বৃষ্টিদিনের জার্নাল : আঙুল টেবিল টাইপরাইটার ও অন্যান্য নস্টালজিয়া । এমদাদ রহমান

‘কবে বৃষ্টি শেষে আমার- তোমার সঙ্গে দেখা হবে…

মৌসুমি ভৌমিক একা একাই গেয়ে যান বৃষ্টির গান, জানালা দিয়ে দূরে, আমি, অন্ধকারে, আসলে- আলো-অন্ধকারে, বার্চ কিংবা ওক- মধ্যরাতের এই নিঃসঙ্গ গাছগুলির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে- জীবন, তোমাকেই নমস্কার করি। শনিবার রাত শেষ হয়েছে একটু আগে, রোববারের প্রথম প্রহর এখন; তখন, মৌসুমি ছাড়া বৃষ্টির গান কে শোনাবে আর? বাইরের বিষণ্ণ-হলদে আলোয়, উইনচেস্টার স্ট্রিট জাগছে- একটু একটু করে। গান বেজে চলেছে, মৌসুমির আরেকটি  গান- বৃষ্টি পড়ে রে… ভেজা আকাশ ভেজা মাটি, ভেজা পথে আমরা হাঁটি… বৃষ্টি পড়ে রে… মৌসুমি ভৌমিকের গানটা একা একা দুই বার বেজেছে। শনিবার শেষ রাতে, কী আশ্চর্য, একজন লেখককে আজ প্রথম-ই পড়ব। জন এডগার ওয়াইডম্যান। হ্যাঁ। তাঁর একটা গল্প পড়ে ফেলা যাক- ‘একটা লোক তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হাঁটছিল, কলা খেতে খেতে।’ গল্পের শুরুতেই বৃষ্টি! আচ্ছা… পড়ে ফেলা যাক, ওয়াইডম্যানের গল্পটি- ‘একটা লোক তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হাঁটছিল, কলা খেতে খেতে। লোকটি কোথা থেকে আসছে। আর এভাবে, ভিজতে ভিজতে সে যাচ্ছেই বা কোথায়। সে কলাটিকে খাচ্ছে কেন। কীভাবে মুষলধারার বৃষ্টি পড়ে। কলাটা সে পেয়েছিল কোথায়। কলাটার নাম কী। কতো দ্রুত হাঁটছিল লোকটা। সে কী বৃষ্টির উপর ক্ষেপে গিয়েছিল। কী হচ্ছিল লোকটার মনের ভেতর। কে করছিল এতগুলি প্রশ্ন। উত্তর দেবার জন্য কাকে ধরে নেয়া হয়েছিল। কেন। উত্তর কি দিতেই হবে কোনও একজনকে। এখানে ঠিক কতগুলি প্রশ্ন আছে এই লোকটি সম্পর্কে যে তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কলা খাচ্ছিল। আগের প্রশ্নটি কি তাদের মধ্যে একটি, অথবা এটা একেবারে ভিন্নধর্মী প্রশ্ন- সেই লোকটি, কিংবা- তার হেঁটে যাওয়া কিংবা বৃষ্টি- কোনও কিছুর সঙ্গেই প্রশ্নটি সম্পর্কিত নয়…

হলদে-বিষণ্ণতায় ভোজবাজির মত জেগে উঠেছে উইনচেস্টার স্ট্রিট! হলদে বিষণ্ণতা একটা ধাঁধা যেন! হঠাৎ খেয়াল হল, এই শব্দটা কী অদ্ভুত! ধাঁধা। গোলকধাঁধা। মন্ত্র, আর মন্ত্র মানে বোর্হেস… আজ এই শনিবার শেষ-হওয়া-রাতে, মধ্যরাতে, রোববারের প্রথম প্রহরে- আমার টেবিলে আছেন- জন এডগার ওয়াইডম্যান। আছেন বোর্হেস, মারিও বার্গাস য়োসা। য়োসা আজ তার সাক্ষাৎকারী, ফ্রান্সে সাক্ষাৎ হয়েছে তাঁদের, সঙ্গে আছেন আদিসিয়া হোরাদো। য়োসা’র প্রশ্নের জবাবে বোর্হেস, নির্জনবাসে গেলে সঙ্গে নিয়ে যাবেন, এরকম বইয়ের নাম বলছেন তিনি- ‘হিস্টরি অব ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব রোমান এম্পায়ার’, ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ফিলোসফি’, এই বইয়ের বদলে আঁরি গোইঙ্কায়ের কোনও বই, ১৯১০ কি ১৯১১’র দিকে প্রকাশিত এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার কোনও একটি খণ্ড, বা, ব্রোখাস মেয়ারের কোনও খণ্ড, আর- বাইবেল। বোর্হেস স্মিত হেসে মারিও বার্গাস য়োসাকে বলছেন- আর বাইবেল হচ্ছে নিজেই একটি গ্রন্থাগার। আমার লেখার টেবিলে আছে, ভার্গাস য়সা’র নোবেল বক্তৃতা। এডিথ গ্রসম্যানের ইংরেজি থেকে মহাশ্বেতা’র বাংলা। ২০১০-এর ৭ ডিসেম্বর স্টকহোমে, ভার্গাস য়সা তাঁর কথাগুলি বলছেন- আমি প্রথম পড়তে শিখেছিলাম পাঁচ বছর বয়সে, বলিভিয়ার কোচাবাম্বা শহরের দে লা স্যাল একাদেমির ব্রাদার জুস্তিনিয়ানোর ক্লাসে। আজ পর্যন্ত এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বইয়ের পাতার শব্দ থেকে ছবি গড়ে তোলবার জাদুশক্তিটা আমার জীবনটাকে আমূল বদলে দিয়েছিল; স্থান-কাল-পাত্রের বেড়াজাল ভেঙে অন্য দুনিয়ার চাবিকাঠিটা ধরিয়ে দিয়েছিল আমার হাতে… জাদুশক্তির অধিকারী এই লেখকের গুরুত্বপূর্ণ একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিল প্যারিস রিভিউ। সাক্ষাৎকারীরা তাঁকে জরুরি একটি প্রশ্ন করেন- কেন লেখেন? উত্তরে, য়োসা বলেন-

লিখি, কারণ- আমি অসুখী। লেখালেখিকে আমার অসুখী অবস্থার সঙ্গে লড়াই করবার একটা পদ্ধতি ধরে নিয়েই আমি লিখি।

মৌসুমি ভৌমিকের গান একা একাই বাজে… ওয়াইডম্যানের লেখায় আবার ফিরি- ‘আগের প্রশ্নটি কি তাদের মধ্যে একটি, অথবা এটা একেবারে ভিন্নধর্মী প্রশ্ন- সেই লোকটি, কিংবা- তার হেঁটে যাওয়া কিংবা বৃষ্টি- কোনও কিছুর সঙ্গেই প্রশ্নটি সম্পর্কিত নয়। যদি তা না-ই হয়, প্রশ্নটি তাহলে কোন বিষয়ে করা হয়েছিল। প্রতিটি প্রশ্ন থেকেই কি অন্য প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। তা-ই যদি হয়, তাহলে মূল বিষয় এখানে কোনটি। যদি তা না-ই হয়, তাহলে সর্বশেষ প্রশ্নটি কী হতে পারে। বৃষ্টিতে হেঁটে যাওয়া লোকটি কি কোনও একটির উত্তর জানে। সে কি কলাটাকে উপভোগ করেছিল। সে বৃষ্টিতে ভিজে হেঁটেছিল। তাকে এভাবে হাঁটতে থাকা দেখছিল যে চোখগুলি, সেই চোখগুলির ওজন, আর তাকে দেখে যে বিপুল প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল, লোকটি কি সেসব অনুভব করতে পারছিল। কেন কলাটির উজ্জ্বল হলুদ-কে মনে হচ্ছিল একমাত্র রঙ, একটি ধূসর জগতের শেষ সম্ভাব্য রঙটি তখনও টিকে ছিল বৃষ্টিপতনের গাঢ় ধূসরতার ভেতর, যা চারপাশের সবকিছুকেই করে তুলেছিল আরও বেশি ধূসর। আমি জানি প্রশ্নের পর প্রশ্নের পর শুধুই প্রশ্ন। কিন্তু একমাত্র যে উত্তরটি আমি জানি তা হলো- সব গল্পই আমি সেই লোকটির কাছ থেকে নিয়েছি যে-লোকটি কলা খেতে খেতে বৃষ্টিতে হাঁটছিল, সে মর্মাহত হতে পারে, যদি আমি তোমার সঙ্গে জানালাটির পেছন থেকে বৃষ্টিতে হাঁটতে থাকা তাকে খুঁজে বের না করি।’ ওয়াইডম্যানের লেখা মাথায় আলোড়ন তুলছে। রাতের প্রথম প্রহর শেষ হতে চলেছে। মৌসুমির গান থেকে পড়ছে বৃষ্টি। একা একাই গেয়ে চলেছেন তিনি। এদিকে ওয়াইডম্যানের গল্পের লোকটা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। আমার লেখার টেবিলে, বোর্হেসের পাশে বিভূতিভূষণ, তাঁর পাশে সন্দীপন, তাঁর পাশে বাশেভিস সিঙ্গার। আপাতত শান্তিকল্যাণ…

স্টকহোমে ভারগাস য়োসা কথা বলছেন- ‘প্রত্যেক যুগেরই নিজস্ব আতঙ্ক আছে!’ একটা গভীর অসুখ, গভীর আত্মক্ষয় অনুভূত হয়। সময় বয়ে চলেছে…

এইটুকু বলার পর, একটু বিরতি নিয়ে লোরকা আবারও বলতে লাগলেন, স্পেনের সান্তান্দারে, বন্ধুদের সামনে কথা বলেছেন তিনি- ‘একজন পথভ্রষ্ট নিঃসঙ্গ মানুষ হিসেবে আমি আমার শৈশবকালকে এইভাবে স্মৃতিতে জাগিয়ে তুলি…’, তীব্র হ্যুইশ্যলে শমশেরনগরে ট্রেন থামে… আমাদের হারিয়ে যাওয়া কৈশোর জাগতে থাকে।

একটু একটু করে, হ্যাম্পশায়ার গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবে; কিন্তু, আমার কুঠরির আলো? এন্ডওভার (হ্যাম্পশায়ার) স্টেশনে, এই রাতে একটাও ট্রেন আসবে না? প্রলম্বিত এক হ্যুইশ্যল বাজবে না কোথাও? এখানে, মৌসুমির গানে বৃষ্টি। একা একা গাইছেন তিনি। আমার টেবিলে সন্দীপন। ঈশ্বর হে, পাশের চেয়ারে এসে বসো। দেখো, আমার মনে পড়ছে মেগাডেথ। মনে পড়ছে মনোলগ। শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু যেখানে একা একা কথা বলে স্মৃতির সঙ্গে। এখন, এই এখন, হু হু বাতাস ধেয়ে আসছে সাউদাম্পটন বন্দর থেকে। এই এখন, বোর্হেসের পাশে আছেন হুইটম্যান। মাঝরাতে, পাখিদের দেশান্তর দেখছেন তিনি। এদিকে, বোর্হেস মুখে রহস্যময় অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে বলছেন- বাইবেল নিজেই একটি গ্রন্থাগার…

রাত শেষ হচ্ছে হ্যাম্পশায়ারে। খোলা জানালা দিয়ে হাওয়া আসছে। উত্তুরে হাওয়া। এবার বৃষ্টিতে কামু ভিজবেন। আলবেয়ার কামু। বালিশের পাশে নির্বাচিত নোটবুক। আমি ভিতরে ভিতরে উন্মুখ হয়ে উঠি। কামু’কে পড়তে থাকি-

পাইন গাছগুলি- হলদে পরাগরেণু আর তাদের সবুজ পাতার উল্লাস!  

একজন বুদ্ধিজীবী? হ্যাঁ, এবং তাকে কখনোই অস্বীকার করা যাবে না। বুদ্ধিজীবী হলেন এমন একজন ব্যক্তি যার মন নিজেই নিজেকে দেখতে থাকে। আমি এই ব্যাপারটা পছন্দ করি, কারণ আমি নিজেই দুটি সত্ত্বা-কে ধারণ করছি- আমিই দর্শক আবার সেই আমিই নিজেকে দেখাচ্ছি। ‘তারা কি দুইয়ে মিলে এক হতে পারে না?’ এটা একটা প্রায়োগিক প্রশ্ন। আমাদেরকে অবশ্যই এর উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিকে আমি এই দৃষ্টিতেই বোঝে থাকি : ‘আমি কোনওভাবেই আমার সংশয়গুলোকে বহন করতে পারছি না।’ আমি আমার চোখগুলোকে সব সময় খোলা রাখতে পছন্দ করি।

সারাটা জীবন ধরে আমরা আমাদের ব্যক্তিত্বকে একটা নির্দিষ্ট আকার দিতে আবিরাম চেষ্টা করি। যদি আমরা নিজেদেরকে পরিপূর্ণভাবে জেনে যাই, আমরা মারা যাব।    

ম্যাডনেস– একটি দিনের যাত্রা শুরুর পক্ষে এক মহৎ বিন্যাস– দিবাকর। আকাশ আর অস্থি। ম্যাজিক। জানলায় একটি আঙুল, উদ্দশ্যহীন।

বিপ্লব, গৌরব, মৃত্যু, এবং প্রেম। আমার ভেতরকার সেইসব আলোঅন্ধকার, যাতে ছাপ পড়ে আছে গভীর এক বোধ, এক তীব্র সত্য; সেই দিক থেকে- কী বিশেষ তাৎপর্য আছে তাদের আমার কাছে? ‘আর সেই ব্যাপারটা?’‘কান্নার সেই প্রবল ধারাস্রোত?’ সে বলল, ‘মৃত্যুতেই আমি যার সমস্ত স্বাদকে খুঁজে পেয়েছিলাম।’

প্যারিস- তার সমস্ত আবেগ আর কোমলতা। সেই বিড়াল, শিশু আর লোকজনের সরল ও সাবলীল মনোভাব; আর- রঙের সেই অদ্ভুত ধূসরতা, সেই আকাশ, জল-পাথরের সেই প্রশান্ত প্রদর্শনী…

ফিডলার। ফিডলার। কোথায় তুমি? ভায়োলিনটা তুলে নাও। এই শোনো, চার্লি চ্যাপলিন জীবনের শেষ ভাষণে কী বলছেন :

এই পৃথিবীতে সকলের জন্যই একটা করে ঘর আছে আর এই মাটিপৃথিবীর আছে এমন এক উর্বরাশক্তি যে সকলের জন্যই ফসলের স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষা করে। নিজেকে সে সবার জন্যই উন্মুক্ত করে রেখেছে। জীবনকে যাপনের পথগুলি আমাদের জন্য কতোই না মুক্ত ছিল, আর ছিল সৌন্দর্যময়। সেই মুক্ত সুন্দর পথগুলি হারিয়ে আমরা এখন বিলুপ্তির স্মৃতিতে ভুগছি… আহ… চ্যাপলিন। দ্য গ্রেট ডিক্টেটর। গুগোলে চ্যাপলিনকে খুঁজতে থাকি। মডার্ন টাইমস-এর স্টিল ছবি ভেসে ওঠে। খুঁজে পাই হেলেন কেলার পরম মমতায় ছুঁয়ে আছেন চ্যাপলিনের মুখ… আয়নার সামনে নাটকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন অ্যাডলফ হিটলার… শরীরে হিমস্রোত। মেগাডেথ! ইতিহাসের পাতা ওলটাতে ওলটাতে বোর্হেস ভাবছেন- 

পত্রিকা আমি কখনোই পড়িনি, তার একমাত্র কারণ আজকাল কী ঘটছে তার চেয়ে বরং বহুদিন আগে কী ঘটেছিল- আমার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা ছিল সেইসব ঘটনাবলীর প্রতি। এক ধরনের মানসিক বিকার। মনে আছে- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, আমি ছিলাম জেনেভায়। সেখানে আমি পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসের উপর লেখা বইপত্র পড়ছিলাম। সেই সময় প্রায়ই ভাবতাম, একেবারেই সাদামাটা ছিল ভাবনাটা, আর, হ্যাঁ, বয়সও তখন চৌদ্দ কি পনেরো- আমি ভাবতাম- আরে কী অদ্ভুত ব্যাপার, সবাই যেন হঠাৎ করেই ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, ভাল কথা, কিন্তু, কী অদ্ভুত, সাম্প্রতিক ডামাডোলের ভিতর কেউই আগ্রহী নয় কার্থেজের যুদ্ধের ব্যাপারে, কিংবা কেউ আগ্রহী নয় পারসিক ও গ্রিকদের মধ্যকার যুদ্ধে কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে জানতে, কিন্তু, সবাই আগ্রহী হয়ে পড়েছেন- সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে…

রাত শেষ হচ্ছে হ্যাম্পশায়ারে…

গর্ভঘর, ঘুম, ওঙ্কার… শব্দ। শব্দের ভেতর আমি, আর আমিতেই ঢেউ, সেই ঢেউয়ে মা- ম্যাগনোলিয়ার স্নান। শব্দে থাকে ভাই, শব্দে আছে- বোন। এতো শব্দ… এতো শব… জার্নাল লিখছেন কবি। মাহমুদ দারবিস। স্মৃতিকথা লিখছেন তিনি। দস্তয়েভস্কি বলছেন, এ হচ্ছে প্রার্থনা। কথাগুলি লেখবার খুব সাধারণ এক কলম এটা নয়। দারবিস লিখছেন- What are you doing, father?/-I’m searching for my heart, which fell away that night./ – Do you think you’ll find it here?/ -Where else am I going to find it? I bend to the ground and pick it up piece by piece just as the women of the fellahin pick up olives in October, ane olive at a time… কবির জার্নাল। এ হল প্রার্থনা। এই জার্নাল আমাদের বিপন্ন করছে। অক্টোবরের অলিভ এক ভিন্ন অর্থ নিয়ে আসছে। বিটুইন মেমোরি এন্ড হিস্ট্রি- মাতৃভূমি। দারবিস লিখছেন-The map is not the answer… এ তো দেশহীন মানুষের কথা! বিটুইন মেমোরি এন্ড হিস্ট্রি… সুতরাং, শব্দ হে- তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা। এই যে, হিস্পানি কবি গারসিয়া লোরকা চিঠি লিখছেন তাঁর বন্ধুকে, এই যে আমরা পড়ছি, এই যে বেঁধে যাচ্ছি, এই তো জীবন, এই তো ওঙ্কার। এই তো চিৎকার। লিখছেন লোরকা- সব কিছুই, যা যা তুমি আমাকে বলেছ— সবই সত্য, তিক্ত সত্য। আমি বুঝতে পারছি জীবন তার শিকলগুলোকে আমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। জীবন নিরুপায়। তার এমনটা করার কারণও আছে, অনেকগুলো কারণ… কিন্তু, আমার ডানাগুলি কী করুণ! আমার শুকিয়ে-যাওয়া-ছেলেবেলা কী করুণ! …আমি এই ভাবনায় মগ্ন হয়ে আছি- এখন কাজ করব কিছু গীতিকা নিয়ে, যেখানে থাকবে হ্রদ আর উপহ্রদের কথা, লিখব পর্বতমালার আত্মার সঙ্গে মিলে যাবার গীতিকা, তারকাপুঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত গীতিকা; বিস্ময়কর আর খুব বলবান কাজের ভাবনা। যে-কাজকে মনে হবে একটি ফুল (খামখেয়ালি এবং নিখুঁত, একটি ফুল যেমন হয়ে থাকে), পুরোটাই সৌরভ! সুগন্ধে ভরপুর। কল্পনা করুন, হ্রদের বদলে আকাশের গীতিকা; সম্ভবত, এর চেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ আর কিছুই নেই। এই গ্রীষ্মে, যদি ঈশ্বর আমায় সাহায্য করেন তাঁর ছোট্ট পায়রাটির মত, তাহলে আমি জনপ্রিয় আর খাঁটি আন্দালুসিয়ান ঘরানার কিছু কাজ করতে চাই… বিষাদগ্রস্ত হয়ে আছি। একজন মানুষ প্রচণ্ড মানসিক চাপ অনুভব করছে এবং  তার আছে আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা। আমি আমার মাটির কাছে ফিরবার জন্য, সেই দিনগুলিকে ফিরে পাওয়ার জন্য- বুভুক্ষু। সেইসব দিনগুলিতে তোমাদের বাড়িতে আমরা উষ্ণতা বিনিময় করতাম। তোমার সঙ্গে কথা বলবার সেই সময়টাকে স্মরণ করছি। একসঙ্গে পুরোনো দিনের হিস্পানি গান গাইবার দিনগুলিকে মনে করছি… ভাষার সাবান দিয়ে চোখগুলিকে ধুয়ে নাও (প্রত্যেকদিন সকালে)। তুমি আর আমি- দুজনেই আমরা, কবি। আমাদের আনন্দে। বহুকাল আগের কবি… আমার ছবি আর পংক্তিগুলি আমাকে এমন এক আবেগের অভিঘাত দিয়েছে, এমন এক ছাপ ফেলেছে আত্মার ভিতরে,… এবং, এখনও আমার আত্মার ভিতরে জেগে আছে এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা, যেন আবারও সেই শিশুটির মত হয়ে যাই, হয়ে যাই নিরুপায়, অন্তর্মুখী। লুকিয়ে থাকি নিজেরই ভিতর। নিজেকে দেখবার আগেই আমাকে দেখতে হচ্ছে চারপাশের সমস্যাগুলিকে, দেখতে হচ্ছে অসংখ্য ফাঁদ-পাতা চোখ; মগজ আর হৃদয়ের যুদ্ধের অসংখ্য দ্বন্দ্ব আর আমার আত্মা পুষ্পিত কোনও এক সোনার বাগানে ঢুকে পড়বার পথ খুঁজছে। আমি সেই বাগানে ঢুকবার পথ খুঁজে মরছি; কারণ, আমি ভালবাসি কাগজের ফুল, ছেলেবেলার খেলা। বারে বারে ঘরের মেঝেয় শুয়ে পড়ছি, খেলা করছি শিশু বোনটির সঙ্গে (যে-আমার আনন্দ!)… আমি জানি না, কেন সবাইকে ছেড়ে চলে আসলাম- দিনে, অন্তত একশ বার নিজেকে প্রশ্নটি করছি। এক কুঠরিঘরের আয়নায় নিজেকে দেখছি, এবং কী আশ্চর্য, আমি আমাকেই চিনতে পারছি না। মনে হচ্ছে, আমি যেন অন্য এক ফেদেরিকো… আমরা পড়ছি এইসব আর আমাদের মনে এক শিল্পী গেঁথে দিচ্ছেন এক একটি শব্দ- যুগপৎ স্মৃতি ও বেদনার। তারপর, খুঁজে দেখি, তারকোভ্‌স্কি তাঁর ডায়েরিতে শব্দের কথা লিখেছেন- In cinema-as in life-the text, the words, are refracted in everything apart from the words themselves. The words mean nothing- words are water. শব্দ তবে জল! আশ্চর্য হই। একটা নতুন আইডিয়া পাওয়া গেল জল ও শব্দের বিভ্রমে। বুঝলাম- শব্দ তুমি ভূমি। শব্দ তুমি স্বর। বরিস পাস্তেরনাককে আনা আখমাতোভা চিঠি লিখছেন-

Dear Boris Leonidovich,

Your letter was an unexpected joy for me.
It’s strange that we haven’t corresponded all this time, isn’tit.
I congratulate you on the success of your book- I would like to see it. Natalya Alexandrovna Vishnevskaya will tell you about me.

       She reads your poetry wonderfully, and what a voice! নাতালিয়া পাস্তেরনাকের কবিতায় তীব্র এক স্বর খুঁজে পেয়েছেন, সেই কথা আখমাতোভা জানাচ্ছেন তাঁকে। এই চিঠি লিখিত হচ্ছে তেতাল্লিশে, এই বছর পাস্তেরনাক বের করেছেন তাঁর কাব্য On Early Trains!

That winter I lived outside Moscow
But when in town some duty called
I made the journey, if I had to,
Through the frost and snow and flurrying squall.
I’d leave the house so very early
That all was black as pitch outside
And send the forest darkness spurting
Beneath my creaking, squeaking stride.
And as I neared the level-crossing
The wasteland willows loomed in sight.
The stars shone far above, embossed in
The cold pit of the winter night…

পাস্তেরনাকের একটা একটা শব্দ একটা একটা বাতি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। শব্দের পেছনে দাঁড়িয়ে আছ তুমি। শব্দের ভেতর এতো স্মৃতি! এখন, হ্যাম্পশায়ারে, শেষরাতের বিষণ্ণ-হলদে আলোয়, শব্দ যেন স্বপ্নের এক মহত্তম বিভ্রান্তি…

এবার তবে ফিডলার, প্রিয় বন্ধু, ভায়োলিনাটা বাজাও। এই সুরে, ঘুম আসুক। এই সুরে পাখিগুলি উড়তে থাকুক…একটা তরুণ গাছ আঁকড়ে রইলো তার গত বছরের পাতাগুলোকে… শামসুর রাহমানের অনুবাদে, আজ বহুদিন পর, ফ্র্রস্টের কবিতা পড়ছিলাম। হ্যাম্পশায়ারের রাত, বারোটা পেরিয়ে রোববার হয়ে গেছে, তার মানে ভীতিকর শনিবার তুমি আরও সাতদিন পর আসবে, কিন্তু রোববার তো হয়েই গেছে,- অনেকক্ষণ। হ্যাঁ, অনেকক্ষণ। কবিতাটির নাম ‘একটি অসীম মুহূর্ত’; না, এই কবিতাটিকেই, এখন পড়তে চাইনি, আমরা। মাঝে মাঝে আমাদের মন হয়ত তেমন একটি কবিতাই পড়তে চায় (কবিতা, পড়তে-চাওয়া-মন) দীর্ঘক্ষণ, একটি দিনের শেষে আরেকটি দিনের শুরু- ঠিক এইরকম মুহূর্ত-যাপনের ভেতর, হয়ত, একটি মাত্র পঙক্তিকেই আমাদের মন খুঁজে বেড়ায়। একটু যদি, আশ্রয় দেয় পঙক্তিটি, আর যখন অজানা সেই পঙক্তিটিই ডানা মেলে দেয়… তখন, ঠিক তখন… নূপুর তো কোথাও না কোথাও বাজবেই! এই যেমন, ফ্র্রস্টের পঙক্তি- ‘এভাবে আমরা মুহূর্তের জন্যে একটা অদ্ভুত জগতে দাঁড়িয়ে রইলাম’, এরকম এক বিস্ময়ের ঘোর যে তৈরি হতেই পারে, যদি কবিতাখানির শেষ পঙক্তিটি হয় এমন- ‘একটা তরুণ গাছ আঁকড়ে রইলো তার গত বছরের পাতাগুলোকে।’… গত বছরের পাতাগুলি! এই পাতাগুলিকে আমরা কী বলব? পাতাগুলি কি স্মৃতি? পাতাগুলোই জীবন? আমাদের আত্মার কম্পন? এই দুটি পঙক্তি হঠাৎ, কবিতা পাঠের মাঝখানে, যেন হয়ে উঠতে চাইল এক যোগ-সেতু, গারসিয়া লোরকা’র কথা তা না হলে, ঠিক এই মুহূর্তেই, মনে পড়বে কেন! এই মনে পড়িয়ে দেয়াটা হল যোগাযোগ- অনুভবের সঙ্গে অনুভবের। লোরকা’র ‘গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত কবিতা ও গদ্য’ বইয়ের একটি লেখা’র কথা মনে পড়ে গেল। লেখাটা যেন কবির আত্মার গান, একটু তবে পড়েই ফেলা যাক, ফিরে দেখা যাক আবার, অনুবাদের নোটবই থেকে, খুঁজেপেতে বের করা যাক আজ আবার- ‘তবে, হ্যাঁ, আজ  আমি যেন দেখতে পেলাম আমার আত্মাকে! দেখলাম আমার আত্মা রূপান্তরিত হয়েছে এক ত্রি-পার্শ্বকাচে। আলোক বিচ্ছুরণে অনুভব করছিলাম গভীরতা ও দূরত্বের নিখুঁত পরিপ্রেক্ষিত আর অলীক এক মূর্তির ভয়ে শিউরে উঠা কম্পন। আরেকদিন বিকালে, সবুজাভ জলে নিজের মুখটাকে প্রতিবিম্বিত হতে দেখছি। জলের ভিতর মুখের ভাঙাগড়া। দেখে, আশ্চর্য হয়ে গেলাম! একটি স্বর্ণাভ পুচ্ছবাঁকা পাখি মৃদুতরঙ্গের জলে প্রতিফলিত পপলারে যেন উড়ে বেড়াচ্ছে। পাশের সত্যিকার গাছগুলির দিকে তাকালাম। ডুবতে থাকা সূর্যের শেষ লাল আলোয় তারা দীপ্তিমান। চোখে পড়ল অদৃশ্য কিছু হাওয়ার পাখি পপলারের পাতায় পাতায় খেলা করছে… সোনালি হাওয়ার সেইসব পাখিরা হঠাৎ কোথায় জানি হারিয়েও গেল!’ এইটুকু অনুবাদের খাতা থেকে পড়ে ফেলে, ফের, ফ্র্রস্টের, সেই দুটি পঙক্তি, আবার- ‘এভাবে আমরা মুহূর্তের জন্যে একটা অদ্ভুত জগতে দাঁড়িয়ে রইলাম’; তারপর… আমরা যেন জীবনের পায়ের নূপুর শুনছি। এই নূপুর… আহা, আমাদেরই জীবন-বাহিত এক ঘোর অনুভব! তারপর- হ্যাঁ, তারপর- নীরবতা। তারপর, সেই পঙক্তিখানি- ‘একটা তরুণ গাছ আঁকড়ে রইলো তার গত বছরের পাতাগুলোকে।’ এইবার, পড়ে ফেলা যাক, শামসুর রাহমানের অনুবাদে, ফ্র্রস্টের কবিতাখানি-

সে দাঁড়িয়ে ছিল হাওয়ায়, আর-ঐ দূরে
মেপল গাছের মধ্যে প্রেত ছাড়া কী আর হতে পারে এত বিবর্ণ?
সেখানে দাঁড়িয়ে সে বৈশাখের কথা ভাবছিল,
এবং তবু সবটা বিশ্বাস করার জন্যে সদা তৎপর।

‘আহা এই তো পুষ্পিত স্বর্গ’, বললাম আমি;
যদি ফাল্গুনের এই শুভ্র সমৃদ্ধি
বৈশাখের আছে বলে মনে করতে পারতাম, তবে
এটা ফুলের পক্ষে প্রসন্ন কালই বটে।

এভাবে আমরা মুহূর্তের জন্যে একটা অদ্ভুত জগতে দাঁড়িয়ে রইলাম,
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম তার মতো যাকে তার নিজের ভড়ং
করে প্রতারণা; আর তারপর আমি সত্য উচ্চারণ করলাম (আর চলতে
শুরু করলাম আমরা) একটা তরুণ গাছ আঁকড়ে রইলো তার

গত বছরের পাতাগুলোকে… এইখানে কবিতা শেষ হতে চায়, কিন্তু, পারে না, কারণ এই ঘোরলাগা রোববার, কারণ শনিবার রাত শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ, কারণ, কবিতার শেষ পঙক্তিটি জীবনকে আলিঙ্গন করেছে! গাছটি তার গত বছরের পাতাগুলিকে আলিঙ্গন করছে… কিন্তু আমাদের যে ‘গভীর গানের’ সেই কবিকেও মনে পড়ে গেছে! শনিবার শেষ হলেই, কেবল ভয়ঙ্কর এই শনিবারের রাত শেষ হলেই, হাই স্ট্রিট আড়মোড়া ভাঙে… মন তখন পাখি হয়। মন তখন পালক। গভীর গানের কবি গারসিয়া লোরকা কী বলে দিলেন! আজ যেন আমি দেখতে পেলাম আমার আত্মাটিকে! দেখলাম আমার আত্মা রূপান্তরিত হয়েছে এক ত্রি-পার্শ্বকাচে। আলোক বিচ্ছুরণে অনুভব করছিলাম গভীরতা ও দূরত্বের নিখুঁত পরিপ্রেক্ষিত আর অলীক এক মূর্তির ভয়ে শিউরে উঠা কম্পন… আরেকদিন বিকালে, সবুজাভ জলে নিজের মুখটাকে প্রতিবিম্বিত হতে দেখছি। জলের ভিতর মুখের ভাঙাগড়া। দেখে, আশ্চর্য হয়ে গেলাম! একটি স্বর্ণাভ পুচ্ছবাঁকা পাখি মৃদুতরঙ্গের জলের উপর প্রতিফলিত পপলারে যেন উড়ে বেড়াচ্ছে। পাশের সত্যিকার গাছগুলির দিকে তাকালাম। ডুবতে থাকা সূর্যের শেষ লাল আলোয় তারা দীপ্তিমান। চোখে পড়ল অদৃশ্য কিছু হাওয়ার পাখি পপলারের পাতায় পাতায় খেলা করছে… সোনালি হাওয়ার সেইসব পাখিরা হঠাৎ কোথায় জানি হারিয়েও গেল!’ একটা খেলা শুরু হয়। মৃদু তরঙ্গে কাঁপা জলের উপর প্রতিফলিত পপলারে সোনালি পাখিটির উড়ে বেড়ানর সঙ্গে, ফ্র্রস্টের কবিতা’র পঙক্তি এক দ্বৈত-ভাষ তৈরি করে ফেলে- ‘একটা তরুণ গাছ আঁকড়ে রইলো তার গত বছরের পাতাগুলোকে’ এসে মিশে গেল জলে প্রতিফলিত পপলারের ডালপালায়, যেখানে, অদৃশ্য কিছু হাওয়ার পাখি পপলারের পাতায় পাতায় খেলা করছে… রাত শেষ হচ্ছে, হ্যাম্পশায়ারে। অন্ধকার ফিকে হয়ে আসতে চাইছে… কিন্তু পাখি! একটা ডানামেলাপাখি হঠাৎ উড়তে শুরু করে… দেখা যায় না। পাখির পায়ে নূপুর। সেই এক পাখি শত পাখি হয়। আমি দেখতে থাকি। আমার নোটখাতা ভরে উঠেছে এলোমেলো রেখায়। দেখি, কামু’র কিছু কথা এক কোণে লেখা। তার পাশে দেখি, আরও কয়েকটি লাইন। টমাস মানের কথা। টুকে রেখেছিলাম। মনে হয় গতবছর কিংবা মনে হয়- কবেকার টুকে-রাখা-কথা, মনে নেই তারিখ। টমাস মানের পাশে তলস্তয়। আগে আসবেন তলস্তয়, তারপর মান। তলস্তয় বলছেন- ‘শিল্প হচ্ছে অণুবীক্ষণ যন্ত্র যা হয়ে আছে শিল্পীর আত্মার গূঢ়তার উপর স্থির, আর লোকজনকে দেখাচ্ছে কেবল সেই গূঢ়তাটুকুই যা তাদের সবার বেলায় এক। এই কথা পড়ছেন টমাস মান, বলছেন তিনি- ‘তলস্তয়ের শেষ জীবনের ডায়রির ভিতর ডুবে আছি। কথাবার্তা একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না। তবে, কিছু বিষয়ের সঙ্গে সহমতও পোষণ করছি। ”… শিল্প হচ্ছে  অণুবীক্ষণ…” চমৎকার।’ এইখানে এসে, আমরাও নূপুর বাজিয়ে দিতে পারি। আমরাও চিৎকার করে বলতে পারি- চমৎকার… খেলাটা কিন্তু, চলছেই। কিন্তু না, আমাদের এখানে থেমে গেলে চলবে না। কবিতায় ফিরতে হবে। হ্যাম্পশায়ারে শেষ হচ্ছে রাত। সময় নেই। হাতে সময় নেই… ফ্রস্টের একটা কবিতা, একটা কবিতার দুইটি পঙক্তি আমাদেরকে নিয়ে খেলছে। একবার লোরকায় একবার কামু-তে। কামু বলছেন মন উদাস করা কথা, এদিকে- রাত শেষ হচ্ছে, হ্যাম্পশায়ারে। স্ট্রিট লাইটে রাজ্যের বিষণ্ণতা… অনুবাদের খাতা থেকে পাঠোদ্ধার করা যাক আলবেয়ার কামু’র কথাগুলি-  ‘দিনের বেলা পাখিদের এমন দেখা যায় যেন তারা উড়ে বেড়াচ্ছে উদ্দেশ্যহীন। সন্ধ্যায় তাদের দেখে এমন লাগে যেন তারা আবার একটা গন্ত্যব্যর সন্ধ্যান করছে। তারা যেন কোনও একটা বিশেষ দিকে উড়ে চলেছে। হতে পারে যেন তারা জীবনের সন্ধ্যার দিকেই উড়ে চলেছে…এখানে কি জীবন-সন্ধ্যা আছে?’ কামু’র নোটবুক বিষণ্ণতায় ভরে থাকে। এখানে শঙ্খ বাজে, বাজে নূপুর… ভোর! আলোর মিছিলের। ভোর- নীরবতার। শব্দের। স্মৃতির। ভোর- পাখির। শঙ্খচিলেরা আসছে… আর, ঘুমিয়ে যেতে যেতে, আরেকবার, একটি তীব্র ঝলক- ‘একটা তরুণ গাছ আঁকড়ে রইলো তার গত বছরের পাতাগুলোকে।’ হঠাৎ শব্দ- নূপুর… কোথায় নূপুর! কার পায়ে? আমি ভাবছি- শব্দের ভিতর এত স্মৃতি!     

রাত শেষ হচ্ছে হ্যাম্পশায়ারে। এবার তবে ফিডলার, প্রিয় বন্ধু, ভায়োলিনাটা বাজাও। এই সুরে, ঘুম আসুক। এই সুরে পাখিগুলি উড়তে থাকুক… আর আমরা একটি প্রেমের গল্প লিখতে থাকি… আমাদের গল্পের নাম মেহেরুন্নেসা। গল্পটি লিখিত হয়ে গেছে। এই যে শব্দের পর শব্দ হয়ে তা একটি বাক্যময় নস্টালজিয়ায় পরিণত হয়েছে-

মেহেরুন্নেসা

এবার তুষার নেই… আদিগন্ত শুভ্রতায় আমাদের ঢেকে-যাওয়া নেই। সঙ্গীতের যাপন-মুহূর্তটুকু হয়ে উঠে যেন অলৌকিক। যেন কিছুই আর মর্তে ঘটছে না- এমনই গহনতা গোপন থাকে মেঘমল্লারে!

ফেব্রুয়ারিতে হ্যাম্পশায়ারের আকাশ ঘনকৃষ্ণ… আর বৃষ্টি সারাক্ষণ! এরকম বৃষ্টিতে মেঘমল্লার! জানালার শার্সিতে বৃষ্টি যেন গেঁথে যেতে চাইছে! ঠিক এরকম একটি দিনে, আচমকা, তোমার সঙ্গে কথা হয়ে গিয়েছিল। দেখো, মেহেরুন্নেসা, এই দেশে মুহূর্তের খেলা… খেলা চলছে মুহুর্মুহু বদলে যাচ্ছে মুখ। কোথাও কচুপাতার ঝোপ নেই এখানে, আছে শুধু ম্যাগনোলিয়া স্নান… প্রবল বাতাস ক্লান্ত ওকের ডাল ভালবেসে… পাতাদের কোনও অভিমান নেই আজ। তারপর একদিন তুমি শমশেরনগরে গেলে… আমার নোটবুকে লিখে রেখেছি তা। শমশেরনগর স্টেশন! কী অদ্ভুত একটা নাম। আমার স্মৃতির শিকড় ধরে ঠাণ্ডার পরাগ-লাগা বাতাস নাড়িয়ে দিয়ে যায়- শমশেরনগর, শমশেরনগর। কী তীব্র ডাক! আমিও ডাকি- হে জন্ম! আরও একবার মুগ্ধ করো। একটা দীর্ঘ জীবনের মত ট্রেন এসে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াক… হ্যুইশ্যল বাজুক। বর্ষিত বৃষ্টি আর শতাব্দীপ্রাচীন ধূলিবসনে আমাদের মুখ ঢেকে যাক, যেন লুকিয়ে ফেলতে পারি- কান্না। যে-কান্না মৃতদের জন্য, যাদের শক্ত হাত ধরে, ছায়ারেখায়, বর্ণমালা শেখবার আনন্দের মত লোকাল ট্রেনে উঠে ভানুগাছ পার হয়ে শ্রীমঙ্গলে যাওয়া হবে না আর। দেখো, যখনই সেই দিনটির কথা ভাবি, সেই আমাদের প্রথম কথার দিন, কতগুলো ফুল ঝরতে চেয়েও আবার জন্মের আনন্দে হেসেছিল! আর তুমি দৌড়ে চলে গিয়েছিলে সেই নদীর কিনারে… কী নাম! নদীর কোনও নাম থাকে? মাটির উপর দিয়ে বয়ে চলা নদী, মাটি নামে জাগে? কী অদ্ভুত প্রশ্ন, তাই না? এসো, চিৎকার করে বলি- মাটি মাটি, দেশের মাটি… আমাদের মন মিশে গিয়েছিল হিস্পানি সেই কবির মরমে। গারসিয়া লোরকা তার নিউইয়র্ক যাপনের কথা বলছিলেন এক বক্তৃতায়, এভাবে- ‘না মেঘমালা, না অহমিকা, কোনও কিছুকে পাত্তা না দিয়ে, তোয়াক্কা না করে দালানগুলির তীক্ষ্ণ প্রান্তসীমা উঠে গেছে আকাশের দিকে। গথিক স্থাপত্যকলার এইসব কোণ আর প্রান্তসীমাগুলো যেন মৃত আর কবরস্থানের হৃদয় থেকে তরঙ্গের উচ্ছ্বাসের মত ধাবমান… না। খুব বেশি আশাবাদী হবার কোনই কারণ নেই পৃথিবীতে, আমাদের। পৃথিবী আদিম, ক্রোর।’ কবি বলছেন তাঁর আত্মপোলব্ধি, লিখছেন তাঁর স্মৃতিকথায়, বলছেন বক্তৃতায়- যে-বিষয়টা উপলব্ধি করবার জন্য আর মাত্র কয়েকটি দিনের প্রয়োজন, সেই বিষয়টি হল- এই অতিকায় পৃথিবীর কোনও শিকড় নেই, এই পৃথিবী শিকড়হীন, উন্মুল আর মাত্র কয়েকটি দিন লাগবে এই বিষয়টি বুঝতে যে- দ্রষ্টা এডগার পো কেন অপার রহস্যময়তাকে আলিঙ্গন করেছিলেন আর শরীরের শিরায়- উপশিরায় যন্ত্রণাদায়ক ফোঁড়ার মত পৃথিবীর উন্মত্ততাকে বন্ধুর মমতাময় দৃষ্টিতে দেখেছিলেন।

এইটুকু বলার পর, একটু বিরতি নিয়ে লোরকা আবারও বলতে লাগলেন, স্পেনের সান্তান্দারে, বন্ধুদের সামনে কথা বলেছেন তিনি- ‘একজন পথভ্রষ্ট নিঃসঙ্গ মানুষ হিসেবে আমি আমার শৈশবকালকে এইভাবে স্মৃতিতে জাগিয়ে তুলি…’, তীব্র হ্যুইশ্যলে শমশেরনগরে ট্রেন থামে… আমাদের হারিয়ে যাওয়া কৈশোর জাগতে থাকে।

মাঝে মাঝে শমশেরনগর উড়ে আসে ফ্রাঙ্কফুর্টের উপর দিয়ে, মাসুদ খানের কুড়িগ্রামের মত! পেছনে পড়িয়া থাকে জীবনের লাগি তীব্র মায়া। বিপুল স্মৃতিরা ডাকে- আয়… আমি দেখি, আমাদের উঠোন জুড়ে কচ্চপের সংসার! আর অজস্র ফোঁটার বৃষ্টি! ছোট্ট আমি, উঠোনে নেমে পড়ি। ছোট্ট কচ্চপ ধরে রাখি হাতের তালুতে। শিশু। আহা, কচ্চপের শৈশব, এভাবে বন্দি যায় মানুষের হাতে! বাতাসে মেঘমল্লার… একটু দূরে, নিলুদের বারান্দায় হলদে বাতি জ্বলছে। নিলু তার মা’র সঙ্গে বৃষ্টি দেখছে! এই বৃষ্টি দেখার কারণ- আর কয়েকটি দিন পর আমার শৈশব-সঙ্গি নিলু কারও সঙ্গে হারিয়ে যাবে… আমি আমার ভাইটিকে ডাকি। আমার অনেক আগে এই পৃথিবীটাকে ছেড়ে যাবে বলে তার চোখে গভীর ঘুম… আমার বোনটি কচ্চপ ধরার এই দৃশ্যটি কখনও দেখবে না। তার এখনও জন্ম হয়নি, আরও কয়েকটি বছর বাকি! বহু বছর আগে এই কচ্ছপগুলি এসেছিল গিয়াসনগরের একটি চা বাগানের এক বাড়িতে, শ্রীমঙ্গলের খুব কাছে! আর সেই বাড়িটিতে মা যেদিন প্রথম গেলেন, আমি তখন তাঁর পেটে… আর, এইখানে এসে, এই জীবন-সুদূরে, তোমাকে ভাবতে গিয়ে হঠাৎ আমার  মনে পড়ে গিয়েছিল, বোর্হেসের কবিতায় একটা বাঘ আছে। তা না হয় থাকুক, এই গোলকধাঁধায়। উইলিয়াম ব্লেইকে-ও আছে। তোমার মনে নেই? অগাস্টিন গোমেজের অনুবাদে পড়েছিলাম- বাঘ ও বাঘ! জ্বলছ জ্বল্‌জ্বল্‌/ঝল্‌সে দিয়ে রাতের বনতল… কোন দেশের কবি আজ এই গাঢ় রাতের মৌনতা খুঁজতে খুঁজতে কবিতায় লিখছেন- দমকল, দমকল! 

দৃশ্যটিকে এখনও হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছি, তোমার ঘুম ভাঙলেই ছেড়ে দেব।

রাত শেষ হচ্ছে হ্যাম্পশায়ারে…
এবার তবে- ফিডলার, প্রিয় বন্ধু, ভায়োলিনাটা বাজাও। এই সুরে, ঘুম আসুক। এই সুরে পাখিগুলি উড়তে থাকুক…

 

Comments

comments

এমদাদ রহমান

এমদাদ রহমান

জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৯, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার বাদে সোনাপুর গ্রামে। রাজনীতি ও প্রশাসন-বিষয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। এখন ইংল্যান্ডে, জীবন ঘষে আগুন জ্বালাতে। কবিতা স্মৃতিকথা, পুরোনো চিঠি আর লেখা গদ্যে এবং অনুবাদে বিপুল আগ্রহ। পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প তাঁর প্রথম বই ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি