সাম্প্রতিক

উল্টা টান । নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

ঘরের বাইরে, পৃথিবীতে প্রতিদিনের মতোই ভোর হচ্ছে। ঘরের ভিতর নড়বড়ে চৌকিটাতে দবিরমিয়া যেনো সাপের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। তার চোখ জ্বালা করছে। শেষ রাতে তার ঘুম এসেছিলো, হালকা ঘুম। সে গভীর ঘুম কবে ঘুমিয়েছে ভুলে গেছে। ঘুমের ভিতর বারবার সে একই স্বপ্ন দেখছিলো। স্বপ্ন না, দুঃস্বপ্নই হবে।

সে ঘুমের ভিতর দেখছিলো এই চরে ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। সঙ্গে প্রবল জলোচ্ছ্বাস। আর জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছে মানুষজন, ঘরের চাল, ঠেলাগাড়ি, নৌকো, বৈঠা, কলাগাছ, সার্কাসের হাতি, বকফুল, গরু-মহিষ, হাঁস-মুরগি, কুকুর, ছাগল, পাটক্ষেত আর লাউয়ের মাচাং। আর তার  সাড়ে চার বছরের ছেলে করিম বড় মসজিদের পুবপাশের জামগাছটায় আটকে আছে, করিমের শার্টের কলারের দিকে অংশটা গাছটার ভাঙা একটা ডালে গেঁথে আছে বলে রক্ষা। সে ‘বাপজান বাপজান’বলে তারস্বরে কাঁদছে। কিন্তু তার কান্নার শব্দ ঢাকা পড়েছে ঝড়ের শব্দে। জায়নামাজের মতো টকটকে লাল একটা শাড়ি উড়ে যাচ্ছে দেখলো নিমগাছের পাশ ঘেঁষে। বিজলির চমকে শাড়ির রং পাল্টাচ্ছে। তার মনে হলো, এই শাড়ি জরিনার পরনে ছিলো…। এবং এটা তার বিয়ের শাড়ি, নদীর ওইপাড়ের কালীগঞ্জ বাজার থেকে এই শাড়ি সে জরিনার জন্য ছয়শো পঞ্চাশ টাকায় কিনেছিলো…। একটা গরু হাম্বা হাম্বা করে ডেকে যাচ্ছে কোথাও, সে দেখতে পেলো না। জল বাড়ছে, জল বাড়ছে…।

দবিরমিয়ার স্বপ্ন আর বিস্তারিত হলো না, মাইকে ফজরের আযানের প্রকট শব্দে তার ঘুম ছুটে গেলো।

ইদানীং প্রায় রাতে সে এইসব হিজিবিজি স্বপ্ন দেখে। প্রায় রাতে ঘুম হয় না। শেষরাতে হালকা তন্দ্রামতো ঘুম হয়। সে বিছানায় পড়ে আছে প্রায় দুইবছর হতে চললো। এবং প্রতিদিনই বাইরে পৃথিবীতে ভোর হয়।

দবিরমিয়ার শরীর দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে শুটকিমাছের মতো। আরেকটা পা-ও নীল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। সে কারণে-অকারণে জরিনাকে ডাক দিয়ে বাপ তুলে গালি দেয়, আরো আরো অশ্রাব্যভাষায় গালিগালাজ করে। জরিনা কিছু বলে না, চুপ করে শুনে যায়, মাঝে মাঝে চুপিচাপ কাঁদে।

নদীতে নতুন চর জেগেছিলো চরকাঞ্চনায়, সেই বছর। মফিজের পাল্লায় পড়ে দবিরমিয়াও চর দখলে গিয়েছিলো। এই চরের মারা পড়েছে দুইজন—সব থেকে বড় লাঠিয়াল হাসমত আর তার সাগরেদ মফিজ।

পর পর লাঠির বাড়ি খেয়ে দবির মিয়ার ডান পা-টাও ভয়ানকভাবে থেতলে গিয়েছিলো। ওরা হাসমত আর মফিজের লাশের সঙ্গে তাকেও ওঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। হাসমতের লাশের কী হলো সে জানে না। মফিজের লাশ যখন টুকরো টুকরো করে কেটে ভুষি আর খড়ের সঙ্গে গরুকে খাইয়ে দিলো তখনও সে নির্বিকার, কেবল একটু বমি বমি ভাব হয়েছিলো।

যখন সাড়ে তিনদিন পর ওরা তার কাছে এসে বললো, ‘অ মিয়া! এমুন ভাঙা পাডি দিয়া তুমার কাম কী? এইডা হইলো বুঝা…’ বলেই ভুজালির এক কোপে হাঁটুর ওপর থেকে তার থেতলানো আর ফোলা ডান পা-টা কেটে ফেললো—তখনও তেমন ব্যথা পেলো না। ওইপায়ে কোনো চেতনা ছিলো না, অসার হয়ে গিয়েছিলো। মনে হলো, শরীর ভারমুক্ত হলো। আর তার অবাক লাগলো। কিন্তু যখন তার পা-টা তার সামনেই টুকরো টুকরো করে কেটে ভুষি আর খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে গরুকে খাইয়ে দিলো, তখন তার বমি হলো, এবং সে বমি করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেলো।

তার জ্ঞান ফিরলো দুইদিন পর নিজের ঘরের বিছানায়। তার মুখের ওপর তখন জরিনার নিলির্প্ত মুখ। জরিনা তাকে কিছু বলেনি। পরে শুনেছিলো, তার অজ্ঞানদেহ চরে পড়েছিলো; লালু তাকে প্রথম দেখে, ঘেউ ঘেউ করে আকাশ বাতাস যেনো এক করে ফেলে। এবং চরে জানাজানি হয়। সেবছর এই চরের লোকজন নতুন-চর আর দখল করতে পারেনি।

দবিরমিয়ার শরীর দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে শুটকিমাছের মতো। আরেকটা পা-ও নীল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। সে কারণে-অকারণে জরিনাকে ডাক দিয়ে বাপ তুলে গালি দেয়, আরো আরো অশ্রাব্যভাষায় গালিগালাজ করে। জরিনা কিছু বলে না, চুপ করে শুনে যায়, মাঝে মাঝে চুপিচাপ কাঁদে।

দরজায় ঠকঠক, ঠকঠক শব্দ হয়। দরজা ভেজানো তারপরও শব্দ। দবিরমিয়া কথা বলে না। অসহায় চোখে দরজার দিকে তাকায়। সে বাতাসকে মনে মনে বাপান্ত করে। তারপর তার মনে পড়ে লালুর কথা। ভাবে, লালু নাতো! এ কুকুরটা তার কাছে মাঝে মাঝে আসে, মানুষের মতো তার সাথে কথা বলে, প্রথমে সে অবাক হয়ে ভাবতো, কুত্তা কেমতে কথা কয়? তারপর মনে হলো, সবডি আল্লার খেল…। যখন থেকে সে ঘরে একা একা থাকেÑ একদিন লালু এলো। কুকুরটাকে দেখে তার ভালো লাগে এটা বলতে গেলে তার প্রাণ রক্ষা করেছিলো। সে ভাবে, আল্লার অছিলা। দরজা ঠেলে লালু ঢুকে ঘরে, ‘মিয়াভাইয়ের শইলডা কেমুন?’

‘ভালা নারে! তুই খাইছোস কিছু?’
‘আমারে নিয়া ভাবতে অইবো না। আমার খাওনের অভাব নাই।’
‘আইজগা কী খবর লইয়া আইলি?’
‘মিয়াভাই চরে লাখে লাখে পিঁপড়া ঢুকতাছে। এইডা ভালা লক্ষণ না।’
‘হ। আমি কদিন ধইরা খারাপ খোয়াব দেখতাছি।’
‘তুমার শইলতো শুকাইয়া যাইতাছে শুটকি মাছের লাহান।’
‘হ।’

দবিরমিয়ার কান্না পায়। সে গোঁ গোঁ করে কাঁদে আর বিছানায় গড়াগড়ি করে। লালু দরজা ঠেলে বের হয়ে যায়। হঠাৎ পাশের ঘর হাসির শব্দ শুনে চমকে ওঠে সে। ভাবে, জরিনার হাসে। মনে মনে বলে, মাগী কি রফিক্যার লগে হাসে, হের লগে কী চলতাছে? বলে, মাগীডা খায় কী, দিন দিন এমুন সোন্দর হয় কেমতে? তার সবকিছু অসহ্য লাগে সে মাথার ওপর বালিশ চেপে ধরে বিছানায় গড়াগড়ি খায় আর গোঁ গোঁ করে কাঁদে।

দিন পাল্টে গেছে। এখন সেই প্রেম আর নেই। অভাব আর পঙ্গুত্ব সব কেড়ে নিয়েছে দবিরমিয়ার জীবন থেকে। এই দুইতিনবছরে জরিনা তার বিছানায় দুইয়েকবারও আসেনি। সে এখন শাশুড়ির ঘরে শোয়। শাশুড়ির মরার পর থেকেই জরিনা ওইঘরে থাকতো ছেলে করিমকে নিয়ে। কিন্তু এখন একা থাকে।

করিমের যখন চারবছর বয়স তখন তাকে রফিকের হাফেজখানায় সে রেখে আসে। ওখানে আরো ছেলেরা থাকে কবুতরের ঘরের মতো খোঁপ খোঁপ বাঁশের ঘরে। জরিনা কয়েকদিন পরপর গিয়ে ছেলেটাকে দেখে আসে। করিমের বয়স এখন সাড়ে চারবছর। হাফেজখানাটা রফিক চালায় বলে কোনো টাকা পয়সা দেয়া লাগে না। রফিক জরিনার দূর স¤পর্কের মামাতো ভাই। বছরদেড়েক হলো সে এই চরে এসেছে। জরিনার স্বপ্ন ছেলেকে ভালো স্কুলে পড়াবে, শহরে পাঠাবে। জরিনা মাঝে মাঝে ভাবে, রফিকভাইজান না থাইকলে যে কী অইতো? সে প্রতিবারই একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে। সে ভাবে, সারাজীবন মানুষডা আর বিয়াও করলো না। আমার লগে বিয়া হইলে তো… এর পরে সে আর ভাবতে পারে না, খানিকটা লজ্জাও পায় প্রতিবার।

ভরদুপুর। সারাটাদিন এইখানে কেমন করে কেটে যায় জরিনা তা বুঝতেও পারে না। দিনভর কাজ করতে হয় উত্তরচরের এ বাড়িতে। অনেক বড় বাড়ি। নদী পার হয়ে প্রতিদিন এই বাড়িতে আসে সে। স্বামী পঙ্গু হওয়ার পর থেকেই সে বাড়ি বাড়ি কাজ করে। এ বাড়িতে কাজ করছে তাও আটনয়মাস হয়ে গেছে। সে ভাবে, করিমের বাপের পাডা ভালা থাইকলে তার আর চিন্তা থাইকতো না। এইসব কথা মনে হতেই তার চোখ ফেটে পানি আসে। সে আঁচল চোখে চেপে ধরে।

এই বাড়িতে জরিনা সারাদিন গরুর জন্যে খড়বিচালি কুটে, ভুষি মাখায়। গোয়াল ঘরে এগারোটা গরু। দুইটা গরু গাভীন। একদিন কাজ করতে করতে হঠাৎ তার গোয়াল ঘরের একটা কড়িকাঠের দিকে চোখ যায়। একটা পেরেকে ঘুনশির সঙ্গে ঝুলতে থাকা একটা মাদুলির দেখতে পায়। খুব পরিচিত লাগে। সে হাতে নেয়। সে চিনতে পারে, চর দখলের ঘটনার আগেও এটা তার স্বামীর কোমরে বাঁধা ছিলো। হঠাৎ করে তার কী যেনো হয়ে যায়, সে কাঁদে না, চোখ দিয়ে তার আগুন বের হতে চায়। সে পাশ থেকে একটা চেলাকাঠ তুলে নিয়ে গাভীন দুইটা গরুকে নিঃশব্দে পেঠাতে থাকে। সে যেনো বোবা হয়ে যায়। বাতাস ভেসে বেড়ায় কেবল দুইটা গরুর গগনবিদারি হাম্বা হাম্বা চিৎকার।

দবিরমিয়ার ঘুম ভেঙে গেলো। সে ধড়ফড় করে বিছানায় ওঠে বসতে গেলো, পারলো না। তার শীর্ণকায় পঙ্গু শরীর দোলে ওঠলো। একপাশ ভিজে গেলো। চৌকিটা কাত হয়ে ডুবে যেতে গিয়েও আবার ভেসে ওঠলো। শেষবার যখন চৌকিটার একপাশ ভাঙলো তখন জরিনা দুইপাশে দুইটা বাঁশ বেঁধে দিয়েছিলো বলে আজ রক্ষা। একটা ঢোঁরাসাপ তার কাটা পায়ের কাছে কু-লি পাকিয়ে চুপিচাপ শুয়ে থাকে। সে শক্ত হাতে চালটা আঁকড়ে ধরে থাকে। কিন্তু সহসা প্রচণ্ড এক দমকা বাতাস এসে চালটা উড়িয়ে নিয়ে যায়। সে আকাশের দিকে দিকে তাকিয়ে থাকে, সে ভাসতে থাকে অবারিত জলস্রোতে। সে ভাবে, এমুন ঢল বাপজানের দাদার আমলেও হয় নাই। তয় হুজুরে কইছিলো নুহনবির আমলে চল্লিশদিন ঢল অইছিলো দুনিয়ায়।

দবিরমিয়া তার চৌকিটাকে নুহের নৌকা মনে করে মনে মনে স্বস্তি পায়। কিন্তু তার সেইদিনের সেই দুঃস্বপ্নটার কথা মনে পড়ে যায়…

Comments

comments

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

জন্ম : ২৪ আগস্ট ১৯৮১, কক্সবাজার। পড়াশোনা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এ চিত্রকলা। প্রকাশিত বই : পাখি ও পাপ (২০১১, কবিতা), শোনো, এইখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয় (২০১১, মুক্তগদ্য), ডুবোজ্বর (২০১২, গল্প), কাপালিকের চোখের রং (২০১৩, কবিতা) পুরুষপাখি (২০১৪, মুক্তগদ্য), মহিষের হাসি (২০১৫, কবিতা), আরজ আলী : আলো-আঁধারির পরিব্রাজক (২০১৫, প্রবন্ধ) সম্পাদিত ছোটোকাগজ : মুক্তগদ্য

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি