সাম্প্রতিক

পাণ্ডুলিপি থেকে । মৌসুমী বিলকিস

কবি মৌসুমী বিলকিস‘র কবিতার বই এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে বের হয়েছে ২০১৮ সালের একুশে বইমেলায়। বইটি দুইবাংলার বইমেলাতেই পাওয়া যাবে। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী দেবাশীষ সাহা এবং প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের চৈতন্য প্রকাশনী থেকে।

এই শহরে

আমি এখন রেস্তোরাঁয় বসে তোমার সঙ্গে খাই
বাড়িতে নাজায় বাপ, গুটিকয় ভাইবোন
শুঁটকি মাছের মতো মা

আমি এখন গল্পগুজব তোমার সঙ্গে কফি হাউস
ঢাউস কিছু স্বপ্ন দেখা চিচিং ফাঁক কাব্য টাব্য

গ্রামের বাড়ি খড়ের চালা, আঁচল পেতে মা-ও ঘুমোয়
স্বপ্ন দ্যাখে খুদকুঁড়ো আর কত আছে রাধতে হবে সকালবেলা

আমি এখন গঙ্গার ধার ভিক্টোরিয়া আকাদেমি
নন্দনে আজ শেক্সপিয়রের লাভ, যেতেই হবে, সঙ্গে তুমি

বাড়িতে তবু বাঁশের মাচা লাউডগারা উঁচিয়ে আছে ফণা
একটা ছোট্ট ধুতুরো গাছ তেসিরা আর ফণিমনসা
মায়ের প্রসব বেদনা যখন তেসিরাটাও কাজে দেবে

আমি এখন বিতর্কে যাই, বাংলা নাকি ইংরেজি চাই
নারীসভাও মাঝে মাঝে সঙ্গে কিছু বন্য সময় তুমিও থাকো

মা আমার মার খেয়েছেন খবর পেলাম
বোনও নাকি দু’-একটা চড় বাবার হাতে
ডাইনি বলে কাপড় খুলে উস্কোখুস্কো আমার নানি
জলপানিও মিলবে না আর জানিয়ে দিল গ্রাম্য সমাজ

আমি এখন শহর ঘুরে শান্ত করি জীবন যাপন
আমি এখন কবি কিংবা অধিবাসী এই শহরের

কাকলি

[যে মেয়েটি সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেছিল
আর নিথর হয়ে পড়ে ছিল যার উজ্জ্বল চোখ জোড়া।] 

কী করিস মেয়ে তুই জিমনাসিয়াম?
মা-বাবার ঘর ছেড়ে গালাগালি উপহাস একলাফে ট্রাম?

মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে যমের দুয়ার
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে মিটিং মিছিল
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে কামনা বাসনা
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে স্বপ্ন বিলাস
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে উদ্ধত হাত
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে সোজা প্রতিবাদ
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে সমাজ বদল
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে খাদ্য মিছিল
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে অপুষ্টি জনিত
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে জ্ঞানের খবর
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে নিষিদ্ধ পল্লী
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে বিবাহ বিলাস
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে বিবাহ বিচ্ছেদ
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে অবৈধ যৌনতা
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে আইন অমান্য
মেয়ে তুই ঘর ছেড়ে মুক্তি আন্দোলন

মেয়ে তুই যে-ই হোস, কী যে তোর নাম
ও মেয়ে তোমার নাম কাকলি দিলাম 

 

কলা কলকাতা

প্রথমে একটা পরের দিন দুটো তারপর তিনটে
এভাবে হাজার হাজার কলা কলকাতা ছেয়ে ফেলল

ফুটপাথের লোক কলা দেখছে
এক তলার লোক কলা দেখছে
তিন তলার লোক কলা দেখছে
টপ ফ্লোরের লোক কলা দেখছে

কলারা বাজারে যাচ্ছে
কলারা বর বউ নিয়ে ঘুরতে বেরোচ্ছে
বাসে ট্রামে ট্যাক্সিতে পাতাল রেলে এক্কা গাড়িতে
কলারা বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছে
কলারা উঁকি দিচ্ছে তোমার জানলায়

এইভাবে কলারা যখন কলকাতায় আধিপত্য নিয়েছে
বারবনিতারা রাস্তায় এসে দাঁড়ালো, তাদের মুখে কোনো রং নেই
কাঠের খঞ্জনী বাজিয়ে বাসের মধ্যে গান করে বেড়ানো ছেলেমেয়েগুলো তার পাশে
মাথায় যাদের ছাদ নেই তার পাশে
টপ ফ্লোর থেকে নেমে আসা এক্সিকিউটিভ তার পাশে

সমস্ত কলকাতা এভাবে হাত ধরাধরি করে ময়দানে নেমে এলো
ঠিক তখনই, কলারা সার বেঁধে চটপট ঢুকে পড়ছে মানুষগুলির ক্ষুধার্ত পেটের মধ্যে  

আগুন

হাতের মধ্যে তোমার হাত
জাগছে আঙুল অগ্নিপাত
পবিত্র সেই অগ্নিপাত 

আগুন মোড়া রাত্রিদিন
ঘোড়ায় জিন
আগুন সেঁকা সাঁঝ সকাল
ঝরছে কাল  

আগুন আমায় পুড়িয়ে ফেল
আগুন আমার, ভিজবি চল

কোদানকুলামের আম্মা

আম্মা তোর হাতে নেই কোনো ঝাণ্ডা
পুলিশ কিন্তু বাগিয়ে ধরেছে ডাণ্ডা
আম্মা তুই সারাদিন মাছ ধরেছিস
রাষ্ট্রের ফেউ শ্বাস প্রশ্বাস ডিসমিস
আম্মা তুই আমার জন্য চিন্তায়
র‍্যাফ ছুটে আসে নিরীহ জেলের প্রাণ যায়
আম্মা তুই প্রতিবেশিদের হাতে হাত
তেজস্ক্রিয়তা কেড়ে নেয় তোর সব রাত
নেতারা করেছে মানুষ মারার চুক্তি
তুই ভেবেছিস সন্তানদের মুক্তি
আম্মা তুই সাগরের জলে দাঁড়িয়ে
আমরাও আছি দিয়েছি দুহাত বাড়িয়ে
আম্মা তুই হয়তো জেলের গারদে
থার্মোমিটার উপচে উঠছে পারদে
আম্মা তোর বুক ফেটে যায়, যা বিষাদ
তোর জন্যই প্রথম কবিতা মা নিষাদ

অভিসার

কঙ্গুচিনা পেকেছে বলে আজ তুই নেচে উঠেছিস
ঘরে তোর শয্যা পাতা খাট, উঠোনে কাপাস
ফুল, তীর ছোঁড়া সারা, মাথায় পালকও
আমাকে নাচাবি তুই কামচণ্ডালী গীতে, বুদ্ধ নাটকেও 

অবোধ বালক তুই, ছলনায় জলকেলি, বস্ত্র বিসর্জন
তোর ডাকে ছেড়ে আনু আত্মীয় স্বজন
তোর বাঁশি তোর নৌকা ভূভার হরণ

দধি দুগ্ধ বেচে খাই না করি পরোয়া
শতেক মরণ ছেলে তোর চুম্বনেই  

খিদে

গগনে গরজে ঘনঘটা আঁচলে বাঁধা থাক শাকপাতা
চোখের নিচে থাক কাজল দাগ কাজলে বিস্মৃতি বছর পাঁচ
শাড়ির মাঝখান রান সেলাই চূর্ণ কুন্তল যাচ্ছেতাই
ঘোমটা টেনে রাখা অসম্ভব আসলে ছিন্ন শরম বোধ   

উনুন ভিজে যাক রাঁধব না
শরীর নিভে যাক সাধব না
ঠোঁটেরা উত্তল হলোই বা
খিদে ও আদরে সূক্ষ্মতা
খোঁজাই সার

সকলে গিয়েছে উৎসবে
মায়াবী আলোয় চঞ্চল সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল
বো ব্যারাক, পার্ক স্ট্রিট
যবে কাটিয়ে উঠেছে নোট-সংকট
যানজট তুচ্ছ বিষয়
সকলেই লালটুপি, সকলেই সান্তাক্লজ হবে

জনমজুর মুতাল্লিব মিঞা খিদে চেটে খায়
বিবি নাফিসা বেগম খিদে গিলে গিলে সূর্যের মতো হাসে
উৎসব লোকজন নেতা মন্ত্রী
দেশপ্রেম জাতীয় সঙ্গীত
আস্ত ভারতবর্ষ গিলে ফেলবে মেয়ে

বাতাস ওড়াবে তার অলৌকিক কেশভার, ছিন্ন আঁচল

Comments

comments

মৌসুমী বিলকিস

মৌসুমী বিলকিস

কবি, গল্পকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। জন্ম: ৭ আগস্ট, ১৯৭৭, মুর্শিদাবাদে # বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ইন্দো-ইতালীয় ফিল্ম স্কুল রূপকলা কেন্দ্র থেকে পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে। # প্রকাশিত বই: এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৮), একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যরা (গল্পগ্রন্থ, ২০১৮), হলদে শাড়িটি ও অন্যান্য অণুগল্প (অণুগল্প, ২০১৮) # পরিচালিত চলচ্চিত্র: কবি (তথ্যচিত্র, ২০০৪), সবুজের অভিযান (তথ্যচিত্র, ২০০৫), শবনম (ফিকশন, ২০০৪), মহারাণী কাশেশ্বরী কলেজ (তথ্যচিত্র, ২০০৫), আবাদ (ডকু-ফিকশন, ২০০৭), আইনী পরিষেবা (ডকুফিকশন, ২০১১), অসংগঠিত শ্রমিক (সমাজসচেতনামূলক বিজ্ঞাপনচিত্র, ২০১১) ইত্যাদি। # সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ সহ অনেক প্রোথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে। চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে প্রায়শ তার লেখা প্রকাশিত হয় কলকাতার বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি