সাম্প্রতিক

এলিঃ হারাইয়া যাওয়ার আগে একটা মুহূর্ত খালি । হাসান শাহরিয়ার

তখন শুধু এলিরে দেখা যায়; উড়তেছে এলি। না আকাশ, না ঘুড়ি। না সমুদ্র; না তার বালুর পার। এলির মুখ জ্বলজ্বল করতেছিল যেন এক অমাময়ী বিষাদ গইলা যাইতেছিল কোন বরফ-পাহাড়ের নিচে। এলির গোল গাল, টোল-লটকানো হাসি, সরু নাক, লাল এইটুক ঠোঁট, গলায় লাল স্কার্ফ। হিজাবে মোড়ানো পৃথিবীর সহসা টের না পাওয়া এক অতল সিম্ফনি যেন এলির ওই মুখ; উড়তেছিল অথবা কেউ উড়াইতেছিল তোমার অথবা আমার খালি শুকনা চোখের ভিতর। এইটা এমন এক দৃশ্য — তুমি যতই এর ভিতর যাইতে থাকবা ততই তোমার মনে হইবো, একটা ডিফর্মড আনসারটেইনটির লগে যেন তোমার এখনই দেখা হইতে যাইতেছে। তোমার সময় ধারণা অচেতনে যা তোমারে দিন কে দিন বুড়া বানাইয়া দিতেছে, আচমকা মনে হইবো — তুমি এর প্রত্যেকটা আঘাত টের পাইতে শুরু করছো। এই দৃশ্যের ভিতর তুমি এমন এক পরিণতির দিকে যাইতে থাকো, তোমার অস্তিত্বের ভারে বা এর এক ধরণের বিভ্রমে যারে তুমি কখনোই ঠিক বুইঝা উঠতে পারো না। এই সুন্দরের ভিতর হারাইতে হারাইতে তুমি বরং ওই নিয়তির দিকেই যাও — যেইখানে তুমি অসহায়; যেইখানে তুমি সাংঘাতিক রকম অপ্রস্তুত। আর তখন তোমার লগে শুধু আকাশ, শুধু একলা একটা ঘুড়ি। তখন শুধু সমুদ্র; তার মলিন বালুর পার।

যেহেতু আমি তুমি কেউ ইরানি না; এর ভাষা বা ভাষার ডাইলেক্ট কিছুই নিজের না — এই সাস্পেন্সের ভিতর দিয়া যাইবার সময় নিজেরে তোমার অসহায় মনে হইতে পারে। তুমি তখন ফরহাদির দেখানো ইরানি কাস্ট-কাস্টমসের দিকে মনোযোগ দিতে পারো। অথবা ক্যামেরার খুবই লিনিয়ার মুভমেন্টগুলা দেখতে পারো যা তোমারে ধীরে ধীরে ফরহাদির তৈরি করা জালের মধ্যে আটকাইয়া ফেলবে। ওই যে বললাম — একটা দেখানো জীবনের বাইরে একটা বা এর থেইকা দুই-একটা বেশি মোমেন্ট-ই বোধ হয় এই জীবনের অর্থ; (যদি তুমি এর একটা অর্থ করতে চাও) বা যে জীবন বইয়া বেড়াইতেছো তুমি- তার একটা দিশা।

ইরানি ফিল্ম-মেইকার আসগর ফরহাদির ‘এবাউট এলি’ দেখার পর আমি আমার জীবনের দিকে ফিইরা চাই। ওই মোমেন্টটারে আইডেন্টিফাই করতে চাই যার পর থেইকা জীবন একদিকে ঘুইরা গেছে। আমি নিশ্চিত, এর পিছে আমার নিজের কোন প্ল্যান ছিল না মোটেও। বাই ডিজাইন, আমি কিছুই করি নাই। বরং আমি খালি আমার ইন্সটিংক্টগুলারে কিছুটা পাত্তা দিছি কেবল; কিছুটা পাত্তা দেই মাঝে মাঝে। এর বাইরে একধরণের নিয়ন্ত্রণহীনতাই আমার নিয়তি। সোসাইটি যেই সব মিটার-স্কেল দিয়া তোমারে মাপে, আমার তাতে আগ্রহ হয় না মোটে। ফলে চারপাশের ভাঁজ করা লোকজন যেইসব ভান নিয়া থাকে, সেইদিকে আমি তাকাইতে যাবো কেন? মানে একটা দেখাইবার জীবন-ই ত নাকি? আমার মনোযোগ বরং এর একটা মুহূর্তে, এর একটা ইশারায় যা অনেক গহিন আর ভরা; যা অনেক ডন্টিং আর অনেক চার্মিং।

একজন ক্রিয়েটিভ লোক সম্ভবত এইটাই তোমারে দেখাইতে চায়। যেমন এইখানে ফরহাদির ‘এবাউট এলি’ বা ‘দারবারেয়ে এলি’ নিয়া বলতেছি। একজন ইউনিক স্টোরি-টেলার হিসাবে; ভিন্ন একরকম সাস্পেন্সের ইমেন্স মেইকার হিসাবে ফরহাদি বিখ্যাত। আমি অন্য কথা বলতে চাইতেছি তবে। যেহেতু আমি তুমি কেউ ইরানি না; এর ভাষা বা ভাষার ডাইলেক্ট কিছুই নিজের না — এই সাস্পেন্সের ভিতর দিয়া যাইবার সময় নিজেরে তোমার অসহায় মনে হইতে পারে। তুমি তখন ফরহাদির দেখানো ইরানি কাস্ট-কাস্টমসের দিকে মনোযোগ দিতে পারো। অথবা ক্যামেরার খুবই লিনিয়ার মুভমেন্টগুলা দেখতে পারো যা তোমারে ধীরে ধীরে ফরহাদির তৈরি করা জালের মধ্যে আটকাইয়া ফেলবে। ওই যে বললাম — একটা দেখানো জীবনের বাইরে একটা বা এর থেইকা দুই-একটা বেশি মোমেন্ট-ই বোধ হয় এই জীবনের অর্থ; (যদি তুমি এর একটা অর্থ করতে চাও) বা যে জীবন বইয়া বেড়াইতেছো তুমি- তার একটা দিশা। মনে হয়, ফরহাদি এইরকম কিছু মোমেন্ট তার ক্যামেরায় বানাইয়া ফেলতে পারেন।

Comments

comments

হাসান শাহরিয়ার

হাসান শাহরিয়ার

জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৮৫, একটি কবিতার বই রেরিয়েছে ‘বালির ঘর’ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ jhs.phy@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি