সাম্প্রতিক

পিক্সি-ডাস্ট । কল্যানী রমা

“ঐশ্বর্য! আবার কোথায় উধাও হ’লি? সারাদিন শুধু উড়ছিস তুই! বিকালবেলা! সব বাচ্চারা মাঠে ‘ঝাঁই ঝাপ্পা কানাই মাছি’ খেলছে। সৌন্দর্য পর্যন্ত জামার সাথে মাথার ফিতা, গলার মালা সব ম্যাচ করে সেজেগুজে নীচে খেলতে চলে গেছে। উফ্, আর পারি না! সারাটা জীবন জ্বালিয়ে মারল! আমার মাথার চুল এদিকে শাদা হয়ে যাচ্ছে তোর এইসব অত্যাচারে!

এ কি! আবার স্টোর রুমে? চালের বস্তার উপর বসে এই অন্ধকারে বই পড়ছিস? চোখটা তো এমনিতেই গেছে! প্রতিদিন ছোটমাছ খাইয়েও কিচ্ছু লাভ হচ্ছে না! আর দেখি, দেখি আবার কি পড়ছিস? সব সময় খালি লোক দেখানো তোর। বুঝিস না বুঝিস ক্লাশ ফোরে বঙ্কিম রচনাবলী নিয়ে ঘুরে বেড়ালি! এমন করলেই যদি নোবেল প্রাইজ পাওয়া যেত!”

“বা রে, লোক দেখাচ্ছি কোথায়? সেই জন্যই তো এইখানে সেধিঁয়েছি। ওই সব ফালতু ‘ঝাঁই ঝাপ্পা কানাই মাছি’ টাছি খেলতে ভালো লাগে না আমার! কি না একজন চোখ বেঁধে মাটিতে আর বাকি সবাই আম গাছ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাদের ছুঁতে হবে! যত্তসব হাদারাম কতগুলো। যাও তো এখন এখান থেকে। আমাকে পড়তে দাও।”

“The fog was where I wanted to be. Halfway down the path you can’t see this house. You’d never know it was here. Or any of the other places down the avenue. I couldn’t see but a few feet ahead. I didn’t meet a soul. Everything looked and sounded unreal. Nothing was what it is. That’s what I wanted—to be alone with myself in another world where truth is untrue and life can hide from itself. Out beyond the harbor, where the road runs along the beach, I even lost the feeling of being on land. The fog and the sea seemed part of each other. It was like walking on the bottom of the sea. As if I had drowned long ago. As if I was a ghost belonging to the fog, and the fog was the ghost of the sea. It felt damned peaceful to be nothing more than a ghost within a ghost.”

মাথার উপর নিজের আকাশ, পায়ের নীচে নিজের সমুদ্র। কোথাও কোন মাটি নেই। এমন কি পায়ের নীচে বালিগুলো পর্যন্ত হলুদ রঙের কিনা তাও ভালো বোঝা যায় না। জলের উপর যে জল বাষ্প হয়ে একটু উপরে উঠবার চেষ্টা করছে, সেই কুয়াশাও রঙহীন। শুধু মাঝে, মাঝে আকাশের তারাদের ঠুকে দিলে মনে হয়, যেন অন্ধকারে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। ভুতুড়ে চকমকি পাথরের মত। সবকিছু কেমন শ্যাঁওলার মত গলে গিয়ে সারা শরীরে বৃষ্টির মত লেগে থাকে। সমুদ্রের নীচে ঐশ্বর্য একা, একা হেঁটে বেড়ায়। প্রেতাত্মার মত।

শুধু চালের বস্তার উপর একটা চল্লিশ ওয়াটের আলো হ্যারিকেনের মতই টিম টিম করে জ্বলে। পিছনের ছোট জানালাটা দিয়ে কোন আলোই ঘরে এসে ঢোকে না। ভ্যাঁপসা গন্ধ। কি জানি ইঁদুরই বাসা করেছে কি না স্টোর রুমে!

সবই সম্ভব!

স্বপ্ন ১

“কি রে মোহর? খবর কি? চল্, আজ আবার ওই ভাঙ্গা মন্দিরটায় যাই। তোর সাইকেলে পাম্প আছে তো? দুই ঘন্টা যেতে, দুই ঘন্টা আসতে লাগবে কিন্তু।”

“সারাদিন খাব কি?”
“ওহ, ওইসব নিয়ে ভাবিস না। আমি এক প্যাকেট চানা্চুর নিয়েছি আর দুটো শশা।”
“আঁধার রজনী পোহালো
জগত পূরিল আলোকে
বিমল প্রভাতকিরণে
মিলিল দ্যুলোকে ভূলোকে।”
“এ কি? ব্যাগে করে ক্যাসেট প্লেয়ার এনেছিস? সত্যি তুইও পারিস!”

“দেখ্, দেখ্, সূর্য উঠছে। আর ওইগুলো হচ্ছে সোনাঝুরি কিংবা বাদরলাঠি কিংবা সোনালু কিংবা অমলতাস। ইংরেজীতে Golden Shower tree. আসলে Cassia fistula কিংবা Indian Laburnum.

“…honey-sweet and honey-colored blossoms of a laburnum…” কি থেকে বললাম বল তো? Oscar Wilde – এর ‘The Picture of Dorian Gray!’ ”

“হ্যাঁ, I would die full of quotations…and… being zero in my brains”

“আই, একদম আমার Anne Sexton নিয়ে প্যারডি বানাবি না!”

তবু প্রায় অর্ধ উলঙ্গ বাচ্চাগুলো লাল সুঁড়কির ধূলোবালির উপর দাঁড়িয়ে চোখের সামনে এমন জলজ্যান্ত এক রোমান্টিক দৃশ্য দেখতে পেয়েও সিটি বাজায় না!

“না রে তোর সাথে কিছুক্ষণ থাকলে মাথাটাকে কেমন একদম একটা ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরীর বুক শেল্ফ বলে মনে হয়। শোন এরপর থেকে বই পড়বি মলাট ছিঁড়ে। কে লিখেছে, কি সমালোচনা কিচ্ছু আগে না পড়ে। তবেই জানবি বইটা আসলে ভালো না খারাপ।”

“সেই তো, সবকিছুতে শুদ্ধ বিপ্লব না ঘটালে আর তোর চলবে কেন? গৌতম বুদ্ধ হয়ে তো আর নিজের ধর্ম প্রচার করতে পারলি না, এখন এই সব আজগুবি কায়দা আবিষ্কার করে চলেছিস।”

“তাও তো তোরমত লোকদেখানো pseudo আঁতলামি করছি না! এসব ছাড় তো এখন! অনেক হ’ল। চল গান গাই-

‘ঘর হোক পথের পাশে
ছাদ তার দূর আকাশে’ ”

ঐশ্বর্য এক হাত দিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে। ঠাকুরমার ঝুলির নীলকমল-ও এক হাত দিয়েই সাইকেলটা চালায়। ওদের অন্য দুটো হাত কালো রঙের ভাঙ্গাচোরা পিচের রাস্তার সব ট্র্যাফিক নিয়ম ভেঙ্গে সাইকেল চালাতে, চালাতেও এক সাথে ধরা থাকে।

হঠাৎ অসম্ভব জোরে বৃষ্টি নেমে পড়ে। ছাতিম গাছের পাঁচ পাপড়ির মত পাতা এবং গাছের অর্ধেক হারিয়ে যাওয়া এবড়ো, খেবড়ো বাকল – সব ভিজতে থাকে। টপটপ করে জল ডাল থেকে পাতায়, পাতা থেকে মাটিতে পড়ে। মাটির ভিতর বৃষ্টি পড়ে ছোট, ছোট গর্ত করে ফেলে – যেন তার ভিতরই ভালোবাসার সব গল্পগুলো অনায়াসে লুকিয়ে রাখা যাবে। যে ভালোবাসাগুলো বহুদিন আগেই হারিয়ে গেছে, আর যে ভালোবাসা এখনো বেঁচে আছে। ভেজা ছাতিমের মাতাল করা গন্ধ অদ্ভুত পাগল করে তোলে! রাস্তার পাশের বাদামি রঙের ছনের ছাপড়া থেকে জবজবে তেলে ভাজা পকোরার গন্ধও ভেসে আসে।

সেই সাথে হিন্দী গান—

‘এ লাল রঙ কব মুঝে ছোড়ে গা…’

তবু প্রায় অর্ধ উলঙ্গ বাচ্চাগুলো লাল সুঁড়কির ধূলোবালির উপর দাঁড়িয়ে চোখের সামনে এমন জলজ্যান্ত এক রোমান্টিক দৃশ্য দেখতে পেয়েও সিটি বাজায় না!

দুঃস্বপ্ন ১

সোণালি কুকুর এসেছে। গোল্ডেন রিট্রিভার। সেই সাথে বাবা, মা, রজনীগন্ধা ফুল, নজরুলের অনুবাদে রুবাইয়াৎ ই ওমর খৈয়াম।

‘কারুর প্রাণে দুখ দিও না, করো বরং হাজার পাপ,
পরের মনের শান্তি নাশি বাড়িও না তার মনস্তাপ।
অমর-আশিস লাভের আশা রয় যদি, হে বন্ধু মোর,
আপনি সয়ে ব্যথা, মুছো পরের বুকের ব্যথার ছাপ।’

 

— রাজকুমার নীলকমলের বাবা এত্ত চমৎকার আবৃত্তি করে যে ঐশ্বর্য ভীষণ আশ্চর্য হয়ে যায়। নিজের বাবার কথা তো ওর মনে নেই, বাবা এমন হয় বুঝি? উফ্, কি অসম্ভব ভালো সবাই। ঐশ্বর্য একেবারে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। মা চেয়ার থেকে উঠতে গেলে বাবা এসে সকলের সামনেই মা-র হাত ধরে সাহায্য করছে। রাজকুমার নীলকমল, রাজকন্যা কঙ্কাবতী আর রাজকন্যা শঙ্খমালা তিন ছেলেমেয়ের সাথেও কি চমৎকার সম্পর্ক বাবা, মা-র! কার্ল মার্ক্সের রাজনীতি থেকে শুরু করে ‘হ-য-র-ব-ল’ – কত যে গল্প ওদের নিজেদের মধ্যে! এমন হাসিখুশী পরিবার ঐশ্বর্য জীবনে কোনদিন চোখে দেখে নি। সবকিছু একদম রূপকথার গল্পের মত!

আর ওই সোণালি কুকুরটা! আহা রে! কোনদিন ছেলেবেলাতে কুকুর, বিড়াল পুষবার পারমিশনই পায় নি ঐশ্বর্য নিজেদের বাড়ীতে! মা তো সারাদিন শাদা বিছানার চাদর, বালিশের ওয়্যার, দরজা জানালার পরদা সব মাড় দিয়ে ইস্ত্রি করে ঝুলাচ্ছিলো। কুকুর, বিড়াল বড় নোংরা করে ওইসব একদম ধবধবে শাদা কাফনে মোড়া অসম্ভব পরিষ্কার কোন বাড়ি।

তবে সিঁড়িঘরের নীচে একবার একটা বিড়াল পুষেছিলো ঐশ্বর্য। নিজের দুধ ভাত খাওয়ার সব দুধ জমিয়ে চুপি, চুপি বিড়ালটাকে খাওয়াতো। আর একবার ছিল একটা খলসে মাছ। গায়ে যেন রংধনু আঁকা। টিনের চালের স্কুলটার পাশে জমে থাকা জলে লাল, সবুজ ডোরা কাটা গামছা দিয়ে ধরেছিলো। মাছ যে কি খায় জানত তো না। প্রতিদিন দু’ চারটা ভাত আর টোস্ট বিস্কুট ভেঙ্গে খেতে দিত।

কিন্তু তবু একদিন কালি পূজার রাতে অনেক তারাবাজি পুড়িয়ে পরদিন সকালে ঐশ্বর্য ঘুম থেকে উঠে দেখে যে পেট উলটে মরে ভাসছে মাছটা। হরলিকসের কৌটা দিয়ে বানানো ঐশ্বর্যর এ্যাকুয়ারিয়ামের ভিতর!

কে জানে তারাবাজি দেখবার আনন্দেই অকালে পটল তুললো কি না! তবে বাবা মরে যাওয়ার পর সেই প্রথম লাশ দেখা! এবং ঐশ্বর্য তার পর থেকেই মাছ, মাংস খাওয়া বন্ধ করে ভেজেটেরিয়ান হওয়ার চেষ্টা করে চলেছে!

কিন্তু এখন মরা মাছের চোখ উলটানোর গল্পটা থাক। কনে দেখা চলছে।

আর সব চেয়ে বড় কথা একটা সোণালি কুকুর জুলজুলে চোখ আর হাসি, হাসি মুখ করে লেজ নাড়ছে। উফ্! এত মনে হচ্ছে একদম হাতের মুঠোয় এক রাজপুত্র আর অর্ধেক রাজত্ব! সকলের সাথে কথা বলবে কি ঐশ্বর্য? সোণালি কুকুরের সাথে হুটোপুটি করেই কেটে গেল সারাদিন ওর।

এদিকে ঘরের অন্য কোণে বাবা চুপ করে বসে আছে। ‘এ কি! প্রথম দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে সব! এত একদম আস্ত পাগল একটা! এত দূর থেকে ওকে দেখতে এসেছি আমরা! অথচ একটা কথা নেই আমাদের কারো সাথে? পুরো সময় কুকুরের সাথে খেলে সময় কাটাচ্ছে? আর ছোট বাচ্চা মেয়ে তো নয়। এক বছরের মধ্যে পড়া শেষ করে নাকি বিয়ে করে সংসার পাতবে!’

মা অন্য কোণে প্রচন্ড রকম ভুরু কুঁচকে একটা চোখ দিয়ে সরাসরি, অন্য চোখ দিয়ে একটু বাকা করে মিনিস্কার্ট পড়া, লেডী ডায়নার মত চুল কাটা এক বাঙ্গালী মেয়েকে দেখছে!

আসলে টিপ আর শাড়ি পরা শিখবার আগে থেকেই তো ঐশ্বর্য বাড়ি থেকে বহুদূরে এক অবাঙ্গালী হোস্টেলে। কিন্তু অনেক বুদ্ধি করে আজকের জন্য সবচেয়ে ভালো স্কার্টটাই তো বেছে পড়েছে ও। আর বন্ধুরা তো বললও বের হওয়ার সময়, ‘Oh Babe! You are looking Hot!’ চিন্তাহীন ঐশ্বর্য তাই প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী আর উচ্ছল!

কুকুরের সাথে হুটোপাটি করতে করতে এক ফাঁকে তবু সবকিছু ঠিক চলছে কিনা বুঝবার জন্য একটু সময় করে নীলকমলকে জিজ্ঞেসও করে ফেলে ও, ‘কি রে, তোর বাবা মা আমাকে দেখে খুশী তো?’

‘ওহ মোহর, কি যে সব বলিস? তোর মত এমন এত্ত জ্যান্ত কাউকে কেউ ভালো না বেসে পারে? সক্কলে খুব পছন্দ করছে রে তোকে!’

বিকেল পেরিয়ে প্রায় গোধূলি। কনে দেখা আলোয় ঘর ভরে গেছে।

স্বপ্ন ২

পৌঁছে গেছে ভাঙা মন্দিরের কাছে ঐশ্বর্য আর রাজকুমার নীলকমল। একটা বড় সবুজ রঙের শ্যাঁওলা পড়া দিঘী। দিঘীটার পাশেই মন্দিরটা যেন কোন অতীত থেকে হঠাৎ ভুল করে এই এখানে এসে পড়েছে। আশে পাশে ভাঙ্গাচোরা কুঁড়ে, ভাঙ্গাচোরা মানুষ, ভাঙ্গাচোরা স্বপ্ন। আর সবকিছুর মাঝে অসঅম্ভব কারুকার্য করা এক পুরাতন, পড়ে থাকা মন্দির। গায়ে কবেকার সব দেব-দেবীদের প্রেম মূর্তি করে খোদানো। বট, পাকুড়ের চারা এখানে, সেখানে।

“সাবধানে উঠে আয়। দেখিস বৃষ্টি হয়ে সব কিন্তু খুব পিছল। পা ফসকে পড়িস না যেন!” হাতটা বাড়িয়ে দেয় রাজকুমার নীলকমল। কি অসম্ভব শাদা লম্বা, লম্বা আঙ্গুল রাজকুমারের। হাতে তুলি নিয়ে ছবি আঁকলে কিংবা পিয়ানো বাজালেই মানাতো বেশী। আর হাতের পাতাও কত্ত বড়। ঐশ্বর্যর হাত আজো চার বছরের বাচ্চা মেয়ের মত ছোট, অশক্ত। ওর মনে হ’ল নীলকমলের হাতের পাতায় নিজের এজন্ম, পরজন্মের সমস্ত অস্ত্বিত্ব একেবারে নিশ্চিন্ত মনে সঁপে দেওয়া যায়।

রাজকুমারের সোনালি শরীর বেয়ে বেয়ে মন্দিরের ছাদে উঠে আসে বাদামি রঙের ঐশ্বর্য। দেখে আকাশটা কি ভীষণ নীচে নেমে এসেছে। মেঘগুলোকে ছুঁয়ে দিলে হয়ত হাত জলেই ভিজে যাবে। কে জানে হয়ত একেই স্বর্গ বলে। মন্দিরের উপরে নীচ থেকে সত্যিকার জীবনের শব্দ খুব বেশী ভেসেও আসে না । ছেঁড়া ময়লা ধুতি, ছেঁড়া শাড়ি, খিদে পেয়ে কান্নাকাটি করা বাচ্চাদের হট্টগোল সবকিছু নীচে পড়ে থাকে – জলের নীচের তলানির মত ।

ঐশ্বর্যর পরনে শ্যাওলা সবুজ আর বাদামি ডোরাকাটা শার্ট, কালো করড্রয়ের ট্রাউজার। বৃষ্টিতে সব ভিজে গেছে। রাজকুমার নীলকমলেরও সিল্কের মত এলোমেলো চুল, চোখের বড় বড় পাতা ভেজা।

“খুলে ফেল সব, ওই দিকে রোদ্দুরে ছড়িয়ে দে। বিকেল হ’তে, হ’তে সব শুকিয়ে যাবে দেখিস। আর চলে আয়, চলে আয় তো ঠিক এইখানে।” – ততক্ষণে মন্দিরের ছাদে কাঁধের ঝোলা থেকে বের করে কিছুটা শুকনো একটা চাদর বিছিয়ে ফেলেছে রাজকুমার। আর একটা চাদর মাথা থেকে পা ঢেকে দেওয়ার জন্য।

লজ্জায় চোখ বন্ধ করেও ঐশ্বর্যর মনে হয় রাজকুমার নীলকমল বুঝি কোনদিন কোন ভেসে বেড়ানো কচুরিপানার ফুল দেখে নি। কচুরিপানার বেগুনি পাপড়িও যে কেউ এত আলতো করে, এত যত্ন করে ছুঁতে পারে!

প্রথমে ঐশ্বর্য একেবারেই ভেসে যায়! তারপর কেমন যেন মনে হয় কেউ বুঝি ওর গায়ে ডুবুরি পোষাক পরিয়ে দিয়েছে। সমুদ্রের অনেক নীচ থেকে ও আস্তে, আস্তে উপরে উঠে আসছে। কেমন যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছে। জীবনে প্রথমবারের মত। কোন ফুলকা বা ফুসফুস ছাড়াই।

দুঃস্বপ্ন ২

“It was a great mistake, my being born a man. I would have been much more successful as a sea gull or a fish. As it is, I will always be a stranger who never feels at home, who does not really want and is not really wanted, who can never belong, who must always be a little in love with death.”

“আচ্ছা, দেখুন তো ডাক্তারবাবু, আপনার কি মনে হচ্ছে মেয়েটির মাথা টাথা ঠিক আছে? এইসব হচ্ছে চিঠির নমুনা! কে জানে নিজেই লিখেছে নাকি কারো ইংরেজী লেখা থেকে টুকেছে! একটাই ছেলে আমার! ছেলেবেলা থেকে কেমন বউ আনব সব ঠিক – কত স্বপ্ন!” ছেলেটির বাবা বলে।

একদম পরিচয়ের শুরুতে রাজকুমার নীলকমলকে লেখা ঐশ্বর্যর এক ব্যাগ বোঝাই চিঠি নিয়ে বসে আছে খুবই উদবিগ্ন দুই বাবা, মা ।

“আর দেখতেও এমন কিছু সুবিধার না! বেটে, খাটো, কালো রঙ! দেখতে ছোটখাট হ’লে কি হ’বে। আসলে বয়সে আমার নীলকমলের থেকে এক বছরের বড়ও। এদিকে আমার ছেলেটাকে তো দেখেছেন। লম্বা, ফর্সা, টিকালো নাক। কেউ বাঙালিই বলবে না। রাজপুত্রের মত চেহারা। একদম মানাবে না আসলে!” মা যোগ করে।

“আরে আমি আপনাদের কিচেন গার্ডেনের বাঁধাকপি না কি? অর্ডার দিয়ে গজাবেন, অর্ডার দিয়ে কাটবেন আর আলু মিশিয়ে সরস্বতী পূজার ওই খিচুড়ির সাথে দেওয়ার ঘন্ট বানাবেন?” – ঐশ্বর্যর গলার স্বরটা শুধু কেউ শুনতে পায় না।

বাইরে তখন লাল রঙের কৃষ্ণচুড়া আর হলুদ রঙের রাধাচূড়া ফুটে আছে। বৈশাখ মাসের ঝলসানো রোদ চারদিকে। উত্তর কোলকাতার সাইকাট্রিস্টের চেম্বারটা আসলে ঠিক কোথায়, এবং কার যে আসলে তা প্রয়োজন – সেটাও খুব ভালো বোঝা যায় না। তবে মেয়েদের শরীরের রূপ দেখে মুগ্ধ এ সমাজের যে নয়, সে কথা নিশ্চিত। কেননা রোদ হলেও চোখ দিয়ে তো আসলে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

স্বপ্ন ৩

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ধানক্ষেতের পাশে একটা ছোটমত পড়ে থাকা ঘর। শাদা রঙ। দেয়ালে অনেক ইঁট বেরিয়ে গেছে। রাজকুমারের হাত একটা একটা করে ঐশ্বর্যর শার্টের বোতাম খুলতে থাকে। সব পাঁজরগুলো খুলে ফেলে বেগুনি আলোয় রাজকুমারের চোখ ঝলসে যায়। এবড়ো খেবড়ো বাদামি-কালো জিওড পাথর ভাঙলেও ভিতরে অমন ঝিকিমিকি ক্রিস্টাল পাওয়া যায় বুঝি!

সাইকেল দু’টো আবার চলে। হঠাৎ বাম দিকে তাকিয়ে ঐশ্বর্য দেখে রাজকুমারের পাঞ্জাবীটার বুকের কাছে উপরের দু’টো বোতাম খোলা। ঐশ্বর্যর হাত পা অবশ হয়ে আসে। ‘তোকে চাই, এক্ষুনি!’

ওরা নেমে পড়ে পাশের নদীটার পাশে। চরের উপর সাইকেলগুলো ছুঁড়ে ফেলে বালুর উপরই শুয়ে পড়ে। আকাশের মত উপুড় হয়ে একজন আর একজনকে ঢেকে দেয়। সূর্য ডুবতে থাকে। তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলে উঠে। দিন ফুরানো শাঁখের শব্দে সব মানুষেরা ফিরে যেতে থাকে – তাদের মানুষীদের কাছে।

নদীর জলের ছলছল শব্দে আগের জন্মের গান শোনা যায়। ঐশ্বর্যর চোখের পাতা প্রজাপতির পাখার মত কাঁপতে কাঁপতে রাজকুমার নীলকমলের চুল, চোখ, ঠোঁট ছুঁয়ে পায়ের পাতায় গিয়ে থামে।

রাজকুমার নিজের দুই হাতের ভিতর ঐশ্বর্যর মুখটা ধরে এমন ভাবে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে যে মনে হয় ও বুঝি Monet র ছবির সেই ছোট ছেলেটাই হয়ে গেছে। সূর্যের আলোয় ঘর এত ভেসে যাচ্ছে যে ছেলেটার শরীরটা ছায়ার মত দেখায়। মাথার উপর একটা ঝাড়বাতি। ঝাড়বাতিটা জ্বলছে না। তবু ছবিটার সামনের দিকে দরজার কাছে সোনালি, হলুদ, লাল রঙের ছড়াছড়ি।

নদীর হাওয়ায় কেমন শীত, শীত করে।

দুঃস্বপ্ন ৩

রাজকুমার নীলকমলের বাবা, মা, দুই বোন কঙ্কাবতী, শঙ্খমালা আর ঐশ্বর্য সবাই এসেছে মেলায়। নাগরদোলার নীচে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। বনবন করে ঘুরছে নাগরদোলা। জীবনের সব আনন্দ যেন এক মুহুর্তে প্রচন্ড হুল্লোড় করে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছেড়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে। নাগরদোলার নীচে বসে কেউ কি কখনো পা ছড়িয়ে কাঁদে?

ঐশ্বর্যকে উজ্জ্বল কমলা রঙের শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে রাজকন্যা কঙ্কাবতী আর শঙ্খমালা। বড় ভালো মেয়ে ওরা। রাজকুমার মরা বিড়াল ভালোবাসলে কঙ্কাবতী, শঙ্খমালাও ভাবতে বসে এবার কি করা যায় মরা বিড়ালের জন্য। দাদা বলে কথা!

বাবা, মা সকলে তাকিয়ে দেখছে কেমন দেখাচ্ছে ঐশ্বর্যকে রাজকুমারের পাশে। ভালো যে নয় সে তো কোন রঙ দেখতে না পাওয়া রাস্তার নেড়ী কুকুরটাও একবার লেজের মাছি তাড়িয়েই বলে দিতে পারে। আসলে শাড়ি পড়ে খুবই জুবুথুবু হয়ে হাঁটছে ঐশ্বর্য। ছেলেবেলায় পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পঁচিশে বৈশাখ আর একুশে ফেব্রুয়ারি ছাড়া শুধু, শুধু তো শাড়ি পড়বার, টিপ পড়বার সুযোগ হয়নি ওর। তাও নিজেদের বাড়ি পুরো শরীর দেখা যায়, এমন আয়নাই ছিল না ওদের। পড়াশোনা বাদ দিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকা আবার কি? মার কড়া শাসনে দাদুর দাড়ি কাটবার একটা আট ইঞ্চি সাইজের আয়নাতে মুখ দেখেই বড় হয়েছে ঐশ্বর্য। মেয়ে হলেই যে চোখে কাজল পড়ে অন্যদের মুগ্ধ করতে হয়, কোনদিন শেখেনি তো!

আসলে বুনো কলমিলতার মত এক মেয়ে ঐশ্বর্য। বাতাস হলে এমনিই ও হেলে পড়ে- জলের উপর। আর জ্যোৎস্না রাত হ’লে গান গায় চাঁদের সাথে। ভোরের শিশিরে পা ধোয়। রাতের বৃষ্টিতে স্নান করে শন্ শন্ বাতাস ছুঁয়ে ভাঁটফুল ছিঁড়ে মাথায় পরে।

আর কে জানে হবে হয়ত, খুব ছেলেবেলায় যাদের বাবা মরে যায়, তারা হয়ত কোনদিনই শিখে ওঠে না যে আসলে প্রেমের একটা বড় অংশ থাকে বন্ধ দরজার ভিতর! ওদের বাড়ি কোনদিন ঘরের কোন দরজাই তো বন্ধ হ’তে দেখেনি ঐশ্বর্য! সাতাশ বছর বয়সের বিধবা মা কাকে নিয়ে দরজা দেবে? কার জন্য গয়নাগাটি পরবে? পায়ে আলতা পরে সাজবে? শাড়ির রঙ সব শাদা!

কিন্তু এখন ওইসব সাজগোজের গল্পগুলো বরং থাক। সবাই নাগরদোলায় উঠে পড়ছে।

অথচ নাগরদোলা দেখলেই ঐশ্বর্য একদম ফ্যাকাশে হয়ে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে। এবারও ওর পুরো জীবনটা ওই নাগরদোলার ঘূর্ণির সাথেই ঘুরতে থাকল। তারপর ঘুরতে, ঘুরতে এক পাক খেয়েই ঐশ্বর্য ঝরা পাতার মত ঝরে পড়ল। অন্যরা আবার শুন্যে উঠে গেল। এবং বাতাস থেকে রাজকুমারের বাবার গলা চানাচুর খাওয়া শেষের খালি ঠোঙ্গার মত ভাসতে, ভাসতে ঐশ্বর্যর সামনে এসে একদম হুমড়ি খেয়ে পড়ল। “যে মেয়ে নাগরদোলায় উঠতে পারে না, সে কি ভাবে জীবনে অন্য কাউকে সুখী করবে?”

পকেট হাতড়াতে থাকে ঐশ্বর্য। এক কোণে অল্প একটু ছেলেবেলার সেই ‘পিক্সি-ডাস্ট’ খুঁজে পায়। ও আবার উড়তে থাকে। তবে টিঙ্কার-বেলের মত, পিটার প্যানের মত, সিগালের মত… হারিয়ে যাওয়া ভো-কাট্টা ঘুড়ির মত।

সন্ধ্যাবেলা আরেক পরীক্ষা। পোলাও রান্না হবে। রাজকুমারের মা বলে,“যাও তো মা, একটু দারচিনি আর এলাচটা ছেঁচে দাও তো!” শিলপাটার দিকে তাকিয়ে যে কোন নতুন কিছু শিখে ফেলবার অসীম আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে ঐশ্বর্য,“এটার কোনদিকটা সোজা আর কোনদিকটা উল্টা?” একটা বাঙালি ঘরের কলেজ পড়া মেয়ের এমন প্রশ্ন খুব মর্মান্তিক হ’লেও আসলে ঐশ্বর্য রান্নাঘরে ঢুঁ মারেনি জীবনে কোনদিনই কোন সুকাজে। দাদু সারাদিন বলে চলেছে,“তোর দিদা এত্ত ভালো রান্না করে! সে খেয়ে জিভ তৈরী কর! পরে যখন দরকার পড়বে, অনায়াসেই রাঁধতে পারবি। মেয়ে হয়েছিস বলেই সেলাই-ফোঁড়াই শিখে, ডাল-ভাত রান্না শিখতে হবে না এখন। গিয়ে অঙ্ক-ফিজিক্স পড়। সময়টা কাজে লাগা!”

কিন্তু সময়ের কাজ সময়ে না শিখলে অমনই তো হয়! ঐশ্বর্যর মত ডিম পোচ করতে গেলে ডিমের খোসাটা পড়ে ফ্রাইং প্যানের ভিতর, আর কুসুমসহ বাকি সব ডিম মাটিতে!

প্রতিদিনের জীবনে চালের কাঁকড় বাছাটাই শেষ পর্যন্ত মানুষের সর্বশেষ ব্যস্ততা! এবং ভাতের চাল চালই, জুঁইফুল তো আর নয়!

স্বপ্ন ৪

ধড়ফড় করে ট্রেনের হুঁইসেল আর হুঁশ হুঁশ শব্দে উঠে বসে ঐশ্বর্য।

প্রথমে ভালো বুঝতেই পারে না ও কোথায়। মাঝরাত। টিমটিমে কেরোসিনের বাতির মত আলো চারদিকে। ছায়া ছায়া মত অনেক, অনেক লোকজন ঘোরাঘুরি করছে চারদিকে। এমনকি বাদামভাজা আর ভেলপুরীওয়ালাও।

আসলে ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে মাটিতে শুয়ে আছে ওরা সবাই। একটু শীত, শীত করছে দেখে ঐশ্বর্য পড়ে নিয়েছে রাজকুমারের হলুদ, কালো বাটিকের ছোপ ছোপ ফুলস্লীভ শার্ট। সারাদিন অনেক সাইকেল চালিয়েছে সকলে। খড়গপুর থেকে উড়িষ্যার বালিয়াপালে চলেছে মিসাইলের বিরুদ্ধে মিছিল করে।

রাজকুমার আলোর পাখি। জীবনের ট্র্যাপিজে অবাক ভারসাম্য নিয়ে সবসময়ই দক্ষ পায়ে দড়ির উপর দিয়ে ও চলেছে। ঐশ্বর্যর কাজ শুধু নিশ্চিন্তমনে রাজকুমারের হাতদু’টো ধরে শূন্যে সমস্ত শরীর ভাসিয়ে বাতাসের ভিতর ঝুলে থাকা!

দলবল নিয়ে নীলকমল সব সময়ই ছুটছে। আর ঐশ্বর্যও কিচ্ছু না বুঝেই ওদের পিছু, পিছু।

রাজকুমারের দলের মনের ভিতর আজও নকশালবাড়ি ছড়িয়ে আছে। সমাজের সাথে সংযোগহীন, বাবল্ড়্যাপে মোড়া যে কলেজটায় ওরা পড়ে, সেখানে মিটিং, মিছিল এক্কেবারে নিষিদ্ধ।কলেজের সব দেওয়াল, লিখনহীন হলুদ!

তবু রাজকুমারের দল লুকিয়ে, লুকিয়ে মিটিং করে। নিজেদের ঘরের দেওয়াল জুড়ে লাল বিপ্লবের ছবি এঁকে রাখে। ঐশ্বর্য অনেক শক্ত রাজনৈতিক তত্ত্ব কিছুই বুঝতে পারে না, তবু সবখানেই রাজকুমারের হাতটা ধরে ও বসে থাকে। রাজকুমার নীলকমলের সাথে গ্রামে, গ্রামে পথ নাটক করে ফেরে। আগুনের লাল শিখার মত নাটকের শেষ দৃশ্যে ঐশ্বর্য যখন ঘুরে, ঘুরে নাচ করে –

‘নিভন্ত এই চুল্লীতে মা একটু আগুন দে
আর একটু কাল বেঁচেই থাকি বাঁচার আনন্দে…’

তখন মনে হয় সত্যিই বুঝি পথের উপর ঘর বাঁধা ওই সব হতভাগা লোকগুলোকে খবরের কাগজের ঠোঙ্গা করেই স্বপ্ন বেচে ফেলবে ও। যে স্বপ্ন ঝরে গেছে এবং যে স্বপ্নের কোনদিন জন্ম হয়নি।

স্বপ্ন এবং শপথ ফেরি করা সত্যিই এক ভীষণ তেজী নেশা!

দুঃস্বপ্ন ৪

গত তিনমাস ধরে প্রতি রাত কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ছাদে কাটাচ্ছে ঐশ্বর্য রাজকুমারের সাথে। কোনভাবেই একা থাকা ওর আর সম্ভব না। কিন্তু কে ওদের ঘর দোর দেবে? পৃথিবীটা ঠিক অতটা উদার না।

যখন ছাদের উপর ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ে, ঝড় ওঠে, তখন ওরা ছাদের জলের ট্যাঙ্কের নীচে গিয়ে ঢোকে। শ্যাঁওলা পড়া ছাদ। ছাদ বেয়ে যে কোন সময় যে কেউ উঠে আসতে পারে। ধরা পড়লে কলেজ থেকে বেরই করে দেবে। কে জানে হয়ত জেলেই রাখবে!

ঐশ্বর্য বলে, ‘জানিস কাল রাতে তোর মাকে স্বপ্নে দেখেছি। আমি কেমন যেন হসপিটালে। খোদাই মালুম কেন। কিন্তু আমি নাকি মরতে বসেছি। অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে রেখেছে। কিন্তু জানিস দেখলাম তোর মা এসে আমার মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্কটা যেন সরিয়ে দিল। কাঁচি দিয়ে সব নলটল কেটে ফেলল। আমি মরে গেলাম।’

‘উফ্, এমন পাগলপারা হয়ে সারাক্ষণ কষ্ট পাস নাতো। নিজের মনে এইসব আর বানাস না। বাবা, মা তোকে ভালোবাসে তো।’

নিজের বাবা-মার পাপ বলা তো যায় না। লুকিয়ে রাখে, সব চোখের জল লুকিয়ে রাখে রাজকুমার। গুনগুন করে গান ধরে, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে, জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে…’

শুধুমাত্র এই একটি রবীন্দ্র সংগীত গায় রাজকুমার। আসলে রবীন্দ্র সংগীত একদম ভালোবাসে না ও। কোন চোখের জলই নয়। ওর গলায় সব সময় তো বাজছে কেবল ওইসব ‘মে দিনের শিকল ভাঙ্গার গান!’

ঝড়বৃষ্টি বাড়তে থাকে। কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ছাদে ফেলে রাখা নানা এসিড আর কেমিক্যালের উপর বৃষ্টির জল পড়ে হলুদ, সবুজ, শাদা, কমলা আগুন জ্বলে ওঠে। এমন ভৌতিক আলেয়া কোনদিন দেখেনি ওরা দু’জন। তবু অরোরা বরিয়ালিস দেখে চোখ বন্ধ করে থাকবে, চোখের পাতার ভিতর তো ওতটা অন্ধকারের চুম্বক নেই ওদের!

স্বপ্ন ৫

তারপর কিভাবে যেন কে একটা দয়া করে ওদের একটা ঘর ভাড়া দিয়ে ফেলে। দেওয়াল থেকে চুন সুঁড়কি সব খসে পড়ছে। তবু সে ঘরের ভাড়াই মাসে পাঁচশ রুপি।

অবশ্য রাজকুমার কাছে থাকলে সব কিছুই ঐশ্বর্যের রাজপ্রাসাদ বলে মনে হয়। ও ক্যালেন্ডার কেটে কেটে দেওয়ালের সব খসে পড়া চুন-সুঁড়কি, লাল ইঁটের পাঁজর মাতিস আর সেজানের ছবি দিয়ে ঢেকে দেয়।

ইঁট জড়ো করেই টেবিল করে। স্যুটকেস থেকে বের করে দেশ থেকে আনা নিজ মার একটা তাঁতের শাড়ি দিয়ে টেবিলক্লথ বানায়। ভাঙা কুঁড়েকেও না সাজিয়ে ঐশ্বর্য ভাত খেতে পারে না তো। পুরোনো কফ্ সিরাপের খালি বোতলে মাঠ থেকে ঘাসফুল নিয়ে এসে সাজিয়ে রাখে।

এমন সংসার পেতে বসে যে মনে হয় প্ল্যানচেট করে বুঝি ছেলেবেলার রান্নাবাটি খেলবার দিনই সব ডেকে এনেছে। সোনাঝুরির বাঁকানো ফল দিয়ে তেঁতুল; ইঁট দিয়ে ঘসে ঘসে হার্ট শেপের লুচিপাতাকে একদম ট্র্যান্সপারেন্ট করে ঘিয়ে ভাজা লুচি; আগাছার ছোট, ছোট সবুজ ফলগুলো দিয়ে বেগুন। এই নাম না জানা আগাছাটা ভারি অদ্ভুত। বেগুনি রঙের ফুল হয়। ভিতরটায় হলুদ রেণু। এমন দয়ালু এবং প্রয়োজনীয় গাছ সচারচর চোখে পড়ে না। সবুজ রঙের ফলগুলো অনায়াসে রান্নাবাটি খেলবার বেগুন হয়, পেকে লাল হয়ে গেলেই সেই একই ফল আবার টম্যাটো!

ভাঙা বাড়ির ছাদে উঠে রাজকুমার আর ঐশ্বর্য মিল্কিওয়ে দেখে। পেঁয়াজের খোসার মত একটার পর একটা গোলাপি স্বপ্ন খুলতে থাকে। পাশের সালুয়ার জংগল আর ক্যানেল পাড় থেকে কিসের যেন সোঁ সোঁ শব্দ ভেসে আসে। ঐশ্বর্য পাশে আঙ্গুলে আঙ্গুল পেঁচিয়ে বসে থাকা রাজকুমারের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে অনেক যেন কমলা রঙের আলো। জলের ঢেউ-এর মত কাঁপা কাঁপা। রাত শেষ হয়ে ভোর হয়ে গেছে।

দুঃস্বপ্ন ৫

আজ প্রথমবারের মত ঐশ্বর্যের সংসারে আসবে রাজকুমারের বাবা, মা। গত সাতদিন ধরে এই ভাঙা বাড়িই ঘষে মেজে এত্ত ঝকঝকে করে ফেলেছে ঐশ্বর্য যে সত্যিই মেঝেতে মুখ দেখা যাবে। আজকাল রান্নাবান্না করতেও শিখে গেছে ও।

রাত তিনটা থেকে রাঁধছে ঐশ্বর্য। এমন কিছু পয়সাপাতি রোজগার নেই ওদের। একদিনেই তবু সব উড়িয়ে দেবে এমনই পণ করে বসেছে আজ ও। বাবা, মা বলে কথা। মুগ্ধ করেই ছাড়বে তাঁদের ঐশ্বর্য।

কুমড়ো ফুলের বড়া, নারকেল দেওয়া ছোলার ডাল, শুক্তো, মোচার ঘন্ট, পাঁচমিশালি লাবড়া, কেঁচকি মাছের চচ্চড়ি, পাবদা মাছের জিরে দিয়ে ঝোল, চিংড়ি মাছের মালাইকারী, সরষে ভাপে ইলিশ, ভাত, কাচ্চি বিরিয়ানী, খাসির কষা মাংস, মাছের চপ, কোর্মা, রেজালা, রসগোল্লা, দই, পানতোয়া, আমের চাটনি সব রেঁধে বসে আছে ঐশ্বর্য।

রাজকুমারের বন্ধুদের মাঝে ঐশ্বর্যর হাতের রান্নার খুব সুনাম আজকাল। আসলে রাজকুমারের জন্য যে কোন সময় খোলা তরবারির উপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যেতে পারে ঐশ্বর্য। আর সামান্য রান্নাবান্না শেখা তো তুচ্ছ ব্যাপার।

ঠকঠক করে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। ঐশ্বর্য পড়িমড়ি দরজা খুলতে যায়। লাল রঙের শাড়ি পরে মাথায় বেলীফুল দিয়ে সেজেছে ও। কি মিষ্টি যে লাগছে, রাজকুমার চোখই ফেরাতে পারছে না!

তবু নীলকমল বলে, ‘তুই দরজা থেকে দূরে সরে দাঁড়া মোহর। আমি খুলছি। কিচ্ছু বিশ্বাস নেই। ওরা তো তোকে মেরে ফেলবার জন্য গুন্ডা ভাড়া করেছিলো। কে জানে তুই দরজা খুলতে গেলে এসিডই ছুঁড়ে মারে কিনা!’

রাজকুমারের এই সবসময়ের সতর্কতা আর ভয় দেখে হেসেই বাঁচে না ঐশ্বর্য। তবু কথা শোনে।

নাহ্ কোন অঘটন ঘটে না। বাবা, মা ঘরে ঢোকে।

ওদের ঘরদোর এত্ত সুন্দর লাগছে আজ যে প্রশংসা শুনবার জন্য মুখিয়েই থাকে ঐশ্বর্য। আর রাজকুমারের মা ঘরটা ঘুরে ফিরে দেখে শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘষে নীল রঙ্গের জলের ফিল্টারের ঢাকনার উপর থেকে ধূলো খুঁজে বের করে।

ঐশ্বর্য যে রান্নাবান্না, ঘরকন্না কিছুই পারে না সেতো সবাই জানে। তাই বিপদ বাঁচাতে স্টেনলেস স্টীলের টিফিন বক্স করে শুকনো আটার রুটি আর আলুভাজা নিয়ে এসেছে ওরা। ঐশ্বর্যর রান্নাবান্না খাওয়ার টেবিলের উপর ধাক্কাধাক্কি করে যেন এক ট্র্যাফিক জ্যাম করে ফেলে। রাজকুমারের বাবা, মা কিচ্ছু একবারও মুখে ছুঁয়ে দেখে না। শুকনো রুটি আর ঠান্ডা আলুভাজা খেয়েই ওরা পেট ভরায়।

তারপর রাজকুমারের জিনিষপত্র বেঁধে ছেঁদে বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা ম্যাটাডোরটাতে রাজকুমার সহ সব তুলে ঐশ্বর্যকে একা ফেলে রেখে সবাই উঠে পড়ে। ওরা চলে যায়।

হতভম্ব ঐশ্বর্য কি করবে কিচ্ছু বুঝতে পারে না। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে। একটা রিক্সাতেই উঠে বসে ও। রিক্সাওয়ালাকে বলে, ‘আজ সারারাত আমাকে রিক্সাতে করে ঘোরাবে, দাদা? তুমি যত রুপায়া চাও দেব।’

রিক্সাওয়ালাটা বড় ভালো মানুষ। এক পয়সা না দিলেও ও হয়ত আজ ঐশ্বর্যর কথা শুনত।

সালুয়ার বন, গোলবাজার, পুরীগেট, চাঁদনীর মাঠ সব ঘুরে বেড়ায় সারারাত ধরে ঐশ্বর্য। চাঁদনীর মাঠ এতই ভয়ানক যে দিনের বেলাতেই ওখানে মানুষ খুন হয়ে যায়, মেয়েদের নামিয়ে রেপ করে ফেলে। তবু কেউ ঐশ্বর্যর একটা চুল পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখে না।

রিক্সাওয়ালা সারা রাত নিজের জীবনের নানা সুখ, দুঃখের কথা বলে চলে। ঐশ্বর্য সব গল্প শোনে আর পুরো রাত ধরে কাঁদে।

ভোরের দিকে রিক্সাওয়ালা বলে, ‘দিদিমণি, আপনার মত মানুষ হয় না! আমার মত মানুষের সুখ দুঃখের কথা শুনে আপনি এমন করে কাঁদলেন! ভগবান আপনাকে অনেক সুখী করবে, দেখবেন!’

তারপর কিভাবে কিভাবে যেন অনেক, অনেক বছর কেটে যায়। কারণ ছাড়াই একসময় দুঃস্বপ্নগুলো শেষ হয়ে যায়। কে জানে শুধু সময় হয়ে গেছে বলেই হয়ত।

একটা ট্রেন এসে থামে। ঐশ্বর্য আর রাজকুমার নীলকমল পড়িমরি ট্রেনটাতে উঠে পড়ে। রাতের ট্রেন। একটাই বার্থ পেয়েছে দুইজন। ঐশ্বর্য যে দিকে মাথা দেয়, রাজকুমার সেদিকে পা আর ঐশ্বর্যর যে দিকে পা , সে দিকে রাজকুমারের মাথা। এভাবেই দু’জন মানুষ একটা ছোট বার্থে শুতে পারে।

রাজকুমার বলে, ‘দেখেছিস মোহর! কেউ কিন্তু আজকাল আর আমাদের দিকে চোখ বড়, বড় করে তাকিয়ে থাকে না। আমি মনে হয় আসলে তোর শরীরের চামড়ার মত হয়ে গেছি, আর তুই আমার। এত বেশী অভ্যস্ত দু’জন দু’জনকে নিয়ে যে ইচ্ছে করলেই এখন পাশাপাশি শুয়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়তে পারি। মনে আছে আগে কেমন কক্ষণো ঘুমাতে পারতাম না! সারা রাত আর সারা দিন জেগে থাকতাম!’

অল্প হাসে ঐশ্বর্যও। রাজকুমার নয়, নিজের চাদর নিজেই টেনে নিয়ে মাথা পর্যন্ত ঢেকে দেয় ঐশ্বর্য। শুধু অল্প একটু ফাঁক রাখে চোখদু’টোর জন্য। উঁকি মেরে দেখে ট্রেনলাইনের পাশে যতদূর চোখ যায় অনেক যেন জল। আর জলের উপরে অসম্ভব বড় একটা সোণালি-লাল মত চাঁদ। শাদা রঙের শাপলা ফুটে আছে। শাপলাগুলো বেশী শাদা না চাঁদটা – কিছুতেই তা ও বুঝে উঠতে পারে না। ঐশ্বর্যর মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করতে থাকে। মনে হয় শুয়ে থেকেও ও বুঝি অজ্ঞান হয়ে যাবে।

চোখের উপর বহুদিন পরের একটা ছবি ভেসে ওঠে।

ঐশ্বর্যর বাগান। অনেক শাদা মিল্কউইড ফুটে আছে। মনার্ক বাটারফ্লাই আসবে। আর তারপর বরফ পড়বার আগে মনার্ক বাটারফ্লাই আবার মেক্সিকো ফিরে যাবে। কিন্তু মিল্কউইড ছাড়া অন্য কোন পাতা খেলেই তো মনার্ক ক্যাটারপিলার মরে যায়!

রূপকথা আর গল্প খুব দৌড়াদৌড়ি করে ছুটে আসছে।

‘মা, মা, দেখে যাও। স্টিঙ্কবাগ তোমার সব ক্যাটারপিলার খেয়ে ফেলছে!’

ঐশ্বর্য তাড়াতাড়ি কোনমতে দু’টো মনার্ক ক্যাটারপিলার বাঁচাতে পারে। ঘরে নিয়ে এসে একটা নেটের ঘর করে ওদের রাখে। দিনে তিনবার মিল্কউইড এনে ক্যাটারপিলারদের খেতে দেয়। একসময় দু’টো ক্যাটারপিলারই ক্রিসালাস তৈরী করে। একদম ভিতর পর্যন্ত দেখা যায় এমন স্বচ্ছ সবুজ অদ্ভুত কচিকলাপাতা রঙ। মাথার কাছে একটা করে সোণালি রিং- যীশুর মাথার হেলোর মত। একসময় সবুজ ক্রিসালাস রঙ বদলে কালচে বাদামি হয়। আর তারপর একটা ক্রিসালাস থেকে এক মনার্ক বাটারফ্লাইও বের হয়ে আসে। সোনালি-বাদামি আর কালোর মেশামিশি। স্বপ্নের মত আলোকিত। এবং জীবনের মত উজ্জ্বল।

বাইরের বেগুনি-গোলাপি নিউ ইংল্যান্ড এস্টারের মাঝে তাকে উড়িয়ে দেয় ঐশ্বর্য। মনের ভিতর হুড়মুড় করে বৃষ্টির পরের সব কাগজের নৌকা ভাসানো ছেলেবেলা যেন ফিরে আসে। নিজের মরা ঈশ্বরের কাছে প্রানপণ প্রার্থনা করে চলে, “ঠাকুর, প্রজাপতিটাকে পৌঁছে দাও গরমের দেশে!” ঐশ্বর্যর পৃথিবীতে তখন পাতারা সব কমলা, হলুদ, লাল হয়ে ঝরছে। বরফ উড়বার সময় হয়ে গেছে।

অন্য ক্রিসালাসটার পাশে ঐশ্বর্য আরো কিছুদিন বসে থাকে। সকাল, দুপুর আর রাতে অপেক্ষার রঙ বাদামি থেকে কালো হয়ে যায়। তবু ঠিক একইভাবে ক্রিসালাসটা ঝুলতে থাকে। তা থেকে কোন সোনালি-বাদামি প্রজাপতি বের হয়ে আসে না। কে জানে হয়ত কোকুনের স্বাচ্ছন্দেই ওর নিঃশ্বাস নেওয়ার সব বাতাস শেষ হয়ে গিয়েছিলো! কিংবা হয়ত ভুল করে মিল্ক উইড ছাড়া অন্য কোন পাতা খেয়ে ফেলেছিলো। কলাপাতা সবুজ-হলুদ আর কালো ডোরাকাটা মনার্ক ক্যাটারপিলার তো তাতে বাঁচে না! কোকুনের বাইরে বের হয়ে সে আর কোনদিন ওড়ে না!

মনে পড়ে ছেলেবেলার সেই খলসে মাছটার কথা। মাছটার গায়ের উজ্জ্বল কমলা-লাল, সবুজ-নীল রং ফ্যাকাশে হতে হতে কেমন ধীরে ধীরে জলের রঙের মত, সন্ধ্যাবেলার ডুবে যাওয়া সূর্যের মত হয়ে গিয়েছিলো! কালিপূজার রাতে সেই মাছটা তারাবাজি দেখে ফেলবার আনন্দেই তো আসলে চোখ উলটে মরে গিয়েছিলো।

ট্রেনের জানালার বাইরে শাদা শাপলাগুলো তারাবাজির মত জ্বলতে থাকে। আর ঐশ্বর্য অনেক জলের ভিতর, এক রঙহীন সূর্যের আলোয় ফ্যাকাশে খলসে মাছের মত ভাসতে থাকে।

ধীরে, ধীরে ছোট ছোট শাদা তারার মত বরফ ঝরতে শুরু করে। তারপর বরফ বাড়তে থাকে। ঐশ্বর্য খালি পায়ে ভেজা ঘাসের উপর হাঁটতে পারে না। ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার সামনের দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। কোন জানালাই আর খোলা যায় না।

 

Comments

comments

কল্যাণী রমা

কল্যাণী রমা

ছেলেবেলা কেটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ভারতের খড়গপুর আই আই টি থেকে ইলেকট্রনিক্স এ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল কমুনিকেশন ইঞ্জিনীয়ারিং-এ বি টেক করেছেন । এখন আমেরিকার উইস্কনসিনে থাকেন। অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট সিনিয়র ইঞ্জিনীয়ার হিসাবে কাজ করছেন ম্যাডিসনে। ২০১৫ সালে ‘যুক্ত’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কল্যাণী রমার প্রথম বই ‘আমার ঘরোয়া গল্প’। ২০১৬ সালে ‘চৈতন্য’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে আরো দু’টো অনুবাদের বই। ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার ‘হাতের পাতায় গল্পগুলো’ আর সিলভিয়া প্লাথ, অ্যান সেক্সটন, মেরি অলিভারের কবিতা নিয়ে ‘রাত, বৃষ্টি, বুনোহাঁস’। ২০১৭ সালে ‘যুক্ত’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'জলরঙ' । জন্ম ঢাকায়। ইমেল: kalyanirnath@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি