‘মরণ’ শব্দে লিখে দিলাম মরণকথার প্রেম । নাহিদা নাহিদ

যবে সম্মুখে দেখি মোর অপ্রিয় মুখ
তব
অন্তঃতলদেশে বাড়ে মৃত্যুপ্রিয় সুখ!

গতকাল রাতে আমার স্বপ্নে এলো ‘চন্দরা! রবি ঠাকুরের সে নতুন নৌকোর মতো মেয়ে চন্দরা। পুনরায় পুনঃপুন ব্যঞ্জনায় সে কহিল মরণ! তৃষ্ণা বেড়ে গেলো আমার, সাধ হলো মরিবার! চন্দরাতো জানে না কাদম্বিনীর ন্যায় সেও মরিয়া প্রমাণ করিলো তাহার ‘মরণ’ শব্দটি এখনও মরে নাই! এই ‘মরণ’ শব্দটির এ এক বিচ্ছিরি টান! নাচন তুলে রাখে সব সময়! চন্দরাকে চেনার আগেই এ ‘মরণ’ আমার অন্তরে বসে খোল, করতাল, মন্দিরা বাজিয়েছে বহুকাল। পাগলা সন্ন্যাসিনীর মতো ভৈরব রাগিনীর মাতন তুলেছে যখন তখন! ‘মরণ’ শব্দের মরণপ্রেমে না ভাসি না ডুবি! ‘মরণ নামে মরণপ্রেম! মরণ নেশায় তুচ্ছ লাগে প্রাণ! দোষ যদি দেই তবে বলি ‘মরণ’ নামের এ বিষমঘোর রবি ঠাকুরের অভিশাপ! তাঁকে ভালও বাসি; মন্দও বাসি আমি! বলুনতো কোন পাপে আজীবন মরণবিলাপের দণ্ড পেলাম আমি! আমার যে বড্ড তাঁর মতো করে কইতে ইচ্ছে হয় ‘আকাশেতো রাখি নাই মোর মরিবার ইতিহাস’! সমস্যা একটাই কেবল ‘উড়িবার ইতিহাস’ আর ‘মরিবার ইতিহাস’ কোথায় যেন এক হয়ে যায় আমার! গোলমেলে সব!

প্রথম প্রথম এ রোগের শুরুটায় একটা কথা ঢং ঢং করে বাজতো মনের গোপন ঘরে!” মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান”, বড় আচানক বিষয় কবে যেন দেখি এ মরণশ্যাম রীতিমতো আমার হয়ে গেছে! আমার সাথে হাসে- খেলে, আমার সাথেই তার আজন্ম বাস! বৎসর বৎসর পার করে দেখি আপামর আমজনতারও আজ আমার মতোই ত্রিশঙ্কু ত্রাহী অবস্থা! মরণ শব্দে কেমন কৌতুহলে নাচে সব, চোরা কেষ্টার এই তবে কারসাজি! শ্যাম পিরিতির বালির বাঁধে নাচে রাধা মন! ঘোর কলিকাল! ঝরঝরে আধুনিক মন সবের তবুও এ মতিভ্রম! এতো গেলো মরণের প্রেমপর্বের উপাখ্যান। এবার উল্টো পথে খুঁজি এই মরণের ভয়াল জিঘাংসা রূপ!

আপনাদেট জানা আছে কী পৃথিবীর সব প্রাণ আজ মৃত, সকল আত্মা ছেয়ে আছে মরণ নামক ঘুমব্যাধিতে! সীমাহীন কৌতুহলে আজ আমরা দেখি মৃতপ্রাণ মানুষের হাসি! যদি দেখি কোন জীবনবাদীর যাপিত জীবন অন্তহীন সুখ; ভাবি এ নিছক সুখ সুখ খেলা! সতৃষ্ণ মনে এও ভাবি আহা এ সুখীমানুষগুলো মরবে কবে? আজন্ম তৃষ্ণায় আমরা সকলেই আজ এক! মরণকামী, ধ্বংসকামী! কান পেতে উৎকর্ণ হয়ে থাকি বায়বীয় বাতাসে ভেসে বেড়ানো মৃত্যুশোক শোনার অপেক্ষায়! মরণশোকের মাতঙ্গী নাচে বড্ড মোহ আজ আমাদের।

কোন কবি যদি সংগোপনে নিজের ঘরে আপন মনে কলম ছুঁয়ে লিখে রেখে যান “শোনা গেল লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে; কাল রাতে ফালগুনের রাতের আঁধারে যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ। তখন আমাদের মনোযোগে পঞ্চমীর ডুবে যাওয়া চাঁদের চেয়ে লাশটাই বড় হয়ে ওঠে। মনে মনে ভাবি; কাকে নিয়ে গেলো লাশকাটা ঘরে! কী নাম ছিল তার! ঘোলাচোখ পেতে বসে থাকি একটা মৃত লাশ দেখবো বলে! কবিকে খুঁজি এদিক সেদিক। শুনেছি সে কবি নাকি জোছনার জল গায়ে মেখে মৃত হরিণীর সাথে মধ্যরাতে আছেন কোথাও! হেমন্তের ঝড়ে পথের পাতার মতো এখনো কেউ তাঁর বুকের পাঁজরে শুয়ে আছে হয়তো! অথবা ভাবি যদি সেই বেদুইনের কথা “ধবল কঙ্কাল যেথা দিকে দিকে রয়েছে ছড়ায়ে, অন্তহীন বালুকা জড়ায়ে” কেমন ভাবনা এসব? হায় জীবনানন্দ! কেন তবে এ মৃত্যুপ্রেমে মজে ছিলে তুমি! কঙ্কাল দেখেও মিটেনি সাধ! ধানসিঁড়ির তীরে আবার এসে শোনাতে চাও মৃত্যুকথন!

খোঁপায় দোলন চাপা গুজে চোখে কাজল মেখে দাঁড়াই আর্শীতে! বেশ তো বর্ষার সদ্যুতা শিশিরের মতো সাজ! আত্মপ্রেমে নিজেকে একটু বেশিই ভালোবাসি আজ! এরপর লাজুক চোখে তাকাই আশেপাশে, ঐ তো মরে পড়ে আছে আমার বিশটাকা মূল্যের তাজা প্রাণ!

কবিদের ভুলে যাই। খাতা রেখে,পাতা ছেড়ে চলুন দেখি বহুবিধ উৎসবে মৃত্যু আয়োজন! আমরা ইটের পরে ”ইট মাঝে মানুষ হয়ে কীট” ভূমিধ্বসে,পাহাড়ধ্বসে, মাটির মাঝে, ইটের মাঝে চলুন খুঁজি এবার আস্ত আস্ত মানুষের লাশ! একটু এদিক সেদিক মৃত্যু দেখি চলুন! গার্মেন্টস পোড়ে, বিল্ডিং ভেঙে হয় হাঁ! সেখানে কত কত লাশ! একটা দুটো মরণ দেখে কী হয় আমাদের! মরণ শ্যামের ভালোবাসায় লাশের গায়ের গন্ধে নেশা হয় খুব; এগিয়ে দেই ক্যামেরা,তুলে রাখি ছবি!সময়ে অসময়ে দেখি সেসব! কখনো কখনো মাইক্রোফোন এগিয়ে দেই, জনাব আপনি মরে যাচ্ছেন, প্লিজ বলে যান অনুভূতি!হাজার হাজার মানুষ দেখুক লাইভ! বড় শখ করে আমরা এখন মৃতদের স্কোর গুণি! বাজারে কান পাতি। কোথায় কে মরলো একটু শুনি! মনে মনে মৃতপ্রায় মানুষের প্রতি কাতর মিনতি জানাই প্রিয় মরণ পথের যাত্রী, আমরা গোণার আগেই আপনারা মরে যাবেন না প্লিজ! এই দেখেন এবারের বন্যায় মরলো সবে ১৬৮, এত কমে হয়? আরেকটু সংখ্যা বাড়ান। দয়া করুন! হাত তুলি, প্রার্থনা করি বাড়–ক জল আরো, হাজার ছড়াক তবেই না আমরা কেঁদে কেঁদে বলবো দেখুন দেখুন আমাদের এত এত লাশ! এত মানুষ মরেছে আমাদের! এখানে অযথা ধর্ষণের ঘটনা টানবো না! সেখানে মানুষ মরে খুব কম, দিব্যি বেঁচে থাকে, মামলা করে! শিশুদের মতো মৃতের সংখ্যা বেশি নয়। আর রুপাদের মতো দু’একজন মরে গেলে ভুলে যাই দ্রুত।ভুলে যাওয়াটা স্বভাব আমাদের! এদিকেও সংখ্যা আর একটু বাড়ুক!

বড় শখ করে আমরা তখন সেদিকে তাকাবো! আচ্ছা এই মরণ দেখার চরম নেশায় আমার মতো ক’জন আছে পাগল বলুনতো? ইডিপাস এখনো বেঁচে আছে জানেন? সুন্দরী ক্লিউপেট্রা মরে গেছে কবে? ইদানীং রাস্তাঘাটে কিউপেট্রাদের মতো মৃতদের খুব হাসতে দেখা যায়! ঘরে অথবা রাস্তায়! ভিড় দেখলেই এখন আমি আগবাড়িয়ে যাই, ঢেলেঠুলে ঢুকে যাই ভিড়ের ভেতর, এই যে ভাই সরে দাঁড়ান একটু। আমি দেখতে চাই কিছু! সামনে দেখি বিরাট বিরাট ফটোগ্রাফ, বেলাবোস দাঁড়িয়ে বেলাবিস্কুট খায় , আমি ভিড় কমাই ঠেলে! আপনি কিনু গোয়ালার গলির সেই হরিপদ হয়ে থাকলে পিছু হটেন দাদা, এখনে মরাবেড়াল, মাছের কানকো কাঁঠালেরভুতি ফেলার জায়গা নেই, কেরনীরা অচ্ছুত! এখানে সব হাস্যমুখি মানুষ! এরা বেঁচে থাকবে অনন্তকাল! এসব শুনলে লোকজন হাসে। হয়তো আপনারাও হাসছেন? হাসুন। কোথায় শুরু আর কোথায় এসে ঠেকছে। আপনি হরিপদ নন! আপনি কমলা। হোন না দাদা তাতে কি হলো? হলেন না হয় আপনি অমিতের লাবন্য, জমিটাতো বেলাবোসদের?আপনি চিনতেন তাকে? গানে শুনেছেন? এতদিনে নিশ্চই মরে গেছে সে! আমি সুযোগ পেলেই মৃত্যু প্রসঙ্গ টানি। আচ্ছা আপনি অনিলা, সুনীলা কমলা যাই হোন দিদি আপনার পাতলা ফিনফিনে কাপড়ের রং লাল হলুদ, সবুজ, নীল ছড়িয়ে আলো ছড়াক যতো, আপনি হয় কাটুন, না হয় সরুন। সদাশয় মহাশয় হাস্যমুখ নারী যেদিন আপনি মরে যাবেন; সেদিন খবর দেবেন কিন্তু! শুনে যাবো আপনার গল্প! আর আত্মহত্যা করলে একটা নোট রেখে যাবেন প্লিজ! আমরা নিজ দায়িত্বে ভাইরাল করবো আপনার গোপন গোপন ব্যথার সুখ। ওমা এখানেও হাসি! দেখুন আপনার দাঁতের এনামেল খসে গেছে? আহা আপনার দাঁতের ফাঁকে একঝাঁক মানুষ পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে, আমি, আপনি আমরা সবাই এখন একসাথে- আত্মপ্রিয় মানুষের দল, বড্ড বেশি মৃত্যুপ্রিয় এখন!

 এই যে মহাশয়রা চলে যাচ্ছেন কেন! আমার শেষ কথাটা শুনে যান! না না আপনাদের দোষ দিচ্ছি না। আপনাদের তুলনায় আমিই বরং একটু বেশি! মৃত্যু নিয়ে ভুগি বিলাসিতার সুখে!

 জানেন ডজনখানেক গল্পও লিখেছি মৃত্যু নিয়ে, ভয় পাবেন না গল্পগুলো বলছি না এখন! গত কালকের কা-টা শুনে যান একটু! মেলায় গিয়েছিলাম! সেই পুরাকালের মতো একালের মেলায় আর তালপাতার বাঁশি পাওয়া যায় না, আমি এদিক সেদিক ঘুরে একটা প্লাস্টিকের পাখা কিনে নিই, পাশেই বন্দুকওয়ালা; আমি ঠাস ঠাস করে কয়েকটা বেলুন ফাটিয়ে দিলাম! লাল নীল গোলাপী বেলুনগুলো চুপসে গেলো সব! এক একটা বেলুন এক একটা দানবীয় মানুষের মুখ! আমি মহাবীর কর্ণ ভাবি নিজেকে, উহু আমি অর্জুন! সামনে রাজত্ব বা রাজকন্যা কোনটাই নেই, তবু একচোখ কানা করে মহাত্রাসে গেলে দিলাম ঘূর্ণায়মান মাছের চোখ! আহা করুণ বেলুন! বেলুন শোকে বিষণ্ন মনে আমি মেলা থেকে বের হই! মেলায় সকল রকম পণ্যের অসীম মূল্য! আমার চলবে কেন? সস্তায় চাই সব! বিরস বদনে ফিরবো ভাবলাম! অবশেষে মেলার প্রবেশমুখেই পেয়ে গেলাম বর্ণাঢ্য আয়োজনের সবচেয়ে কম দামী দুটি পণ্য। দশ টাকায় এক একটা কচি প্রাণ। সদ্য ডিম থেকে ফোটা তুলতুলে খেলনা পুতুলের মতো জীবিত মুরগীর ছানা। একঝুড়ি আছে, বিক্রি হচ্ছে ভালোই! প্লাস্টিকের তুলোর পুতুলের কত দাম বাবা! আমি সস্তায় কিনে ফেলি দুটো জীবিত প্রাণ। মাত্র বিশ টাকা। জানতাম মরে যাবে ছানা দুটো; তবুও আনলাম। পলি কাগজ ফুটো করে রেখে দিলাম ঘরে! সারারাত কাঁদলো ছানার দল, সকালে উঠে ভুলে যাই সব।

খোঁপায় দোলন চাপা গুজে চোখে কাজল মেখে দাঁড়াই আর্শীতে! বেশ তো বর্ষার সদ্যুতা শিশিরের মতো সাজ! আত্মপ্রেমে নিজেকে একটু বেশিই ভালোবাসি আজ! এরপর লাজুক চোখে তাকাই আশেপাশে, ঐ তো মরে পড়ে আছে আমার বিশটাকা মূল্যের তাজা প্রাণ!

 মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান!

Comments

comments

নাহিদা নাহিদ

নাহিদা নাহিদ

কথা সাহিত্যিক, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। মোবাইল: +88 01719-900769

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি