পাপ । রুখসানা কাজল

মধুমতির ওপারে গঞ্জের হাট তখন জমে উঠেছে।

কাছে দূরের হাঁটুরেরা এসে গেছে অনেকেই। কাঁচা গির্জার পাশে দেখা যাচ্ছে সার সার বাঁধা  নৌকার সারি। সেখানেই নৌকা  ভেড়ায় ওরা।

গির্জার শক্ত খুঁটির হলুদ বেড়ার সাথে নৌকা বেঁধে কিছুক্ষণ উপুড় হয়ে বসে থাকে বদর আলি। উতল পাতাল করছে মন। কেমন যেনো ছিঁড়ে যাচ্ছে মনের সেলাইগুলো। ঝুলঝুল করছে রক্ত। একটা রাজা ফড়িং নোঙ্গরের দড়িতে বসেই আবার উড়ে যাচ্ছে কাঁচের মত পাখা বন্‌বন্‌ করে।  নধর তেলো শরীর। কি খায় ওরা ? ওদের কি মানুষের মত অভাব অনটন অসামর্থ্য বলে কিছু থাকে?  ওরা কি জানে অভাবে মানুষের স্বভাব বদলে যায়? রক্ত রক্তকে কেটে অস্বীকার করতে চায় দায় দায়িত্বের গুরুভার ?  

বদর আলির বুকের ভেতর থম ধরে থাকে নিঃশ্বাস।  অন্য কোনো দিকে তাকিয়ে দেখার সাহস পায় না সে। চোখ নামিয়ে এক ধ্যানে কেবল নদীর জল দেখে। ঘোলা জল। চলন্ত নৌকার বৈঠার  ঘায়ে জল তল  মাটি একাকার হয়ে ঘুলে উঠেছে। বদর আলি বোঝে বুকের কোথাও ব্যাথা হচ্ছে। ঘাই মারছে চিকন ধারালো ব্যাথা। আর জাগ দেওয়া কাঁচা পাটের গন্ধের মত ব্যাথাটা ওকে ঘিরে ফেলছে।        

ওদিকে ছোটভাই নজর আলি তখন নৌকা থেকে খুব যত্ন করে হাত ধরে ধীরে ধীরে নামিয়ে আনছে ওদের ছোটকাকা রহম আলিকে।    

টলমল পায়ে মাটিতে নেমে অবাক হয়ে যায় রহম আলি। গির্জার টিনের চালে উঁচু করে বাঁধা  কালো কাঠের ক্রুশ। একটা দাঁড়কাক শিকার ঠুকরে খাচ্ছে তাতে বসে।  অনবরত কাঁপতে থাকা মাথা সামান্য উঁচিয়ে রহম আলি ক্রুশ দেখে। তারপর খুশি খুশি মুখে কি যেন বলে ওঠে।   

বদর নজরের মনে পড়ে যায় ছোটকার বন্ধু, নারায়ণ ঢুলির কথা।

বছর আট আগে এই গির্জায় এসে খৃষ্টান হয়ে গেছে নারাণকা।  পেটে ভাত নাই, পরণে কাপড়     নাই। কচুঘেচু শাকপাতা খেয়ে বুড়ি মা আর দুটো ছোট ছেলে তখন মরে গেছে। বউ আর বাকি দুটো ছেলেমেয়ের মরমর অবস্থা। গ্রামে সবার ঘরে অভাব। কেউ কাউকে দুমুঠো খাবার দিতে পারছে না। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ যা পাচ্ছে তাই কাজবাজ খুঁজে নিচ্ছে । কেউ স্রেফ ভিক্ষে করছে। কেউ চুরিচামারি। আর সাহসি কেউ কেউ যিশুর চরণে আশ্রয় নিয়ে সেখানেই থেকে যাচ্ছে। ক্ষুধার উপরে আর কে আছে এই পৃথিবীতে !  

নারাণকা যেদিন খৃষ্টান হয়ে যাবে সেদিন সারারাত, সারাক্ষণ অবিরাম ঢোল বাজিয়ে যাচ্ছিল।  গ্রামের  লোকেরা ভেবেছিল, দুঃখ শোক অনাহারে মাথাটা গেছে তাদের বাজনাদারের।  কিন্তু  সকালে উঠে পাড়ার সবাই দেখেছিল, সেই ঢোল কুড়াল দিয়ে ফালি  ফালি করে ধুত্তুরি করে উঠোনে ছুঁড়ে ফেলে  চলে গেছে নারাণ।  দরোজার শিকল তোলা। তাতে তালা মারা। ক্রমে জানা গেলো, বউ আর বেঁচে থাকা  ছেলেমেয়ে দুটির হাত ধরে এখানে এই গঞ্জের গির্জায় এসে যিশুর শরণে আশ্রয় নিয়েছে বাজনাদার।       

মাঝখানে কয়েক বছর ভালই ছিল। জমি মায়ের মত ফসল ফলাচ্ছিল। আবার এই টানা তিন বছর বন্যায় ফসল তলাচ্ছে তো খরায় জমির ফসল জমিতেই ঝরে পড়ছে। মুরুব্বিদের অনেকেই বলছে, অলক্ষ্মীর আছর পড়েছে। কত ঘর যে আবার ভেসে যাবে অভাবে !  

আজকাল প্রায়ই গ্রামে আসে নারাণকা। অন্যরা ঘিরে ধরে, হ্যারে নারাণ সত্যি তুই ভাত খাস ?  তিনবেলাই ভাত খাস ? বউ ছেলেরাও ভাত খায় !  

বদরের বুক ভেঙ্গে আসে কান্নায়, আল্লা রে ও বেবদ আল্লাহ। তুই এত কৃপণ ক্যান রে ! এত   ছোট ক্যান তোর আত্মা ! দেওয়া থুয়া বলে কি কিছুই নাই তোর অন্তরে? নেয়ামতের এই বৃষ্টির লাহান যদি কয় বস্তা টাকাও দিতি রে আল্লা ! তালি কি এই পাপ করি আমরা! আমাদের যে জাহান্নামেও জায়গা হবে না রে আল্লা।

নারাণকা বুকে ক্রুশ এঁকে মা কালির দিব্যি কেটে বলে, যিশুর শপথ, ভাত খাই, সাদা সাদা ভাত।    মোটা চালের। অড়হরের ডাল, পাতের কোণে তোগের বউমা ডিমের ডেলাও দেয়। আবার মাঝে মধ্যে কুচো চিংড়ি, ট্যাংরা, পুঁটির ঝোলও খাই।   

ভাতের জন্যে ধর্ম ছাড়লি?  

নারায়ণকা মুখতোড় উত্তর দেয়, না ছাড়লি কি বাঁচতি বাঁচাতি পারতাম ? জানো না যেন কিছু। আর এই যে বাঁচতিছো এর বাঁচা কয় !           

তাই শুনে পুরুষরা অনাহারে চুপসানো পেটে হাত বুলোয়। আর মহিলারা শিউরে ওঠে অভিশাপ  দেয়, ছি ছি, ভাতের জন্যি নিজির ধর্ম ছাড়ি আবার বড় গলায় তা বলতিছে। অমানুষ যেনো কোহানকার। লোকটা পাপী, পাপী মহাপাপী বলতে বলতে তাদের গলা ভেঙ্গে আসে। আঁচলে চোখ  মুছে ভাবে, খিস্টানদের ন্যাতাকানি পরা, পেরেক গাড়া মরা যিশু কত বড়লোক ! কাছে গেলেই ভাতের তরকারীর  সুগন্ধ ভাসে। আর আমাগের!   

 বদর নজর দুভাই দুজনের দিকে তাকায়। তারপর রহম আলির দু হাত ধরে মাটির রাস্তা ধরে সাবধানে এগিয়ে যায় হাটের দিকে।

পাকা রাস্তার দুই ধারে বসেছে সাপ্তাহিক হাট। যাদের পয়সা আছে তারাও হিসেব করে বাজার করছে। পয়সা কমের গরীব মানুষরা চালডাল, আটা তেল নুনের দিকে তাকিয়ে বার বার হিসাব  কষছে। তাদের হাতের মুঠোয় গোনাগুনতি টাকা। অসংখ্য বার তারা হিসাব করে দেখছে, কত কম করে কিনলে বা কোন সদাইটা একেবারে বাদ দিলে, এই সপ্তাহটাও  চালিয়ে নেওয়া যাবে  কোনো না কোন ভাবে!         

পাইকারি হাটুরেরা অনেক সময় সস্তায় ছেড়ে দেয় দাম। সেখানে গিজগিজ করছে অভাবি  মানুষজন। তাদের ঠেলে সরিয়ে ওরা এগুতে থাকে। একটা অস্থায়ী বড় চাল ডালের দোকানে রহম আলিকে গুছিয়ে বসিয়ে দেয় দুভাই। আধা কেজি মুড়ি কিনে আনে বদর। নজর চাল ডালের দর দাম করতে করতে সব্জি বাজারের ভেতর পানে কোথায় যেন চলে যায়।      

রহম আলির কম্পিত হাতে মুড়ির ঠোঙাটা ধরিয়ে দিয়ে নজর আলির খোঁজে এদিক সেদিক  তাকায় বদর, ও কাকা, নজু গেলো কই কও তো দেখি ?         

রহম আলির কম্পিত মাথা আরো ঘনভাবে নড়ে ওঠে। কিছু বলতে হা করতেই মোটা হয়ে গড়িয়ে   পড়ে  মুখের লালা। কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও একদিক দেখিয়ে দিয়ে বিজবিজ করে কিছু বলে। বদর আলি, আচ্ছা আচ্ছা, আমি দেখতিছি বলে, অতি ব্যস্তসমস্ত ভাবে বেরিয়ে পড়ে ভিড়ের ভারে হারিয়ে যাওয়া ছোটভাই নজর আলির খোঁজ তল্লাশে।   

শ্রাবণের শেষ। আকাশ জুড়ে শ্লেট রঙ মেঘের বেহিসাবী দাপাদাপি। নদীর জল উঠেছে ফুলে  ফেঁপে। গঞ্জ ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে এসেছে ওরা। মাঝ নদীতে বইঠা থামিয়ে নজর আলি ডুকরে কেঁদে ওঠে, বড়ভাইজান আমরা পাপ করিছি। মহাপাপ করিছি। এখনো সময় আছে। চলেন কাকারে  ফিরায়ে আনি। অসুক্যে মানুষ। এই ঝড় জলের মধ্যি কাকা মনে কয় মরি যাবিনি। বাঁচতি পারবি নানে। ও  ভাইজান। চলেন ভাইজান। কাকারে ফিরায়ে আনি। বাড়ির কানা কুঞ্ছির কুহানে না হয় পড়ি থাকপেনে ভাঙ্গাচুরা লাঙ্গলের লাহান!             

বদর আলি বইঠা থামায়। নজরের পেছনে দূর নদীতে বৃষ্টি নেমে গেছে। কলস কলস বৃষ্টি ধেয়ে আসছে এদিকে। এবারেও বন্যা হবে। ভাঙ্গন দেখা গেছে শান্ত মধুমতিতে। ্রোজ ভেঙ্গে পড়ছে ওদের গ্রামের দিকের পাড়। চালের ঠোঙ্গাটা সাবধানে রেখে জোর করে রাগ দেখায় বদর, আর খাতি দিবানে কুহানথে বল শুনি?  

বৃষ্টিতে ভেসে যায় ওদের কথা।   

নৌকার দুদিকে দুভাই। হাতে বৈঠা। তবুও অচল। বসে থাকে তীর ঘেঁসে। অনর্গল বৃষ্টিতে নদীর  মত ওরাও ভিজতে থাকে। দূরে নদীপারের গ্রাম দেখা যাচ্ছে ধোঁয়াসে আভাসে। সেখানকার  আকাশে আর্ত আবেগে চড়চড় শব্দে ডেকে ওঠছে বিদ্যুত। ঝিলিক ঝিলিক ঝলক জ্জ্বালিয়ে রাগ   দেখাচ্ছে আকাশ। কোথাও ভেঙ্গে পড়ে মেঘ। গুড়গুড় গুড়ুম গুম।  ভাঙ্গা মেঘের ডাকের সাথে ভাঙ্গা গলায় কেঁদে ওঠে নজর আলি, কাকা রে ও সোনাকাকা। তোরে ইচ্ছে করি আমরা ফেলি আসিছি রে কাকা।            

বদর আলি কাঁদে না। ছোটকার জন্যে ওর বুকও পুড়ে যাচ্ছে মায়ায়। পাকা ধানের  গোঁড়ায় কিভাবে  কাচি ধরে ধান কাটতে হয়, কাদা ছেনে মাছ খুঁজে বের করতে হয়, গরুর অসুখে ঠিকঠাক ওষুধপথ্য দেওয়া সব তো এই কাকার কাছেই শেখা। কিন্তু কি যে অসুখে পড়ল কাকা। আর ভালো হয়ে ওঠল না। হাত পা মাথা কেবল কেঁপে কেঁপে ওঠে। কবিরাজ বলল খারাপ বাতাস লেগেছে। খ্রিষ্টান মিশনের ডাক্তার দেখে কি যেনো নার্ভ টার্ভের কথা বলে জানালো, দীর্ঘদিন  চিকিৎসা করতে হবে। সে চিকিৎসার মেলা খরচ। এদিকে টানা অভাব। অভাব যেনো এজন্মে আর  কাটবে না। সংসারের খাই মেটাতে বাপ মরা ওরা দুভাই যে আর পারে না।

কদিন ধরে ভেবে ভেবে ওরা এই পথই খুঁজে নিয়েছে। ঘরবাড়ি ফেলে রেখে ওরা চলে যাবে জেলা শহরে। রিকশা চালাবে। কিন্তু রিকশা চালিয়ে কি করে কাকাকে দেখে রাখবে ওরা ! গ্রামেই বা কে  দেখবে  কাকাকে ? বরং এই ভালো হলো। হাঁটের কেউ নিশ্চয় দয়া করে কাকারে তুলে দিয়ে আসবে খ্রিষ্টান মিশনারির হাসপাতালে ! কিন্তু এই বৃষ্টিটা !      

বদরের বুক ভেঙ্গে আসে কান্নায়, আল্লা রে ও বেবদ আল্লাহ। তুই এত কৃপণ ক্যান রে ! এত   ছোট ক্যান তোর আত্মা ! দেওয়া থুয়া বলে কি কিছুই নাই তোর অন্তরে? নেয়ামতের এই বৃষ্টির লাহান যদি কয় বস্তা টাকাও দিতি রে আল্লা ! তালি কি এই পাপ করি আমরা! আমাদের যে জাহান্নামেও জায়গা হবে না রে আল্লা।

কাকারে ও আমার ছোটকাকা। সোনাকাকা রে,  ইচ্ছে করি তোরে হাঁটে ফেলায় আসিছি রে কাকা।

Comments

comments

রুখসানা কাজল

রুখসানা কাজল

একটি বেসরকারি বিশবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, জন্ম: ২৩ নভেম্বর ঢাকায়। ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তনী। লিখেন কবিতা, গল্প। বই পড়া ও নিভৃতিই তার পছন্দ। উনার গল্পের বই গুলো হচ্ছে : ‘তোমার জন্যে মেয়ে’ ‘আহা জীবন’ ‘নুনফল গল্পগুলি’ ‘জলের অক্ষর’

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি