নীলকমল । আফরোজা সোমা

সৈয়দা মুনিয়া তাবাসসুম-এর জগতটা তিতা-তিতা হয়ে আছে। জীবনের ত্যাক্ত মুহূর্তগুলোতে তার দাদীর কথা খুব মনে পড়ে। বিশেষ করে, ডিভোর্সের পর থেকে তো দিনে অন্তত চল্লিশবার করে মনে পড়ে তার দাদী সালেমন বেওয়ার কথা। দাদী বলতেন,

‘নিম তিতা, করলা তিতা আরো তিতা জেহের
এর চেয়ে অধিক তিতা কইন্যা প্রেমের ফের।’

তার জীবনে প্রেম একটা ‘ফের’ তো বটেই। ভালোবাসার বিয়েটা টিকলো না। বিয়ের ঠিক তিন বছরের মাথায় ডিভোর্সটা হলো। ডিভোর্সের আইনি মার-প্যাঁচ শেষ হওয়ার সময় শেষ-দিনের একটা পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতার কাজ ছিল। খোদার কী লীলা! অদ্ভুত এক নাটকীয় কায়দায় সেই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার দিনটা গড়াতে-গড়াতে গিয়ে ঠেকলো তার এনগেজমেন্টের তারিখেই। মানে তাদের যেই ডেট-এ এনগেজমেন্ট হয়েছিল, সেই ডেটেই সম্পন্ন হলো বিবাহ বিচ্ছেদের চূড়ান্ত লেনা-দেনা।

বিবাহ বিচ্ছেদের পর কেটে গেছে প্রায় পাঁচ মাস। এখন বরং তিনি অনেকটাই স্থির হতে শুরু করেছেন। কিন্তু তার এই সুস্থিত দিনে ফেরার পথে গত মাসখানেক ধরে বাগড়া দিচ্ছে বাসার সামনের ফ্ল্যাটের এক কালা-বান্দর।

বাসার একটা মাত্র বারান্দা। যেই বারান্দায় দাঁড়ালে এক চিলতে আকাশ চোখে পড়ে; আকাশের তারাদের চোখে পড়ে। ‘নিম নয়, করলা নয়, জেহের খাওয়া’ তিতা-তিতা হয়ে যাওয়া জিন্দেগী-কে সহনীয় করতে সৈয়দা মুনিয়া তাবাসসুম-কে গত কয়েকটা মাস শান্তি জুগিয়েছে এই দক্ষিণ-খোলা-বারান্দা; এই বারান্দার আকাশে উবু হয়ে থাকা কালপুরুষের ছুরির বাট।

ডিভোর্সের আগে থেকে, সেপারেশানের দিনগুলোতেও এই বারান্দায় রাত-বিরেতে বসে কত শত তিমির-রাত্রি তিনি পাড় করেছেন তারাদের দিকে ব্যাকুল তাকিয়ে থেকে। কিন্তু গত মাসখানেক হলো তার দক্ষিণ বারান্দার মুখোমুখি ফ্ল্যাটে উঠে এসেছে মাঝবয়সী, গায়ের রঙ কালো, মুখের চামড়া কেমন ষাঁড়ের চামড়ার মতন দেখতে মোটা, আর সাইজে খাটো এবং পেটটা মাঝখানে বেঢবভাবে বেরিয়ে থাকা এক লোক।কচ্ছপের পিঠের মতন দেখতে মুখাবয়বের ওই লোকটার ব্যালকনিটাও সৈয়দা মুনিয়া তাবাসসুমের ফ্ল্যাটের সোজাসুজি।

এই কালা-বান্দর আসার পর থেকেই রাত-বিরেতে মুনিয়াকে দেখে মৃদু স্বরে গলা খাকারি দেয়। মোবাইলের স্ক্রিনের লাইটটা এই বারান্দার দিকে তাক করে নাড়ায়। এইসব সহ্য করতে না পেরে মুনিয়া রাতে বারান্দায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। মন যতই খারাপ থাকুক, যতই মনে হোক, দেখি পূব থেকে পশ্চিমের দিকে কতখানি হেলেছে তারাদের দল; যতই ইচ্ছে করুক কপালে-গায়ে-মুখে লাগাক রাতের একটু শীতল পরশ, তবুও তিনি বারান্দায় যাচ্ছেন না আজ ক’দিন।

খুব ইচ্ছে হলে বরং বেড-রুমের জানালাটা খুলে সেটার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে নিজের গলিটা দেখেন। গলিতে ল্যাম্পপোস্টের আলো দেখেন। গলির চেনা কুকুরদের লেজ নাড়ানো দেখেন। তবু, ঐ কালা-বান্দরের মুখ দেখতে চান না। এমনকি আজকাল মুনিয়ার এটাও মনে হয় যে, এই কালা-বান্দরের মুখ দেখে গেলে তার দিনটাই খারাপ যাবে। তাই, পারতপক্ষে সকালবেলায় বারান্দার দিকে মুখই ঘোরান না।

একই ঘরে বিলাইয়ের তিনটা বাচ্চা আর মুনিয়া থাকার কথা ভাবতেই পারছেন না। ফলে নিচ থেকে গিয়ে দারোয়ানকে ডেকে এনেছেন তিনি। দারোয়ানকে দিয়ে বিড়ালের বাচ্চাগুলোকে ঘর থেকে বের করিয়েছেন। বের করিয়ে সেগুলোকে রাখতে বলেছেন তাদের বিল্ডিং-এর পশ্চিম কোণার আম গাছটার তলায়। সেপথ দিয়েই বেড়ালটা আসে। ফলে, ওখানে রাখলেই বিড়াল তার বাচ্চাদের দেখবে সবার আগে।

একে তো অন্তরে ‘প্রেমের জেহের পানের জ্বালা’। তার উপরে সেই জেহের-তিতা ভোলার জন্য যে বারান্দা ছিল সেটিরও দখল নিয়েছে কাছিমমুখো পেটমোটা এক কালা-বান্দর। বারান্দায় গিয়ে বাতাসে একটু বসতে না পারার কারণে গত কয়েকদিন ধরে মুনিয়ার প্রাণ আঁই-ঢাঁই করছে। এরই মধ্যে একদিন শেষ রাতের দিকে গিয়ে একটু বসেছিলেন। সেই সময়েও হঠাত করে শুনে মৃদু গলা খাকারি! সেই খাকারি শুনে মুনিয়ার মনে হলো, ‘দুইটা থান ইট নিয়া ওই কালাবান্দরের বিচি দুইটা ছেইচা ফালাই’। কিন্তু মনের কথা মনে রেখে এমন-ই অনড় হয়ে বসে রইলেন যেনো কিচ্ছুটি শোনেননি। যেনো তার কানে হেডফোন। ফলে, আরো দুইবার গলা খাকারি শোনার পরেও কিছুই না শোনার ভাণ করে রাগে গড়-গড় করতে-করতে উঠে গেছেন অন্তরে জেহের তিতা নিয়ে দিনাতিপাত করতে থাকা সালেমন বেওয়ার নাতি মুনিয়া।

এই অবস্থায় নিজের হিলিং-এর জন্য একটা পথ মুনিয়া বের করেছেন। অফিস শেষ করে অফিসের গাড়ি থেকে এসে ধানমন্ডি লেকে নেমে যান। সেথানেই হাঁটেন সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসা নাগাদ। এরপর ঘোর সন্ধ্যা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এতে বরং তার ভালই বোধ হচ্ছিলো। বারান্দায় যাবার প্রয়োজনটা অতোটা তীব্র বোধ করছিলেন না।

কিন্তু মুনিয়ার যেনো শনির দশা যাচ্ছে। যেনো তার রাহুর গ্রাস কাটছেই না। তাই, শান্তি যেনো তার রাশিতে সইলো না। তৃতীয় দিন ধানমন্ডি লেকে হাঁটাহাঁটি শেষে রিকশায় বাসায় এসে ঘরে ঢুকে দেখেন ডাইনিং টেবিলের মাঝখানে প্যাঁচ দিয়ে আরামসে বসে আছে একটা বিড়াল।

তারপরের দিনেও ঘরে ফেরে দেখেন একই দশা; বিড়ালের লোমে টেবিল সয়লাব। তারপরের দিনেও টেবিলে বিড়াল দেখে মুনিয়ার যেনো সব রাগ একেবারে শুরু থেকে একসঙ্গে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। তার মনে উতলে উঠলো আরেক মেয়েকে নিয়ে কক্সবাজারের হোটেলে বেড়াতে গিয়ে তার বিশ্বাসঘাতক স্বামীর হাতে-নাতে ধরা খাওয়ার অপমানজনক কেচ্ছা। মনে পড়লো এক কালাবান্দর এসে তার বারান্দাটার দখল নেয়ার কথা। তার উপরে এখন এই বিলাইয়ের যন্ত্রনা।

সেই ছোটোবেলায় বিড়ালের খামচি খাওয়ার পর থেকেই বিড়ালকে ভীষণ অপছন্দ করেন সৈয়দা মুনিয়া তাবাসসুম। এমনকি অপছন্দের মাত্রা এতই বেশি যে বিড়ালকে মানুষের সামনেও পর্যন্ত বিড়াল বলেন না। ময়মনসিংহের উচ্চারণে বিড়ালকে তিনি সবসময়ই ডাকেন ‘বিলাই’।

গত কয়েকদিন আগে কিচেনের একটা জানালার কাচ ভেঙে গেছে। বিল্ডিং-এর ফ্ল্যাটের বাচ্চা-কাচ্চারা গেটের মুখে কানাগলিতে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে জোরে বল মারায় সেই বল লেগে কাচটা ভেঙেছে। অফিস থেকে বাসায় ফিরে রাতে প্রথমে না দেখে সেই কাচে তার বাম পায়ের কানি আঙুলটাও একটু কেটেছে। কিন্তু এরপরো সব সাফ-সুতরো তাকেই করতে হলো। কারণ সাহায্য করার মতন বাসায় কেউ নেই। বহুদিনের চেনা কাজের মেয়েটা গার্মেন্টসে চলে যাবার পর আর নতুন কোনো কাজের মেয়ে তিনি নেননি। মানুষের ‘আধা-কেচরা’ কাজ তার পছন্দ হয় না। আর বুয়াদের সঙ্গে ‘ক্যাট-ক্যাট’ করা তার আরো অসহ্য। এরচেয়ে নিজের কাজ নিজে করাই সাব্যস্ত করেছেন তিনি। ফলে, গত মাস তিনেক বাসার সকল কাজ নিজেই করেন।

কাচে কাটা পা এখনো শুকায়নি। তার উপরে শুরু হয়েছে নতুন উৎপাৎ। ওই ভাঙা জানালা দিয়ে ছাইরঙা পেটমোটা এক ‘বিরাট বিলাই’ এসে বসে থাকে ডাইনিং টেবিলে। প্রথম দিনেই মুনিয়া ঘরে ঢুকে দেখেন, ‘মহাসুখে বিলাই প্যাঁচ দিয়ে বসে আছে’ একদম টেবিলের মাঝখানে। ধাওয়া দিতেই সেটা আবার সেই ভাঙা জানালা দিয়েই সুরুত করে বেরিয়ে গেলো। কিন্তু একদিন দুইদিন না। গত পাঁচ ছয়দিন ধরে রোজই অফিস থেকে এসে দেখেন, বিলাই বসে আছে ডাইনিং টেবিলে। বাসায় এসে একটু জিরানোরো-টাইম নাই। আরো ১৫ মিনিট লাগে রোজ টেবিল ধোয়া-মোছা করতে। একদিকে এক ‘লুইচ্চার সাথে প্রেম করা, বিয়ে করা এবং নিজের বংশের মধ্যে যা কখনো ঘটেনি তাই ঘটিয়ে ডিভোর্স করে জীবনটা তিতা-তিতা। মনে হয়, তার জীবনটা সাপে কাটা একটা রোগীর মতন বিষে নীল। সেই বিষ-ভাবটা কাটানোর জন্য বারান্দাটাই ছিল তা আশ্রয়। রাতে দূর আকাশের তারাদের রাজ্যে যাওয়ার জন্য ওই বারান্দাই যেনো ছিল অপার্থিবের সিঁড়ি। কিন্তু এই কালা-বান্দর এসে সেই শান্তিটুকুও কেড়ে নিলো। এখন বারান্দাতেও কেবল কাপড়-চোপড় শুকোতে দেয়া ছাড়া আর বিশেষ যাওয়া হয় না। আর তার উপরে কয়েক দিন ধরে এই বিলাই।

‘বিলাইয়ের অত্যাচারটা আর সহ্য হচ্ছে না’ সৈয়দা মুনিয়ার। গত বৃহস্পতিবারে অফিসে আড়াই ঘন্টা সময় বেশি থেকে, জ্যাম পাড়ি দিয়ে রাতে সাড়ে আটটায় বাসায় ফিরে যখন দেখেন বিলাই তার ডাইনিং টেবিলে একগাদা লোম, আর পায়ে ও গায়ে লেগে থাকা ধুলা-বালি ফেলে গেছে সেটা আর তিনি সহ্য করতে পারেননি। ঐ দিন-ই টেবিল মুছতে-মুছতে উনি ঠিক করছেন, ‘এরপর দিন বিলাই দেখলে আর ধাওয়া দেওয়া-দেওয়ি নাই। কঠিন মাইর দিতে হবে’। যেই ভাবা সেই কাজ। ঘরের সিলিং ঝাড়ার কাঠিটা উনি খুঁজে বের করে দরজার পাশে এমনভাবে রেখেছেন যেনো ঘরে ডাইনিং রুমে ঢুকেই আগে কাঠিটা হাতে নিয়ে নিতে পারেন।

পরদিন তাই করেছেন। ধানমন্ডি লেকে হাঁটা বাদ দিয়ে তিনি বাসায় এসেছেন বিড়াল পেটাতে। কাঠি দিয়ে বিড়ালকে উদ্দেশ্য করে শূন্যে দিয়েছেন এক ঘা। কিন্তু বিড়াল লাফ দিয়ে আগেই পগাড় পাড়। প্রথম দিন ব্যার্থ হলেও এরপর দিন বিড়ালের গায়ে উনি এক ঘা লাগাতে পেরে বেশ পরিতৃপ্ত হয়েছেন।

এরপর দিন অফিস থেকে ফিরে মুনিয়া বেশ প্রফুল্লই হলেন। কারণ ‘বিলাই টেবিলের উপরে নাই’। কিন্তু প্রফুল্ল ভাবটা টিকলো না বেশিক্ষণ। হঠাতই তার নাকে এসে একটা কেমন দূর্গন্ধ লাগায় ইতি-উতি তাকিয়ে দেখেন ডাইনিং টেবিলের পাশে কিচেনে যাবার দরজার মুখে ‘বিলাই হেগে রেখে গেছে’।

বিড়ালের এ হেনো আচরণ দেখে মুনিয়ার মাথায় খুন চড়ে গেছে। মনে মনে ভাবছেন, ‘এইবার বিলাইকে মাইরাই ফেলবো’। অফিস থেকে এসে বেড়ালের গু সাফ করতে-করতে মুনিয়ার মনে হলো, একবার গ্রামে গিয়ে তার দাদীর কবরের পাশে দাঁড়ায়। কবর থেকে তার দাদী সালেমন বেওয়া কিছু একটা শিলুক বা বচন যদি বলে তাই শুনে হয়তো তার হৃদয়ে আসতে পারে শীতল হাওয়া।

এখন অফিস থেকে ফিরে মুনিয়ার এক নম্বর কাজ হচ্ছে চুপিচুপি পা টিপে-টিপে আগে ডাইনিং-এ আসা। সেখানে বিড়াল থাকলে তাকে ধাওয়া দেওয়া। আর কোনো-কোনো দিন বিড়াল না থাকলে ভালো মতন ঘরের কোণা-কাঞ্চি তন্ন-তন্ন করে খুঁজে দেখা যে ‘বিলাই কোনো কুকর্ম করে গেলো কিনা’। তারপর টেবিল ধোয়া-মোছা করা।

এভাবে প্রায় মাস খানেক যাবার পর হঠাত মুনিয়া খেয়াল করলেন যে প্রায় সপ্তাহ বা দশদিন ধরে বিড়ালটা আসে না। বিড়াল না আসায় তিনি খুব কৌতুহলি-ও হলেন। আবার খুশি-ও হলেন। মনে ভাবলেন, এতদিনে প্রাণ জুড়িয়েছে।

কিন্তু এর দুই-একদিন পরই ঘরে ফিরে রাতের বেলা শুনতে পেলেন স্টোররুমের ভেতর থেকে একটা কেমন চিঁহি-চিঁহি শব্দ আসছে। স্টোররুমে রাশি-রাশি পেপার আর যত সব পুরনো জঞ্জাল। এর মধ্যে কিছু প্রথমে খুঁজে না পেয়ে ভাবলেন, বুঝি বাইরের শব্দটাকেই ঘরের ভেতর ভেবে ভুল করেছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার এই শব্দ শুনতে পেয়ে কয়েকটা পেপার সরিয়ে দেখেন, ‘পেপারের তলায় বিলাইয়ের তিনটা বাচ্চা’! এই দেখে ভয়ে আঁতকে উঠে একটা আর্তস্বর বেরিয়ে এলো তার। আর মনে হলো, যেনো কোনো এক মুণির অভিশাপ বয়ে চলেছেন তিনি। সেই অভিশাপ মুক্তির জন্য তার এখন সালেমন বেওয়ার কাছে যাওয়া দরকার। গল্প শুনে শুনতে শৈশবে যেমন জিজ্ঞেস করতেন তেমনি এখন জিজ্ঞেস করা দরকার, ‘ও দাদু, এই যে মানুষটার এতো যাতনা তা শেষ হওনের উপায় কী?’

একই ঘরে বিলাইয়ের তিনটা বাচ্চা আর মুনিয়া থাকার কথা ভাবতেই পারছেন না। ফলে নিচ থেকে গিয়ে দারোয়ানকে ডেকে এনেছেন তিনি। দারোয়ানকে দিয়ে বিড়ালের বাচ্চাগুলোকে ঘর থেকে বের করিয়েছেন। বের করিয়ে সেগুলোকে রাখতে বলেছেন তাদের বিল্ডিং-এর পশ্চিম কোণার আম গাছটার তলায়। সেপথ দিয়েই বেড়ালটা আসে। ফলে, ওখানে রাখলেই বিড়াল তার বাচ্চাদের দেখবে সবার আগে।

বিড়াল তাড়িয়ে সারা বাসা এই রাতে ডেটল দিয়ে মুছতে-মুছতে মুনিয়া ভেবেছেন, ‘পাড়ার মিস্ত্রিটাকে ডেকে এনে দুই এক দিনের মধ্যেই জানালাটা আর ঠিক না করালেই নয়।’

কিন্তু পরদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সৈয়দা মুনিয়া তাবাসসুম যেনো বোবা হয়ে গেলেন। ডাইনিং টেবিলের দিকে চেয়ে নিজেকে তার মনে হলো পরাজিত সৈনিক। যেনো তার শিরোস্ত্রান লুটাচ্ছে ধুলায়। ডাইনিং টেবিলের উপরে প্লাস্টিকের সাদা যে টেবিলম্যাটটা ছিল সেটি বিড়ালের নখের আঁচড়ে-আঁচড়ে জায়গায় জায়গায় ফালা-ফালা হয়ে আছে। আর সাদা ম্যাটের উপরে হাল্কা ঘিয়া রঙের পানি। ভালো করে পরখ করে মুনিয়া বুঝলেন, এটা পানি নয়, ‘বিলাইয়ের পেসাব’। বেড়ালের বাচ্চাদের ঘর থেকে বের করে দেওয়ায় বেড়াল ক্ষেপে তার শোধ নিয়ে গেছে এভাবে- আঁচড়ে, ছিঁড়ে, পেচ্ছাব করে দিয়ে।

সব দেখে মুনিয়ার মনে হলো, যেনো দাদীর কবরই তার আশ্রয়। যেনো একবার দাদীর কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেই তার দাদী, সালেমন বেওয়া, কবর থেকে বলে উঠবেন একটা শিলুক বা মুহূর্তেই ঘটনার সঙ্গে খাপ খাইয়ে একটা পদ মিলিয়ে দিয়ে বলে উঠবেন:

‘ওগো কইন্যা কান্দিও না, কান্দিও না তুমি
তোমার লাইগ্যা নীলকমল তুইল্যা আনবাম আমি।’

Comments

comments

আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা

জন্ম ২রা অক্টোবর, ১৯৮৪, কিশোরগঞ্জ। পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেন বিবিসি বাংলা রেডিও-তে। প্রকাশিত কবিতার বই: অন্ধঘড়ি (২০১০,কথা প্রকাশ), হারমোনিকা (২০১৪, সংবেদ), ডাহুক (২০১৫, ভাষা প্রকাশ)।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি