সাম্প্রতিক

বোর্হেসের গল্প । ভাষান্তর : এমদাদ রহমান

হোর্হে লুইস বোর্হেসের গল্প
ব্যাবিলনিয়া ও আরবের দু’জন সম্রাট এবং তাদের দুটি গোলকধাঁধা
ভাষান্তর : এমদাদ রহমান

সম্ভবত বোর্হেস হচ্ছেন সেই লেখক যার প্রতিটি কথাকেই পাঠকের কাছে মনে হয় জীবনের পক্ষে উচ্চারিত প্রগাঢ় মন্ত্র। কথাগুলি কেবল তিনিই বলতে পারেন — লেখকের লেখার কাজগুলি হল তার অলসতার ফল, আপনি সেটা সহজেই বুঝতে পারবেন। লেখকের মনের ভিতরে ভাবনার যে ভাঙাগড়া, কোনকিছু নিয়ে বিশেষ চিন্তা, দিবাস্বপ্ন, এমনই এক স্বপ্ন যা কাউকে গভীর ঘুমে তলিয়ে দেয় না বরং কল্পনা করতে বাধ্য করবে- একজন লেখকের কাজ আসলে তা-ই… এভাবেই প্রকৃত লেখাটি তার হাত দিয়ে প্রকাশিত হয়, আর এটাই তার মূল কাজ। একজন লেখককে সব সময় বিচার করা উচিত তাঁর শ্রেষ্ঠতম পৃষ্ঠাগুলি দিয়ে। বাবা আমাকে এই পরামর্শটা দিয়েছিলেন।

তিনি আমাকে প্রচুর পরিমাণে লিখতে বলতেন, প্রচুর পরিমাণে বাতিল করতে বলতেন, আর বলতেন প্রকাশের জন্য উন্মুখ না হতে, আর এই কারণে আমি প্রথম যে বইটি প্রকাশ করেছিলাম, fervor de Buenos Aires নামে, আসলে এই বইটি ছিল আমার তৃতীয় বই। বাবা আমাকে বলেছিলেন যে আমি যখন একটি বই লিখে ফেলব, তখন আমি যেন সমস্ত বইটিকেই প্রকাশের অযোগ্য মনে না করি…

‘বোর্হেসের সঙ্গে আলাপ করার মানে হল তাঁকে পড়তে থাকা, বোর্হেসের সঙ্গে দেখা হবার মানে হল তাঁকে পড়তে শুরু করা।’ তিনি সব সময় সাহিত্য নিয়েই কথা বলেন, কিংবা বলেন শুধু জীবন নিয়ে। তখনও পুরপুরি অন্ধ হয়ে যান নি, অন্ধত্বের ঠিক আগের অবস্থায় আছেন, এখন কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এলে, তিনি বলছেন — দেখছি জানালাগুলি এখানেই আছে কিন্তু আপনার মুখ আমি দেখতে পাচ্ছি  না!

পত্রিকা আমি কখনোই পড়িনি, তার একমাত্র কারণ আজকাল কী ঘটছে তার চেয়ে বরং বহুদিন আগে কী ঘটেছিল — আমার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা ছিল সেইসব ঘটনাবলীর প্রতি। এক ধরনের মানসিক বিকার। মনে আছে — প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, আমি ছিলাম জেনেভায়। সেখানে আমি পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসের উপর লেখা বইপত্র পড়ছিলাম। সেই সময় প্রায়ই ভাবতাম, একেবারেই সাদামাটা ছিল ভাবনাটা, আর, হ্যাঁ, বয়সও তখন চৌদ্দ কি পনেরো — আমি ভাবতাম — আরে কী অদ্ভুত ব্যাপার, সবাই যেন হঠাৎ করেই ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, ভাল কথা, কিন্তু, কী অদ্ভুত, সাম্প্রতিক ডামাডোলের ভিতর কেউই আগ্রহী নয় কার্থেজের যুদ্ধের ব্যাপারে, কিংবা কেউ আগ্রহী নয় পারসিক ও গ্রিকদের মধ্যকার যুদ্ধে কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে জানতে, কিন্তু, সবাই আগ্রহী হয়ে পড়েছেন — সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে। 

নিউইয়র্ক টাইমস একবার লিখেছিল —’বোর্হেসের সঙ্গে আলাপ করার মানে হল তাঁকে পড়তে থাকা, বোর্হেসের সঙ্গে দেখা হবার মানে হল তাঁকে পড়তে শুরু করা।’ তিনি সব সময় সাহিত্য নিয়েই কথা বলেন, কিংবা বলেন শুধু জীবন নিয়ে। তখনও পুরপুরি অন্ধ হয়ে যান নি, অন্ধত্বের ঠিক আগের অবস্থায় আছেন, এখন কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এলে, তিনি বলছেন — দেখছি জানালাগুলি এখানেই আছে কিন্তু আপনার মুখ আমি দেখতে পাচ্ছি  না!

অনূদিত গল্পটি Collected Fictions, Jorge Luis Borges, translated by Andrew Hurley, Penguin Books, 1998 বইটি থেকে নেয়া হয়েছে। গল্পটিতে বোর্হেস দুই ধরণের গোলকধাঁধার কথা বলেছেন। প্রথমটি জটিল, চাতুর্যপূর্ণ; দ্বিতীয়টি আদি অন্তহীন মরুভূমির গোলকধাঁধা। এখানেই গল্পটির প্রাণ ও সার্থকতা। ]

* * *

গল্পটি এমন এক ব্যক্তির দ্বারা কথিত হয়েছে যার সমুদয় বিশ্বাস প্রশংসাযোগ্য (যদিও আল্লাহ্‌ই সর্ব বিষয়ে প্রজ্ঞাবান) — অতীতের কোনও এক সময়ে ব্যাবিলনিয়া দ্বীপপুঞ্জে এক সম্রাট ছিলেন যিনি তার সমস্ত স্থাপত্যবিদ এবং যাজকদের একত্রিত করেছিলেন; তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এমন এক গোলকধাঁধা নির্মাণের জন্য সর্বাপেক্ষা বিচক্ষণ ব্যক্তিটির পক্ষেও যে গোলকধাঁধায় প্রবেশ হবে একটি বিভ্রমের মতো আর সূক্ষ্মতায় এতোই জটিল হবে যে সে কিছুতেই তার পথ আর খুঁজে পাবে না। গোলকধাঁধাটি ছিল এক চরম পরিহাস যা কেবল বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করে; যে-কাজটি করবার অধিকার কেবল ঈশ্বরের, মানুষের নয়। সেই সময়ে রাজদরবারে আরবের এক সম্রাট এসে হাজির হলেন এবং তখন ব্যাবিলনিয়ার সম্রাট (তার অতিথির সমস্ত সরলতাকে তুচ্ছ করে দিতে) তার গোলকধাঁধায় প্রবেশের আহ্বান জানালেন, যেখানে প্রবেশের পর সম্রাট সেখানে ঘুরতে ঘুরতে অত্যন্ত ভীত, অপমানিত এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন; সন্ধ্যা নামার আগে তিনি ঈশ্বরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার দরজা খুঁজে পেলেন। তাঁর ঠোঁট কোনও অভিযোগ প্রকাশ থেকে বিরত থাকল, তবে ব্যাবিলনিয়ার সম্রাটকে তিনি জানিয়ে দিলেন যে তাঁর সাম্রাজ্যে আছে অন্য রকম এক গোলকধাঁধা; এবং আল্লাহ্‌ যদি সদয় থাকেন, তাহলে তিনি আশা করছেন কোনও এক দিন ব্যাবিলনের সম্রাটও সেই গোলকধাঁধার সঙ্গে পরিচিত হতে আসবেন। অতঃপর তিনি আরব্যদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন তাঁর সেনাপতি ও রক্ষীদের সঙ্গে নিয়ে; এবং তিনি ব্যাবিলনিয়া রাজ্যকে আক্রমণ করে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করলেন; পরম সৌভাগ্যের বলে সবগুলি দুর্গকে তিনি ধূলায় মিশিয়ে দিলেন, হত্যা করলেন তাঁর প্রজাদেরকে, এবং সম্রাটকে বন্দি করলেন। তারপর, দ্রুতগতির এক উঠের পিঠে বন্দি সম্রাটকে বেঁধে মরুভূমির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন আরব্য সম্রাট। তিন দিন একটানা পথ চলবার পর তিনি তাঁকে বললেন- হে সময়ের সম্রাট, শতবছরের সারবস্তুহীন ব্যক্তি! ব্যাবিলনিয়ায় তুমি আমাকে প্রলুব্ধ করেছিলে দস্তা ও তামায় তৈরি অগণিত সিঁড়ি আর দরোজা আর দেয়াল দিয়ে তৈরি এক গোলকধাঁধায় যাতে আমি পথ হারিয়ে ফেলি; আর এখন, সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী একজন আমাকে উপযুক্ত মনে করে অনুমতি প্রদান করেছেন আপনাকে সেইসব দেখাতে যেখানে অজস্র সিঁড়ি ভেঙে উঁচুতেও উঠতে হয় না, দরোজা নেই, নেই কোনও অন্তহীন সুড়ঙ্গপথ; কোনও দেয়ালও যার উত্তরণ আটকাতে পারে না।

কথাগুলি বলেই মরুভূমির মাঝখানে ব্যাবিলনিয়ার সম্রাটকে তিনি মুক্ত করে দিলেন  যেখানে তিনি ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মরতে পারেন।গৌরব তো জীবিতদের জন্যই যারা মৃত্যুকে বরণ করতে চায় না।

Comments

comments

এমদাদ রহমান

এমদাদ রহমান

জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৯, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার বাদে সোনাপুর গ্রামে। রাজনীতি ও প্রশাসন-বিষয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। এখন ইংল্যান্ডে, জীবন ঘষে আগুন জ্বালাতে। কবিতা স্মৃতিকথা, পুরোনো চিঠি আর লেখা গদ্যে এবং অনুবাদে বিপুল আগ্রহ। পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প তাঁর প্রথম বই ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি