সাম্প্রতিক

দিমিত্রিয়োস গালানোসের আষাঢ় । অদিতি ফাল্গুনী

‘আষাঢ়ষ্য প্রথম দিবস মেঘমাশ্লিষ্ট সানু’…

মুন্সী শীতল সিংয়ের বাড়িটা বারাণসীর গঙ্গার ঘাট থেকে খুব বেশি দূরে নয়। গলির পর গলি। তস্য গলি। তার কাছেই সংস্কৃত শেখে সে। শুরুতে বিভ্রান্ত লাগতো দিমিত্রিয়োসের। কিন্ত ভাষা শেখা যার আগ্রহ, তাকে দমাবে কে? ভারতে এসেছে সে আজ বছর পাঁচেক। শুরুতেই শিখতে হয়েছিল ফার্সি আর ইংরেজি। মুঘলরা শাসন ক্ষমতা হারালেও কয়েকশ’ বছরের মুসলিম শাসনের কারণে এদেশের আইন-আদালত, ভূমি রাজস্ব সহ নানা দাপ্তরিক কাজে ফারসি আজো রাজভাষা। তবে এই রাজভাষা পুরণো হতে চলছে। গোটা দেশটাই যেন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়ানো। দেশটির শাসক বদলেছে। আর বদলাচ্ছে সভ্যতা। ফার্সির বদলে ইংরেজি, গরুর গাড়ির বিপ্রতীপে সশব্দ বাষ্পীয় রেল, কয়েক হাত ঘোমটার নিচে থাকা শিশু বধূদের কারো কারো মুখে বর্ণ পরিচয়… ঘুম ঘোর ভেঙে একটি বৃহৎ জাতির চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসা। ভারতে এসেছিল সে লোহিত সাগর আর ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে। ভারতে বৃটিশের নয়া রাজধানী বাংলার কলকাতা আর কলকাতার কিছু দূরে বাংলার অপর শহর ঢাকায় গ্রিকরা কেউ কেউ এসেছে পারস্য আর আফগানিস্থান হয়ে। আবার কেউ কেউ এসেছে তারই মতো দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার অবসানে। জাহাজে চেপে। হাজার হোক বীর নাবিক ওদিসিয়ুসের দেশের ছেলে নয় কি সে? হোমারের মহাকাব্যে যা ট্রয় সেই এশিয়া মাইনরেই ত’ বহু শতাব্দী হয় রয়ে গেছিল কিছু গ্রিক  পরিবার…অটোমান তুর্কীরা গ্রিকদের হারিয়ে দেবার পর থেকে যে গ্রিকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল এশিয়া মাইনর, ঈজিয়ান ও আয়োনীয় দ্বীপপুঞ্জে। অনেকে চলে গেছিলো ফিলিপ্পোপলিসের থ্রেসিয়ান নগরীতে… তোমরা আজ যাকে বলো বুলগেরিয়ার প্লভদিভ নগরী। সালটা ১৭১৩ থেকে ১৭২৮। বেশ কিছু গ্রিক পরিবার এসে ঠাঁই করলো ঢাকা এবং কলকাতায়। কিছু বা ঢাকা ছাড়িয়ে শীতলক্ষ্যার ওপারে। পাট ও লবণের কারবারে তারা জমে গেল খুব।

দিমিত্রিয়োসের অবশ্য ভারতে আসা হয়েছে আরো কিছু পরে। তার জন্মই কিনা ১৭৬০ সালে। খোদ এথেন্সেই। ভারতে আসা হলো এক প্রবল আগ্রহ নিয়ে। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর আদি মৈত্রীর শেকড় খুঁজতে। কলকাতায় এসে প্রথমেই চটপট শিখে নেওয়া হলো ফার্সি আর ইংরেজি। তারপর মন বসাতে হলো সংস্কৃত শিখতে। সংস্কৃত না শিখলে প্রাচীন ভারতীয় কাব্য-মহাকাব্য, পুরাণ, বেদ, উপনিষদ মূলে পড়া হবে কি করে? গ্রিক ভাষার সাথে সংস্কৃত ভাষার সাযুজ্য খুঁজে বের করবে কি করে?

‘মুন্সী শীতল সিং কোঠি মে হ্যায়?’ শীতল সিংয়ের একতলা কোঠি বাড়ির সামনে আর দশজন হিন্দুর মতোই সিক্ত ধূতি ও চাদর গায়ে এসে দাঁড়ায় দিমিত্রোয়স। হিন্দিও ভাল বলতে শিখে গেছে। মাত্রই গঙ্গায় ডুব দিয়ে এলো। সংস্কৃত শেখার এই দুই বছর সে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের জীবন যাপন করবে। মদ, গোমাংস ভক্ষণ ছেড়ে দিয়েছে। চামচ ছেড়ে হাত দিয়ে ভাত-রুটি-সব্জি-দই খায়। শোয় মেঝেতে বা বড় জোর কাঠের চৌকিতে। পায়ে কাঠের খড়ম। মাথার চুল সব নেড়া করে টিকি ঝুলিয়েছে। কপালে চন্দনের তিলক কাটা।    

‘আও ইয়ার-ইধার আও!’ শীতল সিং ঘরেই ছিলেন। এই শ্বেতাঙ্গের দেহ-মন এক করে সংস্কৃত শেখার একাগ্রতা তাকে বিষ্ময়াভিভূত করছে। অথচ ভারতের একটু অবস্থাপন্ন ঘরের বাবারা এখন ছেলেদের সব টোলে না দিয়ে ইংরেজের স্কুলে দিচ্ছে।

‘লাগতা হ্যায় কি বারিস আতা হুঁ…’ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন শীতল সিং। আজ তাই উঠানে না বসে ঘরের ভেতরেই শতরঞ্জি পাতা হলো।

‘বারিস আতা হুঁ?’ দিমিত্রোয়স প্রশ্ন নয় যেন প্রতিধ্বনি করেন। এ দেশের আবহাওয়া খুব অদ্ভুত। ছাতি ফাটানো গরমের পরেই আসে অবিশ্বাস্য জীবন দায়িনী বর্ষা। একটু যেন বা গ্রিসের কর্ফূ দ্বীপের গভীর শীতের দিনের মতো হয়ে যায় আবহাওয়া। কর্ফূ দ্বীপই কি হোমারের ওদিসিয়ুসের পদ্মফুল খেকো দৈত্যদের দ্বীপ নয়?

‘আজ আমরা পড়ব মেঘদূতম!’ মুন্সী শীতল সিং বিদেশী ছাত্রর দিকে তাকান। নিজেরই শিক্ষক হিসেবে অবিশ্বাস্য লাগে। মাত্র নয় মাস আগেও না এই ছাত্রকে ‘নদী নদ্যাঃ নদ্যৌ’ পড়িয়েছেন? সে এখন বৈদিক সুক্ত আবৃত্তি করতে পারে। আর আজ শীতল সিং বুঝছেন যে এই ছাত্রকে অনায়াসে এখন ‘মেঘদূতম’ পড়ানো যাবে।

‘রামগিরি পর্বতের উপর মেঘ ঘনিয়েছে। প্রিয়ার সাথে থাকার সময় একটি কর্তব্যে ত্রুটি হওয়ায় অলকাপুরী থেকে নির্বাসিত হলেন যক্ষ। প্রেয়সী স্ত্রীর কথা ভেবে চঞ্চল চিত্ত যক্ষের মনে হলো আষাঢ়ের প্রথম দিনের যে মেঘ ঘনিয়ে আসছে পাহাড়ের উপর, তাকেই দূত করে স্ত্রীর কাছে বার্তা পাঠাবেন কি?’

আলেক্সিয়োস আরগাইরি পানাঘিওতিস মাথা নাড়েন, ‘খোদ ওয়ারেন হেস্টিংস আমাকে কায়রো পাঠিয়েছিলেন যেন মিশরে বৃটিশ বেনিয়াদের জিনিষ বিক্রি করার পক্ষে আমি ওকালতি করি। আমার অনুরোধেই কলকাতায় গ্রিক চার্চ স্থাপণার অনুমতিও দিয়েছিলেন হেস্টিংস। তবু কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসেছি শীতলক্ষ্যার পাড়ে পাট এবং কাপড়ের ব্যবসার সুবিধার জন্য। আমার ছেলে আলেক্সান্দারও দিন-রাত নারায়ণগঞ্জ আর চট্টগ্রাম ছুটছে লবণের ব্যবসায়। কিন্ত ম্যানচেস্টারের কাপড় বাংলার তাঁতীদের পথে বসাচ্ছে। সেই সাথে যে আমাদের ব্যবসাও ডুবছে! এবার না বাংলা ছাড়তে হয়!’

আকাশ ঘনিয়ে এলো সত্যিই। ঘোর, ছায়াচ্ছন্ন মেঘে।

‘The impassioned lover having passed some months,
On that hill, parted from her unsupported
— the golden armlet slipping down
to lay bare his wasted fore-arm —
saw on Asadha’s most auspicious day
a cloud embracing the crest of the hill,
strikingly-shaped like a sportive elephant
bent down to butt a river bank.”

এখনো সংস্কৃতে উচ্চাঙ্গের কাব্য পড়ে প্রতিটি অক্ষর বোঝার মত দড় হন নি দিমিত্রিয়োস । তাই সাথে একটি ইংরেজি অনুবাদও রেখে দেন মিলিয়ে নিতে। সেই কবে এই কাব্য লিখেছিলেন কালীদাস! তবু রয়ে গেছে কদম্ব, কেতকী আর অনি: শেষ আষাঢ় রাত্রি যখন আকাশের তীব্র মেঘগর্জনে ভীতা নারীরা জড়িয়ে ধরে তাদের পুরুষ সঙ্গীদের। রয়ে গেছে তন্বী শ্যামা বিম্বোধরোষ্ঠি নারীরাও। মধ্যে শ্যামা  নিম্ন নাভি ক্ষিপ্রা চকিতা হরিণী… আজ বারাণসীর গঙ্গার ঘাট থেকে স্নান করে ওঠার সময় এমনি এক ক্ষিপ্রা চকিতা হরিণী নামছিল একই সিঁড়ি বেয়ে। সহসাই চোখাচোখি হলো এক পলকের জন্য… আকাশের বিদ্যুত বহ্নি অভিশাপ গেল লিখি!

মাকারিয়োইয়স এফেলেফয় কাই প্রোসেলাবয়!

স্মারকগৃহে পৌঁছাতে হলে পূর্বদিক দিয়ে প্রবেশ করুন!’ 

শোকগৃহের দেয়ালে কালো পাথরে খোদাই করা নয়টি শিলালিপি। ১৮০০ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি মৃতা সুলতানা আলেক্সান্দার। তিন ইল্লিয়াস ভ্রাতার স্মরণেও এপিটাফ রয়েছে বৈকি। জন দেমেত্রিয়াস ইলিয়াস নামের এক ভ্রাতা বাঘ শিকার করতে গিয়ে মরেছে। অথচ একই ঘরের অন্য এক ভাই বাসিল দেমেত্রিয়াস কিনা ছিল সেন্ট থমাস চার্চের কেরাণী। সেই সাথে ঢাকা কলেজে ছাত্রও পড়াত।

‘এইখানে শায়িতা রহিয়াছেন সুলতানা, কিইয়িনাকোস ফিলিপ্পৌ পলিতৌয়ের পুত্র আলেক্সান্দরের স্ত্রী; ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ শে জানুয়ারী পরলোকগতা- ঢাকায় তাহার সকল দেনা পরিশোধ হইয়াছে।’

পরপর শিলালিপিগুলো পড়ে যান দিমিত্রিয়োস গালানোস:

‘এইখানে শায়িতা রহিয়াছেন জর্জ ফিলিপ্পৌ পলিতৌয়ের সহধর্মিনী থিওডোসিয়া। ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই এপ্রিল তিনি মরজগতের সকল দেনা পরিশোধ করিয়াছেন।’

‘শ্রীমতি মাদালেন এবং সোহিয়া জর্দান ও এই উভয় নারীর স্বামী জোসেফ জর্দান যাহার জন্মস্থান গ্রিসের সিজারেহ হইলেও বর্তমান বাসস্থান নারায়ণগঞ্জ। তাহার অনাথ সন্তানরা মাতৃ স্মৃতিতে এই শিলা লিপি খোদাই করিল।’

‘ঢাকায় কি তবে গ্রিক বসতি থাকবে না?’ প্রশ্ন করেন দিমিত্রোয়েস।
‘দ্যাখো- প্রায় শ’ দুই গ্রিক সেই ১৭৭০ থেকে ১৮০০ সাল অবধি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে বাস করেছে। বসরা হয়ে ইউরোপে আমরা বাংলার কাপড় কত রপ্তানী করেছি! এছাড়াও লবণ মায় চুন পর্যন্ত তৈরি করেছি। কিন্ত…’
‘কিন্ত?’

আলেক্সিয়োস আরগাইরি পানাঘিওতিস মাথা নাড়েন, ‘খোদ ওয়ারেন হেস্টিংস আমাকে কায়রো পাঠিয়েছিলেন যেন মিশরে বৃটিশ বেনিয়াদের জিনিষ বিক্রি করার পক্ষে আমি ওকালতি করি। আমার অনুরোধেই কলকাতায় গ্রিক চার্চ স্থাপণার অনুমতিও দিয়েছিলেন হেস্টিংস। তবু কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসেছি শীতলক্ষ্যার পাড়ে পাট এবং কাপড়ের ব্যবসার সুবিধার জন্য। আমার ছেলে আলেক্সান্দারও দিন-রাত নারায়ণগঞ্জ আর চট্টগ্রাম ছুটছে লবণের ব্যবসায়। কিন্ত ম্যানচেস্টারের কাপড় বাংলার তাঁতীদের পথে বসাচ্ছে। সেই সাথে যে আমাদের ব্যবসাও ডুবছে! এবার না বাংলা ছাড়তে হয়!’

‘বাংলা ছাড়বেন? ভারত ছাড়বেন?’ আ-স্তে গলায় প্রশ্ন করেন দিমিত্রিয়োস গালানোস।
‘নয় কি? ব্যবসায় ত’ মার খাচ্ছি! আপনিই বা আর কতদিন থাকবেন এখানে?’
‘আমৃত্যু-’
‘আমৃত্যু? পাগল হলেন নাকি?’
হাসলেন দিমিত্রিয়োস, ‘নয় হাজার শব্দের একটি গ্রিক-সংস্কৃত ভাষার অভিধানে হাত দিয়েছি। সেটা শেষ না করে স্বদেশেও ফেরা হবে না!’
‘আপনি ত’ আচ্ছা পাগল!’
‘আসি তবে। কালই আবার কলকাতার দিকে রওনা হব। ঢাকা আর নারায়ণগঞ্জ দেখে গেলাম। শীতলক্ষ্যা পাড়ের তাঁতীদের দেখলাম। কলকাতা থেকে আবার বারানসী আমার সংস্কৃত শিক্ষকের কাছে- গুরুর যেতে হবে।’

উঠে পড়েন দিমিত্রিয়োস গালানোস। তিনি ত’ আর পাট কি লবণের ব্যবসা করতে আসেন নি। শীতলক্ষ্যার ঘাটে সার সার নৌকা বাঁধা। সেখান থেকেই বুড়িগঙ্গাতে গিয়ে পড়বে নৌকা। দু’কুল ছাপিয়ে আষাঢ়ের ঢল নামছে বাংলার নদীতে। নদী ফুলে-ফেঁপে গর্ভিনী নারীর মত প্রশস্ত, বিশাল হয়ে উঠেছে। বাংলার নদীরই এত বিস্তার যেন তা’ পশ্চিমের সমুদ্র। কালিদাস আর হোমার…দুই সভ্যতার দুই কবিকে তিনি আজ জানেন। মেঘের আকাশ পরিভ্রমণ আর ইউলিসিসের সমুদ্র যাত্রা যেন একই গল্পের এপিঠ ওপিঠ:

‘Now all the rest that austere death out strove
At Troy’s long siege at home safe anchor’d are,
Free from the malice both of sea and war;
Only Ulyssess is denied access to wife and home…”

অবিশ্রান্ত আষাঢ় ধারায় দিমিত্রিয়োস গালানোসের বজরা নৌকা শীতলক্ষ্যা থেকে বুড়িগঙ্গার দিকে পাল তোলে। ছুটে চলে ঈজিয়ান থেকে করিন্থীয় দ্বীপপুঞ্জে।

Comments

comments

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী

জন্ম: ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে সম্মানসহ ¯œাতকোত্তর। কাজ করেছেন ও করছেন একাধিক সংবাদপত্র, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায়। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০ (প্রবন্ধ-গবেষণা-গল্প-কবিতা-অনুবাদ সহ)। পুরষ্কার সংখ্যা: ৩। email : audity.falguni@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি