এভাবেই হারিয়ে যায় : শামসুল কিবরিয়া
সাম্প্রতিক

এভাবেই হারিয়ে যায় : শামসুল কিবরিয়া

কাজ শুরুর প্রথম দুদিনেই খুলে ফেলা হয় কাঠের পুরনো দরজা জানালাগুলো। বড় বড় হাতুড়ি আর বাটালির শব্দে আশপাশের বাতাসে কম্পন উঠে তীব্র ও তীক্ষ হয়ে। ফলে আব্দুস সালামের কানেও আঘাত করে তা। তার কানে একটু বেশি করেই লাগে কেননা যে বাড়িটি ভাঙ্গা হচ্ছে এটা তারই ছিলো। এই কদিনেই কতবড় একটা ব্যবধান রচিত হয়ে গেলো ! ‘ আমার বাড়ি’ বলার স্বত্ব হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। এই ব্যবধান আরো বেড়ে চলে যখন তিনি ভাড়া বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখেন বা বাসার ভেতরে থেকেই শুনেন বুলডুজারের দয়ামায়াহীন আঘাতে ধ্বসে পড়ছে পুবের বা পশ্চিমের, উত্তর বা দক্ষিণের দেয়ালবা বড়ির ছাদ। এভাবেই, মনে হয় যেন চোখের নিমেষেই, ভেঙ্গে পড়ে আস্ত বাড়িটি যেখানে তিন দশক তিনি থেকেছেন। এরপর তুলে ফেলা হয় যে কয়টি গাছের জন্য বাড়িটি ছায়াময় হয়ে থাকতো সেগুলো। আব্দুস সালাম দেখেন একটা ধ্বংসস্তূপ যেন ভাবলেশহীনভাবে পড়ে আছে। অথচ এখানে হাসি ছিলো, কান্না ছিলো,ছিলো স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, আশা ছিলো, হতাশা ছিলো,আনন্দ-বেদনা মাখা অনেক দিন ছিলো, রাত ছিলো। আর এখন শরীর থেকে সবকিছু ঝেড়ে ফেলে দিয়ে উঠোনযুক্ত বাড়িটি কেবলই স্মৃতি হয়ে উঠেছে।

ভেঙ্গে পড়া বড় টুকরো ছোট ছোট টুকরো হয়ে ট্রাকে উঠে। যেসব বাঁকা রড একদা সোজা হয়ে এখানে লেগেছিলো, এখন আবার সেগুলো বাঁকা হয়ে স্থানান্তরে যায়। আর এভাবে খসে পড়া পলেস্তারা, ভাঙ্গা ইট, রড তাদের একত্র হওয়ার ইতিহাসকে পেছনে ফেলে দূরে সরে গেলে আব্দুস সালাম টের পান এখানে বিরাজ করছে কেবলই শূন্যতা। কাজ শেষ হলে ভাঙ্গার যন্ত্রপাতি চলে যায়। ধীরে ধীরে আসতে থাকে নির্মানের যন্ত্রপাতি।বারো তলা ভবন নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞকে সামনে রেখে শুরু হয় ভিত্তি স্থাপনের জন্য মাটি খুঁড়ার কাজ। কিন্তু তার অনুভূত শূন্যতা এতে কাটেনা। বরং দীর্ঘ ও ঘন হতে থাকে।

বড় ছেলের সেদিনকার কথাটি বেশি লম্বা ছিলোনা। কিন্তু এর ধাক্কা তাকে অনেকদিন টলোমলো করে রেখেছে। ডেভেলপার কোম্পানি যে বাড়িটি নেয়ার জন্য চুক্তি করতে চাইছে, এ ব্যাপারটি তার দুঃশ্চিন্তা বাড়িয়েছে, ফলে প্রেসার ও ডায়াবেটিস বেড়েছে। অল্প কটি কথায় বড় ছেলের যে আগ্রহ দেখা গেছে তা তার ভাবনাকে আরো গভীর করেছে। তিনি কোনদিন কোনভাবে ভাবতে পারেননি বাড়ি নিয়ে এরকম কথা উঠবে। বাড়িটিকে বাণিজ্যিকভাবে পুনর্নিমাণের সুযোগ তো তার সামনে এসেছিলোই। বাড়িভাড়া থেকে মাসশেষে তাহলে ভালো অংকের টাকাই হাতে আসতো। তিনি সেদিকে এগুননি। যে ভালোলাগা ,ভালোবাসা জড়িয়ে আছে এর সাথে, তা হারাতে চাননি।এটি তার কাছে শুধু আবাসস্থলই নয়, তার চেয়ে বেশিকিছু। যৌবন থেকে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছানোর পথ-পরিক্রমা। এর নানা ঘটনা, উপঘটনা এখানে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন রঙে। নিজের যা আছে তা নিয়ে জীবন কেটেছে,কেটে যাচ্ছেও। এর বেশি তার প্রয়োজনও নেই। তাই শেষে ছেলেকে বলে দিলেন ‘তোমরা এ ব্যাপারে আর অগ্রসর হয়োনা।বাড়ি যেভাবে আছে সেভাবেই থাকবে।’ নির্ভার লাগে এরপর নিজেকে। কয়েকদিনের ঝড়ো অবস্থার পর শান্ত আবহ বিস্তৃত হয় মনজুড়ে।

কিন্তু তার চিন্তা-ভাবনার সাথে অন্যদের চিন্তা-ভাবনা মিলে যাবে এমন কোন কথা নেই। তিনি যে চেতনা ধারণ করেন অন্যরাও যে একইভাবে তা ধরে রাখবে তা-ও কথা নয়। প্রত্যেকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, ভালো লাগা, মন্দ লাগা আছে।একজনের পছন্দের বিষয় অন্যের কাছে বিরক্তিকর ঠেকতে পারে।তার সিদ্ধান্তটিও অন্যদের মনোমত হয়নি।সম্মিলিতভাবে আব্দুস সালামের ছেলেরা যে স্বপ্ন দেখে এসেছে কয়েকদিন ধরে-বড় ছেলের মাধ্যমে এসে যা সংক্রমিত হয়েছে অন্যদের  মধ্যেও-তাতে আঘাত লাগে।তাই মেনে নিতে পারেনা তারা এ সিদ্ধান্ত। তাদের আশা ছিলো বাবাকে বললে রাজি হয়ে যাবেন। কিন্তু তা না, পুরো উল্টো, তিনি যেন প্রতিপক্ষ হয়ে তাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তাদের স্বপ্ন-যাত্রায় বাবা বাধা দিবেন একথা তারা ভাবতেও পারেনি।তবে এ প্রতিকূল অবস্থায় থেকেও তারা দমে যায়নি। বাবার এরকম মনোভাবের কারণ খোঁজার পাশাপশি কিভাবে তাকে বুঝানো যায় তা নিয়েও মাথা ঘামানো শুরু করে।এতগুলো টাকা দিবে, সাথে তিনটি ফ্ল্যাট। এগুলো কী ছাড়া যায়? না তা হবেনা,যে করেই হোক বাবার মত পরিবর্তন করাতেই হবে।পরামর্শ চলে এ নিয়ে নানা ভাবে। বিবাহিত দুজনের বউরাও একাজে এগিয়ে আসে।কিছুদিন সময় নিয়ে, যুক্তিজাল তৈরি করে, ইতোমধ্যে কাছে টানতে পারা মাকে সাথে নিয়ে বাবার সামনে দাঁড়ায় তারা।

আদ্দুস সালামের স্ত্রীর যুক্তিঃ

এই পুরনো বাড়িটি রেখে কী হবে? ওরা তো বলেছে তিনটি ফ্ল্যাট দিবে। ছেলেদের থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে তাহলে। বাস,আমাদের আর কী দরকার? বাড়তি কোন চিন্তা নিতে হচ্ছেনা। আর এ বাড়ি দিনে দিনে নষ্ট হবে। একসময় এমনিতেই নতুন করে বানানোর দরকার পড়বে। এটা যদি এখনই হয়ে যায় ক্ষতি কী? তাই ডেভেলপারকে দিয়ে দিতে আপত্তি করার মতো কোন কারণ দেখিনা।

বড় ছেলের যুক্তি:

বাড়িটা তুমি নিজে বানিয়েছিলে বাবা। এটির প্রতি তোমার ভালোলাগা থাকবে,তুমি নষ্টালজিক হবে এতো খুবই স্বাভাবিক।নিজের হাতে গড়া জিনিসের প্রতি বেশি টান থাকেই।এটা আমরা কেউই অস্বীকার করছিনা। আমরাও তো এ বাড়িতে বড় হয়েছি। আমাদের অনেক স্মৃতি আছে এখানটাকে ঘিরে। কিন্তু এ যুগের কথাও তো চিন্তা করতে হবে। দেখো,আমাদের ডানে বামে দুদিকেই বিশাল বাড়ি হয়ে গেছে। আমরা পড়ে গেছি একেবারে চিপায়। এটা দেখতেও অনেক বিশ্রী লাগে।

মেঝো ছেলের যুক্তিঃ

সামনে এত ফাঁকা জায়গা রেখে বাড়িটা রাখার মানে কী বাবা? প্রতি ইঞ্চি জাযগার দাম এখন কত! কেউ এখন এরকম করেনা। আমরা যদি ওদেরকে বাড়িটা দিয়ে দেই তাহলে নগদ টাকার পাশাপাশি তিনটি ফ্ল্যাট পাওয়া যাচ্ছে। এতে তোমার দ্বিমত করার কারণ বুঝিনা বাবা।

ছোট ছেলের যুক্তিঃ

আমাদের বাড়িটা একেবারে সেকেলে হয়ে গেছে। এরকম বাড়ি এ শহরে খুঁজলে কয়টা পাওয়া যাবে? দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনের বাড়ি হচ্ছে এখন। ডেভেলপার কোম্পানি তো বর্তমান স্থাপত্যরীতিতে বাড়ি বানাবে। সেসব ফ্ল্যাটে থাকলে জীবনটাও অনেক আরামপ্রদ হবে। সুযোগ যখন আমাদের সামনে এসেছে সেটাকে ঠেলে সরিয়ে পুরাতন মডেলের এ বাড়ি রাখা ঠিক হবেনা।

এটা খুবই সত্য যে সময় নিত্য পরিবর্তনশীল। এগিয়ে চলার সাথে সাথে নিজের অঙ্গ থেকে পুরনো অনেককিছু ঝেড়ে ফেলে, নতুনকে বরণ করে নেয় ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। আজ যা নতুন কালই তা পুরাতন। আবদুস সালাম যে তা বুঝেননা এমন নয়; তার চোখের চোখের সামনেই কত কিছু ঘটে গেছে, ঘটে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।তার ছেলেরাও যে নতুনত্ব চাইবে  এটা অস্বাভাবিক নয়।যুগের হাওয়া অন্য অনেকের মতো তাদেরকেও প্রভাবিত করেছে। তবু সবার কথা শুনে তিনি একটু অবাকই হলেন। কেউ-ই তাকে অন্তত একটু হলেও বুঝার চেষ্টা করেনি। নিজেদের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে একেবারে একদিকে সরিয়ে দিয়েছে। তার মুখে কোন কথা আসেনা অথবা আনতে চাননা ।এত যুক্তির পর তারও তো বলার মতো কিছু কথা আছে।কিন্তু নিঃশব্দই থেকে যান। শুধু রাতে একান্তে স্ত্রীর সাথে কথা বলেন —

‘তুমি কেমন করে বাড়িটা ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবতে পারলে সানজীদা? ছেলেরা যা দেখেনি তুমি তো সেসব দেখেছ। কতটা শ্রম,কত স্বপ্ন এর পেছনে ছিলো। রিস্ক ছিলো, বোঝা মাথায় নিয়ে কাজ এগিয়ে নিতে হয়েছে। তারপরও নিজেদের একটি বাড়ি হবে বলে কত আনন্দময় সময় আমরা পার করেছি। ছেলেরা হয়তো এসব অনুভব করতে পারবেনা। কিন্তু তুমি তো সেসবের স্বাক্ষী ,সঙ্গীও ছিলে।অথচ এখন ভেঙ্গে ফেলার ব্যাপারে কী সুন্দর যুক্তি দেখালে! যাই হোক, আমি তোমাদের কথা মানতে পারছিনা।’

কিন্তু সানজীদা তার অবস্থান থেকে নড়েননা। আগের কথাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যান কেবল ‘আমাদের সবকিছু তো তাদের জন্যই। আমাদের চিন্তা-ভাবনা পুরনো হয়ে গেছে। তারা এ যুগের মতো করে ভাববে। তারা যা ভালো মনে করে আমাদের তাতে সায় দেয়া উচিত।’

নিজের মত না বদলানোয় আব্দুস সালাম স্পষ্টতই একা হয়ে পড়েছেন। একা একাই ভাবেন। অবস্থান স্পষ্ট করে দিলেও ভাবনাবৃত্ত থেকে বের হতে পারেননা তিনি। দিনে রাতে এই ঘূর্ণন চলে ক্রমাগত। তিনি তাতে নিমজ্জিত হন। কারো সাথে যেহেতু শেয়ার করতে পারেননা তাই এই একাকী নিমজ্জন তাকে মাঝে মাঝে বিরক্ত করে তোলে। এসবের ভেতর থেকেই সবার উত্থাপিত যুক্তিগুলো খন্ডন করেন। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার চেষ্টা করেন।নিজের সিদ্ধান্তকে দেখেন আরো তলিয়ে,আরো নিবিড়ভাবে। আর এখানেই বারে বারে তাকে থেমে যেতে হয় যে, বাড়ি কোনভাবেই হাতছাড়া করা যাবেনা।

নিজেদের ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার পর তিনভাই ইন্টেরিয়র ডিজাইনার দিয়ে ভেতরটা নিজেদের মতো করে ডিজাইন করিয়েছে। কাজ শেষ হলে তারা বাবাকে নিয়ে দেখায়। কোন পেইন্ট কোথায় কেন দিয়েছে তা বুঝিয়ে দেয়। দৃষ্টিনন্দন দরজা এবং টাইলসের দাম কতো পড়েছে, বাথরুমের ফিটিংসগুলোর সৌন্দর্য এবং স্থায়িত্ব, কিচেন এবং ডাইনিং এর বিশেষত্ব, বেডরুমের আরমপ্রদায়ী আবহ ,ড্রয়িংরুমের বাহারি ডিজাইন-সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলে। আবদুস সালাম দেখেন আসলেই অনেক সুন্দর হয়েছে ফ্ল্যাটগুলো। চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতোই সব কাজ। সব দেখে তিনি বলেন-‘খুব সুন্দর হয়েছে কাজ। তোদের পছন্দ আসলেই অনেক ভালো। আমার ভালো লেগেছে।’

এদিকে আব্দুস সালামের ছেলেরা বাবার দৃঢ়তায় হতাশ এবং অখুশি হলেও আটকে থাকেনা। আগের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে নতুনকরে ভাবতে শুরু করে। পৃথক এবং যৌথভাবে এ প্রক্রিয়া চলে। ডেভেলপার কোম্পানির সাথেও লিঁয়াজো রাখে বড়জন। এদিকটাতো কঠিন নয়। নিজের বাবা-ই কঠিনতম ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বাবাকে কোনদিন কোন বিষয়ে এভাবে কঠিন হতে দেখেনি। এ পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হয়নি। তাই তাকে নিয়ে বেশি করেই মাথা খাটাতে হচ্ছে। কৌশল ঠিক করে মনোমত না হলে পাল্টাতে হচ্ছে নিজের কাছেই। একেবারে নতুন যুক্তি নিয়ে বাবার সামনে হাজির হয়, কখনোবা পুরনোটিকেই বদলে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। এভাবে একেকজন একেকভাবে তাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

আব্দুস সালাম খেয়াল করেন বাড়ির বিষয়টি সামনে রেখে তার ছেলেদের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। তার দ্বিমতের পর থেকে তারা একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে। তাদের চেহারায় ও যেন এর ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তাদের কথার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝে তিনি তার দিকটা বুঝাতে চাইলেও তারা সেদিকে যায়না বরং তার চিন্তা-ভাবনাকে পুরনো বলে খারিজ করে। তার মনোবৃত্তিকে সেকেলে বলে খোঁচা দিতেও ছাড়েনা। দিন এভাবেই এগুতে থাকলে পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যেতে থাকে। ব্যাপারটি এত ঘোলাটে হবে তিনি ভাবতেও পারেননি। ঐতিহাসিক কতো নিদর্শন যুগ যুগ ধরে নিজস্বতা নিয়ে টিকে আছে। তার বাড়িটির ঐতিহাসিক কোন মূল্য হয়তো নেই,তবু তো নিজস্বতার ছোঁয়া আছে এতে। এটিই কম কিসের। অন্যের থেকে আলাদা করে তো  এই নিজস্বতাই। ছেলেদের কথাবার্তায় ইদানিং যুক্তির পাশাপাশি আগ্রাসী মনোভাবও ফুটে উঠছে যেন। আব্দুস সালাম অসহায় বোধ করেন এতে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পারিবারিক বিশৃঙ্খলা বাড়ে কিনা এটাও তার ভাবনাকে এখন আলোড়িত করে। অবশেষে নিজেকে নিজেই তীরবিদ্ধ করে, নিজের ইচ্ছের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে বাড়ি ডেভেলপারকে দিতে সম্মতি দিলেন।

সেদিন তার বাবার কথা খুব মনে পড়ে। অনেক আগে মারা যাওয়া বাবার চেহারা দিনে দিনে ধূসর থেকে ধূসরতর হয়েছে। যখন বাবা মারা যান তখন তার যৌবনের দিন,আর এখন প্রৌঢ়ত্বে আসীন। সময়ের প্রবহমানতায় বাবা অনেক দূর চলে চলে গেছেন, তবু তার অস্তিত্ব যেন চতুর্দিকে বিরাজমান; এই বাড়িটা তো তারই পেনশনের টাকা দিয়ে তৈরী। অবসরে যাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হলে অনেক ঝক্কি ঝামেলা পেরিয়ে সে টাকা তোলা হয়েছিলো। এ টাকা দিয়ে কী করা হবে তা নিয়ে বিভিন্নমুখী চিন্তা-ভাবনা চলতে থাকলে মায়ের পরামর্শ মতো জায়গা কিনে বাড়ির কাজ হাত দেয়া হয়। বাড়ির কাজ কিছুদূর অগ্রসর হলে টাকার অপর্যাপ্ততার দিকটি ফুটে উঠে। তখন গ্রামের বাড়িতে আর কখনো ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় সেখানকার কিছু জমি বিক্রি করে দেওয়া হয় বাড়ির অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিতে। বাবা এসবের কিছুই দেখেননি। তার রেখে যাওয়া সম্পদ ছেলে, ছেলে বউ,নাতিরা ভোগ করছে। এসবও তিনি দেখেননি। হয়তো দেখবেনও না এসব ভাঙ্গা-গড়া। নাকি দেখবেন? মা কী দেখবেন? মায়ের কথাও মনে না এসে পারেনা। তিনি তো এ বাড়িতে থাকতে পেরেছিলেন। মা কী ব্যাথা পাবেন এই ভাঙ্গা-গড়ার খেলা দেখে দেখে? সারাদিন আব্দুস সালামের মাথায় এগুলো কিলবিল করে।

কিছুদিন পর তিন দশকের আবাসস্থল ছেড়ে চার বাসা পেরিয়ে একটি ফ্ল্যাটে চলে এসে আব্দুস সালামের অনুভূতি হলো- জাস্ট বাস্তুচ্যূত। এ স্থানান্তরকে তিনি অন্য কোনভাবে ভাবতে পারলেন না। আরো মনে হলো যতদিন বেঁচে থাকবেন, নতুন বাড়ি তৈরী হলে সেখানে গেলেও এ অনুভূতি মুছে যাবেনা। কেননা তার মতো করে কোনকিছুই সেখানে পাবেননা। সেখানে সবকিছু থাকবে কৃত্রিমতার মোড়কে আবদ্ধ। আপন জগতেও থাকবে পরনির্ভরশীলতার একটা সূক্ষ ছাপ। আব্দুস সালাম এসব ভেবে ভেবে উদ্বিগ্ন হন। তার মনোলোকে অস্থিরতা বাড়ে বার্ধক্যের গার্ম্ভীযতাকে পাশ কাটিয়ে। আর এতে করে যেন বার্ধক্যের ছাপ আরো ঘন হয় শরীরজুড়ে, মনজুড়েও। স্ত্রী বা ছেলে বা ছেলেবউরা তাকে নিয়ে চিন্তিত হলে তাদেরকে মানা করেন এসব থেকে বিরত থাকতে। সাথে যোগ করেন তিনি দিব্যি আছেন, কোন সমস্যা হচ্ছেনা।

বাড়ি তৈরীর কাজ এগিয়ে চলেছে, খুঁড়িয়ে নয়, তরতরিয়ে, জাঁকজমকের সাথে। ব্যক্তি হিসেবে তিনি টাকার অভাব বোধ করেছিলেন। আর এটা পূরণ করতে গিয়ে কত চাপ পড়েছে মাথার ভেতর। দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে শ্রান্ত হয়েছেন, ক্লান্ত হয়েছেন। কিন্তু কোম্পানির সে সমস্যা নেই। একদিক থেকে টাকা এনে আরেকদিকে ছাড়বে ।বাড়ি বানাতে যে খরচ হয় তার চেয়ে অনেক বেশি তারা তুলে নিয়ে যেতে পারে। তাই তাদের কাজ চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে। আব্দুস সালাম বারান্দা থেকে দেখতে পান এ কর্মচাঞ্চল্য। দেখাটা যে খুব স্পষ্ট তা নয়। ছানি অপারেশন হয়েছে দু চোখেই। অবশ্য এসব যে দেখতে খুব ইচ্ছে করে এমনও নয়। তবু কিসের টানে যেন বারান্দায় চলে যান। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ চলে। এর ভেতর কয়েকবারই বারান্দায় যাওয়া হয়।নিচে গেলেও কখনো কখনো সেদিকে ঘুরে আসেন।তবে নিজের তত্তাবধানে বাড়ি বানানোর সময় যে অনুভূতি, যে আবেগ নিয়ে যেতেন,তার বিন্দুমাত্রও এসময় থাকেনা। হয়তো যান সেগুলো মনে করতেই। সেই বাড়ি আর আসবেনা, কিন্তু সে স্মৃতি তো আর বিলুপ্ত হবার নয়। তার মস্তিষ্কের কোণে কোণে যে লেগে আছে সেসব দিনের কথা। তাকে এগুলো তাড়িত করে। অন্য সবাই ভুলে যেতে পারে। কিন্তু চাইলেও কী  তার পক্ষে ভুলা সম্ভব?

ছেলেরা মাঝে মাঝে তার সামনে নতুন বাড়ির রুপরেখা তুলে ধরে। কি কি জিনিস সেখানে থাকবে,বলে। সেসবের কারণে তাদের জীবন যে আরামপ্রদ হবে তা একটু জোর দিয়েই বলে।আরো জোর দেয় একথাতে যে, বাবা তখন বুঝতে পারবেন তাদের সিদ্ধান্ত কতো সঠিক ছিলো। বাবার কষ্ট হচ্ছে দেখে তারা ব্যাথিত হয় তার সামনে আর একথা বলে সান্তনা দিতে চায় যে,সেখানে উঠে গেলে এসব পুষিয়ে যাবে।

ছেলেদের কথা শুনে আব্দুস সালামের হাসি পায়। তাদের এসব কথা তার কাছে যে কতটা অর্থহীন তা যদি তারা বুঝতো তাহলে হয়তো এভাবে বলতোনা। তারা বুঝতে পারেনা তাদের উচ্ছাসমাখা কথাগুলো তার কাছে এসে কতটা হালকা, কতটা পানসে হয়ে যায়। তিনি তো এসব চাননি। অনেক বিলাসবহুলতা থাকবে সেখানে হয়তো, কিন্তু আরাম কী থাকবে? তার মনে হয়না। তার নিজের বাড়ির মতো করে আরাম থাকবেনা,তিনি পাবেননা, এটা নিশ্চিত। ছেলেরা তার চোখের সামনে যা তুলে ধরছে তা নিজের বাড়ির বিকল্প হতে পারেনা কোনভাবেই। চতুর্দিকে এত নাগরিক কোলাহল,এত ব্যস্ততা,ক্রমবর্ধমান মানুষের গমগম । এতকিছুর ভেতরে থেকেও নিজের বাড়িটিকে মনে হতো শান্ত, নিরাপদ আশ্রয়স্থল। হ্যাঁ,সময়ের সাথে তাকেও অনেক পরিবর্তন আনতে হয়েছে।তার চোখের সামনে কতকিছু ঘটে গেলো। ঢাকা থেকে অনেকদূরের এই মফস্বল শহরটি ধীরে ধীরে মহানগর হয়ে উঠেছে। তারা যখন এখানে বসত গাড়েন প্রায় গ্রাম এলাকা ছিলো এটি। এখন এখানে দাঁড়িয়ে  হয়তো সেসব কল্পনায় আনতে পারবেনা কেউ।হয়তো তাই বাড়িতে আর চুনকাম নেই, সিমেন্টের ফ্লোর তুলে টাইলস লাগানো হয়েছে । এভাবে সময়ের সাথে সাথে বেশ কিছু সংস্কার ও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। কিন্তু কখনোই মূল কাঠামোকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেননি। এটাকে ভিত্তি ধরেই বাকিগুলো করা হয়েছে।আর এখন ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা না রেখে সবকিছু হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে।

মাঝে মাঝে আব্দুস সালামের মনে হয় আরো দূরে বাসা ভাড়া নিলে ভালো হতো। তাহলে চোখের সামনে এসব পড়তো না। কাছে যেতেও ইচ্ছে হতো না। দু-ক্ষেত্রেই দূরত্ব পথ আগলে দাঁড়াতো তখন। এই যে আজ একতলার ছাদ ঢালাই হচ্ছে, সেখানে যেতে মন চেয়েছে কয়েকবার। তবু আটকে রেখেছেন নিজেকে। অথচ নিজে যখন কাজ করিয়েছিলেন ছাদ ঢালাইয়ের দিন সার্বক্ষণিক থেকেছেন,খুঁটিয়ে খঁটিয়ে দেখেছেন সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে কি-না। আজ একই কাজ হচ্ছে,অন্যভাবে। তার সংস্রব কোনভাবেই সেখানে নেই। বাসা ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রেও ছিলোনা। ছেলেরা দেখেশুনে নিয়েছে।সবকিছু যে তার সেচ্ছাধীন নয় দিনে দিনে যেন স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। বার্ধক্য-জর্জর শরীর নিয়ে অনেককিছু করাও সম্ভব নয় তার পক্ষে। তাই জড়াতেও চাননা সবকিছুতে। নিজেকে সঁপে দিয়েছেন অন্যদের অনুকূলেই। সময় ও পরিস্থিতি যেদিকে নিয়ে যাবে চলে যাবেন সেদিকেই। হয়তো এভাবেই  স্বত্ত্বাহীন হয়ে যাবেন একেবারে।

একতলা হয়, তারপর দুতলা, তিনতলা, চারতলা করে উপরের দিকে উঠতে থাকে বাড়ি।যত উপরে উঠে মনে হয় তত দূরে চলে যায়। আব্দুস সালামের বয়সও বাড়ে সাথে সাথে। বয়সের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে তিনিও তো অনেকদূরে চলে এসেছেন। তাই কী তারও একটা দূরত্ব রচিত হয়েছে আশপাশের সাথে? শারীরিক কারণে বাসার ভেতরেই থাকেন বেশিরভাগ সময়। মন চাইলেও বাইরে যাওয়া হয়না। আর গেলেও কাছেই হাঁটাহাঁটি করে চলে আসেন। পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে কথা হয়, তবে সংক্ষিপ্ত। পরিচয়ের এই গন্ডিও অনেক ছোট হয়ে এসেছে। এখানে আসার পর যাদেরকে পেয়েছিলেন,যাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিলো,তাদের অনেকে মারা গেছে, অনেকে তারই মতো ঘরেই আবদ্ধ থাকেন। বয়স সবাইকেই কোঠরে ঠেলে দিয়েছে। কাউকে বুঝতে না দিয়ে ধীরে ধীরে পরিমন্ডলটি আলগা হয়ে গেছে। তাই তিনি এখন ঘুরপাক খান কেবলই পরিবারের ভেতর। সেখানেও তো একটা একাকিত্বের সুর বাজে।ছেলেরা ব্যস্ত, ছেলে-বউরা ব্যস্ত। তাদের সাথে তো আর মনখুলে আলাপ করা যায়না। কাছে বলতে এখন শুধু স্ত্রী; বিয়ে করার পর থেকে এ পর্যন্ত যার সাথে জীবন কাটিয়েছেন। তারই সাথে বা আর কী আলাপ করা যায়, কতটুকুইবা চালানো যায় জুড়ে দেয়া আলাপ। বাড়ির বিষয়ে কারো সাথেই কথা বলেননা। এখন এটা তার একান্ত বিষয় হয়ে গেছে ।তারই একান্ত স্মৃতিচারণায় উঠে আসে নীরবে,নিভৃতে।

নিজেদের ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার পর তিনভাই ইন্টেরিয়র ডিজাইনার দিয়ে ভেতরটা নিজেদের মতো করে ডিজাইন করিয়েছে। কাজ শেষ হলে তারা বাবাকে নিয়ে দেখায়। কোন পেইন্ট কোথায় কেন দিয়েছে তা বুঝিয়ে দেয়। দৃষ্টিনন্দন দরজা এবং টাইলসের দাম কতো পড়েছে, বাথরুমের ফিটিংসগুলোর সৌন্দর্য এবং স্থায়িত্ব, কিচেন এবং ডাইনিং এর বিশেষত্ব, বেডরুমের আরমপ্রদায়ী আবহ ,ড্রয়িংরুমের বাহারি ডিজাইন-সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলে। আবদুস সালাম দেখেন আসলেই অনেক সুন্দর হয়েছে ফ্ল্যাটগুলো। চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতোই সব কাজ। সব দেখে তিনি বলেন-‘খুব সুন্দর হয়েছে কাজ। তোদের পছন্দ আসলেই অনেক ভালো। আমার ভালো লেগেছে।’

— আমরা বলছিলাম না নতুন বাড়ি হলে চেহারা পাল্টে যাবে।

— ঠিকই বলেছিলে।

বাবার কথায় ছেলেরা খুশি হয়। তাদের স্থির বিশ্বাস ছিলো যে, এসব বাবার পছন্দ হবেই। বাবা এখন নিশ্চয় বুঝতে পারবেন তারা ঠিক কাজটিই করেছে।

ছেলেদের খুশি করার জন্য মুখে প্রশংসা করলেও আব্দুস সালাম এসবে কোন উচ্ছাস বোধ করেননা। তার আগের বাড়িটা মনশ্চক্ষুতে ভেসে আসে এসব দেখার পর ।ফ্ল্যাটগুলোর তুলনায় যে তার বাড়ি কিছুই ছিলোনা এটা অনস্বীকার্য। একটার পাশে আসলে আরেকটাকে দাঁড় করানোই যায়না। সময় যত এগিয়ে গেছে তার বাড়ি তত পুরনো তত সেকেলে হয়েছে। তখনকার চিন্তা-ভাবনার সাথে এখনকার চিন্তা-ভাবনার তফাৎ ঘটে গেছে অনেক।এসব তুলনা করেও তিনি শান্তি পাননা। ফ্ল্যাটে যাওয়ার দিন যত ঘনিয়ে আসে তার অস্বস্তি তত বাড়তে থাকে। ছিলো আগের বাড়িটি সেকেলে, ঠিক আছে ,গুণে মানে ফ্ল্যাটগুলোর চেয়ে অনেক নিম্নমানের,কিন্তু সেখানে লেখা ছিলো তার ব্যক্তিগত ইতিহাসের দিনলিপি। আব্দুস সালামের মনে হয় এই বহুতল ভবনটি যেন গ্রাস করে ফেলেছে তারসর্বস্ব।

Comments

comments

শামসুল কিবরিয়া

শামসুল কিবরিয়া

জন্ম:০৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ ,হবিগঞ্জ জেলায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মান সহ স্নাতক ও ¯œাতকোত্তর।বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সদস্য হিসেবে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় প্রভাষক পদে কর্মরত। লেখালেখি: ছোটগল্প ও সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।বিভিন্ন লিটল ম্যাগ ও সাহিত্য পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি