সাম্প্রতিক

ঘুড়িটি ভোকাট্টা ছিলো না । রুমা মোদক

দ্বিতীয়বার একটা ফোন এলো।

দরজাটির সামনে আমি তেমন দাঁড়িয়েছিলাম পেশার প্রয়োজনে যেমন অন্য আর দশটি দরজার সামনে দাঁড়াই। অন্যান্য কোন দিনের সাথে  কোন তফাৎ ছিলো না আমার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে আমার আকুতিতে। কোন আলাদা বৈচিত্র্য ছিলোনা দৃষ্টিতে, উচ্চারিত বাক্যে। যা সতত করি করুণ আকুতি,পেশার খাতিরে যে আকুতিতে অভ্যাসই থাকে বেশি।সে আমার দিকে তাকালো খানিক,তারপর বললো,কেউ বাসায় নেই। হ্যা নিয়তই এই উত্তর শুনি আমি। ত্রিশটি বাসার ডোর বেল বাজালে আটাশটিতেই। অবাক হইনি,আহতও নয়। এক্ষেত্রে আমি যা করি,নাম ঠিকানা সমেত কাগজের টুকরোখানা এগিয়ে দেই। প্রয়োজনে ফোন দেবেন প্লিজ। কাগজের টুকরোটিতে আমার ফোন নাম্বারটিও রয়েছে। এরকমই নির্দেশ দেয়া আছে আমার প্রতি।        

কেউ কালেভদ্রেও ফোন দেয় না। শুধু একবার দিয়েছিলো একজন, আর সেটা ছিলো ফাঁদ।সে আরেক ইতিহাস, হয়তো বলা হবে একফাঁকে । তাছাড়া কেউ আমাকে ফোন দেবেই বা কেনো,খুব দরকার হলে যা কিনা কাছেধারে দোকান থেকেই যে কেউ কিনে নিতে পারে। আমি নিশ্চিত হয়েই কাগজখানা দেই,যে ফেরার সাথে সাথেই এর ঠিকানা হবে ডাস্টবিন। তবু আমাকে প্রতিদিন ঘরে ঘরে যেতে হয়,পণ্যগুলোর লিটারেচার মেলে ধরতে হয়, বিক্রিত বেবুশ্যের শরীরের মতো। আর ব্যার্থ হয়ে ঠিকানাসমেত কাগজখানা দিয়ে আসতে হয়। এটাই আমার কাজ। খুব সামান্য টিএ ডিএ এর সাথে মূলত এই ডোরবেল বাজানোর সাফল্যের ফলাফল যুক্ত হয়ে তবেই আমার উপার্জন। এই উপার্জনটাই আমার সম্বল। এই শহরে টিকে থাকার সম্বল। আজ একটি ডোরবেল বাজানো যে অন্য আর নিরানব্বইটি থেকে আলাদা হবে এমন কোন পূর্বাভাস কোথাও ছিলো না, ছেলেটির মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়ার উপেক্ষায় নয়। কাগজের টুকরোটা রাখার তাচ্ছিল্যেও নয়। তবু ফোন কলটা এলো।

হ্যালো

হ্যালো, আসসালামু আলাই কুম

ওয়ালাইকুম সালাম,আপনি জেরিন সুলতানা?

হ্যা আমি জেরিন সুলতানা তো বটেই। আলবাত জেরিন সুলতানা। পাঁচজনে মিলে এই নাম ঠিক করেছে মিটিং করে। 

বাপ মা নাম রেখেছিলো জরিনা খাতুন। এই নামেই স্কুল পাশ,পাড়া প্রতিবেশির জানাশোনা আর স্কুল যাওয়া আসার পথে – ও জরিনা গেছস কিনা ভুইল্যা আমারে, গানের কলি নারীজীবনের লোমকূপে লজ্জায় মাখতে মাখতে সত্যি নারী হওয়া। বইয়ের পাতার ভেতরে করে যে চিঠি রেখেছিলো  উকিল বাড়ির ছোটপোলা, গদগদ প্রেমে আমি তার উত্তর লিখেছিলাম। আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি। পরদিন বই ফেরত দেয়ার পর উকিল বাড়ির ছোটপোলা আর সাংগপাঙ্গদের সে কী ঠাট্টা, তামাশা!কথাটা খুব মনে আছে, গুজার আবার চিত্তইয়া ঘুমানির হাউশ। হায় কী তীব্র ঝাল, না জেনে কাঁচামরিচে কামড় দেয়ার তীব্র জ্বলুনির মতো সে অপমান। উকিল বাড়ির ছোটপোলার সাথে প্রেম করার কী যোগ্যতা আমার? বাপ পরের জমিতে বর্গা খাটে,মাহীন সংসারের  হাড়ি পাতিলের কালি নিত্য পুকুরঘাটে ঘষে পরিষ্কার করা যার কাজ, যার কাজ বালতি ভরতি কাপড় বাংলা সাবানে কেঁচে স্কুল মাঠের তালগাছে বাঁধা  দড়িতে শুকাতে দেয়া,আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে  যার তীব্র ক্ষারের ক্ষত,কাপড়ে শুকনো হলুদের দাগ আর কাটা মাছের আঁষটে গন্ধ আর ঘামের কটু গন্ধে আমার নিজেরই বমি চলে আসে মাঝেমাঝেই। তারে কি মানায় উকিলের ছোটপোলার সাথে প্রেম  করা? ঐ চিঠি সে লিখছিলো চৌধুরী বাড়ির মাইজা মাইয়া মায়িশারে। কী দুধে আলতায় রং! গালের চামড়া বেয়ে যেনো হাঁসের ডিমের কুসুমের মতো চকচকে লাল রং  পড়ে চুইয়ে চুইয়ে 

কী লজ্জা কী লজ্জা,কোথায় রানী রাসমনি আর কোথায় ফকিরনি। কেমনে আমি ভাবলাম এই চিঠি আমারে লিখতে পারে। ফোনের ঐ প্রান্ত থেকে ডাকে অচিনপুরের রাজকুমার, হ্যালো জেরিন সুলতানা, যেনো সেই কণ্ঠ কোন ডালিমকুমারের,  পঙখীরাজ ঘোড়ায় চড়ে যে আসছে রাজকন্যাকে উদ্ধারে!

জ্বী বলুন, আমি আমিই জেরিন সুলতানা। বলুন।

 আপনি  কাল আসেন একবার।  

জ্বী কোত্থেকে বলছিলেন আপনি? আমি কী কোন পণ্য নিয়ে আসবো?

শ্যাওড়াপাড়া,বাসা খুঁজে না পেলে আমতলীর মোড় থেকে  ফোন দেবেন। না আপাতত এমনি আসুন। ক্যাটালগ দেখি আগে।

আচ্ছা একী সত্যি! একী স্বপ্ন? আশা এবং আতঙ্কের দোলাচলে আমি বিশ্বাস অবিশ্বাসের চোরাবালিতে ডুবতে থাকি ভাসতে থাকি।মানুষ যে,নিরাশার বাস্তব অন্ধকার ভেদ করে আশার অলীক ইশারাই বাঁচিয়ে রাখে।ঘুমের ঘোরে আমি আশায় এপাশ ওপাশ করি।তবে কী শেষ পর্যন্ত এই মাসে একটা আইটেম বিক্রি হতে যাচ্ছে! মোট বিক্রিত টাকার অর্ধেকটাই নিশ্চিত আয়। কিন্তু লোকটা কিনবে তো সত্যি! এরকম ফোন করে কেউ আসলে ডাকে না। যে জিনিস দুহাত দূরে দোকানে গেলেই পাওয়া যায় এর জন্য কেই বা ডাকবে? কিন্তু লোকটা ডেকেছে  । যে কাগজটার ঠিকানা ডাস্টবিনে হওয়ার কথা সে কাগজটা যত্নে রেখেছে।    আবার কোন ফাঁদ নয়তো?

নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে ফুলে উঠা নগ্ন পেট-বুক। আমি একটু বেশি দ্রুতই চলে এসেছি। কেউ বেরিয়ে যাবার সুযোগ পায়নি। লোকটি কথা জমাতে চায় খুবই অবিশ্বস্ত আগ্রহে, আফনের গ্রামের বাড়িডা জানি কই?  আমি পণ্যের ক্যাটালগ বের করি ফাইল ঘেঁটে। নেয়ার ভঙ্গিতে এসব ক্যাটালগ পণ্যের প্রতি অনাগ্রহ  সে লুকাতে পারে না।

ও বলেছিলাম,বলা হবে একফাঁকে। আচ্ছা এই ফাঁকটাই কাজে লাগাই। নতুন  এই যে ফোনকলটি এলো, তাতে আমি যতোটা উচ্ছ্বসিত ততোটাই আতঙ্কিত।  সাধারণত ব্লেণ্ডার, ইস্ত্রি, হেয়ার স্ট্রেইটনার, হেয়ার ড্রায়ার ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো লাগলে কেউ হাতে হাতেই কিনে নেয়। শিখিয়ে দেয়া ঝাড়া বক্তৃতার মাধ্যমে কাস্টমারকে  পটানোটাই আমার মূল ইনভেস্ট।  কোম্পানি ১৫ দিন ট্রেনিং দিয়ে তোতা পাখির মতো শিখিয়েছে। আমিও সুনিপুণ আয়ত্ত্ব করেছি বলার ভঙ্গিটি। তবু মাসে দুদিন সেই ঝারা বক্তৃতা কাজে লাগলেও আটাশদিন লাগে না।আর  এই দুদিনেই মাসের মূল উপার্জন টা আসে আমার। যে টাকায় বিক্রি হয় তার আধা আধি। সবাই জানতে চায়,জিনিস ভালো তো? জিনিস ভালো কীনা আমিও কী ছাই জানি? মুখে তোতার মুখস্থ বুলির মতো খুব ভালো আপা/ভাইয়া,  সরাসরি জাপান থেকে আমদানি, পাঁচ বছরের গ্যারান্টি বলি বটে,কিন্তু নিজেও জানি না আসলে কেমন জিনিস কী বৃত্তান্ত! যার কাছে কোন পণ্য একবার গছিয়ে দিয়ে আসি, দ্বিতীয়বার কয়েকদিনের মধ্যে আর সে পথ মাড়াই না।    

যারা পণ্য নেয় না,তাদের জন্য  নাম-ঠিকানা-ফোন নং লেখা কাগজ।  আসলে এসব পণ্য আসল না নকল আমি নিজেই কী আর জানি? প্রথম যেদিন এই কাগজের টুকরোয় লেখা নাম্বারে ফোন এলো সেদিন আমার আনন্দ দেখে কে! নতুন পেশায় আমার সাফল্যে আনন্দের আতিশয্যে সেদিন আমার খাওয়া ঘুম হারাম হয়ে যায়। ভাবছিলাম বুঝি আমার ঝাড়া বক্তৃতার কী অসীম ক্ষমতা খদ্দের এতো সহজেই কুপোকাৎ!  এ ব্যবসায় আমার সাফল্য নিশ্চিত। পরদিন ঘুম থেকে উঠেই দৌড়াই না। মেসের খটখটে চকি আর নোনাধরা দেয়ালের ওপাশে যে দিন ফুটে তার আলো যতোটা ভদ্রস্থ না হলে নারীর ঘর থেকে বের হতে নেই, সেই সময়টুকু অপেক্ষা করি।

ভেতরের টগবগে উত্তেজনা নেকাব হিজাবে যতোটা পারি আড়াল করে যখন ঠিকানা অনুযায়ী ডোরবেল বাজাই,তখন দরজা খোলে যে মধ্যবয়সী  বেঢপ লোকটি,তার কুতকুতে চোখ দেখেই  আমার নারীত্বের ষষ্ঠেন্দ্রিয় টের পায় এর অসৎ উদ্দেশ্য। আমি তার ঘরে ঢোকার আহবানে সাড়া দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হই, তবু পেশাগত সাফল্যের নেশায় আমি ভেতরে ঢুকি। ঢোকে স্পষ্টতই বুঝে ফেলি এ এক সুচিন্তিত ফাঁদ। গতকাল যে বয়স্কা নারী দরজা খুলেছিলো সে হয়তো বুয়াস্থানীয়। মেসঘরটিতে এবড়থেবড়ো বিছানা,ভিন্নবয়সী পুরুষদের আদিম ঘুমানোর ভঙ্গি, দৃষ্টিতে ধাক্কা খাওয়া উদোম পেট আর পা। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে ফুলে উঠা নগ্ন পেট-বুক। আমি একটু বেশি দ্রুতই চলে এসেছি। কেউ বেরিয়ে যাবার সুযোগ পায়নি। লোকটি কথা জমাতে চায় খুবই অবিশ্বস্ত আগ্রহে, আফনের গ্রামের বাড়িডা জানি কই?  আমি পণ্যের ক্যাটালগ বের করি ফাইল ঘেঁটে। নেয়ার ভঙ্গিতে এসব ক্যাটালগ পণ্যের প্রতি অনাগ্রহ  সে লুকাতে পারে না।

একজন একজন করে উঠতে থাকে বিছানা ছেড়ে আমার দিকে তীর্যক অথচ অর্থপূর্ণ অশ্লীল ইংগিতময় দৃষ্টি ফেলে। আমি নিশ্চিত হই আমার ব্লেণ্ডার, ইস্ত্রি কিছুই এদের দরকার নেই। ঘর খালি হলে সে আমার গা ঘেঁষে বসে। কাঁধে হাতে রাখে,কী দুঃসহ গা ঘিনঘিন করা অনুভূতি। যেনো ক্ষুধার্ত শেয়ালের থাবা গৃ্হস্থের মোরগ বাগে পেয়ে। আমি এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে বাইরে আসি।

তাই এই দ্বিতীয়বার ফোনটাতে যতোটা উচ্ছ্বসিত তার চেয়ে বেশি সাবধানী আমি। একটু দেরি করে ঢিমেতালে বের হই। বাসের প্রচণ্ড চাপে-চাপাচাপিতে, অনাকাঙ্ক্ষিত হাতের মুদ্রার কৌশলে নারী জন্মের একজন্ম ঘেন্না দাতে দাঁত চেপে গিলে খেতে খেতে আমার ভীষণ আরেকটা হাতের স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে। সেই স্পর্শের কাছে কয়েকমিনিট নিজেকে সঁপে দেই। বাপের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে আসা আটকে ছিলো আমার জন্য, ডাঙর মাইয়া নিয়া সংসার করবে নাকি নতুন বউ,সংসার চাই নির্ঝঞ্ঝাট, ঝামেলাহীন।শুধুই নিজের। বাপ তাই সকাল বিকাল পাত্র আনে। কী বয়স কী পেশা কিছুই বিবেচ্য নয়। দলে দলে আসে আর যায়। উন্মত্ত চোখে গিলে গিলে খায় আমার বুক পাছার মাপ। তারপর লেনদেনের হিসাব মিলাতে না পেরে ফিরে ফিরে যায়।  এই আসা যাওয়ার ভীড়ে একজন কেবল একজন জানতে চেয়েছিলো,এই বয়সে বিয়ে করতে চাও কেনো,পড়াশোনা করতে চাও না? আমিও এই প্রথমবার সুযোগ পেয়ে উত্তর দিয়েছিলাম,আপনে বিয়ে করতে আইছেন ক্যান। কী গভীর মায়াবী বিষন্নতায় কূল হারিয়েছিলো লোকটির দুচোখ!  ঘাড়ে হাত রেখে বলেছিলো, আমি তোমার আব্বাকে বলে যাচ্ছি অন্তত এস এস সি পর্যন্ত যেনো তোমাকে লেখাপড়া করায়। সেই স্পর্শ এখনো অমৃত সুখের মতো মিশে আছে আমার স্মৃতিতে, শিহরণে। তার সংগে আমার বয়সের পার্থক্য কতো ছিলো? ১৫-২০? সমর্পণের জন্য, শিহরণের জন্য  বয়স কী আর বাধা?

আমতলীর মোড়,আমতলীর মোড়……। গা বাঁচিয়ে নয়, ভীড়ের কাছে গা ছেড়ে দিয়ে ভীড়কে অসহায় করে  আমি নির্বিকার নেমে যাই। থতমত খাওয়া ভীড় নিয়ে বাসটি চলে যায়। এ আমার নতুন কৌশল। নিজেকে রক্ষার আয়োজন না করে নিজেকে তাদের হাতে ছেড়ে দেয়ার ভাণ করি,আর কৌতুকে লক্ষ্য করি লুচ্চাগুলো কেমন কাপুরুষ হয়ে যায় সামান্য কৌশলেই।    

ফোন দেই নাম্বারটিতে। লোকটি নাকি ছেলেটি  প্রথমে মনে করতে পারে না,পরে হঠাৎ মনে পড়ে কিংবা মনে পড়ার ভাণ করে বলে, ও আপনি জেরিন সুলতানা, থাকুন ওখআনেই আমি আসছি। আমি কি একটু স্বস্তির হাঁফ ছাড়ি? যাক, লোকটি বাসায় ডাকলো না!   

একটা সস্তা হোটেলে বসি আমরা। দুকাপ চা আর দুটো পুরি সামনে নিয়ে। লোকটি নাকি ছেলেটি একটা সিগারেট ধরায়। এই শহরে পা রেখে নিত্য কতো অপ্রিয়, বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিদিন পথচলা আর এতো সামান্য সিগারেটের ধোঁয়া, জীবনই যার কাছে প্রতিদিন নানারকম বিবমিষার সাথে আপোষ, সেখানে সামনে একটা অপরিচিত লোক আর একটা সিগারেট কিআর এমন?

সিগারেটে টান দিতে দিতে ছেলেটি অপ্রাসঙ্গিক বক্তৃতা ঝাড়ে। আমার উদ্দেশ্য সে জানে কি জানে না আমি ধন্দ্বে পড়ে যাই, আপনি কী জানেন নারী উন্নয়নের পথে দারিদ্র্য প্রধান বাঁধা। শুধু নারী হওয়ার কারণে তাদের অবস্থান দরিদ্রদের মধ্যে দরিদ্রতর। অবশ্য কয়েক দশক ধরে এটা দূর করার জন্য নানা প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হচ্ছে, এর মধ্যে রয়েছে নারী উন্নয়নের জন্য বাজেট বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার ও অংশগ্রহণ……গা চিরচির করা মহাবিরক্তি পেটে হজম করে আমি তাকে মাঝপথে থামিয়ে কোম্পানির ক্যাটালগ এগিয়ে ধরি। শেখানো বক্তৃতাকে সংক্ষেপ করে ছোটখাটো একটা বক্তব্য তৈরি করতে থাকি। লোকটি নাকি ছেলেটি যেনো হঠাৎ খেই খুঁজে পায়, ও আপনি তো এসব পণ্য বিক্রি করেন। আচ্ছা আমাকে বলেন তো আপনি কতোদিন ধরে এই পেশায় আছেন, কীভাবে এলেন?কী কী সমস্যা ফেইস করেছেন এ পেশায় এসে…….?

 আমিও একটু খেই পাই। সম্ভবত সে কোন এন জি ওর গবেষণা টবেষণার সাব্জেক্ট পেয়েছে। আমি লিটারেচার গুছাতে গুছাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি কথা বাড়ানোর।  এরকম অভিজ্ঞতা আমার প্রতিনিয়ত হয়। আমাদের মেসগুলোত কতোজন কতোবার হামলা দেয়।ফাইলভর্তি কাগজপত্র, এই প্রশ্ন সেই প্রশ্ন…..।  এরকমই কেউ হবে। দূর শুধু শুধু এতোদূর এতো আশা নিয়ে খরচ করে আসা। নিজের উপর নিজের রাগ বাড়তে থাকে পারদের মতো চরচর করে।

রাগের পারদে বরফ প্রলেপ দেয় লোকটি নাকি ছেলেটি। ক্যাটালগ উল্টেপাল্টে দেখে  আমাকে অবাক করে পরদিন একটা ব্লেন্ডার মেশিন, একটা ইস্রি, একটা রাইস কুকার   নিয়ে বাসায় যেতে বলে। আমি আশা নিরাশার দোলাচলে দুলতে থাকি, ট্রেনের সময় পেরিয়ে স্টেশন অভিমুখে যাওয়া যাত্রীর মতো।ট্রেন মিস হওয়াই নিয়তি,যদি ভাগ্যক্রমে ধরে ফেলা যায়! 

সত্যি কী কিনবে সে? নাকি আগের মতোই কোন ফাঁদ! লোকটা নাকি ছেলেটা কেমন পাগলাটে। ভাবভঙ্গি কেমন

 বিশ্বাস অবিশ্বাসের চোরাবালিতে ডাকে।       

লোভ, ব্যবসার, লাভের নেশা নিয়ন্ত্রণ মুশকিল। অবিশ্বাসের ভারি পাল্লায় বসেও তবু  নিজেকে সামলাতে পারি না। আকাশ পাতাল ভাবি। যদি ছেলেটি বাসায় ডেকে নিয়ে দরজা আটকে দেয়!আগের বার তবু বের হয়ে আসতে পেরেছিলাম এবার যদি না পারি!  

সারারাত নিজের সাথে যুদ্ধ শেষে, যুদ্ধই জয়ী হয় আমার। যুদ্ধের জন্যই এই শহরে আসা আমার। নিজের সাথে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য। শিকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে, এক পরিচয় অস্বীকার করে অন্য পরিচয় তৈরি করার জন্য আসা আমার। এটুকু ঝুঁকি না নিলে হয়!  পরদিন তার কথামতো পণ্য সমেত আমতলীর মোড়ে গিয়ে ফোন দেই তাকে। ফোন পেয়ে পড়িমরি আসে সে,চলেন বাসায় চলেন,আম্মা দেখবেন।

আমার দ্বিধাগ্রস্ত পা আগায় না। সত্যি কী আম্মা আছে বাসায়? সে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাকে! আমি কী আবার কোন ফাঁদে পরতে যাচ্ছি!  যাবো, নাকি ফিরে যাবো! লোকটা নাকি ছেলেটার,  দ্রুত পদক্ষেপের সাথে আমার আশঙ্কারা পেরে উঠে না। হুমড়ি খায়। আবার আগায়…..।তার নির্বিকার পথ দেখিয়ে চলায় আমি কেমন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো পিছন পিছন যেতে থাকি তুচ্ছ ইঁদুরের মতো। মনের উথাল-পাতাল ভাবনা একটা মূহুর্ত প্রকাশের অবকাশ খুঁজে পায় না।

আমি কী তবে আত্মহুতি দিতে যাওয়া ইদুর, একটা তুচ্ছ ব্লেন্ডার মেশিনের জন্য?

বাসার ডোরবেল বাজলে দরজা খুলে যে মেয়েটি তাকে আমার ভিনগ্রহের পরি বলে ভ্রম হয়, লোকটি নাকি ছেলেটি পরিচয় করিয়ে দেয়, আমার ছোট বোন। আমি এবার একটু   নির্ভার স্বস্তির ঢোক গিলি। যাক বাড়িতে মেয়েমানুষ আছে তবে। বাহুবলী ২ ছবিতে রাজপ্রাসাদ দেখেছি সম্প্রতি,ঠিক সেরকম নয় তবে মাথার উপর ঝারবাতি ওয়ালা আর চার দেয়ালে এমন বিপুল নজরকাঁড়া কাঠের নকশা আঁকা বাড়ি আমি আগে আর দেখি নি। ঘরের ভেতর ঢুকতেই একট হিমশীতল বাতাস মূহুর্তে আমাকে আলিঙ্গন করে নেয় বাইরের জগতের অসহ্য উত্তাপ থেকে। আমি ঘরের চরদিকে কোন এসি মেশিন দেখি না,ফলে এই শীতল বায়ুর উৎস খুঁজে পাইনা।       

লোকটা নাকি ছেলেটা আম্মাকে ডাকলে যে মহিলা পর্দা ঠেলে বেরিয়ে আসেন , তাঁকে আমার বোধ হয় মোগল সম্রাজ্ঞী। এর জন্যই শাহজাহান তাজমহল বানায়, নাকি আকবর সম্রাট হবার আশা জলাঞ্জলি দেয়! এতো সুন্দর নারী হয়!  এই বয়সে?  

জিনিসগুলো হাত পেতে নেন তিনি, দরদাম না করে যা চাই, পুরো টাকাটাই দেন। সব,সবই আমাকে স্তম্ভিত করে! স্বপ্ন ঘুম ছেড়ে মাটিতে এসে দাঁড়ালে যেমন হয়। চা খবেন তো, বলে হনুফা হনুফা নামে অদৃশ্য গৃহকর্মীকে ডাকতে ডাকতে লোকটা নাকি ছেলেটা অন্দরে ঢুকে যায়।

মহিলা তখন আমার হাতদুটো ধরেন, কী গভীর অতলস্পর্শী আকুতি,তুমি কিছু মনে করোনা মা। প্রতিদিন পত্রিকায় টিভিতে মেয়েদের ধর্ষণ হত্যা ইত্যাদি খবর দেখে দেখে ওর মাথাটা একটু আউলে গেছে,কোন মেয়েকে অসহায় মনে হলেই বাড়ি পর্যন্ত ডেকে নিয়ে এসে সর্বস্ব দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করে।

সামনে রাখা পুডিং আর শরবত খেয়ে বেরিয়ে আসার সময় আমি অনেক আগে শেখা ভাব সম্প্রসারণের বাণী আওড়াই, কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক,কে বলে তা বহুদূর….. । প্রথমবার আমার মনে হয় জীবনের কতো  বিচিত্র  রূপ!ভোরের আকশে জ্বলতে থাকা প্রদীপ শিখা যেমন দিন বাড়তে বাড়তে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত আকাশময়,তাপে পুড়াতে পুড়াতে চলে জনপদ,বসতি,লোকালয়,নিচে শুয়ে থাকে দগ্ধ তৃণময় মাঠ, পাকা ধানক্ষেত। তালগাছের চূড়ো,শ্যাওলাসবুজ দীঘি,বাসন মাজতে থাকা আমি

সব ছেড়ে উড়তে থাকা ভোকাট্টা আমি তেমন  উড়তে উড়তে সন্ধান পেয়ে যাই আবার অপরূপ সতেজ উপত্যকার……আসলে জীবন এমন, এমনই।।

Comments

comments

রুমা মোদক

রুমা মোদক

জন্ম: হবিগঞ্জ। জেলা শহর থেকে প্রকাশিত সংকলনগুলোতে লেখালেখির মাধ্যমেই হাতেখড়ি। শুরুটা আরো অনেকের মতোই কবিতা দিয়ে। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বিশঙ্ক অভিলাষ’। এরপর ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন মঞ্চনাটকে। রচনা করেন কমলাবতীর পালা, বিভাজন, জ্যোতি সংহিতা ইত্যাদি মঞ্চসফল নাটক। অভিনয়ও করেন। মঞ্চে নাটক রচনার পাশাপাশি নিরব অন্তঃসলিলা স্রোতের মতো বহমান থেকেছে গল্প লেখার ধারাটি। জীবন ও জগতকে দেখা ও দেখানোর বহুস্তরা এবং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার উৎসারণ ঘটেছে ২০১৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন ‘ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি’তে। ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’ প্রন্থভুক্ত গল্পগুলোতে সে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠেছে আরও নির্মোহ, একবগগা, খরখরে কিন্তু অতলস্পর্শী ও মমতাস্নিগ্ধ। গল্প লেখার স্বীকৃতিস্বরূপ ইতোমধ্যে পেয়েছেন বৈশাখী টেলিভিশনের পক্ষ থেকে সেরা গল্পকারের পুরস্কার, ফেয়ার এন্ড লাভলী সেরা ভালোবাসার গল্প পুরস্কার। ২০১৪ সাথে মঞ্চনাটকে অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘তনুশ্রী পদক’। বর্তমানে সক্রিয় রয়েছেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পত্র-পত্রিকা, লিটলম্যাগ এবং বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রকাশিত অন্তর্জাল সাহিত্য পোর্টালে লেখালেখিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম. এ সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় জড়িত রয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে স্বামী অনিরুদ্ধ কুমার ধর ও যমজ সন্তান অদ্বিতীয়া অভীন্সা পদ্য ও অদ্বৈত অভিপ্রায় কাব্যকে নিয়ে হবিগঞ্জে বসবাস করছেন।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি