সোনারঘাট । রুখসানা কাজল

খুলনা থেকে একজন সাঁতারের প্রশিক্ষক এসেছিল আমাদের ছোট শহরে। সুমিত্রা পাল। সপ্তাহের তিনদিন উনি আমাদের ভ্যানে তুলে শহর ছাড়িয়ে যেখানে নদি বেশ চওড়া সেখানে সাঁতার শেখাতে  নিয়ে যেতেন। সেই সাঁতার ম্যাম একটি ব্যায়াম শিখিয়ে দিয়েছিলন আমাদের। যখন  সাঁতরাতে সাঁতরাতে দুই ডানা  ব্যথায় ভেঙে আসবে, পায়ের পেশিতে খিঁচ ধরে টান লাগবে, তখন শরীরটাকে শিথিল করে পানির ভেতর চিত হয়ে ভেসে থাকতে হবে। পানি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। চেনা নদি। ভয়ের তো কিছু নেই। ঘাট কোন না কোন পাওয়া যাবেই।   

আমি প্রাণপণে তাই করছিলাম। ছোট ছোট পানির দোলা আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটি দোলার আঘাতে ক্লান্ত আমি উহু আহ করে ভেসে যাচ্ছিলাম। দূরে ঘাট দেখা যাচ্ছে। মুখরিত সোনার ঘাট। সে ঘাটের পৈঠায় বসে আমার বাপি, বরুণ চাচা, ময়েন স্যার, কমলা দিদিমনি,   তাতারিফুপি, মিস জোন্স , রেনুদি  আর আমার মা হাসি মুখে গল্প করছে। অবাক হয়ে দেখি, মহা আশ্চর্যেরও আশ্চর্য আমার লস্ট হাসবেন্ড সেই সদা বিরক্ত, হতাশ আর অপুরুষিত মীন মুখে আমার ভেসে আসা দেখছে। আমি ভেসে যাচ্ছি। ভেসে আসছি সেই সোনার ঘাটের দিকে। লোকটা ঘাট ঘুরিয়ে আমাকে ডুবিয়ে মারবে না তো !  

জিভের নিচ থেকে থার্মোমিটার বের করে ডাক্তারআপু বলে ওঠেন, এই ত জ্বর নেমেছে। আড়াই। তবে সহজে ছাড়বে না। আমি কাঁইকুঁই করে উঠি, এত জ্বর আমার কক্ষনো হয় না। কি হলো  আমার ! মরে যাচ্ছি যে ! আমি মরে যাচ্ছি !  

আমি যেতে যেতে দুহাতে ফ্রকের কোণা মুচড়ে, চৌকি দিয়ে বানানো মঞ্চে পায়ে তাল ঠুকে, গলা উঁচু করে মাইক্রোফোনের ফুটো ফুটো রূপালি ঠোঁট ছুঁয়ে বলি, আমার  নাম রুখসানা কাজল। আমি এখন একটা ছড়া বলব। বলি? 

খুব আদরে আমার জটাজুটো বাঁধা চুলে চুমু খেয়ে অশেষ হেসে ডাক্তারকে জানায়, আন্টি প্রতি  তিনচার বছর পরে আম্মুর এই জ্বর হয়। ডাক্তার টেস্ট দেয়। জ্বর সেরে গেলেই আম্মু সব ভুলে যায়। কোনো টেস্ট আর করায় না। ইনফ্যাক্ট টেস্টের কথা মনেই আনে না। এবার দেখছি খুব বেশি কষ্ট পাচ্ছে।      

আমি জ্বরতপ্ত শরীরটা অশেষের গায়ে ছেড়ে দিতে দিতে শব্দহীন বলে চলি, ভেসে যাচ্ছি কিন্তু।  আমি ভেসে চলে যাচ্ছি।

গেলো সন্ধ্যায় জ্বর কমে এলে অশেষ আমাকে মোয়ানা ফিল্মটি দেখতে বসিয়েছিলো। আমার যে নিজস্ব একটি নদি আছে ও জানে। আর জীবনভর ফাইট দিতে আমি যে খুব ভালোবাসি ছেলেটা  তাও  জানে। আমি আধো ঘুমে আধো জাগরণে মোয়ানাকে দেখছিলাম আর উদ্দীপ্ত হয়ে নিজেই বলছিলাম, আই এম রুখসানা কাজল, ডটার অফ দ্যা রিভার মধুমতি! এইসব জ্বরটরে আমার কিচ্ছু হয় না –           

কে যেন ভারি গলায় অশেষকে বলে, এবার সবগুলো টেস্ট করিয়ে ফেলো। আমি আছি কিছুদিন।  জোর করে না করলে তোমার মা কবেই বা কি করেছে স্বেচ্ছায় !    

কে ? কে ? কে ভাই আপনি ? ছেলের কাছে আমার গুপ্তী খুলে মেলে দিচ্ছেন!  চোখ খোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেও আমি পারি না। আমার চোখের আশেপাশে অসংখ্য নদি নালা। তাতে ধাপ বেঁধেছে কচুরিপানার দাম। কিছুতেই সে ভার সরিয়ে আমি তাকাতে  পারছি না। কিন্তু কে এই মানুষটা ? অশেষকে সাহস দিয়ে আমার সেবা করে চলছে ! আমার পায়ের মাথার জলপটি বার বার বদলে দিচ্ছে অসীম মমতায়।

বাঁহাতের উপর মাথা রেখে কঁকিয়ে উঠি ব্যাথায়, ও  মাগো। বাবাগো। মরে যাচ্ছি গো। আমি মরে যাচ্ছি।  

ঘরসুদ্ধ সবাই হেসে ওঠে। ভারি গলা অশেষকে বলে একেই বলে বাঘের ধান খাওয়া বুঝলে অশেষ। তোমার মা সেই ছোটবেলা থেকে এরকম। মারকুটে। দাঙ্গাবাজ। কি এবার বুঝতে পারছ  তো কেমন লাগছে ! তা এখন কেমন লাগছে মাতঙ্গিনী রুখসানা?    

আমি চোখ মেলে তাকাতে চাই। কচুরিপানার শিকড় আর নালে জড়াজড়ি হয়ে গেছে আমার চুল। দূর নদির ঘ্রাণ ভেসে আসছে। নদি ডাকছে গুমগুম। কঠিন ভৈরবী সে সুরে। আরো একটি বাঁক  পেরুলেই  হাতের কাছে সোনারঘাট।

হঠাত রক্ষীবাহিনীর কমান্ডরের মুখের মত হয়ে যায় আমার লস্ট হাসব্যান্ডের মুখ। সাফল্যের শেষ মুহুর্তে বরাবরের মতই রুক্ষ কঠিন স্বরে হেঁকে ওঠে, ফায়ার!

পরমুহুর্তে প্রতিটা কচুরিপানার ধাপ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে নদিতে। এক সময় একটি ধাপ থেকে মরণ চিৎকার ভেসে আসে। সুমিত্রাদি। একবার ভেসে ওঠে আবার হারিয়ে যায় নদিতে। পানিতে ঘূর্ণি ওঠে লাল হয়ে যায়। তারপরেও দুজন সৈনিক ঠা ঠা করে গুলি চালিয়ে যায়  কিছুক্ষণ। আমরা, ম্যাম আমাদের সাঁতার ম্যাম বলে জলপুলিশের নৌকায় ঠকঠক করে কাঁপতে   কাঁপতে কাঁদতে থাকি। কেউ কেউ সৈনিকদের পায়ের ফাঁক দিয়ে  হাত বাড়িয়ে  চিৎকার করে উঠি, ম্যাম ম্যাম , এই যে আমরা । হাত ধরুণ ম্যাম ! ম্যাম – 

সৈনিকরা আলুর বস্তার মত আমাদের সবাইকে নৌকার মাঝখানে জড়ো করে রেখেছে। ভেজা গা । খালি পা। এ ওর গায়ের সাথে লেপ্টে চেপ্টে কাঁপছি আর কাঁদছি। বিধ্বস্ত নদি। বিধ্বস্ত কচুরিপানার দল। এলোমেলো হয়ে  স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বড় নদির বুকের গভিরে । আমরা কাঁদতে কাঁদতে ঢিকসি তুলে বলি, ম্যাম মরে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে আমাদের ম্যাম। রাইফেলকাকুরা বাঁচান। আমাদের ম্যামকে বাঁচান প্লিজ!   

ধ্যাড়াঙ্গে এক সৈনিক রাইফেল নামিয়ে কমান্ডারকে জিগ্যেস করে, লাশ তুলব স্যার ?   

নো । কমান্ডার লাল গামছা মাথায় বেঁধে রাখাল রাজা সেজে উত্তর দেয়, রিপোর্টবুকে লিখে রেখো, নো ট্রেস।

বাট এই বাচ্চারা স্যার –   

আমি হাত দুলিয়ে নদি বানাই, লাফিয়ে লাফিয়ে নদি পেরুই আর ছড়া বলতে থাকি,  এ নদিতে কুমির নাই, হাপুসহুপুস নেয়ে যাই। হাপুসহুপুস নেয়ে যাই, এ নদিতে কুমির নাই। জোরসে বলো, তালে বলো, সুরে বলো, প্রাণে বলো, জানে বলো, সবাই বলো, জলদি বলো, তোমার বাড়ি আমার বাড়ি নকশালবাড়ি নকশালবাড়ি –

কমান্ডার রঙ ছোপানো সুন্দর বিকেলকে কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। কমান্ডারের মুখটা কেমন ফ্যাঁকাসে । অপুরুষ ফর্সা রঙের। আমি জানি এরকম মুখে হাজারবার চুমু খেলেও এই মরা রঙের কোনো খোলতাই হয় না। পানসে। জলশীতল মীন স্পর্শ। অথচ বেদম স্মার্ট। আর্টিফিসিয়াল সুন্দর দেখতে কমান্ডার লোকটা এক পায়ে একটি ড্রাম টেনে তার উপর বসে মুড়িমাখানো হাসি হাসে, ওরা ভুলে  যাবে। ভয়ে  জ্বর আসবে সবার। ফেবুলেসলি হাই ফিভার। আবোলতাবোল বকবে। জ্বর থাকবে   সাত  থেকে পনেরো দিন। তদ্দিনে ঘিলু ধুয়ে ফকফকা হয়ে যাবে। মেমরি পুড়ে মিষ্টি আলুর মত হয়ে যাবে বাচ্চাদের।

সৈনিকরা ঠা ঠা করে হাসে। ওদের দাঁতগুলো ওদের কোমরে ঝুলানো পেতলরঙ্গা বুলেট মালার  মত  পরিপাটি, সাজানো ঝকঝকে। ওরা সুর করে গেয়ে ওঠে, জোরসে বল, তালে বল, প্রাণে বল, সবাই বল, তোমার বাড়ি আমার বাড়ি নকশালবাড়ি নকশালবাড়ি।

কমান্ডার দু হাতে চুটকি বাজিয়ে তালি দিয়ে পা নাচায়। তারপর দুঃখ দুঃখ ভাব করে আমাদের  পাশে এসে বসে। আমার ভেজা চুলগুলো জোরে টেনে দিয়ে অন্যদের চুলও টেনে দেয়, বাচ্চুরা তোমরা তো জানো, বড় নদি থেকে একটি কুমির ঢুকে পড়েছিলো এই নদিতে। মানুষখেকো কুমির। ইসস তোমাদের সেফ করতে পারলাম। কিন্তু তোমাদের সাঁতার মিসকে বাঁচাতে পারলাম না। সো স্যাড বাচ্চুরা। প্রে ফর হার।   

আমাদের চোখ বুজেঁ আসছে। গা তেতে উঠছে জ্বরে। সবকিছু কেমন লাল লাল আর হঠাত প্রচন্ড ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। শুনতে পেলাম কে জেনো বলে উঠলো, স্যার চারু মজুমদারের খবরটি  যদি সত্যি হয় তো  এরা এখনো কিসের আশায় –

কড়া তামাকের গন্ধে অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে যায় জল পুলিশের লঞ্চ। আরামে মাথা খুলে খুলে  ভেসে যাচ্ছে আকাশে বাতাসে। আমি গাইছি। হাসছি। ছড়া বলছি। অন্যরাও খুশি খুশি। চেঁচাচ্ছে। গাইছে, হাসছে। কারা যেনো ত্রস্তে আমাদের কোলে  করে নিয়ে যাচ্ছে। কে যেনো নিজের শার্ট  খুলে আমাকে পেঁচিয়ে ভালো করে ঢেকে ঢুকে দিয়ে চেঁচিয়ে ডাকলো, বড়কাকা বুনুর যে অনেক জ্বর। বাসায় নেবো, নাকি ফার্মেসিতে ?  

আমি যেতে যেতে দুহাতে ফ্রকের কোণা মুচড়ে, চৌকি দিয়ে বানানো মঞ্চে পায়ে তাল ঠুকে, গলা উঁচু করে মাইক্রোফোনের ফুটো ফুটো রূপালি ঠোঁট ছুঁয়ে বলি, আমার  নাম রুখসানা কাজল। আমি এখন একটা ছড়া বলব। বলি ? 

উঠোন জুড়ে মা, চাচি, ফুফু, মাসি, কাকিরা ফুরফুর করে হেসে হাত দোলায়, আচ্ছা আচ্ছা বল্‌ বল্‌। তাড়াতাড়ি বলে ফেল বাপু। তোদের ন্যাংটোপোংটোদের আসর শেষ হলেই হেমন্তের গান  শোনাবে বরুণ। ও বরুণ অনেকগুলো গান গাবি কিন্তু ভাই! থামবি না মোটেও। ফাঁকি দিলি কিন্তুক  মার আছে তোর কপালে এইবেলা বলে রাখলাম!    

ষ্টেজের পাশ থেকে মাথায় গাট্টা মারার ভয় দেখিয়ে আপুলি বলে, এক্কেরে এক মিনিট। মনে থাকে   যেনো। তোর পরে নাজমা ছড়া বলবে। নাজমা কই রে ! এই নাজমা এদিকে আয়। এখুনি লাইনে দাঁড়িয়ে থাক । যা, জলদি যা –      

আমি হাত দুলিয়ে নদি বানাই, লাফিয়ে লাফিয়ে নদি পেরুই আর ছড়া বলতে থাকি,  এ নদিতে কুমির নাই, হাপুসহুপুস নেয়ে যাই। হাপুসহুপুস নেয়ে যাই, এ নদিতে কুমির নাই। জোরসে বলো, তালে বলো, সুরে বলো, প্রাণে বলো, জানে বলো, সবাই বলো, জলদি বলো, তোমার বাড়ি আমার বাড়ি নকশালবাড়ি নকশালবাড়ি –

Comments

comments

রুখসানা কাজল

রুখসানা কাজল

একটি বেসরকারি বিশবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, জন্ম: ২৩ নভেম্বর ঢাকায়। ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তনী। লিখেন কবিতা, গল্প। বই পড়া ও নিভৃতিই তার পছন্দ। উনার গল্পের বই গুলো হচ্ছে : ‘তোমার জন্যে মেয়ে’ ‘আহা জীবন’ ‘নুনফল গল্পগুলি’ ‘জলের অক্ষর’

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি