শরব্য শব্দ নিনাদঃ নৈঃশব্দ্যের কাল । আসমা অধরা

অনেক সময় না চাইল যা কিছু শুনতে হয়, তাই শব্দ। আদরের, আর্তনাদের, ফিসফাসের, সাইরেনের, রাগের, দুঃখের, সুখের সব সব শব্দ ভীড় করেই থাকে চারপাশ। অথচ আজ সেই শব্দ নিয়ে লিখতে বসে এমন একটিও শব্দ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা যা দিয়ে কেবল শুরুটা করা যায়। সমস্ত কিছু অগ্রাহ্য করে যাবার ক্ষমতা নেই, নেই তেমনি ছাপোষা কিছু শব্দ পুষে রাখার ক্ষমতাও। এই চরম অসহ্য অবস্থায় মুখ থেকে যে অসহিষ্ণু আহ শব্দ বের হয়ে আসছে, তা লিখতে গিয়েও নিতান্তই বিরক্তিকর হয়ে উঠছি নিজের কাছেই। এ বিরক্তিকর অবস্থায়ও রবি ঠাকুরের গান বেজে উঠছে মনে, ‘না চাহিলে যারে পাওয়া যায়, ত্যায়াগিলে আসে কাছে’…

বহুক্ষণ থেকে সেই ত্যাগ নিয়েও ভাবি, অথচ যে বায়ু তে আমার শ্বাস মিশে যাচ্ছে, প্রবল পিপাসার মতো সেখানেই লুকিয়ে আছে এসমস্ত শব্দ, ঘুমিয়ে গেছে যেন আকন্ঠ তৃষ্ণার্তকে রেখেই। কবিতারা হাহাকার করছে, তৃষ্ণাকে তাই জলের খুব কাছেই শুইয়ে রাখি। এই প্রায় ফুরিয়ে আসা শ্রাবণের দিনের প্রথমার্ধ শেষ হতেই আকাশ ছেয়ে আসে মেঘে, চারিদিকে অদ্ভুত ছায়াছায়া নির্জনতা ঘিরে আসে। ছায়াকুশল হয়ে উঠছে খুব মহীরুহ,মোহাবিষ্ট প্রিয়র মতো তুমি শুধু ঝঙ্কার বাজাও কানে; তবু বন্ধু ধরা দেবার পথ আর কতদূর! আমাদের সমস্ত অনুষঙ্গের বাইরে যে ষড়ভুজা ফ্রেম, তার পাশের একাকী জানালায়ও উঁকিঝুঁকি কতখানি, সেই জানালা ছুঁয়ে দিতে দিতেই গ্রীষ্ম সরে যাচ্ছে ঋতুর বাইরে। এই যে সরে যাওয়া তাকে লিখে রাখারও শব্দেরা নেই, নেই!

এই ছায়াসঙ্কুল আধ দুপুর আর আধ বিকেলে, খুব মনে পড়ে কারো নির্জন দ্বীপের মতো চোখ, জলের মত চাহনি, তার ওপর ঝড়ের মেঘের মতো গহন কালো তীব্র ভ্রু সন্ধি। কী নিপাট মনভুলো টাইপ অথচ কেতাদুরস্ত আকর্ষন, অথচ তাকে ঠিক করে বয়ান করার ভাষাও নেই। কোন শব্দে তেমন অনুরণন তুলবে তার ভঙ্গিমা? যেন আশ্চর্য সব আলো খেলে যায় তার চোখে। যেন বাদল হাওয়ায় খুব ঝড়ের মতো ডাকছে কাছে! আহ মেঘ থেমোনা, সরে যেওনা, আরো কিছুক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকি, কিছু আরো বৃত্ত আঁকি- কিছু আরো ট্রায়াঙ্গল ভাঙ্গি।

এত কিছুর পরেও ঘরের দেয়াল নিখুঁত গোলপোস্ট হয়ে ওঠে, সেখানে দাঁড়িয়ে বিগত সমস্ত জীবনের স্মৃতিকে কি তুমুল সন্দেহে আবার বিচার করতে থাকি, তবু যা কিছু যাপিত, তা কি আর শোধরানোর উপায় থাকে! আবার হন্যে হয়ে খুঁজি এমন সব শব্দ, যে নিজেই বলে যাবে সব কথা, তুমি শুনবে…

তৃষ্ণার মতো সেঁটে দিচ্ছি জলরঙ, তার মধ্যে বুদবুদের মতো আঁকছি আরো পিপাসা, কেমন করে বোঝাই! শেষ বিকেলের আলোয় তার দীর্ঘ ছায়া আরো দীর্ঘ হয়, ভেঙ্গেচুরে একাকার করে যাচ্ছে আমায়। এই নিঃশব্দ প্রণয় তাকে করে তুলছে আরো অভিমানী, কবিতা আমার! কোন শব্দে বলে গেলে সেও আচ্ছন্ন হবে ইমপেরিয়াল ম্যাজেস্টি পারফিউমের মত, উবে যাবে সব অভিমান? স্নানঘরের কাঁচ ঝরে যাচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে চিলেকোঠার বিষণ্ণ শ্যাওলা রঙ, নেই নেই!

এখানে পিপাসার্ত হয়ে খুঁজে যাচ্ছি যে শব্দজট, তার কেমন এক খলবলে গন্ধ আছে। পাথুরে উপত্যকার নীচে জলার মতন, শুধু কাঙ্ক্ষিত সেই শব্দটা ধরতে পারলেই যেন ছুটে আসবে মায়াহরিণ, উল্লাসের মত আনন্দ নিয়ে। স্বপ্নের কুটির ঢেকে আছে জল জঙ্গলের মধ্যবর্তী ফাঁদে। এমন সব অনুধাবন কি কুয়াশামগ্নতা নাকি হ্যালুসিনেশা্ন। কথার যে ঘাগরা চোলির ঘের বাড়ছে, বেহালার সুরের মত দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে বুক, খুজে না পাবার যন্ত্রণায় দাঁতে চেপে কেটে ফেলছি ঠোঁট, তবু জেদী বাচ্চার মুঠো করে ধরা হাত খুলছে না। বলছে না- নাও নাও ধরো, আঁকড়ে ধরো আরো! ফিরিয়ে নাও, লাভ মি ব্যাক টু লাইফ…

শব্দ কী কোনো পুরুষপাখী, আর আমি কী মৌন অন্ধকার? এই ক্লান্তি জুড়ে মুগ্ধতা ছড়াবে কী আর! কেবল একবার মনে পড়ুক, লিখে রাখি যন্ত্রণার এসব রকমারি সমাহার। জীবন তো কেবল তাকিয়ে থাকা। যাপনে, বর্ণে গন্ধে ভরে নেয়া, তাতে বিষদও থাকুক। তুমুল বিষাদ না হলে কি পরেরটুকুতে সুখ এলেও ক্যান্ডিফ্লসের মতো রঙ্গিন হয় কিছু! বেঁচে থাকায় বৈচিত্র লাগে। যা কিছুই দেখি, তা দেখাতে ইচ্ছা করে, ইচ্ছা করে তুমিও শোনো। শব্দ ধরে ধরে গাঁথি, সাজাই। ছিঁড়েও যায় কিছু। হওয়া না হওয়ার মাঝের এই যাতনাও সেই শব্দের জন্যই, সেই পারে সব, জুড়ে দিতে বা খুলে দিতে গাটবন্ধনের গিঁট। অনার্য পুরাণের মতো তাই এমন খোঁজ।

ডুবে যাচ্ছি তার খোঁজে, কন্ঠের মধ্যে একটা গান বাজতে বাজতে থেমে যাচ্ছে। হাতছানি দিচ্ছে দূরবর্তী তীরের হালকা কাঁপন, ধোঁয়াশা। যে কবিতা অসম্পূর্ণ রেখেই কলমটির কালি শুকিয়ে গেল, তার আনাচে কানাচে পরিষ্কার করে করে বুঝি স্তব্ধতা আঁকা কতখানি কষ্ট এক মহীরূহের। প্রতিরাতে যে কয়টা পাহাড় হেঁটে আসে এপাড়ায়, তার আড়ে আটকে যায় বিহ্বল বায়ু। অথচ আমি গৌণ সংবাদের মতো করে বিশিষ্ট ভাবমূর্তি সহ মন দেই মৃত পড়ে থাকা সুইসাইড স্কোয়াডের বোরকা পড়া মহিলার ছবির দিকে, সেই ফাঁকে বুকসেলফ টা ঝুঁকে পড়েছে হুহু শূন্য চেয়ারের দিকে। অথচ গম্ভীরভাবে নড়তে থাকা পাহাড় দেখেনা, জানালা ঘেষে বসে থাকে আরেক পাথর আর জানালার শিক ধরে নেমে গেছে ফুলেল উল্লাস কখানা দিন আগেই। তারপর থেকেই জলের বাগানে রক্তচক্ষু ছায়া।

শেলফ ভর্তি অজস্র কবিতার বই থেকে রাত ঘনালেই ময়ূরনীল মাছরাঙা ডানা মেলে দেয়, কামরার ছাদে গুনগুন শব্দ করে জোনাকী। মীনের মতন ধ্যান করি যার সে কবিতা। কবিতার গায়ে লিখেছিলাম শব্দের শ্রমবাস, তখন থেকেই শোবার কামরায় বাতি গুলো টিমটিমে হয়ে গেল। ঘরের আয়নায় রাত গভীর হলেই জল গড়ায় টুপ! ছুঁয়ে দিতে গেলেই রক্তের মধ্যে কি যে এক জলোচ্ছ্বাস; শব্দের ভালোবাসা শেখালেই সব পাথর হয়ে যায় কলমটির মতো। অথচ পাথরের ফাঁক গলে পাথর চাঁপা ফোটার গল্প আমি জানতাম, তাদের সুবাস খলবল নদীর মতো শব্দ তুলে বয়ে যেতো, সেসব এখন রূপকথা।

রাত্রির ভাঁজে ভাঁজে কেবল কবিতার গন্ধ, মাতাল করে ঠিক কিন্তু ধরা যায়না। এসমস্ত রাত্রির রদেভু’রাই জানে, যে পাড়ায় রাতভর ক’জোড়া পাহাড় হেঁটে বেড়ায়- সে পাড়ার সমস্ত কলম শুকিয়ে যায়, সমস্ত শব্দেরা বিষণ্ণ হয়ে ভুলে যায় কথা বলতে, লিখিয়ে নিতে,  মরে যায় পাথর চাঁপা’র সমস্ত ফুল। এত কিছুর পরেও ঘরের দেয়াল নিখুঁত গোলপোস্ট হয়ে ওঠে, সেখানে দাঁড়িয়ে বিগত সমস্ত জীবনের স্মৃতিকে কি তুমুল সন্দেহে আবার বিচার করতে থাকি, তবু যা কিছু যাপিত, তা কি আর শোধরানোর উপায় থাকে! আবার হন্যে হয়ে খুঁজি এমন সব শব্দ, যে নিজেই বলে যাবে সব কথা, তুমি শুনবে…

Comments

comments

আসমা অধরা

আসমা অধরা

জন্ম, পড়ালেখা ঢাকায়। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছেলেবেলা থেকেই। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ একটি। একটি লিটলম্যাগ এর সহ সম্পাদকের কাজ করেছি। বর্তমানে ভিন্নচোখ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং এডিটর হিসেবে আছেন।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি