সাম্প্রতিক

স্তেফান মালার্মে : বিচারক, বিদূষক ও রাজা । অদিতি ফাল্গুনী

স্তেফান মালামের্র (জন্ম: ১৮ মার্চ ১৮৪২- ৯ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮) প্রকৃত নাম ছিল এতিয়েন মালার্মে। স্তেফান মালার্মে তাঁর কলমী নাম বা লেখক নাম । ফরাসী প্রতীকবাদী কবিদের অন্যতম পুরোধা স্তেফানের কবিতা বিশ শতকের শুরুতে শিল্পকলায় একাধিক বৈপ্লবিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। যেমন, কিউবিজম, ফিউচারিজম, দাদাইজম ও স্যুররিয়ালিজম।

জীবনভর ইংরেজি ভাষার শিক্ষক হিসেবে জীবন নির্বাহ করেছেন মালার্মে। তবে তাঁর বাড়িতে কবিতা, শিল্পকলা ও দর্শণ নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের যে আড্ডা বসতো, সেই আড্ডাগুলোর মধ্যমণি হিসেবেও সুনাম ছিল তাঁর। ফরাসী ভাষায় `মঙ্গলবার’-কে বলা হয় mardi- প্রতি মঙ্গলবার তাঁর বাসায় লেখক-শিল্পী বন্ধুবৃত্তের আড্ডায় অংশগ্রহণকারীদের তাই বলা হতো les Mardistes| প্রতি মঙ্গলবারের এই আড্ডার আয়োজনের মাধ্যমে মালার্মে একটি গোটা প্রজন্মের লেখকদের উপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছিলেন। বহু বহু বছর ধরে মালার্মের বাড়িতে আয়োজিত এই সভাগুলোয় মালার্মে একাই পালন করতেন বিচারক, বিদূষক ও রাজার ভূমিকা। ডব্লু.বি.ইয়েটস, রাইনার মারিয়া রিলকে, পল ভালেরি, স্তেফান জর্জ, পল ভার্লেইন সহ অনেকেই তাঁর বাড়ির আড্ডার নিয়মিত অংশগ্রহণকারী ছিলেন। ১৮৬৩ সালের ১০ই আগস্ট মালার্মে মারিয়া ক্রিস্টিনাকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র কণ্যা জেনেভিয়েভ মালার্মে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬৪ সালের ১৯ নভেম্বর। ১৮৯৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কবির মৃত্যু হয়।

মালার্মের জীবনের শুরুর দিকের কাজগুলো সাহিত্যিক প্রতীকবাদের অগ্রদূত শার্ল ব্যোদলেয়ারের কবিতা দিয়ে দারুণ ভাবে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়। পরবর্তীতে মালার্মের `শতাব্দীর শেষ (fin de siècle)’ (Un coup de dés jamais n’abolira le hasard) আঙ্গিক মূলত: কবিতা ও শিল্পের অন্য নানা শাখার ভেতরে মিশ্রণ হিসেবে কাজ করবে। তাঁর শেষের দিকের অধিকাংশ কাজেই বিষয়বস্তÍ এবং আঙ্গিকের ভেতরকার সম্বন্ধকে অন্বেষণ করা হয়েছে, কবিতা লেখার পাতায় শব্দ ও পরিসরের ভেতর নানা বিন্যাসগত ক্রিড়া দেখা যায়। এই ক্রিড়ার চূড়ান্ততম প্রকাশ দেখা যায় `পাশার ঘূর্ণন কখনোই হারাবে না সুযোগÕ কবিতায়। এই দীর্ঘ কবিতা বা কাব্য কবি রচনা করেন ১৮৯৭ সালে। অনেকেই মনে করেন যে ফরাসী কবিদের ভেতর মালার্মেকে অনুবাদ করা দু:সাধ্যতম কাজগুলোর একটি। শুধুই তাঁর কাজের জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট আঙ্গিকের জন্য নয়, বরঞ্চ কবিতায় তাঁর শব্দের ধ্বনির ক্রিড়াবিভঙ্গের কারণেও মালার্মের রচনাকে জটিল ও দূর্বোধ্য মনে করা হয়। বিশেষত: ফরাসীতে যখন তাঁর কবিতা পাঠ করা হয়, তখন ধ্বনিগত কারণেও প্রায়ই তাঁর কবিতার এক দ্ব্যর্থবোধক অর্থ দাঁড়ায় যার অনুবাদ করা আক্ষরিক অর্থেই প্রায় অসম্ভব।

মালার্মের কবিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একাধিক সঙ্গীতকার সৃষ্টি করেছেন কিছু কম্পোজিশন। এদের ভেতর ক্লঁদ দেব্যুসির `প্রেল্যুড আ লাপ্রেমিদি দ্যুন ফোন- ১৮৯৪’-এর কথা বলা যায়। এই সঙ্গীতকর্মটি মালার্মের ÔL’après-midi d’un faune (1896)- এক ছাগদেবতার অপরাহ্ন)’ দ্বারা অনুপ্রাণিত। মরিস রাভেল ÔTrois poèmes de Mallarmé(Un coup de dés jamais n’abolira le hasard)Õ মালার্মের তিনটি কবিতা (১৯১৩)-য় সুরারোপ করেন। সঙ্গীত ব্যতীতও মালার্মের জীবনের সবচেয়ে বেশি নিরীক্ষাপ্রবণ ও শৈল্পিকভাবে সফল দীর্ঘ কবিতা `পাশার ঘূর্ণন কখনোই হারাবে না সুযোগ’ অবলম্বনে চলচ্চিত্রকার ম্যান রে নির্মাণ করেছেন তাঁর `পাশার প্রাসাদের রহস্য (Les Mystères du Château de Dé)|’

অনুবাদক ও সমালোচক বারবারা জনসন বিশ শতকের ফরাসী সমালোচনা ও তত্ত্বের ভুবনে মালার্মের প্রভাব বিষয়ে বলতে গিয়ে জানান: Ôমালার্মের কাছ থেকে প্রভূত পরিমাণে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমেই সম্ভবত: রোঁলা বার্থ সাহিত্যে লেখকের মৃত্যু বিষয়ে কথা বলা শুরু করেন। পাঠকে শুধুই ব্যক্তি লেখকের উদ্দেশ্যের উদ্গম হিসেবে না দেখে কাঠামোবাদী এবং বিনির্মাণবাদীরা ভাষা-তাত্ত্বিক দ্যোতকের নানা পথ ও বিন্যাস লক্ষ্য করেছেন, নতুন করে মনোযোগ দিয়েছেন বাক্যগঠন, যতিগত পরিসর, অন্তর্পঠন, ধ্বনি, শব্দার্থবিদ্যা, ব্যকরণ এবং এমনকি ব্যক্তিগত চিঠি-পত্রেও। জাঁক দেরিদা, জুলিয়া ক্রিস্তেভাঁ, মরিস ব্লাঁশো এবং বিশেষত: জাঁক লাঁকা মালার্মের জটিল কবিতাগুচ্ছের কাছে নানাভাবেই দায়বদ্ধ ।‘  নিচে পাঠকদের জন্য স্তেফান মালার্মের তিনটি বিখ্যাত কবিতার বঙ্গানুবাদ দেওয়া হলো: 

এক ছাগ দেবতার অপরাহ্ন ÔL’après-midi d’un faune

 রোমক পুরাণে বর্ণিত এক ছাগ দেবতা :
সেই পরীদের চির অমর দেখতে চাই আমি,
যারা এত স্বচ্ছ
যেনবা অতীব লঘু দেহ তাদের বাতাসে ভাসে,
বাতাসে চপল দেহবিভঙ্গ ওদের
নিয়ে আসে গাঢ়, পত্রপল্লবিত নিদ্রার ঘোর।
আমি কি ভালবেসেছিলাম এক স্বপ্ন?
আমার সন্দেহ, যেন প্রাচীন রাত্রির স্তপ, গোলকধাঁধাঁর মত
শাখা-প্রশাখায় খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই পরীদের।
হাতড়ে খুঁজে ফেরা সেই একই প্রকৃত অরণ্য
যা প্রকাশ করে
গোলাপের আদর্শ ভুল হিসেবে আমার বিজয়।
একবার বিবেচনা করো…
তোমার ভাবনায় সদা উদ্ভাসিত নারীরা
আসলে তোমারই কল্প-বাসনার প্রতিমা!
হে ছাগ দেবতা, পবিত্রতর পরীর তুষার শীতল নীল চোখ
থেকে তবু বিভ্রম ছড়ায় যেনবা ক্রন্দনশীল ঝর্ণা।
আর অন্য যা কিছু দীর্ঘশ্বাসে প্রোথিত,
তুমি বলতে চাও সেসবই
ভেড়ার পশমের মত তপ্ত দুপুরের হাওয়ার সাথে তূল্য?
না! তীব্র গরমের এই শ্বাসরোধী সকালের গতিহীণ,
ক্লান্ত মূর্ছার ভেতর দিয়ে,
আমার বাঁশী ব্যতীত উপবনের ভেতর দিয়ে
কলকল শব্দে প্রবাহিত নয় কোন জলধারা।
দিগন্তের একমাত্র বায়ুতে কোন লহরী নেই,
আমার যমজ পাইপ থেকে নি:সৃত এবং সহজে নিষ্কাশনক্ষম
সুরধারা বৃষ্টির শুষ্ক প্রবাহে যেন
সেই দৃশ্য, শান্ত ও অলীক প্রেরণাদায়ী বায়ু
যা জেগে উঠছে প্রার্থনার মত।

চেহারা   Poème Apparition

দু:খী হয়ে পড়ছিল চাঁদ। ক্রন্দনশীল দেবশিশুরা স্বপ্ন দেখছিল।
শান্ত ও বাষ্পীয় পুষ্পস্তবকে তাদের তীরবাহী আঙুল
যেন বা তাদের মরণাপন্ন বেহালার তার বাদিত হচ্ছিল
আর আকাশ-নীল ফুলের পাঁপড়িতে গড়িয়ে পড়ছিল শ্বেত অশ্রু।
সে ছিল তোমার প্রথম চুম্বনের আশীর্ব্বাদধন্য দিন,
এবং আমি শহীদ হলাম আমার স্বপ্নের কাছে,
বেঁচেছিল যা বিষাদের সুগন্ধীর উপর ভর করে,
যা এমনকি কোন পরিতাপ বা দূর্ঘটনা ব্যতীতই
একটি স্বপ্নকে সেই হৃদয়ের কাছে রেখে যায়
যে প্রথম স্বপ্নটি তুলেছিল।
এখানে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, পুরণো পাথর বাঁধাই সড়কে
আমার চোখ নাচছিল।
যখন তোমার চুলে সূর্যের উচ্ছাস নিয়ে, রাস্তায় এবং রাত্রিতে,
তুমি সহাস্যে আমার কাছে এসেছো,
এবং আমি ভাবলাম আমি দেখছি আলোর টুপি পরা এক পরীকে,
যে আমার শৈশব নিদ্রার স্বপ্নে দেখা দিত,
এবং যার অর্দ্ধমুষ্টি হাত থেকে
সুগন্ধী নক্ষত্ররাজিতে ঝরে পড়ছে পুঞ্জ পুঞ্জ তুষার।
বৃক্ষের সূক্ষ যত শাখায়।

জানালা  Les fenêtres

দু:খী হাসপাতালের পূতি গন্ধে ক্লান্ত
যে গন্ধ বেয়ে উঠছে আর বসে যাচ্ছে পর্দার
বস্তাপচা সাদায়,
শুণ্য দেয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর বিপুল অবসাদ,
অসুখী ওয়ার্ডে মৃতপ্রায় সেই বৃদ্ধ বসে আছেন প্রায়ান্ধকার ঘরে।

বৃদ্ধ শিরদাঁড়ায় কখনো কখনো ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন,
জানালার সামনের পাথররাজি দেখার ইচ্ছে তত নেই-
যারা যতটা না রোদে পোড়া ততটা নয় তপ্ত
আর ক্ষয় হতে পারে যখন তখন,
জানালার শার্সিতে তবু তাঁর সাদাটে চোয়াল
আর চোয়ালের হাড় আঠার মত সেঁটে থাকে-
যে শার্সি আহা মিষ্টি রোদ্দুরে বাদামী।

জ্বরগ্রস্থ মুখখানা তার নীলের জন্য বড্ড লোভী
যেমনটা বহু বহু আগে, এক কুমারী ত্বকে, নোনা চুমু দেবার আশায়,
তৃষার্ত হয়ে উঠতেন তিনি, আর দীর্ঘ আলিঙ্গন,
সোনালী, কবোষ্ণ বর্গক্ষেত্রে দীর্ঘ কর্ষণ।

আসবমত্ত তিনি বেঁচে থাকেন, পরিশোধিত যত ঔষধি ভুলে,
কফ, ঘড়ি, পবিত্র যত তেল, যে বিছানায় তাঁর মৃত্যু হয়;
আর সন্ধ্যা যখন রক্তক্ষরণ করছে তাঁর যাবতীয় প্রতিবন্ধকতার উপরে,
তাঁর চোখজোড়া, দিগন্তের আলোয় সেঁটে আছে।

বেগুণীবর্ণ ঢেউয়ের উপরে তিনি দেখতে পান স্পেনীয় অর্ণবপোত,
সুরভিত, যেন বা সমাধিগ্রস্থ রাজহংসের ঝাঁক সাঁতার কাটছে,
ঐশ্বর্যময় আলোর রেখার চমকে সাজাচ্ছে তারা সারিবদ্ধ রেখা
স্মরণে প্লাবিত এক পরম আলস্যে।

সুতরাং কঠোর হৃদয় পুরুষদের প্রতি বিরূপ হয়ে,
যাদের স্বাদের শেকড় শুধুই সুখের গোবরগাদায়,
জলাভূমিতে দৃঢ়, সেই নারীকেই তারা কিছু কিছু দান করে
যে স্তন্য পান করায় তার শিশুদের।

আমি উড়ে যাই, এবং প্রতিটি জানালার সাথে সেঁটে থেকে,
কাব্য করি, জীবনের দিকে ফিরে আমার কাঁধ পরিতাপ করে,
চিরায়ত শিশিরে ধোয়া গ্লাসে তাদের
অসীমের পবিত্র সকালের অপরাধবোধ।
দেবদূতের মত প্রতিসরিত আমি! এবং আমি মরছি,
আর প্রেম, শিল্পের জানালায় রহস্যের বিষন্ন হয়ে থাকা,
পুনরায় জন্ম নেয়া, স্বপ্ন-মুকুট পরা, আরো আগের আকাশে,
যেখানে রূপ প্রথম তার কুঁড়ি থেকে ফেটে প্রস্ফুটিত হয়েছিল।

কিন্ত নিচে এখানে ঈশ্বর আছেন এবং তিনি পরম দয়ালু, আহা!
ধিক্কার আমাকে এমনকি যখন আমি আমার গোলাপও শুঁকি,
মানুষের নিতম্বের নোংরা বমন
আকাশের সামনে আমাকে বাধ্য করে
চেপে ধরতে নাসারন্ধ্র আমার!

এমন কি উপায় নেই কোন যে তিক্ত যত প্রতিবন্ধকতা নিয়েই,
রূঢ়ভাবে কলুষিত
এই জানালার কাঁচ ভেঙে
উড়ে যেতে পারি নি:সীম নীলে উন্মুক্ত দুই পক্ষ বিস্তার করে?
—     অনন্তের ভেতর পতিত হবার সম্ভাবনা নিয়েই?  

Comments

comments

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী

জন্ম: ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে সম্মানসহ ¯œাতকোত্তর। কাজ করেছেন ও করছেন একাধিক সংবাদপত্র, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায়। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০ (প্রবন্ধ-গবেষণা-গল্প-কবিতা-অনুবাদ সহ)। পুরষ্কার সংখ্যা: ৩। email : audity.falguni@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি