বিকৃত প্রতিবিম্ব । শামসুল কিবরিয়া

ব্যাপারটা তো এমনও হতে পারতো যে, আক্কাছ আলী তার বার্ধক্য-জর্জর শরীরটাতে গ্রামের আলো-বাতাস লাগিয়ে, যে গ্রামটা তার আজন্ম পরিচিত, সেখানে স্বজনদের সাথে, মাঝে মাঝে পরিচিত মানুষগুলোকে দেখে, তাদের সাথে সুখ-দুঃখের আলাপ করে বেশ সুখেশান্তিতেই দিন কাটাচ্ছেন।আহা! কতই না ভালো লাগে কল্পনায় এমন একটি চিত্র ফুটিয়ে তুলতে। একটি সংগ্রাম মুখর জীবন কাটিয়ে তেয়াত্তর বছর বয়সে উপনীত হয়ে মানুষের আর চাওয়া -পাওয়া কী থাকতে পারে? একটু আরামে আয়াসে বেঁচে থাকার দিনগুলো কাটিয়ে দেয়া – এই তো। কিন্তু আক্কাছ আলীর ক্ষেত্রে এরকম হয়নি। যৌবনে যেমন টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে, এখনো তাই করতে হচ্ছে।

অনেক আগে বিনামূল্যের চক্ষু শিবিরে চোখের চিকিৎসা নিয়ে চশমা লাগিয়ে ছিলেন। এরপর থেকে নিত্যদিনের সঙ্গী এই চশমার কাঁচদুটো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এসেছে। কিন্তু বদলানো আর হয়নি। এটি-ই তাই চোখে লাগিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন কলেজের গেটের পাশে। দাঁড়াতে ভালো না লাগলে বসে পড়েন হাতে থাকা থালাটা নিয়ে। এককালের পরিশ্রমী হাতদুটো কেঁপে কেঁপে এগিয়ে যায় কলেজের শিক্ষার্থী ও ফুটপাত ধরে হাঁটাচলা করা লোকজনের দিকে। এদের কারো হাত গলে বিভিন্ন দিকে চ্যাঁপা হয়ে যাওয়া থালাটিতে কখনো এসে পড়ে এক টাকা, দু টাকা বা পাঁচ টাকার কয়েন, কখনোবা নোট।

আক্কাছ আলীর সাথে একটি ঝোলাও থাকে। আবহমানকাল কাল ধরে এ অঞ্চলে ভিক্ষাবৃত্তির একটি মৌলিক দৃশ্য যেন – ঝোলা হাতে ভিক্ষুক। আক্কাছ আলী যেহেতু এখন ভিক্ষুক তাই তারও একটি ঝোলা আছে। হাতে থাকা থালার সাথে ঝোলার একটি সম্পর্কও স্থাপিত হয়ে আছে। খুবই নিবিড় এ সম্পর্ক। থালায় কয়েকটি কয়েন বা নোট জমলে চালান হয়ে যায় ঝোলার অন্ধকারে। থালাটা তখন পুনরায় শূন্যতায় হাহাকার করে উঠে। পথচারীদের সহানুভূতি জাগিয়ে তোলার এ এক কৌশলও বটে – এ শূন্যতা উপলব্ধি করে যদি কেউ টাকা দেয়।

এভাবে কলেজের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করতে করতে চারটি বছর কেটে গেছে। এ সময়খন্ডে অনেক ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছে এখানে, অনেকে পাস করে চলে গেছে, লক্ষ লক্ষ পথচারী যাতায়াত করেছে ফুটপাত দিয়ে।কিন্তু এ শরীর নিয়ে কিছু করা সম্ভব নয় বলে, অনোন্যপায় হয়ে থালা আর ঝোলা নিয়ে আক্কাছ আলী এখানে অবস্থান করেন দিনের আলোতে, কখনো সিটি কর্পোরেশনের লাগানো বাতির আলোতে, রাতে।

ছেলেদের আচরণে, পিতৃত্বের অধিকার লন্ডভন্ড হলে তার রাগ, ক্ষোভ, অভিমান হয় বটে, তা হওয়া-ই স্বাভাবিক, তবু তাদের অসহায় মুখগুলোর দিকে তাকালে করুণাও হয়। তারা যেন তারই যাপিত জীবনের ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে। তার নিজের যৌবনের দিনগুলোতে ছেলেরা যখন বড় হচ্ছে, পড়ালেখার সীমাবদ্ধতা ছিলো অনেক তখন। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তৃণমূলে যথেষ্ঠ জেগে না উঠায় গ্রামের কয়টা পরিবারই সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে ভাবতো?

যে গ্রামে তার শৈশব, তারুণ্য ও যৌবনের দিনগুলো কেটেছে, বার্ধক্যে উপনীত হয়েও যেখানে থেকেছেন,সেই গ্রাম থেকে পাঁচ বছর ধরে দূরে আছেন আক্কাছ আলী। মহাকালের হিসাবে এ হয়তো কিছুই নয়, কিন্তু একজন ব্যক্তির জন্য তা অনেক দীর্ঘ। যতদিন বেঁচে থাকবেন ব্যবধানের এ হিসাব আরো হয়তো লম্বা হবে। অথচ সেখানে তার নিজের একটি বাড়ি আছে। পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত এ বাড়িতেই আজন্ম থেকেছেন। যদিও বাড়িতে ভালো কোন ঘর ছিলোনা কোনসময়ে, জোড়াতালি দিয়ে ভাঙ্গা ঘরেই থেকেছেন, তবু তো ছিলো নিজের বাড়ি। নাড়ির বন্ধন জড়িয়ে থাকা এ বড়িতে তিনি না থাকলেও থাকছে তার ছেলেরা, ছেলে-বউরা, নাতি-নাতনিরা। তারা-ই তো থাকবে, তাদেরই থাকার কথা, বাহিরের কেউ এসে এখানে থাকার কথা নয়, তিনি মরে গেলে তো তার ছেলেরাই পেতো এ বাড়ি, তবু পরিবারের সবাইকে রেখে তিনি সরে পড়লেন এখান থেকে।বাড়িটা তার কাছে এখন অনেক অনেক দূরের।

বউ বেঁচে থাকতে সমস্যাগুলো এতোটা তীব্রভাবে অনুভূত হতোনা। ‘বুড়া-বুড়ির লাগি আমরার কম খাইতে অয়’ – এমন কথা প্রায়ই শুনলেও স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মনের কথাগুলো ভাগ করতে পারতেন একে অপরের সাথে। তিনি হয়তো বলতেন – ‘বেশিদিন বাইচ্যা এরার লাগি বুঝা অইছি’। তার স্ত্রী হয়তো বলতেন – ‘দোয়া করো আল্লা যেন তাড়াতাড়ি নেয়। ’তাইতো হলো, বউ ঠিকই চলে গেলেন তাকে একা রেখে, তাকে নিঃসঙ্গ করে দিয়ে। তিনি জীবিত থাকতে অনেককিছুর জন্য তার উপর নির্ভর করতে পারতেন। এই নির্ভরতা শুরু হয়েছিলো দাম্পত্যজীবনের প্রথম থেকেই। তবু বার্ধক্যে এসে যেন তা আরো বেশি করে উপলব্ধ হতো। কিন্তু তিনি মারা গেলে অবস্থা আর আগের মতো থাকেনা। ছেলেদের কিংবা তাদের বউদের কিছু বলতে ইচ্ছে হয়না – কেননা তার একান্ত কাজগুলো কেউ করতে পারবে না আর নিরুপায় হয়ে যতটুকু করাতে হয় তাদেরকে দিয়ে তা-ও মনকে খুশি করে তারা  করতে চায়না। এজন্য শক্তি-রহিত হলেও, নিজের কাজগুলো নিজেই করে ফেলেন – যতটা সম্ভব। একান্তই যদি না পারেন তখন মন না চাইলেও অন্যের সাহায্য নিতে হয়। বিশেষ করে খাবারের জন্য তাদেরই দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। আর এজন্য তীর্যক কথাবার্তাগুলোও তাকে সয়ে নিতে হয় মুখ বুঁজে। সহ্যাতীত হলে দু’ একবার মুখ খুলে দেখেছেন এর প্রতিক্রিয়া হয় তীব্র। ঔরসজাত ছেলেদের তখন মনে হয় অন্য কেউ। তারা যেন দয়া করে আশ্রয় দিয়েছে তাদের সংসারে। তাই আর মুখ খুলেননা । ফলে তার চারদিকে নেমে আসা নিঃসঙ্গতার দেয়াল দিনে দিনে গাঢ় হতে থাকে। নিজের কষ্টগুলো, অভিমানগুলো নিজেরই ভেতর গুমরে গুমরে মরে যায়।

ছেলেদের আচরণে, পিতৃত্বের অধিকার লন্ডভন্ড হলে তার রাগ, ক্ষোভ, অভিমান হয় বটে, তা হওয়া-ই স্বাভাবিক, তবু তাদের অসহায় মুখগুলোর দিকে তাকালে করুণাও হয়। তারা যেন তারই যাপিত জীবনের ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে। তার নিজের যৌবনের দিনগুলোতে ছেলেরা যখন বড় হচ্ছে, পড়ালেখার সীমাবদ্ধতা ছিলো অনেক তখন। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তৃণমূলে যথেষ্ঠ জেগে না উঠায় গ্রামের কয়টা পরিবারই সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে ভাবতো? বরং কিভাবে কাজে লাগানো যায় তা-ই থাকতো মাথায়। ফলে প্রাইমারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো অনেক কম। যারা ভর্তি হতো তাদেরও একটা বড় অংশ ঝরে যেতো উপরের ক্লাসে উঠতে উঠতে। আক্কাছ আলীও ব্যতিক্রম হতে পারেননি। তিনি যখন নিজের গ্রামে বা আশেপাশের গ্রামে ঘর ছাওয়া, মাটি কাটা, ধান কাটা সহ বিভিন্ন ধরণের কাজ করতেন তখন ছেলেদেরকেও নিতেন সহকারি হিসেবে বা অন্য কোন কাজে লাগিয়ে দিতেন; পড়াশোনা করার চেয়ে কাজ করলে যদি খাওয়ার ব্যবস্থা হয় তাহলে তো তাই ভালো। যদিও তার বয়স বাড়ার সাথে সাথে, ছেলেরা বড় হওয়ার সাথে সাথে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন হয়েছে, উন্ন্য়নের নানাবিধ নতুন ধারণা এসেছে জ্ঞানকান্ডের স্রোত বেয়ে, বাস্তবায়নও হয়েছে, জাতিসংঘ,বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বৈচিত্র্যে ভরপুর প্রেসক্রিপশন দিয়েছে, সে অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন সময়ের সরকার সেগুলো বাধ্যগত ভৃত্যের মতো মেনেছে তবু আক্কাছ আলীকে টেনেটুনে কোনরকমে সংসার চালাতে হয়েছে। স্কুলে না পাঠিয়ে ছেলেদেরকে নিতে হয়েছে কাজে। তাই তারাও আর যেতে পারেনি পরিচিত গন্ডির বাইরে। এই গন্ডির ভেতরে থেকেই একজন এখন রিকশা চালায়, একজন ধানকলে কাজ করে, একজন গ্রামের বাজারে রাতে চৌকিদারি করে। এসব করে যা আসে তা দিয়ে নিজের বউ বাচ্চাকে খাওয়াতেই নাভিশ্বাস উঠে।তার উপর পিতা – কর্মে অক্ষম হয়ে উঠায়, তার মাধ্যমে পরিবারে কিছু যোগ হয়না বলে, মেনে নেয়া কঠিন হলেও এটাই সত্য যে, যে মানুষটা তাদেরকে আদর স্নেহে বড় করেছে, তাকে এখন বুঝা বলেই মনে হয়।মনে হয় একজন অতিরিক্ত মানুষ, যে শুধু তাদের অন্নে ভাগ বসাচ্ছে।

গ্রামে অনেকেই বয়স্ক ভাতা পায়। একজন প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবে অন্যতম দাবিদার বলে ওয়ার্ড মেম্বারের পেছনে ঘুরেছেন তালিকায় তার নাম উঠানোর জন্য। মেম্বারের আশার বাণী শুনে শুনে অপেক্ষা করেছেন। নাম আসেনা বলে আবার গেছেন মেম্বারের কাছে। কতোবার কাতর হয়ে বলেছেন – ‘আমার দিকে একটু চাও মেম্বার সাব, আমারে একটু দয়া করো’ – কিন্তু কাজ হয়নি। এভাবে বারবার তার কাছে গিয়ে বরং ধমকও খেয়েছেন কয়েকবার। লোকমুখে শোনা যায় মেম্বারকে একটা পার্সেন্টেজ না দিলে নাম উঠেনা তালিকায়। নিজের অবস্থা থেকে, বিনয়ে নুয়ে যেতে যেতে সে চেষ্টা করেও কোন এক অদৃশ্য কারণে তার নাম আসেনা। বরং তিনি হতাশ চোখে দেখেন তার চেয়ে যার অবস্থা ভালো, এমনকি যার এ ভাতা পাওয়ার কথা নয় সে-ও তা পাচ্ছে। তিনি ভাবতেন এটা পেলেও তাকে অন্তত কিছুটা নিরাপত্তা দিতে পারতো। যদিও ভাতা বাবদ যা পাওয়া যায় তা বর্তমান বাজার মূল্যের তুলনায় খুবই নগণ্য। তবু নিত্য হাহাকার করতে থাকা ছেলেদের অভাবের সংসারে কিছুতো যোগ হতো। আর একারণে এখন যেভাবে অনেককিছু রাখঢাকহীনভাবে বলে ফেলে সবাই তখন হয়তো মুখে এভাবে কথা নিয়ে আসতে একটু বাধতো। সবচেয়ে বড় কথা তার নিজেকেই অনেক হালকা লাগতো। প্রায়ই যা বিভিন্নভাবে মনে হয় – তিনি একজন অযাচিত ব্যক্তি এখানে, তখন আর এরকম লাগতো না।

কিন্তু তা তো আর হলোনা।হয়কি আসলে সবকিছু চাওয়া মতো? জীবনের অভিজ্ঞতা তা বলেনা। ছেলেদের একজন কিছুদিন খাওয়ায় তারপর কিছু কথা শুনিয়ে ঠেলে দেয় অন্যজনের দিকে, সে কিছুদিন চালিয়ে আবার ঠেলে দেয় আরেকজনের দিকে।ঠেলাঠেলির ফাঁক গলে ঝরে পড়ে পিতার স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা আর ত্যাগ স্বীকার। সংসার গড়ে তোলার জন্য তার শ্রম হাওয়ায় উড়ে যায়। ফলে আক্কাছ আলী নিজেকে অনুভব করেন এখানে একজন নিঃস্ব ব্যক্তি হিসেবে যা তার একাকিত্বের বোধকে আরো তীব্র করে। আর এভাবেই রচিত হতে থাকে তার বাড়ি ছাড়ার পরিপ্রেক্ষিত। ঘর ছেড়ে, বাড়ি ছেড়ে, পরিচিত পরিপ্বার্শ ছেড়ে একদিন সকলের অজান্তে রওয়ানা দেন শহরের উদ্দেশ্যে, ভবিতব্য কি হবে না জেনেই। নিজের বিভাগীয় এ শহরে আগে দু’একবার আসলেও এবারের আসার পার্থক্য হলো যে, এবার আর তার ফিরে যাওয়ার তাড়া থাকবেনা।

শহরে পৌঁছে ট্রেন থেকে নামার পর আক্কাছ আলীকে অনিশ্চয়তার আতংক জাপটে ধরে। এই বয়সে বলতে গেলে সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গায় এসে এমনতো হওয়ারই কথা। এই বিশাল শহরে তার পরিচিত কেউ নেই। আর চেনাও নেই শহরের পথঘাট। তাই কি করবেন, কোনদিকে যাবেন ভেবে পাননা কিছুই। যদি অবলম্বন করার মতো কিছু পাওয়া যেতো তাহলে হয়তো এভাবে তাকে ভাবনার পাহাড় মাথায় জমাতে হতোনা। স্টেশনে বসে থাকেন অনেক সময়। কিন্তু বসে থাকলে তো চলবেনা। এক সময় বের হতেই হয়। স্টেশন থেকে বের হতে হতে হঠাৎ করে তার স্মৃতিতে ভেসে উঠে একবার এসে এ শহরের মাজার জেয়ারতের কথা। তার ভাবনাসমূহ এবার যেন একটা থৈ পেলো। কোনকিছু আর না ভেবে মনস্থির করলেন আপাতত সেখানেই যাবেন। কিভাবে যেতে হবে, একজনের কাছে জেনে নিয়ে হাঁটা শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির কথা মনে পড়ে,ট্রেনে আসতে আসতেও মনে পড়েছে বহুবার। যে দীর্ঘ জীবন সেখানে কাটিয়েছেন সেখানকার মায়া ভুলা তো সহজ নয়।মানুষের ভিড়ে ঢুকে,ধাক্কা খেয়ে, অজস্র গাড়ির হর্ণ শুনে এগুতে এগুতে তার মন আর্দ্র হয়ে উঠে। এই আর্দ্রতা কান্না হয়ে চোখ বেয়ে নামে।

মানত পূরণের আশায় কিংবা জেয়ারতের উদ্দেশ্যে এ মাজারে অনেক মানুষ আসে। ফলে বিভিন্ন ধরণের লোকের যাতায়াত এখানে সবসময় থাকে। মাজারে অর্থ কিংবা শিরনি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় গেটের অশেপাশের থাকা ভিখিরিদেরও দান করে অনেকে। আক্কাছ আলী দেখেন পা-হীন, হাত-হীন ভিখিরিদের সাথে তার মতো বয়স্ক মানুষও আছে। দুদিন মাজারে ঘুরেফিরে কাটিয়ে রুজির একটা অবলম্বন মনে করে মিশে যান ভিখিরিদের দলে। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ ছিলোনা কোনকালেই – রোদে পোড়ে বৃষ্টিতে ভিজে তা হওয়ারও কথাও নয়,আর এখন তো চেহারা আরো খটমটে,ঘন রুক্ষ, আরো করুণা উদ্রেককারী হয়েছে। পুরনো যে কয়টা পোশাক আছে সেগুলো আরো জীর্ণ হয়েছে।তাই ভিখিরির দলে মিশে গেলে তাকে আর বিসদৃশ লাগেনি।

তবে বিসদৃশ লাগে তার নিজের কাছেই। অতীতে যে দিনগুলো তিনি পার করে এসেছেন, এ দিনগুলোতে কখনো হয়তো তার মনে আসেনি, একদিন তার পরিশ্রমী হাতদুটোকে ভিক্ষা পাবার উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে দিতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে মানুষের করুণা পাবার। এই অনাকাঙ্খিত, অ-ভাবিত পরিস্থিতিতে এসে তাই তার সংকোচ লাগে। হাতদুটো সহজে এগুতে চায়না কারো দিকে, মুখ থেকে শব্দ বের হয়না কারো মনোযোগ পাবার আশায়। তাই কিছুদিন তার তেমন কিছু জোটেনা।

পরে দগদগে বাস্তবতার সামনে সংকোচ গলে যেতে থাকে। তবে এ সমস্যা কাটিয়ে উঠার পাশাপাশি দেখা দেয় আরেক সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে যারা এখানে ভিক্ষা করছে এই আগন্তুক বৃদ্ধকে দেখে তারা অসন্তোষ প্রকাশ করে। এরা মনে করে যে এখানে ভিক্ষা করার অধিকার কেবল তাদেরই। আর কারো এখানে আসা যাবেনা। তারা পরস্পরের সাথে এতো পরিচিত যে, নতুন কেউ আসলে ধরে ফেলতে পারে। আক্কাছ আলীকেও তারা নতুন হিসেবে চিনে ফেলে। নতুন এই ভিখিরিকে কেউ একটু উত্তপ্ত হয়ে বলে – ‘এই মিয়া বুইর‌্যা, কই থাইক্যা আইছো? আমরার ভাগ কমাইতে চাও, না?’ কারো পাশে বসলে বলে – ‘ভাগো , অন্যদিকে গিয়া বও। ’এভাবে বিভিন্ন ধরণের কথার বাণে জর্জরিত হন আক্কাছ আলী। কিন্তু এসবের প্রতিউত্তর দেয়ার মতো কোন কথা তার মুখে আসেনা – অনভ্যস্ততাও একটি ব্যাপার এতে – তাই চুপচাপ শুনে যান কেবল। কারো পাশেই শান্তিতে বসা হয়না তার। ফলে ঘন ঘন স্থান বদলাতে হয় তাকে।

এখানে যারা ভিক্ষা করে তাদের বেশির ভাগই এ এলাকাতেই থাকে। আক্কাছ আলীরও সার্বক্ষণিক থাকা হয় এখানে। কারণে অকারণে তাই কারো না কারো সাথে কথা হয়েই যায় । আর এতে করে ধীরে ধীরে তার সাথে অন্যদের দূরত্ব কমে আসতে থাকে । একই পথের সারথি হিসেবে তারা তাকে মেনে নিতে থাকে। ফলে তিনি একটু স্বস্তি পান। তার বার্ধক্য-পীড়িত শরীরটাও স্থিতি পায়।

এখানে ভিক্ষুকের সংখ্যা যেহেতু বেশি তাই ভিক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাও থাকে। বিশেষ করে পয়সাওয়ালা পার্টি দেখলে এ প্রতিযোগিতা আরো বেড়ে যায়। হুড়মুড় করে তারা এগিয়ে যায় এক অপরকে টপকানোর চেষ্টা নিয়ে। আর এতে করে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে। একজনের সাথে অন্যজনের কথা কাটাকাটি, গালাগালি কিছুসময় উত্তেজনা বিরাজ করে রাখে। কিছুক্ষন পর আবার এমনভাবে মিটে যায় যে তাদেরকে আলাপরত দেখলে মনে হবেনা একটু আগে তারা কোন বিবাদে জড়িয়েছিলো। এসব তাদের গা সহা হয়ে গেছে। আর যদি না-ই সয় তাহলে একজায়গায় থাকবেই বা কিভাবে?

সে আসলে নিজেও বুঝতে পারেনি আক্কাছ আলীর জন্য এতটুকু করতে পারবে। কতো ভিখিরিই তো আছে এ শহরে। কিন্তু এ মানুষটির জন্য কেন মায়া জন্মেছে এর কোন যুক্তিও তার কাছে নেই। কলেজের ভেতরে থাকার কথা যখন সে আক্কাছ আলীকে বলে তখন তার চোখ দিয়ে অশ্রু নামে।

আক্কাছ আলী এদের মতো করে ভিক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই সফল হতে পারেননা। একে তো শরীর দুর্বল, তার উপর আবার এ লাইনে নতুন। অন্যদের সাথে পেরে উঠা তার জন্য সত্যিই কঠিন। তাই দৌড়ানো বাদ দিয়ে একজায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকেন। বসে বসে যা পান তা দিয়েই চালিয়ে নেন। খরচ বলতে তো শুধু নিজের জন্যই। কোন পিছুটান যেহেতু নেই অযথা তাড়াহুড়া, মারামারি করার কী দরকার? পেট চালানোর মতো কয়টা টাকা জুটলেই হলো। এর বেশি প্রত্যাশা আর নেই।

জীবন সম্পর্কে এরকম ধারণা নিয়েই আক্কাছ আলী ভিক্ষাবৃত্তি চালিয়ে যান। ছেড়ে আসা গ্রাম মাঝে মাঝে তার কল্পনাকে তাড়িত করে; মন চলে যায় গ্রামের পরিচিত ভূগোলে, বাড়ির আঙ্গিনায়। কিন্তু সেখানে তো আর যাবেননা। অন্তত জীবিত থাকতে ওমুখো হবেননা। যেতে পারবেন কী আদৌ মৃত্যুর পরেও? তার পূর্বপুরুষদের পাশে শুতে পারবেন কী? মাঝে মাঝে তার মনে হয় মারা গেলে ছেলেরা তার মৃত্যু সংবাদ পাবে তো? এতোদিনে এখানে যাদের সাথে একটু ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, তার ঠিকানা জেনেছে তাদের কেউ কী ছেলেদের কাছে পৌঁছে দিবে তার মৃত্যু সংবাদ অথবা তার লাশটা পৌঁছে দিবে গ্রামের বাড়িতে? এভাবে অনেক কিছু তার মাথায় আসে। আর ভাবতে ভাবতে তিনি বিপন্ন বোধ করেন। এই বোধ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখলে তিনি নিজেকে দেখতে পান এক অসীম শূন্যতার গহ্বরে। ফলে অস্বস্তি লাগে। এই অস্বস্তি দীর্ঘ হতে থাকলে  এ থেকে মুক্তি পেতে ছটফটানি লাগে। তখন ফিরে আসার চেষ্টা করেন যে বাস্তবতায় অবস্থান করছেন সেখানে। ভাবেন জীবন থাকলে তো চিন্তা থাকবেই। মরে গেলে সবকিছুরই সমাপ্তি ঘটে যাবে।

প্রতিদিন ভিক্ষা করে যা পান তা দিয়ে আক্কাছ আলী মাজারের পাশের সস্তা হোটেলগুলোতে খেয়ে নিতে পারেন। আর যেখানে রাত হয়, শুয়ে পড়েন সেখানেই। সেটা হয় রাস্তার পাশে, নতুবা জায়গা পেলে মাজারের বাহিরের আঙ্গিনায় কিংবা কোন দোকানের পাশে। বাড়িতে থাকতে তো অন্তত এই সমস্যা ছিলোনা। নিজের চৌকিটাতে শুতে পারতেন। কিন্তু এখন তাকে এভাবেই রাত কাটাতে হয়। অনভ্যস্ততার কারণে এর প্রভাব পড়ে শরীরের উপর। হঠাৎ করে প্রতিকূল অবস্থা বৃদ্ধ শরীরটা সইবেই বা কেমন করে?

বছরখানেক এভাবে কেটে গেলে মানুষের ভিড় তার কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে মাজারে। ফলে সর্বদা এ জায়গাটা সরগরম থাকে। আর ভিক্ষুকদের চেঁচামেচি, ঝগড়াঝাটি, তাকে খুব জা¡লা দিচ্ছে এখন। যেচে ঝগড়া করতে না চাইলেও তার সাথে লেগে যায় অনেকে। যদিও মিটমাট হয়ে যায় পরে, তবু যেহেতু জীবনের কোন পর্যায়েই এ অবস্থা মোকাবিলা করেননি, তাই একসময় বিরক্তি চরম পর্যায়ে উঠে গেলে, ইতোমধ্যে যে ঝোলা ও থালা জুটিয়েছেন তা নিয়ে বেরিয়ে আসেন মাজার থেকে।

পথ চলতে চলতে এক কলেজের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েন। একদিন ভিক্ষা করে দেখলেন মাজারের মতো অবস্থা এখানে নেই। এখানে কারো সাথে ধাক্কাধাক্কি করতে হয়না, ঝগড়া করতে হয়না। শান্তিতে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করা যায়। তাই তিনি এখন যে রকম চান – একটু নির্ঝঞ্ঝাট সময় কাটানো, এ জায়গায় তা পেয়ে গেলে ভালো লেগে যায়। কয়েকদিন এখানে ভিক্ষা করে আর কোনদিকে যাবেননা বলেই সিদ্ধান্ত নিলেন।

দিনে যেখানে ভিক্ষা করেন রাতে সেখানেই সাথে থাকা বস্তা বিছিয়ে চাদর গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়েন। মাজারে খোলা জায়গায় ঘুমাতে ঘুমাতে অভ্যস্ততা তো এসেই গেছে। নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন এ অবস্থার সাথে। এভাবে অনেকদিন কেটে গেলে একদিন কলেজের নাইটগার্ড এসে তার সাথে কথা বলে। বৃদ্ধ মানুষটিকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে হয়তো তার মনে করুণার উদ্রেক হয়।তার কাছে বসে বলে – ‘ও চাচা, ইভাবে যে ঘুমাও কষ্ট অয়না?’ আক্কাছ আলীর মন এ কথা শুনেই যেন আর্দ্র হয়ে উঠে। একবছরের উপরে শহরবাসের সময়কালে কেউ এতো আন্তরিক হয়ে কথা বলেছে বলে তার মনে পড়েনা। শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে বলেন – ‘কষ্ট তো অয়।কিন্তু আমার যে এছাড়া আর উপায় নাই।’

– তুমার আর কেউ নাই?

আক্কাছ আলীর কথা এবার আটকে যায়। কি বলবেন তিনি? থেকেও যে তার কেউ নাই। কিছু সময় চুপ করে থেকে তাই   গার্ডকে বলেন – ‘বাদ দেও ইসব কথা।’

গার্ড এ কথা শুনে হয়তো তার নিজের মতো করে কিছু ভেবে নেয়। কত জিনিসই ঘটে এ জগতে। সবকিছু তো আর জানা যায়না। তাই এদিকে আর কথা না বাড়িয়ে অন্য কিছু বলে। এরপর থেকে আক্কাছ আলীর সাথে প্রায়ই সন্ধ্যার পরে তার কথা হয়। এভাবে সম্পর্ক কিছু ঘনিষ্ঠ হলে একদিন আদৌ পারবে কিনা এ সন্দেহ নিয়েই গার্ড বলে – ‘দেখি তুমারে কলেজের ভিতরে ঘুমাইবার কোন ব্যবস্থা কইর‌্যা দিতে পারিনি।’

গার্ড সত্যিই একদিন একটা ব্যবস্থা করে ফেলে। কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে কলেজের পুরনো  ভবনের বারান্দার একমাথায় থাকার অনুমতি নিয়ে আসে। সে আসলে নিজেও বুঝতে পারেনি আক্কাছ আলীর জন্য এতটুকু করতে পারবে। কতো ভিখিরিই তো আছে এ শহরে। কিন্তু এ মানুষটির জন্য কেন মায়া জন্মেছে এর কোন যুক্তিও তার কাছে নেই। কলেজের ভেতরে থাকার কথা যখন সে আক্কাছ আলীকে বলে তখন তার চোখ দিয়ে অশ্রু নামে। এই অনাত্মীয় মানুষটির জন্য দু’হাত তুলে দোয়া করেন তিনি। গার্ড তাকে ভিতরে নিয়ে শোয়ার জায়গা দেখিয়ে দেয়। এরপর থেকে তাকে আর বাহিরে শুতে হয়নি। সেই ধারাবাহিকতা এখনও চলছে।

এভাবেই তার দিন কাটতে থাকে। বিবর্ণ মূহুর্তগুলো সামনে হেঁটে যায় তার বয়সকে আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে। বয়স যেহেতু বাড়ে শরীরও তাই দুর্বল হতে থাকে। এই শরীরটাকে কিভাবে টিকিয়ে রাখা যায় এটাই তার মাথায় থাকে সবসময় – সচেতনে হোক কিংবা অবচেতনেই হোক। ক্রমবর্ধমান বড় বড় দালান, শপিং মল, রেস্তোঁরা, রাস্তাঘাট, গাড়ির বহর, এসব পত্রিকায় ছাপা হলে কিংবা টেলিভিশনের টকশোতে আলোচিত হলেও তার মাথায় এ বিষয়ক কোন চিন্তাই আসেনা। তার সাথে এসবের কোন সম্পৃক্ততা কোনকালে ছিলোনা, এখনও নেই। হয়তো তাই এসব তাকে কোনভাবে আলোড়িত করেনা। রাতে যেখানে ঘুমাতে আসেন সেখানে কলেজের লাইট এবং স্ট্রিট লাইটের কিছু আলো ছিটকে এসে পড়ে। বিছানা ঠিক করে শ্রান্ত শরীরটাকে যখন মশারির নিচে এলিয়ে দেন তখন তার আপাদমস্তক আলো-আঁধারির নিচে চাপা পড়ে যায়।

Comments

comments

শামসুল কিবরিয়া

শামসুল কিবরিয়া

জন্ম : ০৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫, হবিগঞ্জ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মান সহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সদস্য হিসেবে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় প্রভাষক পদে কর্মরত। লেখালেখি : ছোটগল্প ও সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ। বিভিন্ন লিটলম্যাগ ও সাহিত্য পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে। skibriyass@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি