সাম্প্রতিক

পাণ্ডুলিপি থেকে । আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ পরমের সাথে কথোপকথন প্রকাশ করেছে বৈভব। মূল্য: ২০০ টাকা। মেলায় ৪২২ নং স্টলে পাওয়া যাবে ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ থেকে।

সমাজকর্মীর সাথে একজন বারবণিতার অন্তরঙ্গ আলাপের পর

পুরুষের শরীরে তবু হৃদয় আছে নাকি?
ভাবে সে। ধরি, তার নাম অনাদৃতা;
বেঢপ ভূঁড়ির নিচে মেলে ধরে দুই ঊরু
শুয়েছিল সে বানিয়া শান্তায়।

মায়া ছিল একদিন
উঠোনের পরে ছিল ক্ষেত থেকে
কেটে আনা সোনালি ধানের বুনো ঘ্র্রাণ;
ছিল বাড়ির দেউরির কোণায়
একটা শিউলি গাছ;
আর সে ছিল
অক্ষিগোলকে নিয়ে কাতর প্রণয়।

তারপর আর কোনো কথা নাই
নাই কোনো দোষারোপ কাউকে দেবার;
তারপর একদিন প্রেম এসে ঠেকেছে
এই বানিয়া শান্তায়।

তবু, মাঘের কুয়াশাঘন রাতে
যখন টিনের চালে টুপটাপ
বাঁশের পাতা থেকে টুপটাপ
ঝরতে থাকে শিশির সারা রাত;
যখন সকলে ঘুমিয়ে যায়
অথবা যখন আর কোনো ঘরে
আর কেউ আর কারো সামনে
খুলে দেয় ব্লাউজের বোতাম;
কিন্তু কাউকে ঘরে নিতে
ইচ্ছে করে না অনাদৃতার
তেমন বুক খালি করা রাতে
দুয়ার খুলে হিমের ঘ্রানের ভেতর
সে পায় সুবাস— প্রেমের;

হিমের ভেতর পুরণো ঘ্রাণে সে পায় টের
একদিন প্রেম ছিল
অক্ষিগোলকে কেউ ধরেছিল তুমুল প্রণয়।

আমাদের হিয়ার ভেতর আমরা যখন গান হয়ে যাই

আমরা খরচ হয়ে যাচ্ছি রোজ;
হিসেবের খাতায় ভাংতি পয়সার মতন
সেই খরচ তুলতে ভুলে যাচ্ছেন গিন্নি মা।

জীবন-জীবন করে আমরা ছুটছি
আর জীবন আমাদের নাম ধরে
ডাকতে-ডাকতে ছুটছে আমাদেরই পিছু।

আমরা একটা সার্কেলে ঘুরছি
এই ঘূর্ণনে কোনো বিরতি-বিন্দু নেই;
দৌড়ের নিয়মে চলতে থাকলে এইখানে
কোনোদিন আমাদের হবে না দেখা।

তবে, কেউ-কেউ দেখা পেয়ে যায়;
তারা নিয়ম ভাঙে
তারা দৌড় থামিয়ে দেয়;
তাদের দেখে লুথা মনে হতে পারে

তাদের দেখে বোকা মনে হতে পারে
তাদের দেখে ঋষি মনে হতে পারে
তাদের দেখে মনে হতে পারে
ফুটো পকেট গলে পরে যাওয়া ভাংতি পয়সা;
কিন্তু তারা জীবনের দেখা পায়
চলতে-চলতে জীবন এসে একদিন
হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাদের বুকের উপর
সেদিন তাদের দেখা হয়ে যায়;
দৌড় থেমে গেলে।

আমিও অপেক্ষায় আছি
একদিন আমাদের দেখা হয়ে যাবে;
জীবন মিলিয়ে দেবে
তোমাকে ও আমাকে ঠিক;
সেদিন ভাদ্র মাসের রোদ্দুরে
ভরদুপুরে ঘামতে-ঘামতে হাসতে-হাসতে
দূর গাঁয়ের মেঠো পথে আমরা
বাশঁঝাড়ের নিচে এসে জিরোবো;
বাঁশপাতার শন শন শব্দে
আমার শরীরে জাগবে শিহরন;
তাই দেখে তুমি বুজবে চোখ,
শুনবে শনশন শব্দের ভেতর
কেমন গান বয়ে যায়।

এমন দিন আমাদের সত্যিই আসবে, জেনো
এমন প্রেমের দিন না এলে
আমরা মরবো না;

পৃথিবীতে কেউ মরে না
প্রেমের দিন না দেখে;
বাস্তবে না হোক,
অন্তত কল্পনায়
বেঢপ দেখতে
ভুঁড়িওয়ালা
কুৎসিৎ যুবকটির ঠোঁটেও
ভালোবেসে চুমু খায় এক পরী;
আর চিরজন্ম দুঃখে থাকা
ডানা খসে যাওয়া পরীটিও
কল্পনায় একদিন
ডানা খুঁজে পেয়ে দেয় উড়াল;
উড়াল রচিত না হলে
মৃত্যুর শর্ত হয় না পূরণ।

তাই, জেনে রেখো, প্রিয়
এই ঘূর্ণন চাকায় আমাদের দেখা হবেই;
সেই আশায় আমি দৌড় থামিয়ে
বসে আছি পথের ধারে;
তুমি এলে আমরা রোদের মধ্যে
ঘামতে-ঘামতে মেঠো পথে হাঁটবো
আর শুনবো বাঁশের পাতার সঙ্গে
পাতার স্পর্শে কেমন হচ্ছে সঙ্গীত;
শুনবো, আমাদের হিয়ার ভেতর
আমরা কেমন গান হয়ে যাচ্ছি।

কলহাস্য বসন্তের দেশ

ফুরিয়ে গিয়েছে প্রেম
ফুরিয়ে গিয়েছে ভূতে পাওয়া দিন;

টেবিলের ‘পরে ক্যান্ডেল একলা জ্বলুক,
দেয়ালের গায়ে পাটে গড়া দুইটা পুতুল
গাঁ গেষাঘেষি করে
থাকুক দিনের পর দিন;
তোমাদের ফুরিয়েছে প্রেম।

ফাল্গুনের রাতে যদি খুব হাওয়া দেয়
খুব যদি ডাকতে থাকে
একরোখা কোকিল
তুমি জানালা বন্ধ করে দিও।

দেয়ালের গায়ে দুইটা পুতুল
হেসে খুব জড়াজড়ি করে থাক;
সিনেমার কাহিনীতে
প্রেম ভেঙে গেলো বলে
তুমি খুব কেঁদো মেয়েটার দু:খে
আর ছেলেটিকে দিও সুখী হবার বর।

এইভাবে, ফিল্মের প্রেমের কথা ভেবে
তুমি পার করো ফাল্গুণের রাত;
হুট করে যেওনা মরে হাতে নিয়ে চিরকুট:

ফুরিয়ে গিয়েছে প্রেম
ফুরিয়ে গিয়েছে ভূতে পাওয়া দিন;
দেওয়ালের গায়ে থাক দুইটা পুতুল
টেবিলের ‘পরে থাক অসুখী ক্যান্ডেল
আমি যাই কলহাস্য বসন্তের দেশে।

পুলক

দ্রাক্ষারস তারা করে পান। নেশাতুর হলে পরে
শরীরের প্রহরীরা হয় শিথিল। এই পথে কলবের
কাছে তারা যায়, বহুদিন বাদে দেখে নিজের মুখ
তাদের পুলক জাগে মনে; তাই দ্রাক্ষারসের কাছে
তারা ফিরে বার বার, দেখতে আপন মুখ।

আমাকে সেধো না দ্রাক্ষারস, দিও না মহুয়ার নেশা
আমি যে মাতাল পরমের ভেতর জানে তা দ্রাক্ষারস
বিভোর এই চিত্তে তাই পুলক আমার কাটে না। 

পরমের সাথে কথোপকথন: সাধু শয়তান

 —সাধু কে?
—যিনি জানেন পৃথিবীতে পাপ-পূণ্য বলে কিছু নেই।

—শয়তান কে?
—যিনি জানেন পৃথিবীতে পাপ-পূণ্য বলে কিছু নেই।

—সাধু ও শয়তানে তবে ফারাক কোথায়?!
—ফারাক কি হয় জানায়? না। তা নয়।
ফারাক রচিত হয় কর্ম-চিন্তায়।

পাপ-পূণ্য নেই জেনেও যিনি ন্যায় মনে চলেন তিনিই সাধু
আর পাপ-পূণ্য নেই জেনে যিনি ক্রুর হেসে
ধুন্দুমার উড়িয়ে চলেন বিজয় কেতন তিনিই শয়তান।

 

 

Comments

comments

আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা

জন্ম ২রা অক্টোবর, ১৯৮৪, কিশোরগঞ্জ। পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেন বিবিসি বাংলা রেডিও-তে। প্রকাশিত কবিতার বই: অন্ধঘড়ি (২০১০,কথা প্রকাশ), হারমোনিকা (২০১৪, সংবেদ), ডাহুক (২০১৫, ভাষা প্রকাশ)।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি