সাম্প্রতিক

নিশি । শেখ লুৎফর

গেরাম ঘুরতে-ঘুরতে বেলা পড়ে যায়। বেসাত মন্দ হয় না। তবু বহরে ফেরার জন্য নিশির তেমন তাগদা

নেই। উলটো তার চোখে ফুটে উঠে এক বন্য আবেগ। আদিম রাত্রির রহস্যে নেচে উঠে জোড়া ভুরুর আয়ত চোখ। এক পাল ছেলেমেয়ে ঘিরে থাকে ঝাঁপির চারপাশ। শেষবেলায় বেসাতের চাইতে

বেহুদা দরদাম পাড়ে পড়–য়া কিশোরিরা। শিবগঞ্জ ঘাটে যেতে কমপক্ষে একঘন্টার পাড়ি। পান-সুপারি আর দুগদা গুটি করে মুখে দেয় নিশি। বাড়ির কর্ত্রী মুন্সিবউ তার মেয়েকে হাঁস-মুরগি ঘরে তোলার তাগদা দেয়। তার কথার তপ্ততা নিশির গতরে ছেঁকা লাগায়। সে পুঁটলি মতো কাপড়ের গোলগাল ভিড়েটা মাথায় রাখে। মুন্সির হাড়গিলা বউটা ফের চিক্কাইর দেয় —

—অ বৈদের বেটী, তুমি কী গো, বেলা যে পড়ি যায় নাওয়ে যাইবা না?’
তার ছোট ননদ মুন্সির বউকে খ্যাপানোর জন্য ত্যারচা আলাপ জুড়ে।
—অ —ভাবী, তোমার ছোট্ট বু—ঝি কইরা রাইখ্যা দেওনা। দ্যাহনা কত্ত সুন্দর মুখ।
মুন্সির বউ পিত্তশুলের কামড়ের মতো চেঁচিয়ে ওঠে —
—মর…মররে ছিনাল।

এসব কথা নিশিকে স্পর্শ করে না। নিজের ভেতর নিজেই যেন ঘুম যায়। মাঝরাতে পাশ ফেরার মতো করে ঝাঁপি মাথায় আগে হাঁটে। সূর্যের মুখ বাঁশবনের পিছনে লুকায়। আশ-পাশের ঝোপঝাড়, পথের পাশের কাঁট মেহেদী, মটকিলা-নিশিন্দা আর দলকলসের পাতার ঝাঁঝালো গন্ধে আনচান করে তার গাও-গতর।

মগজ থেকে বিজাতীয় ভাবনাটা চিনচিন করে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে নিশিকে বেচুইন করে। কোমরের কাছ থেকে আবার উর্ধ্বগামী হয় অন্য রকম একটা ঝাল। কপালে জমে ওঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম, নিশ্বাসে চৈতের চাবুক। মনে-মনে উচ্চারে —

—হায় শিব ঠাকুর আর যে বাঁচিনে।

নিশির সারা গতরে অন্য এক তিয়াসের তুফান। রক্তিম মুখে ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ে বাঁশচেরা শব্দের মতো।

বরুণ তার শিকারের মাছ বিক্রি করে নৌকায় ফিরে শেষ বিকালে। কোষা ডিঙা বড় নৌকার পাশটায় দাবিয়ে চুলায় আগুন ধরায়। মনে মনে প্রত্যাগত নিশির ক্লান্ত মুখ তার দিলে ফুটে, খাঁ খাঁ করে ওঠে তার পরানের পর্দা। মা কালীকে দীর্ঘশ্বাসে শোনায় —

—মা শ্যামা; নিশিরে তুমি চন্ডালের হাত থন সামাল দিয়ো।

নিশি পুচ করে পানের পিক ফেলে। হাঁটার গতি একটুও বাড়ায় না। অথচ শিবগঞ্জ ঘাট মেলা দূরার পথ। কালো চকচকে পেটানো শরীরের ছোট-খাটো বরুনকে তার খুব ভালোলাগে। ভালোবাসায় নিজেদের কোন গলতি নেই। দুইজনের তড়তড়ে দুধভাত সংসার।

তবু গলত দেখা দেয়। সেটা তার জ্ঞান গম্যি কচলে দেয়, খোয়াবের ধবল সলতেটা সড় সড় করে পুড়ে ছাই হয়, পাপ পুণ্যির হিসাব-কিতাব তলিয়ে দেয়, বিবেকের সকল খিড়কি-কপাট বন্ধ করে রাখে। মাঝ রাতে নিশি দারু-খাওয়া মাতালের মতো নিদ্রিত বরুণের বুক থেকে উঠে এসে নৌকার গলুইয়ে বসে, নদীর দূর বাঁকে তাকিয়ে থাকে। অসম্ভব ঔজ্জ্বল্য ও গভীর রহস্য নিয়ে থরথর পূর্ণিমা রাত। নক্ষত্রবিস্তৃত আকাশ আর নদীবুক যেন জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে, পরস্পর লীন হয়ে গেছে এক অলৌকিক প্রেমের আলো-ছায়ায়। এই অভঙ্গুর দূরধিগম্য দৃশ্যে নিশির বুকটা জ্বলে উঠে, শরীর পুড়ে খাক হয়। সেইসব দিনগুলোতে বরুণের আদর-সোহাগ সহ্যের তল্লাটে থাকে না। রাত্রির ঘুম উধাও। বার বার ইচ্ছে করে নদীর বুকে ঝাঁপ দিতে। আর তখনি সে যেন শোনে, স্পষ্ট শোনে ঐ দূর ত্রিমুহনী থেকে ভেসে আসা একটা ক্ষীণ শিৎকার। শিৎকার আর রোদন। কার যেন এক আজব-অসহ্য তৃপ্তির রোদন। নিশির ইচ্ছে করে নিজের বুকে নিজেই ছুরি মারে। ঐ ত্রিমোহনীতে ছুটে গিয়ে ঝাঁপ দেয়।

নিশির প্রতি বরুণের বিশ্বাস শান্ত শীতলক্ষ্যা। তবু সে বিশ্বাসে মাঝে-মধ্যে ঢেলা মারে ঠোঁটকাটা পড়শিরা। সামান্য আলোড়িত হয়ে স্থিতু হয় ডাবের সোহাগি জল। বরুণ জানে,‘ ব্যাবাকতে চশমখোর হারামজাদা।’ তার সুখ ছ্যাদাবেদা বজ্জাতগ সইবে ক্যান? যুক্তি প্রমাণে বরুণ কোনো দিন শতভাগ হিসাব মিলাতে পারেনি। গেরাম থন হঠাৎ করে নিশির হাওয়া হয়ে যাওয়ার কথাটা বরুণের কাছে খ্যাপশা পেরতের পেতরামি ছাড়া কিচ্ছু না। কারণ বরুন মনে করে মানুষ কোন ছার, নিশির মোহিনী আঁঙ্খিবাণে শিবঠাকুর তক নিশ্চয়ই বিদ্ধ হবে।

একটা বিশেষ শব্দে নিশি ফিরে আসে মামুদপুরের মাটির সড়কে। পাতিলের পাছার মতো ঘন অন্ধকার চার পাশে হাঁটু গেরে বসতে শুরু করেছে। নিশি থত্থর বুকে সন্ধান করে আওয়াজের সাকিন। পথের বাম পাশটায়, সরকারি পাঠশালার চাতালে চাইতেই তার মুখটা হাস্যময়তা পায়। আট-দশজন মিলে এক ঝাঁক তরুণ। তাকে দেখে গোলশা মাছের দলটা মোঁচ পাকাচ্ছে। একজন দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটা ইশারা দেয়। বরুণের কোঁচে গজার গাঁথার নিপুন কায়দায় নিশি বিদ্ধ হয়।

তিরতির করে একটা উষ্ণ পারদ পা থেকে বুকে এসে ছড়িয়ে পড়ে। চোখে ভাসে ত্রিমোহনীর থরথর পূর্ণিমা রাত। সে একবার চোরা চোখে দেখে নেয় চারপাশটা এবং সেই সাথে ভেবে লয় খরা ও সামর্থের কথা। এরা কি চাইবে, বলবে তার মুখস্ত।

বরুণের চোখে মহাবিস্ময় আর সন্দেহের আগুন লকলক করছে দেখে নিশি ফের হাসে। একটু স্পষ্ট আর অধিক তীক্ষ্ন হাসির মাঝেই সে আবার বলতে শুরু করে —

এমনি এক গোপন সানঝায় আর আশ্চর্য  কান্তিমান এক তরুণের বিণীত প্রার্থনায় আর কিঞ্চিৎ নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে প্রথম আবিষ্কার করেছিল শান্তির এই গোপন সাকিন।

নিশির চোখে একঝলক খেলে যায় সেই তরুণের পৌরষ্য-দীপ্ত মুখ আর সেই সাথে বরুণের প্রেমময় লৌহপেটা পেশি। তিলেকর জন্য তার নিজের প্রতি ঘেন্না জাগে। নিজেকে বেশ্যা বলে গাল দিতে সাধ হয়।

কলজে-ফাটা তিয়াস আগলে রেখে নিশি সাড়া দেয় নিমন্ত্রণে। নেড়িকুত্তির মতো ইতিউতি খেয়াল করে যুব সংঘের নিরালায় চলে আসে। ঝাঁপিটা নামিয়ে আঁচলে মুখ মুছে মনকে বোঝায়; এইবার সেবা লও তরতাজা বুইনপুতগ।

নিশি সন্ধ্যাটা কাটায় তালা দেওয়া মাটির ঘরের বেঞ্চিতে বসে। বাঁশঝাড় বেষ্টিত ছোট্ট এ যুবসংঘের ভৌতিক অন্ধকার আর চারপাশের বিকট নির্জনতা তাকে খুব সামন্যই ভাবায়। আকন্ঠ তিয়াস নিয়ে সে সময় গুজরান করে। সারা গতর ভিজে গেছে ঘামে, আগত সুখ আর তুফানের মতো সুখের দাপাদাপি মাপজোখ করে। বারবার ওদের সংখ্যাটা কাঁকড়া হয়ে হেঁটে যায় দিলের কিনারা ধরে। পাঁচ-ছয়জন তক খেলেছে; কিন্তুক এবারের দলটা যে মামুলি নয়। তবু সে জালে পড়লো, সুখের এ নেমনতন্ন কোন মতিতে পায়ে ঠেলে নিশি!

ফিসফিস শব্দ আর তালার টুংটাং তাকে সতেজ করে। গাঁও-ফেরতা বেসাতের ঝাঁপিটা ঘরের এক কোনায়। ঘরের এক পাশে একটা টেবিল, কয়টা বই লয়ে কাঠের একটা আলমিরা এবং পাঁচটা চেয়ার। খেজুর পাতার একটা মাদুর এক কোনায় মোড়ানো। নিশি কল্পচোখে দেখে নেয় তার আসন্ন ভোগ শয্যা।

হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে জনাদশ এবং খট করে দরজায় খিল পড়ে। একজন ফস করে দেয়াশলাই ঠোকে। একটা কুপি বাতি জ্বলে ওঠে। বাতির লম্বা-লালচে শিষটা দপদপ আত্মচিৎকারে যেন নিশিকে নিষেধ করে। সে ভীতা হরিণীর মতো চোখ বুলায় আগত যুবাজনে। ব্যাবাকতের গতরে দাঙ্গায় যাবার চিলবিল। মনে মনে ডর খায়। জপ করে শিব ঠাকুরের নাম। ভয় তাড়াবার জন্য শিড়দাড়া মটকায় হাড্ডি চিবানোর অশ্লীলতায়। সুগঠিত পেলব পেশীর নিচে মুহূর্তে মটমট করে তার গতরের অস্থিসন্ধিগুলো কামনায় খেঁকিয়ে ওঠে।

একজন কাছে এসে থুতনিতে হাত দেয়। সন্মুখে নামায় একটা কাগজের ঠোঙা। কানে কানে বলে, খেয়ে নেও গুড়-মুড়ি। একজন জগ থেকে পানি ঢালে মাটির টোপায়। একজন বিড়িতে দম দিয়ে খক খক কাশে। অন্য একজন ওর মুখ চেপে ধরে গাল দেয় —

—হালারপুত গাঞ্জাখোর, তরে লইয়া চুরিতেও সুখ নাই।

একজন কাঁপা হাতে খেঁজুরের পাটি ফেলে ঘরের মধ্যিখানে। পাঁচটা চেয়ার ভরে গেছে, অন্যরা মাটিতে পা ঠেকিয়ে বসে বসে চোখে গিলছে নিশিকে। একজনের উচ্ছাস তার কানে লাগে —

—এই জিনিস পাইলে কৈ!

নিশি তেতোমুখে দু-এক মুঠি মুড়ি পিষে। গকগক করে এক টোপা জল খায়। মনে মনে হিসাব করে, এই নিয়ে পাঁচবার। এবারই শেষ বলে অন্যবারের মতো ফের মা কালীর কসম করে। আরেকবার ঠাকুরের কাছে প্রণতি মাগে যেন সে সুস্থতায় ফিরতে পারে। সত্যিই কি এবার নিশি রক্ষা পাবে পরানে?

নিশি উঠে দাঁড়ায়। একটা ছেঁড়া-কাটা গুমোট নিশ্বাস পড়ে। ধীরে ধীরে খেঁজুরপাটিতে যায়। স্পষ্ট আকুতি জানায় —

—জনা করি একবার, ও ভাই তার বেশি অইলে মরি যামু।

বরুণের কাজলা মুখটা একবার দোল খায় পরানের ঝাঁপিতে। অদৃশ্য একটা গলা তার কানের কাছে এসে ‘কুত্তি কুত্তি’ বলে বিদ্রুপ করে ।

ভোরতক বরুণ নাওয়ের গলুইয়ে বসে কাটায়। পুরু কালি পশর দেবার সাথে সাথেই কোষা ডিঙায় চড়ে একবার দেখে যায় ঘাট পাড়। বহরে ফিরে গিয়ে সবার নায়ের গলুই ধরে জানান দেয় —

—নিশি ফিরে আইছে না।

ক্ষণ কতক পরেই বহরের সবাইকে দেখা যায় চিন্তিত মুখে বসে আছে ঘাটের উঁচু ঢিবিতে। কালু ঠাকুর তার পাকা বাবড়িতে হাত বুলিয়ে সিদ্ধান্ত টানে —

—সবাই চারদিকি খুঁজতি থাক। আশপাশ এবং পরে গেরামের দিকি। সাবধান সইত্য কথা কইছ না।

সূর্য যখন তার লালটে মুখ পুব গাঁয়ের বাঁশ বনে রেখেছে তখনই নিদু চিক্কাইর দেয়। নদীপাড়ের সামান্য দূরে বেত ছোপার পাশটায় নিশি পরে আছে। সবাই দেখলো বেঘোর নিশির শাড়িটা তার পাশেই পোঁটলার মতো দলাপাকানো। ব্লাউজের বোতামগুলো খোলা। চাপচাপ রক্তে সায়াটা ভেজা। বেঘোরে বকছে নিশি।

সবার পরে আসে বরুণ। একটু থমকে দাঁড়ায়, কালো কালো রাগী চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। তার পর দুই হাতেভির ঠেলে ছুটে যায় নিশির শিথানে। নিশির মাথায় হাত রাখে। সবার মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে খোলা ব্লাউজের বোতাম টানে। গামছায় উদাম বুক, উদর ঢেকে দেয়। টেনে নেয় অসার দুই হাত। বালকের উচ্ছাসে চিক্কাইর দেয় —

—তর কি অইছেরে নিশি? কেডা তুরে এমুত করছে? ক, একবার নামডা ক, আমি এই চান্দের তলে তারে আস্তা রাঁহুম না।

ত্রিমোহোনীর অলৌকিক রহস্য নিশির চোখ থেকে অনেক আগেই মুছে গেছে। শরীরে ফিরে এসেছে সহজ জীবনের কাম্য বোধ। সে হাত তুলে বরুণের কোঁকড়া চুল টানে। পরিচিত হাসি ফোটে তার কমলার কোয়া ঠোঁটে। সে আস্তে আস্তে বরুণের কানে বলে —

—কিচ্ছু না আমি ভালা অইয়া যামু । আমারে নায়ে লইয়া যাও।

বরুণের চোখে মহাবিস্ময় আর সন্দেহের আগুন লকলক করছে দেখে নিশি ফের হাসে। একটু স্পষ্ট আর অধিক তীক্ষ্ন হাসির মাঝেই সে আবার বলতে শুরু করে —

—পাগলা জোয়ারের টানে মাঝে-মৈদ্যে ভুল ঘাটে চলি যাইত, হেল্লিগ্যা খ্যাপ্শা ভূত-পেরতে বেহুদা দাবরায়।

Comments

comments

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা। বিজ্ঞাণ বিভাগ, আল জান্নাত এডুকেশন এনষ্টিটিউট, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ । প্রকাশিত বই : গল্প— উল্টারথে [ঐতিহ্য, ২০০৮] ভাতবউ [ঐতিহ্য, ২০১৩] উপন্যাস— আত্মজীবনের দিবারাত্রি [ঐতিহ্য, ২০১০] কিশোর উপন্যাস— সুতিয়া নদীর বাঁকে [রূপসি বাংলা, ২০১৪] ই-মেইল : sheikh.lutfor32@gmail.com ০১৬৮১ ০২২৪৫২

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি