সাম্প্রতিক

সুপ্রাচীন । অর্ক চট্টোপাধ্যায়

শীতের সন্ধ্যায় আধোচেনা পথে হাঁটতে হাঁটতে লোকটার যখন মনে হল, কেউ পিছু নিয়েছে, দিগন্তরেখা বরাবর ধীরে ধীরে দৃশ্যপটের বাইরে ডুবে যেতে থাকা একেকটা আলোর প্রেত কানের কাছে এসে বলে গেলঃ “অনেক দিন পর আবার ঐ সন্ধ্যারেখা। আলোর নীচে ডুবে যাচ্ছে সুপ্রাচীন মাতৃমুখ।” লোকটা পেছনে তাকিয়ে দেখলো, শুকনো কয়েকটা পাতা ঝরা সময়ের মতো আলতো আলগা পথে ওর পিছু নিয়ে হাওয়ার আবর্তের সন্ধান দিচ্ছে। সান্ধ্যকালীন এই অরণ্য ওকে দূরবর্তী হতে বলছে। দূরবর্তীতা অনুশীলনস্বাপেক্ষ। লোকটা অনুশীলন করছে। পাতাগুলো জাবর কেটে চলেছে। আবছায়া পথে পত্রমর্মরের লঘু পদধ্বনি লোকটাকে মিলিয়ে যেতে সাহায্য করবে বলে দেখা দিয়েছিল। হ্যাঁ, লোকটা মিলিয়ে যাচ্ছিলো। আলোর প্রেতের মতো সন্ধ্যারেখার প্রান্তে মিলিয়ে যাচ্ছিলো।

মিলিয়ে দেওয়া আর মিলিয়ে যাওয়া। একটা অঙ্ক, অন্যটা অন্তর্ধান। লোকটা অঙ্ক মেলাতে পারছিল না, তাই অন্তর্হিত হতে চাইছিলো। লোকটার মনে ভাসছিল অন্য ভাষার বাক্য:

বড় বড় গাছের ফাঁপা কান্ড ভেঁপুর মতো বাজাচ্ছে। এদেশের বাতাস ওদের চেনে। তাই ভেঁপুর মধ্যে দিয়ে ইচ্ছে মতো বয়ে যায়। তৈরি করে নানা রকম মন্দ্রস্বর। প্রাচীন ভূপৃষ্ঠ থেকে উঠে আসে। উথলে ওঠে, তারপর মুহূর্তে ধোঁয়া হয়ে আকাশে চলে যায়। এই উপজাতির কেউ মারা গেলে গাছের কাণ্ডের ভেতর ওরা ছাইভস্ম ভরে রাখে, কখনো কখনো। আলো দেয় ভস্মকে। তারপর অন্ধকার। ভস্মের আলো অন্ধকার রয়ে যায় মৃত্যুর পর। তারপর কি একদিন ঐ ফাঁপা ভেঁপু দিয়েই মৃত্যুসঙ্গীত পরিবেশন করে ওরা?

“I don’t come to me.”

“I don’t come to me.”

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভিবাসনের জন্য অপেক্ষমান মানুষের সারি। তার মধ্যে একটি কৃষ্ণাঙ্গ বাচ্চা, কেঁদেই চলেছে। বাবা-মা অদূরে কিন্তু তার কান্না শুনেও শুনছে না। বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে বারবার একটাই বাক্য বলে চলেছে: “I don’t come to me.” “I don’t come to me.” লোকজন কি শুনছে তার কান্না? শুনছে তার পুনরাবৃত্ত বাক্য? তারা কি লক্ষ করছে বাক্যের সর্বনাম? আমি তখন লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি, ছেলেটা কি স্রেফ তুমির জায়গায় আমি বলছে? নাকি অন্যকিছু। লোকটা তখন আমায় দেখছে, ঠিক যেমন আমি বাচ্চাটাকে দেখে চলেছি। লোকটা আমার চিন্তাপাঠ করে ভাবছে, মানুষ আর তার ব্যাখ্যাপ্রবণতার কথা। ভাবছে, ব্যাখ্যার উর্দ্ধে স্থাপিত ঐ জাদুবাক্যের গভীরতার কথা।

লোকটা কে? আমিই বা কে? লোকটাই কি আমি? আমিই কি লোকটা? জেরাল্ড মারনেনের দেশে জেরাল্ড মারনেনের কথা মনে পড়ছে। উনি তো লিখেইছেন, প্রথম পুরুষে লেখা উপন্যাসেও মন দিয়ে খুঁজলে একটা দুটো উত্তম পুরুষ সর্বনাম বেরিয়ে পড়বে। সর্বনামে কি বা আসে যায়?’ লোকটা ভাবছিলো মিলিয়ে যাওয়া আলোয় মিলিয়ে যাওয়ার কথা। যে ধরণের আলো অনিল করনজাইয়ের ছবিতে দেখা যায়। ভোর আর সন্ধ্যা যেখানে একাকার, আগমনী আর বিদায়ীর সমাপতনে। সেই আলো কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে, “আলোর নীচে ডুবে যাচ্ছে সুপ্রাচীন মাতৃমুখ।” অন্য কান উত্তর দেয়: “I don’t come to me.” দু’ভাষার দুই বাক্য দু’কানের মধ্যিখানে দুই চোখের ব্যবধানে ভুরু দুটি যেখানে পরস্পরকে ছুঁয়েও ছোঁয়নি, ঠিক সেইখানে ধাক্কা খায়:

আলোর নীচে
I don’t
ডুবে যাচ্ছে
come
সুপ্রাচীন মাতৃমুখ
to me

দূরে শোনা যায় এদেশের আদিবাসীদের সান্ধ্যসঙ্গীত। বড় বড় গাছের ফাঁপা কান্ড ভেঁপুর মতো বাজাচ্ছে। এদেশের বাতাস ওদের চেনে। তাই ভেঁপুর মধ্যে দিয়ে ইচ্ছে মতো বয়ে যায়। তৈরি করে নানা রকম মন্দ্রস্বর। প্রাচীন ভূপৃষ্ঠ থেকে উঠে আসে। উথলে ওঠে, তারপর মুহূর্তে ধোঁয়া হয়ে আকাশে চলে যায়। এই উপজাতির কেউ মারা গেলে গাছের কাণ্ডের ভেতর ওরা ছাইভস্ম ভরে রাখে, কখনো কখনো। আলো দেয় ভস্মকে। তারপর অন্ধকার। ভস্মের আলো অন্ধকার রয়ে যায় মৃত্যুর পর। তারপর কি একদিন ঐ ফাঁপা ভেঁপু দিয়েই মৃত্যুসঙ্গীত পরিবেশন করে ওরা?

লোকটা আমায় দেখছি। আমি দেখছে লোকটাকে। সর্বনামে কি বা এসে যায়?  লোকটা নেই। আমি নেই। হাওয়ার ব্যাকরণে পত্রমর্মর কবিতাবাক্য হয়ে যায়: 

মগের ডালে আপনি ওঠা বক, 
অন্ধকারে আড়ষ্ট দূরবীন।। 
ডাকলে পরে গল্প বলার ছক, 
থলের মধ্যে আহত ডাকনাম।। 
হাওয়ার খামে ভরে দেওয়া দিন, 
ছোটবেলার আতপগন্ধী ভাম।।

Comments

comments

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

জন্মঃ ২৫ নভেম্বর, ১৯৮৫। পেশাগতভাবে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, আই আই টি, গান্ধীনগর। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থঃ পিং পং গন্ধ (২০০৯) এবং সাইজ জিরো এবং অলিখিত হ্রস্বস্বরের সন্ধানে (২০১৫)। প্রকাশিতব্য উপন্যাসঃ উপন্যস্ত (২০১৯ বইমেলা)। অধুনা হাইবারনেশনে থাকা অ্যাশট্রে পত্রিকার সম্পাদক। ছোট পত্রিকায় লেখালিখিঃ গল্প এবং অনুবাদ। ইমেল : arkaless@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি