সাম্প্রতিক

ছোটদের গৌতম বুদ্ধ, ‘পর্ব ৩’ । অদিতি ফাল্গুনী

মানুষের তিন প্রধান বৈরী

লোভ : মোট পাঁচটি লোভ মানুষের ক্ষতি করে। এই পাঁচটি লোভ হলো যথাক্রমে টাকা-পয়সা, নাম-যশ বা খ্যাতি, ছেলেদের জন্য সুন্দরী মেয়ে আর মেয়েদের ক্ষেত্রে সুন্দর ছেলের জন্য আকাক্সক্ষা, খাবার এবং ঘুমের লোভ।

ক্রোধ: রাগ বা মানুষের প্রতি ঘৃণা আমাদের মন্দ কাজের একটি বড় কারণ। কোনো কারণে মনে দুঃখ পেলেও রাগ করার বদলে শান্ত থাকা ও ধৈর্য রাখা উচিত।

মোহ: কোনো মিথ্যে বা ভুল জিনিস দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করা। আমাদের উচিত সবকিছু বস্তু নিরপেক্ষ আর যৌক্তিকভাবে বিচার করা।

বৌদ্ধ ধর্মের মোট দশটি ভালো কাজ

১.  কাউকে হত্যা না করা,
২. চুরি না করা,
৩. ব্যভিচার না করা,
৪. মিথ্যা কথা না বলা,
৫. মিথ্যা কথা না বলা,
৬. কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা গালিগালাজ না করা,
৭. কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা না বলা,
৮. লোভ না করা,
৯. ঘৃণা না করা,
১০.    কোনো মোহে না পড়া।

ধামেক বৌদ্ধ স্ত্মত্মপ, সারনাথ, ভারত; এখানেই প্রথম গৌতম বুদ্ধ তাঁর পাঁচ শিষ্যকে ধর্ম শিক্ষা ও ‘চার পরম সত্য’ শিক্ষা দেন।

ধ্যান থেকে জেগে উঠার পরপরই বুদ্ধ দুজন বণিকের সাক্ষাত পেলেন। তাঁদের নাম তপুস্যা এবং ভলিস্কা। এই দুই বণিকই প্রথম বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁরা মাথার চুল ফেলে দিলেন যা বর্তমানে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে শোয়েডাগন মন্দিরে রক্ষিত। বুদ্ধ এ সময় অসিত ভ্রমণ করে তাঁর প্রাক্তন শিক্ষক আলারা কালামা এবং উদাকা রামপুত্তর সাথেও সাক্ষাৎ করতে চাইলেন। কিন্তু শেষোক্ত দুজন ইতোমধ্যেই মারা গেছেন।

এরপর বুদ্ধ উত্তর ভারতের বারানসীর নিকট মৃগ আশ্রমে যান। সেখানে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম অনুষঙ্গ `ধর্মচক্র’ স্থাপনা করেন এবং তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যকে বোধি বিষয়ে উপদেশ দেন। তাঁর সাথে মিলে এই পাঁচ শিষ্যই প্রথম সংঘ গঠন করেন। সংঘ বলতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আশ্রম বোঝানো হয়। এই পাঁচ শিষ্যই পরে `অর্হৎ’ হন। এবং মাত্র দুই মাসের ভেতরেই যশসহ বুদ্ধের আরো ৫৪ জন বন্ধু বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হন এবং মোট ৬০ জন মানুষ বুদ্ধের বুদ্ধত্ব অর্জনের দুই মাসের ভেতরেই বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়ে `অর্হৎ’ নন। এরপরই কাশ্যপ গোত্রের তিন ভাই তাঁদের বিখ্যাত ২০০, ৩০০ এবং ৫০০ শিষ্য নিয়ে যোগ দেন। এতে সংঘের সদস্য মোট ১,০০০-এ দাঁড়ায়।

ভ্রমণ এবং শিক্ষাদান

বুদ্ধ তাঁর রক্ষাকর্তা বজ্রপাণির সঙ্গে, গান্ধার, দ্ধিতীয় অব্দ, অস্টাসিয়াসটিশে কুস্নট মিউজিয়াম।

বুদ্ধত্ব অর্জনের পর জীবনের বাকি ৪৫টা বছর গৌতম বুদ্ধ গাঙ্গেয় অববাহিকায় ভ্রমণ করেন। বিশেষত গাঙ্গেয় অববাহিকার অন্তর্গত উত্তর প্রদেশ, বিহার এবং নেপালের দক্ষিণে। বিচিত্র নানা ধরনের মানুষকে শিক্ষা দেন তিনি। অভিজাত রাজন্যবর্গ থেকে শুরু করে রাস্তার ঝাড়দার, অঙ্গুলীনামার মতো খুনি থেকে শুরু করে নরমাংসভোজী অলবাকা… সবাইকে নীতি শিক্ষা দেন তিনি। সেই সময়কার হিন্দু সমাজে বিদ্যমান জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে বুদ্ধ তাঁর ধর্মে জাতিভেদ প্রথার বিলোপ ঘটান। যদিও বুদ্ধ ঠিক কোন্ ভাষায় শিক্ষা দিতেন তা আজ এতদিন পর অনুমান করা সত্যিই কঠিন, তবে নানা প্রমাণ সাপেক্ষে ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, মধ্য ভারতের ইন্দো-আর্য ভাষার এক বা একাধিক ভাষাতেই তিনি তাঁর ধর্মোপদেশ প্রচার করেছেন। পালি এই ভাষাগুলোর প্রমিত রূপ।

বুদ্ধ ও তাঁর সংঘ গোটা উপমহাদেশ ভ্রমণ করা শুরু করেন। সেই সাথে চলে নতুন ধর্ম বিষয়ে আলোচনা এবং উপদেশ। গোটা বছর জুড়েই চলত বুদ্ধ আর তাঁর ভিক্ষুদের প্রব্রজ্যা। শুধু `বষন্ন’ বা বর্ষার সময়ের চারটি মাস ভিক্ষুদের সঙ্গে থাকতে হতো। এর একটি কারণ ছিল এই যে, প্রাণীদের কোনো ক্ষতি না করে বর্ষাকালে চলাফেরা করা সত্যিই বেশ কঠিন কাজ। বর্ষার এই সময়টা ভিক্ষুরা সংঘে, অরণ্যে বা জন উদ্যানে  আশ্রয় নিতেন যেখানে জীবনের সর্বস্তরের মানুষেরা তাঁদের সাথে এসে দেখা করতেন।

বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যদের প্রথম বর্ষা কেটে গেল বারানসীতেই যেখানে সংঘ গঠিত হয়েছিল। এরপর বুদ্ধ মগধের রাজা বিম্বিসারের কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য মগধের রাজধানী রাজগহতে গেলেন। এই ভ্রমণের সময় সারিপুত্ত এবং মৌদগলন্য আসসাজি কর্তৃক বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। এই সারিপুত্ত এবং মৌদগলন্যই বুদ্ধের প্রথম পাঁচ শিষ্যের দুই অতি অনুগত্য শিষ্য ছিলেন। এরপর বুদ্ধ তিনটি মৌসুম মগধের রাজধানী রাজগহের ভেলুবন বাঁশ ঝাড় সংঘে কাটিয়ে দেন।

ছেলের বুদ্ধ হবার সংবাদ পেয়ে রাজা শুদ্ধোদন দশজন প্রতিনিধির একটি দল পাঠালেন। যেন প্রতিনিধি দল বুদ্ধকে কপিলাবাস্তুতে ফিরে যেতে বলে। প্রতিনিধি দলের প্রথম নয় সদস্যই বুদ্ধকে তাঁর পিতা শুদ্ধোদনের কথা বলতে গিয়েও ব্যর্থ হন। উলটো তাঁরা নিজেরাই সংঘে যোগদান করে `অর্হৎ’ হয়ে যান। কিন্তু দশম প্রতিনিধি কলুদায়ি, গৌতম বুদ্ধের এক শৈশবের বন্ধু (যিনি কিনা পরে একজন অর্হৎও হয়েছেন), বুদ্ধকে তাঁর পিতার কথা জানালেন।

এভাবে বোধি লাভের দু-বছর পর বুদ্ধ কপিলাবাস্ত ফিরতে রাজি হলেন। এবং এই দুই মাস পায়ে হেঁটে কপিলাবাস্তু এসে সবাইকে ধর্ম শিক্ষা দিলেন। বুদ্ধ ফিরে আসার পর রাজপ্রাসাদ থেকে এক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। কিন্তু বুদ্ধ নিজে কপিলাবাস্ত শহরে তাঁর শিষ্যদের নিয়ে ভিক্ষা করে বেড়ালেন। এ কথা শুনে শুদ্ধোদন তাঁর ছেলের কাছে গেলেন এবং বললেন, ‘ক্ষত্রিয় বংশের রাজপুরুষ আমরা। আজ পর্যন্ত আমাদের বংশের কেউ কখনো ভিক্ষা করেননি।‘

বুদ্ধ উত্তর করলেন, ‘সে তো’ তোমার ক্ষত্রিয় রাজবংশের কেউ ভিক্ষা করেনি। কিন্তু আমার বৌদ্ধ নিয়মে সব ভিক্ষুকেই ভিক্ষা করতে হয়। অতীতেও কয়েক সহস্র বুদ্ধ ভিক্ষা করেছেন।’

বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলোর বর্ণনা মতে, এরপর শুদ্ধোদন সংঘকে একটি ভোজনের অনুষ্ঠানে ডাকলেন। ভোজনের পর ধর্ম আলোচনা ছিল। এই আলোচনার পর শুদ্ধেদন একজন ‘স্রোতাপন্ন’ হন। ভ্রমণের সময় রাজ পরিবারের অনেকেই ‘সংঘ’-তে যোগদান করেন। বুদ্ধের দুই মাসতুতো ভাই আনন্দ এবং অনুরুদ্ধ তাঁর পাঁচ প্রধান শিষ্যের অন্যতম ছিলেন। সাত বছর বয়সে বুদ্ধের পুত্র রাহুলও সংঘে যোগ দেন। বুদ্ধে বৈমাত্রেয় ভাই নন্দও সংঘে যোগ দেন এবং একজন অর্হৎ হয়ে যান।

বুদ্ধের শিষ্যদের ভেতর সারিপুত্ত, মৌদগলন্য, মহাকাশ্যপ, আনন্দ এবং অনুরুদ্ধ তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে মনে করা হয়। এর পরেই তাঁর বাকি পাঁচ প্রিয় শিষ্য হলেন উপালি, শুভতি, রাহুল, মহাক্কানা এবং পুণ্য। পঞ্চম বসন্নে বুদ্ধ বৈশালীর নিকট মহাবানায় ছিলেন যেখানে বসেই তিনি তাঁর পিতার আসন্ন মৃত্যুর সংবাদ শুনলেন। তিনি তখন শুদ্ধোদনের কাছে তাঁকে ধর্ম শেখালেন এবং তাঁর পিতা একজন ‘অর্হৎ’ হলেন।

রাজার মৃত্যু এবং দাহ ক্রিয়া সমাপ্ত হবার পর ভিক্ষু বা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ভেতর একটি ধারাক্রম প্রতিষ্ঠার প্রেরণা দেখা দেয়। বুদ্ধের অনুসারীদের ভেতর আনন্দের স্মৃতিশক্তি ছিল সবচেয়ে প্রখর। শৈশবেই আনন্দ সংঘে যোগ দেন। বলা হয়ে থাকে যে অনিরুদ্ধ এবং ভদ্রের সাথে মিল আনন্দ ভিক্ষু হয়েছিলেন। শাক্য বংশের যে চারজন রাজপুত্র একযোগে ভিক্ষু হন, বয়সে আনন্দ ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। আনন্দর পিতা ছিলেন গৌতম বুদ্ধের পিতৃব্য (কাকা) শুক্লোদন। বোধি লাভের পরপর বুদ্ধ যখন নিজ জন্মভূমি কপিলাবাস্তুতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য ফিরে আসেন, তখন শুক্লোদন বুদ্ধের প্রভাব থেকে ছেলেকে মুক্ত রাখার জন্য আনন্দকে নিয়ে বৈশালী চলে যান। কিন্তু পরে বুদ্ধ যখন ধর্ম প্রচারের কাজে বৈশালী যান, তখন শুক্লোদন ছেলেকে নিয়ে আবার কলিপাবাস্তুতে ফিরে আসেন। কিন্তু এত কিছু পরেও কোনো লাভ হয় না। আনন্দ বুদ্ধর বাণী ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন। সত্যি কথা বলতে বুদ্ধর বরাবরই এই আস্থা বোধ ছিল যে আনন্দ তাঁর সঙ্গী হবেন। দূরদর্শী বুদ্ধ বুঝেছিলেন যে, “আনন্দ যদি গৃহত্যাগ করেন, তবে সে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও আমার ধর্মের আলো ছড়িয়ে দিতে পারবে।” বুদ্ধ যখন জানতে পেলেন যে, আনন্দ কপিলাবাস্তুতে ফিরেছেন, তখন তিনি দ্রুতই শুক্লোদনের প্রাসাদে যান। বুদ্ধকে দেখেই আনন্দ তাঁকে প্রণাম করে একটি পাখা দিয়ে বাতাস করতে শুরু করেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে, শৈশব থেকেই বুদ্ধের প্রতি আনন্দের ছিল গভীর শ্রদ্ধবোধ। আরো বড় হবার পর রাজপুত্র আনন্দ এবং ভদ্র বুদ্ধের সংঘে যোগ দিলেন।

ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠায় আনন্দ খুব বড় ভূমিকা রেখেছেন। মূলত সংঘেই বড় হবার কারণে আনন্দ তাঁর আচার-আচরণে ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র ও শান্ত-শিষ্ট প্রকৃতির। নারীরা তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করত। কেননা, তিনি সংঘে মেয়েদের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে বুদ্ধের সঙ্গে লড়াই করেছেন। আনন্দের ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টাই মেয়েদের ভিক্ষুণী সংঘে যোগদানের প্রশ্নে বুদ্ধের অনুমতি আদায়ে সক্ষম হয়। আসলে গৌতম বুদ্ধের প্রতিপালিকা মা  মহা প্রজাপতি যখন দেখলেন যে, বুদ্ধ বোধি অর্জনে সক্ষম হয়েছেন, তখন মহা প্রজাপতি বুদ্ধকে সংঘে যোগদান করার ইচ্ছা জানালে বুদ্ধ প্রথমে রাজি হননি। কিন্তু মহা প্রজাপতি এই নতুন ধর্মের জ্ঞান লাভের জন্য এতটাই অস্থির হয়ে যান যে তিনি শাক্য এবং কলিয়ান নারীদের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে বুদ্ধের পেছন পেছন রাজগহ অবধি এক লম্ব পথ অনুসরণ করেন। তখন শিষ্য আনন্দ মেয়েদের ভিক্ষুণী হিসেবে সংঘে যোদানের অনুমতি দানের জন্য বুদ্ধকে অনুরোধ করলে বুদ্ধ রাজি হলেন। এভাবেই সংঘ গঠনের পাঁচ বছরের ভেতর মেয়েরা ভিক্ষুণী হিসেবে সংঘে যোগদানের অনুমতি পেল। বুদ্ধ বললেন যে, নারী ও পুরুষের উভয়েরই প্রজ্ঞা অর্জনের ক্ষমতা রয়েছে। তবে তিনি মেয়েদের বাড়তি ‘বিনয় ও নীতি’ অনুসরণের পরামর্শ দিলেন।

বুদ্ধের এই অনুমতি পেতে মহা প্রজাপতির কিন্তু প্রচুর কষ্ট হয়েছে। মাসী ও প্রতিপালিকা মায়ের ক্রমাগত অনুরোধ এড়াতে বুদ্ধ বৈশালী থেকে অ-নে-ক দূরে অবস্থিত নমন্তিনী সংঘে চলে যান। মহা প্রজাপতি কিন্তু এতে মোটেই দমে গেলেন না। শাক্য গোত্রের পাঁচশত নারীকে জড়ো করে (যাঁরা তাঁর মতোই সংসারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে সন্ন্যাস নিতে চাইছিলেন) তিনি নমন্তিনী সংঘে চললেন। মহা প্রজাপতি এবং এই পাঁচশত নারীর প্রত্যেকেই তাদের মাথা নেড়া করে, নগ্ন পায়ে দুই হাজার মাইল হেঁটে নমন্তিনী সংঘের সামনে গিয়ে সমবেত হলেন। এতদিন নারীরা সবাই প্রাসাদে স্বাচ্ছন্দ্যে থেকেছে। এত দীর্ঘ পর্থ হাঁটার কষ্ট তাঁরা আগে কখনো করেনি। কাজেই এই নারীদের সবাইকে খুব ক্লান্ত আর পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছিল। আবার মেয়েদের সংঘে ঢুকা নিষেধ বলে তাঁরা সংঘের ভেতরেও ঢুকতে পারছিল না। কিম্বা ঢুকার সাহস পাচ্ছিল না। আনন্দ মেয়েদের দেখে বাইরে বেরিয়ে এলেন। দেখলেন মহাপ্রজাপতি এবং তাঁর সাথের পাঁচশ নারী ভিক্ষুণী গেরুয়া বসনে বাইরে দাঁড়ানো। তাদের মুখে পথের ধুলো আর চোখে জল। আনন্দ মনে খুব আঘাত পেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, `কী হয়েছে?’

মহাপ্রজাপতি উত্তর করলেন, ‘আমরা আমাদের প্রিয়জন এবং আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে এতটা পথ হেঁটে এসেছি ভিক্ষুণী হবার জন্য। বুদ্ধ যদি আমাদের আবার প্রত্যাখ্যান করেন, তবে আমরা এখানেই মরবো এবং আর কখনোই ফিরবো না।‘

আনন্দ এ কথায় এতটাই কষ্ট পেলেন যে, তিনি তাঁর চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। সাথে সাথে বুদ্ধের কাছে ছুটে গিয়ে মেয়েদের সংঘের যোগদানের অনুমতি চাইলেন।

বুদ্ধ অবশ্য এ কথার উত্তরে বললেন, ‘আনন্দ, এই নারীদের প্রতি আমার পূর্ণ সহানুভূতি আছে। তবু আমি মনে করি যে, আমাদের ভিক্ষু সংঘে মেয়েদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।‘

‘প্রভু! আমাদের ধর্মে নারী আর পুরুষে কি সত্যিই ভেদ (পার্থক্য) আছে?’

‘আনন্দ! ধর্ম স্বর্গ এবং পৃথিবীতে একই। আমি নারীর প্রতি বৈষম্যে বিশ্বাসী নই। পৃথিবীর সকল জীবিত প্রাণীকে আমি একই চোখে দেখি। আমি বিশ্বাস করে যে, মেয়েরা পুরুষের সমান সব কাজই করতে পারে। তারা আমার ধর্ম গ্রহণ করে গৃহেই (ঘরে) এই ধর্ম পালন করুন। কিন্তু তাই বলে তাদের ভিক্ষুণী হবার দরকার নেই। এখানে নারী-পুরুষ অসাম্যের কোনো প্রশ্ন নেই। ঘর ছাড়া মেয়েরা মাঠে বেড়ে ওঠা বুনো ঘাসের মতো যা শেষ পর্যন্ত চাষাবাদের ক্ষতি করে।’

বুদ্ধের এই কথার গভীর অর্থ ছিল। মানবতার দিক থেকে দেখলে সন্ন্যাসী হতে ছেলেরা ঘর ছাড়তে পারলে মেয়েদেরও তাদের ঘর ছাড়তে কোনো সাামজিক বা ধর্মীয় বাধা থাকা উচিন নয়। কিন্তু সংঘে পাশাপাশি থেকে ধর্ম পালন করতে থাকলে কিছু ভিক্ষু-ভিক্ষুণী সন্ন্যাসব্রত পালন না করে সংসার ধর্ম শুরু করতে পারে। অথবা হয়তো বুদ্ধের মনে হয়েছিল যে, পুরুষের তুলনায় নারী অধিকতর অন্তঃসারশূন্য, কোমল এবং ধীর গতি। কাজেই মেয়েদের সন্ন্যাসের এই কঠোর শিক্ষা তিনি দিতে চাননি।

বুদ্ধ নিষেধ করা সত্ত্বেও আনন্দ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘তাই বলে চোখের সামনে এই মেয়েদের আপনি মরতে দেখবেন? একটু করুণা করুন প্রভু। তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন।’

বুদ্ধের তখন মনে হলো একই সাথে ধর্মের কঠোর নিয়ম এবং মানবীয় অনুভূতি রক্ষা করা সম্ভবপর নয়। তিনি আরো বুঝতে পারলেন যে, ধর্মের কোনো বিশুদ্ধ এবং অপরিবতর্নীয় সংজ্ঞা নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি অবশেষে মেয়েদের ঘর ছাড়ার জন্য আনন্দের মতে সম্মতি দিলেন। ভীষণ খুশি হয়ে আনন্দ ছুটে গিয়ে সংঘের বাইরে অপেক্ষারত মেয়েদের এই তথ্য জানালেন। মহাপ্রজাপতি ও তাঁর সাথের পাঁচশ নারী এই সংবাদ শুনে কেঁদে ফেললেন। বুদ্ধ তখন পাঁচশ নারীর সাথে দেখা করলেন এবং তাদের পুরুষ ভিক্ষুদের সাথে আটটি অতিরিক্ত সংযম নীতি পালনের পরামর্শ দিলেন।

আনন্দ, চন্ডালিকা মাতঙ্গ (প্রকৃতি) বুদ্ধ

আনন্দ বয়সে ছিলেন তরুণ এবং দেখতে ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন। এ জন্য মাঝে মাঝেই তাঁর কিছু সমস্যা হতো। যেমন একদিন শ্রাবন্তী নগরীতে রোদ্দুরে ঘুরে ভিক্ষা করতে আনন্দের হঠাৎ খুব তৃষ্ণা পেল। তখন তিনি একটি কুয়ো দেখতে পেলেন। একটি কৃষক মেয়ে কুয়ো থেকে জল তুলছিল। আনন্দ পিপাসার্ত। তাই মেয়েটির কাছে জল চাইলেন।

মেয়েটি আনন্দকে চিনতে পারল। সে যেহেতু দরিদ্র চাষি পরিবারের মেয়ে তাই খুব লজ্জার সাথে বলল, ‘আমি গরিব চাষির মেয়ে। নিচু চন্ডাল বংশে আমার জন্ম। আপনাকে জল দেবার অধিকার কি আমার আছে?

আসলে বুদ্ধ তাঁর ধর্ম ভারতে প্রচারের আগে গোটা ভারতের মানুষ ছিল উঁচু-নিচু জাতে বিভক্ত। বুদ্ধের ধর্মেই প্রথম সব মানুষকে সমান বলা হয়। আনন্দ তখন মেয়েটিকে সান্ত¦না দিয়ে বললেন, ‘আমি ভিক্ষু। ভিক্ষুর কাছে কোনো ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু নেই। যে মানব আমি তুমি সেই মানব কন্যা!’

সারা জীবন যে মেয়ে কিনা সবার কাছে শোনেছে সে ‘নিচ’ আর `গরিব’, সে আনন্দের কাছে এই সাম্যের বাণী শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল। আনন্দকে জল দেবার পর আনন্দ জল খেয়ে চলে গেল। এ দিকে মাতঙ্গ নামের এই চাষি মেয়েটি আনন্দের সুন্দর চেহারা আর মিষ্টি কথাই ভাবতে লাগল সারাদিন ধরে। স্বপ্নে সে এমনকি আনন্দকে বিয়ে করার কথাও ভাবল। সত্যি বলতে আনন্দ নিজেও মেয়েটিকে ভুলতে পারেননি। পরের দিন আনন্দ যখন মেয়েটির বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন মেয়েটি তাঁকে দেখে হাসল। আনন্দ নিজেও একটু বিচলিত হলেন। কিন্তু সাথে সাথেই তাঁর মনে পড়ে গেল যে, তিনি একজন ভিক্ষু এবং আর দশজনের মতো আচরণ তাঁর শোভা পায় না। আনন্দ সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে পুনরায় জেবতন বিহারের দিকে হাঁটা শুরু করলেন। যেন বা বুদ্ধ নিজেই বাতাস হয়ে এসে তাঁকে জেতবন বিহারের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে শুরু করলেন।

তৃতীয় দিনে আনন্দ যখন আবার শ্রাবন্তীতে ভিক্ষা করতে বের হয়েছেন, সেই তরুণীটি একটি নতুন জামা পরে, চুলে নতুন ফুলের মালা গুঁজে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আনন্দকে দেখামাত্র সে আনন্দের পিছু পিছু হাঁটতে লাগল। বারবার বলতে লাগল, ‘আনন্দ, আমাকে তুমি ছেড়ে যেও না!’ আনন্দ বিচলিত ও অসহায় বোধ করল। সংঘে ফিরে বুদ্ধকে সব খুলে বলার পর বুদ্ধ আনন্দকে বললেন মেয়েটিকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে।

মাতঙ্গ ও আনন্দর কাহিনী নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘চন্ডালিকা’ নাটকের একটি দৃশ্য

মেয়েটি যখন আনন্দের কাছে জানতে পেল যে, বুদ্ধ নিজে তাকে দেখতে চেয়েছেন, সে খুবই অবাক হলো! তবু, আনন্দকে পাবার আশায় বুদ্ধের সাথে দেখা করার জন্য মনে শক্তি সঞ্চয় করল সে। মেয়েটিকে সামনা-সামনি দেখে বুদ্ধ ঈষৎ হেসে বললেন, `দ্যাখো, আনন্দ তো ভিক্ষু ব্রত পালন করছে। ওর বউ হতে হলে আগামী এক বছর তোমাকেও ভিক্ষুণী হিসেবে ঘর ছেড়ে সংঘে থাকতে হবে। তুমি কি রাজি?’

‘আমি রাজি,প্রভু!’ মেয়েটি বেশ অবাক হলো। সে ভাবতেই পারেনি তার ইচ্ছা পূরণে বুদ্ধ এত দ্রুত রাজি হবেন।

‘আমার ধর্মমতে ভিক্ষু বা ভিক্ষুণী হবার জন্য ঘর ছাড়ার আগে পিতা-মাতার উপদেশ প্রয়োজন। তুমি কি তোমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে পার?’

মেয়েটি এ কথায় দ্রুতই ঘাড় নেড়ে বাসায় ছুটল তার মাকে বুদ্ধের সামনে নিয়ে আসতে। তার মাও আনন্দকে বিয়ে করার আগে মাতঙ্গর এক বছর ভিক্ষুণী হবার শর্ত খুশি মনেই মেনে নিল।

আনন্দের স্ত্রী হবার জন্য মেয়েটি খুব খুশি মনেই মাথার চুল ফেলে নেড়া হলো। গেরুয়া কাপড় পরে সে খুব উৎসাহের সাথে বুদ্ধের উপদেশ শিক্ষা গ্রহণ করা শুরু করল এবং তাঁর দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন কাটালে লাগল। দেখতে দেখতে ছয় মাসের মধ্যে আনন্দের জন্য মাতঙ্গর আকাঙ্খা কমে গেল। সে বুঝতে পারল প্রেমের জন্য তার ব্যাকুলতা কী অপবিত্র আর লজ্জাকরই না ছিল!

তখন একদিন সে বুদ্ধের পায়ে কেঁদে পড়ে বলল, ‘প্রভু! আজ আমি জেগেছি। আগের মতো অজ্ঞান আর আমি নই। আপনার কাছে সত্যিই খুব কৃতজ্ঞ। আমাদের মতো তুচ্ছ মানুষদের আপনিই প্রকৃত সত্যের পথ দেখিয়েছেন। এখন থেকে আমি চিরতরে একজন ভিক্ষুণী হতে যাচ্ছি। আজীবন আমি আপনার দেখানো সংযমের পথ অনুসরণ করব।‘

বুদ্ধের পথ অনুসরণ করে মাতঙ্গ ধীরে ধীরে একজন আদর্শ সন্ন্যাসিনী হন। একটি চাষির মেয়েকে ভিক্ষুণী হওয়ার অনুমতি দেওয়ায় বুদ্ধকে তাঁর জীবদ্দশায় অনেকে সমালোচনাও করেছিলেন। যেহেতু ভারতীয় সমাজে তখন কঠোর বর্ণাশ্রম প্রথা প্রচলিত ছিল। কিন্তু বুদ্ধ চারটি বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র) মাঝে সমতা চেয়েছিলেন। মাতঙ্গর এই কাহিনি নিয়েই বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত কবি ও লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর `চন্ডালিকা’ গীতিনাট্য রচনা করেন। সেখানে অবশ্য মাতঙ্গর নাম কবি রেখেছেন প্রকৃতি।

ভারতে সেসময় বর্ণাশ্রম প্রথা প্রচলিত ছিল। কিন্তু বুদ্ধ চারটি বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র) মাঝে সমতা চেয়েছিলেন। মাতঙ্গর এই কাহিনি নিয়েই বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত কবি ও লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘চন্ডালিকা’ গীতিনাট্য রচনা করেন। সেখানে অবশ্য মাতঙ্গর নাম কবি রেখেছেন প্রকৃতি।

চন্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একটি দৃশ্যে প্রকৃতি (মাতঙ্গ) ও তার মা

বুদ্ধের মতে, পাঁচ ধরনের বাসনা মানুষকে অপবিত্র করে এবং তার দুঃখ-বেদনার কারণ হয়। এই পাঁর ধরনের বাসনা থেকে মুক্ত হলেই শুধুমাত্র আমাদের মন পবিত্র এবং জীবন শান্তিময় হতে পারে।

আসলে আনন্দ ভিক্ষুণী বা নারী ভিক্ষুদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল বলে ভিক্ষুণীরাও আনন্দকে গভীর সম্মান করতেন। এমনকি কখনো কখনো বয়সে বড় ভিক্ষু মহা কাশ্যপের সাথে হাঁটার সময়ও ভিক্ষুণীরা এসে মহা কাশ্যপের বদলে আনন্দের কাছে নানা বিষয়ে উপদেশ চাইতেন। ভিক্ষু আর ভিক্ষুণীদের প্রতি মুহূর্তে মনের আবেগ আর যুক্তির ভেতর লড়াই করতে হয়। এটা আশা করা কঠিন যে, প্রতিটি ভিক্ষু বা ভিক্ষুণীই সবসময়ই শুষ্ক-কঠোর তপস্যার জীবন কাটাতে পারবে।

জেতবন সংঘে এমন এক তরুণী ভিক্ষু ছিলেন। আনন্দের সুন্দর চেহারা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সংঘের কঠোর পরিবেশে বাস করার দরুণ আনন্দকে তিনি নিজের মনের কথা কিছুই বলতে পারেননি। একদিন এই ভিক্ষুণী খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায় সংঘেরই অন্য কোনো ভিক্ষু বা ভিক্ষুণীকে দিয়ে তিনি আনন্দকে খবর পাঠান যে, আনন্দ যেন তাকে দেখতে আসে। পরের দিন সকালে ভিক্ষা করতে বের হবার আগে দয়ালু আনন্দ অসুস্থ ভিক্ষুণীকে তার ঘরে দেখতে গিয়ে দেখেন যে, ভিক্ষুণী খুব পরিপাটি হয়ে সেজেছে। আনন্দের দিকে সে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল।

আনন্দ সাথে সাথে গোটা বিষয়টি বুঝে নিয়ে ভিক্ষুণীকে বলল, ‘বোন, তোমার শরীরকে অপবিত্র করার জন্য মনে কখনো কোনো বাজে চিন্তার ঠাঁর দিও না।’

তরুণী ভিক্ষুণী বলল, ‘আমি বুঝি। কিন্তু আপনার কথা না ভেবে আমি পারি না।’

‘এভাবে ভাবতে নেই বোন! মানুষ কাপড়, খাবার এবং আশ্রয়ের জন্য কাজ করে। মনে মন্দ চিন্তার ঠাঁই না দিয়ে সত্যের সন্ধান করো।‘

ভিক্ষুণী তার ভুল বুঝতে পারল।

যা হোক, বুদ্ধ যখন দেখলেন তরুণ ও সুদর্শন আনন্দকে মেয়েরা মাঝে মাঝেই বিরক্ত করছে, তখন বুদ্ধ আনন্দকেই তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী করে নিতে চাইলেন। যাতে কেউই আর তাঁকে বিরক্ত করতে না পারে। বুদ্ধের অন্য শিষ্য যেমন মোগাল্লান এবং সারিপুত্রও বুঝলেন যে, বুদ্ধের ইচ্ছা আনন্দকেই সার্বক্ষণিক সহচর করার। তাঁরা তাঁকে বললেন, ‘আনন্দ, তুমি বয়সে তরুণ, শারীরিকভাবে সক্ষম, বুদ্ধিমান এবং শাস্ত। আমরা চাই তুমি বুদ্ধের সার্বক্ষণিক সহচর হতে রাজি হও!’ শুরুতে রাজি না হলেও পরে অবশ্য আনন্দ নিম্নোক্ত শর্তগুলোর বদলে বুদ্ধের সার্বক্ষণিক সহচর হতে রাজি হলেন :

১.  বুদ্ধকে ভক্তদের দেওয়া কাপড়, নতুন বা পুরনো, তিনি পরবেন না।
২. ভক্তরা যখন বুদ্ধকে দানসামগ্রী গ্রহণের জন্য ডাকবেন, আনন্দ সাথে যাবেন না।
৩. বুদ্ধের সাক্ষাতের সময় ব্যতীত তিনি সাক্ষাতে যাবেন না।

মোগাল্লান এবং সারিপুত্ত বুদ্ধের কাছে আনন্দের এই তিনটি শর্তের কথা বললে বুদ্ধ খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘আনন্দ সত্যিকারের চরিত্রবান। বুদ্ধের সার্বক্ষণিক সহচর হলে ঈর্ষাকাতর সতীর্থরা কী বলতে পারে সেটা ভেবে সে ঠিকই আগেই শর্ত বাতলে দিয়েছে।‘

আনন্দের ভাই দেবদত্ত এবং বুদ্ধকে হত্যা প্রচেষ্টা

আনন্দ নিজে খুব ভালো হলেও আনন্দের বড় ভাই দেবদত্ত ছিলেন একেবাইে ভিন্ন প্রকৃতির। দেবদত্ত এবং বুদ্ধের বয়স ছিল পাশাপাশি। শৈশবেই বুদ্ধ ও দেবদত্তের ভেতরে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। যেমন, কিশোর বয়সে দেবদত্ত একবার একটি উড়ন্ত রাজহাঁসকে তীর ছুড়ে আহত করেন। আহত হাঁসটি আর্তনাদ করতে করতে মাটিতে পড়লে বুদ্ধ আহত হাঁসটিকে সেবা-শুশ্রুষা করে সুস্থ করে তোলেন। এই সময় দেবদত্ত তার হাঁসকে খুঁজতে দিয়ে দেখে হাঁসটিকে সিদ্ধার্থ যত্ন করছে।

দেবদত্ত, সিদ্ধর্থর কাকাতো ভাই, একটি সাদা হাঁসকে তীর ছুঁড়ে আহত করেছে। বুদ্ধ হাঁসটিকে সুস্থ করার পর দু’জনার মাঝে তর্ক হয়। পরে রাজপ্রাসাদের অভিভাবকেরা পাখির প্রতি বুদ্ধের দয়া দেখে তাকেই হাঁসটি দিয়ে দেয়।

দেবদত্ত তখন বলল, ‘সিদ্ধার্থ! তুমি কেন এই হাঁসটি ধরলে? এই হাঁসটি তো আমার। আমি একে তীর বিদ্ধ করে হত্যা করেছি। হাঁসটিকে আমার কাছে দিয়ে দাও। আমি এর মালিক।‘

দেবদত্তের নিষ্ঠুরতা দেখে সিদ্ধার্থ খুব কষ্ট পেলেন

কিশোর সিদ্ধার্থ পাল্টা উত্তর দিল, ‘দেবদত্ত, প্রাণীকে হত্যা বা আহত করা খুব সহজ। তাকে বাঁচানো বা প্রাণ দান করাই কঠিন কাজ। তুমি তীর ছুড়ে একে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলে। আর আমি আহত হাঁসটিকে সেবা করে সুস্থ করে তুলেছি। একে আমি আবার নীল আকাশে মুক্ত করে দেবো।’

দেবদত্ত বলল, ‘না- আমি এই হাঁসটিকে ছেড়ে দিতে পার না। এর মালিক আমি।’

সিদ্ধার্থ বলল, ‘দেবদত্ত! আমি নাকি বড় হলে দেশের রাজা হব। আমি তোমাকে আমার সিংহাসন ছেড়ে দেবো। বিনিময়ে তুমি শুধু আমাকে এই হাঁসটিকে ছেড়ে দিতে দাও!’

ভাবা যায়, রাজ সিংহাসনের চেয়েও একটি হাঁসের জীবনের দাম সিদ্ধার্থের কাছে বেশি ছিল! বড় হয়ে এই দেবদত্ত সিদ্ধার্থ বা গৌতম বুদ্ধের অনেক ক্ষতি এমনকি তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলারও চেষ্টা করেন। এমনকি দেবদত্ত বুদ্ধকে একাধিকবার তাঁর জীবদ্দশায় হেয় প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিলেন। যেমন একবার, প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, দেবদত্ত বুদ্ধকে নিজের পদাধিকার থেকে সরে দাঁড়িয়ে তাকে (দেবদত্তকে) সংঘ চালানোর দায়িত্ব দিতে বলেন। কিন্তু বুদ্ধ দেবদত্তকে এই দায়িত্ব না দেওয়ায় তাঁর শিক্ষককে তিনবার হত্যার চেষ্টা করেন।

হাঁসটিকে সেবা করে সুস্থ করার পর সিদ্ধার্থর কাছ থেকে শিকারী দেবদত্ত হাঁসটি ফেরত চাইছে

প্রথমবারের চেষ্টায় দেবদত্ত একদল তীরন্দাজ ভাড়া করে এনে বুদ্ধকে তীরবিদ্ধ করার চেষ্টা করেন। দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় দেবদত্ত বুদ্ধের গায়ে পাহাড়ের উপর থেকে একটি পাথর গড়িয়ে হত্যা প্রচেষ্টা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এই পাথরটি বুদ্ধের গায়ে না লেগে অন্য একটি পাথরের গায়ে লাগে এবং বুদ্ধের পায়ের পাতায় শুধু কিছুটা আঘাত লাগে। আনন্দ তখন বুদ্ধের পাশেই ছিলেন। আনন্দ পাহাড়ের উপর তাকিয়ে দেবদত্তের পালিয়ে যেতে থাকা শরীরটা দেখতে পান। ভাইয়ের অপকর্মে লজ্জিত আনন্দ বুদ্ধকে বলেন, ‘দেখছেন প্রভু? আমার ভাইয়ের কান্ড দেখেন!’

উত্তরে বুদ্ধ বললেন, ‘আমি ঠিক আছি আনন্দ। কিন্তু তুমি ঠিক আছ তো? একজন ভিক্ষু বা সৈন্যকে কখনো এত বিচলিত হতে নেই।‘ আনন্দ এ কথায় লজ্জা পেলেন। তৃতীয় প্রচেষ্টায় দেবদত্ত একটি হাতিকে মদ খাইয়ে মাতল করেন এবং বুদ্ধের উপর ছেড়ে দেন। কিন্তু এতেও কিছু হয়নি।

বুদ্ধকে হত্যা করার বেশ কিছু প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে দেবদত্ত সংঘের ভেতরে কিছু বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করেন। বিশেষত নীতির ব্যাপারে অত্যাধিক কড়াকড়ি চাপানোর চেষ্টা করেন তিনি। এই লড়াইয়েও বুদ্ধ জয়ী হলে দেবদত্ত সংঘের ভেতর থেকে কিছু ভিক্ষুকে নিজের দলে ভিড়ানোর চেষ্টা করেন। কিছু ভিক্ষু শুরুতে দেবদত্তের দলে ভিড়লেও সারিপুত্ত এবং মৌদগল্যন্যরা বুদ্ধের প্রবর্তিত ‘ধম্ম’কে এত নিখুঁতভাবে প্রচার ও অনুশীলন করেন যে, বুদ্ধ ও তাঁর অনুসারীরাই জিতে যান।

পরবর্তী সময়ে দেবদত্ত তাঁর কৃত কর্মের উপযুক্ত শাস্তি পান ও করুণ মৃত্যুবরণ করেন।

Comments

comments

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী

জন্ম: ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে সম্মানসহ ¯œাতকোত্তর। কাজ করেছেন ও করছেন একাধিক সংবাদপত্র, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায়। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০ (প্রবন্ধ-গবেষণা-গল্প-কবিতা-অনুবাদ সহ)। পুরষ্কার সংখ্যা: ৩। email : audity.falguni@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি