সাম্প্রতিক

সুন্দরীবনের চাঁদ । মৃন্ময় চক্রবর্তী

একদিন মাতাল সুন্দরবনে

একদিন সুন্দরবনে, মেটেরঙা চাষীদের গ্রামে
গরিব দাওয়ায় বসে
আলুর ডাল মেখে খেয়েছি লাল লাল অমৃত চালের মোটা ভাত
তারপর সূর্য অস্তে গেছে।
সন্ধ্যার উঠোনে নেমে অবাক হয়েছি দেখে
মাথার উপর এ-কী আকাশ,না জুঁইফুল ঝোপ?
পাশে পড়ে আছে শূন্য ধানের গোলা,
ভরাট আকাশের নীচে, শোষণের ক্ষতচিহ্ন হয়ে।

নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে অহল্যার ছেলেরা জেগেছে সেদিনে,
আবার তেভাগা মাতাল। আকাশও কি তাই মাতাল হয়েছে?
উড়িয়ে নিয়ে গেছে আমাদের গ্রাম থেকে গ্রামে রাতের গেরিলা হাওয়া।
যেতে যেতে দেখেছি রায়মঙ্গলের জলে ডিঙি বাইছে চাঁদ,
আর তার বিভা মেখে সারা গায়ে খেলা করছে পারশে মাছেরা,
এঁটেল কাদার চরে জরি বসিয়ে রেখেছে হাজার নক্ষত্র এসে।

প্রচন্ড মাঘের শীতে খড়ে ঢাকা ছাগলের ঘরে
সংগোপনে শুয়ে থেকে শুনেছি কৃষকযুদ্ধের গল্প,
ভূমিহীন কৃষকের গান!
সব কি তেমনই আছে, যুদ্ধ কবে শেষ হবে?
বাঘের থাবা খুলে কুমিরের চোয়াল উপড়ে
তারা কি হেঁটে গেছে রণপায়ে!
স্বপ্নগুলো ভাসতে ভাসতে
রায়মঙ্গল, ঠাকুরান, শপ্তমুখী পেরিয়ে চলে গেছে দূর দূর নুন দরিয়ায়,
সাগর পেরিয়ে যেতে পেরেছে কি তারা?

তেভাগার শেষ সেনানী

এই পথে একদিন নীলাচলে পাড়ি দিয়েছিলেন চৈতন্য
আরো কতশত বছর আগে বিদ্রোহী কপিল
এই ব্যাঘ্রতটীবনে দর্শনের মুক্তির সন্ধানে এসেছিলেন,
সগরপুত্র ভগীরথ কেটে এনেছিলেন গঙ্গা,
সেসব অতীত এখন।
গঙ্গা হারিয়ে ফেলেছে পথ।
মাঠ ও জাঙ্গালের নিচে সভ্যতার প্রাচীন কঙ্কাল
পরিচয় খুইয়ে স্থির হয়ে আছে।
তটরেখাজুড়ে উত্তাল সমুদ্র কী আশ্চর্যভাবেই না
মৌন স্থবির।

এখানে একদিন কাকদ্বীপে ডাঁশের জ্বালায়
অস্থির কৃষকেরা মশাল হাতে নেমে এসেছিল মাঠে।
সেও তো অনেকদিন হল।
চন্দনপিঁড়ি নদীর নীলাভ সবুজ জলে
সবকিছু ধুয়ে মুছে সাগরে মিলিয়ে গেছে।
তবু কি পড়ে আছে কিছু, দু’এক টুকরো
প্রাণবন্ত সময়ের পাতা?
ওইতো উড়ছে জেলেনৌকার মাস্তুলে মাস্তুলে স্পষ্ট ইতিহাস!

এখানে লয়ালগঞ্জে তেভাগার শেষ সেনানীকে
ছুঁয়েছি আমি জীবন্ত ফসিলের মত।
যখনই ছুঁয়েছি, মুহুর্তেই হারানো সময়
দপ করে জ্বলে উঠে তার দুচোখ বেয়ে
গড়িয়ে পড়েছে আমারই অঞ্জলিপুটে।

বয়স ছুঁয়েছে নব্বুই। শালপ্রাংশু ভীম ঘোড়ুই
সময়কে শরীরে ধারণ করে শুয়ে রয়েছেন
অপর্যাপ্ত খাটের দীনতম শয্যায়।
এক আশ্চর্য বিকেলের আলোয়
তাঁর কথা শুনতে শুনতে যেন দেখলাম—
যাবজ্জীবন দন্ড পেরিয়ে এইমাত্র
দীর্ঘদেহী তরুণ কৃষক যাত্রা করেছেন
তাঁর ভিটের সন্ধানে।
তাঁর সমস্ত পথ জুড়ে বনলতাগুল্ম, কাঁটাঝোপ
ভাঁটের অস্থির জঙ্গল।
তিনি তবু পথ খুঁজে ভিটের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
এক জীর্ণ হাওয়া তাঁকে
জড়িয়ে ধরে হাহাকার করে উঠল।
খসে যাওয়া মাটির দেয়ালের গোটাচার
জরাগ্রস্ত খুঁটির মাথায় বিবর্ণ কয়েকটা তালপাতা
ছাড়া আর কিছু নেই।
যারা বেঁচে ছিল তারা সব মরে হেজে গেছে।
তিনি হাতড়ে হাতড়ে কী যেন খুঁজছেন।
কী খুঁজছেন, স্বদেশ? স্বজন?
তাঁর স্তব্ধতার চারপাশে তাঁরই অশ্রুবিন্দুগুলো
বেদনার ফুল হয়ে মাথা নাড়ছে।

সূর্যাস্তের বিপুল আভায়
চন্দনপিঁড়ির নীলাভ সবুজ জলের রঙ এখন লাল।
সূর্যোদয়ের পর এভাবেই বারবার
ডুবে যায় আলোকিত যাত্রাপথ,
ইতিহাস বারবার ফিরে ফিরে আসে।

মিঠে খালে লাল শালুকেরা দেখি মুচকি চায়
মাটিকাদা মাখা মগ্ন কিশোর জাল ঝাড়ে
উঠোনে জমাট নতুন ধানেরা কী গান গায়
কুয়াশা সবুজ ওলকপি খেতে মাথা নাড়ে।

কোথায় রয়েছে সেই চাবি

গুড়ের চায়ের ভাপ    ঠোঁটে নিয়ে মৃদু তাপ
            বাতাসির নাতি হেসে বলে :
যাবে একদিন নাকি   দেখবে কেমন থাকি
           সমুদ্র গভীর কালো জলে?
চন্দনপিঁড়ির চরে    ট্রলারের বন্দরে
          জেগে আছে মাস্তুলের সারি
মুহূর্তেই মনে হল    নীল ঢেউ এলোমেলো
          আমিও সমুদ্রে যেতে পারি।
নদীর জলের দাগে   হাজার বছর আগে
           এপথেই চন্দ্রসদাগর
এখনো হাওয়ায় দুলে   প্রাচীন গন্ধ তুলে
          ভেসে যায় চোদ্দমধুকর।
তার বাড়ানো হাত   নিরেট লোহার পাত
         ছুঁয়ে দেখি হাল ধরা মুঠি
তবুও তাদের কাঁধে   মনসার পাতা ফাঁদে
      গেঁথে আছে জোয়ালের খুঁটি!
তার চোখ নিরুপায়   আবার তেভাগা চায়
        সাগর খিলানে তার দাবী
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে  অহল্যা-বাতাসীগ্রামে
       কোথায় রয়েছে সেই চাবি?

হে লখিন্দর

চোরাবালিময় এই আমাদের পথ
কাঁধে স্বপ্নের লাশ ক্রমাগত ভারি
প্রাণহীন নদী, তেষ্টায় সারিসারি
ভেঙে পড়ে আছে কত পথিকের রথ।

মনসার চ্যালা দাঁত নাড়ে, জিভে জ্বর
চারপাশ ঘিরে সশস্ত্র কাপালিক
তবু পায়ে পায়ে আগুনের ভ্রামণিক
কাঁধে মৃত লাশ স্বপ্ন লখিন্দর।

বেঁচে ওঠো তুমি চন্দ্রের সন্তান
জড়ো করে আনো জীবনের ডালপালা
আমাদের যত নিভে যাওয়া অভিমান
দাও দাও বুকে ফের লেলিহান জ্বালা।

কোজাগরী সন্ধ্যায়

আকাশের কপালে কাঁচপোকার মত চাঁদ
নিচে বিলের জল হাসছে আরশির মত।
বাসকের ঝোপ থেকে উইপোকা উড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে!
গরু নিয়ে মাঠ থেকে ফিরছে গেরস্ত…

একটু আগেই গ্রাম পেরিয়ে এসে প্রান্তরের পথ ধরেছি।
গ্রামে মানুষ নেই, ভাঙা ঘর, টালি আর মাটির ভগ্নস্তুপ।
এবছর বন্যায় ডুবেছে সব,
মাঠে ফসলের চিহ্নমাত্র নেই,
লক্ষ্মীর কঙ্কাল দেখেছি এইমাত্র!
তবুও আকাশের ঢঙ
তবুও জোৎস্নার আহ্লাদ
তবুও সন্ধ্যার কপালজুড়ে কাঁচপোকা টিপ,
নিচে বিলের জলের আরশির বেহায়াপনা!

আমি তাকে খুঁজছি

আমি তাকে খুঁজছি…

এইমাত্র শরীরজুড়ে তীব্র ঘামের গন্ধ নিয়ে
যে লোকটা উঠে এলো কাদা পায়ে।
এক্ষুণি একথালা নুনমাখা ভাত না পেলে
যে এই ব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস করে দিতে পারে…
তাকে

তাকে আমি খুঁজছি…

যাকে তাড়া করে ফিরছে একটি শিশুর
করুণ ক্ষুধাতুর চোখ।
আজ সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেও
যে কোনো কাজ জোটাতে পারেনি,
আর নিজের অজান্তেই বুকের তলায়
বিছিয়ে রেখেছে দূরনিয়ন্ত্রক ভূমিমাইন

তাকে আমি খুঁজছি…

আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি এমন কিছু মুখ
যার ভেতরে ঘুমিয়ে আছে একটা দেশ,
প্রকান্ড বিস্ফোরক,
আর কিছু আশ্চর্য কবিতা।

আমি কী বলতে পারি মেয়ে

আমার এ বুকজুড়ে
মেয়েটি কাতরায়!
কামদুনি কাকদ্বীপ
আরো কত নাম
জমা হল,
কী ভীষণ ত্রস্ত নীরবতা,
মৃতের মিছিল হেঁটে যায়।

আকাশে জমাট বাঁধা ক্ষত।
চিৎকার করো তুমি মেয়ে
একাই চিৎকার করো
সূর্যটা হোক অবনত

একবার
ছিন্নফুলের দিকে চেয়ে।
ক্ষমতার মাংসাশী নাক
তোমার ক্রোধের আঁচে
কুঁকড়ে থাকুক,
অন্তত একবার
ভীরু নপুংশক হয়ে যাক!

কাতরাও কাতরাও মেয়ে
একফোঁটা শব্দ নেই
প্রাণবন্ত তোমাদের চেয়ে
দারুণ নির্বাক
এইদেশে !

ধানশালিকের দিন

সন্ধ্যার কপালে
কে দেশলাইকাঠি দিয়ে চন্দন এঁকে দেয়
কার হাত
আমি খুঁজি
অনবরত খুঁজে যাই।
মায়াবী লণ্ঠন হাতে চাঁদ ওঠে বাঁশবনে,
তার পা দেখিনা
অথচ খস খস শব্দ ভেসে আসে।
মগ্নচৈতন্যের আঙুল শিশ দেয়,
তীব্র শিশ
আমি গান শুনতে পাইনা কিছুতেই।

আমাকে দেখাও সেই ব্যথার তরবারি,
উঠোনে পড়ে থাকা নতজানু হাত
যে পথে সূর্য গেছে,
যে পথে লুটোপুটি খায় গেঁড়িশাল ধান,
ধানশালিখের দিন,
আমাকে সেই বন্দনা এনে দাও।

সুন্দরবন

নোনা সাগরের বুকে ভেসে আছে সোঁদরবন
বনবিবি আর দখিনরায়ের রাজ্যপাট
কালিন্দী থেকে রায়মঙ্গলে লাগে কাঁপন
সোনারঙে মোড়া দূরদিগন্ত ধানের মাঠ।

জলে বাস করে কুমিরের সাথে বিবাদ কার
কারা হাত রাখে বাঘের টুঁটিতে, কাদের গ্রাম
গণহুকুমতে সাধ জমে ওঠা আকাঙ্ক্ষার
কারা আঁচ তোলে বুকের হাপরে, চোকায় দাম।

মিঠে খালে লাল শালুকেরা দেখি মুচকি চায়
মাটিকাদা মাখা মগ্ন কিশোর জাল ঝাড়ে
উঠোনে জমাট নতুন ধানেরা কী গান গায়
কুয়াশা সবুজ ওলকপি খেতে মাথা নাড়ে।

দাওয়ার উপর পৌষের রোদ পাতে আঁচল
টক ঢ্যাঁড়শের রক্তরঙিন নড়ছে মুখ
জেলে ডিঙিগুলো ঠেলে দেয় ঢেউ, নদীর জল
চাষীর উঠোনে আপন ফসল পেয়েছে সুখ।

বাঁধে সন্ধ্যায় নৌকার প্রেত জাগলো ফের
তারায় তারায় চন্দন মাখে কাদার চর
গুঁড়ি মেরে চাঁদ উঠে এলে রাত রহস্যের
দ্রুত পায়ে বিল পেরোয় গেরিলা রাতের ঝড়।

এইখানে দেখি পড়ে আছে কাটা সোনার শিষ
কত খুন ঝরে ভেজা এই মাটি স্বয়ম্ভর
খুঁজছে ছেলেরা অহল্যাকেই তো অহর্নিশ
সূর্য উঠবে পাখিরা দিয়েছে ডানায় ভর।

চালচিত্র

সকাল হয়েছে অনেকক্ষণ।
ধূসর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন শীতের গ্রাম
তবু গড়িমসি করছে।
ফণীমনসার ডালে মাকড়সার জাল
কুয়াশায়, রূপোর ছবির মত স্থির।
রাঙচিতা ঝোপের মাথায় একঝাঁক লাল মৌমাছি দুলছে মুকুটের মতো।
বাজবরণের বেড়ায় গা ঘষছে একটা ছাগল।
গ্রামের ভেতর দিয়ে মাঠের ভেতর দিয়ে
বিচিত্র পথে কৃষকেরা চলে যাচ্ছে।
আকাশে কারুকাজ এঁকে উড়ে চলেছে পাখিরা।
নদীর জলে চুমকি বসাচ্ছে রোদ,
নীল ঢেউ এসে ফিরে যাচ্ছে পাড় ছুঁয়ে
ছু কিৎ কিৎ ছলাৎছল
যেন কোনো কিশোরী খেলছে আনমনে।
তালপাতায় ছাওয়া কুঁড়েঘরের সামনে
গোবরজলের ছিটে ছড়াচ্ছে কৃষক রমণী।
কে যেন ছুটছে হনহন, ছেঁড়া চাদর শরীরে পেঁচিয়ে
সকালের বাসটা তার ধরা চাই।
গ্রামে ভাত নেই
অন্নের খোঁজে কলকাতা  যেতে হবে !

Comments

comments

মৃন্ময় চক্রবর্তী

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম — ১৯৭৬, কলকাতার ঢাকুরিয়ায়। কবিতার পাশাপাশি গদ্যে, অনুবাদেও তাঁর বিচরণ। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি ( ২০০৪), এই মৃগয়া এই মানচিত্র ( ২০০৮)। পাঁচালি কাব্য: ভুখা মানুষের পাঁচালি ( ২০০৯)। সম্পাদিত গ্রন্থ পুস্তিকা : রাত্রির কঠোর বৃন্ত থেকে, মানিক শতবর্ষপূর্তি শমীবৃক্ষ, নির্মোহ রবীন্দ্রনাথ ( শমীবৃক্ষ)। সম্পাদিত পত্রিকা: মাটির প্রদীপ। ইমেল : mrinmoyc201@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , , , , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি