পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মাতৃত্ব । তানিয়া কামরুন নাহার

নারী,কেবল মাত্র নারীই সন্তান গর্ভে ধারণ করতে পারে, নতুন একটি মানুষের জন্ম দিতে পারে। এ এক আশ্চর্য ঘটনা। তাই মাকে দেবীরূপে পূজা করা থেকে শুরু করে মায়ের পায়ের নিচে পবিত্র বেহেস্তের স্থান ভাবা হয়ে থাকে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর এই সন্তান গর্ভ ধারণ করার জৈবিক ঘটনাটিকে অত্যন্ত মহান করে তোলে মূলত সম্পদের উত্তরাধিকার নির্ধারণের জন্য। তাই মাতৃত্বকে বরাবরাই মহান করে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। এমন কি সন্তান জন্ম দিয়ে নিজের নারীত্বের প্রমাণ দিতে হয়। যে নারী কোন কারণে সন্তান/ পুত্র সন্তান জন্ম দিতে না পারে, সে যে কারণই হোক ( পুরুষের অক্ষমতা বা অন্য কোন কারণ) তবে সে নারীকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে। তাকে অপয়া, অলক্ষী হিসেবে অভিহিত করে থাকে। এমন কি সে নারী নয়, অন্য কিছু, জাদুকরী ডাইনি হিসেবেও তাকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার চল ছিল কোনকালে। মোট কথা, নারীকে সন্তান জন্ম দিতেই হবে, নারীকে হতে হবে উর্বরা শষ্য ক্ষেত্রের মত। নারী সন্তান জন্ম দিতে চায় কি না চায়, তার শরীর/মন সন্তান জন্ম দেবার জন্য উপযুক্ত/প্রস্তুত কিনা এসবের কোন বালাই নেই। পুরুষতন্ত্র যা চাইবে, নারীকে তাই করতে হবে।

হাজার বছর ধরে নারীকে *মহান* মাতৃত্বের নামে এক শেকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। নারীও সে শেকল পরে অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।

গর্ভধারণের ফলে শরীর মনে অনেক পরিবর্তন ঘটে। যন্ত্রণা হয়। অনেকে প্রসবপরবর্তীকালীন বিষণ্ণতাতেও ভোগে। মাতৃত্ব অনেকের স্বাধীনতাও কেড়ে নেয়, সন্তানের দিক চিন্তা করে নারীর বহু শখ আহ্লাদ জীবন থেকে ছেঁটে ফেলতে হয়। দায়িত্ব বেড়ে যায় অনেকগুণ। এত কষ্ট করার পরেও সন্তান সব সময় মায়ের কথা শুনবে না। এসব কিছু চিন্তা করে কোন নারী যদি গর্ভে সন্তান ধারণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কি তাকে সহজভাবে গ্রহণ করবে?

অবশ্যই সন্তান জন্মদান একজন নারীর জীবনে বিশাল ব্যাপার। এই সন্তান গর্ভ ধারণ, জন্ম ও লালন পালন করতে গিয়ে নারীর দেহে মনে অনেক পরিবর্তন ঘটে।

সন্তান গর্ভধারণ নারীর শরীরে কিছু মারাত্নক দাগ তৈরি করে দেয়। শরীরও বদলে যায় অনেকখানি। আবার মাতৃত্বজনিত এই দাগকেই, শারীরিক পরিবর্তনকেই পুরুষতন্ত্র একেবারেই পছন্দ করে না। নারীর এই দাগ ও পরিবর্তনকে পুরুষতন্ত্র কুৎসিত বলে মনে করে। এ জন্য পুরুষ অনেকক্ষেত্রে নারীকে আগের মত ভালবাসতে পারে না। আবার ভিন্ন নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়।

নিজ দেহে নারী একটি মানব শিশুকে ধারণ করে। এসময় অনেকেরই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরায় কষ্ট হয়। মর্নিং সিকনেস, বমি, খাদ্যে অরুচি ইত্যাদি সমস্যা তৈরি হয়। কশেরুকার হাড় বেড়ে যায়। শরীর বাড়তি চাপ সহ্য করে। নারীর শরীর থেকে পুষ্টি শুষে নিয়ে সন্তানটি বড় হতে থাকে। এতে নারীর শরীরে খনিজের ঘাটতি তৈরি হয়। এর ফলে বৃদ্ধ বয়সে বেশির ভাগ নারীর হাড়ের সমস্যা দেখা দেয়। গর্ভের সন্তান নড়াচড়ায় ঘুমের সমস্যাও হয়। আর সন্তান প্রসবকালীন সময়ের যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা যাদের আছে, এটা তারাই ভাল বলতে পারবেন। অনেক সময় নারীরা প্রসব করতে গিয়ে মারাও যান। তবুও মাতৃত্বেও এক ধরনের প্রশান্তি নিশ্চয়ই আছে। সন্তানের হাসি মায়ের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। এই আশ্চর্য অনুভূতির জন্য নারীরা নিজ থেকেও মা হবার স্বপ্ন দেখেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই “ইচ্ছে হয়ে ছিলি মনের মাঝারে”র মত ইচ্ছে নারীদের মধ্যে কিছুটা জন্ম হয়। আবার কিছু ইচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর মনে মাথায় মগজে তৈরি করে দেয়। এত কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করে, ধৈর্য ধরে ১০ মাস গর্ভে সন্তান ধারণ করে যারা জন্ম দেন, তাদের প্রতি আলাদা এক ধরনের শ্রদ্ধা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যদিও এটি একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। মানুষ ছাড়াও অন্য প্রাণীও সন্তান জন্ম দেয় একই প্রক্রিয়ায়। তাদের প্রতিও আমাদের একই রকম শ্রদ্ধা পোষণ করা উচিত। একটি মা কুকুর বা একটি মা শুকর-ও শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য, যদি মা হওয়া এতই মহান কর্ম হয়ে থাকে!

নারীর এই গর্ভধারণ সব সময়ই কি তার নিজের ইচ্ছেতে ঘটে? নিশ্চয়ই না। নারীর চেয়েও তার পরিবার বা চারপাশের মানুষের চাপে পড়ে তাকে অনেক সময় অনিচ্ছাসত্ত্বে গর্ভধারণ করতে হয়। একটি মেয়ে বিয়ে হতে না হতেই চারপাশের মানুষ থেকে বারবার একটি প্রশ্নই শুনে আসে, বিয়ে তো হলো, নতুন খবর কবে পাবো, ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়াও আছে ধর্ষণের মত দণ্ডনীয় অপরাধ। যে নারী সব সময় মা হবার স্বপ্নে বিভোর থাকে, সেও কখনওই ধর্ষিতা হয়ে মা হতে চায় না। কিন্তু এর ফলেও নারীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে সন্তান গর্ভে চলে আসে, যা সম্পূর্ণ বায়োলজিক্যাল কারণেই ঘটে। সুতরাং নারীর মা হবার বিষয়টি সব সময় তার নিজের ইচ্ছেয় ঘটে না। আবার এক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটাতে গেলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীই।

গর্ভধারণের ফলে শরীর মনে অনেক পরিবর্তন ঘটে। যন্ত্রণা হয়। অনেকে প্রসবপরবর্তীকালীন বিষণ্ণতাতেও ভোগে। মাতৃত্ব অনেকের স্বাধীনতাও কেড়ে নেয়, সন্তানের দিক চিন্তা করে নারীর বহু শখ আহ্লাদ জীবন থেকে ছেঁটে ফেলতে হয়। দায়িত্ব বেড়ে যায় অনেকগুণ। এত কষ্ট করার পরেও সন্তান সব সময় মায়ের কথা শুনবে না। এসব কিছু চিন্তা করে কোন নারী যদি গর্ভে সন্তান ধারণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কি তাকে সহজভাবে গ্রহণ করবে? উত্তরটি সবারই জানা। মধ্যযুগের মত সেই নারীকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে মারতেও দ্বিধা করবে না অনেকে।

নারী তার গর্ভে সন্তান ধারণ *করবে* কি *করবে না*, সে সিদ্ধান্ত নারীরই থাকুক। কেননা, শরীরটা নারীর নিজের। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মাইন্ড সেট থেকে বেরিয়ে এসে নারী ভাবুক, পুরুষটি কি তার গর্ভের সন্তানের বাবা হবার যোগ্য?

সব শেষে একটা ধাঁধা তাদের জন্য, যারা মনে করেন নিজ গর্ভে সন্তান ধারণ না করলে মাতৃত্ব অনুভব করা যায় না, মা হওয়া যায় না, এমন ভাবেন যারা তাদের জন্য।এমন একজন নারী জন্মেছিলেন এ পৃথিবীতে, যিনি নিজ গর্ভে কোন সন্তান ধারণ করেন নি। তবুও সবার মা হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছেন। কে তিনি?

Comments

comments

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি