সাম্প্রতিক

ফেরেশতা । মৃন্ময় চক্রবর্তী

হোগলা বনের আড়ালে যে জলটুঙি আছে সেখানে হোসেন ওস্তাদ ঘুমিয়ে থাকে ভোরবেলা। তারপর আর তাকে দেখতে পাওয়া যায় না। হোগলার বনে ফুল তুলতে এসে রাজু, অনাদি, মোজ্জামেলরাই কেবল ওকে দেখতে পায়। তারপর হাঁটুগেড়ে সেলাম দেয়।

হোগলার ফুল শুক্রবারের হাটে খুব বিক্রি হয়। ফুলের গুঁড়ো ভেজে মুড়ি দিয়ে খেতে বেশ লাগে। হোসেনের ঘুম ভাঙলেই বলে, কইহে মুরিদরা, আমারে কিছু ফুল দিয়ে যাও!

হোসেন ওস্তাদ বাজিকর নয়, শিকারি ছিল। পাখি ধরত মাঠে একসময়। বিক্রি করত হাটে। এখন আর সে শিকার করে না। বরং নিজেই সারারাত পাখিদের সাথে উড়ে বেড়ায় বিলের আকাশে।

বিশ্বেস করো, পুরো মানষির গলায়, এক্কেবারে। আমি ভয়ে অস্থির। জাল আলগা করে দিচি। উড়ে গেছে পাখিরা। কিন্তু সেই হাঁসটা যায়নি। সে ফের বললে, ওস্তাদ তুমি চাইলি আমাদের দলে আসতি পারো। তোমায় ওড়া শিকিয়ে দোবো, দেকবে কী আনন্দ। আকাশ তোমায় বড় করবে। পাখির বুক অনেক বড় ওস্তাদ। চলে এসো..

হ্যাঁ, খাটি সত্যি কথা। রাজু একবার ভুল করে ভোরের হবার বেশ আগে এসে পড়েছিল হোগলা বনে। তখন অনেক রাত। ও দেখেছিল একটা মানুষ আকাশে উড়ছে হাঁসেদের সঙ্গে। চাঁদের আলোয় কী অদ্ভুত সেই দৃশ্য। ও তারপর ভয়ে লুকিয়ে গেল চুপচাপ। ভোর হবার আগে যেই মানুষপাখিটা নেমে এলো জলটুঙিতে, রাজু বুঝল হোসেন ওস্তাদ ফেরেসতা হয়ে গেছে।

সারা গাঁয়ে রটে গিয়েছিল খবর। কিন্তু কেউ খোঁজ পায়নি তার। এমনকি যে ফকিরমোল্লার ঘেরিতে হোসেন পাহারা দেয়, সেও না।

কিন্তু রাজু, আর তার বন্ধুরা ওকে দেখতে পায় ভোরবেলা। রাজু জিজ্ঞাসা করে, ওস্তাদ এই পাখি হয়ে ওড়াটা কীরকম? হোসেন বলে, তাহলে শোনো গল্প, একদিন আমি মাঠে মশাল জ্বাইলে পাখি ধরতিচি, তা বেশ কটা হাঁস ধরা পড়েচে, টিয়াও পড়েচে। সবকটারে নে জালে ফাঁদিয়ে বাড়ি আসচিতি এমন সময় একটা হাঁস আমারে বললে, হোসেন ওস্তাদ মানুষ এমন নিদয় কেনো? আমরা পাখিরা কিন্তুক এমন না। আমাদের ধরে কী পাও তুমি? ওই আকাশটা দেখো কত বড়, বাঁচতে চাইলে এসো আমার সঙ্গে…

বিশ্বেস করো, পুরো মানষির গলায়, এক্কেবারে। আমি ভয়ে অস্থির। জাল আলগা করে দিচি। উড়ে গেছে পাখিরা। কিন্তু সেই হাঁসটা যায়নি। সে ফের বললে, ওস্তাদ তুমি চাইলি আমাদের দলে আসতি পারো। তোমায় ওড়া শিকিয়ে দোবো, দেকবে কী আনন্দ। আকাশ তোমায় বড় করবে। পাখির বুক অনেক বড় ওস্তাদ। চলে এসো..

সেই শুনে আমার যে কী হল…

রাজুরা দেখল সকাল হয়ে আসছে আর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে হোসেন!

Comments

comments

মৃন্ময় চক্রবর্তী

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম — ১৯৭৬, কলকাতার ঢাকুরিয়ায়। কবিতার পাশাপাশি গদ্যে, অনুবাদেও তাঁর বিচরণ। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি ( ২০০৪), এই মৃগয়া এই মানচিত্র ( ২০০৮)। পাঁচালি কাব্য: ভুখা মানুষের পাঁচালি ( ২০০৯)। সম্পাদিত গ্রন্থ পুস্তিকা : রাত্রির কঠোর বৃন্ত থেকে, মানিক শতবর্ষপূর্তি শমীবৃক্ষ, নির্মোহ রবীন্দ্রনাথ ( শমীবৃক্ষ)। সম্পাদিত পত্রিকা: মাটির প্রদীপ। ইমেল : mrinmoyc201@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি