সাম্প্রতিক

একটা ভালো জ্বীন চাই । বদরুন নাহার

আমার মায়ের উপর কিছু একটার নজর আছে। বিষয়টা আলোচনায় আসে বাবার মৃত্যুর পর। প্রথম প্রথম সবাই ভেবেছিল, স্বামী হারানোর শোক। এতগুলো ছেলে-পেলে নিয়ে চিন্তায় হয়তো তিনি দিশেহারা। কিন্তু কিছুদিন বাদেই লক্ষণগুলো আর ভালো ঠেকেনি কারো। তখন প্রথম বড় খালাই বললেন, মনুর তো উপরি দোষ আছে।

আর তারপর থেকে একে একে নতুন নতুন অনেক তথ্য বেড়িয়ে আসতে লাগল! এতদিনের চেনা মা, কেমন অচেনা হয়ে যান! আমাদের তখন বিহ্বল অবস্থা, যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল! এসব আমরা কিছুই জানতাম না। দুধ-দুধ গন্ধ মেশানো, আদোর আর শাসনের মায়াজাল ছাড়া মাকে নিয়ে আর কোন ভাবনাই ছিল না আমাদের। মেঝবুবু আর ছোট ভাই বলল, ধ্যাৎ ওসব জি¦ন-পরি বলে কিছু নেই। মায়ের মানসিক শক্ থেকে এটা হচ্ছে।

বড় বুবু কিছু বলল না। ও মুখটা ভারী ভারী করে মায়ের সংসারটাকে কাঁধে তুলে নিল। আমার বয়স কতই বা আর! সবার ছোট, দুই-তিন বছর হলো স্কুলে যাই। আমার কিন্তু ভিষণ ভয় লাগল। আমি আর মায়ের কাছে ঘেঁষি না। এমনিতেই কিছুদিন আগে বাবা মরে গেলেন! সেই সাদা কাপড়ে ঢাকা দেহটাকে চোখ থেকে সরাতে পারিনি, নাকের কাছে আগর বাতির গন্ধ, সন্ধ্যে না হতেই অন্ধকারের ভয়, আর মাঝে মাঝেই ফিরে আসে কর্পূরের গন্ধ! আমার জগতটাকে কেমন ঘোলাটে করে ফেলেছে।

যদিও কিছুদিন বাদে আমি বাবার মৃত্যুটাকে ভুলতে বসেছিলাম। কেবল মনে হতো বাবা কোথাও চলে গেছেন! রাতে স্বপ্নের মধ্যে তিনি মাঝে মধ্যে আমার কাছে আসতেন। সে কথা আমি কাউকে বলিনি। কারণ যেসব রাত্রে স্বপ্নে বাবা আসত, সেসব দিনের বেলাতেই কোন না কোন ঘটনা স্বপ্নের পথ খুলে দিতো! যা রাত্রে স্বপ্নে ফিরে আসত! যেমন একবার আমার ক্লাসের মৌটুসীর নতুন পানির পট, এত সুন্দর! যেদিন একটা পানির পট নিয়ে এলো, সে রাতেও আমি স্বপ্ন দেখলাম!

ওটা নাকি ওর বাবা ঢাকা থেকে এনেদিয়েছে। ওইদিন সারাক্ষণ আমি ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারিনি! কেবল ওই কাটুন আঁকা পটটা..। আর রাতেই কিনা আমার বাবা এলো স্বপ্নে! সুন্দর এক পানির পট নিয়ে! আমার বিশ্বাস একদিন আমার পছন্দের আর প্রয়োজনীয় সব কিছু নিয়ে বাবা হাজির হবেন! স্বপ্নের কথা কাউকে না বলেই আমি অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। সমস্যা বাবা নয়, সমস্যাটা হলো মা। তাঁকে আমি ভয় করতে শুরু করলাম! আমার ভাইবোনরা নিজেদের সামলে নিলেও, আমি মাকে ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না। মায়ের সামনে যেতে বা একা মায়ের নেওটা হয়ে বেড়াবার তো কোন প্রশ্নই উঠে না। আমি মাকে দেখে লুকিয়ে পড়তাম।

কিন্তু  এ অবস্থায় আমি বাবার অপেক্ষায় থাকতে থাকতেও আশাহত হয়ে পড়ছিলাম। মায়ের ভয়ে লুকিয়ে পড়ছিলাম, বাসার সবার মাঝে নানা সমস্যার বসবাস শুরু হয়েছিল তখন; মায়ের উপর নজর বিষয়টা খোলসা করে বললেন মায়ের ফুপু, জয়নব নানী। তিনি জানালেন সমস্যাটা ছিল মূলত তাঁর মায়ের। মানে আমার মায়ের দাদী। আমি জন্ম নেবার আগেই নানীজান মারা গেছেন, নানাজান তো আরও আগে। আর নানীজানের শাশুড়িকে দেখার তো প্রশ্ন আসে না। জয়নব নানীর কথায় আমার ভীষণ অবাক লাগে, সে আবার কি? মায়ের দাদী! আমি তো বুঝতেই পারি না, তা কি করে সম্ভব। অদেখা দূরুত্বে আমি তাঁদের সেতুবন্ধনটা অনুমান করতে পারি না। কিন্তু জয়নব নানী বলেন, তাঁর মায়ের উপরি দোষ ছিল, আর তা শেষ পর্যন্ত মনুর ঘারে এসে পড়েছে।

ঘটনাটা নাকি আমার মায়ের ছেলেবেলার! মা ছিলেন তাঁর দাদী তহুরা খানমের নেওটা। জয়নব দাদী মূলত মায়ের এই উপরি দোষ কাটাবার জন্য পীরের পড়া পানি, তেল পড়া আর তাবিজ নিয়ে এসেছেন। তিনি সঙ্গে নানা রকম পিঠা-পুলিও নিয়ে এলেন আমাদেও জন্য। চল্লিশ দিনের একটা দীর্ঘ নিয়মে মায়ের চিকিৎসা চলবে। এই চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি এখান থেকে কোথাও যাবেন না। তাতে অবশ্য বড় বুবুর খানিকটা স্বস্তি হল।

দুপুরে মেঝেতে পাটি পেতে তিনি পানের বাটা নিয়ে বসেন, তখন শুরু হয় উপরি দোষের গল্প। আশপাশের দুই-চারজন পাড়া-প্রতিবেশী এসে নানীজানের পানছেঁিনটা তুলে নিতে নিতে বলে, দ্যান খালাম্মা, ছেঁইচা দেই।

তিনি তখন পা মেলে গল্প করতে বসেন, গল্পের শুরুতে তাঁর বাপের বাড়ির বিশদ এক বিবরণ উঠে আসে। তিনি জানান, আমাগো বাড়িখানা না দ্যাইখলে, বিষয়ডা বুঝবা না।

বাড়িটি যতটা নিজে চোখে দেখেছি, মার মুখে তার চেয়েও বেশী শোনা; আর জয়নব নানীর কাছে থেকে যা শুনেছি তা মায়ের গল্পের চেয়েও অনেক বেশী। ওটাই মনে লেগে আছে। নানী বললেন, ওই জব্বল পুরে ওই একখানই দালান বাড়ি আছিল। আমার দাদাই কলকাতা থিকা আইসা বাড়িটা কিনছিল।

উপস্থিত সবাই তখন মাথা দুলিয়ে সায় দেয়। এইসব বদ নজরের ক্ষেত্রে পরিবেশ-পরিস্থিতি আর সময়টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একথা ঘটনা বর্ণনাকারীর মুখেই কেবল শুনেছিলাম তাই নয়, ততদিনে আমার হাতে চলে এসেছিল রঙিন ছবি আঁকা কিছু বই। তাঁর মধ্যে আলী বাবা চল্লিশ চোর যেমন ছিল, তেমনি পেতিœর বিয়ে নামে একটি বইও আমি পড়ে ফেলেছি। শ্যেওড়া গাছের পেত্নীটার স্বাধ জেগেছিল নাপিতকে বিয়ে করার। নাপিতটি ছিল মানুষ, তাকে বিয়ে তো সহজ বিষয় নয়, তার জন্য অনেক সুযোগের অপেক্ষা করতে হয়েছিল পেত্নীটার। উপযুক্ত এক সন্ধ্যের নির্জনতায় সে ধরেছিল নাপিতটিকে। আর নাপিতও সুযোগ মতো বুদ্ধি করে বলেছিল, বিয়ে করতে হলে পেত্নীকে আগে সাজতে হবে.. আর সাজানোর ছলে খুর দিয়ে পেত্নীটার পা কেটে কেটে মেরেছিল বুদ্ধিমান নাপিত। সুতারং বিষয়টা আমি বুঝি, সময় আর পরিবেশ জরুরি তাদের আসার জন্য। জয়নব নানী সেই বিষয়টিই বলছিলেন, তবে তাতে তার বাপের বাড়ির ঠাক-ঠমকের ছায়াও প্রকট হয়ে ওঠে। আমার মায়েরও বাপের বাড়ি নিয়ে ভারী অহংকার ছিল। যখন জয়নব নানী খুব আমাদের বাড়ি… আমাদের বাড়ি বলে যে বাড়ির কথা বলছে, দেখি সেই বাড়িটা তো আমার মায়ের বাড়ি! কিন্তু সেই বাড়িটা আমি মা কিংবা জয়নব নানীকে ভাবতে পারিনা, দেখি ওটা তো আমার মামার বাড়ি! বড়বু বলল, আরে বোকা ওটা তো নানা বাড়ী। মা আর জয়নব নানী তো ওই বাড়ির মেয়ে।

এই জট খুলতে আমার বয়সকে আরও বাড়তে দিতে হয়েছিল। যাই হোক, সেই বাড়িটার গল্প এত শুনেছি! যত বার না দেখেছি, তার থেকে বহু বহুবার শুনেছি। ওটা এখন আমার মুখস্ত করা বাড়ি!

বাড়িটি যতটা নিজে চোখে দেখেছি, মার মুখে তার চেয়েও বেশী শোনা; আর জয়নব নানীর কাছে থেকে যা শুনেছি তা মায়ের গল্পের চেয়েও অনেক বেশী। ওটাই মনে লেগে আছে। নানী বললেন, ওই জব্বল পুরে ওই একখানই দালান বাড়ি আছিল। আমার দাদাই কলকাতা থিকা আইসা বাড়িটা কিনছিল।

আমি আর তোর নানা তখন এক্কেবারে গেঁদা। দাদাজান কোন এক হিন্দু জমিদারের কাছ থিকা কিনল। তখনও দ্যাশ ভাগ হয় নাই। তারপর গল্প চলে যায় সেই দালানের প্রতিটি খিলানের বর্ণনায়। দোতালা বাড়ির চিলেকোঠার ঘর থেকে ছাদের রেলিং। দরজায় কাঠের খোদাই করা কারুকাজ। তা অবশ্য আমিও দেখেছি । কিন্তু যা আমি দেখি নাই তা হল পুরনো টাট্টিখানা। জনয়ব নানীর গল্প শুনে শুনে আমি সেই টাট্টিখানার খোঁজ পাই। না, এটা ভেবে বসবেন না যে এটা কলাপাতায় ঘেরা কোন বাঁশের চার দেওয়া পায়খানা। যেমন দালান বাড়ি, তেমনি তার পয়নিষ্কাষণের ব্যবস্থা ছিল। জমিদার না হোক,  নানাজান ছিলেন গ্রামের মাতুব্বর মানুষ। আমি এগল্প শোনার আগে মামার বানানো নতুন পায়খানাটাই দেখেছিলাম, সাথে স্নানের ঘর। কিন্তু জয়নব নানী বললেন, আরে না, ফজু তো ওইডা বানাইলো ওই সেইদিন। আমার বাপের আমলে ছিল অন্য ব্যবস্থা। ওইযে উঠানের উত্তর পাশে ঢেঁকি ঘর, তার পেছনে ইটের গাঁথুনী তোলা আছিল, পা রাখনের উঁচু জায়গা, আর ড্রেন, সেই ড্রেন যাইয়া মিশছিল তালতলার ডোঁবায়। এইটা আছিল বাড়ির বিবিদের টাট্টি। একবার ভাদ্রমাসে যে ভয় পাইছিলাম! রাইতের বেলা, টাট্টিতে বইছি, পাশেই হারিকেন নিয় খাঁড়াইছিল বুড়া ঝি ফুলির মা। এমুন সময় ওই ডোবায় যেইনা একখান তাল পড়ছে, আমি তো উইঠা দৌড়…। ওই বাগানের তাল তো আমরা কোন কালেই খাইতাম না।

তিনি জানান তারা ছিল মাতুব্বারের মেয়ে, বিশাল আলিশান দালানের বাড়িই শুধু না। তার বাড়ির চারপাশ জুড়ে ছিল আম-কাঁঠালের বাগান, বাড়ির পূর্ব পাশে ছিল পুকুর, তাঁর ছিল দুইখানা পাঁকা ঘাটলা। একটা ছেলেদের আর একটা বউ ঘাটলা, উঁচু দেওয়াল ঘেরা।

জয়নব নানীর গল্পের সমস্যাই এইটা, একগল্পের মধ্যে আরেক গল্প টাইনা আনে। এরপর আসে দ্বিতীয় টাট্টির গল্প, যেইটা ছিল কাচারী পার হয়ে আম-কাঁঠালের বাগানের মধ্যে, সেইটা ছিল বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে উঁচুতে। তার নীচে ছিল মাটির চারি, উপর থেকে মলগুলো সব থপথপ করে নীচে পড়ত। সমস্যা ওইটা না, সমস্যাটা ছিল তেঁতুল গাছে, সমস্যাটা ছিল তালগাছে। সমস্যাটা ছিল আমার মার দাদীর, মানে জয়নব নানীর মায়ের। আমার তখন সব তালগোল পাকায়ে যায়। জট খুলতে পারি না। এইসব গল্প শুনতে শুনতে কেবল মায়ের প্রতি ভয় বেড়েই চলে, অচেনা লাগে, মায়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময় মায়ের দুধ-দুধ গন্ধ পাইনা, কেবল আগোঁর বাতির গন্ধ আসে। সত্যিকার অর্থে ওই সময়টা আমি খুব এতিম এতিম বোধ করলাম।

উদাস উদাস লাগে, আশেপাশে কোথাও তেতুঁল গাছ বা তালগাছ দেখলে বুকে থুতু দিয়ে ছিটকে পড়ি। তো মায়ের সমস্যাটা ছিল মায়ের দাদীর! ভদ্রমহিলা নাকি চরম সুন্দরী ছিলেন, রাশভারী। খোদাভক্ত, সেই তার মধ্যেই প্রথম লক্ষণগুলো দেখা গেল। তা নিয়ে কত পীর-ফকির নাকি আসতে লাগল বাড়িতে। শেষে একপীরের বানে তালগাছের মাথা ভেঙ্গে জ¦ীনের বিদায় ঘটে। কিন্তু মায়ের দাদী নাকি আর কথা তেমন একটা বলতেন না। খালি নামাজ-কালাম নিয়ে পড়ে থাকতেন। জয়নব নানীর মায়ের গল্প শুনে আমার লাভ নাই, আমি তখন ছি-বুড়ি খেলতে চলে যাই ঝুনুদের উঠোনে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত মায়ের সমস্যার কোন হদিস মিলল না। বুড়ো মানুষ এত কথা প্যাঁচাইয়া গল্প বান্ধে! যাক্, অপেক্ষা করা ছাড়া উপায়ও নেই। ওই অতীত ইতিহাসের তিনিই সবচেয়ে বড় স্বাক্ষী।

এবার তিনি বললেন, মনু হইছে এক্কেবারের আমার মার মতোন। যেমুন টকটকা ফর্সা, তেমুন চুলের গোছা, তেমুন উচাঁ-লম্বা। মনু ছিল মায়ের নেওটা। সারাদিন দাদীর পিছন পিছন থাকত। আমার মায়ে বড় কামিল মানুষ আছিল, সে চাশতের নামাজ থেকে শুরু কইরা তাহাজ্জুতের নামাজ, কোনটাই বাদ দেয় নাই। তো মনু তো মার কাছেই থাকতো, রাইতের বেলা মা টাট্টিতে গেলে, ওজুতে গেলে ওই মনুরেই নিয়া যাইত। মনু হারিকেন ধইরা দাঁড়ায় দাঁড়ায় নাকি ঘুমের চোটে একবার ঝিমায় তো। যাই হোক, বিষয়টা হইল মার সঙ্গে যে আছিল, তার নজর মনুর উপরও ছিল। সে তো তালগাছের মাথা ভাইঙ্গা চইলা গেল, কিন্তু সেই নাকি আবার ফিরা আইসিল! তহন আমার বিয়া হয়ে গেছে।

জয়নব নানীর বিয়ে তো আর যেই সেই ঘরে হয় নাই, মাতুব্বর বাড়ির কন্যার বিয়ে হলো তিন গ্রাম পরে আরেক মাতুব্বর বাড়ি। এবার তিনি নিজের শ্বশুর বাড়ির শান-শৌকাতের গল্পে মেতে উঠেন। কিন্তু জ্বীনের গল্প তো কেবল জয়নব নানীর একার নয়, চারপাশ থেকে গল্প শুনতে আসা মানুষ তো আর কেবল শুনতেই চায় না, তারা গল্প শোনাতেও চায়। একটু সুযোগ পেলেই গল্প শুরু হয় নতুন কোন মুখে। আর এইসব গল্প তো বানানো যায় না, সব সত্যি গল্প!

জ্বীন-পরীর এত সত্যিকারের ঘটনা লুকায় ছিল! এতদিন বুঝতে পাড়া যায় নাই। এখন সব বেড়িয়ে আসছে। পাশের বাড়ির কেকার মা জানালেন, তাঁর ভাশুরের ছেলের উপর পরীর নজর ছিল! প্রথম পরীর নজর জেনে আমার বেশ আকর্ষণীয় লাগে, জ্বীনের চেয়ে পরী অনেক বেশী আমাকে টানে। জ্বীন বলতেই ভাঙ্গা কূলার মতো চুল, কাঠির মতো পা আর মুলোর মতো দাঁত ছাড়া ভাবার কিছু নাই। কিন্তু পরী! রূপসী, ঝলমলে পোশাক, জাদুর কাঠি, কত কী, মনে আসে!

কেকার মার গল্পটা তেমন আকর্ষণীয় ছিল না, কেমন যেন কাঠ কাঠ। যাই হোক জয়নব নানী জানান, তাঁর মায়ের মৃত্যুর সময় আমার মায়ের বয়স মাত্র চৌদ্দ বছর। এবার মায়ের কিছু খারাপ গুণও তিনি বর্ণনা করলেন, তার মধ্যে প্রধান যে বিষয়টি ছিল তা হলো, মনুটা ছিল ভীষণ জেদী। সে জেদ করলে তা ভাঙ্গানোর সাধ্ধি কেবল তাঁর দাদীরই ছিল। দাদী মারা যাবার বছর খানিক পর নাকি আমার মা আরও বেশী জেদি হয়ে পড়ে! কারো কথা শুনে না। জয়নব নানীর মতে, জেদ তো মনু করছে না, করছে ওর ঘাড়েরডা।

তিনি জানান তাহাজ্জুদের নামাজে যেমন সোয়াব, তেমনি তা করাটাও কঠিন কাজ। মাইষের কাছ থেকে শুনছি, খাস দিলে গভীর রাইতে এই নামাজে যে কামিলদার হয়, সে নাকি খোদার আরশ দ্যাখে। তাই সেই মনোযোগ ভাঙ্গতে শয়তানও থাকে তক্কে তক্কে। তো রাইতে ওই তালপুকুরের ধারের টাট্টিতে তো মনুই যাইতো মার লগে, আইল মাইয়ের মরণের পর ওর ঘাড়ে। ফকিরের বান্ধ গেছিল ভাইগা, আবার ফিরল মাইয়ের মরার পর। এইবার সে ঘর বান্ধল কাচারীর পেছনের তেতুল গাছে। ওই গাছের কাছেই ছিল আমাগো ধলা আমগাছ। সেই আম যেমুন কাচা-তেমুন মিঠা। মনুর আবার তাতে সাধ বেশী। নানীজানের কথায় মাকে তো আর লক্ষী মন্ত মনে হচ্ছে না! মাও দেখি এককালে পাড়া বেড়ানী ছিল! যাই হোক সেই জ্বীন নাকি মায়ের বিয়ের আগেই তাড়ানোও হইছিল, তা তো গেছিল গা। কিন্তু অহন ক্যান যে ফিরল! নানীজানের চেহারায় অসাহায়ত্ব ফুটে ওঠে। পাশের বাড়ির শফিকের মা সান্ত¦না দেয়, চিন্তা কইরেন গো খালা, সবই আল্লার ইচ্ছা। নানীজান জানান ঈশ্বরদীর তুলারাশির ফকির সানাউলাহরে খবর দিতে হবে। সেই ফকির হইছে আয়না পড়ায় ভালো। একটা আয়না পড়া দিতে হবে।

আমাদের সংসারের রাত-দিনের হিসেব পাল্টে গেল। বড়বু বলেছে বাবা না থাকলে, এমন হয়। এদিকে রাত-দিন নিয়ম করে কেবল মায়ের চিকিৎসা চলছে। এর মধ্যেও একদিন মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খুঁজা খুঁজির পর আমাদের পাড়ার শেফালিদের পুকুরের মধ্যে গলাপানি থেকে উদ্ধার করা হলো। বাসায় সে যে কি হুলুস্থুল!

যাই হোক সবাই বেশ দিশাহারা। এবার সত্যি সত্যিই আমি এতিম হয়ে পড়লাম! আর তার ফলাফল হলো ষান্মাষিক পরিক্ষায়, ফেল করলাম। রেজাল্টটা গোপনে খাতার ভেতর ভাঁজ করে রেখেছি, বুঝতে পারছি না কাকে দেখাবো? যদিও সব কিছুই দেখভাল করছে বড় বুবু। কিন্ত এই খারাপ রেজাল্টের কারণে সে ভীষণ ক্ষেপে যাবে, এমনিতেই তার মাথা গরম আছে, একটা কিলও মাটিতে পড়বে না। তাই আমি ভাবলাম, সে তো আর গার্জিয়ান না, বাবা বা মাকেই তো স¦ক্ষরটা করতে হবে। তাই অপেক্ষা করলাম কোন এক ফাঁকে মাকে দিয়ে সইটা করিয়ে নিব।

এদিকে সাতদিন হয়ে গেল, দশদিনের মধ্যে সই করে জমা দিতে হবে স্কুল, তা নাহলে নতুন নোটিশ আসবে। আমার তখন খুব খারাপ অবস্থা। ওই বয়সে অনেক চিন্তা করতে হচ্ছে বলেও খুব নিজেকে এতিম এতিম লাগছিল। কিন্তু এতিমের সহায় তো আল্লাহ, সে কথায় আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে পড়ল। কেননা, শুক্রবার সন্ধ্যায় যখন সবাই নামাজে ব্যাস্ত সে সময়, মা এক অদ্ভুত নিঃশব্দে হাসাতে হাসতে নিজের কাপড় ধরে টানছিলেন। এরকম আগেও কয়েকবার হয়েছে, পরে আর তিনি এসময়টা মনে করতে পারেন না। আমি টুক করে রেজাল্ট সিট আর কলমটা নিয়ে সোজা মায়ের কাছে চলে গেলাম।

কি হইছে মা?
তিনি হাসতেছেন, কোন শব্দ নেই! আমি খানিকটা ভয়ও পাচ্ছি। তবুও হাল ছাড়লাম না। আবার বললাম, ওমা, কি হইছে,
তিনি কেমন অচেনা কন্ঠে বলে, কিছু নারে।
তখন আমি টুক করে কলমটা দিয়ে বললাম, তাইলে, এইখানে একটু সই করে দ্যাও, স্যার বলছে।
আচ্ছা, বলে, তিনি সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরের লিখে দিলেন, দিল মনোয়ারা।

আমার কাজ শেষ। আল্লাহই রক্ষা করলেন। কিন্তু সামনে তো ফাইনাল পরীক্ষা। আমার তো পড়াশোনার কোন মনই নেই! আমি জানি এই এতিমের এখন দেখভাল করার কেউ নাই, নিশ্চয়ই তিনিই দেখবেন।

সমস্যা হলো স্যারকে নিয়ে, যখন রেজাল্টটা ফেরত দিলাম তিনি বললেন, কিরে তোর মা কি কিছু উত্তম-মাধ্যম দিল?

না, স্যার।

তা, এত সুন্দর রেজাল্টেও কিছু বলল নাহ?

তখন আমি অধম কি জবাব দেই, বললাম, স্যার আমার মাকে তো জি¦নে ধরেছে।

স্যার আমাকে এক ধমকে বসিয়ে দিলেন। কিন্তু আমার ক্লাসের সবাই আমাকে ঘিরে ধরল, তারা জ্বীনের গল্প শুনতে চায়। তখন আমার ভীষণ কান্না পেল, আমি কিছু বলতে পারিনি।

আমি আমার মায়ের অস্বাভাবিক জীবনের গল্পটা বলতে না পারলেও এরপর ক্লাসে নতুন নতুন জ্বীন-পরীর গল্প বেড়িয়ে আসতে লাগল। একটা জ্বীনের গল্প আমি আমার ক্লাসের তুলির কাছ থেকে জানতে পারলাম। তা হল এক আলেম জ্বীনের গল্প, এটা নাকি ভালো জ্বীন!

এক মাদ্রাসার ছাত্র নাকি খুব অল্প বয়সেই কোরআন মুখস্ত। কিন্তু একদিন দুপুরবেলা ছোট হুজুর পুকুরের পারে ওজু করতে গিয়ে দেখলেন ছেলেটি ওজু করছে, দু’জনে ওজু শেষে ফিরছেন, সূর্য মাথার উপর। ছোট হুজুরের পাশে পাশে ছেলেটি হাঁটছিল, হুজুর হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, মাটিতে কেবল তাঁর ছায়া, ছেলেটির কোন ছায়া নেই! তিনি পাশে ফিরে দেখেন ছেলেটি পায়ের গোড়ালি উঁচু করে হাঁটছে! ছোট হুজুর তখনই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। কেবল জ্বীনেদের নাকি কোন ছায়া পড়ে না আর ওরা গোড়ালি উঁচু করে হাটে। তবে বড় হুজুর বলেছে, এই জ্বীন, ভালো জ্বীন। নেক আদায়ে আসছে। ছেলেটির ভালো রেজাল্টের পেছনে ওই জ্বীনের হাত আছে।

এরপর থেকে আমি মায়ের পিছু পিছু ঘুরছি, যদি একটা ভালো জ্বীনের নজরে আসি।

Comments

comments

বদরুন নাহার

বদরুন নাহার

কথা সাহিত্যিক।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি