জ্বিন, গুণিন, রাখালসাপ, সাপুড়ে ও আমাদের পাড়ার রীতি-রেওয়াজ । রাসেল রাজু

ঘটনাটি আমার জন্মের আগের। এলাকার সবার মুখে শোনা। আমাদের পাশের পাড়ার গুণিন, নাম ফরিজ আলী, একদিন বাস ধরতে যেতে দেরি করে ফেলে। এতদিন যে বাস সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার আগে আসত না সেই বাসই কিনা সেদিন সোয়া ছয়টায় চলে যায় গ্রামের এই বাসস্টপ ছেড়ে। পরের বাসের অপেক্ষায় থাকবে কিনা এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে দেখল বাসস্টপের পাশের বটগাছের জ্বিনটি এক বৃদ্ধের রূপ নিয়ে বাসে চড়ে বসেছে।  এই দিব্যদৃষ্টি সে কীভাবে লাভ করল তার কোন কূলকিনারা করতে পারল না। তবে তন্দ্রাবেশে তাকে এটা দেখিয়েছে ওই জ্বিন। এলাকার মোড়লসহ বেশকিছু লোকের এটাই বিশ্বাস। অন্যরা ধরে নেয় এতদিন জ্বিনের দেখা না পেয়ে বানোয়াট একটা গাঁজাখুরি গল্প দাঁড় করিয়েছে লোকটা। পাড়ার বশির প্রথম পক্ষের কথা মেনে নেয় ত বশিরের বউ দ্বিতীয়পক্ষের। খেলার মাঠে সাদিক দ্বিতীয়পক্ষের মতে যায় ত অন্যরা মিলে ওকে পেটাতে থাকে। কেঁদে কেঁদে ঘরে এসে মা নিধিকে বললে সে গ্রামান্তরে থাকা নিতাইয়ের মায়ের সাথে এটা নিয়ে ঝগড়া বাঁধিয়ে বসে। নিতাইয়ের বাবা ক্ষেত নিড়ানো সেরে ঘরে এসে ওটা শোনে পাশের গাঁয়ের সাদিকের বাবার সাথে কথা কাটাকাটি করতে করতে মারামারিতে জড়িয়ে যায়। তখন হিন্দু মুসলমানে লেগে যায় একচোট। পরদিন পত্রিকায় খবর হয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খবর। এসব কারণে ওই পাড়ার নামই হয়ে গেছে কমিনকোণা। আমাদের পাড়ার সকলের বিশ্বাস এখানে কমিন-কমজাত লোক থাকে। তারাও আবার কম যায় না, নিজেরাই এই নামটাকে শরিফকোণা বলে প্রচার করে। তাদের মতে তারা শরিফ লোক।

এলাকার সকলে প্রেতটাকে চেনে বাসস্টপের বটগাছে থাকা জ্বিন নামে। কেউ কেউ দেখেও থাকতে পারে। তবে স্থানীয় কারো সাথে লাগে না সে। সকলে তাকে সন্তুষ্ট করার নিমিত্তে হুজুর ডেকে সফিনা খতম পড়িয়ে বছরে একবার গরু জবাই দেয়। সেই গরুর গোশত রান্না করে কেউ খাওয়ার আগেই একটা বড় অংশের সাথে একটা জ্ব্যান্ত মোরগ আর এক ডেকচি ভাত তেমাথা রাস্তায় বাওনা হিসেবে দেয় অমাবস্যার রাত্রি দ্বিপ্রহরে। যে বা যারা দিতে যায় তাদের সাথে কোন টর্চ থাকলে হবে না। ফেরার পথে যদি কেউ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে কিংবা নাম ধরে ডাকে, তখন পেছনে ফিরে তাকানো চলবে না। তাকালে একবারে মেরে ফেলবে জ্বিন। তাই কাজটা সবাই করতে পারে না। ফরিজ আর কে কে যেন এটা করতে যায়। তাদের কেউ কেউ স্বপ্নেও দেখে ফেলে যে ওই বাওনা খেয়েই বাঁচে জ্বিনটি। আবার কেউ উল্টাপাল্টা কিছু একটা করলে গ্রামের কেউ একজনকে স্বপ্নের মাধ্যমেও সেটা জানিয়ে দেয় জ্বিন। কারণ হিসেবে সবাই ধরে নেয় জ্বিনটা অনেক ভাল। নেমকহারামি করেনা। যার নুন খায় তার ক্ষতি করতে বিবেকে বাঁধে জ্বিনের। এলাকার কাউকে এই কারণে সে বিরক্ত করেনা। কিন্তু বহিরাগত কেউ এলে আর রক্ষে নেই। লোকজনকে তার ক্ষমতা সম্বন্ধে সজাগ করতেই ওটা করে থাকে জ্বিনটি। তাছাড়া কেউ বটগাছে চড়ে বসলে বা সেটার গোড়ায় পেচ্ছাপ করলে ভয়ানক ক্ষেপে যায় সে। তবু কেউ কেউ ভাবত এখন থেকে বছরে দুইবার খাবার খাওয়ার লোভে সবার চোখে ধান্ধা লাগিয়েছে এই জ্বিন। গোড়ার দিকে যে-ই এই দিক দিয়ে গেছে সে-ই পরের কয়েকদিনের মধ্যেই মারা পড়েছে জ্বর হয়ে। এমনকি কেউ কেউ দেখেছেও যে একটি অদ্ভুত প্রাণী বটগাছটি বেয়ে উঠছে। সবাই তখন সিদ্ধান্তে পৌছয় যে কিছু একটা থাকে এই বটগাছে। এজন্যই এক পীরকে নিমন্ত্রণ করে এনে ইস্তিখারার মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হয় জ্বিনের ব্যাপারে। তিনিই মুজিজাবলে জ্বিনটিকে বেঁধে রেখেছিলেন ওই বটগাছের ডালে। পীর বেঁচে থাকতে তাই আর কিছুই করতে হয়নি। কিন্তু উনি আউড়ি দেওয়ার পর তার মুজিজা নষ্ট হলে বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়ে দ্বিগুণহারে যন্ত্রণা দিতে থাকে সে। এরপর থেকে প্রথমবার বাওনা দেওয়ার আগপর্যন্ত শান্তিতে ছিল না এলাকার লোকেরা। সবাই জানে একবার জনৈক সমিল ব্যবসায়ী সরকার থেকে এই গাছ কিনে নিয়েছিল নিলামে। কিন্তু একজন কামলা গাছে প্রথম কুপ দিতেই গলগল করে রক্ত ঝরতে শুরু করে। কামলারা তাই দেখে পালিয়ে যায়। প্রথম ও একমাত্র কুপটা যে দিয়েছিল সে একমাস জ্বরে ভোগে মারা যায়। বাকিদের কথা কেউ জানেনা। এলাকার সবার মুখে মুখে ঘোরে ঘটনাটা।

এতকিছুর মধ্যে খালি ফরিজ থাকে না। সে কিছুই জানতেও পারেনা। বাসস্টপে বসে বসে ভাবে, একবার শেষরাইত একলোক এই রাস্তা হয়া কোথাও যাইতেছিল। জ্বিনের খুব ইচ্ছা তারে লইয়া একটু মজা করে। দিল তারে ধান্ধায় ফেইলা। বটগাছের চারদিকে চক্কর দিতে দিতে সে হাজির হইল এক বিয়া বাড়িত। সেইখানে তারে লোকজন খাতিরদারি কইরা পালংকে বসায়া মিষ্টি খাইতে দিল। তাই সে মজা কইরা খাইতে থাকল। কিন্তু রাইত পোহাইলেই জ্বিনের শক্তি শেষ। ফজরের আজান হইতেই তাই লোকটি দেখল গোবরের শুকনা টুকরা হাতে নিয়া সে খাইতেছে জমির আইলে বইসা।

সন্ধ্যার একটু পরেই ফরিজ যখন দেখল জ্বিনটি বাসে উঠে বসেছে এক মেয়ের পাশে যার পরনে লাল কাপড় যা বোঝার ফরিজ ততক্ষণে বুঝে নিল। কিন্তু শীঘ্রই তার মনোযোগ গেল সময়ের দিকে। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে সে ফিরে গেল ঘরে। সবাই এমনটিই করে। সন্ধ্যার বাস বাসস্টপে পৌঁছার পূর্বে ছেড়ে গেলে আর বাসের অপেক্ষায় থাকে না। ঘরে চলে যায়।

তৃতীয় আরেকটি ঘটনার কথা বলাবলি করে পাড়ার লোকজন। আতাবুন নেছার একমাত্র ছেলে স্বপ্নে জ্বিনকে দেখে। তবে স্বপ্নে নাকি বাস্তবে এই ব্যাপারে কেউ নিশ্চিন্ত হতে পারে না। এই কারণে রাজিক বলে, মুই শুনছি পোলায় বটগাছের নিচে গেছিল শেষ রাইত। তারে জ্বিনই ডাইকা নিছিল। সানজিমা বলে, জ্বিনরে সে সাধনার দ্বারা ডাইকা আনছিল তার ঘরে।

এশার পরে রাতের খাবার সেরে সে ঘুমোতে যায় নিয়মিত টিভি দেখার অভ্যাসের ব্যত্যয় ঘটিয়ে। পাশে শোয় তার বউ চামেলি। ক্লান্ত দেহে সে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন অভ্যাসমত ঘুম থেকে জেগে উঠে। নামাজ আর নাশতা সেরে বাসস্টপে যায়। শহরে পৌছে কাজ সেরে গ্রামে ফেরে সন্ধ্যায়। ব্যস্ততায় তার যেন কথা বলার ফুরসৎ মেলা ভার। শেষমেশ এশার পরে সবাই যখন টিভি দেখতে বসেছে এর এক ফাঁকে বিদ্যুৎ চলে যায়। ফরিজ আর খবরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখতে পায় না। এলাকার লোকেরা বলাবলি করে, এই সংবাদ দেখা তার কপালে আছিল না। আলিফ লায়লা দেখার আশায় জমায়েত সবাই তখন অপেক্ষারত কখন বিদ্যুৎ আসবে। তখন সে মেয়ে মাসুমাকে দিয়ে হাতপাখা আনিয়ে বাতাস করে। তার রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে। বলে,

শোন বউ, কাইল রাইত এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখসি। দুয়ারে চম্পাফুল।

আমরা রাতেরবেলা স্বপ্নের কথা বলতে গেলে দুয়ারে চম্পাফুল কথাটি বলি। ওটাই নিয়ম। না বললে স্বপ্ন উলটো ফলে। ভাল স্বপ্ন খারাপ হয়ে যায়। ফরিজ তাই দুয়ারে চম্পাফুল কথাটি বলে তার স্বপ্নের কথা বলতে শুরু করে।

দেখলাম আমি বাসস্টপে গেছি। ওইখানে বাসে একটা মাইয়া বইসা আছে পরনে লাল কাপড়। আমি বসলাম তার পাশের আসনে। কী এক টানে আমি য্যান মন্ত্রমুগ্ধের মতন মেয়ের দিকে তাকায়া রইলাম। লাল কাপড়, কালো চুল আর রক্তাভ চোখ। বাস থাইকা নাইমা সোজা একটা জমির আইল ধইরা হাঁটতে থাকল সে। আমি তার পিছন পিছন। আসমান জুইড়া ধলা ধলা মেঘের আলপনা আঁকা। এই রইদ ত এই আবছায়া। সুরুজ এই মেঘের তলে যায় ত এই বাইর হইয়া পড়ে। কিন্তু আকতা বিশাল এক আজাগর আইসা খাড়াইল আমার সামনে ফণা মেইলা। ভয়ে আমি এক্কেরে জইমা গেলাম। এইবার ওই মাইয়া একপলকেই একটা পোলা হইয়া গেল। একটা লাঠি দিয়া ওই আজাগররে খেদায়া দিল।

একটা কাক আর তিনটে পাখি আসলো এইবার। মাঠের একপ্রান্তে নাইমাই হাঁটতে শুরু কইরা দিল। একটা বউ কথা কও, দুইটা ঘুঘু। এইবার এইগুলা আমাদের ভয় পাইলো না মোটেই। পাখিটা “ভাই কথা কও” কইয়া ডাক দিল! দিয়াই তিনটা পাখি মিলে আমারে তাড়া কইরা আইল। এইবারও আমার ত্রাতা হয়া আমারে বাঁচাইল ওই মাইয়া পোলা হয়া।

হালচাষের প্রস্তুতি চলতেছে কোথাও, কোথাও কোথাও ধান রূপণ করা হইছে। কিন্তু এই ভরাদুপুরে কোথাও একটা মানুষের চিহ্নমাত্র নাই আমরা দুইজন ছাড়া। রাস্তারও কোন খোঁজ পাইলাম না। ভয়ে তেষ্টা লাগল খুব। কিন্তু পান করনের জল দূরের কথা কোন টিউবওয়েলই নাই। অথবা থাকলেও আমাগো খেয়াল আছিল না। তাছাড়া সামনে বেশ উঁচা উঁচা পাহাড় ভাইসা উঠল। এইভাবে আরও কিছুক্ষণ চলবার পরে এক রাখাল ছেলেরে দেখতে পাইলাম। গায়ে লুঙ্গি, এছাড়া আর কিছুই নাই। গরু চরাইতেছিলো সে। আমাদের দেইখাই পালাইবার ধান্ধা করতেছিল দেইখা ডাক দিলাম,

এই পোলা, একটু শোন।

ছেলেটা দাঁড়ায়া গেল। অবশ্য আমার হাত-পা কাঁপতেছে তখনও। ইচ্ছে হইল পালাই এই ভূতুড়ে জায়গা থিকা।

আমার খুব তেষ্টা লাগছে। একটু জল পাওয়া যাইবো কাছেপিঠে?

ইঙ্গিতে তারে অনুসরণ করতে কইয়া ছেলেটা হাঁটতে শুরু কইরা দিল। তারে অনুসরণ করলাম দুইজনে। ছাউনির মতন গাছপালায় ঘেরা রাস্তা দিয়া আমরার আগে আগে হাঁইটা গেল সে। বেলা পইড়া আইছে প্রায়। একটা শনের চালা আর মাটির দেয়ালের ঘরের পাশে আইসা থামল সে। আমরাও থাইমা গেলাম। তারপরে আকতা দৌড় মাইরা ঘরে চইলা গেল। ঘরটার আশপাশে আরও কয়খান ঘর। তয় সবগুলান একটা থাইকা আরটা আলাদা। অনেক সময় কাইটা গেলেও কেউ ঘর থাইকা বাইর হইয়া আইল না। ব্যাপক ভয় করতে লাগল আমার। কাউরে ডাকতে চাইলাম। কিন্তু ক্যান জানি গলা দিয়া কোন আওয়াজ বারাইল না।

দরওয়াজা খোলবার শব্দয় চমকায়া গেলাম আমি। এতক্ষণ পর একটি সানকী হাতে বাইর হইয়া আইল এক বেটি। তার পরনে লাল শাড়ি, চোখদুটো আগুন লাল আর মুখ যেন ভয়াল রকমের কালা। এই বেটি আইতেই আমার লগেরজন গায়েব। আমিও আর তার কথা মনে করবার পারলাম না।

বলতে চাইছিলাম, জগ-গ্লাস নাই? এইটা থাইকা ক্যামনে জল পান করমু, বুঝতাছি না! কিন্তু গলা দিয়া কোন আওয়াজ বারাইল না।

আমরা এইটা দিয়াই পানি খাই। বেটি কইল। আপনেও এইডা দিয়াই খাবেন।

সানকী থাইকা বহুত কষ্টে সামান্য জল পান কইরা ওইটা একপাশে রাইখা দিতেই ওই মহিলা আরবার বাইর হইয়া আইল। এইবার হাতে পিঁড়ি লইয়া। আইসা আমার হাত ধইরা আমারে টাইনা বুকে চাইপা ধরল।

কাছে আসেন। একটু বিশ্রাম নেন। রাইত খাইয়া তবেই যাইয়েন।

ঘরের ভিতরে হাঁটতে হাঁটতে দেখি লগের বেটি, ঘর সব উধাও।

এইসময় কেউ একজনের বাচ্চা কান্নাকাটি শুরু করে দিতেই সবাই একটু বিরক্ত হয়ে উঠল। আর সময় পাইল না কান্দনের। শেষমেশ একজন কেউ রেগেই যায়। কুলাঙ্গার পোলা, কান্দন থামাইবি? বলে মাও ঝাড়ি দেয়। সঙ্গে সঙ্গে সবাই নীরব হয়ে যায়। পনেরো-ষোলো জন মানুষ টিভি রুমে বসে বসে স্বপ্নের সেই তাজ্জব ঘটনাবলি শোনে, অবাক হয়। ফরিজ আলী বলে চলে।

আমার ভয় ভয় করতেছিল। কই যাই, কী করি সেসব কিছুই ঠাওরাইতে পারতেছিলাম না। তারপর সহসা নিজেরে হাটে দেখতে পাইলাম যেন এক দোকানে বইসা বিড়ি ধরায়া টানতেছি। এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘইটা গেল তখনই । একটা গাছ আমার ঘাড় ভেদ কইরা জাইগা উঠল। আমি ভয়ার্ত হইয়া চিক্কুর পাইড়া দৌড়াইবার চেষ্টা করলাম। কিন্তুক সফল হইতে পারলাম না। পুরা শরীর অবশ হয়া গেছে যেন। শত চেষ্টাতেও কাউরে ডাকতে পারলাম না। নড়তেও পারলাম না। সহসা মারাত্মক কালো এক লোক আইসা আমার ঘাড় থাইকা গাছটি ফেইলা দিয়া আমার কান্ধে হাত দিয়া কইল, তুই গুণিন হইবি। আর অমনি গায়ে ঘাম ছাইড়া দিয়া আমার ঘুম ভাইঙ্গা গেল।

সেইদিন সেখানে উপস্থিত বাচ্চাদের সকলেই এমনকি বড়রাও প্রত্যেকের মনের মধ্যে ভয় নিয়ে যার যার ঘরে ফিরে। সবাই জানে এই লোক আর কেউ নয় সেই জ্বিন। সে-ই লোকটারে গুণিন হতে আদেশ করেছে। এই ঘটনাই ক্রমে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সবাই যে বিশ্বাস করে তা না। কিন্তু যে অবিশ্বাস করে সে-ই মারা পড়ে অপঘাতে নয়তো রাতে কিছু একটা তাদের ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায়। রমজান মারা যায় একটা জুরুঙ্গা থেকে পড়ে গিয়ে। মরতুজ আলী মারা যায় শেষরাতে সাপের কামড়ে। আর প্রতিদিন রাতে আজিরের নাম ধরে ডেকে ডেকে কান্নাকাটি করে জ্বিন। আজিরের মা একমাত্র ছেলেকে ঘর ছেড়ে বেরুতে দেয় না। সে জ্বিনের উদ্দেশ্য জানে। আজিজ ফরিজের ঘটনা বিশ্বাস করেনি দেখে জ্বিনের এই কারসাজী। এলাকার সবার মুখে মুখে এখন জ্বিনের এই ক্ষেপে যাওয়ার ঘটনা। একদিন গভীর ঘুম থেকে আজির জেগে উঠে হাউমাউ কান্নার শব্দে। ঘর পেরিয়ে ছুটে যায় ওই বটগাছের তলে। আজিরের মা এখনো তার ছেলের জন্য পাড়ার সবার কাছে কান্নাকাটি করে। একমাত্র ছেলেটার লাশ মেলে পরদিন বটগাছের সবচেয়ে চিকণ ডালে ঝুলন্ত অবস্থায়। এলাকার মাঝবয়েসী সবাই তা দেখেছে। আজিরের মৃত্যুর পরদিন ময়মুনা নামক এক বুড়ী রজবের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে সব খুলে বলে। একেকজন একেক বিশ্বাসে ভর করে জ্বিনের এই চাওয়াকে মেনে নেয়। পনেরো জনের মত অবিশ্বাসী মারা যাওয়ার পর একে একে সবাই যখন এই বাস্তবতা মেনে নেয় এর পরদিন থেকে দশ বছর এলাকায় কেউ মরে না। বাকী সবাই বড় বাঁচা বেঁচে গেছে বলে ধরে নেয়। বছরে তিনবার জ্বিনের জন্য বাওনা দেবে বলে স্থির করে।

সবার মুখে মুখে ঘুরে, জ্বিনের সাধক হতে মাঝরাতে গোরস্তান থেকে মড়ার মাথার খুলি এনেছিল ফরিজ। সবাই জানে মধ্যরাতে মড়ার মাথার খুলি কবর থেকে তুলে আনতে পারলে গুণিন হওয়া যায়। তবে সেটা জ্বিন ভূত আর ভয়ের কারণে অসম্ভবের কাছাকাছি। তাও ফরিজ এক মধ্যরাতে গোরস্থানে যায়। এরপর থেকে ফরিজের বসার ঘরে জায়গা করে নিয়েছে এই মড়ার মাথার খুলি।

আমরাও কয়েকজন মিলে একবার ভয়ে ভয়ে তার বাড়ি সে খুলি দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারিনি। আশপাশের সবাই জানে তন্ত্র বলে সবার মনের কথা জানে ফরিজ আলী গুণিন। এই কারণে তাই কেউ তার কথা ভাবে না কখনোই। খারাপ ভাবনা ত নয়-ই। অবশ্য কেউ অসুস্থ হলে তার কাছ থেকে টোটকা নিতে যায় সবাই। ফরিজ আলীর বাড়িতে লোকের পা ফেলবার জায়গা থাকে না। এত লোক আসে প্রতিদিন! সবাই কোন না কোনভাবে জ্বিনভূতের রোষের শিকার।

তাছাড়া ফরিজ আলী জাদুর আরেকটি ব্যাপার খুব ভাল করেই জানত। এটা সবাই-ই জানে আসলে। সুরা এখলাস উলটা করে পড়লেই হয়ে উঠা যায় মস্ত জাদুকর। সবরকমের দরোজা, তালা খোলতে পারা যায় এটা করলে। তবে এক্ষেত্রে একটা অপূরণীয় ক্ষতি অবশ্য আছে। এলাকার ছোটবড় সকলেই সেটা জানে বিধায় তারা জাদুকর হতে যায় না। ক্ষতিটা হল, ঈমান হারিয়ে কাফের হয়ে যাওয়া। এই ঈমান হারানোর ভয়ে কেউই তাই এটা করে না। কিন্তু সবাই জানে, জ্বিনের সহায়তায় ফরিজ আলী তাই করেছে।

একরাতে কালীপূজোপলক্ষে দেবী কালীর মন্দিরে দেয়া প্রসাদ খেয়ে মন্দিরে প্রস্রাব করে চলে আসে আমাদের পাড়ার সাইফের বাবা। ফলটা ভাল হয় না। সবার বিশ্বাস মন্দিরে ইবলিশ থাকে। সে ক্ষেপে যায় বিধায় পরদিন থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে সাইফ। তলপেটে প্রচন্ড ব্যথা আর বমি। ফরিজ আলীর ডাক পড়ে। সে জানায়, এর আর কোন আশা নাই। মন্দিরে থাকা ইবলিশ শয়তান ক্ষেইপা গেছে সাবুদ্দিনের উপ্রে। তিন দিনের মধ্যেই মারা পড়ব হে। কোন টোটকায় কাম হইব না।

তিন দিনের মধ্যেই সদ্যজাত সাইফকে এতিম করে মরে যায় সাইফের বাবা। সবাই কষ্ট পায়। তবে সাবুদ্দিন যে ভুল করছে সেটাও গুরুত্ব পায় সবার কাছে। ভুলের শাস্তি পেতে হবেই।

কমিনকোণার ফরিজ গুণিন যে পাপ করছে সবাই সেটাও ভাবে। ধর্মচ্যুত হয়ে গেছে সে। তার পরিবারও। প্রতিদিনই নাকি বাণ মারত সে কাউকে। একটি পাতিলে আগুন জ্বালিয়ে তাই হাওয়ায় ভাসিয়ে দিত যাকে বাণ মেরেছে তার উদ্দেশ্যে। সেই পাতিল দেখে ফজলু, বছল আর করিমসহ অনেকেই। শুক্রবারে জুমার নামাজেও কথা উঠে এটা নিয়ে। পঞ্চায়েতের মুরব্বি কথা বলেন। কিন্তু ফরিজের বিপক্ষে কিছুই করতে সাহসে কুলীয়ে উঠে না কারো। এইটুকুই থেকে যায় ঘটনা। কেউ আর অতো ঘাঁটাঘাঁটি করেনি এসব নিয়ে।

এর কিছুদিন পরেই কমিনকোণার রশিদ একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করে। তার একমাত্র নাতিটি সেদিন ঘরের পেছনে ভয়ানক রকমের কান্না করে উঠে শেষরাতে। কিন্তু ছেলের বউ কিংবা ছেলে কেউই সেটা বুঝতে পারে না। বশির অবাক হয়ে ছুটে যায় সেখানে। গিয়ে দেখে তার একমাত্র নাতি যার বয়স সাড়ে তিন বছর কান্না করছে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে। এতো রাতে আর ছেলের ঘরের দরোজায় ঠেলাঠেলি করতে মন সায় দেয় না বশিরের। এলাকার ছোটবড় সকলেই জানে ঘটনাটি। বাচ্চাটিকে নিজের পাশে শুইয়ে ঘুম পাড়িয়ে সে নিজেও ঘুমোয়। পরদিন সকালে আর নাতিকে পাশে পায় না। এলাকার সবাই বলে, এরকম করে দুই থেকে তিন রাত তা ঘটে। এতে সে বেশ একটু অবাক হয় আর ছেলেবউকে জিজ্ঞেস করে, সালামের বউ, তোমার পোলা শেষ রাইতে প্রত্যেক দিন বাইরে যায় ক্যামনে?

কিতা বলেন, আব্বা? ও ত সারারাইত আমাদের পাশেই ঘুমায়া কাটায়।

টনক নড়ে বশিরের। ফরিজ গুণিনের কাছে ছুটে যায় সে। ফরিজই পরামর্শ দেয় বৃদ্ধ বশিররে,

একটা লাত্থি মাইরা চইলা আইসেন ওই প্রেতটারে। ফিরেও তাকায়েন না। অনেক মিনতি করব আরেকবার মারনের লাইগা। ভুইলাও শুইনেন না। একবার আঘাত করলেই প্রেতরা মইরা যায়। কিন্তু দুইবার আঘাত করলে আর রক্ষা নাই। আপনেরেই মাইরা ফালাইব। আর তাবিজটা রাখেন। আপনের ছাটা লাগছে।

পাড়ার সবাই ঘটনাটা অক্ষরে অক্ষরে জানে। আমাদের পাড়ায়ও এইটা এখনো অনেকের মনে আছে। বশির ওইদিন রাতেই প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করে। শেষরাতে কান্না শুরু হতেই সে ছুটে গিয়ে বাচ্চাটিকে লাত্থি মারে। পেছন ফিরে তাকানোর জন্য অনেক মিনতি করে প্রেত। বশির থুড়াই পরোয়া করে। পরদিন সকালে সেখানে একটি ইঁদুর মরে পড়ে থাকতে দেখে সবাই। প্রেতরা মরে গেলে কোন একটা প্রাণীর রূপ লাভ করে। এইটাও ইঁদুর হয়ে মরে পড়ে ছিল। এরপর একে একে অনেকেই শুনে কেউ কাঁদছে, কেউবা হাসছে, কেউবা গুণগুণ করে গীত গাচ্ছে। আবার মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ঘেউ ঘেউ করে উঠছে কুকুর।

আমাদের পাড়ার হাফিজ লুকুসের কথা সবার মনে আছে। একদিন চাবাগানের ভিতর দিয়ে বাইসাইকেলে করে যাচ্ছিল সে। মাঝপথে একদল গরু ছুটাছুটি করে তার সামনের রাস্তা আগলে দাঁড়ায়। সে অবাক হয় গরুগুলোর এভাবে ছুটে চলায়। হঠাৎ দেখতে পায় এক ষাঁড়ের পীঠে বিশাল এক নখরের ক্ষতচিহ্ন। তার আর বুঝতে বাকি থাকে না এইটা অদৃশ্য রাক্ষসী আচড়াউরির কাজ। বাইসাইকেল ফেলে সে চার ক্বুল পড়তে পড়তে রাস্তার পাশের জমিনে লাফিয়ে পড়ে আইলের চিপায় শুয়ে পড়ে। এই দফায় রক্ষা পেয়ে সবাইকে সতর্ক করে দেয় সে। ঘরে ঘরে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই ফরিজের কাছে পড়া জল আনতে ছুটে যায়। কিন্তু সেদিনের ঘটনায় এলাকার সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতংক। গরুগুলোও খুব অস্বাভাবিক লাফালাফি করে সমস্ত বিকেল। সন্ধ্যায় বাধ্য হয়ে সবাই নিজেদের পোষা গরুগুলো গোয়ালঘরে না বেঁধে নিজেদের থাকার ঘরে নিয়ে যায়, পড়া পানি ছিটিয়ে দেয় ওগুলোর গায়। রাত জেগে পাহারা দেয়। কিন্তু এতকিছু করার পরও জলিলের গরুগুলো কেমন যেন আতংকে ভোগে। খুঁটি ভেঙ্গে, দঁড়ি ছিঁড়ে যেন পালিয়ে যাবে কোথাও। তখন জলিল আর তার পরিবারের সবাই মিলে বারান্দার বেঞ্চিতে দা হাতে বসে চিৎকার করে জপতে থাকে,

আলীর হাতে জুলফিকার, ফাতেমার হাতে তীর

যেই পন্থে আইছিস বলা সেই পন্থে ফির।

এতদসত্ত্বেও গ্রামের মখাই মিয়ার গাভীটা মরে যায় সেদিন রাতে। ছটফট করতে করতে নাকি মরে গিয়েছিল। কোন সুরাকালাম পড়াতেও কাজ হয়নি একদম। গাভীর গলায় নখরের গভীর ক্ষত দেখে আচড়াউরির ব্যাপারে সবাই নিশ্চিত হয়। এবং সবাই জানে, জানের উপর দিয়ে যে বিপদ এসেছিল সেটা মালের উপর দিয়ে গেছে। মখাই মিয়ার ঘরের ফাঁড়া কেটে গেছে একবারে। অন্যরাও তাই জানের বদলে মাল সাদকা দেয়। প্রসাদ বিতরণ করে। ফাঁড়া কেটে যায় সবার।

এই ঘটনার দিনকয়েক পরের ঘটনাও লোকমুখে শোনা যায়। সবাই বলে যে, হুট করে কমিনকোণায় সাপের আনাগোনা বেড়ে যায়। আর ঠিক ওই সময় এলাকায় আগমন ঘটে এক বিখ্যাত সাপুড়ের। তাকে সবাই ধরে কয়ে নিয়ে আসে সাপ ধরার জন্য। সে সাপুড়ে তুতা মিয়ার বাড়ির উঠোনে আসন পেতে বসে। তার সাথে আট থেকে দশজন সহকারী। বেশ বড়সড় উঠানে ইতোমধ্যে অনেক লোকসমাগম হয়েছে। সাপুড়ে সবার উদ্দেশ্য বলে, আপনেরা বারান্দার ভিতরে চইলা যান। নইলে কিন্তু সাপে কাটব। সবাই ভয়ে বারান্দায় সেটিয়ে যায়। সাপুড়ে পানিভর্তি একটি গেলাস রাখে সামনে। আর তার চারপাশে চারটি বড় সাইজের কড়া। কয়েকটি বস্তা সাপুড়ের সামনে রাখা এইগুলায় সাপ ভরে রাখবে। সাগরেদদের চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে সে মন্ত্র পড়তে থাকে। আর গ্লাসের দিকে তাকায়। কড়াগুলো অদৃশ্য মন্ত্রবলে সাপ খোঁজতে থাকে। আর যে সাপের খোঁজ মেলে তাই সে দেখতে পায় গেলাসে। উত্তরের ঝোপে হলে চিৎকার করে তাই জানিয়ে দেয় সে সাগরেদদের।

মন্টি, তর ডাইনের ঝোঁপটা থাইকা একটা আলদ বাইরইতাসে। ধইরা লইয়া আয়। কালু, তর সামনের পুকুর পাড় থিকা জিনুয়া সাপডা ধর। কাদের, তর বায়ে একটা ফাতালত বাইরইতাছে।

একে একে অনেক সাপ ধরা পড়ে। সবাই শিহরিত। হঠাৎ একজন সহকারী ছুটে আসে, উস্তাদ আমারে সাপে কাটছে। বলেই ধুম করে মুখ দিয়ে ফ্যানা বেরুতে বেরুতে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।

এইবার দেখেন আমার কেরামতি।

বলেই সাপুড়ে তার সহকারীর সাপেকাটার স্থানের একটু উপরে ত্যানা দিয়ে বেঁধে ক্ষতস্থানে মুখ লাগিয়ে টেনে টেনে বিষ বের করে ফেলে। এর কিছুকাল পরেই সহকারী উঠে বসে। কিন্তু আসল ঘটনা ঘটে এর কিছুক্ষণ পরে। এই ঘটনাটি সকলেরই মনে আছে। সাপুড়ে হঠাৎ ভুল হইছে! ভুল হইছে! চিৎকার করে সেজদায় পড়ে যায়। আর তার সাগরেদদের ডেকে ফেরত আনে। তারাও সেজদায় পড়ে যায়।

সাপুড়ে চিৎকার করে উঠে। আমারে মাফ কইরা দেন। এর একটু পরেই উপস্থিত সবাই লক্ষ্য করে তুতা মিয়ার পুকুরের ঠিক মাঝখানটায় কুণ্ডলী পাকিয়ে জল ঘুরছে আর ঠিক মধ্যিখান থেকে কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। আরও ভয়াবহ ব্যাপারটা ঘটে এরপরেই। বিশালাকৃতির ধোঁয়ার কুণ্ডলী একটি সাপের রূপ নিয়ে মাথায় মুকুট সমেত এসে হাজির হয় সাপুড়ের সামনে। সে অবিরত ক্ষমা ভিক্ষা করে, মনসার দোহাই! আমি জানতাম না আপনে এইখানে থাকেন।

সবাই বলে যে, ওই সময় লোকজনের চিৎকার শুনে ফরিজ আলী ছুটে আসে। সব দেখে সে রেগে যায়।

আপনেগো আর খায়া কুনো কাজকাম নাই রাখাল ডাইকা আইনা এইরাম বিপদের সৃষ্টি কইরা ফালাইলেন?

কিছুও কি করার নাই, গুণিন? লোকটারে খায়া ফেলবো রাখাল সাপটায়! উপস্থিত সবাই বলে। সাপটা তখনও উঠোনে রাগে ফোঁসছে।

দেখি, কিছু করন যায় কিনা।

এই কথা বলে সে একা একা একটা রাস্তা আঁকে যেটা ওই পুকুরে গিয়ে পড়ে। এরপর বিড়বিড় করে কী যেন পড়ে। রাখালটিকে ইঙ্গিতে পুকুরে নামতে বলে। প্রথমে রেগে যায় সাপটি। ফরিজকেই যেন গিলে ফেলবে। ফরিজ আরো মন্ত্র পড়ে যেন। লোকজন বলে এরপর সাপটা পুকুরে চলে যায় উড়াল দিয়ে। তখন দ্রুত চারটে বাঁশের খুঁটি পুঁতে তুতা মিয়ার পুকুরের চৌকোণে। তারপর বালু হাতে নিয়ে তাতে ফুঁ দিয়ে পুকুরপাড়ের চারদিকে ছিটিয়ে দেয়। সবাই বারান্দায় ভয়ে তটস্থ অবস্থায় এমনটিই দেখে। এখনো সবাই বলে যে এহেন গর্জন তারা জীবনেও শোনে নাই যেমনটা শোনেছিল ওইদিন। ঘণ্টাদুয়েক পরে সে ফিরে আসে উঠোন। সবাই বলে, ফরিজ তখন কয়, নিজের জীবন দিয়া তোমাদের বাঁচাইছি। আর অমন ভুল কইরো না জীবনেও। ধন্য ধন্য পড়ে ফরিজের নামে। লোকজন এখনো এই রাখালের ঘটনা নিয়ে কথা বলে। আমাদের এলাকায়ও এখনো সেটা ঘরে ঘরে প্রচলিত।

কিন্তু এই ঘটনা সামাল দিতে গিয়ে অনেক পরিশ্রান্ত হয়ে যায় ফরিজ। কমিনকোণার লোকজন বলে, বয়স হয়ে যাওয়ায় আর এভাবে রাখাল সামাল দিতে গিয়ে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছিল ফরিজকে। তাই তার স্বীকারোক্তির জন্য সে তখন সবার ত্রাতা। কৃতার্থচিত্তে সবাই তা মেনে নেয়। আসলেই ফরিজের দিন শেষ হয়ে এসেছে।

তৃতীয় আরেকটি ঘটনার কথা বলাবলি করে পাড়ার লোকজন। আতাবুন নেছার একমাত্র ছেলে স্বপ্নে জ্বিনকে দেখে। তবে স্বপ্নে নাকি বাস্তবে এই ব্যাপারে কেউ নিশ্চিন্ত হতে পারে না। এই কারণে রাজিক বলে, মুই শুনছি পোলায় বটগাছের নিচে গেছিল শেষ রাইত। তারে জ্বিনই ডাইকা নিছিল। সানজিমা বলে, জ্বিনরে সে সাধনার দ্বারা ডাইকা আনছিল তার ঘরে। শফিক বলে, আসলে ওই জ্বিন না। তারে নতুন জ্বিন আইসা ধরা দিছিল স্বপ্নে। আগের জ্বিন ফরিজের বয়স হইছিল দেইখা লগে লগে চইলা গেছে। আর কোন বটগাছ খালি থাকে না বইলা এইটাতে আইসা থাকতে শুরু করছে এই জ্বিন। ব্যাপার যাইহোক, সবাই মেনে নেয় যে আতাবুনের ছেলেই এখন থেকে গুণিন হতে যাচ্ছে। কিন্তু ফরিজের ক্ষেত্রে ঘটে চূড়ান্ত বিপজ্জনক ঘটনা। সবাই বলে সে নাকি বোবা হয়ে গিয়েছিল। এবং একদিন সকালে তার স্ত্রী চামেলি তাকে ঘরে খুঁজে পায়নি। সেদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিল চামেলি। সারাদিন খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে যখন তাকে পাওয়া গেল তখন তার দেহে প্রাণটুকু বিদ্যমান নেই আর। এলাকাবাসী বলে, তারে যেইদিন দাফন করা হয় সেইদিন রাইতে বিকট একটা শব্দ শুনতে পাইছিল সকলেই। সেই শব্দ আসছিল গোরস্থান থাইকা। পরদিন সকাল হইতেই মতিন মিয়াঁ ছুইটা গেছিল কয়বরে। সেইখানে গিয়া দেখে ধোঁয়া উড়তেছে কয়বর থিকা আর সুগভীর একটা সুড়ঙ্গ তৈয়ার হইয়া গেছে এর ভিতরে যে সুড়ঙ্গের আদৌ কোন শেষ আছে কিনা তার জানা নাই। আসলে কেউরই জানা নাই।

এই ঘটনা এলাকায় আলোড়ন তুলে। শেরেক আর বেদাতের শাস্তি যে হতে হবে তা নিয়ে কারো কোন সন্দেহমাত্র থাকে না। কদিনের জন্য সবাই খুব ধার্মিক হয়ে যায়। কিন্তু আতাবুনের ছেলেকে সাহস করে কেউ কিছু বলতে পারেনা কখনো। সে এখন বৃদ্ধ। এলাকায় সবাই তাকে গণি নামে চিনে। মাথায় মস্ত টাক। অদ্ভুত গোঁফ। আর চোখ কড়া লাল। এখনো সবাই সেই বটতলার বাসস্টপ দিয়ে শহরে যায়। শহর থেকে ফিরে আসে। এই বটগাছ কেটে ফেলার চেষ্টাও কেউ করে না। তবে বটগাছের খুব কাছেই ঘর করে থাকে রুহুল আমীন আর তার পরিবার। কমিনকোণাকে আর কেউ কমিনকোণা বলে চিনে না। এখন সে জায়গা শরিফকোণা নামে পরিচিত। আমাদের পাড়ার সবাইও শরিফকোণা বলে।

আলিফ লায়লার দিন চলে গেলেও, ফরিজ গুণিনের দিন চলে গেলেও লোকজনের সেই অগ্রহায়ণের ধান মাড়াই উৎসব, আশ্বিনে সবাই মিলে হালচাষের রীতি এখনো রয়ে গেছে। এখনও সবাই সামান্য সমস্যায় গুণিনের কাছে যায়।  এসব কোনদিন হারিয়ে যাওয়ার নয়। এখনো গণিই এলাকার কবিরাজ। সবাই তার কাছেই ছুটে যায়। তবে একজন হুজুরের আবির্ভাব হয়েছে বছরচারেক ধরে। সায়েম হুজুর নাম। ইনি জ্বিনের সাধক। গণির থেকে মনোযোগ এখন সায়েম হুজুরের দিকে।সায়েম হুজুর যেই মসজিদের ইমাম সেই মসজিদে লোকজন জড়ো হয় প্রতিদিন। পড়া তেল আর তাবিজের জন্য। লোকজন জানে ফরিজের দিন গেছে, গণির দিন প্রায় গেছেই এবং সায়েমের দিনও একদিন ফুরোবে। নতুন কেউ সে জায়গার দখল নেবে। কিন্তু সুদিনে তারা সবাইকেই উপরে উঠতে দিতে জানে, উপরে তুলে সম্মান করে। জানে দুর্দিনে নিচে নামিয়ে আনতে। আসলে তারাই এখানে সবকিছুর নিয়ন্তা। তারাই বাস্তবকে পরাবাস্তব করে তুলে। তারাই পাতাল হতে আকাশে তুলে আবার আকাশ হতে পাতালে ছুঁড়ে ফেলে।

 

Comments

comments

রাসেল রাজু

রাসেল রাজু

শাবপ্রবি থেকে সদ্যই পোস্টগ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করলেন ইংরেজি বিভাগ থেকে। লেখালেখি ব্যাপারটা প্যাশন থেকে। গল্প আর কবিতা লেখারই চেষ্টা করেন। অনুবাদ করেন মাঝে মধ্যে। সাহিত্য বিষয়ক পড়তে বেশি পছন্দ। জন্ম ১৯৯৩ সালের ৭ ডিসেম্বরে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি