খানসাহেবের খণ্ডজীবন :: পর্ব ১৫ । সিরাজুদ দাহার খান

জ্যোতিষি আংকেল  — ১ম অংশ

সেদিন সন্ধ্যালগ্নে পাড়ার রাস্তায় নামতেই খানসাহেব বন্দী হলেন লামি ও মিতুমনির হাতে। প্রায় মাস দেড়েক পর ওদের সাথে দেখা। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মুখ বেজার থাকলেও ওদের দেখা পেয়ে খানসাহেবের মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। কোনো ভূমিকা ছাড়াই দু’জন তাঁর দুই হাত ধরে ফেলল এবং যথারীতি হাত দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটতে শুরু করল তাঁর সাথে। তাঁর কোন হাতের মালিক কে তা নিয়ে দু-এক মিনিট ওদের মধ্যে খুনসুঁটি হলো। গত ২ বছরের রীতি অনুযায়ী, কেউই তাঁর পূর্বঅধিকৃত হাতের ন্যায্য অধিকার ছাড়তে রাজি নয়। ওদের হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলে বিশেষ করে মিতুমনির সাথে দেখা হলেই তার কাজিন প্রীতুমনির স্মৃতি মনে পড়ে যায় তাদের এবং ওকে নিয়ে ছোট ছোট স্মৃতিচারণ শুরু হয়ে যায় তাদের মধ্যে।

প্রীতিমনি বছরখানেক আগে যখন এ পাড়ায় ছিল তখন খানসাহেবের ডান হাতটা কেউই কব্জা করতে পারত না। ও এমন শক্ত করে ধরত যে, খানসাহেব জোর খাটিয়েও কখনো কখনো হাত ছাড়াতে পারতেন না। ওর ভাই প্রতীকের দখলে থাকত তাঁর বাম হাত। আজকে আবার প্রীতুমনির প্রসঙ্গ তুরতেই মিতুমনি ও লামি একযোগে বলে উঠল —

: আপনি যখন আমাদের চাইতে প্রীতিমনিকেই এত বেশি ভালোবাসেন, তো আপনি আমাদের সাথে না হেঁটে ওদের বাসায় যাননা কেন? তাহলেই তো ওর সাথে দেখা করতে পারেন।
: বাসায় গেলে তো ওর হাত ধরে হাঁটতে পারব না। বসে বসে গল্প করতে হবে। — খানসাহেবের ছোট্ট কৈফিয়ত।

এ কথা বলতেই সবার মনে পড়ে যায়, সবাই যখন খানসাহেবের হাত ধরে সামনের দিকে জোরকদমে হাঁটত, প্রিতুমনি তখন তাঁকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য সবসময় তাঁকে পেছন দিকে টেনে ধরত। এটা মনে হতেই সবাই হি হি করে হাসতে শুরু করল।

শিশুদের মন অতি চঞ্চল এবং কৌতূহলি। হাসতে হাসতে হঠাৎ মাথায় কী বুদ্ধি চাপল, মিতুমনি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে কৌতূহল নিয়ে খানসাহেবের বুদ্ধির পরীক্ষা নেয়ার জন্য জিজ্ঞেস করে —

: আংকেল আপনের তো অনেক বুদ্ধি, তাই না! আচ্ছা বলেন তো! প্রিতুমনি এখন কোন ক্লাসে পড়ে?
: ক্লাস টু-তে। গতবার ক্লাস ওয়ানে পড়ত; তাই সহজেই তিনি বলে দেন।
: আপনি জানলেন কেমনে? আপনার সাথে তো দেখাই হয়না।

খানসাহেব খুব ভারিক্কি চালে বলেন —

: আমি তোমাদের ব্যাপারে সবকিছু জানি।
: আচ্ছা তাইলে বলেনতো, প্রীতিমনির মাথায় এখন চুল আছে, না কি নাই?
: নাই। 
: কী হইছে?
: টাককু।

লামি আর মিতুমনি চোখ বড় বড় করে জানতে চায় : 
: আপনি এতসব জানলেন কেমনে? আপনার সাথে দেখা হইছে?
: না।
: তাইলে জানলেন কেমনে? আচ্ছা এবার বলেন তো, টাকু হওয়ার পরে ও কয়েক দিন স্কুল বাদ দিছিল না-কি দেয় নাই?
: কয়েকদিন বাদ দিছিল।
: এখন যায়?
: যায়।
: খালি মাথায় যায়?
: না।
: ও মাথায় কী পরে যায়? ক্যাপ পরে, না ওড়না, না হিজাব?

খানসাহেব এবার আমতা আমতা করে বলেন —
: উ উ উ, ক্যাপ না হিজাব? ক্যাপ না হিজাব? ক্যাপ না ওড়না? ক্যাপ।

পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে হিসাব কষে কিছুটা আন্দাজে তীর ছোড়েন খানসাহেব। মিলেও যায়। কারণ প্রীতিমনির মাথায় এর আগেও মাঝে মাঝে ক্যাপ পড়তে দেখেছেন তিনি। লামি ও মিতুমনি দুজনেই বিস্মিত হয়ে যায়! এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। খানসাহেবের বুদ্ধি দেখে ওরা আরও কৌতূহলি হয়ে ওঠে। এর মধ্যে আরও কয়েকজন ছেলেমেয়ে এসে যোগ দেয়। কিন্তু কথাবার্তার কোনো আগামাথা না পেয়ে এবং আসরে ভালোমতো জায়গা না পেয়ে কিছুক্ষণ পরেই চলে যায়।

২য় অংশ

এবার লামি যুদ্ধে নামে এবং পরীক্ষা নেয়া শুরু করে —

: আচ্ছা বলেন তো, আমি কি কয়দিন আগে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেছিলাম নাকি যাই নাই?
: গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেছিলা।
: আরে আপনি তো দেখছি, আমারটাও জানেন? কেমনে জানেন?
: আমি সবারটাই জানি — খানসাহেবর গৎবাঁধা উত্তর।

এবার মিতুমনির বুদ্ধি খুলতে শুরু করে —

: আরে তুমি বোঝ না কেন, হয়তো তোমার আব্বুর কাছ থেকে শুনছে। আর তা ছাড়া তুমি তো কয়দিন আংকলের সাথে হাঁট না। তাই অনুমানে কইছে আংকেল। আংকেল যে চালাক।

লামি আবার জেরা করতে শুরু করে —

: আচ্ছা! বলেন তো, আমি একা গেছিলাম, নাকি বাড়ির সবাই গেছিলাম?
: বাড়ির সবাই গেছিলা। কিন্তু তোমার আব্বা যায় নাই। 
: আপনি এইটাও জানেন! হায় আল্লা আমি কই যাই।
: হ্যাঁ। এ পাড়ার সবার সবকিছু জানি।

আসলে লামির বাবাকে তিনি আজ কয়েকদিন ধরেই পাড়ায় দেখছেন। কিন্তু লামিকে দেখেন নাই।
লামি এবার বলে : যদি আপনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন, তাহলে বুঝব যে, আপনি আসলেই অনেক জ্ঞানী। ও নতুন কঠিন প্রশ্ন করে —

: আমাদের গ্রামে আমার যে বন্ধু আছে, সে লম্বায় কি আমার সমান, না-কি আমার চাইতে একটু বড়?
: তোমার চাইতে একটু লম্বা।

সঠিক উত্তর শুনে মিতুমনি ও লামির বিস্ময়ের আর সীমা থাকে না! পরের প্রশ্ন —

: ওকি আমার মতো হাঁটে, নাকি এইরকম জোরে জোরে হাঁটে?- বলে লামি জোরকদমে হেঁটে হেঁটে দেখায়। 
: এইরকম জোরে জোরে হাঁটে?- বলে খানসাহেবও জোর কদমে হেঁটে হেঁটে দেখায়।
: আপনে আসলেই অনেক জ্ঞানী। আপনি কি একজন জ্যোতিষি! নাকি আপনার সাথে জ্বীন আছে?
: না আমি নিজেই জ্বীন।

বলে সে চোখের মনি মাঝখানে এনে বড় বড় করে ওদের দিকে তেড়ে যায়। এটা তিনি শিখেছিলেন তাঁর বড়মামার কাছ থেকে অথবা কোনো এক মজাদার নানা কাছ থেকে। দুই চোখের মনি একযোগে নাকের ডগার দিকে তাকালে চোখে-মুখে এক অদ্ভূত রূপ ধারণ করা যায়!

: আংকেল, আপনি এত দুষ্টামি করতে পারেন। — বলে দুইজনই দু্ পা পিছিয়ে যায়।

শেষ অংশ

এবার মিতুমনি আবার প্রশ্ন শুরু করে এবং শেষ অস্ত্র ছোড়ে —

: বলেন তো, আমার কি কোনো ছোট ভাই আছে?

হঠাৎ এরকম আজগুবি প্রশ্ন শুনে এবার প্রথমে তিনি একটু বিচলিত হয়ে যান। পরক্ষণেই সামলে নেন। কারণ তিনি এর আগে কখনো ওর ভাইকে দেখেননি। সুতরাং নিশ্চিত হয়ে বলেন —

: আছে। 
মিতুমনির তো চক্ষু চড়কগাছ!
: আমার ছোট না বড়?
: ছোট
:কত ছোট?
: অনেক ছোট। ক্যাতারি। ছোট বাচ্চা।
: তাও জানেন! বয়স কত বলেন তো?
: ১মাস ২২ দিন।

খানসাহেব চমক দেয়া জন্য মাসদেড়েক না বলে মাস ও দিন বলে বসেন এবং কাকতালিওভাবে তা মিলে যায়। মিতুমনির তো এবার মাথায় হাত! সে কোনো দিশা পায় না — আংকেল কারো বাসায় যায় না; ওর সাথেও দেখা হয় নাই মাসদেড়েক। তার নতুন ভাই সম্বন্ধে এতকথা জানল কেমনে? এবার আরও শক্ত প্রশ্ন করে —
: এবার বলেন, আমার ভাইয়া কি হাঁটে?
: না! বেশির ভাগ সময় শুয়ে থাকে আর তোমার মায়ের কোলে কোলে থাকে।

কোনোমতেই আংকেলকে হারাতে না পেরে সে মরিয়া হয়ে ওঠে —

: ও কাঁদে না হাসে?
: বেশির ভাগ সময় কাঁদে; খিদে পেলে কাঁদে। আবার মাঝে মাঝে এমনি এমনিই হাসে। অনেক সময় তোমরা হাসালে ও হাসে, আবার কোনো কোনো সময় হাসেও না।
: কী খায় বলেন তো? 
: দুধ খায়
: আপনি এত কিছু জানেন কীভাবে? লামি তুই সব বলছিস। 
লামি বলে : অমার সাথে আংকেলের আজ কতদিন দেখাই হয় নাই; মৃদুল জন্ম হওয়ার পরও তো আমার সাথে আংকেলের দেখা হয় নাই।

এবার বেশ শক্ত প্রশ্ন করে মিতুমনি —

: আচ্ছা এইবার বলেনতো, আমার ভাইয়া ছেলে না মেয়ে?

এবার খানসাহেব একটু ভড়কে যাওয়ার ভান করেন; মাথা চুলকায়। এত কঠিন প্রশ্ন শুনে তিনি চোখমুখে পরাজয়ের চিহ্ন ফুটিয়ে তোলেন। মিতুমনি ও লামির চোখেমুখে বিজয়ের হাসি দেখা যায়। ওরা যখন আনন্দে হাততালি দিতে শুরু করেছ, তখন ওদের বেলুন চুপসে দিয়ে দুম করে খানসাহেব বলে বসেন —
: তোমার ভাইয়া মনে হয় একজন ছেলে!
: আপনি শিওর?
: হ্যাঁ আমি শিওর।

এবার ওদের মুষড়ে পড়ার পালা! চোখ বিষ্ফারিত হয়ে যায়। কিন্তু হাল ছাড়ে না। মিতুমনি এবার শেষ অস্ত্র ছোড়ে —

:আচ্ছা আমার ভাইয়া তো ছেলে, তাহলে কি কাজল পরে?

এবার খানসাহেব চোখ বন্ধ করে থাকেন। যেন কিছুতেই ধরতে পারছেন না, এমন ভাব করে চুপ করে বসে পড়েন মাটিতে। ওরা এবার আবারও বিজয়ের আলো দেখতে পায়।

: এই আংকেল! কী হইলো আপনের। আপনে কি প্নারশ্ন শুনে জ্ঞান হারায়ে ফেললেন? না পারলে হার মাইনে নেন। আমরা বলে দিতাছি।

আংকেল হঠাৎ একলাফে দাঁড়িয়ে ওদরেকে চমকে জবাব দেন —

: কাজল পরে। কপালের ডান দিকে।– সারাজীবনের অভিজ্ঞতা তেকে তিনি স্মার্টলি বলে যান। কোনো ইতস্তত ভাব নেই তাঁর মধ্যে।
: আংকেল, আপনে এইটাও জানেন। কেমনে জানলেন। ছেলেরা তো কাজল পরে না। তাও বুঝলেন কীভাবে? আপনি কি জ্যোতিষি?

যান, এইবার শেষ প্রশ্ন এইটা পারলে আমরা হার মাইনা নেব —

: বলেন তো আমার ভাইয়ের নাম কী?
: মৃদুলমণি।
; আপনি আমার ভাইয়ের নামও জানেন? আপনার বাসায় কি কোনো ডিজিটাল মেশিন আছে। আপনার সাথে কি জ্বীন আছে? না হলে জানেন কীভাবে?

আংকেল কোনো জবাব দেন না।

: আংকেল, বলেন না। কেমনে জানলেন?
: আরেকদিন বলব।

বলে তিনি নিজের মতো নিজেদের পূর্ব পাড়া থেকে পশ্চিম পাড়ার রাস্তায় হাঁটতে চলে যান।

(পুনশ্চ: ছোটদের লিড প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চালাকি করে মজা নেওয়ার জন্য খানসাহেব শিশু অধিকারকর্মীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি এও জানিযেছেন, ওদেরকেে আরেকদিন তার সবকিছু জানার রহস্য জানিয়ে দেবেন। তবে, জেলজরিমানা করলেও এরকম সহজ মজা নেওয়ার পথ ছাড়বেন না।)

Comments

comments

সিরাজুদ দাহার খান

সিরাজুদ দাহার খান

সমাজোন্নয়ন ও জনশিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের কৌশল প্রণয়ন ও উপদেশনার কাজে ব্যাপৃত। প্রশিক্ষণ ও অধিপরামর্শ তৎপরতা চালনে সহায়ক একাধিক বোধিনী পুস্তক ও নির্দেশনগ্রন্থের প্রণেতা। ‘মাইন্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক বিশেষ একটি প্রশিক্ষণ সঞ্চালনকৌশলের উদ্গাতা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয় নিয়ে বিদ্যায়তনিক অধ্যয়ন সেরেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গোড়ার দিককার গণথিয়েটার ম্যুভমেন্টের তৎপরতা ছাড়াও জড়িত ছিলেন বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে। পেশাজৈবনিক লেখালেখির পাশাপাশি নেশাজৈবনিক লেখার প্রতি নিবিষ্ট হচ্ছেন ক্রমশ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি