সাম্প্রতিক

নম্রতায় ডুব | ফাহমিদা ফাম্মী

একটার পর একটা ট্রেন চলে যাচ্ছে… প্ল্যাটফর্মে বসে ট্রেনের চলে যাওয়া দেখতে আমার ভালো লাগে… সিলেট যাচ্ছি বহুদিন পর… ইদানিং ঢাকা চিটাগং জার্নিটাই বেশি করা হয় হটাৎ একটা কাজে সিলেট যাচ্ছি…যাওয়ার কথাটা শুনে মনটা ভালো হয়ে উঠলো… অনেক পুরানো স্মৃতি ফেলে এসেছিলাম সিলেটে… ফেলে এসেছিলাম আমার সেই বান্ধবীটিকে যাকে একটা সময় অনেক ভালবাসতাম… নম্রতা! আমার নাম্রতা!!! সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে নম্রতার কথা মাথায় আসলে এখনো মাথা হ্যাং হয়ে যায়… দশ বছর আগের একটা মানুষ এখনো কেন কষ্ট দিবে!!! ভাবতেই বিষাদ লাগে… মাথার ভারী ভাব কমাতে একটা গোল্ড লিফ ধরালাম… সস্তা সিগারেট। কিন্তু পছন্দের, ক্যাম্পাসে এইটা ছাড়া আর কোন ব্যান্ডের সিগারেট পাওয়া যেত না। তখন ব্যানসন চাইতাম ফুড কোর্টে গিয়েই কিন্তু বরাবর হতাশ হতাম… নম্রতা একদম পছন্দ করতো না আমার এই সিগারেট খাওয়া কিন্তু আমার বেশ মজাই লাগতো তার সামনে সিগারেট ধরিয়ে ঠিক তার মুখের সামনে ধোঁয়া ছেড়ে দিতে। নম্রতার ভালোবাসা যেমন ভালোলাগতো তেমনি তার রাগটাও ভালো লাগতো…

সিগারেট খেতে খেতে একটু দূরের সিটের দিকে নজর পড়লো… একজন মধ্য বয়সী নারী আমার দিকে তাকিয়ে আছেন… দূরে ভালো চোখে দেখি না তাই মাইনাস পাওয়ারের গ্লাসটা চোখে নিলাম।। চিনতে বাকি রইলো না…অনেক মোটা হয়ে গেছে নম্রতা।। তাকিয়ে আছে অপলক আমার দিকে। আমি উঠে পড়লাম, সরে যাওয়ার জন্য না আরেকটু কাছে গিয়ে বসলাম।।

কেমন আছো? খুব সাধারন চোখে তাকালও নম্রতা! যেন আমাকে প্রতিদিন দেখছে, অনেক দিনের পুরানো এই মধ্যবয়স্ক মানুষটা তার খুব পরিচিত খুব!
ভালো তুমি?

ভালোই! কোথায় যাচ্ছ?
তুমি যেখানে যাচ্ছ সেখানে…
মানে? তুমি কিভাবে জানলে?

গত এক ঘণ্টা যাবত আমিও ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছি। তুমি খেয়াল কর নি।।আমি দেখছিলাম তোমাকে, ট্রেন লেট, অবশ্য আর বেশি সময় না আর মাত্র আধা ঘণ্টা!
হু… তা তোমার বর কই?
এইতো একটু সামনে গেছেন মেয়েকে নিয়ে…
বাহ।। তাহলে তোমার মেয়ে হয়েছে?
হুম হবেই তো তুমিই তো বলেছিলে আমার মেয়ে হবে। তাইনা?
ওহ হ্যাঁ বলেছিলাম তো…

তুতুল তোমার সাথে আমার কথা ছিল… অনেক কথা কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে তুমি? ফোন বাসার ঠিকানা কোন কিছুতেই তোমাকে খুঁজে পাইনি আমি। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে বল?

নম্র হারাই নাই আমি।। তোমার কাছেই ছিলাম সিলেটেই ছিলাম।। কথায় আছে না যখন মানুষ দূরে হারিয়ে যায় তাকে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু কাছের মানুষ গুলো যখন কাছেই কোথাও গাঁ ঢাকা দেয় তখন আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না…
কিন্তু আমি তো তোমাকে অনেক খুঁজলাম…
আমি জানি তুমি আমার অনেক খোঁজ করেছো… পাওনি।। আমি আসলে চাইনি কখনো তোমার সামনে পরি…

নম্র তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার চোখে অনেক অভিমান।। চাপা কষ্ট তাকে গ্রাস করেছে হয়তো… একটা চঞ্চল মেয়ে এমন চুপচাপ হয়ে যাবে ভাবাই যায় না…
আমার সাথে নম্রতার পরিচয় ভার্সিটি লাইফের প্রথম দিন… ওরিয়েন্টেশনের দিন।। পাশাপাশি রোল ছিল আমাদের… প্রথম প্রথম এত চঞ্চল এই মেয়েটাকে দেখতে পারতাম না একদম, চুপচাপ শান্ত মেয়ে বরাবরই পছন্দ ছিল আমার।।এক দিন ক্যাফেটেরিয়াতে গিয়ে চা খাচ্ছি হটাৎ চোখ পড়লো কোণায় বসে একটা মেয়ে সিঙ্গারা খাচ্ছে আর চোখ মুছছে! তার চোখে কান্না দেখে বেশ মায়া হল আমার।। কাছে গেলাম গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার? কি সমস্যা কাঁদছ কেন?
সে উত্তর দিলো কাঁদছি কারন আমার পোষা বেড়ালটা একটু আগে মারা গেছে…মা এই মাত্র খবর দিলেন…

ওহ সরি! তাহলে খাচ্ছ কেন?
খাচ্ছি কারন আমার মন খারাপ হলে আমি খাই…
আমি এই মেয়ের কথা শুনে প্রায় হ হ করে হেসেই দিলাম…
আমার হাসি দেখে ন্ম্রতা আরও জোড়ে কান্না শুরু করলো।।চল নম্রতা আমরা সামনে থেকে হেঁটে আসি। একটা জায়গা দেখাবো তোমাকে দেখে তোমার মনটাই ভালো হয়ে যাবে।

নম্রতা যেতে চাচ্ছিল না তাকে মোটামুটি জোড় করেই নিয়ে গেলাম। টঙের পাশেই একটা ঝিলে অনেক অনেক শাপলা ফুটে ছিল… শাপলা দেখে নম্রতার মন ভালো হয়ে গেলো… এর পর থেকেই আমাদের পথ চলার শুরু… সারাক্ষন পকপক করে কথা বলতো নম্র আর আমি চুপ হয়ে তার কথা শুনতাম… সিগারেট খাওয়া যদিও একদম পছন্দ করতো না সে কিন্তু মাসের শেষে যখন পকেট ফাঁকা থাকতো তখন সিগারেটের প্যাকেটাও কিনে দিত সেই নম্রতা… আমরা ভালো থেকে খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম… কিন্তু অনেক বড় একটা বাধা ছিল আমাদের মধ্যে আমি মুসলিম আর সে হিন্দু।। প্রেম ধর্ম মানে না… আমাদের প্রেম চলল কখনো টংএর চায়ে কখনো ফুচকায়… আমরা জানতাম এই সম্পর্কের কোন ভবিষ্যৎ নাই কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখতাম ভবিষ্যতের।।

নম্রকে একটা নাম ঠিক করে দিয়েছিলাম আমাদের মেয়ের… বুলি!
নামটা জানিনা কেন এত ভালো লেগে গেলো। নম্র প্রায় বুলির কথা বলে বলে আমাকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নিত এমন কি দিনে পনেরটা সিগারেট খাওয়ার অভ্যাসও পরিবর্তন করাল সে বুলির কথা বলে…

আমাদের সম্পর্কটা দিন দিন গভীর হতে শুরু করলো… কোন বাঁধন ছাড়াই আমরা দিনাতিপাত করতে শুরু করলাম… নম্রর শরীরের সোঁদা গন্ধ আমাকে উম্মাদ করতে শুরু করলো আমি ডুব দিতে শুরু করলাম নম্রতায়, ভালো বাসতে বাসতে ভুলতেই বসলাম অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যৎ! স্বপ্নের ঘোর আমাকে টেনে হেঁচড়ে বাস্তবে নিয়ে আসলো… হটাৎ খবর আসলো নম্রতার বাবা খুব অসুস্থ… নম্রতা বাড়ি চলে গেলো… সেখান থেকেই জানাল তার বিয়ের পাকা কথা দিয়ে দিয়েছেন তার মুমূর্ষু বাবা! শুনে আকাশ ভেঙে পড়লো মাথায়… নম্রকে বললাম দেখছি আমি… কিন্তু কি দেখবো কিছুই করার নেই আমার… বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে কোন কাজ করা আমার পক্ষে একদম সম্ভব না। বাবা মা কখনোই নম্রকে মেনে নিবেন না… আমাদের কি করা উচিৎ? পালিয়ে যাবো? কিন্তু নম্রর বাবা যদি শোনেন তার মেয়ে পালিয়ে গেছে ঐ অবস্থাতেই মারা যাবেন। কি করবো আমি? চুপ হয়ে গেলাম।। একদম চুপ… চলে গেলাম দক্ষিণ সুরমায় ওখানে এক দূরসম্পর্কের খালার বাসা…ফোন অফ করে দিলাম, বাড়িতেও কোন খবর জানালাম না। একদম চুপ হয়ে গেলাম সরে গেলাম সব কিছু থেকে নম্রতা থেকে।।

এদিকে নম্রতা সব জায়গায় খোঁজ খবর নিতে শুরু করলো, আমার সব আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবের কাছে খোঁজ নিলো… কোথাও পেল না আমাকে…
এর কিছুদিন পর জানতে পারলাম নম্রর বাবা মারা গেছেন। আর বিয়ে দিয়ে গেছেন ঐ ছেলের সাথেই… সিলেটে থাকার প্রয়োজনীয়তা ফুঁড়িয়ে এলো ঢাকা চলে আসলাম দিনাতিপাত করতে শুরু করলাম ছোট্ট একটা চাকরিও পেয়ে গেলাম… ভালোই চলল এক একটা নম্রতাহীন দিন… চলল

গ্লাসটা খুলে চোখ মুছলাম। নম্র তাকিয়ে আছে আমার দিকে… একটু সময়ের মধ্যেই নম্রর বর আর মেয়ে কিছু খাবার নিয়ে এলো… বেশ সুন্দর হয়েছে নম্রর মেয়েটা বাবার মত কুৎসিত না… নম্রর মত সুন্দরী।

নম্রর বর বলল ওঠো ওঠো ট্রেন চলে এসেছে… বুলি মামনি খাবারের ব্যাগটা তোমার হাতে নেও।। তাড়াতাড়ি…
আমি তাকিয়ে রইলাম নম্রর দিকে… বুলি আর তার বাবা ওয়েটিং রুমের বাইরে গেলো আর তখন নম্রকে জিজ্ঞেস করলাম… আমাদের মেয়ের নাম কেন তুমি রাখলে? অন্য একজনের মেয়ের নাম কেন বুলি হবে? কেন নম্রতা? আমার বুলি শুধুই আমাদের মেয়ে তোমার আর তোমার বরের না…

নম্র তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে চলে যাচ্ছিলো… একটু দূরে গিয়েই কি মনে করে যেন ফিরে আসলো আর বলল
তুতুল কে বলল মেয়েটা আমার আর আমার বরের? কে বলল তোমাকে?
আমি তাকিয়ে আছি নম্রর দিকে… ফ্যালফ্যাল চোখে…

নম্রর দেরী দেখে বুলি আবার ওয়েটিং রুমে ঢুকল, তার মায়ের হাত ধরে টেনে বের হয়ে গেলো, আমি তাকিয়ে রইলাম বুলির দিকে… চোখে পড়লো বুলির হাতেও আমার হাতের মত একটা আঙুল বেশি…

বুলি চলে যাচ্ছে তার মা বাবার হাত ধরে… আমি তাকিয়ে আছি, বুলির সাথে সাথে ট্রেনটাও চলে গেলো হুইসেল বাজিয়ে দূরে কোথাও অনেক দূরে…

Comments

comments

ফাহমিদা ফাম্মী

ফাহমিদা ফাম্মী

জন্ম ২৬ অক্টোবর ১৯৯৪, শিক্ষার্থী শাবি সিলেট

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি