সাম্প্রতিক

নিয়তির নিরিখ । শেখ লুৎফর

একটানে ঘন্টা দেড়েক হাঁটার পর মানুষটা টের পায়, কী একটা কথা যেন তার মনে চোরা কাঁটার মতো খচখচ করছে। শত চেষ্টাতেও আদত বিষয়টা ধরতে পারছে না! তাই সে একলা একলা মাথা ঝাকায় আর নিজের সাথে আক্ষেপের সুরে কথা বলে,‘ আসলে জীবনডা মস্ত কমিন। চৌপাশে খালি কারেন্টের জাল পাতায়া রাহে! 

বলছিলাম আকন্দ বাড়ির বড় পোলা কাশুর কথা। গত জষ্টিমাসে তার চল্লিশ পেরিয়েছে। টিংটিঙে গতরের মানুষটা রোদে পোড়তে পোড়তে ইটখলার ঝামা । হাঁটার মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ কাশুর মনে একটা পুকুর ঘাট দপকরে ভেসে ওঠে। বিশ বছর আগের শেওলাধরা সেই ভাঙা ঘাটটা তিলেকের জন্যও মন থেকে সে তাড়াতে পাড়ে না! পাকা সড়ক ধরে শাঁ শাঁ বেগে সিএনজি ছুটে যায়, থর থর করে মাটি কাঁপিয়ে ট্রাক আসে। শাঁ করে অজানার দিকে ছুটে যায় দানব। সে সড়কের বাজু ধরে হাঁটতেই থাকে। আর কাশুর একটু একটু মনে পড়ে ; তখন ছিল শাওন মাসের খরা। তামান আসমানে এক দলা মেঘ নাই, এক ফোঁটা বৃষ্টি নাই। চষা ক্ষেতগুলার মাটিতে তালের আঁশের মতো চিকন চিকন ফাটল জেগে ওঠছে! আকাশটা অনেক উঁচুতে; বেগানা বেটিমানুষের মতন বেজার মুখে দিনমান বসে থাকে। গাঙপারের বাঁশঝাড়ে চাতক পাখি রোদন পাড়ে, – মেঘ দে, পানি দে…।

সবেমাত্র তার গোঁফ ওঠতে শুরু করছে। শাওনের সেই দুপুরে, সে একলা এসে তাদের পুকুর ঘাটে দাঁড়ায়। মনে বাতির শিষের মতো একটা ছায়া নড়ছে । নিজের কোনো ভাই-বোন ছিল না। সৎ মায়ের সংসারে সে পরগাছার মতো অনাহক বেড়ে ওঠছিল। দুনিয়াটা তখন কাশুর কাছে ছিল দুপুর বেলার শনির আখড়া। একটুতেই ডরে গা ছমছম করতো। একটুতেই বাপের হাতে-কিল-থাপ্পর। গালি-গালাজ। তাই আজও কোথাও ঠন করে ওঠলে তার বুকটা ধড়াস করে ওঠে। এই যে সব কিছুতেই এত সন্দেহ, ভয় তা কী আর এম্নি এম্নি। বউ না এলো এই সে-দিন। এর আগের স্মৃতি বলতে তো সৎ মায়ের ঝন্নাৎ ঝন্নাৎ। বাপের চোখে আগুন।

তড়িৎ হাঁটার মাঝেই কাশুর মনে কিছু জিনিস ছায়ার মতো আনাগোনা করে। বিচিত্র আর নীল-কালো নকশা তুলে। হাঁটতে হাঁটতেই তার মনে পড়ে; সেদিন পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে সে আকাশে একটুকরো মেঘের তালাশ করছিল। জীবনচিহ্নবাহি এক টুকরো জলভরা কালো মেঘ। ঠিক তখনি তার একমাত্র সৎ ভাইটা নাকের সিকনি টানতে টানতে ঘাটে এসে তার পাশে দাঁড়ায়। চট-করে কাশুর চোখে ভেসে ওঠে, তাদের বড় বড় ক্ষেত, পুকুর, ফলবাগানসহ মস্ত বাড়ি। এইসব কিছুর একমাত্র মালিক তার হওয়ার কথা। কিন্তু এই যে তার পাশে বিচ্চুটা এসে দাঁড়িয়েছে, এখন সেও তার সমান হকদার। তার মানে একদিন এই জমি-বাড়ি সব… সবকিছু দুই টুকরা হয়ে যাবে!

কাশু চন্-করে মাথা ঘুরায়। চারপাশটা এক নজরে দেখে। বাঁশঝার ঘেরা পুকুরের চারপাশে জনমানবের কোনো সাড়া নাই। সে খপ্ করে ছ বছর বয়সি সৎ ভাইটার ঘার খাবলে ধরে। ছেলেটা আচান্নক চোখে তার দিকে তাকায়। এবার সে অন্য হাতে বালকের মুখটাও চেপে ধরে পানির নিচে ঠেঁসে রাখে। বড়জোর এক-দেড় মিনিট। ছোট ছোট হাত-পা পলোর নিচে আটকাপড়া রুই মাছের মতো তড়পায়। তারপর গজার মাছের মতো কয়টা ভুরুঙ্গি তুলে গোলগাল ছোট শরীরটা নেতিয়ে আসে। কাশু আবার চারপাশটা পরখ করে। একটা পাখিও নাই। বালকের মরা শরীরটা আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে থাকলে সে, গামছায় হাত-মুখ মুছতে মুছতে আবার পুবের মাঠের দিকে হাঁটা ধরেছিল।

তাই ঢেফলের ডালে ঠোঁট ঘঁষতে ঘঁষতে প্রায় কালো অথচ করমচা রাঙা চোখে কাশুর বন্ধ কপাট জোড়ার দিকে ঘন ঘন নজর ফেলে। একটু পর পর ঘারের লাল রোয়া খুঁটতে খুঁটতে আচমকা কা কা করে চেঁচিয়ে ওঠে। তার দীর্ঘ আর কঠিন ধমকে কাশুর তড়তড়া চিকন নাকটা কুঁচকে যায়। কাঁপে। সে তামড়ানি খেতে খেতে দরজার বাইরে পা বাড়ায়। একটু একটু করে মেলতে থাকা কাঁচা সকালটা, কাকটার কা কা আফালে ফালা ফালা হয়ে কাশুর কানে নিয়তির পয়গামের মতো আগাম কিছু বার্তা পৌঁছে দেয়।

হাঁটতে হাঁটতে কাশু এক নজরে তার হাত-পায়ের বর্তমান অবস্থা যাচাই করে। কোথাও এক ফোটা পানি নাই। ঢুলঢোলা ফোলা হাত-পা হাঁটার বেগে চিমসা হয়ে এসেছে। তারপর ঝন্নাৎ করে মাথা ঘুরিয়ে সে দেখে, তেজাল রোদে দুনিয়াটা জ্বলছে তো জ্বলছেই। কোথাও এক ফোঁটা মেঘ নাই, ক্ষমা নাই।

রোদে ধাক্ ধাক্ করে জ্বলছে রাস্তার পিচ। জামতলার চৌমাথায় এসে কাশু থমকে দাঁড়ায়। ডান দিকে জাম গাছের গোড়ায় জমাট ছায়া। ওপরে বড় বড় ডালের ফাঁকে ঝুলছে ডিশ লাইনের মোটা তার। চারপাশে হাল-মই দেওয়া বিরান মাঠ। মাঝে চ্যাগ-বেগা পানি-কাদায় কয়টা বক সতর্ক পায়ে হাঁটছে। এই দেখা-দেখির মাঝেই সে আবার পুরানা দিনের ভাবনায় ফিরে যায়। মনে পরে. বুড়ো বয়সে তার বাবা একটু ক্ষ্যাপে গেলেই গলা ফাঁটিয়ে বলতো – চুদার জীবনে কোনো আছান (শান্তি) নাই।

গাছতলায় বসতেই কাশুর দু-চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে। সেই ভোর-বিহানেই পাঁচ মাইল হেঁটে, কয় খাবলা ভাত মুখে দিয়ে ফের সে পথে বেরিয়েছিল। খাল-বাল ছাড়া টাট্টু-ঘোড়ার মতো এখনও সে ছুটছেই। হাঁটায় একটু ঢিল দিলেই কোত্থেকে যে খল খল করে পানি এসে তার হাত-পা, মুখে জমে জমে শরীরটা ঢোল বানিয়ে ফেলে! ফোলা বেলুনের মতো গতরটা তখন টনটন করে। মনে হয়, এই বুঝি পটকা মাছের মতো পটাশ-করে ফাটলো!

কাশুর ঘুমটা যখন সারা শরীর জুড়ে ক্ষিরের মতো জমে ওঠতে থাকে, ঠিক তখনি গাছের মগডালে একটা কাক, কা…কা করতে করতে বিশাল ডানা দুটোতে যমের ঝাপটানি তুলে। আচমকা হামলায় সে ঘুম থেকে দড়ফড়িয়ে ওঠে। চেয়ে দেখে কাকটা তার দিকে ধারালো ছোঁ নিয়ে রকেটের বেগে তেড়ে আসছে। সে কাঁধের গামছাটাই দলা পাকিয়ে কাকের দিকে ছোঁড়ে মারে। কাকটাও বুঝি তৈরি ছিল। ছোঁ মেরে গামছাটা নিয়ে সে উড়াল দেয়। উঁচু ডালে বসে, কাশুর গামছাটা ঠোঁটে-নখে টেনে টেনে ছিঁড়ে ফালা ফালা করে ফেলে। কাকটার কা- দেখে সে বোবা বনে যায়। অবলা জীবটা তার ওপর এত ক্ষাপ্পা!

ছেঁড়া গামছাট এখন ডালের ফাঁকে বঁদুড়ের মতো ঝুলছে। কাশু আরেকবার নিজের পায়ের নলি টিপে পরখ করে। একটু জিরিয়ে নিতে না নিতেই ফের পায়ে পানি জমতে শুরু করছে! সে মনে মনে উঠেপরার তাগিদ বোধ করে। কিন্তু ঘুমের দায়ে চোখ খুলতে পারে না। এর মাঝেই কাকটা আবার ঠোঁট বাগিয়ে তার দিকে তেড়ে আসে। পাশ থেকে একটা মরা ডাল খাবলা দিয়ে তুলে সে নিজেকে কোনোমত রক্ষা করে। বেগতি দেখে কাকটাও ফিরে গিয়ে একটা ডালে বসে। ঠিক তার মাথার উপর। কিছু আন্দাজ করার আগেই জীবটা ছেড়ৎ করে তার ওপর হেগে দেয়।

কাশুর মনে পড়ে, তার সৎভাইটার ঘারে লালবর্ণের একটা জন্মদাগ ছিল। কাকটার ঘারের রোয়াগুলোও ঘন লাল। এই নিয়ে সে কমপক্ষে হাজার বার কাকটার গর্দনাটা পরখ করে দেখেছে। যতবার দেখে ততবারই সে নিশ্চিত হয়, তার আর কোনো নিষকিতি (উদ্ধার) নাই। গত দশ বছর ধরে এই কাক আর কাশুর দিনগুলা এভাবেই কাটছে। মাঝে মাঝে দিশেহারা কাশু কাকটার দিকে জোড়হাত করে মিনতি মাগে, তুই আমার মায়ের পেটের ভাই, এইবার আমারে মাফকর…।

তখন কাশুর গলা জমে আসে। দুচোখ উপচে হড়হড় করে গালে পানি গড়ায়। তার মাথার ওপর পাক-খাওয়া কাকটাও বুঝি ঠা ঠা হাসিতে ভেঙে পড়ে।

পিতলের থালার মতো আকাশটা দাউ দাউ জ্বলছে। এর মাঝেই কাশু ফের পথে নামে। টাট্টু ঘোড়ার বেগে হাঁটা ধরে। কাঁধে বুঝি একশ-মনি একটা বোঝা নিয়ে সে গত দশ বছর ধরে এভাবেই ছুটছে। এখন নিজেকে তার কিছুটা ক্ষ্যাপাটেও লাগে। দূর গাঁয়ের বাচ্চারা তাকে দেখলেই পাগল…পাগল বলে ছুটে আসে। কেউ কেউ ঢেলা মারে। সে একটুও ক্ষ্যাপে না। জানে, ক্ষ্যাপলে আর নিস্তার নাই। পথে বেরুতে পারবে না। জংলার ভীমরুলের মতো বাচ্চারা তাকে চেপে ধরবে। পিজির ডাক্তার তাকে শেষ নিদানে বলে দিয়েছিল, তোমার লিভার, হার্ট,কিডনি আর প্রেসার সব ঠিক। অথচ পানি জমে! এ রোগের কোনো অষুধ নাই। মালিক ভরসা। অবশ্য একটা উপায় আছে, বেশি বেশি হাঁটা। যতদিন হাঁটবে ততদিন বাঁচবে।

কাশুর পেছনে পাঁচখানা গ্রাম। তারপর প্রাইমারি স্কুলটার ডান পাশে আকন্দ বাড়ির পুকুর, জংলা আর তিরিশ বিঘা জমিনের গেরস্থালি। এখন বউটাই তার সংসার সামাল দেয়। চাষবাস, হাট-বাজার সব…সব। বেচারি শুধু জমিতে হাল-মই দেওয়াটাই বাকি রেখেছে। আর কাশু এখন বেঁচে থাকার দায় পথে পথেই শোধ করে।

হাঁটার মাঝেই কাশু টের পায়, পানির তিড়াসে কলিজাটা ধাক্ ধাক্ করছে। আর একটু হলেই বুঝি চন্ করে ফেঁটে যাবে। তার মন চায়, পথের পাশের ডোবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ডাক্তার চব্বিশ ঘন্টায় তার জন্য মাত্র এক লিটার পানি বরাদ্দ করে দিয়েছে! তিন বেলা খাওয়ার পরে তিন গ্লাস। এর মাঝে খুব দায়ে পড়লে মাত্র এক চুমুক। সে ভাবে, এখন যদি কেউ তাকে ডোবার টলটলা পানিতে চোবিয়ে চোবিয়ে মেরে ফেলত!

মাঝে মাঝে কাশুর ঘুম ভেঙে গেলে দেখে, বউ তার পায়ে তেল ঢলছে। দিনমান হাঁটার দাবারে পায়ের হাড়-মাস ফানা ফানা হয়ে যায়। তাই বিষ-বেদ্নায় সে ঘুমের মাঝেই উঁ… উঁ…করে রোদন পারে। বউ তেল-রসুন গরম করে পৈথানে বসে বসে মাঝ রাততক পা দুটো ঢলে। আজাবে কাশুর ঠোঁটের দুই কশে জমে ওঠে ফেনা। একটু পর পর বউ ওঠে এসে আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেয়। তখন তার ঘুম ভেঙে গেলেও সে টালমেরে পড়ে থাকে। কাশুর বুকটা নীরব রোদনে ধড়াস ধড়াস ভাঙছে। তার ইচ্ছা করছে লাফ দিয়ে ওঠে বউকে জড়িয়ে ধরে বলে; বুইনরে… আগের জনমে তুই আমার মা আছিলে, আমারে তুই মাফ কইরা দিছ। আমি বড় চিক্কন প্যাচে পইড়া গ্যাছি।

দূর গেরামের মসজিদের মাইক ফজরের আযান দেওয়ার ছলে ক্ষয়ে আসা রাতটাকে ধামকি মারে। সারা রাত ফোঁটা ফোঁটা পানি জমে কাশুর শরীরটা এখন আড়াইমনি আলুর বস্তা। জানপ্রাণ চেষ্টায় কোনোমতে সে চোখ দুটো মেলে বউকে ডাকে, – আমারে ধর।

দুই জনের চার জোড়া হাত-পায়ের আছাড়ি-পাছাড়িতে কাশু আদিম কোনো প্রাণির মতো হামা দিয়ে দাঁড়ায়।

দেউড়ির ঢেফল গাছে বসা কাকটাও জেগে ওঠে। ভোরের আলোতে ঘারের লাল লাল রোয়াগুলা চকচক করছে। অসহ্য অপেক্ষার শেষ পহরে এসে সেও যেন জিঘাংসায় ফোঁসছে। তাই ঢেফলের ডালে ঠোঁট ঘঁষতে ঘঁষতে প্রায় কালো অথচ করমচা রাঙা চোখে কাশুর বন্ধ কপাট জোড়ার দিকে ঘন ঘন নজর ফেলে। একটু পর পর ঘারের লাল রোয়া খুঁটতে খুঁটতে আচমকা কা কা করে চেঁচিয়ে ওঠে। তার দীর্ঘ আর কঠিন ধমকে কাশুর তড়তড়া চিকন নাকটা কুঁচকে যায়। কাঁপে। সে তামড়ানি খেতে খেতে দরজার বাইরে পা বাড়ায়। একটু একটু করে মেলতে থাকা কাঁচা সকালটা, কাকটার কা কা আফালে ফালা ফালা হয়ে কাশুর কানে নিয়তির পয়গামের মতো আগাম কিছু বার্তা পৌঁছে দেয়। ফোলা ফোলা চোখ দুটো না-তুলেই সে টের পায়, কালো অথচ করমচা-রাঙা আগুনের দুটো ছুঁরি ডেফলের ডাল থেকে তার কলিজা বরাবর ছুটে আসছে!

Comments

comments

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা। বিজ্ঞাণ বিভাগ, আল জান্নাত এডুকেশন এনষ্টিটিউট, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ । প্রকাশিত বই : গল্প— উল্টারথে [ঐতিহ্য, ২০০৮] ভাতবউ [ঐতিহ্য, ২০১৩] উপন্যাস— আত্মজীবনের দিবারাত্রি [ঐতিহ্য, ২০১০] কিশোর উপন্যাস— সুতিয়া নদীর বাঁকে [রূপসি বাংলা, ২০১৪] ই-মেইল : sheikh.lutfor32@gmail.com ০১৬৮১ ০২২৪৫২

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি