পথে যেতে যেতে । ফজলুররহমান বাবুল

এমনও নয় যে, কবিতা আমাকে তার সঙ্গী হতে দূর কিংবা কাছ থেকে ইশারায় ডেকেছিল। পথে যেতে যেতে মনের খেয়ালে আমিই তার ভুবনবাড়িতে কোনও-একদিন উঁকি দিয়েছিলাম। কবিতার সঙ্গে প্রায়শ দেখাসাক্ষাতে আমি প্রাণিত হই বলে সুখে দুখে ভালোয় মন্দে কোনও-এক প্রেম অন্য-কতকিছুকে ছাপিয়ে ক্রমশ বেড়ে ওঠে আর এক অন্ধ-আনুগত্যেই তার কাছে ক্রমশ নিজেকে সমর্পণ করতে থাকি। ক্রমশ আমি হয়ে যাই একজন কবিতানুরাগী। কোনও কাব্যজিজ্ঞাসালোকে কোনও আলংকারিকের সৌন্দর্যবর্ণনায় নয়, শুধু নিজেরই ভালো লাগায় কবিতা হয়ে ওঠে আমার অনুরাগের বিষয়। কবিতার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই আমার চিত্ত-প্রদেশে কোনও আত্মতৃপ্তির উদয় হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলেও তা কেমন ছিল, কতটা ছিল, সেটা আজ আর স্মরণ করতে পারি না। কবিতার অস্তিত্বের পাশাপাশি কোনও-এক আকর্ষণ আছে বলেই তো কবিতার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। অনেক দিন থেকে কবিতার সঙ্গে আছি কিংবা কবিতা আমার সঙ্গে আছে। কবিতার ফল্গুধারা আদিম মানুষ থেকে আধুনিক মানুষের সঙ্গে স্রোতের মতো বয়ে চলেছে। কী কারণে সেটা? কবিতার সৌন্দর্য/দ্যুতি-ব্যঞ্জনা (সব মানুষের মনকে না-হলেও) কোনও কোনও মানুষের মনকে আকর্ষণ করে, কোনওভাবে প্রভাবিত করে বলে? সৌন্দর্য/দ্যুতি বা ব্যঞ্জনার আকর্ষণেই কবিতার সঙ্গে আমার প্রেম।  

আমি কবিতার কোনও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার্থ যেমন জানি না, তেমনই জানি না কীভাবে একটা সফল কবিতা লিখে ফেলা যায়। কবিতাপাঠ কিংবা শ্রবণ থেকে বুঝি, এই মাধ্যমে ভিন্নরকম সৌন্দর্যের অস্তিত্ব আছে। কবিতার সৌন্দর্য চোখে দেখার কিছু নয়, অনুভবের/উপলব্ধির বিষয়। অনুভবে, উপলব্ধিতে সুন্দরকে পাই। ছবির/দৃশ্যের ভিতর জেগে ওঠে বা জ্বলে ওঠে ধরা পড়ে আলো। আলো আসে অতীত ও বর্তমানের ভিতর থেকে। আলো, অসাধারণ কোনও মুহূর্তের আলো কিংবা খুুব সাধারণ কোনও মুহূর্তের আলো। কোনও আলো জ্বলে আর ছবি ভেসে ওঠে। উপভোগ করি।

আলো কিসের? ছবি কিসের? দৃশ্য কিসের? কত আলো, ছবি কিংবা দৃশের কথাই-বা বলতে পারি আমি! আলো-ছবির কোনও শেষ নেই, দৃশ্য-ছবির কোনও শেষ নেই। খুব কাছের চেনা-অচেনা ছবি, দৃশ্য – দূরদূরান্তের চেনা-অচেনা ছবি কিংবা দৃশ্য হঠাৎ যেন ঘুম থেকে জেগে ওঠে। বিচিত্র ভাবতরঙ্গে আবেগ-অনুরাগের আলোকোদ্ভাসিত পটে কেবলই ছবি, কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়। কোনও কোনও দৃশ্য-ছবি যেন চোখের সামনে আসে আমারই স্বপ্নের জানালা থেকে। কোনও কোনও দৃশ্য-ছবি যেন কোনও নক্ষত্রের প্রিয়ার হাসির ভিতর থেকে একঝাঁক প্রজাপতির উড়াল দেওয়া; কোনও কোনও দৃশ্য-ছবি ঘন-কালো মেঘ থেকে ঝরে পড়া কোনও বিষণ্ন-স্মৃতি অথবা বিস্মৃতি। দৃশ্য-ছবির ভিতর স্বপ্ন থাকে গল্প বুনবার। গল্প কিংবা দৃশ্য-ছবি থাকে কত স্বপ্নের আত্মাহুতি দেওয়ার। কবিতার অফুরান গল্প, অফুরান দৃশ্য-ছবি। ছবির ভিতর থেকে ছবি, দৃশ্যের ভিতর থেকে দৃশ্য জাগে আর যেন মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। কবিতায় আমার কোনও ছবি, দৃশ্য কি ধরা পড়েনি কোথাও? আমি কবিতার মৃত্তিকায় পরিভ্রমণ করি, জল-হাওয়ায় পরিভ্রমণ করি, আমার ছবি ফুটে ওঠে আর আমাকে স্পর্শ করে, কাঁপিয়েও তোলে। আর, সেইসব কবিতাও যেন আমার হয়ে যায় – যা কোনওদিন আমার জন্যও লিখে রাখেননি কবি।

ব্যক্তি-আমি যেমনই হই না কেন, কবিতার সুন্দর আমার সঙ্গে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে না। কবিতা যেভাবেই লিখতে চাই না কেন, কেবল লেখার সময় ছাড়া অন্য কোনও সময় আমি কবিও নই। কবিতা কি আমারই ভিতরে হঠাৎ কোনও ডুবোদ্বীপের ভেসে-ওঠা? দ্বীপ ভেসে ওঠে, ডুবেও যায়। কবিতা মাঝেমধ্যে লেখা যায়, সবসময় লেখা যায় না। আমি সবসময় লিখতে পারি না। লিখতে না-পারাটাও কি এক অলেখা-কবিতা হয়েই থাকে না? কবিতা আছে, কবিতা থাকুক

সময়ের সমুদ্রে রস ও রহস্যে কবিতা যেন তার পুরনো রং বদলে নতুন রূপে আমার কাছে আসে। বলতে চাই, কবিতা পুরনো সময়কে অতিক্রম করে নতুন সময়ে আমাকে পৌঁছে দেয়, ভাবায়; আমি হয়ে উঠি এক নতুন আমি; অনুভবের নির্জন দ্বীপে নৈঃশব্দ্যে গজিয়ে ওঠা তৃণলতার মতো কোনও আমি। তখন আমাকে স্পর্শ করতে পারে না কোনও তৃণভুক। আমি আনন্দ উপভোগ করি। অভিভূত হই।

আমি যখন অনুভব পান করি তখন লিখতে পারি কবিতা, আমার মনে যখন অনুভব খেলা করে–– লিখতে পারি কবিতা। অনুভবের খেলায় আমি আমার ছায়ার উলটো পিঠে আঁকতে পারি ছবি এবং নিজেকে অনায়াসেই সুখি কিংবা দুখিও ভাবতে পারি। কবিতার সঙ্গে আমি একাকী থাকি না, কবিতার সঙ্গে পথ হাঁটি একাধিক আমি। অনুভবে আমি আমারই উলটো ছায়া। সকল অনুভবকে প্রশ্রয় দিতে পারি না। আমার কবিতায় সকল অনুভব বিজয়ীও হতে পারে না।

‘আমি’একটি সর্বনাম। কবিতায় কত-যে আমি! কত ‘আমি’ কেই মনে হয় আমারই ‘আমি’ ! কথার ফাঁকে কত রঙের, কত ঢঙের, কত সুরের ‘আমি’ ঘুমায় আর জেগে ওঠে। আমার ছায়ার ভিতর থেকে ‘আমি’ বেরিয়ে পড়ে আবার ছায়ার ভিতরেই লুকিয়ে যায়। ‘আমি’ কি আমারই ছায়া? আমার সবকিছুতেই কি ‘আমি’ থাকে? আমি যেসব কবিতা পড়ি, তার সবগুলোয় কবির ‘আমি’ কে পাই না। আমার ‘আমি’ চায়, কবিতায় যেন তার কথা বলি।

আমার কবিতা মানে – আমারই ভাবাবেগের প্রকাশ, যে-ভাবাবেগ আমি সৃষ্টি করি না, আবিষ্কার করি। একটা কবিতা লিখে ফেলার পর সেটার প্রথম পাঠক আমিই। একটা কবিতা যদি লিখতে পারি, তো তার প্রথম পাঠে আমারই কোনও-এক ‘আমি’র ভাবাবেগ কিংবা অনুভবের ছায়াকে ছুঁয়ে দেখতে চাই। অক্ষরে অক্ষরে রেখে যাওয়া ‘আমি’র গন্ধ শুঁকতে চাই। এইসব যেন এক অদৃশ্য ‘আমি’র স্মৃতিকথাপাঠ। আমি বহুমুখী। আমি প্রকাশিত, আমি অপ্রকাশিত। আমি সত্য, আমি মিথ্যে। আমি আমার সম্মুখে, আমি আমার পশ্চাতে। আমি আমার ভিতরে, আমি আমার বাইরে। আমি চাই না একই অনুভূতির গন্ধসরোবরে দিনের পর দিন ‘আমি’ তার পুনরাবৃত্তিতে মত্ত থাকুক।       

  কখনও-বা আমার ‘আমি’ যেন অচেনা সমুদ্রের জলে ভেসে ওঠা কোনও দ্বীপ। কখনও-বা ‘আমি’ কোনও ভোরের রৌদ্রের মতো জানালা দিয়ে আমাকে একবার দেখে শিঘ্রই অদৃশ্য হয়ে যায়। আমার ‘আমি’ আমাকেই জিগ্যেস করে, কোনও রৌদ্র কি ধরে রাখা যায়? অন্ধকারে কেউ রৌদ্রের কথা ভুলে গেলে রৌদ্রের কী আসে যায়? আমি জানি, কত-যে দিন যায়, কত-যে রৌদ্র যায়। আমার মধ্যে কত দ্বীপ ভেসে ওঠে, কত দ্বীপ ডুবে যায়। এক ‘আমি’ আরও-এক ‘আমি’ কে জিগ্যেস করে, কবিতার কোন দ্বীপেই-বা বানাবে তোমার প্রতিশ্রুতির ঘর? কবিতার কোন দ্বীপ তোমার আপন আর কোন দ্বীপই-বা পর? কবিতার কোন সত্যকে আপন করে নেবে তুমি বেলা-অবেলায়? কোন সত্যকেই-বা তুমি করবে পর?

কবিতার সত্য মাঝে মাঝে এক অন্ধ-প্রহর। আর, কবিতা তেমনই, সমুদ্রের তলা থেকে যেন জ্বলে ওঠে কোনও আগ্নেয়গিরির আগুন। কবিতা যেন অরণ্যে হিমবাহে আকাশে মেঘে কিংবা হাওয়ায় হঠাৎ কিছু জ্বলে-ওঠা অথবা কোনও অচেনা দ্বীপে পালিয়ে গিয়ে পুরনো বাড়িতে আর কোনওদিন ফিরে না-আসা।

কোনও কোনও কবিতা পাঠ-উত্তর মনে হয়, ওরকম তো আমিও লিখতে পারতাম। কিন্তু, আগেই তো লেখা হয়ে ওঠে না! কখনও-সখনও মনে হয়, আর কখনও কবিতা হবে না আমাকে দিয়ে, আবার আশার পালও তোলা হয়। বিষয়ের মূলে কি শুধু লেখা কিংবা শুধু পড়া? পথে যেতে যেতে পথ ভেসে ওঠে। কবিতার চেনা ও অচেনা পথে শতশিখা জ¦ লে ওঠে তার বন্ধু হবার এবং পথ হাঁটার। ভ্রমণে বেরোনোর আগেই পথগুলো বোঝা যায় না, ভ্রমণের শেষে সব পথ ভোলাও যায় না। পথে পথে রাত্রি, পথে পথে দিন। শুধু হেঁটে চলে সময়। কবিতার প্রেমে পথ চেয়ে থাকা কিংবা কবিতার পথে পথে হাঁটা নেশা আমার। শুধুশুধু লেখার নেশায়ও যাপন করি না সময়। পড়ার খিদেও পায়। খিদেই তো। সম্মোহনের ভিতরে পড়ি, সম্মোহনের বাইরেও পড়ি। শুধু সম্মোহনের ভিতরে পাঠ্যবস্তু নির্বাচন করতে চাই না আমি।

কারও কারও মনের ভিতরে একটি স্বপ্নের দেশ থাকতেই পারে। কবিতা কবির একটি স¦প্নের দেশ, সাজানো আনন্দের দেশ, বিষাদের দেশ, দিন ও রাত্রির আয়নায় দেখা ভালোবাসার দেশ, ফুল ও ফসলে ভরা দেশ, কোনও বুভুক্ষু মানুষের দেশ, কোনও চেনা দেশ, কোনও অচেনা দেশ, স্পষ্ট কিংবা অস্পষ্ট কোনও ছবির দেশ। কবিতার দেশটি সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত। কবিতা রাজা ও প্রজার, কবিতা কামারের কুমারের ছুতোরের মুটেমজুরের, কবিতা তোমার, কবিতা আমার। ফ্যাসিবাদের কোনও দালাল কিংবা কোনও ঢাঁট-মাতাল কবিতা নিয়ে কুতর্ক করলে কবি ও কবিতার কী আসে-যায়? কবি যে-অর্থসংগতিতে লেখেন সেই অর্থসংগতিতেই সকল পাঠক মর্মার্থ উপলব্ধি করেন না, কেউ কেউ উপলব্ধি করেন। সব সবল কবিতাই সকলের কাছে সমান অর্থসংগতিতে ধরা পড়ে না। সবল কবিতাগুলো গাঢ় ভাবেই কোনও-না-কোনও পাঠকের প্রাণে প্রভাব ফেলে। সকল অনুভবে কবিতার সকল রূপ-রং একইভাবে ধরা দেয় না।

কবিতা আমার নিঃসঙ্গতাকেও রোধ করে, আমাকে সঙ্গ দেয়। শূন্যতা বড়ো বজ্জাত, জানেন তো সকলে। কোনও নিমন্ত্রণ না-পেয়েও তার নিজেরই অভীপ্সায় চিঁবিয়ে খেতে চায় ধীরে ধীরে। চোয়ালটা তার বেজায় শক্ত। শূন্যতা বড়ো বেয়াড়া, তার নেই কোনও ভয়-ব্যথা-উদ্বেগ। কবিতায় আমি শূন্যতার বদলে কখনও-সখনও পাঠ করতে চাই শিমুলফুলের বেদনা। নিঃসঙ্গতায় শূন্যতার সুর কবি শুনতে পায়। শূন্যতা একজন কবিকেও ভাবিয়ে তোলে। মিরোস্লাভ হোলব বলেছিলেন, ‘শূন্যতা শুধু কোনও-একজন লোকেরই মাথাব্যথা নয়, নয় কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির ব্যাপার। তার বিশৃঙ্খলার জন্যই সে সকলের বিষয়, সকলের বিবেচ্য-জীবনপরিবেশ হিশেবে সে দানা বেঁধে ওঠে, শ্বাসের সঙ্গে ভিতরে ঢুকে যায়, বীজাণু ছড়ায়, সংক্রাম ঘটায়, বংশবৃদ্ধি করে বহুগুণ, ক্রমে হয়ে ওঠে মহামারী।’ আমি লিখতে লিখতে উপলব্ধি করি, পাঠ করতে করতে উপলব্ধি করি, কবিতা কবির শূন্যতাকে প্রতিরোধ করে, প্রতিরোধ করে পাঠকের শূন্যতাকেও। একটা কবিতা লিখে ফেলার পর আমিও একজন পাঠক।

শূন্যতা যাতে আমাকে দেখতে না-পায়, তেমন উদ্দেশ্যেও কবিতা লিখতে বসি না আমি। মনে হয়, কবিতা আমাকে দেখতে না-পেলে খুঁজতে থাকে মনে মনে। কবিতার পক্ষে কেউ যেন বলতে থাকে, নদীর জলে ভাসতে ভাসতে লিখে ফেলো বৃষ্টিজল কিংবা কোনও নিমগ্ন সেতুর গল্প, লিখে ফেলো শূন্যতাঘেরা বেদনা। আর, আমি জানি না, জানি না, কোনও শূন্যতার ভিতরে কারও কোনও বেদনা লিখে নেওয়ার শখ থাকে কি না।

চাই, কবিতা বেঁচে থাকুক মানুষের জীবন-বিচরণে, যদিও গুহা-গহ্বরের অন্ধকারে সরাসরি কবিতা নয় কোনও বিদ্যুৎবাতি। এই বাহ্য জগতের কতশত দুর্যোগ-মহামারিও রুখতে পারে না কবিতা। কবিতা তার রসিকের কাছে জরুরি। কাব্যরসিক কবিতাকে খোঁজেন বিষয়বস্তু, ভাববিন্যাসসহ নানান সৌন্দর্যবৈচিত্র্যে।

কবিতা একটা-কিছু, সৌন্দর্যছড়ানো। এবং, কবিতার অলিগলি কিংবা মহাসড়কে সকল বয়সের কবিই ভাবশিশু। যে-কোনও বয়সেই একজন কবিকে ক্রমশ শিখতে হয় তার পথে হাঁটা। যে-কোনও দিনে যে-কোনও সময় তার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা যায় কিংবা পথে পথে সঙ্গী হওয়া যায়। কবিতার বাড়ি-পথ শান্ত, অস্থির, চঞ্চল। আমার চৈতন্যে কবিতা কখনও এক অদৃশ্য সুন্দরের কণ্ঠধ্বনি, কখনও বিদ্যুচ্চমক, কখনও-সখনও স্বপ্নে আঁকা কোনও ছবি।

একজন কবি স্বপ্নে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’ ছবিকে কথা বলাতে পারেন কিংবা সাহারা মরুভূমিকে মুহূর্তেই করে দিতে পারেন ফুল ও ফসলের বাগান। পড়োবাড়িগুলোর দেওয়াল ছাদ দরজা জানালা নতুন রঙে নতুন ঢঙে সাজালেও কবিতা হয়ে ওঠে না। দিঘির পারে, নদীর তীরে বসে বসে ধ্যানে কবিতাদেবীর দেখা পাওয়ার নিশ্চয়তা না-থাকলেও কবিতাকে পাওয়া যেতে পারে সবখানে; মানুষের সীমানা যতদূরে (এবং মানুষের সীমানা নির্দেশের কোনও সত্যিকার সূত্র আজও মানুষ জানতে পারেনি)।

প্রতীক্ষায়ও কবিতাকে পাই না, আবার এমনিই পাই। অনুভবের/উপলব্ধির অরণ্যে কিংবা ঝোপঝাড়ে কবিতা উঁকি দেয়, ধরা দেয়। তাকে পাওয়ার জন্য কোনও শানবাঁধানো ঘাটে বসে থাকতে হয় না, নীরবতায়, হট্টগোলেও পাওয়া যায়, আবার কোনওভাবেই পাওয়া যায় না। শুধু তারাভরা রাতে বাড়ির ছাদে একা একা বসে কবিতা পাওয়া গেলে এক রাতেই কতশত কবিতা লিখে ফেলা যেত।

অনুভবের তোড় আমাকে কাঁপায়। আমি কবিতায় পরিভ্রমণ করি সুন্দরের দেখা পাব বলে। কবিতা পরিদৃশ্যমান কিছুকে অদৃশ্য সুন্দরে রূপান্তর করতে পারলেও তা নয় কোনও সুন্দরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ব্যক্তি-আমি যেমনই হই না কেন, কবিতার সুন্দর আমার সঙ্গে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে না। কবিতা যেভাবেই লিখতে চাই না কেন, কেবল লেখার সময় ছাড়া অন্য কোনও সময় আমি কবিও নই। কবিতা কি আমারই ভিতরে হঠাৎ কোনও ডুবোদ্বীপের ভেসে-ওঠা? দ্বীপ ভেসে ওঠে, ডুবেও যায়। কবিতা মাঝেমধ্যে লেখা যায়, সবসময় লেখা যায় না। আমি সবসময় লিখতে পারি না। লিখতে না-পারাটাও কি এক অলেখা-কবিতা হয়েই থাকে না? কবিতা আছে, কবিতা থাকুক।

 

Comments

comments

ফজলুররহমান বাবুল

ফজলুররহমান বাবুল

জন্মসাল ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ। জন্মমাটি ও বাসস্থান সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলাধীন উত্তর-মিরেরচর, মালদারবাড়ি। মাঝেমধ্যে কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখেন। মূলত কবি। 'ঋতি' নামের একটি কবিতার কাগজ সম্পাদনা করেছেন কিছুদিন। বই, ভ্রমণ এবং নিসর্গপ্রেমী। প্রকাশানুক্রমে ফজলুররহমান বাবুল বিরচিত কবিতাবইগুলো : ঋণী হবো সোহাগী জলে (১৯৯৯), সখিকাব্য (২০০৪), সপ্তস্ফুট (২০১২), থেঁতো ফর্দ (২০১৪)।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি