সাম্প্রতিক

ডহর । আহমদ মিনহাজ

এই শহরে রুম্মান একমাত্র প্রাণী মালকিন যাকে ‘বেটা বলে ডাকে। ওর গায়ের রঙ দিনের ঘড়ি ধরে পালটায়। সকালের নরোম আলো সেই গায়ে অলস বিড়ালছানার মতো লটকে থেকে মালকিনের মুগ্ধতা কুড়ায়। রোদ তেজি হলে রুম্মানের গায়ে খয়েরির ছোঁয়া লাগে আর মালকিন সেটা দেখে মনে-মনে হাসে। দ্বিপ্রহরের রাগি সূর্য শেষ বিকালে অবসন্ন কমলালেবুর মতো দিকচক্রবালে গোধূলি ছড়ালে কেশর ফোলানো সিংহের মতো ঘাড় উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা রুম্মানকে দেখে মনে সমীহ না জেগে পারে না। সন্ধ্যার ধূপছায়া আলো ওকে মেটে ধূসর করে তোলে। আর রাত গভীর হলে ধূসর উবে গিয়ে নিকষ অন্ধকার ছাড়া কিচ্ছু দেখা যায় না। রুপালি পাতের মতো চকচকে একজোড়া চোখ শুধু গভীর অন্ধকার ফুঁড়ে ক্ষণে-ক্ষণে উঁকি মারে। এইসব বিশেষত্বের জোরে রুম্মান মালকিনের ‘বেটা’ হয়ে আদর ও সমীহ কুড়ায়। মালকিনের উপস্থিতি ওর কাছে রোদ-জোছনার মতো চিরন্তন, বিপরীতে রুম্মানকে ছাড়া মালকিন নিজেও অচল। অবিচ্ছেদ্য এক সম্পর্কের টানে দুজন একজোট হয়ে শহর চষে বেড়ায়।

রুম্মান এই শহরের দ্বিতীয় সবাক নাগরিক। প্রথমজন অবশ্যই তার মালকিন। বেয়সে প্রবীণা হলেও চলনে-বলনে নবীন যুবতীর তেজ ধরে রেখেছে। এখনও সাবলীল মোটর গাড়ি হাঁকায়। সোনা-বাঁধানো দাঁতের ফাঁকে কথার খৈ সমানে ফুটে। খয়েরিরঙা মোটরকার রুম্মানের ডেরায় এসে প্রতিদিন থামে। মালকিনের মতো গাড়িটিও প্রাগৈতিহাসিক। আদ্দিকালের হুডখোলা জিপ গাড়ি। একাধিক জায়গায় রঙ চটে গেছে। মাকড়শার জালের মতো ফাটা দাগ উইন্ডশিল্ডের পুরোটা দখলে নিতে বসেছে। হেডলাইটে বিরাট তাপ্পি মারা। গাড়িটি তেলখেকো। মালকিন তবু সারাইয়ের প্রয়োজন বোধ করে না। কারণটি বোধহয় ওর ইঞ্জিন। সেরকম গোঁয়ার! খানাখন্দে দুদ্দাড় নিজেকে টানতে পারে। মাঝেমধ্যে বিগড়ে গেলে চালক নিজে মেকানিক হয়। মাসে একবার গাড়িকে ধোয়ামোছা করে। নিয়ম করে তেল ভরে প্রতিদিন। জননীরব শহরে হুডখোলা জিপ গাড়িটিকে তৃতীয় সবাক বস্তু বলে ভাবা যায়, এছাড়া বাকিটা শ্মশান।

খেলাটি আসলে অনেকদিন ধরে চলছে, রুম্মানের ডেরায় এসে মালকিন গাড়িতে শক্ত ব্রেক কষবেই। আজকের দিনটি যথারীতি সেই খেলার প্রতিধ্বনি হয়ে ওর ডেরায় হাজির হয়। গাড়ি থামিয়ে মালকিন জানালা দিয়ে মুখ বাড়ায়, ‘রুম্মান, উঠ্ বেটা। জলদি গাড়িতে উঠ্। বহুত দূর যানা হ্যায়।’ মালকিনের মুখের বুলি বাংলা তবে প্রমিত উচ্চারণে কথ্য বুলি মিশিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে। দু’চার কলি হিন্দিও সেখানে ঢুকে পড়ে। এক কালে হিন্দি সিনেমার পোকা ছিল। এখনও সময় পেলে পুরোনো দিনের গানের কলি গুনগুন করতে ভোলে না। প্রমিত বাংলায় কথ্য বা হিন্দির টান বিদঘুটে হলেও মালকিনের মুখে শুনতে খারাপ লাগে না। এটা মনে করিয়ে দেয় এই শহরে কোনো এক কালে বাংলা বুলির সঙ্গে হিন্দি ও ইংরেজি লোকের অভ্যাসে জায়গা করে নিয়েছিল। সেসব এখন অতীত। ওরা দুটি প্রাণী ছাড়া শহরটি একেবারেই জননীরব। নিঃস্তব্ধতার গর্ভে গুম হওয়া শহরে মালকিনের ‘বহুত দূর যানা হ্যায়’ বাক্যটি শূন্যতায় পাক খেয়ে রুম্মানের ডেরায় প্রতিদিন আওয়াজ তোলে। সেই আওয়াজের মধ্যে তাড়া ও আকুতি রয়েছে। বিষয়টি আর কেউ না বুঝুক রুম্মানের বুঝতে অসুবিধা হয় না, হয়ত সে-কারণে লাফ দিয়ে মালকিনের পাশের সিটে বসে পড়ে। মালকিন গাড়ির চাবি ঘোরায়। শুরুর শক্ত ঝাঁকুনি সামাল দিয়ে হুডখোলা জিপ শহরের পথে নামে।

মালকিনের মোটর গাড়িটি একখান জিনিস বটে! দেখে মনে হয় কবেকার কোন্ ইতিহাসের গর্ত থেকে ঝংধরা শরীর নিয়ে বর্তমানে উঠে এসেছে। লক্কর-ঝক্কর দুলকিচালে ওটা এখন চালক ও আরোহী নিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছে। শহরে আজ জোর হাওয়া বইছে। ধু-ধু সেই হাওয়া গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে অবাধে যাতায়াত করে। পেছনে ধূলির ঘূর্ণি উঠছে। মালকিন ও রুম্মানের তাতে থোড়াই কেয়ার। ধূলিঝড়ে ওরা অভ্যস্ত। শহরে এটা নিত্যদিনের ঘটনা। রুম্মান শুধু একবার পেছনে ঘাড় ফিরিয়ে ঘূর্ণির শক্তিটা বুঝে নেয়, যেন হারানো অতীতকে মনে করার চেষ্টা, যখন কিনা জীবনের কোলাহল শহরের আকাশকে এরকম ধুলার মেঘে ঢেকে দিত। রোমন্থন বলতে শুধু এইটুকু। বাকিটা নিরেট বর্তমান। রুম্মানের ধূলি-দর্শন যে-কারণে পরিবেশে বাড়তি প্রতিক্রিয়া ঘটায় না। নির্লিপ্ত শহরে ধূলির মেঘ উড়িয়ে লক্কর-ঝক্কর জিপ এগিয়ে চলে।

মালকিনের প্রশ্নে রুম্মান শূন্য চোখ তুলে শুধায়, ‘কেন?’ উত্তর দিতে মালকিন কিছুক্ষণ দম নেয়। চোখের কোণায় লেপটে থাকা আসু মুছে গতর নড়েচড়ে বসে, ‘জুম্মানের মতো স্বাধীন আর সাহসী বাচ্চা আমি দুটি দেখি নাই। মুক্তির লগে তাল দিতে গিয়া খামোখা নিজেরে বিপদে ফেললো। শহর তো মুক্ত হয় নাই। ওইটা নামে স্বাধীন হইছে কিন্তু স্বাধীন হওয়ার অর্থ আজও বুঝতে পারে নাই। মুক্তিরা নিজেকে রক্ষা করতে পারছে কিপারে নাই। যদি পারত শহরে শত-শত জুম্মান জন্ম নিতো। আমি তো এইখানে স্বাধীন হওয়ার কিছু দেখি না। যেদিকে যাই খালি ধুলার পাহাড় দেখি। তুই আর আমি ছাড়া কথা কওয়ার কেউ নাই। দালানকোঠায় ধুলার রাজত্ব। মানুষগুলা সাত চড়ে রা কাড়ে না। ঠেলা দিলে নড়েচড়ে বসে না। তাগো শরীরে ধুলার আস্তর পুরু হইছে। সাফ করার লোক নাই। কেউ নাই রে বেটা এই শহরে যারে দেখে মনের জ্বালা জুড়াবি। তুই আর আমি শহরে একা ঘুরি। তোরে নিয়া জুম্মানরে তালাশ করি। এ কেমন শহর বেটা! এরে জীবন বলে! ওরা বলে জুম্মান নদীতে পড়ে মরছে। আমার বিশ্বাস হয় না। যে স্বাধীন তারে কেউ মারতে পারে না। রাক্ষুসী নদী জানে আসলে কী ঘটছে। তুই দেখিস জুম্মানরে সে ঠিক ফেরত দিবে। লে চল বেটানদীতে নামি। হরমা ওর স্বামীরে ফেরত অনতে ডহরে নামছিলআমরা জুম্মানরে ফেরত নিতে সেখানে নামবো। লে চল।’ “

সময়ের ঘড়ি এই শহরে অনেকদিন ধরে নিথর হয়ে আছে। হুডখোলা জিপের দুলকিচাল ও মালকিনের বয়স্ক মুখমণ্ডল ছাড়া দ্বিতীয় কোনো দ্রষ্টব্য নেই। এরকম এক অনুভব গাড়ির পরিবেশকে কিছুক্ষণ কাবু ও বিমনা রাখে। মালকিনের পাশে বসা রুম্মান গাড়ির দুলুনির সঙ্গে তাল দিয়ে নিজেও দুলছে। মনে-মনে হয়ত ভাবে,-আজকের গন্তব্য এখনও জানা হয়নি; মালকিনের কাছ থেকে এক ফাঁকে সেটা জেনে নিতে হবে; তবে তার আগে অবধি ন্যাংটা জিপ দুলকিচালে চলুক। বেজায় ধূলি উড়ছে চারপাশে। রুম্মানের গায়ের লালিমায় ধূলির আস্তর পুরু হয়ে পড়তে শুরু করেছে। ড্রাইভিং সিটে বসা মালকিনের মুখ ধূসরিত। ধূলিকণা রেশমিদানার মতো তার গায়ের ওপর ঝরছে। সূর্যের আলো সেখানে প্রতিসরিত হয়ে মনোহর বর্ণালীর জন্ম দিয়ে নিমিষে হাওয়ায় উবে যাচ্ছে। অপরূপ সেই আলোক-তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে রুম্মান নীরবে হাই তোলে। ওর এখন বেজায় ঘুম পেয়েছে।

… … …

সময় সকালের কাটায় স্থির হলেও মধ্যাহ্নের বিলম্ব নেই। আকাশ অসহ্য নীল। ছিটেফোঁটা মেঘের হদিস নেই কোথাও। ধুলায় ধূসর রাস্তার দুধারে ন্যাড়া গাছের সারি। গাছগুলো মস্তকবিহীন। কে বা কারা ওদের বিনষ্ট করে দিয়েছে। গাছেদের কাটা মুণ্ডুর ওপর রাজ্যের ধূলি জমে আছে। ওরা হচ্ছে সাদা প্রেত। সেকালে হরিৎ দ্যুতির চমকে লোকের মন হরণ করত, এখন কন্ধকাটা প্রেত হয়ে মনে আতংক জাগায়। রুম্মান সেই কন্ধকাটা প্রেতসারির দিকে তাকিয়ে মালকিনকে সওয়াল পুছে, ‘আজ কোনদিকে যাবে মালকিন?’ মালকিন হাসলে গালে টোল পড়ে এখনও, ‘বেটা, আজ পুব দিকে যাবো। নদী যেখানে ডহর হয়ে মানুষ গিলে খায় সেইখানে যাবো।’ উত্তর পেয়ে রুম্মান আর কথা বাড়ায় না। বেলা মধ্যাহ্নে প্রলম্বিত হতে চলেছে। রোদের তেজ মোলায়েম থেকে প্রখর হবে একটু পরে। রুম্মানের গায়ের রঙ খয়েরি আভায় পালটে যাবার বেশি দেরি নেই। রঙ বদলের মহতি ক্ষণে বাড়তি কথা তাই নিষ্প্রয়োজন।

হুডখোলা লক্কর-ঝক্কর দুই রাস্তার মোড়ে এসে থমকে পড়েছে। সম্ভবত পুবে যাবার নিশানা ঠাহর করতে পারছে না। একটি রাস্তা পিচঢালা ও সর্পিল। এঁকেবেঁকে গলি থেকে তস্য গলি হয়ে কোন্ গহীনে হারিয়ে গেছে! রাস্তার চারপাশে ঝংধরা দোকানপাট ও যানবাহনের সারি। রাস্তা দিয়ে যারা ছুটছিল তারা সবাই দুধসাদা ধূলির মিহি স্তূপে জমে গিয়ে দাঁড়িয়ে অথবা বসে পড়েছে। দূর থেকে দেখলে তুষারদানা দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য বলে ভ্রম হয়। এই রাস্তাটি সম্ভবত উত্তরের দিকে মোড় নিয়েছে। প্রবেশমুখের প্রথম দোকানটি শুরু হয়েছে খাবার দিয়ে। পেল্লাই শিকে গ্রিল করা মুরগির ঠ্যাং এখনও ঝুলছে। আগুনে ঝলসানো ঠ্যাংগুলোকে মুখোশপরা ভূতের মতো দেখায়। গ্রিল চিকেনের পাশ ঘেষে চলমান দোকান রকমারি পণ্যে বোঝাই হয়ে ছিল; কাচঘেরা দ্বিতল ভবনটি হাল ফ্যাশনের কাপড় দিয়ে সাজানো রয়েছে; এখনও সেরকম আছে, তবে ক্রেতারা ধূলির মোড়কে বন্দি হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে পড়েছে। জীবনের কাছে ওদের যেন এটা চাওয়ার ছিল…এভাবে ধূলিধূসর হয়ে সারাজীবন দাঁড়িয়ে থাকবে!

রাস্তাটি প্রশস্ত ও নাটকীয়। অনেক স্মৃতি ধরে রেখেছে। আলো ঝলমল বিপণী বিতানের বিপরীতে কফির দোকান। দোকানি সম্ভবত বেরুবার সময় পায়নি। কাউন্টারে সেই যে গাল ঠেকিয়ে বসা ছিল এখনও সেভাবে বসেই আছে। ওর মুখের চারপাশে ধূলিকণার সাম্রাজ্য। ধূলির রেণু দোকানিকে লক্ষ করে ঝরছে। দেখে মনে হয় বৃষ্টি হচ্ছে ঘরে। তরুণ কপোত-কপোতি ধূমায়িত কফির স্বাদ নিতে সবে ঠোঁটজোড়া কাপের কাছে নামিয়ে এনেছিল এবং সেখানেই দৃশ্যের যবনিকাপাত ঘটেছে। ধূলির রেশমি আলিঙ্গনে কপোত-কপোতির প্রেমের সমাধি ঘটার বেশি দেরি নেই আর। শহরে প্রকাশ্য চুম্বনে লোকের মতি ছিল না এক কালে। পরে সেটা পালটে যেতে থাকে। রাস্তার বাম কোণ ঘেষে যে যাত্রী ছাউনি সেখানে চুম্বন-বিবশ দুই জোড়া অধরকে ধূলি হাতেনাতে বন্দি করেছে। বীমার দালাল হনহন করে পথ চলছিল মাসিক লক্ষ্য পূরণের আশায়। ধূলি তাকে পথের মোড়ে বীমা করে দিয়েছে। চারপাশে ছড়ানো-ছিটানো অজস্র স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে রাস্তাটি ক্রমশ ধূলির পরতে ঢাকা পড়ছে। বিপর্যয়ের আগে এটি ব্যস্ত সড়ক ছিল। জনতার পদভারে সারাক্ষণ গমগম থাকত। সে যাহোক, মালকিনের গন্তব্য অবশ্য এদিক দিয়ে হওয়ার কথা নয়। সে যাবে পুবে আর এই রাস্তাটি মোড় নিয়েছে উত্তরে।

রাস্তা যেখানে সরু গলির জঙ্গলে গিয়ে মিশেছে তার প্রবেশমুখে অতিকায় মূর‌্যাল। কানের পাশে সেলফোন ধরা লাস্যময়ী তরুণী কী যেন ইঙ্গিত দিতে চাইছে। ওর সেই ইঙ্গিত বিশ্লেষণ করার জন্য কলা-সমালোচকরা আর অবশিষ্ট নেই। ধূলি অনেক আগে এই শহর থেকে তাদেরকে গায়েব করে দিয়েছে। তরুণীর মুখটি কেমন যেন রহস্যময়। হাসির ছটা থাকলেও ওর চোখের তারায় খা খা শূন্যতা দেখে মনে ভয় জাগে। তরুণীর রাঙা পায়ের নিচে সবুজ মেঠো ঘাস। স্তূপাকৃত নৃমুণ্ডুর সারি সেখানে গড়াগড়ি যাচ্ছে। যে শিল্পী এই ভাস্কর্যের জনক তাকে শিরচ্ছেদে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। ওর শিল্পকর্ম জীবনবিরোধী ও নৈরাজ্যের উসকানিদাতা অভিযোগে অজ্ঞাতনামা খুনি তার ঘাড়ে কোপ বসিয়েছিল। শিল্পীর কাটা মুণ্ডু মূর‌্যালের পাদদেশে নিথর পড়ে আছে। মুণ্ডু থেকে চোয়ানো রক্তের রেখা ধূলির পুরু স্তর এখনও ঢাকতে পারেনি। লোকে বলে রক্তের দাগ সহজে মুছে না। শিল্পীর ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে। শহরে ধূলিঝড় শুরু হওয়ার দিনে তার ধড়টি দেহ থেকে আলাদা করা হয়। আসামী কে সে প্রশ্নটি এখন অবান্তর। ধূলিঝড়ের দাপটে শহরটি আচমকা থেমে গিয়েছিল একদিন, অতঃপর কখনও সচল হতে পারেনি। ওই তো মেয়র সাহেবকে দেখা যাচ্ছে। ট্রাফিক সিগন্যালের অপেক্ষায় তাঁর গাড়িটি স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাড়ির ভিতরে মেয়র সাহেব সিটে হেলান দিয়ে বসে আছেন। তার মুখে অবিরল ধূলিকণা ঝরছে। ধূলির পুরু স্তরে আচ্ছাদিত মেয়র সাহেবকে দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি মানুষ না জম্বি। শহরে এখন শুধু ধূলির রাজত্ব। অবশিষ্ট যা কিছু ছিল অথবা এখনও আছে তারা আস্তে-আস্তে ধূলির আস্তরে দেবে যাচ্ছে।

মালকিনের বুঝতে বাকি থাকে না পথটি আসলে পুবে না গিয়ে উত্তরে মোড় নিয়েছে। সেখান থেকে দ্রুত দক্ষিণে নেমে গেছে। সুতরাং পুবে যেতে হলে দ্বিতীয় সড়ক ধরে আগানো উচিত। মালকিন এখন সেটাই করে। শহরের পূর্ব দিক থেকে নদীর যাত্রা শুরু হয়েছে। চলার পথে একাধিক ডহর তৈরি করে টানা সরলরেখা বরাবর বহু দূর অবধি বাঁক নিয়েছে। দেখে বোঝা যায় প্রস্থে সরু হলেও দৈর্ঘ্যের বিচারে নদীটি লম্বা পথের যাত্রী। শহরের প্রায় প্রতিটি কোণকে সে ছুঁয়ে গেছে। নদীর এই পুবযাত্রার পুরোটা পথ জুড়ে সারবাঁধা বসতি ও দর-দালানের ভিড়। ধূলিঝড়ের ফাঁদে পড়ে তারা সবাই টেসে যাবার অপেক্ষায় দিন গুনছে। ধস-কবলিত দরদালান পেরিয়ে মালকিনের গাড়ি ছুটে চলে এবং একসময় পুবের সঠিক নিশানা খুঁজে পায়। নদীর ঢাল ঘেষে তৈরি মনোরম তোরণটি হচ্ছে পুবের ল্যান্ডমার্ক। মালকিন সেই তোরণের পাদদেশে পৌঁছে গাড়িতে ব্রেক কষে। ধূলির প্রবল দাপট সহ্য করে ওটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাজার বছর আগে এই তোরণ শহরের অন্যতম প্রবেশপথ ছিল এবং এখনও তাই আছে।

হুডখোলা জিপ গাড়ি ওর পাদদেশে থামতেই নদী থেকে মোলায়েম হাওয়ার ঝাপটা উইন্ডশিলে জমে থাকা ধূলির পরত উড়িয়ে নিয়ে যায়। ধূলিঝড়ের দাপট এড়ানোর জন্য মালকিন আঁটোসাটো পাতলুন পরে ঘর থেকে বেরিয়েছিল। শেষ রক্ষা হয়নি। ধূলিকণায় লাঞ্ছিত ওর সেই পাতলুনকে এখন আর চেনা যাচ্ছে না। নদী থেকে উঠে আসা হাওয়া পাতলুনে জমা ধূলির স্তর সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মোলায়েম সেই হাওয়া রুম্মানের গায়েও লঘু পরশ বুলিয়ে যায়। নদীর এমন সদয় অভ্যর্থনা ওরা আশা করেনি। মনে তাই আমোদ জাগে। মালকিন বুক ভরে শ্বাস টানে। রুম্মানকে লক্ষ্য করে তার কণ্ঠ চটুল হয়, ‘বহুত খুবসুরত হাওয়া বেটা। লে, দম নিয়ে লে।’ রুম্মান মালকিনের অনুগত। সুতরাং আকাশের দিকে মুখ করে সেও বুক ফোলায়। তোরণের প্রথম সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নদী থেকে উঠে আসা হাওয়াকে দুজনে আরেকবার আলিঙ্গন করে।

নামে বা স্থাপত্যে তোরণ হলেও ওটা আসলে ঘাট। শান বাঁধানো সিঁড়ি সোজা নদীর অভিমুখে নেমে গেছে। সেখান থেকে ডহরের দূরত্ব খুব বেশি হলে আড়াই তিন হাত হবে। নদীডহরে জলের স্রোত যেখানে অহরহ ঘূর্ণি তৈরি করে সেটার ঘের সচরাচর বেশি হয় না। ভরা পানির মৌসুমে দশ থেকে বারো ইঞ্চি ঘেরে এরকম অজস্র ঘূর্ণি এক-একটি ডহরে পরিণত হতে থাকে। অনেক সময় এর থেকে ছোট পরিসরে ঘূর্ণির জন্ম হয়। সেইসব বর্তুল পরিসরের মধ্যে নদীর জলরাশি সামনে যা পায় সবকিছু গ্রাস করে। ডহর তার গভীরতা সত্ত্বেও অতটা বিপজ্জনক নয়, কিন্তু ডহরে সৃষ্ট স্রোতের চোরাটান সত্যি মারাত্মক। তরণী ও মাঝিমাল্লাকে দিকভ্রান্ত করতে ওর জুড়ি মেলা ভার। দক্ষ সাঁতারু তাই সযত্নে ওইসব বর্তুল এড়িয়ে সাঁতার কাটে, তবে কোনো কারণে বৃত্তের মধ্যে গিয়ে পড়লে ফেরত আসা মুশকিল, গোলক তখন অন্ধবিবর হয়ে সাঁতারুকে ভক্ষণ করে।

এসব কথা মালকিনের অজানা নয়। কিন্তু আজ সে ডহরে নামবে বলে পণ করে এসেছে। নদী তার চলার পথে ছোট-বড়ো ডহর তৈরি করে অন্য নদীর সঙ্গে মিলিত হয় অথবা সরাসরি সাগরে গিয়ে পড়ে। এই নদীটি সে নিয়মের বাইরে নয়, স্থানে-অস্থানে ডহরের সমাবেশ ঘটিয়ে সামনে এগিয়েছে। ওর ডহরগুলোর মধ্যে পুবেরটি সবচেয়ে পুরাতন ও বিপজ্জনক বলে স্বীকৃত। হাজার বছরে ওটা অনেক মানুষ মেরেছে। কুখ্যাত সেই ডহরে নামার জন্য মালকিন সেই সকাল থেকে উতলা হয়ে আছে। লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে ছুটে এসেছে। মোলায়েম হাওয়া গায়ে মেখে রুম্মানকে তাড়া লাগায়, ‘চল বেটা, ঘাটে নামবি চল। রাহা আব দূর নেহি। রাজার মেয়ে এই ঘাটে নাইতে নামতো। এখন আমরা নামবো। লে চল।’

রুম্মান জানে মালকিন কেন তাকে ডহরে নামতে বলছে। বুড়ি ভানুমতীর খেল্ খেলতে পারঙ্গম। জননীরব শহরে সেই খেলার জোরে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে। ওর বয়সের গাছপাথর নেই। সমান তালে অতীত ও বর্তমানে হাঁটতে পারে। রাজার মেয়ে যেখানে নাইতে নেমেছিল বুড়ি এখন সেই ডহরে নামার জন্য সিঁড়ি ভাঙে। ওর মনে ডর-ভয় নেই। থাকার কথা নয়। বুড়ি যে ডাইনি! জাদু দিয়ে ভয়কে বশে রাখতে জানে। রুম্মানের কেন যেন মনে হয় ডাইনি বুড়ি ডহরে নামলে হারানো অতীত ফিরবে বর্তমানে। জননীরব শহরটি আবার ফিরতে পারবে কোলাহলে। নদী অযুত কোলাহলের সাক্ষী। সে চাইলে সব কোলাহল ফিরিয়ে দিতে পারে। রুম্মান তাই নীরবে মালকিনকে অনুসরণ করে, ভেড়ার পাল যেমন অনুসরণ করে রাখালকে,  হ্যামিলনের বংশীবাদকের সম্মোহক সুরে বাচ্চারা যেমন কেপলবার্গের পাহাড়ে অথবা ওয়েজার নদীতে গায়েব হয় চিরতরে; হতে পারে সম্মোহক সেই নেশার টানে রুম্মান বুড়ির সঙ্গে ঘাটের সিঁড়ি ধরে নিচে নামতে শুরু করে।

… … …

মালকিন ও রুম্মান এখন ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। দ্বিপ্রহর তার জাল বিছিয়েছে নদীতীরে। তেজি রোদে চারপাশ চিকচিক করে। রোদের ছটায় রুম্মানের চোখ জ্বালা করছে। ওর গায়ের খয়েরি আভা সেই দ্যুতির আবেশে ক্ষণে-ক্ষণে চমকায়। বুঝিবা রোদের তীব্রতা ভুলে থাকতে মালকিনকে সে সওয়াল-জবাব ব্যস্ত করে তোলে:

— রাজার মেয়ের নাম কি ছিল মালকিন?
: রাজার মেয়ে রাজকন্যা। ওইটা তার নাম হয় বেটা।
— না, মিথ্যা। সব রাজার মেয়ের রাজকন্যা নাম হয়। ওইটা ছাড়াও অন্য নাম থাকে। রাজকন্যার নাম কি ছিল মালকিন?
: সেটা জেনে তোর কাম কি বেটা? তুই রুম্মান। তোর এক ভাই ছিল, তার নাম জুম্মান। সে নাম কে রাখে?
— জানি না। আমার ভাই এখন তবে কই? তারে তো কখনো দেখি নাই।

: দেখবি কেমন করে? সবাই বলে জুম্মান মারা গেছে। শহরের পশ্চিমে তার ডেরা ছিল। জবরদস্ত সাহসী ছিল তোর ভাই। এক শীতের রাতে ওর জন্ম হয়। আরেক শীতের রাতে সে গুলি খেয়ে মারা গেল। শহরে তখন যুদ্ধ চলছে। স্বাধীন হওয়ার যুদ্ধ। লোকে বলতো মুক্তির সংগ্রাম। জুম্মান সেই সংগ্রামে মুক্তিসেনার চর ছিল। ওদের হয়ে শত্রুর ডেরা থেকে খবর পাচার করত।

— মুক্তিসেনা? ওই নাম তো শুনি নাই!

: মুক্তিরা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী। পাকিস্তান নামের দেশটি এই শহরকে একসময় শাসন করছে। শহরের লোক শান্তিতে ছিল না। স্বাধীন হওয়া ছাড়া তাগো কোনো উপায় ছিল না। পাকিস্তানী সেনারা আজাদি রুখতে তখন মানুষ মারতে শুরু করল। মুক্তির জন্ম সেখান থিকা। নিজেরে স্বাধীন করার সংগ্রামে ওরা জান বাজি রেখে লড়াই করে। লড়াইটা ন্যায্য ছিল রে বেটা। জুম্মান সেই লড়াইয়ে নিজের জান খোয়ায়। পাকি সৈনিকের বুলেট তারে খতম করে। তোর আপন ভাই ছিল সে। মুক্তি সংগ্রামের শহিদ।

— তুমি দেখছো তারে শহিদ হইতে?

: শহিদ হইতে দেখি নাই। তবে জুম্মানরে বহুত দেখছি। আমার এই গাড়ি তখন জোয়ান ছিল। জুম্মান ওর সঙ্গে পাল্লা দিয়া ছুটতো। একটা তেজি ঘোড়া ছিল তোর ভাই। আফসোস! শহর যেদিন মুক্তিরা দখলে নিলো জুম্মানের লাশ নদী দিয়া ভাসতে-ভাসতে কোথায় হারিয়ে গেল জানি না। আমি তারে শেষ দেখছি মুক্তির সঙ্গে কুয়াশার মধ্যে হাঁটতে। তখন শীতকাল। খুব কুয়াশা ছিল। তারপর…তারে আর দেখি নাই।

ওরা বলে জুম্মানরে বুকে গুলি করছে। নদীর ঢালে অ্যামবুশ করার সময় শত্রুর বুলেট ওর বুকে লাগে। মুক্তিরা ওরে কবর দিবার সময় পায় নাই। স্বাধীনতার সংগ্রাম কঠিন চিজ বেটা। এই সংগ্রামের লিডার যে ছিল তারে পরে খুন করা হইছে। পরাধীন থাকা সহজ, কিন্তু স্বাধীন থাকা কঠিন বেটা, তারচেয়ে কঠিন তারে ধরে রাখা। ওরে পাইতে ও ধরে রাখতে গুলি খাইতে খায়। তোর ভাই গুলি খেয়ে নদীতে গিয়া পড়ে। নদী ওর কবর হয় বেটা।

বেশুমার লাশ নদীতে ভাসছিল তখন। কাক-চিল-শকুনে শহর বোঝাই ছিল। মাটিতে মাইন পোঁতা হইছিল বেশুমার। মুক্তির মধ্যে অনেকে ছত্রীসেনা ছিল। শত্রু খতমের জন্য হঠাৎ আকাশ থিকা তারা বোমা ফেলত। মাটিতে ল্যান্ড করার সময় অনেকে মাইনে পা দিয়া জান খোয়াইছে। পাকি ছত্রীসেনারাও নিজের পোঁতা মাইনে পা দিয়া বেশুমার মরছে। স্বাধীনতা হইছে মৃত্যুর উৎসব। মনে রাখিস বেটা, যুদ্ধের সময় এই নদী রাক্ষুসী ছিল। ও তখন লাশ খাইতো। তোর ভাই জুম্মানরে সে আর ফেরত দেয় নাই।

— মালকিন তুমি তো ভানুমতীর খেল্ জানো। পারবা না আমার ভাইরে ফেরত আনতে?
: দূর বোকা! যে যায় তারে কে ফেরায়! হরমারে রাজা ফিরাইতে পারে নাই। রাজার কন্যা জলে ডুবে মরছিল।
— হরমা কে হয় মালকিন?

রুম্মানের কথায় মালকিন সিঁড়ি ভাঙা থামিয়ে ভ্রূকুটি কাটে, ‘চুপ বেটা চুপ। এই নদীর নাম হরমা ছিল। বেটির নামে রাজা নদীরে বন্দি করছিল। নদীর অন্য কোনো নাম হয়ত ছিল তখন। কী নাম ছিল সে আমি জানি না। জানার উপায় নাই। রাজার বেটি নিজের থিকা ডহরে গিয়া পড়ে। আর ফিরা আসে নাই। কন্যারে ফেরত পাইতে রাজা অনেক কান্নাকাটি করছে। পাইক-পেয়াদারা ডহর তছনছ করে রাজকন্যার হদিস পায় নাই। ডহর যারে গিলে খায় সে আর ফেরত আসে না। রাজার বেটিও ফিরতে পারে নাই। সে বড়ো দুঃখের কাহিনী বেটা। আহারে…!’

… … …

মালকিন এখন নদীর ঘাটের শেষ সিঁড়িতে পৌঁছে গেছে। পরের সিঁড়িগুলো দৃশ্যমান নয়। নদীর অতলে ওরা ডুব দিয়ে আছে। নদীর সঙ্গে সিঁড়ি বা ঘাটের সম্পর্ক আপেক্ষিক। বৃষ্টির মৌসুমে সে পানিতে থই থই করে। ওর সেই প্রমত্ত যৌবনের জোয়ারে ঘাট নদীতে তলায়। এটা অবগাহন। যৌবনের জোয়ার যখন ওঠে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় কাতর যুবতীকে রুখবে এমন সাধ্য কারও থাকে না। ঘাট সেটা জানে বলে ভরা যৌবনা নদীতে নিজের নিমজ্জনে বিহ্বল হয় না। ফেনিল নদী ও বিপণ্ন ঘাটের মধ্যে এই রতি-সংযোগ প্রতি বছর ফিরে-ফিরে ঘটে। জীবনের জোয়ার-ভাটা নদী থেকে পৃথক নয়। বছর ঘুরে সেই এক খেলা! যৈবতী নদী ঋতুচক্রে বিশীর্ণ হয়। তার ফেনিল ধারাপ্রবাহে ভাটার টান লাগে। প্রমত্ত কামক্ষুধা শিথিল হয়ে আসে। অবসাদে নদী তখন নিস্তরঙ্গ হয়। ওর জলপ্রবাহে টান পড়ে আর ঘাট তখন একটু করে জাগে। গভীর মিলনের তিয়াস শেষে মাথা তুলে নিজের অস্তিত্ব জগৎকে জানিয়ে দেয়। শরীরে নদীর অসংযত রতিচিহ্ন নিয়ে ঘাটের সিঁড়ি পুনরায় লোকের পদভারে মুখরিত হতে থাকে।

নদী ও ঘাটের সম্পর্ক ঋতুচক্রে বাঁধা। মৌসুমী বায়ুপ্রবাহ ও আকাশে মেঘের ডামাডোল সেই সম্পর্কের নির্ধারক। মেঘের ডমরু বিদায় নেয়ার ক্ষণে মালকিন নদীতে নামতে যাচ্ছে। আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা প্রবল নয়। গুরুগুরু বজ্রধ্বনিতে ধরণী প্রকম্পিত করার মতো মেঘদলের সংকট ঘটেছে সেখানে। আকাশ এখন অসহ্য পরিষ্কার। রোদের তেজে শান বাঁধানো ঘাটের ধূলিধূসর সিঁড়ি ইস্পাতশলাকার মতো চিকিচিক করছে। দৃশ্যমান সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে মালকিন তাই বসে পড়ে। গুমোট গরমে সিঁড়ি নামার ক্লান্তি তাকে কাবু করে ফেলেছে। ক্ষণিক বিশ্রাম প্রয়োজন। রুম্মান তার মালকিনের অনুগত এবং সে-কারণে আদরের। সুতরাং তাকেও সিঁড়ির ওপর থেবড়ে বসে পড়তে হয়। নদী থেকে শুকনো হাওয়ার ঘূর্ণি উঠছে। ধূলিধূসর সেই ঘূর্ণি ঘাটের চারপাশে পাক খেয়ে শহরের দিকে ধায়। মালকিনের চোখে-মুখে ধূলির ঝাপটা এসে লাগে। ওদিকে রুম্মানের খয়েরি দেহে লেপটে থাকা ধূলিকণা রোদের তেজে জ্বলজ্বল করে। দৃশ্যটি দেখে মালকিন বিমনা স্বরে মুচকি হাসে, ‘বুঝলি বেটা, রাজার বেটি সিনান করতে যেদিন ঘাটে নামছিল সেইদিন খুব হাওয়া ছিল নদীতে। ওইটা তখন পোয়াতি। ওই যে স্রোতের পাক দেখছস ওইখানে নদী খুব গভীর ছিল। এই পাকে পড়লে কিচ্ছু রেহাই পায় না, সব ডহরে তলায়। রাজার বেটি সর্বনাশা ডহরে নামার পণ করছিল।’  

মালকিনের গলা খানিক ধরে আসে। তার কণ্ঠে অচেনা উদাস এসে ভর করেছে। রুম্মান কৌতূহল চেপে রাখতে পারে না, উৎসুক কণ্ঠে শুধায়, ‘রাজার বেটি কেন পণ করে মালকিন? কীসের দুঃখে ডহরে গিয়া নামে?’ রুম্মানের জিজ্ঞাসু চোখে বুদ্ধির দীপ্তি খেলে বেড়াচ্ছে। বাচ্চা হলেও সে বুঝে ফেলেছে রাজার বেটি মিছে ডহরে নামবে বলে জেদ করেনি। এর পেছনে গভীর কোনো কারণ ছিল। জীবনবিধাতা ওর মৃত্যুকে এভাবে সাজিয়েছেন হয়ত। জগতে সকল ঘটনা বিধাতার ছক মেনে ঘটে। যেটা ঘটবে তাকে রুখার সাধ্য তিনি ছাড়া কারও নেই। ডহরের চোরাস্রোত প্রাণ নিতে পারে জানার পরেও যে ব্যক্তি সেখানে নামে সে আসলে নিজেকে শেষ করার জন্য নামে। নিজের অস্তিত্ব ও পরিচয় বিনষ্ট করতে নদীর পাকে তলায়। রাজার বেটি কি তবে নিজেকে মারতে ডহরে নামে? প্রশ্নটির উত্তর যে দিতে পারে সে এখন বিমনা ও উদাসিন। তার কণ্ঠ কুহকিনীর দখলে। সেকালে লোকে বিশ্বাস করত নদীর মধ্যে কুহকিনী বাস করে। রাত গভীর হলে পাতাল থেকে সে উঠে আসে। চাননিপসর রাতে চাঁদের বুড়ি চরকা ঘোরায় আর কুহকিনী মিহি স্বরে গান গাইতে-গাইতে নদীর উপরে উঠে আসতে থাকে। তার কণ্ঠের সুরেলা টানে হাওয়া অস্থির হয়, নদীর জলে তখন বড়ো-বড়ো ঢেউ ওঠে, আর মাঝি-মাল্লার দল বদর-বদর বলে লগি ঠেলে।

কুহকিনীর সঙ্গে ঝড়-তুফানের সম্পর্ক নিবিড়। নদী থেকে সে উঠে আসে মানুষ ধরতে। লোকে বলে মানুষকে গুম করার জন্য রাত-বিরাতে হানা দেয় নদীডহরে। নদীর অনেক নিচে পাতাল রয়েছে। সেই পাতালের সুড়ঙ্গে কুহকিনীর বসতি। সে হলো পাতালনিবাসী। একা সেখানে দিন কাটায়। নিঃসঙ্গতা চেপে ধরলে মানুষ ধরতে উপরে ওঠে। তাকে পাতালে গুম করে রাখে। মালকিনের কণ্ঠে এখন সেই কুহকিনী এসে ভর করেছে। রুম্মানের প্রশ্নের জবাব করার অবস্থায় সে আর নেই। বিষয়টি বুঝতে পেরে রুম্মান চুপচাপ মালকিনের গা ঘেষে বসে থাকে। ওদিকে মালকিন ডুব দেয় কুহকিনীর সুরজালে, ‘বুঝলি বেটা, রাজা তার মাইয়ারে জলে নামতে নিষেধ করেছিল সেদিন। মাইয়া কথা শুনে নাই। রাজকন্যা নামার পণ করে আর রাজা তারে দোহাই দেয় ডহরে না নামতে’:

দোহাই লাগে কন্যা তুমার না নামিও ঘাটে
আলতারাঙা চরণ মাগো ডুব দিও না ডহরে॥
বাপে দিমু সোনার বিছা কোমরে বান্ধিবা
মায়ে দিব কানপাশা কর্ণেতে পিন্ধিবা॥
আরও দিমু হাতের বালা অঙ্গুলের অঙ্গুটি
গলে দিমু মুক্তার মালা যতনে পরিবা॥
ভাইয়ে দিব নাকছাবি মাথেতে টিকলি
খোপার টায়রা দিব যতনে বান্ধিবা॥
আরও দিব ঝুমকা কন্যা পায়ের মঞ্জীর
অধর রঞ্জিবা কন্যা তাম্বুল রঞ্জকে॥

না নামিও না নামিও কন্যা রাক্ষসী ডহরে
সোনা দিয়া কুপ বান্ধাইছি না যাইও ডহরে॥
বাপের কিরা মায়ের কিরা না যাইও ডহরে
কেশবতী কন্যা মাগো ডুব দিও না ডহরে॥

বাপের দোহাই মায়ের নিষেধ পায়ে ঠেলে আলতারাঙা কন্যা নদীর ঘাটে পা রাখে। পেছনে পাইক-পেয়াদা ও নফর বরদার, সঙ্গে সখীগণ চলেছে। নদীর জলে এখন ছলাৎ-ছলাৎ ঢেউ। সে যেখানে ঘোলাস্রোতে ঘূর্ণি তুলে পাক খাচ্ছে সেখানে অথই ডহর। রাজার বেটি আজ সেই ডহরে ডুব দিবে বলে গোঁ ধরেছে। বাপের ঘরে কন্যার অভাব তো নাই! সোনা বাঁধানো পালঙ্কে শুয়ে তার দিন কাটে। বাপে-মায়ে সোহাগ করে ডাকে চন্দ্রমুখী। কন্যার চাঁদমুখে কালিমা যে স্থান পায় না! ভাইয়ে রঙ্গ করে ডাকে পদ্মমুখী। কন্যার পদ্মমুখে দুঃখ যে দাঁড়াতে পারে না। এহেন কন্যা স্বামীকে ফিরাবে বলে ডহরে নামতে পণ করেছে। স্বামী গিয়েছিল বাণিজ্যে। সওদা বোঝাই ডিঙ্গা ভিড়ে রাজার ঘাটে। কন্যার জন্য ডিঙ্গা বোঝাই করে এনেছে হীরে-মরকত-চুনি-পান্না। দুজনে মিলে নাইতে নেমেছিল ভরা গাঙ্গে। নদীতে তখন নয়া পানির ঢল নেমেছে। নাইওরী রঙ্গে বিধুরা কন্যার মনে লাগে যৌবনের উতল হাওয়া। স্বামী গরবিনী কন্যার তর সয় না জলের সঙ্গে লাই খেলতে। বরকে অস্থির করে জলে নামতে:

শুনগো প্রাণের সোয়ামী নাহিবো জলে
গাঙ্গে আইলা নয়া পানি নাহিবো এখনি॥

কন্যার অবুঝ আবদারে বরের মনে মরার কোকিল শিস দিয়ে ডেকে যায়। বাণিজ্য বসতে লক্ষ্মী তো অনেক হয়েছে। এবার রঙ-তামাশায় কাটুক ক্ষণ। কন্যার নিলাজ চোখে জলে অবগাহনের তিয়াস দেখে বরের মন রসিয়ে ওঠে। মনের গহীনে জলে নামার অছিলায় কন্যার রূপ সম্ভোগের চোরাটান উঁকি দিয়ে যায়। সকৌতুকে কন্যার আঁচল ধরে টানে:

রূপবতী কন্যা ওগো ঢেউ দিও না জলে
ভরা গাঙ্গে লাই খেলিব ডুব দিব গহনে॥

বরের কথায় আদিরসের আভাস পেয়ে যৈবতী কন্যার মুখ শরমরাঙা হয়ে ওঠে। চোখের কোণে ব্রীড়ার ঘনঘটা ছুটাছুটি করে। তাম্বুলরাঙা অধর স্ফুরিত হয় ছদ্মরোষে। বঙ্কিম কটাক্ষ হেনে তর্জনী তুলে বরকে শাসায়:

নিলাজ নিদয় ঠাকুর লজ্জার মাথা খাস
“গলায় কলসি বাইন্ধা গাংয়ে ডুইব্যা মর॥”

কন্যার ছদ্মকোপ বরকে দুর্নিবার করে। সকৌতুক রঙ্গে কন্যার শরমরাঙা অধরে নিজেকে চেপে ধরে গীত আওরায়:

“কোথায় পাইবাম কলসি কন্যা কোথায় পাইবাম দড়ি
তুমি হও গহীন গাং আমি ডুইব্যা মরি॥”

গাঙ্গে নয়া পানির ঢল এলে মানুষ নির্লজ্জ হয়। মন খালি আনচান করে নতুন জলে নাইতে। জলের সঙ্গে রতির সম্পর্ক যে চিরন্তন! সেই টানে স্বামী-সোহাগী কন্যা বর আর সখী পরিবৃত হয়ে নদীর ঘাটে নাইতে চলে। আজ বড়ো সুখের দিন। দুজনে মিলে লাই খেলবে নদীর গহনে। রাজকন্যা ও রাজকুমার জলে নাইতে নেমেছে। প্রজাদের আজ এ তল্লাটে প্রবেশ নিষেধ। সেটা নিশ্চিত করতে পাইক-বরকন্দাজ সার ধরে প্রজাশাসনে দাঁড়িয়ে পড়ে। নদীর উতাল-পাতাল স্রোতে চোরা টান। সেই স্রোত ঠেলে মায়াবী শুশুক ক্ষণে-ক্ষণে ডিগবাজি খেয়ে ফের ডুব দিচ্ছে অথই গহীনে। নির্ভয়া কন্যার দেহ সাঁতার কাটে সেই ফেনিল তরঙ্গে। ক্ষণে-ক্ষণে ডুবে-ভাসে নদীর অথই স্রোতে।

স্বামী নদী-সাগর পাড়ি দিলেও ডুব সাঁতারে পটু নয়। তার দিন কাটে বজরা ও ডিঙ্গায়। মাঝি আর খালাসিরা আগলে রাখে সদাগরকে ঝড়-তুফানে। কখন কোন্ ফাঁকে কন্যার ছদ্মকোপ সত্য করে ডহরের পাকে গিয়ে পড়েছিল সে খবর পাইক-বরকন্দাজরা রাখেনি। নদীর ধারে হিজল গাছে গা এলিয়ে চক্ষু খোলা রেখেছিল জলকেলির দিকপানে। নদী বড়ো শ্রান্তিহারক। ওর বুক থেকে উঠে আসে দরদি হাওয়া। দেহ-মনে বিশ্রামের আবেশ বুলায়। চক্ষু খোলা রাখা দায় হয় তখন। ওরা আপনা থেকে বুজে আসতে চায়। রাজশালার খাটুনি তো কম নয়। সে তুলনায় তনখা আর এমন কি আহামরি! তবু রাজশালার কর্মচারী বলে কথা। লোকে বলে রাজার আশিস পেলে প্রজারা বাঁচে, যদিও প্রজার খাটুনিভরা ঘামের বিনিময়ে রাজা সেই আশিসের মালিক হয়।

এইসব ছেদো ভাবনা ওদের ভাবিয়েছে এমন নয়, তবু দায়িত্বে অবহেলা ঘটে। হন্তারক নদীর হাওয়া তার কুহকজাল বিছিয়ে দুই চক্ষে তন্দ্রা ঘনায়। সদাগর ততক্ষণে কন্যা ও সখীদের চিৎকার ছাপিয়ে ঘূর্ণিপাকে তলিয়ে যেতে বসেছে। গলায় কলসি বাঁধেনি, তবু ওর সলিল সমাধি আটকানোর সাধ্য মানুষের নেই। পাইক-বরকান্দজরা চিৎকার শুনে সচকিত হয়ে জলে ঝাঁপ দেয়। বৃথা! কারণ ততক্ষণে সদাগর তলিয়ে গেছে গহন পাতালে। এখন থেকে সে কুহকিনীর দখলে থাকবে। সেই ফরমান জারি করতে পাতাল থেকে উঠে আসা বাষ্পকণারা নদীতীরে বিস্তার লাভ করে। বড়ো করুণ ও মর্মান্তিক ছিল এই মৃত্যু! জীবনের লীলা বুঝা দায়। রাজার বেটির সিথির সিঁদুর মুছবে বলে কুহকিনী আজ পণ করেছিল। কত সতীর সিঁদুর রাজার কারণে মুছে গেছে তার লেখাজোকা নেই। এবার নদী মুছতে চলে রাজকন্যার সিঁথির সিঁদুর।

… … …

সবাই বলে এই নদীটি বড়ো শান্ত! অনর্থ ঘটানো ওর স্বভাবে নেই। বেণীটানা বালিকার মতো চপলমতি হলেও লক্ষ্মীমন্ত সে। মোটেও হিংসুটে নয়। অমল শান্তিতে বয়ে চলেছে হাজার বছর ধরে। ওর আদি নাম কে রেখেছে কে জানে! যুগ-যুগান্তর ধরে লোকে তাকে কত বাহারি নামে ডেকেছে! এর মধ্যে কোনটি তার আদি নাম সে এক নদী জানে আর জানেন জগদীশ্বর। অতীতে কোনো রাজা তার নাম পালটে দিয়েছিল কিনা সেটা এখন জানার উপায় নেই। কালের করাল গ্রাসে সেসব ইতিহাস বিলীন হয়েছে নদীগর্ভে। সুতরাং ধরে নেয়া যায় এই প্রথম কোনো রাজা তাকে নতুন নামে ডেকেছে। প্রজাদের বাধ্য করেছে সেই নামে নদীকে ডাকতে। নদীর পছন্দ-অপছন্দ এখানে গৌণ ছিল। মানুষের খেয়াল যখন মুখ্য হয়, বাকিরা সেখানে গৌণ হয়ে পড়ে। নতুন নামে নদীকে ডাকার ক্ষেত্রে সে নিয়মের অন্যথা ঘটেনি। রাজার বেটির মনে নদীকে নিয়ে খেয়াল চেপেছিল। খেয়ালি কন্যা ত্বরা করে বাপের শয়নকক্ষে ঢোকে, তার শিয়রে বসে আবদারে বিস্তারিত হয়:

মোর নাম রাখিয়াছ পিতা দীনবর
অতুল ঐশ্বর্য তুমার জানে সর্বজন॥
হাতিশালে হাতি পোষো ঘোড়াশালে ঘোড়া
প্রাসাদ গড়িয়াছ মণি-মুক্তা দিয়া॥
এক হস্তে অসি ধরো অন্য হস্তে অভয়
প্রজারা জপে তব নাম স্মরি বরাভয়॥
দুখীরে ত্রাণ করো বিদ্বানের পোষণ
অশিষ্টরে দমন করো শিষ্টের পালন॥
লোকে কহে তুমি ত্রাতা
প্রজারে পালন করো ধর্ম আচারিয়া॥
তুমি পিতা তুমি দাতা অখিল রুদ্রেশ্বর
পুরাও কন্যার বাসনা দীনবর॥

কন্যার স্তুতিভাষ্যে আবদারের আভাস পেয়ে রাজা মৃদু হাসে। আদুরে কন্যার চর্চিত কেশে হাত বুলায়:

কহ কন্যা কীবা চাও কী হেন বাসনা
কী সাধ জাগিছে মনে কহ প্রকাশিয়া॥
তুমি রাজ্যেশ্বরী রাজার দুহিতা
আঁখিপটে অশ্রু নাহি শোভা পায়॥
তুমি রাজকন্যা রাজরক্ত বহিছো শরীরে
পিতার অদেয় কিছু নাহি জেনো ধরাধামে॥
কহ কন্যা কহ প্রকাশিয়া কীসে মিটিবে খেদ
মলিন বদন পুনঃ হইবে প্রফুল্লা॥

একথা বিদিত স্নেহান্ধ পিতার অদেয় বলে কিছু থাকে না জগতে। ভালোবাসা এক অন্ধ দেবদূত। কন্যাস্নেহে বিবশ পিতার উদারতায় রাজকন্যা মলিন মুখ করে হাসে:

কী কহিব পিতা বাসনা সামান্য
প্রাসাদ চাহি না, বাঞ্ছা না করি রাজ-উত্তরীয়
মণি-মুক্তা চাহি না, লিপ্সু নহি রাজভাণ্ডারে॥
মার্জনা করিও পিতা, মনে না রাখিও খেদ
লোকে যেন নাহি স্মরে মোরে
রাজার দুহিতা জ্ঞানে॥

বাসনা ক্ষুদ্র পিতা মনে জাগিয়াছে সাধ
নিজ পরিচয়ে অক্ষয় থাকিব মরণের পর॥
হে পিতঃ মিটাও এবে কন্যার মনের বাসনা
হরমা নাম তব যেন অক্ষয় থাকে যুগান্তরে॥ 

খেয়ালি কন্যার আবদার শুনে পিতা হাসে:

কহ কন্যা কহ প্রকাশিয়া
কী হইলে মিটিবে বাসনা
তব নাম অক্ষয় থাকিবে যুগান্তরে॥
রাজ্য তবে লিখিয়া দেই তুমা নামে
হরমা নামে লোকে সম্ভাষিবে অতঃপর
যদি চাহ অন্যকিছু কহ প্রকাশিয়া॥

বাপের উদার সম্ভাষে কন্যা মৃদু হাসে:

রাজ্য অক্ষয় নহে নাহি রাজভূষণ
পিতা বিনে মোর রাজ্যে কিবা কাজ॥
তালুক চাহি না বাসনা নাহি রাজন্যে
মনে বড়ো সাধ ধরিব অধরারে॥

ক্ষম পিতা হেন বাসনা।
শস্ত্রে যারে বিঁধে না
কালে যারে সহজে দহে না
মনে সাধ ধরিব উহারে॥
মোর নামে উহারে যুক্ত করি
হে পিতঃ পুরাও বাসনা॥

কন্যার উদ্ভট খেয়ালে বিপাকে পড়ে রাজা। মাখার মুকুটে খানিক হাত বোলায়:

অক্ষয় কেহ নহে ভুবন পরে
রাজপাঠ অস্ত যায় রাজার প্রয়াণে
প্রাসাদ মুলুক তলায় কালের নিয়মে॥
দেহ বিগত হলে অগ্নি তারে দহে
বায়ু গ্রাস করে স্মৃতি
ভূমার আহার্য যোগায় রাজার কীর্তি॥

ঈশ্বর বিনা অক্ষয় কেবা হায় জগতে
জগদ্বিশ্বর বিনা কার সাধ্যি রুখিবে নামের পতন॥

কহ কন্যা অক্ষম পিতারে কহ প্রকাশিয়া
কী হইলে পুরিবে সাধ মিটিবে তিয়াসা॥
আমি রাজ্যেশ্বর বুঝিতে নারি তুমার বাসনা
কহ কন্যা এইবার কহ প্রকাশিয়া
কার নামে সম্ভাষিলে নাম তব অক্ষয় রহিবে জগতে॥

পিতার বিচলিত মুখপানে চেয়ে কন্যার গলা ধরে আসে। জনককে বিব্রত করার কুণ্ঠা জাগে মনে। নতমুখে কন্যা পিতাকে শুধায়:

মার্জনা করিও পিতা ক্ষম ধৃষ্টতা
এইবার কহ মোরে, -মনুষ্য কি স্বাধীন?

কন্যার প্রশ্নে বিহ্বল পিতা খানিক সময় নিয়ে উত্তর করে:

কঠিন প্রশ্ন বটে উত্তর সমধিক
তথাপি কহিব কন্যা
বুঝিয়া লও মোর বিবেচনা
মুই কহি মনুষ্য পরাধীন
জগৎপতি বিনে জগতে সকল পরাধীন॥

পিতার উত্তরে কন্যার মুখে শংসাবচন ফুটে:

যথার্থ কহিছ পিতা
বাচনে নাই খাদ
এবে কহ উহা কি স্বাধীন?

কন্যার হাতের আঙুল রাজপ্রাসাদ থেকে নিকট তফাতে বয়ে চলা নদীর দিকে ইঙ্গিত করে। হাজার বছর ধরে ওটা বয়ে চলেছে আপন খেয়ালে। ওর সাকিন সন্ধান করা গেলেও কে তারে নিয়ন্ত্রণ করে সেটা অস্পষ্ট। কে তাকে দিয়ে ভাঙা-গড়ার খেলা খেলায় তা জগদীশ্বর ছাড়া কেউ জানে না। ওর জন্মবৃত্তাত তাই প্রহেলিকার মেঘে ঢাকা। কবে কোথায় কখন ভূমিষ্ট হয়েছে সেটা ঠাহর করা অসম্ভব না হলেও দুরূহ বটে। কবে কখন মৃত্যু তাকে বিনষ্ট করবে সেটা অনির্দিষ্ট। নদীরা মরে গিয়েও কি মারা যায়? মরে যাওয়ার ক্ষণে সে শাখা নদীর মাঝে নিজেকে হয়ত রক্ষা করে চলে। লোকে তাকে নতুন নামে তখন ডাকে। এজন্য কি নদী নামটি স্ত্রীলিঙ্গ বাচক হয়? ওর কোনো জনয়িতা নেই, ও হলো জননী-প্রকৃতি। নিজেকে একা গর্ভিণী, প্রসবিনী, এবং সংহার করতে সক্ষম।

এইসব ঘোরপ্যাঁচ ভাবনা রাজার মনে খেলা করেছিল কিনা সে এখন জানার উপায় নেই। তবে কন্যার মনের ভাব রাজা বেশ আঁচ করতে পারে। মুখের রেখায় রোষের বদলে শংসা ফুটে ওঠে। নাহ, কন্যাটি আদর পেয়ে বখে যায়নি। যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে ঘটে। রাজা কন্যার প্রশ্নের জবাব করে সন্তুষ্টচিত্তে:

যথা এবে জগতের আয়ু নদেরা স্বাধীন
জগৎ লুপ্ত হলে নদে পরাধীন॥
এবে বুঝিয়াছি বাসনা,
নিজ নামে অধীন করিতে চাহ প্রমত্ত স্বাধীনারে॥

তথাস্তু! এবে হইতে নদেরে লোকে স্মরিবে কন্যা নামে।

… … …

সেই দিন থেকে এই নদীর নাম হরমা। বেটির নামে রাজা তার নাম রাখে হরমা। তথাপি যে তার নিজের ইচ্ছায় ভাঙা-গড়ার খেলা খেলে, মানুষ শত বাধার প্রাচীর তুলে যাকে দমাতে পারে না, যাকে আটক করলে বিড়ম্বনা বাড়ে ছাড়া কমে না, মরতে-মরতে নিজেকে যে বাঁচিয়ে তোলার মন্ত্র জানে, যে তার চলার পথ নিজে ঠিক করে নিতে পারে, নামের অধীন করে তাকে কি আর বশে রাখা যায়? জগতে নদী হচ্ছে ঈশ্বরের সহচর। সে ব্রহ্মা। তার নাভিপদ্মে বিষ্ণু আসন পেতেছে জগৎ রক্ষা করবে বলে। সে রুদ্রাক্ষ। রুদ্রের জটাজাল থেকে নির্গত হয়ে আজ অবধি ভাঙা-গড়ার খেলায় বয়ে চলেছে। নদীকে যে পড়তে শিখেছে তার কাছে জগতের অর্থ তাই ভিন্নরূপে ধরা দেয়। সে তখন নদীর জলস্রোতে নিজেকে ভাসায়। প্রমত্ত জলরাশিতে অবগাহন করে মনের জ্বালা ও তিয়াস মিটায়। তার সকল অহংকার তলিয়ে যায় নদীর অতলে।

স্রোতস্বিনী নদীতে অবগাহন যুগে-যুগে পুণ্য বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। যদিও অবগাহন করলেই কপালে পুণ্য জোটে না। শর্ত আছে সেখানে। নদীতে নামতে হবে অহংকারশূন্য হওয়ার বাসনা নিয়ে, এছাড়া মনের জ্বালা ও খেদ মুছবে না। নদীর বাঁও বুঝে যে অবগাহন করে নদী তাকে উজাড় করে কাছে টানে। বাঁও যে বুঝে না সে হলো ঘোর পাপী। নদী তাকে টেনে নেয় ডহরে। রাজার কন্যা হরমা ভুলটা করে সেখানে। নিজের নামে নদীকে পরাধীন করার ক্ষণে তার হয়ত বিস্মরণ ঘটে। বুদ্ধিমতি কন্যা নদীর সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে দিয়ে অক্ষয় হওয়ার বাসনা প্রকাশ করে বসে। কন্যা তার বুদ্ধির দীপ্তি দিয়ে পিতাকে চমৎকৃত করলেও নদীর মনোহরণ করতে পারে না। রাজা ওদিকে দিকে-দিকে রাষ্ট্র করে:

জ্ঞাতি রাজন্য আমত্য প্রজাকুল
এবে হইতে এই জ্ঞান রাখিও সকল
কন্যার ভূষণে হইবে নদের পরিচয়॥

প্রজাগণ শোন দিয়া মন
এবে হইতে হরমা নামে নদীরে স্মরিবে সকল॥
এবে হইতে সকলে থাকিবা সজাগ
হরমা নামে নদীরে ডাকিবে দিনমান॥

পণ্ডিত শাস্ত্রকার জ্যোতিষ বিদ্বান
রাজকবি রাজপুরোহিত রাজসেনাপতি
এবে হইতে সকলে রাখিবা স্মরণ
হরমা নামে বিদিত হইল নদীর পরিচয়॥

রাজার ফরমান প্রজার জন্য শিরোধার্য কিন্তু নদীর বেলায় সেটা খাটানো মুশকিল। নদী স্বয়ম্ভূ। সে তার নিজ ইচ্ছায় ভাঙা-গড়ার খেলা খেলে। একূল ভেঙে ওকূল গড়ে। নিজ ছন্দে ক্ষণে রজঃস্বলা হয় ও পরক্ষণে নিজেকে নিঃস্ব করে। রাজার ফরমান তাকে কী নামে রাষ্ট্র করে নদীর তাতে থোড়াই যায় আসে। সে তার আপন খেয়ালের দাস। জনপদ প্লাবিত করে লোকের অভিশাপ কুড়ায়, আবার পলির বিপুল বন্যায় ঘরে-ঘরে অন্ন যোগায়। নদী স্বেচ্ছাচারী। আপন খেয়ালের বশে দেবতা ও রাক্ষস হয়। রাজার দুহিতা বুদ্ধিতে চমৎকারা এটা ঠিক; সে নির্ভয়া তাও ঠিক; তথাপি নদী-রহস্যের কিনারা করা তারে সাজে না। যেমন সাজে না নদীকে নিজ নামে যুক্ত করে অক্ষয় হতে চাওয়ার বাসনা।

সেকালের এক ছাপোষা কবি বিষয়টি ধরতে পেরে মনে-মনে হাসে। জগতে রাজকবি ও ছাপোষায় অনেক তফাত। রাজাকে কুর্নিশ করে ছন্দ বাখান করার দায় ওর নেই। রাজার রোষানলে ভস্ম হওয়ার ভয়ে রাজকবি সত্যের ছলে মিথ্যের বেসাত করে দিনমান। ছাপোষা সেদিক থেকে স্বাধীন। তাকে কেউ পুছে না, পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত করার কথা ভুলেও ভাবে না। অখ্যাত ও নামডাকহীন হওয়ার কারণে রাজার রোষানল সহজে তাকে নাগালে পায় না। ওসব থেকে বহুদূরে জরাজীর্ণ কুটিরে বসে ছাপোষা কবি আপন খেয়ালে ছন্দের বেসাতি করে। সেরকম এক কবি রাজার ফরমান শুনে মনে-মনে হাসে আর তুষ্টি ও রোষের জগৎ থেকে বহুদূরে বসে রাজফরমানকে বিবেচনাবিদ্ধ করে:

লোকে কহে নদী লক্ষ্মীমন্তি
কবি কহে করালবদনি॥
রাজা তারে হরমা নামে জগতে প্রচারে
কবি কহে দেবাসূর তথা দিনমান তরঙ্গ তুলিছে॥

কবি ভনে রাজা সাবধান
নাম দিয়া তুমি যারে বন্দি ভাবিছ
এবে সে সংহারে তুমারে॥
করালবদনি জেনো বধিবে রাজনন্দিনী
বধ বিনে দুয়ের মিলন নাহিকো সম্ভবে॥

নিজ নামে যে নদীকে জুড়িল
ব্যাকরণ প্রমাদে নিজেরে সম্প্রদান করিল॥
রাজনন্দিনী যবে নিজ পরিচয়ে নদীরে জুড়িলা
নদীহস্তে নন্দিনী নিজেরে সম্প্রদান করিলা॥

কবি ভনে শুনে পুণ্যবান
সম্প্রদানে বিনাশ ঘটে দাতা ও গ্রহিতায়॥
হরমা নন্দিনী বিনষ্ট হইবে হরমা নদে
দুয়ে মিলে অদ্বৈত অস্তিত্বরে ধরিবে॥

দীন কবি ভনে শুনে পুণ্যবান
রাজার দুহিতা যবে হরমা নদে নামিবে
তথা হইতে নিয়তিজালে নিজেরে বান্ধিবে॥
দীন কবি ভনে সাধু সাবধান
চপলা বালিকা এবে নিজেরে বধিবে॥

কী আর কহিব দুখের বাখানি
বাসনা মিটাইতে এবে
হরমা নদে ডুবিবে হরমা নন্দিনী॥

… … …

কবেকার সেই প্রাচীন কাহিনীর মর্ম স্মরণ করে মালকিনের চোখে অশ্রু গাঢ় হয়ে জমে। তার গা ঘেষে উপবিষ্ট রুম্মানের গালে এখন আলতো টোকা দেয়, ‘বুঝলি বেটা, জন্মের পর হইতে যে স্বাধীন তারে আটকে রাখা যায় না। তোর ভাই জুম্মান স্বাধীন ছিল। ওরে কেউ আটকে রাখতে পারে নাই। ঠুসঠাস গোলাগুলির মধ্যে ওরে আমি ছুটতে দেখছি। মুক্তিরা বলে গুলি খাওয়ার পরে জুম্মান রা কাড়ে নাই। শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে নদীর ঘূর্ণিতে গিয়া পড়ছিল। নদীর স্বাধীন স্রোতে নিজেরে কবর দিল! কে জানে জুম্মান হয়ত মরে নাই। নদীর সোঁতায় ভাসতে-ভাসতে কোথাও ডেরা পাতছে। অনেক খুঁজছি ওরে। পাই নাই। জুম্মানরে আমি কেন তালাশ করি জানিস?’

মালকিনের প্রশ্নে রুম্মান শূন্য চোখ তুলে শুধায়, ‘কেন?’ উত্তর দিতে মালকিন কিছুক্ষণ দম নেয়। চোখের কোণায় লেপটে থাকা আসু মুছে গতর নড়েচড়ে বসে, ‘জুম্মানের মতো স্বাধীন আর সাহসী বাচ্চা আমি দুটি দেখি নাই। মুক্তির লগে তাল দিতে গিয়া খামোখা নিজেরে বিপদে ফেললো। শহর তো মুক্ত হয় নাই। ওইটা নামে স্বাধীন হইছে কিন্তু স্বাধীন হওয়ার অর্থ আজও বুঝতে পারে নাই। মুক্তিরা নিজেকে রক্ষা করতে পারছে কি? পারে নাই। যদি পারত শহরে শত-শত জুম্মান জন্ম নিতো। আমি তো এইখানে স্বাধীন হওয়ার কিছু দেখি না। যেদিকে যাই খালি ধুলার পাহাড় দেখি। তুই আর আমি ছাড়া কথা কওয়ার কেউ নাই। দালানকোঠায় ধুলার রাজত্ব। মানুষগুলা সাত চড়ে রা কাড়ে না। ঠেলা দিলে নড়েচড়ে বসে না। তাগো শরীরে ধুলার আস্তর পুরু হইছে। সাফ করার লোক নাই। কেউ নাই রে বেটা এই শহরে যারে দেখে মনের জ্বালা জুড়াবি। তুই আর আমি শহরে একা ঘুরি। তোরে নিয়া জুম্মানরে তালাশ করি। এ কেমন শহর বেটা! এরে জীবন বলে!

ওরা বলে জুম্মান নদীতে পড়ে মরছে। আমার বিশ্বাস হয় না। যে স্বাধীন তারে কেউ মারতে পারে না। রাক্ষুসী নদী জানে আসলে কী ঘটছে। তুই দেখিস জুম্মানরে সে ঠিক ফেরত দিবে। লে চল বেটা, নদীতে নামি। হরমা ওর স্বামীরে ফেরত অনতে ডহরে নামছিল, আমরা জুম্মানরে ফেরত নিতে সেখানে নামবো। লে চল।’

মালকিনকে নদীতে নামতে দেখে রুম্মান এই প্রথম মুখ ভেংচায়, ‘কই নামবা মালকিন? নদী তো মরা!’ ওর কন্ঠে বিদ্রূপ টের পেয়ে মালকিনের হুঁশ ফিরে। রোদের তেজ স্তিমিত হয়ে এসেছে। মৃদুতালে ধূলিঝড় অবশ্য অব্যাহত রয়েছে। হরমা আর হরমা নেই। ধু ধু বালির চরে চিকচিকে রুপা। সেই বালির নিচে অতই জলের নহর কি তবে এখনও বইছে? এটা সম্ভব; নদীরা নিজেকে লুকাতে জানে। বালিয়াড়ির নিচে জলরাশি গোপন করে হরমা হয়ত সমানে বইছে। হাজার বছরের স্মৃতি ও ইতিহাস সঙ্গী করে চিকচিকে বালু আর মিহি ধূলিকণার আড়ালে নিজেকে সে প্রবাহিত রেখেছে। এটা হলো নদীর দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় অথবা সংখ্যায় ধরে না এমন অযুত নবজন্ম।

শহরটি মাটির হাজার ফুট নিচে ধসে যাবার অপেক্ষায় কাল গুনছে। লোকে বলে মাটির নিচে সভ্যতা ঘুমায়। কথাটি মিথ্যা নয়; তবে তারা যোগ করতে ভুলে যায় মাটির অনেক নিচে নদীরাও এমন করে ঘুমায়। কোনো একদিন আচমকা ফুঁসে উঠার জন্য জলের অগাধ তরঙ্গসহ মাটির নিচে তারা ঘুম যায়। হরমা এমন এক শীতনিদ্রায় নিথর হয়ে আছে। সময় হলে ফোঁস করে জেগে উঠবে। ডহরে ঘূর্ণি তুলে জীবনের কলরব জাগাবে। মালকিনের এসব ভাবার সময় নেই। তার বয়সের গাছপাথর সে নিজে ভুলে গেছে। ঝংধরা জিপগাড়ি নিয়ে ছুটছে প্রতিদিন। রুম্মানের সাধ্য কি একরোখা বুড়িকে থামায়। এই প্রথম ধমকের সুরে রুম্মানকে সে সতর্ক করে, ‘চুপ বেটা চুপ। মনে রাখিস, যে স্বাধীন তার মরণ নাই। সে বিশ্রামে যায়। হরমা এখন ঘুমে। ও কিন্তু জাগবো। ওই দেখ ডহর। ওইখানে রাজার বেটি স্বামীরে ফেরত নিতে ঝাঁপ দিয়েছিল।’  

ইস্পাত ফলার মতো তীক্ষ্ণ রেখা হরমার মৃত বুকে এখনও জেগে রয়েছে। নদী বিশেষজ্ঞরা এটাকে ঘূর্ণি তৈরির উৎস বলবেন কি না সে তাদের বিবেচনা। মালকিনের ওতে কিছু যায় আসে না। হরমাকে সে হাতের তালুর চেয়ে বেশি চিনে। সুতরাং বুজে যাওয়া ডহর যে দাগ রেখে গেছে তাকে পাক বলতে ওর মনে দ্বিধা নেই। এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। মালকিনের কাছে এটা হচ্ছে সেই ফাটল যেখান থেকে নদী নিজের জলপ্রবাহ বারবার নির্গত করে এবং মৃত অবস্থা থেকে পুনরায় জীবিত হয়। মালকিন বিশ্বাস করে বুজে যাওয়া এই খাদ থেকে জলের আকস্মিক প্রবাহ হঠাৎ শুরু হতে পারে। কে জানে হরমা হয়ত সেই ফাটল দিয়ে আরেকবার জীবনের দিকে উত্থিত হবে। শহরকে বাঁচানোর জন্য ওর এই জাগরণ এখন বড়ো প্রয়োজন। ধূলির স্তূপ ধুয়েমুছে মানুষগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলতে এই পুনরুত্থানের বিকল্প নেই। মানুষের জীবনে নদী হলো অসীম প্রয়োজন। নদী যখন জাগে তার সঙ্গে জীবন নতুন করে জেগে ওঠে। নদীর নাম তাই জীবন হওয়া উচিত। অন্তত মালকিন এই বিশ্বাসে অটল থাকার পক্ষে।

রুম্মান মালকিনের মনের বাঁও বুঝে, ধমক খেয়ে তাই কথা বাড়ায় না। ওর গায়ের রঙ এখন মেটে ধূসর হতে শুরু করেছে। রৌদ্র বেলা শেষের আভাস দিচ্ছে গগনে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার বড়ো দেরি নেই আর। ধূলির মৃদু ঝড় কিছুটা নিস্তেজ হওয়ার কারণে দুজনে স্বচ্ছন্দে ডহরের দিকে হাঁটে। হাঁটতে-হাঁটতে মালকিন হরমা ও জুম্মানে ফেরত যায়। তার কন্ঠে এখন কুহকিনী ভর করেছে। ধু ধু বালিয়াড়ির মধ্যে কুহকিস্বর তরঙ্গ বহায়, ‘বুঝলি বেটা, হরমারে আমি দুষি না। রাজার বেটি স্বাধীন ছিল না। সোনা-রুপা-হীরা-মুক্তা তারে স্বাধীন করতে পারে নাই। বেটির মনে দুঃখের নহর ছিল। আমার মনে হয় রাজকন্যার নিজের বলে কোনো ইচ্ছা ছিল না। শখ-আহলাদ ছিল না। কেমনে থাকে? মুখ ফুটে কিছু বলার আগে বাপে-মায়ে সব পুরা করে দিলে ইচ্ছা থাকে কেমনে! ও আসলে জুম্মানের মতো জীবন পায় নাই। জীবনে ইচ্ছার গুরুত্ব কী এবং সেইটা মিটানোর স্বাদ ভোগ করতে পারে নাই। রাজার বেটি সোনার পালঙ্কে ঘুমাইছে তার বাপের ইচ্ছায়। মণি-মুক্তা গলায় পরছে মায়ের ইচ্ছায়। সদাগরের লগে ঘর করছে বাপ-মায়ের ইচ্ছায়। রাজপ্রসাদের গরাদ থিকা নদীরে দেখছে রাজার বেটির ইচ্ছা নিয়া। চাইলেও পাইক-বরকন্দাজ ও সখী ছাড়া নদীতে যাওয়ার উপায় তার ছিল না। রাজার বেটিরে রাজত্ব ও সিংহাসনের ইচ্ছা বুঝে চলতে হয়। যেমন খুশি করার অনুমতি সে পায় নাই। আফসোস!

ওদিকে জুম্মানরে তুই দেখ, সে কিন্তু নিজের ইচ্ছায় চলছে। আমি ওরে মুক্তির চর হইতে নিষেধ করছি। কথা কানে তোলে নাই। ওর মনের মধ্যে অনেক গোপন ইচ্ছা ছিল। সেগুলা সে একা পুরা করছে। কারও দিকে তাকায় নাই। রাজার বেটি অভাগী। নিজের নামে নদীরে বন্দি করার ইচ্ছা নিজে পূরণ করতে পারে নাই। বাপের পারমিশন নিতে হইছে তারে। জুম্মান পরমিশনের ধার ধারে নাই। পারমিশন জিনিসটা আমি ওরে বুঝাইতেই পারি নাই। বুঝাইতে গেলে খেঁক করে উঠতো। বেযাদবের হাড্ডি ছিল তোর ভাই! এদিক দিয়া তুই খুব লক্ষ্মী। এজন্য তোরে ভালোবাসি।

কথা কি জানিস বেটা, ইচ্ছা পূরণের শক্তি জুম্মানরে সাহসী করছে। অন্য কারও মধ্যে আমি এই তেজ দেখি নাই। নিজের ইচ্ছা ও বাছাই করতে পারত। যেমন ধর, কোনটা খারাপ আর কোনটা ভালো সেটা বুঝত। ওরে দিয়া কেউ খারাপ কাম করাইতে পারে নাই। স্বাধীন ইচ্ছার মানে কী হয় সেটা ওর মতো আর কেউ বুঝত বলে আমার বিশ্বাস হয় না। ইচ্ছা পূরণের জন্য ওরে আমি দিনরাত খাটতে দেখছি। এছাড়া উপায় ছিল না। কারণ ওর ইচ্ছা পুরা করার কেউ ছিল না। যার বাপ-মা’র খবর নাই তারে নিজের ইচ্ছা নিজে পুরা করতে হয়। জুম্মান সেটাই করছে। রাজার বেটি এই কাজটা করতে পারলে তারে এইভাবে মরতে হয় না।’

মালকিনের কথায় ছেদ ঘটিয়ে হাওয়া হঠাৎ উত্তাল হয়। বালির স্তূপে বোঝাই ডহরের সরু রেখা থেকে ধূলির ঝাপটা মনখারাপ বিষাদ নিয়ে আকাশে পাক খায়। সত্যি, হরমা নদে রাজার বেটির সলিল সমাধির ক্ষণটি বিষাদে ভারাতুর ছিল। জীবনে প্রথম রূপবতী কন্যা বাপ-মায়ের দোহাই ও নিষেধ তুচ্ছ করে ডহরে নামতে চলে। নামার আগে বাপের হাত ধরে শেষ মিনতি জানায়:

না করিও নিষেধ পিতা যাইতে ডহরে
সতী নারী পুণ্যে দুষে বাপের নিষেধে॥
ময়ূরপঙ্খী বান্ধ পিতা সোনা মুক্তা দিয়া
কন্যারে বান্ধ তব বিয়ার সাজনে॥
না দিও না দিও শাপ যাইতে ডহরে
ফিরাইয়া আনিবে কন্যা প্রাণের স্বামীরে॥

সীতাহার পিন্ধিয়াছি যাইব ডহরে
সিঁথিতে সিঁদুর দিছি ঝাঁপ দিব গহনে॥
না দিও আগল তুমি না রাখিও খেদ
সতী নারী উদ্ধারিব পতি প্রাণনাথ॥
রাখিও স্মরণে কন্যার মনের বেদন
পতিরে ডহরে নিছে সতীর কারণ॥

না দিও দোহাই তুমি না রাখিও দুখ
জানকী কভু ডরে না পাতাল প্রবেশে
স্বামী লাগি যাইবে কন্যা গহন ডহরে॥
কুলটা নহি পিতা রাখিও স্মরণ
সীতা পুণ্যে উদ্ধারিব সখা প্রাণনাথ॥

স্মরণে রাখিও পিতা হরমা বচন
পতি বিনে সতী নাহি রাম বিনে সীতা
স্বামী বিনে কন্যা জেনো হইব কুলটা॥
না করিও রোষ পিতা না দিও শাপ
হরমা নদে জুড়াইবে কন্যা মনের তিয়াস॥

স্মরণে রাখিও পিতা হরমা-বচন
জগতে অনর্থ ঘটে নামের কারণ॥
সাজাও ময়ূরপঙ্খী বিয়ার সাজনে
জুড়াই নামের জ্বালা হরমা সলিলে॥

নাম মানুষের অন্তরতম মৌলিক উচ্চারণ, যদিও জগতে সকল অর্থ ও অনর্থের মূলে নাম তার দাগ রেখে যায়। হরমার প্রমত্ত সলিলে ঝাঁপ দিয়ে রাজার নন্দিনী নামের বেদন ঘুচায়। অদ্য সে নামহীন। অথই ডহর মুছে দিয়েছে তার সকল পরিচয় ও প্রসাধন। না সে এখন রাজার দুলালী, না অক্ষয় নামের পিপাসায় কাতর রাজকন্যা। তার কোনো ইচ্ছা এখন আর নেই। ইচ্ছাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। সে এই ধূলিধসূর শহরের মতো নামগ্রোত্রহীন। হরমা নদীর ধু ধু বালুচর তাকে পাতালে গুম করেছে। রাজার নন্দিনীকে নাম-পরিচয়হীন করে নদী নিজেও নাম-পরিচয়হীন হতে চলেছে। ওর রাক্ষুসে ডহরে এখন আর স্রোতের চোরাটান নেই। রাজার বেটি হরমার নামে সংযুক্ত হরমা নদী এখন মৃত! 

… … …

মৃত সেই নদীতে মালকিনের সঙ্গে রুম্মানের কথালাপ সন্ধ্যার আবছায়া আলোয় ভূতুড়ে শোনায়। মালকিন এখনও জুম্মানে পড়ে আছে। রুম্মানকে তার ভ্রাতার ইচ্ছাশক্তির বিবরণ শুনে যেতে বাধ্য করছে, ‘শুন বেটা, জুম্মানের ইচ্ছাশক্তি ওর সাহসের কারণ ছিল। লম্বা গাছের ডালে ওরে আমি লাফ দিয়া উঠতে দেখছি। আবার ধর, উঁচা ঢাল থিকা ডিগবাজি দিয়া নদীতে পড়তেও দেখছি। কাজগুলা সহজ না। বুকে সাহস লাগে বেটা। বদ লোকের পেছনে জুম্মান লাগতো। ওর কিন্তু অনেক শত্রু ছিল। যারা ওরে দেখতে পারে না তারা ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। সুযোগ পাইলে ওরে জখম করছে। জুম্মান কিন্তু বাঘের বাচ্চা ছিল! মার খেয়ে আর মার দিয়ে শহরে নিজের জায়গা পোক্ত করছে। একবার ভাব, কত কঠিন ছিল এই যুদ্ধ! জুম্মান ওর ইচ্ছা দিয়া সব জয় করছিল।

ও একটা নদী ছিল রে বেটা। নদীর মতো নিজেরে খালি ভাঙছে আর গড়ছে। রাজার বেটি সেই সুযোগ পায় নাই। ওর নদী হওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু কেমন করে হইতে হয় সেটা জানতো না। নদীরে তাই নিজের নামে বন্দি করতে চাইছিল। কাজটা ভুল ছিল রে! যখন বুঝতে পারছে তখন সব শেষ। সে কি জানতো না ডহর যারে গিলে সে আর ফিরে না? আমার মনে হয় জানতো। কিন্তু বাপ-মা’রে সেটা বুঝতে দেয় নাই। বাপে নতুন করে ওর বিয়ের এন্তেজাম করছিল। রাজা ওর বেটির মন ধরতে পারে নাই। সে বুঝে নাই কন্যার মনে বিতৃষ্ণার মেঘ জমা হইছে। এই শহরের লোকের মনে আমি বিতৃষ্ণা জমা হইতে দেখছি। মুক্তির সংগ্রামে ওরা একদিন উতলা হইছিল। পরে মুক্তিরে ঘৃণা করতে শুরু করে। কারণ মুক্তিটা তাদের ইচ্ছা পূরণ করতে পারে নাই। কিংবা ধর, পূরণ করলেও সেটা মনমতো হয় নাই। মন বড়ো আজব চিজ বেটা। ওর নাগাল কেউ ধরতে পারে না। জুম্মান ছাড়া আমি কাউরে দেখি নাই যে জানে কেমন করে বাঁচতে হয়, ভালো-মন্দ বুঝে ইচ্ছারে বাছাই করতে হয়, এবং সেইটা পাওয়ার জন্য জান বাজি রাখতে হয়। শহরটা হয়ত সেজন্য ধুলায় ঢাকা পড়ছে। ওরে আর বাঁচানোর আশা নাই। ওসব কথা বাদ দে। লে চল ডহরে নামি। জুম্মানরে খুঁজি।’

ডহর তো এখন কেবল নামে!…আসলে ধু ধু বালুর চর। মালকিন রুম্মানকে সঙ্গে করে সেই বালুচরে বসে পড়ে। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে ছোট শাবল বের করে ডহর যেখানে ঘূর্ণির দাগ রেখে গেছে সেখানটা খুঁড়তে শুরু করে। সন্ধ্যা ক্রমে অন্ধকারে গভীর হতে চলেছে। রুম্মানের গায়ের রঙ মেটে ধূসর থেকে নিকষ কালো হতে বেশি দেরি নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে ধূলিঝড় প্রবল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওটা একবার আরম্ভ হলে অনেকক্ষণ চলবে। এখন ঘরে ফেরা নিরাপদ। কিন্তু মালকিনের আজ কী যেন হয়েছে! শাবল দিয়ে বালি খুঁড়েই যাচ্ছে। তাকে আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। রূপকথার ডাইনি হয়ে নিজের প্রাণ ভোমরা খুঁজছে। জুম্মান হচ্ছে রূপার কাঠি। সেটা না পেলে ডাইনি আজ মরবে। রুম্মান এই প্রথম মালকিনকে ভয়ে-ভয়ে শুধায়, ‘ঘরে ফিরবা না মালকিন?’ প্রিয় বেটা’র এমনধারা প্রশ্নে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। একমনে গাঁইতি চালায়, ‘না বেটা, এখন না। জুম্মানরে খুঁজতে হবে। আমি জানি এই ডহরে সে সাঁতার কাটে। ওরে পাওয়া দরকার।’

মালকিনের চোখ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে। রুম্মান ফের শুধায়, ‘জুম্মানরে কেন দরকার মালকিন? অন্ধকারে তারে তালাশ করলে কি পাওয়া যাবে? কালকে আবার খুঁজবা। এখন ঘরে চল।’ মালকিন ‘আহ’ বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে। বোঝা যায় রুম্মানের ওপর সে বিরক্ত। ওর তাড়া দেয়ার ভঙ্গি অনুমোদন করছে না। পরক্ষণে নিজেকে মোলায়েম করে প্রিয় বেটাকে বোঝায়, ‘জুম্মানরে আজ না পেলে আর পাওয়া যাবে না বেটা। অমাবস্যা নজদিক। এর আগে তারে পেতে হবে। যদি পাই তবে জিগাবো কেন সে মুক্তির দলে ভিড়ে নিখোঁজ হইছে? নিজের জীবনরে ঝুঁকিতে ফেলে সে কি কিছু পাইছে? যে জানতো কেমন করে স্বাধীন থাকা লাগে সে এই শহরের লোকেগো মুক্ত করতে কি পারছে? যারা একসময় তার ক্ষতি করতে চাইছে তাদের জন্য জীবন দিতে গিয়া কি লাভ হইছে তার? প্রশ্নগুলার উত্তর ওরে দিতে হবে বেটা।’

মালকিন ও রুম্মানের এইসব কথা চালাচালির মধ্যে শো শো গর্জনে ধূলিঝড় শুরু হয়। হরমার চরাচর জুড়ে হাওয়ার দাপট প্রবল হলে মালকিন টাল খেয়ে নিজের খোঁড়া গর্তে সুরুৎ করে ঢুকে পড়ে। গর্তের নিচে চোরাবালির ফাঁদ তৈরি হয়েছে। মৃত হরমা এখন জল নয়, চোরাবালির চুম্বকটানে মানুষ মারবে বলে পণ করেছে। মালকিনকে এভাবে গর্তের ভিতরে দেবে যেতে দেখে রুম্মানের চোখমুখ আতংক ঘনায়, ‘কী হইছে মালকিন?’ অবুঝ বাচ্চাকে কে বুঝাবে তার একমাত্র আশ্রয় সে হারাতে বসেছে। ডহর ততক্ষণে মালকিনকে গলা পর্যন্ত দাবিয়ে দিয়েছে। রুম্মানের সাধ্য নেই সেখান থেকে তাকে টেনে তোলে। চোরাবালির অতল টানে সমাধি লাভের ক্ষণে মালকিন তার শেষ বচন হাওয়ায় ছুড়ে দেয়, ‘দৌড় দে বেটা। জলদি এখান থিকা পালা। জুম্মান ডহরে নাই। তুই ওরে শহরের দক্ষিণে গিয়া খুঁজবি। ওইখানে যে পাহাড় আছে সেইখানে খুঁজবি। জুম্মানের জন্য তোরে বাঁচতে হবে বেটা। আমার কথা ওরে বলবি। লে বেটা, জলদি পালা।’

রুম্মান চিরকালের অনুগত। মালকিনের কথা তার পক্ষে ফেরানো মুশকিল। ধূলিঝড় ক্রমশ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে যাচ্ছে। নিরেট অন্ধকারে মালকিনের হদিস পাওয়া এখন আর সম্ভব নয়। হরমা নদীর চোরা ডহর শহরের সবাক মানুষটিকে গিলে খেয়েছে। এই হত্যার পর অনন্ত স্তব্ধতা ছাড়া কিছু থাকবে না শহরে।

রুম্মান কী বুঝে কে জানে। শিরদাঁড়া টান করে অ্যাথলেটের ভঙ্গি আনে দেহে। লেজ দিয়ে হরমার শুকিয়ে যাওয়া জলরেখায় সপাং বাড়ি মারে। তারপর লেজ টান করে ছুটতে শুরু করে। ডহরে তলিয়ে যাওয়ার ক্ষণে মালকিন জুম্মানকে খুঁজে বের করার দায়িত্বটি তাকে দিয়ে গেছে। মালকিন নিশ্চিত করেছে তারা দুই ভাই ছাড়া শহরে কেউ আর বেঁচে নেই। সেইসঙ্গে ওর পক্ষ থেকে জুম্মানকে এটা বলতে বলেছে, বেঁচে থাকাটা অভিশাপ হলেও যে মরেনি তাকে বাঁচার চেষ্টা বজায় রাখতে হবে। সুতরাং ওরা দুই ভাই আরেকবার চেষ্টা করে দেখতে পারে, যদি নদীর মতো স্বাধীন খেয়ালে বাঁচা যায়!

… … …

 দ্রষ্টব্য: এই কাহিনীর সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে প্রবহমান সুরমানদীর নাম পরিবর্তনের ইতিহাস যৎকিঞ্চিৎ সংযুক্ত থাকলেও লেখক এর ঐতিহাসিক সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত নন, প্রধানত কল্পনার সংশ্লেষ এই গল্পআখ্যানের উপজীব্য এবং সেভাবেই পাঠের অনুরোধ রইল। কাহিনীর প্রয়োজনে ব্যবহৃত পদ্য (উদ্ধৃতিচিহ্ন সম্বলিত ২টি পদ ব্যতীত) মৎকৃত।

Comments

comments

আহমদ মিনহাজ

আহমদ মিনহাজ

জন্ম স্বাধীনতার বছরে । লেখালেখির শুরু নয়ের দশকে, ছোটকাগজে । একসময় নিয়মিত লিখলেও এখন প্রায় স্বেচ্ছা-নির্বাসিত । যদিও মাঝেমধ্যে উঁকি মারেন ছোটকাগজ ও ব্লগে । এর বাইরে একান্ত পারিবারিক । প্রকাশনায় সক্রিয় না হলেও গান শুনে, সিনেমা দেখে ও বন্ধুসঙ্গে নিজেকে যাপনের পাশাপাশি সক্রিয় আছেন নতুন লেখার খসড়ায় । আহমদ মিনহাজ মূলত প্রবন্ধে স্বচ্ছন্দ হলেও গল্প ও আখ্যানের জগতে ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রায়শ । কয়েকটি গল্প ছোটকাগজে প্রকাশিত হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে । বাকিগুলো প্রকাশের মুখ দেখেনি আর । উল্টোরথের মানুষ তার প্রথম আখ্যান । প্রায় এক দশক আগে এই আখ্যানের চিন্তাবীজ লেখককে তাড়িত করে । অনেকটা ঘোরগ্রস্ততার মধ্যে আখ্যান-টি রচিত হয় এবং প্রকাশিত হয় ছোটকাগজে-ই । সময়ের আবর্তে ধূলিমলিন হয়ে পড়ে ছিল দীর্ঘদিন । যদিও এই আখ্যানের গর্ভে লুকিয়ে থাকা প্রাণবীজ আজো অমলিন,- আখ্যান ও প্রতি-আখ্যানের দ্বৈরথে আজ ও আগামীর পাঠকের জন্য প্রাসঙ্গিক ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি