শব্দের অনুভূতি বা ভাবের রঙ । আহমদ সায়েম


আমরা শব্দহীন হতে পারছি না। যন্ত্রণা, স্বপ্ন, ক্ষোভ, ভালোবাসা সবকিছুতেই আমাদের শব্দের প্রয়োজন। লিখতে গেলে ‘শব্দ’ লাগে, কথা বলতেও তা-ই। শব্দের ব্যঞ্জনা ছাড়া কোনো অনুভূতিই প্রকাশ পাচ্ছে না। কিছু-একটা বললেই বুঝে যাই একটা কিছু বলা হচ্ছে যা আমাদের এখন বুঝে যাওয়া উচিৎ তাই আমরা বুঝি। এই বোঝাবুঝির যোগসূত্র কিন্তু ‘শব্দ’। শব্দটার এত-যে শক্তি তা কবে থেকে শুরু হলো? গদ্যটা লেখার আগে দু-একজনের কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলাম, এই ‘শব্দ’টা কবে থেকে শব্দ করছে? মানে এর আমদানি কোথা থেকে, কবে থেকে? কার মাথার শব্দে এত-এত সংগ্রহ, সংকলন আর সমগ্র? কারোর কাছেই বোঝে আসার মতো আন্সার নেই, উল্টা প্রশ্ন ধরিয়ে দেয় সবাই – ‘এমন আজগুবি প্রশ্ন ভায়া কই থেকে নামাইলি?’ আসলে নামানোর কিছু নেই। শব্দের ‘শব্দ’ যে আবিষ্কার করেছে, আসলে সে একটা … -কী, কি বলা যায় তারে? শব্দবাজ বলব না অন্যকিছু? অন্যকিছু তো বলতেই হবে, তা না-হলে ‘কইর তেল দিয়ে কই ভাজা’-র মতো মানে দাঁড়ায়! কিন্তু সেই সামর্থ্য বা শক্তি তো পাচ্ছি না। ঘুরেফিরে শব্দের মাঝেই আটকে আছি। মানে এমন একটা মাল যারে ছাড়া ঝগড়াও করা যায় না আর ভালোবাসার জন্য তো লাগে ১০৮টা পদ্মফুল।

বাচ্চাদের শব্দগুলো যদি সংগ্রহ করা যেত বাংলা অভিধানগুলো মনে হয় বেশ সমৃদ্ধি পেত। কারণ আমরা যারা অনেক বুঝি, ভাবি, আর এই এত ভাবা আর বোঝাবুঝি দিয়ে নতুন কিছু করে দেখানো সম্ভব হয় না। আর যারা এইসবের কোনো ধারই ধারে না, একমাত্র তারাই পারতেছে নতুন কিছু করে দেখাতে। নতুন শব্দ তারাই আবিষ্কার করে। বুদ্ধিজীবী বা ইন্টেলেকচুয়াল বললে ‘শিশু’দেরকেই বলতে হবে। বড় হওয়া মানে শূন্য হয়ে যাওয়া। কারণ আমরা তো কিছুই দিতে পারছি না, কোনো আউটপুট নেই আমাদের। রবীন্দ্রনাথ যে শব্দ নিয়া নোবেল পাইলেন, বাউল আবদুল করিমও সেই একই শব্দ নিয়ে একুশে পদক আনলেন। আমরাও সেই একই তারে ঝুলছি।

বাচ্চারা নতুন শব্দ যুক্ত করার পাশাপাশি নতুন চিন্তার যোগান দিচ্ছে। তাই এখন স্বপ্ন দেখি বাচ্চা হবার, বাচ্চা হয়ে জন্ম দেবো নতুন চিন্তা ও শব্দের অন্য একটা রঙ। যে-রঙ দিয়ে ভাবের অনুভূতিগুলো দেখিয়ে দেয়া যায় এবং এমনকিছুর প্রকাশ ঘটাব যা দিয়ে শব্দের সকল শব্দ হারিয়ে যাবে…

আমরা ভাবতে ভাবতে বলি। ভাবতে ভাবতে লিখি। ভাবতে ভাবতে গাই। ভাবতে ভাবতে চলি। তাই নতুন কোনো ভাবনাই কাজ করে না আমাদের মাথায়। যা যা আসে বা বের হয় তাতে আমাদের অজ্ঞতাই প্রকাশ পায়। কোনোদিন যদি বাচ্চারা বিচারক হয়ে যায়, আমাদের সব কেরামতি প্রকাশ পেয়ে যাবে। কারণ আমরা তো নতুন কিছু দেই না। যা যা দেই – সব পুরাতন নিয়ে নতুন একটা প্রচ্ছদে বেঁধে দেই; যে এই হচ্ছে আমাদের আধি সংস্কৃতির নতুন পাঁচফোড়ন বা বাদ্যযন্ত্র। বাচ্চারা আর যা-ই করুক ভাবনাচিন্তার মাথা খেয়ে নতুন শব্দ দিতে পারে। যেমন তারা পানিকে ‘মানি’ বলবে, ভাতকে বলবে ‘বে’। এই দুইটা শব্দের মর্ম খুঁজতে-খুঁজতে আপনার লিকার হয়ে যাবে ঠাণ্ডা। আমরা জানি ঠাণ্ডা লিকারে কখনো তৃপ্তি আসে না…

শব্দভাণ্ডার বাড়ানোর কাজে প্রায় সব বাচ্চাই রেডি, আমাদের ফোকাস লেবেলটা বাড়ালেই হয়। আমি একটা বাচ্চার কর্ম এখানে তুলে রাখছি। বয়স তিন বা সাড়ে-তিন বছর। তাদের বাসায় বাথরুম রয়েছে তিনটা, তবু সে লুকিয়ে বাসার বারান্দায় প্রস্রাব করবে। এর জন্য তারে অনেক শাসানো হয়, বোঝানো হয়, তবু সে বারান্দাতেই কাজটা সারবে। একদিন সুন্দর দিন, দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি চলে আসলো। বারান্দায় কিছু কাপড় শুকাইতে দেয়া হয়েছিল, সবগুলো কাপড় বেখেয়ালে ভিজে গেছে, অতএব বারান্দাও ভিজা। বাচ্চার মা এসে দেখলেন সে ওখানেই খেলতেছে, তো ‘মা’ জেনেবুঝেই তার কাছে জানতে চাইলেন বারান্দায় এত জল কী করে আসলো? বাচ্চাটার সহজ উত্তর আমি না ‘মা’, আজকে বাতাসে ‘মুতিছে’। মানে আজ সে প্রস্রাব করেনি বারান্দায়, বাতাসই প্রস্রাব করেছে। মা তো শুনে থ বনে গেলেন তার বলার নান্দনিকতায়। আরেকদিনের কথা বলি, – বাচ্চাটা মায়ের কাছে শুয়ে জানালার বাইরে একটা গাছের পাতা দেখিয়ে বলতেছে, দেখো ‘মা’, বাতাস নড়ল। মানে, বাতাস নড়তেছে…!

আমরা সারাজীবন গাছের পাতাকে কাঁপতেই দেখেছি, শুনেছি পাতা নড়ার শব্দ। অনুভব করেছি বাতাসের গতি, তার ছায়া তার ছোঁয়া তার গন্ধ। কোনোদিন ধরতে পারিনি তার শরীর। অথচ আজ একটা বাচ্চার কাছ থেকে জেনে নিলাম বাতাস কীভাবে নড়ে, আসলেই তো বাতাসই নড়ে যা আমরা দেখতে পাই না। পাতার তো কোনো সাধ্য নেই কাঁপার। কোনোদিন চিন্তাও করতে পারিনি যে বাতাস নড়তে পারে! বাচ্চাটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে পাতা কাঁপে না কখনো, বাতাসই নড়ে এবং বৃষ্টিও পড়তে পারবে না বাতাসের সাহায্য ছাড়া। অতএব বাচ্চাটার সাথে আমিও একমত যে – ‘বাতাসই প্রস্রাব করেছে বারান্দা’।

বাচ্চারা নতুন শব্দ যুক্ত করার পাশাপাশি নতুন চিন্তার যোগান দিচ্ছে। তাই এখন স্বপ্ন দেখি বাচ্চা হবার, বাচ্চা হয়ে জন্ম দেবো নতুন চিন্তা ও শব্দের অন্য একটা রঙ। যে-রঙ দিয়ে ভাবের অনুভূতিগুলো দেখিয়ে দেয়া যায় এবং এমনকিছুর প্রকাশ ঘটাব যা দিয়ে শব্দের সকল শব্দ হারিয়ে যাবে।

 

Comments

comments

আহমদ সায়েম

আহমদ সায়েম

‘সূনৃত’ লিটলম্যাগাজিনটা সম্পাদনা করি ২০০০ সাল থেকে । এখন পর্যন্ত আটটি সংখ্যা বের হয়েছে । জন্ম সিলেটে ০৫ জানুয়ারি ১৯৭৮ । স্কুলের খাতায় নাম ছিল সায়েম আহমদ চৌধুরী । কবিতার বই বেরিয়েছে ২০১৫ ফেব্রুয়ারিতে ‘অনক্ষর ইশারার ঘোর’ এই নামে ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
FacebookLinkedInGoogle Plus

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি