সাম্প্রতিক

‘অ-প-র’ এর গল্প । অর্ক চট্টোপাধ্যায়

পেন-ড্রাইভটা ল্যাপটপে ফিট করতেই দৃশ্যের পসরা শুরু হয়ে গেল।

দৃশ্য ১

পাড়ার ছোট্ট মাঠ। তার পাশ দিয়ে চলেছে হাঁটা পথ। উল্টোদিকে বিরাট একটা পাওয়ার হাউস। আগে যেখানে পুকুর ছিল। অ ছোটবেলায় দাদুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে পুকুর দেখেছে। যখন পুকুর বুজিয়ে দেওয়া হলো তারপরও অ দাদুর সঙ্গে ঐ বালিবোজা পুকুরের ওপর খেলাধুলো করেছে। আজ অনেকদিন পর অ এই রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। আশপাশ অনেক পাল্টে গেছে। অ-র চোখ কিছু একটা খুঁজছে। মাঠটা যেখানে শেষ হচ্ছে ঠিক সেখানে রাস্তার ধারে ঐ লোহার পাত দিয়ে বানানো বেঞ্চিটা কি এখনো আছে? আগে যখন অ-র এক বন্ধু এই পাড়ায় থাকতো আর ওরও প্রায়ই যাতায়াত ছিল এদিকে, ঐ লোহার বেঞ্চিটা কেন জানি না অদ্ভূতভাবে আকর্ষণ করতো অ-কে। কোনো কোনো দিন রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখতো, বেঞ্চিটার পেছন থেকে রাজ্যের ঝোপঝাড় এসে সেটাকে একেবারেই ঢেকে দিয়েছে। আবার এক সপ্তাহ পরে আসলে দেখতো দিব্বি দেখা যাচ্ছে বেঞ্চিটাকে। অ কখনো কাউকে ঐ বেঞ্চির ওপর বসতে দেখেনি। কে জানে হয়তো সেই কারণেই বেঞ্চিটা এতো টানতো। অ মনে মনে বেঞ্চির লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে ঠিক করেছিল, যতদিন বেঞ্চিটা আছে, সে-ও আছে। যেদিন দেখবে ওটা নেই, অ বুঝবে ওরও চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। আজ এতবছর পর ওর বন্ধুও যখন পাড়া থেকে বিদায় নিয়েছে তখন ঐ রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অ উৎসুক হয়ে পড়লো দেখতে যে বেঞ্চিটা এখনো রয়েছে কিনা। বেঞ্চিটা থাকলে ও থাকবে, নয়তো নয়, এই চিন্তাটা মাথায় ঘুরপাক খাওয়াতে খাওয়াতে অ-র মনে পড়লো প্রথম যেদিন উল্টোদিকের ঐ বালির পুকুরে খেলেছিল সে। সাঁতার কাটতে অক্ষম অ-র ঐ একবারমাত্র জলের ওপর দিয়ে হাঁটার অনুভূতি হয়েছিল। জল বোজানো বালির কণায় সময় চিকিয়ে উঠেছিল। বেঞ্চিটা থাকলে ও থাকবে, নয়তো নয়। 

দৃশ্য ২

পুরোনো রাজবাড়ি এখন হাসপাতাল। তারই একটা দিকে ডাক্তারদের কোয়ার্টার। প ওর বাবার থেকে গল্প শুনেছে যে ঐ মেইন কোয়ার্টারবাড়ির উঠোনে একটা মস্ত বড়ো গর্ত আছে যেটা ঢাকা রয়েছে। ঐ গর্ত নাকি গঙ্গা পর্যন্ত চলে গেছে। জমিদারবাড়ির হানাহানির নানা গল্প আছে ঐ গর্তটাকে ঘিরে। কিভাবে গুমখুন করে ফেলে রাখা হত ঐ গর্তে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিপ্লবীরা লুকোনোর জন্য ব্যবহার করতেন গর্তটাকে। কেউ কেউ এরকমও বলে যে ঐ গর্তের ভেতরে নাকি কিছু গুপ্ত ঘর রয়েছে। জমিদারবাড়িতে আক্রমণ হলে ওটা লুকোনো আর পালানোর পথ ছিল। প ছোটবেলা থেকেই ওকে গল্পের গর্ত বলে। ওখানে আর কিছু থাক না থাক, গর্তটা তো আছে। প বিশ্বাস করে ঐ গর্ত খুললে আরো নানা গল্প ঠেলাঠেলি করে বেরিয়ে পড়বে। গল্পের গর্তের কথা প-র যে বন্ধু প-কে প্রথম বলেছিল সে এও বলেছিল যে একবার নাকি বছর কুড়ি আগে গর্তটা খুলে কিছু সরকারী লোকজন ভেতরে ঢুকেছিল তদন্ত করতে কিন্তু ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস থাকায় তারা বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি। তারপর থেকে গল্পের গর্তের ঢাকা আরো টাইট হয়েছে। যেন গল্প আর কেউ শুনতেই চায়না। আজ অনেকদিন পর প এই ডাক্তার কোয়ার্টারের উঠোনে দাঁড়িয়ে। রাত ১০টা। উঠোনটা প্রায় অন্ধকার। প একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে গল্পের গর্তের দিকে, যেন ডালা ঠেলে একটা গল্প না বেরোলে সে প্রস্তরবৎ ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে বাকি জীবন। 

একটা ছোট্ট লোহার বেঞ্চ। তার পেছনে লোহা দিয়েই তৈরী ঝোঁপের ব্যাকগ্রাউন্ড। বেঞ্চির ওপর তিনটে ছোট লুজ হিউমান ফিগার বসে রয়েছে। র হাত দিয়ে এক এক করে তুলে আনলো ওদের। ফিগার তিনটের পশ্চাৎদেশে ম্যাগনেট লাগানো রয়েছে যাতে বেঞ্চে বসতে অসুবিধা না হয়। র বোঝার চেষ্টা করলো, এটা ম্যাজিক না স্রেফ খেলনা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে গিয়ে চোখে পড়লো বেঞ্চটা উল্টোলে ভেতরের দিকে একটা গর্ত রয়েছে যার গভীরে যে কোনো একটা ফিগার সেধিয়ে যেতে পারে। তাহলে কি এটাই ম্যাজিক? ভ্যানিশিং ট্রিক?

দৃশ্য ৩

র ছোটবেলায় ম্যাজিক দেখাতো। এখন র-র বয়স তিরিশ পেরিয়েছে। ম্যাজিক উবে গেছে ছেলেবেলার মত। এক বন্ধু রীতিমত জোরজার করায় প্রায় এক ডজন বছর পর ম্যাজিকের আলমারিটা খুললো পুরোনো একতলার ফ্ল্যাটে গিয়ে। খুলতেই একরাশ ধুলো আর মাকড়শার জাল। তাকে তাকে সাজানো কতশত ম্যাজিকের জিনিস। লোহার খাঁচার মধ্যে প্ল্যাস্টিকের ফুল। প্যাকেট প্যাকেট তাস। প্লাস্টিকের আর কাঠের কত রকমের কত রংয়ের বাক্স। সমস্ত জিনিসের মধ্যেই কিছু না কিছু কায়দা আছে। একটা তাসের প্যাকেট যার সবকটা তাস এক, আরেকটা প্যাকেটের ভেতর বিশাল একটা গর্ত যাতে রুমাল কিংবা বিড়াল যেকোনো কিছুই ঢুকে যাবে। একটা বাক্সের পেছনে লুকোনো দরজা। আরেকটা গ্লাসের মধ্যে সরু অদৃশ্য সুতোর এপার ওপার সাঁকো। প্রত্যেক বস্তুর স্বতন্ত্র রহস্য রয়েছে। র দেখতে দেখতে মনে করতে লাগলো কিভাবে সেই রহস্যগুলোর সদ্ব্যবহার করতো সে এককালে। এখন অর্দ্ধ-বিস্মৃত সেইসব সিক্রেট। অনেকগুলো জিনিস হাতে তুলে নাড়াচাড়া করতে করতে র-র আলতো মনে পড়লো কি করে ওগুলোর সিক্রেটকে ব্যবহার করতে হবে। আবার কয়েকটা জিনিস যতই হাঁ করে দেখুক না কেন, কিছুতেই মনে পড়লো না বস্তুগর্ভের বক্র-গোপনতার উপযোগিতা। কিছু যন্ত্রপাতি হাতে নিয়ে আলমারিটা বন্ধ করতে যাবে এমনসময় নিচের তাকে একটা খেলনা জাতীয় জিনিস চোখে পড়লো। একটা ছোট্ট লোহার বেঞ্চ। তার পেছনে লোহা দিয়েই তৈরী ঝোঁপের ব্যাকগ্রাউন্ড। বেঞ্চির ওপর তিনটে ছোট লুজ হিউমান ফিগার বসে রয়েছে। র হাত দিয়ে এক এক করে তুলে আনলো ওদের। ফিগার তিনটের পশ্চাৎদেশে ম্যাগনেট লাগানো রয়েছে যাতে বেঞ্চে বসতে অসুবিধা না হয়। র বোঝার চেষ্টা করলো, এটা ম্যাজিক না স্রেফ খেলনা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে গিয়ে চোখে পড়লো বেঞ্চটা উল্টোলে ভেতরের দিকে একটা গর্ত রয়েছে যার গভীরে যে কোনো একটা ফিগার সেধিয়ে যেতে পারে। তাহলে কি এটাই ম্যাজিক? ভ্যানিশিং ট্রিক? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেঞ্চটা জাস্ট ফুটো হয়ে গেছে। কে জানে? র আবার তিনটে ছেলেকে লোহার বেঞ্চটার ওপর বসিয়ে দিয়ে যথাস্থানে রেখে দিল। মনে মনে ভাবলো, যতদিন এই অনিশ্চয়তাটা রয়েছে যে ওটা ম্যাজিক না খেলনা, ঐ গর্তটা কায়দার না সময়ের, ততদিন সে-ও রয়েছে। টিমটিমে ঐ অনিশ্চয়তাটা যেদিন থাকবে না, সেদিন র জানবে তার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। 

ইজেকট
সেফলি রিমুভ হার্ডওয়্যার

Comments

comments

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

জন্মঃ ২৫ নভেম্বর, ১৯৮৫। পেশাগতভাবে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, আই আই টি, গান্ধীনগর। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থঃ পিং পং গন্ধ (২০০৯) এবং সাইজ জিরো এবং অলিখিত হ্রস্বস্বরের সন্ধানে (২০১৫)। প্রকাশিতব্য উপন্যাসঃ উপন্যস্ত (২০১৯ বইমেলা)। অধুনা হাইবারনেশনে থাকা অ্যাশট্রে পত্রিকার সম্পাদক। ছোট পত্রিকায় লেখালিখিঃ গল্প এবং অনুবাদ। ইমেল : arkaless@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি