প্রমথেশ প্রমিথিউস । অদিতি ফাল্গুনী

খুলনা শহর ছাড়িয়ে বেশ কয়েক মাইল পথ বাসে করে ফেরিতে রূপসা নদী পার হয়ে মংলা পর্যন্ত গেলেই দেখবে বন্দরের কাছে এসে পশুর আর মংলা নদীর মিলিত স্রোত কেমন অদ্ভুত টান নেয়। এখন অবশ্য আগের মত অত বেশি জাহাজ আসে না। নদীর স্রোত থিতিয়ে গ্যাছে অনেকটাই। আগে ত’ দিনমান জাহাজ আর মাল বোঝাই ইয়া বড় বড় কার্গো আসার কোন বিরতি ছিল না। মংলা বন্দরের একটা দিক থেকে সামনে এগোলে সুন্দরবন। বন থেকে অবিরাম গড়িয়ে আসছে সুন্দরী গাছের ফল। ফলের রঙে নদীর রং লাল। আর এক দিকে এই বানীশান্তা। বেশ্যাদের পাড়া। এখানেই স্বাধীনতার বছরের পরের বছর প্রথম এসেছিল ফুলমতী কর্মকার। রাজাকার আর খানেদের গুলিতে বাবা-মা-দুই দাদাকে হারিয়ে আর খানেদের বাঙ্কারে কয়েক মাস কাটিয়ে এসে পৌষ মাসে জ্যাঠা-কাকাদের ভিটেয় মুখ দেখালে তাকে কে আর ঘরে তুলে নেয়? গ্রামে গ্রামে তখন মেয়েরা ইজ্জত হারিয়েছে। গর্ভ হয়েছে অনেকের। ফুলমতী কর্মকারের গর্ভ খসালো হরেণ কবিরাজ। সে শিশু জন্ম নিলে পাঞ্জাবিদের চেহারা নিয়ে জন্মাতো হয়তো। গর্ভ খসিয়ে, হাত-পা ঝাড়া তারা কয়েকজন – কামার পাড়ারই জয়া, বিন্দু, শাশ্বতী, আরতি, ননীবালা আবার ডানে মেঞা পাড়ার কয়েকজন সালমা, সখিনা, রোজিনা – সব মিলিয়ে আট/দশ জন একেবারে এসে আশ্রয় নিল বানীশান্তায়। খানের বাঙ্কারে কয়েক মাস কাটানো, পেট খসানো মেয়েদের কে আর ঘরে রাখে?

সে সময় ছিল বটে। বানীশান্তার তখন রমরমা। কত জাহাজ যে আসে আর কত যে নাবিক! নানা দেশের নানা নাবিক। বৃটিশ , জাপানী, কোরিয়ান, জার্মান, গ্রিক- কয়ে শেষ করা যাবে না। নদীর স্রোত তখন সাগরের মত অথৈ। তাই জাহাজ আসত অগুন্তি। নাবিক আসত অগুন্তি। আর এই বানীশান্তার ঘরে ঘরে তখন পয়সা। প্রতিটি মাটির ঘরের মেয়েদের কুঠুরিতে সোনার গহনা আর টাকার শেষ ছিল না। সেই টাকায় জয়া ঘরে না নেয়া বড় দাদার পুরো পরিবারকে ভারতে পাঠানোর খরচ টেনেছিল,  বিন্দু তার ছোট বোনের বিয়েতে কয়েক লাখ টাকা খরচ দেয়, শাশ্বতী ভাইয়ের ছেলেকে ডাক্তার বানানো পর্যন্ত পড়ার খরচ টানে, সালমা তার দুই ভাইকে চাকরি নিয়ে দুবাই যাবার জন্য প্লেনের টিকিটের টাকা দিয়েছিল। মেয়েগুলো সব কই? সবাই এই ফুলমতী কর্মকার….কামারের মেয়েটাকে একা রেখে কোথায় চলে গ্যালো? সত্যি বলতে এই বানীশান্তাতেই প্রথম ইংরেজি শেখে ফুলমতী। পড়া ত’ ঐ দাকোপের এক গ্রামে ছয় ক্লাস পর্যন্ত। অগ্রহায়ণে বিয়ে ঠিক হয়েছিল ষোল বছরের ফুলমতীর। আষাঢ়েই রাজাকাররা পাঞ্জাবি সৈন্যদের পথ দেখিয়ে চিনিয়ে এনেছিল তাদের গ্রামে। আষাঢ় থেকে পৌষ মাস কেটেছে খানেদের বাঙ্কারে । এই মাস ছয়েকের ভেতরেই আষাঢ় মাস অবধি জীবনে কোন পুরুষের স্পর্শ না জানা ফুলমতীকে পৌষ নাগাদ পাঞ্জাবি আর্মি আর রাজাকার মিলিয়ে ডজন খানেক পুরুষের সাথে থাকতে হয়েছে। শেষের আড়াই মাস তাকে এক পাঞ্জাবি অফিসার একাই দখল করে রেখেছিল। পরে বাঙ্কার থেকে মুক্তি বাহিনী আর ইণ্ডিয়ান আর্মি যেদিন তাদের উদ্ধার করে, সেদিনই তাদের উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে মুক্তি বাহিনী, ইণ্ডিয়ান আর্মি আর খানেদের পাল্টাপাল্টি গুলিতে মরেছিল সে পাঞ্জাবি অফিসার। প্রথম বাচ্চাটা কি তারই ছিল?

সন্ধ্যা বেলায় শীলা মাসি এসেছিল। খর চোখে দেখেছিল ফুলমতীর বমি। খোদেজা খালার পর শীলা মাসী ছিল এই পাড়ার দ্বিতীয় সর্দ্দারনী। ইংরেজি শীলা মাসী বেশ জানতো! বছর পঞ্চাশের মত বয়সী আর লম্বা, শুকনো ইংরেজ নাবিকের দিকে তাকিয়ে শীলা মাসী বলে- শি ইজ সিক। শি ইজ প্রেগন্যান্ট।

  

গর্ভপাতের সময় চার মাস পার হয়ে গেছিল ফুলমতীর। তাই শরীরটা ভারি দূর্বল ছিল। বানীশান্তায় যেদিন প্রথম পা রেখেছিল, তখন এ পাড়ার মূল সর্দ্দারনী ছিল খোদেজা খালা। এই শক্ত এই নরম মানুষটা। কেন জানি তার মায়া হয়েছিল এই সদ্য গর্ভপাত করা মেয়েগুলোর উপর। পাড়ায় পা রাখার সাথে সাথেই তাই খদ্দের নিতে জোর করে নি। নরম গলায় বলেছিল, কয়েকটা দিন খেইয়ে-ঘুমিয়ে পরে কাজ শুরু করলি হবি নে!

 মাস খানেক পর শরীরটা শুকিয়ে এলে এক সন্ধ্যায় খোদেজা খালা ফুলমতীকে ডেকে পাঠালো তার ঘরে। সার সার মাটির ঘরের কয়েকটির একটিতে সে তখন জয়া, বিন্দু আর শাশ্বতীর সাথে থাকত । খোদেজা খালার ঘরে ছোট চোখ, হলদে ফর্সা আর খাড়া খাড়া চুলের একটি ছেলে  বসা। নীল জিন্সের প্যান্ট আর সাদা-কালো স্ট্রাইপ দেয়া টি শার্ট পরা।

– শি ইজ নিউ গার্ল। ভেরি গুড। ফুলমতি নেম।
খোদেজা খালা ছোট চোখ আর হলদে ফর্সা লোকটির সামনে রাখা একটি গ্লাসে মদ ঢালতে থাকে।
– কি দেখিছিস ফুলমতী? প্রথম দিনিই জাপানী বাবু…বিদিশি কাস্টোমার ধরায়ে দিতিছি…মানটা রাখিস আমার।

বানীশান্তায় সেই তার প্রথম খদ্দের। প্রথম বাবু। নাম ছিল তাকুমি। তাকুমির সাথে কথা বলতে বলতে প্রথম ইংরেজি শেখা শুরু হয় ফুলমতীর। ফুলমতীর তখন বয়স যদি হয় সতেরো তবে তাকুমির বছর পঁচিশ । মাস দুই  ছিল তাকুমি মংলা পোর্টে। প্রায় প্রতি রাতেই আসতো। আসতো যেন বিয়ে করা বউয়ের কাছে স্বামী আসছে এমন ভাবে। সেই দুই মাস এই পাড়ার অন্য কোন মেয়ের কাছে আসে নি। মাঝে মাঝে অবশ্য ফুলমতীকে যেতে হত পোর্টে। তাকুমির জাহাজের কেবিনে। কখনো আবার তাকুমি তাকে নিয়ে গেছে খুলনা শহরে বেড়াতে। সেখানে সিনেমা হলে ইংরেজি সিনেমা দেখেছে তারা একসাথে। রেস্টুরেন্টে খেয়েছে। খুলনা শহরের কোন কোন দামি হোটেলে একসাথে থেকেছে তারা। সেই দুই মাস অন্য কাস্টোমার নিতে হয় নি ফুলমতীর। সেই তাকুমি চলে যাবার ঠিক আগের দিন একটি লম্বা, ঝুল জামা পরা আর টেনে চুল বাধা মেয়ের ছবি দেখিয়ে বললো- আই উইল গো হোম। আই উইল ম্যারি হার।

মুখে হাসি টেনে বলেছিল ফুলমতী, হার নেম?
ততদিনে এটুকু ইংরেজি শিখেছিল ফুলমতী।
– আইকো।
আইকো একটি ফুলবাগানে বসা। তার মাথার উপর ঝরে পড়ছে সাদা সাদা নাম না জানা ফুল।
– শি ইজ বিউটিফুল।
অনেকটা ইংরেজি চটজলদি শিখে নিয়েছিল ফুলমতী।

একথার উত্তরে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তাকুমি তাকে শেষবারের মত কাছে টেনে নেয়। ফুলমতীর শরীরে বাঙ্কারে থাকার ছয় মাসের অনেক দাগ… প্রথম বার বাঙ্কার থেকে পালাতে চেষ্টা করার সময় পায়ে লাগা একটা গুলির দাগ, বুকে-উরুতে-তলপেটে দগদগে সব ঘায়ের শুকিয়ে আসা দাগে খানিকটা মমতা ভরেই হাত বুলিয়ে দিত তাকুমি। চুমু খেত সেই সব দাগে। তাই বোধ করি তাকুমি দেশে চলে যাবে শুনে …সতেরো বছরের মেয়ে তখনো ফুলমতী…বাঙ্কারের ছয় মাসের নরক ভোগের অভিজ্ঞতা হয়েছে তবু তখনো স্বপ্ন তাকে ছেড়ে যায় নি…তাকুমির সাথে  তার কখনো কখনো, কোন কোন দুর্বল মূহুর্তে এক বিশ্বস্ত স্বামীর আদুরে বউ বলে নিজেকে মনে হতো। সেই দুই মাস সে মদ তেমন খায় নি যেমনটা খাবার অভ্যাস হয়ে গেছিল পাঞ্জাবিদের সাথে থাকার সময়।  পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন প্রতি রাতে তার সাথে শোবার আগে মদ গিলে নিত অনেকটা। ক্যাপ্টেনের সাথে ফুলমতীকে খেতে হত বৈকি!

–টেক দিস।
– হোয়াট?
তাকুমি বিব্রত হাসে। তার হাতে হাজার দশেক টাকার তোড়া। সেই বাহাত্তর সালে!
– নো নিড। ইউ গো!
সহসাই গর্জে উঠেছিল ফুলমতী। অভিনয় করে যে হাসিটা সে চেপে ধরে রেখেছিল সেটা আর রাখা যাচ্ছিল না। চোখ ফেটে জল গড়াচ্ছিল।
– গো! ইউ গো!
উন্মত্তের মত সব্জি কাটার বটি নিয়ে সে ধেয়ে যায় তাকুমির দিকে। তাকুমি দরজা খুলে বের হলে পাড়ার বয়সীনীরা এগিয়ে এসেছিল।

– হায় আল্লা- যে মিয়্যেকে তুমি ঘর দিলে না, সংসার  দিলে না, তার মনে মহব্বত দিলে ক্যানো? পিরিতি দিলে ক্যানো?খোদেজা খালা এগিয়ে এসে ফুলমতীর মাথায় হাত রেখেছিল- এই বোকামি  করিস নে! দশটা হাজার টাকা- নিয়ি নে! এই জাপানী তোর বর নয়কো- খদ্দের। খদ্দের লক্ষী। তার সাথে রাগ করতি নেই- টাকাটা নিয়ি নে!

বাংলা  বুঝুক না বুঝুক কি ভেবে যেন তাকুমি খোদেজা খালার হাতে টাকার তোড়াটা দিয়ে দেয়। তারপর একবার ফুলমতীর দিকে তাকিয়ে আর খানিকটা ফ্যাকাশে হেসে চলে যায়। খোদেজা খালা দশ হাজার টাকা থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষকে ট্যাক্স দেবে বলে হাজার দুই আর নিজের জন্য হাজার তিন রেখে বাকিটা ফুলমতীকে দিয়ে দেয়। সে সময়টা ভারি অস্থির কাটতো। বাংকারে যুদ্ধের বছরের ছয় মাসে যত না কষ্ট হয়েছে তার চেয়ে বেশি মন খারাপ হয়েছিল তাকুমি চলে যাবার পর। প্রায় রাতেই সে স্বপ্ন দেখতো সাদা সাদা নাম না জানা ঝরে পড়া ফুলের বাগানে তাকুমি আর সেই লম্বা ঝুলের জামা,  টেনে চুল বাধা ছোট চোখের মেয়েটি মুখোমুখি বসে গল্প করছে! দিনে-রাতে মদ খাবার পরিমাণ বেড়ে গেল তার। দু’বার নিজের ডান হাতে নিজেই ছুরি দিয়ে কাটলো ফুলমতী। খোদেজা খালা কঠোর হলো।

– বলি আমি ত’ সে জাপানী নাবিকের কোন দোষ দেখতিচি না। দশটা হাজার টাকা সে তোমায় দিয়ি গেলো। আমার ত’ মনে হয় তার মনে ভাল মায়াই হয়িচিল তোর জন্যি। এখন তোকে যুদ্ধের ছ’মাস খানেদের বাংকারে ডজন ডজন পুরুষ নাড়িচে। তোর কিছু আছে বাকি? থাকলি এ পাড়ায় আসতি? যাকে নিজির কাকা-জ্যাঠারা নেয় না, নিজির স্বজাত-স্বজন নেয় না,  তাকে এক বিদিশি পুরুষ নিবি কেন? বিদিশি পুরুষ কি তোকে বউ করবি? ক্যানো করবি? তার কি জাত নেই? সমাজ নেই? গত পনেরো দিন তুই একটা কাস্টোমার ঘরে নিস নি- আমি কিছু বলি নি- আজ সন্ধ্যায় আবার কিছু ফরেন জাহাজ আসতিচে।   ফরেনার নাবিকিরা আসতিচে। আজ তোর কোন কতা শুনবো নাকো বলি রাখলাম!

সেই সন্ধ্যাতেই নিজের ভেতর দ্বিতীয় বার প্রাণের স্পন্দন টের পায় ফুলমতী। মলা মাছ আর বেগুনের লাল টকটকে মরিচ ঝোল দিয়ে ভাত মাখিয়ে খেতে গিয়ে বমি আসে তার। আর সেই সন্ধ্যাতেই দ্বিতীয় বিদেশী নাবিক স্টিভ- জাতে ইংরেজ – আসে তার ঘরে।

– খালা, আমার বমি হতিচে। আমি কাস্টোমার নেব না।

সন্ধ্যা বেলায় শীলা মাসি এসেছিল। খর চোখে দেখেছিল ফুলমতীর বমি। খোদেজা খালার পর শীলা মাসী ছিল এই পাড়ার দ্বিতীয় সর্দ্দারনী। ইংরেজি শীলা মাসী বেশ জানতো! বছর পঞ্চাশের মত বয়সী আর লম্বা, শুকনো ইংরেজ নাবিকের দিকে তাকিয়ে শীলা মাসী বলে- শি ইজ সিক। শি ইজ প্রেগন্যান্ট।

– দ্যাট ইজ নো প্রব্লেম। আই উইল গিভ হার মোর মানি।
– শালার খবিশ- বিটা মানুষ- কারো গর্ভবতী নারী হলে বেশি ভাল- কারো মেয়েমানুষের শরীর খারাপের সময়টা হলে বেশি ভাল

বছর পঞ্চাশের নাবিক স্টিভকে কোন মতেই পাড়ার অন্য কোন মেয়ের সাথে রাজি করানো গেলো না। তার ফুলমতীকেই চাই। স্টিভ থাকলো মাস তিনেক। তবে রোজ আসত না। দারুণ হিসাব ছিল তার। আসতো সে প্রতি শনিবার সন্ধ্যায়। তখনো এদেশে শুক্রবার ছুটির দিন না। রবিবার ছুটি থাকতো। রবিবার খুব ভোরেই স্টিভ চলে যেত। রবিবার ভোর রাতেই স্টিভ ছুটে যাবে পোর্টে- সেখানে গা ঘষে ঘষে, খুব ভাল ভাবে স্নান করে সে ছুটবে খুলনা শহরের চার্চে। প্রেয়ারে। মাঝে মাঝে মানি ব্যাগ খুলে বউ আর দুই ছেলে-মেয়ের ছবি দেখাতো সে। তার স্ত্রীর ক্যান্সার ধরা পড়েছে। অনেক খরচ এই রোগ সারাতে। তাই সে এত দূর দূর দেশে কাজ করে। স্ত্রীর সাথে বিয়ের সময়ের ছবিতে ঝলমলে লম্বা চুলের হাল্কা-পাতলা এক মেমসাহেব আর অসুস্থ, ন্যাড়া মাথা গোলগাল বয়সী নারীর সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই চেহারা। স্ত্রীর জন্যই, ছেলে-মেয়েদের মায়ের ভালর জন্য প্রার্থনা করতেই সে চার্চে যায়। তবে কিনা সে পুরুষ মানুষ।  এত দূর দূর দেশে এত দিন ধরে একা থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে তার শরীরে আর পারে না! ছেলে-মেয়েদের মা’কে সে অবশ্য এত কিছু জানায় না! এই যে বউকে লুকিয়ে সে এমন মেয়েদের কাছে আসে, এই পাপ মোচনে প্রতি রবিবারই ফাদারকে সে কনফেস করে। ঈশ্বর নিশ্চয় তার পাপ ক্ষমা করবেন। তার দুই ছেলে-মেয়েই এখন বড় হয়েছে। ষোল আর পনেরো বছর বয়স তাদের। কলেজে পড়ে। মা’কে তারাই দেখা-শোনা করে।  অল্প-স্বল্প বাংলা  বলতে পারে বৈকি স্টিভ। না, স্টিভের মুখে আর তার বউ-বাচ্চার গল্প শুনে বা ছবি দেখে তত ঈর্ষা হত না ফুলমতীর। তাই বলে একেবারেই কি হত না? না হোক তিন মাসের প্রতি সপ্তাহে এক দিন করে মোট বারোটা দিন এই নাবিকটার সাথে ছিল সে। মিলনের কোন কোন মূহুর্তে…নারী সে…মনে কি হয় নি এই লোকটি অন্তত: তার হোক? হোক বয়সী…মুখে হাল্কা এক/দু’টো সাদা দাড়ির এই বয়সী লোকটা সম্পূর্ণত: তার হোক? পরক্ষণেই মন শক্ত করেছে। সে বেশ্যা। তার আর কেউ হবে না। পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন না, জাপানী তাকুমি না, এই মাঝ বয়সী ইংরেজ না। তাকুমি…আহ্ তাকুমি! এক অদ্ভুত উদাসীনতায় তাকুমির সন্তানকে নিজে থেকে নষ্ট করলো না ফুলমতী। স্টিভ তাকে সাধারণ সময়ের দ্বিগুণ টাকা দিয়ে রয়ে গেলো তিন মাস। এই তিন মাসের প্রতি মাসের প্রতিটা সপ্তাহের এক দিনেই সে এত টাকা দিত  যে তার অন্য কোন খদ্দের নিতে হয় নি। শেষের দিকটায় বয়সে অনেক ছোট ফুলমতীকে কেমন স্নেহ করতো কি স্টিভ? মাঝে মাঝে এটা-সেটা ভাল খাবার যেমন কেক কি ফল নিয়ে আসত সে ফুলমতীর জন্য।  বারো সপ্তাহের ভেতর তিন/চার বার আবার স্টিভই লোক পাঠিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় তাকে নিয়ে এসেছে পোর্টে- জাহাজের কেবিনে।  স্টিভ চলে গেলো বেশ ভাল অংকের টাকা দিয়ে। পরের কয়েক মাস আর খদ্দের নিল না ফুলমতী। তিন মাস স্টিভ সাহেব থেকেছে তার সাথে; তবু জাপানী তাকুমির সন্তান দিব্যি বেড়ে উঠতে থাকল তার শরীরে।

– ধন্যি মেয়ে বাবা- এই অবস্থায় তিন মাস ইংরেজ সাহেবের সাথে থাকলি আবার গর্ভের সন্তানের কিছু হয় নি? পাড়ার বর্ষীয়সীরা বললো।
– তবে বেশি অত্যাচার করে নি। প্রতি সপ্তাহে এক রাত করে বারোটা রাত তেমন কিছু না। এই জন্যই আস্ত আছে!
কেউ কেউ মনে করিয়ে দিলো। 

তাকুমির মেয়ে জন্মেছিল আশ্বিনের এক সকালে- বড় পূজার কয়েকদিন আগে- ঐ যেদিন মংলার সর্বজনীন দুর্গা পূজা মণ্ডপ থেকে বানীশান্তায় এসেছিল সবাই বেশ্যার ঘরের মাটি নিতে. সেদিনই ত’ তার ব্যথা উঠেছিল। প্রায় চোদ্দ ঘণ্টা কষ্ট পেয়েছিল। তারপর মেয়ে হলো। বাপের মত হলদে পানা রঙ, ছোট ছোট চোখ আর ফুলো গাল। মেয়ের নাম সে রেখেছিল অঞ্জলি। মংলার প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস টু পর্যন্ত গেছে মেয়েটা যতদিন না একবার বর্ষার সময় খুব ম্যালেরিয়া হলো আর অঞ্জলির ম্যালেরিয়া সটান তার ব্রেনে আঘাত করলো। ডাক্তার রোগটার নাম কি যেন বলেছিল! শেরিবারাল (সেরিব্রাল) ম্যালেরিয়া না কি জানি! মেয়েটা সেই জ্বরের কোপেই গেল! তার স্কুলের খাতা আজো যতœ করে রাখা ট্রাঙ্কে – অঞ্জলি কর্মকার, দ্বিতীয় শ্রেণী, রোল-৫, কর্মকারই ত’? বেশ্যাদের ছেলে-মেয়েরা মায়ের বংশের নামই ত’ লেখে- কোথাকার কোন্ জাপানী বাবা- তার নামটা কোনমতে মুখস্থ হয়েছিল, তাই বলে ঐ বিদঘুটে নামের বিদঘুটেতর পদবি কি সে শিখেছিল নাকি? 

– ফুলমতী মাসী ত’ ভাল? কখন থেকে মুবাইল বাজতিচে – ধরো না দিকি?
ফুলমতী মাথা নাড়ে।  রঞ্জনা কখন ঢুকে পড়েছে ফুলমতীর খোপে সে লক্ষ্য করে নি।
– প্রমথ দা’র ফোন নাকি মাসী?

রঞ্জনা এ পাড়ায় এসেছে বছর চার হয়। পুরো বানীশান্তায় এখন তারা মাত্র দুই জন হিন্দু। আর সবই মুসলমান। গত তেতাল্লিশ বছরে কত বদলে গেছে এ পাড়া! গোটা পাড়ার সেই জৌলুস কোথায় হারালো! খোদেজা খালা, শীলা মাসী কবেই মরেছে! যুদ্ধের পরের বছর তার সাথে যে মেয়েরা এই পাড়ায় এসেছিলো তারা বলতে গেলে কেউই নেই। জয়া আর বিন্দু লিভার পচে মরেছে। শেষের দিকে দু’জনেই ভারি মদ খেত। শাশ্বতী তার সব জমানো টাকা নিয়ে এক বাবুর সাথে তার বউ হবার স্বপ্নে ভাগলো। সে কি আর বাবু নেয়? ছয় লাখ টাকা আর গহনা কেড়ে বাবু তাকে ছোরা মেরে পথে ফেলে রেখেছিল। শেষটায় পাগল হয়ে গেছিল শাশ্বতী। জাহাজঘাটায় খালি গায়ে ভিক্ষা করতো। হাজার চেষ্টা করে তার গায়ে কাপড় রাখা যেত না। সারা গায়ে মাছি ভনভন করতো। আরতি আর ননীবালা ভারত চলে গেছে এই পড়তি বয়সে এসে। সালমা আর সখিনা দু’জনেই বেশ্যাদের কবরের মাটি পাবার জন্য মিটিং -মিছিল করেছিল বহুদিন। একবার মোল্লারা আর পুলিশেরা এসে ভয়ানক পেটালো বেশ্যাদের। নষ্ট মেয়েমানুষ গোরের মাটি পাবে কেন? সালমা আর সখিনা পুলিশ আর মোল্লাদের হাত-পা ধরে কান্না-কাটি করেছিল, তোমাদের মা-খালার বয়িস আমাদের। জজ-বারিস্টারের ঘরে জন্ম হয় নি ঠিকই তয় মা-বাপ ছেলো আমাদের। গণ্ডগোলের বছর রাজাকার আর খানেরা আমাদের কুচি কুচি করে খায়িছে। সেই থেকে এই পাড়ায়। এখনো লুকায়ে কোরান পড়ি মাঝে মাঝে। সাধ্য থাকলি পীর-ফকিরকে দিই। শবে বরাতে সারা রাত নামাজ পড়ি। মুসলমানের ঘরে আমাগের জন্ম। আমাগো গোরের মাটি থিকি বঞ্চিত করো না বাপ!

তা’ ঐ কথায় বলে পুলিশের হাতে ব্যাটন থাকলে তাদের দিশা থাকে না। এমন মারই খেয়েছিলো সালমা আর সখিনা যে পরে আর কোমরে সোজা হয়ে টানটান হতে পারে না। তারপর থেকে সালমা-সখিনার চলতে-ফিরতে লাঠি লাগে। একে বয়স হচ্ছিলো তাতে শরীরের বেহাল অবস্থা…দু’জনেই চলে গেল ঢাকা ভিক্ষা করবে বলে। আর যোগাযোগ নেই।  বানীশান্তায় এখন বিদেশী জাহাজ আসে না তেমন। নদীর স্রোত থিতিয়ে জাহাজ আসে না- আর উল্টো দিকে সাগরের মুখ বড় হচ্ছে। প্রতি বর্ষায় বানীশান্তার পাড় ধসে যায়। পরের বর্ষায় নদী আরো ভেতরে চলে আসে। এভাবে আর কতদিন চলবে?

– মাসী, মোবাইল ত’ ধরো না দিকি! প্রমথ দা ফোন করিছে মনে হয়।

ছেলের ফোন কি ধরবে ফুলমতী? যে ছেলে এখন মা’র সাথে এক ঘরে থাকতে লজ্জা পায়। বেশ্যা মা’র সাথে এক ঘরে থাকার লজ্জা। তার ফোন ধরবে? প্রমথ- প্রমথেশ- গ্রিক নাবিক প্রমিথিউস আরন সাহেবের ঔরসে ফুলমতীর একটি মাত্র সন্তান যে পৃথিবীর আলো দেখেছে-  দেখছে। তাকুমি আর স্টিভ সাহেব চলে যাবার পর ফুলমতী দশ বছর আর কোন বিদেশী কাস্টমার নেয় নি।  মংলা পোর্ট থেকে নৌকা করে রুটিন মাফিক বাঙ্গালী নাবিকেরা প্রতিদিন কাজের শেষে ডিঙ্গি নৌকায় চেপে ছুটে আসবে এই বানীশান্তায়। ছোট ছোট কুঠুরিতে জমে উঠবে মাংসের আদি আয়োজন উল্লাস। সেভাবেই চলছিল ফুলমতীর। মাঝখানে এক বাঙ্গালী নাগর বিয়ে করার কথা দিয়ে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নিল। টাকা হাতিয়ে নেবার পর ফুলমতী মাঝে মাঝে মাদ্রাজি ইঞ্জেকশন নিত। হাতের শিরায় প্যাথিড্রিন নিয়ে সকাল দুপুর ঘুমিয়ে থাকা।  সন্ধ্যায়  বানীশান্তার খাড়াই মাটির পাড় বেয়ে নদীতে নেমে ডুব দিয়ে ঘরে ঢুকে মুখে স্নো-পাউডার ঘষা, ঘরে খদ্দের নেয়া…এম্নি চলছিল দশ/দশটা বছর। ক্লাস টু-তে পড়া মেয়েটা মরার পর মাদ্রাজি ইঞ্জেকশন নেবার অভ্যাসটা আরো বেড়ে গেলো। কোন কোনদিন চব্বিশ ঘণ্টায় সে একবার মাথা তুলতে পারে না বালিশ থেকে। দরজার সামনে খদ্দের এসে ফিরে যায়। তেম্নি একদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা সারাদিন ঘুমিয়ে মাগরিবের আজানের সময় পশুর নদীতে নাইতে নামলো সে। ডিঙ্গি নৌকা থেকে লাফিয়ে নামলো এক দীর্ঘদেহী বিদেশী। লোকটির চুল লালচে। ছাই ছাই রংয়ের একটি শার্ট পরা। গোটানো শার্টের হাতা থেকে তার স্বর্ণাভ পশমী হাতে সূর্যের শেষ আলো। ফুলমতী তখন নদীর পাড় থেকে উঠছিল। শাড়ি আর চুল ভিজে চপচপ। লোকটি তাকে এক ঝলক দেখলো। লোকটির মুখে মুচকি হাসির আভাস।

– দিস ইজ বানীশান্তা? ইউ লিভ হেয়ার?

ইংরেজি কিছু ভুলে গেছিল সে। খানিকটা হাত-মুখ নেড়ে-চেড়ে আর খানিকটা ভাঙা ভাঙা কথায় গ্রিককে সে বোঝালো এটাই বানীশান্তা। ভিনদেশী এক নাবিক বহুদিন পর আবার তার ঘরে এলো। লোকটি থেকে গেলো কিছুদিন। এর আগে সে চট্টগ্রামে ছিল কিছুদিন। বাংলা জানে ভাঙা ভাঙা ।

– তোমার নাম? ইয়োর নেম? ফুলমতী জিজ্ঞাসা করলো লোকটিকে।
– প্রমিথিউস।
নদীর খাড়াই পাড় বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলে লোকটি।
– প্রমিথিউস?
– ইয়েস।

লোকটির মুখে হাল্কা হাসি। বছর চল্লিশ বয়স হবে বোধ করি। চোখের রোদ চশমা খুলে রেখেছে। গা থেকে হাল্কা সুগন্ধীর ঘ্রাণ। বেশ্যাপাড়ায় আসার আগে বাবুরা অনেকেই গায়ে যেমন মেখে নেয়।

– ইয়োর নেম প্লিজ? এবার ফুলমতীকে জিজ্ঞাসা করে লোকটি।
– ফুলমতী।
– ফু-উ-ল মটি –

লোকটি বাতাসে তার নামের উচ্চারণ আলতো ছড়িয়ে দেয়। তার চোখের তারায় প্রসারিত হয় কৌতুক । 

ফুলমতীর মাথায় এদিকে স্কুলে ক্লাস সিক্সের পড়া ধাক্কা দেয়। কোন্ এক গ্রিক দেশের গল্প যেন সে পড়েছিল ক্লাস সিক্সে থাকতে! ঐ যে এক দেবতা মানুষের জন্য আগুন চুরি করতে গিয়ে খুব শাস্তি পায় দেবতাদের রাজার কাছে! তার নাম যেন কি ছিল? প্রমিথিউস না? এই কি সেই মানুষ যে আগুন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল? ফুলমতীর বাবা খগেন্দ্র নাথ কর্মকার যেমন লোহার হাপর ঠেলে প্রায়ই আগুনের ফুলকি ছড়তো চারপাশে! সকালবেলা বাড়ি থেকে স্কুলে যাবার পথে বাবার কামারশালা। নানা মানুষ আসছে। এটা-সেটা সারাতে দিচ্ছে। অমুকের বাড়ির দা-টা ধার দিতে হবে। তমুকের বাড়ির বটি। বাবা হাপর ঠেলছে। বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে আগুনের ফুলকি। বাবাকে ফুলমতীর তখন মনে হত পৃথিবীর সবলতম মানুষ।

– তুমি খগেন কামারের মেইয়ে? তোমার বাপের হাতে লোহার জিনিষ যেমন হয় তেমন আর কারুর হাতে হয় নাকো!

বাবাকে ভালই জানতো সবাই। তার শত্তুর দুশমন কেউ ছিল না। আসগর কাকা- বাবা যার সাথে এক থালায় ভাত খেত– সেই পরানের বান্ধবই খান সেনাদের পথ দেখিয়ে এনেছিল তাদের উঠানে। পাঞ্জাবিদের হাতে গুলি খেয়ে উঠানে আছড়ে পড়লো মা–বাবা-দুই দাদা।

…প্রমথেশ কর্মকার। প্রমিথিউসের ছেলে প্রমথেশ। প্রমিথিউসই ছিল ফুলমতীর জীবনের শেষ নাগর। শেষ প্রেমিক। আর আজ তার সন্তানই রয়ে গেছে ফুলমতীর কাছে। ফুলমতীর রক্তের একমাত্র মানুষ হিসেবে। রয়ে গেছে কি কাছে? ঐ ত’ বাবার মতই লালচে চুল, কটা চোখ, ফর্সা রঙের ছেলেটি ভূমিষ্ঠ হবার রাতে খুব ঝড়-বৃষ্টি ছিল। প্রমিথিউস তার কয়েক মাস আগেই জাহাজ চেপে চিরদিনের মত চলে গেছিল নিজের দেশে। শেষ প্রেমিকের সাথে ঝোড়ো আর উন্মত্ত ভালবাসা হয়েছিল ফুলমতীর। নারীর মন বা দেহ দুটোই একদম শেষ হয়ে যাবার আগে যেমন বাণ আসে তেমন। এই মংলা নদীর মত নয়। নদী যেমন আজ শুকিয়ে আসছে আর তাই বন্দরে জাহাজ আসা কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে বিদেশী নাবিকের আনাগোনা…তেমনটা নয়। আগে যেমন মংলা নদীতে মরা কটালের পর ভরা কটাল আসতো, অমাবস্যার পর পূর্ণিমা….নারীর মন বা দেহ তেমন থেকে থেকে মরে গিয়ে আবার জেগে উঠতে পারে। তারপর একদিন চিরতরে মরে যায়। এই আজকের মংলা নদীর মত। আসলে কি ফুলমতী নিজেই একটি বন্দর? এই মংলা বন্দরের মতই? জাহাজগুলো আসে। জেটিতে কিছুদিন থাকে। তারপর আবার চলে যায়।

– ছেলের নাম কি রাখিবি?
– প্রমথেশ। হিন্দুর ছেলে –

ভেবেই জিহ্বায় কামড় পরে তার। হিন্দুর ছেলে? বাপ খ্রিষ্টান না? না হয় হলো একটা কিছু। বেশ্যার ছেলে-মেয়ে মায়ের পরিচয়েই পরিচিত হয়। আজ এই সংসারে ফুলমতীর বাবা নেই, স্বামী বলতে কেউ নেই, ভাই নেই। স্বামীর বদলে জীবনে সে পেয়েছে অসংখ্য পুরুষ। আজ তার বাবা স্বর্গীয় খগেন্দ্র নাথ কর্মকারের বংশনাম না হয় এই ভিনদেশী নাবিকের ছেলেই বহন করবে। তবু মিথ্যা বললে পাপ হবে। প্রমিথিউসই তার জীবনের একমাত্র পুরুষ যে দ্বিতীয়বার ফিরে এসেছিল। অবশ্য কাজ ছিল তার মংলায়। তবু দ্বিতীয়বার দেখা করে গেছিল। ছেলেকে কোলে করে বহুক্ষণ চুপ করে বসেছিল। নগদ কিছু টাকা আর একটি সোনার আংটি দিয়ে গেছিল। বলেছিল ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে বাবার নাম লিখতে হলে তার নাম দিতে পারে। ইংরেজিতে লেখা একটি কাগজ দিয়ে গেছিল যেখানে সে ছেলের পিতৃত্বের দায় স্বীকার করে গেছে। ছেলেকে খুলনার একটি মিশনারি স্কুলে ভর্তি করাতে তাই তেমন সমস্যা হয় নি। প্রমথেশ কর্মকার আরন, পিতার নাম- প্রমিথিউস আরন, ধর্ম- এই জায়গাটা এসে ফর্ম ফিল-আপ করতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো।

মিশনারি স্কুলের দিদিমণি বললেন, বাবার ধর্ম নিতে পারে তোমার ছেলে- এতে ছেলে তোমার কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবে। বিনা পয়সায় আমাদের স্কুলে পড়তে পারবে। ভাল রেজাল্ট হলে কলেজে পড়তে পারবে নিখরচায়।

– থাক- লাগবি না। 

থমথমে জেদে, দৃঢ় স্বরে সে বলেছিল। সত্যি সত্যি প্রমিথিউস নামে গ্রিক লোকটা যদি তার কাছে এসে থাকত তবে খ্রিষ্টান কেন যে কোন কিছুই সে হতে পারত- ছেলেকে হতে দিত! কেউ আসে না- থাকে না- মংলা পোর্টে জাহাজ ছাড়ার সময় যেমন তীব্র সাইরেন শোনা যায়, তেমন কোথায় যেন এক তীব্র হুইসেল বেজে যায়। কেউ থাকে না, কেউ পাশে রয়ে যায় না চিরতরে– গুলি খেয়ে রক্তের স্বজনেরা ছেড়ে গেছিল- তারপর থেকে অসংখ্য পুরুষের হাতে হাতবদল হতে হতে ফুলমতী বুঝেছে আজন্ম একাই থাকতে হবে তার। তবে আর গর্ভের সন্তানকে বিধর্মী করে কি লাভ? প্রমিথিউসই বা কি আলাদা অন্যদের চেয়ে? সেই ত’ আর সবার মত তাকে আদরের অভিনয় করে, তার গর্ভে সন্তান দিয়ে আবার মানি ব্যাগ থেকে দেশে বউয়ের ছবি দেখিয়েছে। আঙ্গুর ক্ষেতে ঢলোঢলো হাসি মুখে জল দিচ্ছে বউ। সাথে আরো তিনটা ছেলে-মেয়ে। এমন নাগরের পদবি ছেলেকে দিয়ে কি করবে সে? হায় ভগবান- কবে এই দেশে একটা যুদ্ধ হয়েছিল আর অগ্রহায়ণ মাসে বিয়ে ঠিক হয়ে থাকা মেয়ে ফুলমতীকে যেতে হলো খানেদের বাঙ্কারে । আর তারপর তার নিয়তি হলো বেশ্যা হবার। শরীরটা শুধুই কেনা-বেচার হয়ে উঠলো। তবে সে যদি বেশ্যাই, তবে সন্তানকে আর পিতৃ নাম দেবে না সে।

– দিদিমণি?
– বলো?
– বলি কি প্রমথেশ কর্মকার আরনের আরনটুকু আর দরকার নেই। ছেলের নাম আমার প্রমথেশ কর্মকারই থাক।
– ঠিক আছে। তুমি যেমন বলবে তেমন হবে।
ক্রিশ্চিয়ান দিদিমণি বললেন।
– প্রমিথিউসের ছেলে প্রমথেশ? বেশ নাম রেখেছো। প্রমিথিউস আগুন চুরি করেছিল মানুষের জন্য। সংস্কৃত ভাষায় প্রমথেশ শব্দের একই অর্থ। যে আগুন চুরি করে। কামারশালার আগুন- তোমার বাবার পদবি কি?
রেভারেণ্ড শশীমোহন চট্টোপাধ্যায় হেসেছিলেন। ব্রাক্ষণ পরিবারের ছেলে খ্রিষ্টান মেয়ে বিয়ে করে খ্রিষ্টান হয়েছেন।
– আজ্ঞে– আমার বাবার ঘরের পদবী কর্মকার।
– বলে কি? কি কাকতালীয় মিল!

রেভারেণ্ডের সব কথা বোঝে নি ফুলমতী। বহুদিন আগে স্কুলে ছয় ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে সে। এখন বাংলা লিখতে ভুল হয় বারবার। তবু কোনমতে ছেলের স্কুলের ফর্ম ফিল-আপ করে ফিরেছিল। সেই মিশনারি স্কুল থেকেই মেট্রিক পড়ে ইন্টার পাশ করে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনীয়ারিং পড়েছে প্রমথেশ। একা ফুলমতী সব খরচ যোগাতে পারেনি। প্রমথেশ  স্কুলে পড়ার সময় কিছুদিন কামারশালায় কাজ করেছে। লোহা পিটিয়ে আগুনের ফুলকি ঝরানো যেন ছেলের রক্তে ছিল। মেট্রিকে পড়ার সময় থেকে টিউশনি করেছে।  কলেজ পাশ হয়ে ডিপ্লোমা করে এখন পিডব্লুডির ইঞ্জিনীয়ার।  ছেলের বউ ঘৃণা করে শাশুড়িকে। ছেলে মাসে মাসে অবশ্য হাতখরচ পাঠাত প্রথমে মাকে। সব টাকা ফেরত পাঠিয়েছে ফুলমতী।

–তোর আমাকে টাকা দিতি হবে না।

ছেলে ফোনের অপর দিক থেকে কান্না কান্না গলায় কথা বলে, সমাজের সবার সাথে আমার চলতে হয় মা! কত বললাম খুলনা শহরে তোমাকে আলাদা বাসা ভাড়া করে দিই? এত জিদ করলে চলে?

– তোর আমাকে টাকা দিতি হবি না- বাসা ভাড়া করি দিতি হবে না– শোন্…তোর মা ত’ বেশ্যা! বেশ্যার টাকায় তোকে ইঞ্জিনীয়ার করিচি– আমার জন্য তোকে কিছু করতি হবি না। তয় এই বানীশান্তায় তুই বড় হয়িচিস- আমার জ্বর করিচে- তোর বেশ্যা খালারা মাসীরা তোকে খাইয়েচে- নদীতে নিয়ি নাইয়েচে। আমাদের বানীশান্তায় একটু লাইট দিবি?

– লাইট?

– কারেন। বিদ্যুত বাবা। তুই ত’ এখন পিডব্লুডির ডিপনোমা ইঞ্জিনীয়ার। দিবি?

– তুমি রাখো মা! আমি দেখি কি করা যায়।  

– প্রমথেশ – আমরা বুঝতে পারছি না তুমি বারবার শুধু বানীশান্তায় ইলেক্ট্রিসিটি দেবার জন্য অস্থির হচ্ছো কেন?একটা  রেডলাইট এরিয়া! বৃহত্তর খুলনার শিল্পাঞ্চলগুলো বা আবাসিক এলাকাগুলোতে যেখানে আমরা বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে পারছি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছেলে-মেয়েদের বিদ্যুত দিতে পারছি না, সেখানে এই নিষিদ্ধ পল্লীতে বিদ্যুত সংযোগ দেবার জন্য তোমার এত অস্থিরতা কেন?

পিডব্লুডির ডিভিশন্যাল চিফ ইঞ্জিনীয়ার ভয়ানক বিরক্ত চোখে প্রমথেশের দিকে তাকালেন। কি উত্তর করবে প্রমথেশ? মা মারা গেছে মাস ছয়েক। ভয়ানক জেদি মা তার কাছ থেকে একটি টাকা নেয় নি মৃত্যু অবধি। ছেলের বিয়ে হলে বানীশান্তা থেকে ছেলের ঘরে এসে থাকার ইচ্ছে ছিল মার। হয় নি। কি করে কি করে প্রমথেশের শিক্ষিতা প্রেমিকা কাম বউ পরে জেনে গেছিল। জয়তী খুব কান্নাকাটি করেছিল।

– আমি, শুধুমাত্র আমি বলে এত কিছু জেনে তোমার ঘর করবো। তোমাকে ছেড়ে যাব না!

– এত ঘৃণা করছো জয়তী? তোমার বাবা না মুক্তিযুদ্ধ করেছেন? আমার মা যুদ্ধে নির্যাতিতা হয়ে –

– চুপ করো– আমি আর কিচ্ছু শুনতে চাই না। প্রতারক তুমি একটা! নিজের পরিচয়, জন্ম সম্পর্কে কিচ্ছু বলো নি। হায় ভগবান! কিছু খবর না নিয়ে বিশ্বাস করেছি তুমি শৈশবে পিতৃহারা। তোমার বিধবা মা তোমাকে মানুষ করেছেন। বাবা আমেরিকায় থাকা পাত্রের সাথে বিয়ে ঠিক করলেন। আমি তোমার রূপে পটে গেলাম। একবার ভাবলাম না এই রূপ কোথা থেকে এসেছে! বাবাকে কষ্ট দিয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এলাম তোমার কাছে। এত মিথ্যা-এত মিথ্যা– শোন, তবু আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না। এই ভয়াবহ সত্য আমার মা-বাবা পর্যন্ত জানবে না। প্লিজ- শুধু আমার মেয়ে যেন তোমার মা’র ছায়ার সংস্পর্শে কোনদিন না আসে! এইটুকু দয়া করো আমাকে!আর কিছু চাই না-

– জয়তী!

– ঘেন্না লাগে না একথা বলতে? আবির কাকু আমাকে প্রমিস করেছেন তিনি একথা চেপে যাবেন। দ্যাখো তোমার মা কি বিয়ের পর কিছুদিন আমার কাছে থাকে নি? আমি সরল বিশ্বাসে কত যতœ করেছি! আজ যদি আমার বাবার বন্ধু আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে তোমার মা’কে চিনতে পারেন- কাকু প্রমিস করেছেন কাউকে বলবেন না – বাকিটা তোমার ইচ্ছা- কেবল তুমি চাইলে আমাকে, আমার মেয়েকে রক্ষা করতে পারো!

জয়তী পাগলের মত মেয়েকে বুকে চেপে ধরে বিলাপ করে।

– আমি ভাবতে পারি না যে আমার এই ফুলের মত মেয়েটার রক্তে এক- এক প্রস্টিটিউটের রক্ত। ছি:

মা ফিরে গেছিল বানীশান্তায়। সারা জীবনের একমাত্র আশ্রয়ে। সেখান থেকে কেউ তাকে অন্তত: দূরে ঠেলে দেয় নি। শেষ ছয় মাস একটা দিন ফোন ধরে নি মা। মৃত্যুর দু’দিন আগে একবার শুধু ফোন ধরলো। ক্লান্ত গলা। কেন জানি বানীশান্তায় বিদ্যুৎ চাইলো এক বেশ্যা মা তার ইঞ্জিনীয়ার ছেলের কাছে। স্ত্রীকে লুকিয়ে বানীশান্তায় গিয়ে মা’র দেহ নিয়ে মংলা এসে শ্মশানে দাহ করে তবে খুলনায় ফিরেছিল প্রমথেশ। জয়তী ইদানীং তাকে খুব ঘৃণা করে। মিলিত হতে চায় না। মিলন হয় না বহু বহু দিন। দাম্পত্য ঝগড়ার মূহুর্তে সব বিষ উগরে দেয়।

– আমি নিজেই একটা নষ্ট মেয়ে আসলে। নাহলে তোমার ঐ সাদা চামড়া, লম্বা শরীর, কটা চোখ দেখে ভুলবো কেন? তোমার খানকি মায়ের গ্রিক বাবুর ছেলে তুমি-

– থাম্ হারামজাদি! আমি তোকে বিশ্বাস করে সত্য কথা বলেছি বলে-

– আহা সত্য কথা! সব ত’ আবির কাকুর কাছে ধরা খাবার পর- লুচ্চা কোথাকার!

তারপর গোটা ঘর নরক। ছয় বছরের মেয়ে অপালা অসম্ভব ভয়ে জোরে কান্না শুরু করে।মা-মা- তোমার ছেলে তোমাকে একটা টাকা দিতে পারে নি। নিজের কাছে রাখতে পারে নি। ব্যথায় নীল হতে হতে, শরীরে নানা পশুর নানা ক্ষত নিয়ে সব টাকা তুমি আমাকে দিয়েছো আমার পড়ার জন্য। আমার মানুষ হবার জন্য। 

– কি প্রমথেশ? বললে না তো সব জায়গা ছেড়ে এই ব্রথেলে বিদ্যুত দিতে কেন আগ্রহ? শোনো, এদের জন্য হিউম্যান রাইটস করে লাভ নেই।

মিটিং শেষ হলে আস্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে প্রমথেশ। বানীশান্তায় বিদ্যুত কেন দিতে হবে? আজীবন তুমি নিজের সত্যিকারের পরিচয় থেকে পালিয়েছো প্রমথেশ! পালিয়েছো জন্মদাত্রী মায়ের কাছ থেকে। বানীশান্তা কি তোমার দ্বিতীয় মা নয়? আজ তার অন্ধকার, ঘুরঘুট্টি কুঠুরিগুলোয় আলো দেয়া কি তোমার দায়িত্ব নয়?    

           নগরীতে তরুণ প্রকৌশলীর আত্মহত্যা।

 নিজস্ব প্রতিবেদক। গতকাল খুলনা মেট্রোপলিটান সিটির নিউ মার্কেট এলাকায় এক তরুণ প্রকৌশলীর মৃতদেহ তার বেডরুমের সিলিঙ ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করেছে পুলিশ। মৃত প্রকৌশলীর নাম প্রমথেশ কর্মকার (বয়স: ৩৩)। মৃতের স্ত্রী তখন ঢাকায় তার আত্মীয় বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মৃতের চিরকুটে আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ি নয় লেখা ছিল।

তবে পিডব্লুডি, খুলনা-র দুই কর্মকর্তা মোফাজ্জাল হাকিম এবং এলগিন মালাকারের মতে অবৈধভাবে নির্দিষ্ট কর্ম এলাকার বাইরে এবং উর্দ্ধতন কর্মকর্তার নির্দেশের বাইরে গিয়ে মংলা বন্দরের বানীশান্তা পতিতা এলাকায় গোপণে বিদ্যুত সংযোগ দেবার অপরাধে সম্প্রতি তাকে চাকুরি থেকে সাসপেণ্ড করা হয়।

দীর্ঘ ছয় বছরের সহকর্মী প্রমথেশকে ব্যক্তি জীবনে সবাই অত্যন্ত নম্র, ভদ্র আর সদালাপী বলে জানতেন বলে দুই সহকর্মী জানিয়েছেন। অতীতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের আদেশ লঙ্ঘন, কোন দূর্নীতির সাথে জড়িত থাকা অথবা নারী ঘটিত কেলেঙ্কারি তার স্বভাবের সাথে যায় না বলেই তারা মনে করেন। প্রমথেশের এই সহসা পরিবর্তনে তারা গভীর ভাবে বিষ্মিত।

প্রমথেশের আত্মহত্যার বিষয়টি বর্তমানে খুলনা মেট্রোপলিটান পুলিশ খতিয়ে দেখছে।  

Comments

comments

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী

জন্ম: ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন ও করছেন একাধিক সংবাদপত্র, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায়। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০ (প্রবন্ধ-গবেষণা-গল্প-কবিতা-অনুবাদ সহ)। পুরষ্কার সংখ্যা: ৩

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি