সাম্প্রতিক

ময়ূর নিধি । বদরুজ্জামান আলমগীর

চরিত্র: জাহেদা। সাইফুল। জরতিক বক্স।।

৩জন অভিনয় শিল্পী। ৩জন ৩দিক থেকে একটি খালি মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসে। একজন গাড়ির সিটি বাজায়, একজন গাড়ির চাকা ঘর্ষণজনিত ঝিকঝিক ঝিকঝিক আওয়াজ করে। একজন চিৎকার করে পত্রিকা বিক্রি করার  সুর   তোলে। 

কাগজ, কাগজ, দৈনিক খবরের কাগজ- প্রথম আলো, ইত্তেফাক, জনকন্ঠ, মানব জমিন, কালের কন্ঠ, সংবাদ, ইনকিলাব, সমকাল, বণিক বার্তা, ডেইলি স্টার, নিউ এইজ! লাগবে কাগজ, কাগজ, নয়া খবর, তাজা খবর!

ওই লাগে নি— কাশ্বের বড়ি, কাশ্বের বড়ি।

জরতিক বক্স: দুনিয়া কী অদ্ভুত জায়গা— তাই না? একজন আসে, একজন বা যায়; একখানে নোতুন অতিথি আসে: ওঁয়া!
আরেকখানে একজন জন্মের মত নোঙর খুলে চলে যায়— হা! পাতাম নৌকা তুমি কই যাও? আবার কেউ হয়তো কোথাও যায় না— আসেও না— একঠাঁই রেইনট্রির গাছ দাঁড়িয়ে থাকে।

জরতিক বক্স: কুছ ইশ তারাহ সে
গুজারি হ্যায় জিন্দেগি জেইসে,
তামাম উমার কিসি দুসরে কে
ঘর মেই রাহা।

জাহেদা; Let me live within the moment.
Let me feel all that I can.
Let me cherish life for all it’s worth,
With everything I am.

Let me see what’s right in front of me,
With vision crystal clear.
And face what’s waiting there for me,
With no hesitance or fear.

সাইফুল: নাইয়ারে কেমনে যাবো ভবনদী বাইয়াক
দেশে দেশে কলেরাক কতো মানুষ যায় মারাক
সাইমনিরে যমে দেখলো নাক
নাইয়ারে, কেমনে যাবো ভবনদী বাইয়াক।।

জরতিক বক্স: হা হা। হা হা। 
মালিক, সবারে দিলা টিয়ার বাচ্চা
আমারে দিলা শালিক, মালিক!
আপনি কী কাউকে খোঁজেন?

জাহেদা: জি! খুঁজি? জানি না তো। মনে হয় খুঁজি।
মনে হয় খুঁজি না। কেবল আমিই খুঁজি, সে খোঁজে না?

আপনি যদি খোঁজেন তাহলে সে-ও খোঁজে। 
তার প্রমাণ কী?

প্রমাণ দিয়ে কী দুনিয়া চলে? প্রমাণ দিয়ে অঙ্ক হয়, যোগ বিয়োগ, পূরণ ভাগ হয়— প্রমাণ দিয়ে কী জিন্দেগি হয়? 
হয় না।

খোঁজাখুঁজির মীমাংসা কী বলুন? একদিন নয়, দুইদিন নয়— আজ থেকে ২৫ বছর— এককুড়ি পাঁচ বছর আগে আমরা দুটি মানুষ এক হই— উপরওয়ালা একটি পাতার মধ্যে না-কী দুটি নাম লিখে আরশ থেকে নিচে ফেলে— সেই পাতা সাত তবক আসমানের উপর থেকে উড়েউড়ে জমিনে এসে পড়ে।
সেইদিনের আগপর্যন্ত জানতাম দুনিয়ার সবচেয়ে ভারি জিনিস পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ, কিন্তু সেইদিন জানি- জগতের সবচেয়ে ভারি জিনিসের নাম আনন্দ, আশা!

হায়! দুনিয়া কী বিরোধিতায় ভরা খেলার মাঠ— জয় পরাজয় না থাকলে, পক্ষ— বিপক্ষ ছাড়া সবটাই জলবৎ তরলঙ, পানসে— লবনছাড়া তরকারি! আজ থেকে ২৫ বছর আগে আপনারা একপিঁড়িতে বসলেন!

ঠিক তাই। বধুবরণের আয়োজনে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকূল
গাঙের ঢেউয়ের মতন বলো কন্যা কবুল, কবুল!

এতোবড় জংশন— কে কোথায় যায়, কে কোনখান থেকে ফেরে— তার হদিস কোথায় পাবো?

আমি সোজাসাপটা বুঝি— যা ঝিলমিল করে, যা ঝিকমিক করে— তা সুন্দর। আমি তার লাগি ঘুরি, তার সন্ধানে ফিরি।
সারা উঠান আলো করে আসে আমার রাজার কুমার!
আহা কীযে আমার রাজার কুমার! বাড়িভর্তি পাড়ার মেয়েরা কী দরদ দিয়ে গান গেয়ে ওঠে: আসে, আসে নয়া দুলহা আসে!
বিয়ের গীত: 

অরুণ জঙ্গলের মাঝে
লইবান কতোই নিন্দবান পারে।
হায়রে উতো উতোরে লইবান লইবান 
সিন্দুর পরিধান করো।
হায়রে উতো উতোরে লইবান লইবান
সিন্দুর পরিধান করো।

হায়রে সিন্দুরের ভরেরে লইবান লইবান
হালিয়া হালিয়া পড়ে
হায়রে সিন্দুরের ভরেরে লইবান লইবান
ঢলিয়া ঢলিয়া পড়ে।

হায়রে কোনবান সৈয়দের বেটা লইবান
গড়িয়া বাতাস করে
হায়রে কোনবান মহলের বেটা লইবান 
ধরিয়া বাতাস করে।
হায়রে উতো উতোরে লইবান লইবান
সিন্দুর পরিধান করে।।

জাহেদা: তুমি কে— এমন খামোখা মুখোশ পরে আছো—
মতলব কী?

সাইফুল:  জি না মতলব কিছু নাই।  পথে পথে ঘুরি, জেল-জরিমানা খাটি।

জেলের কথা হচ্ছে কেন— আপনি কী আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?

একেবারেই না। ওইতো সেদিন পথে পথে ঘুরছিলাম— কোথাও যাবার ছিলো না। ফেউ ফেউ করে ঘুরছিলাম— বিত্ত নাই বেসাত নাই। বলতে পারেন এই জমানার ভুপেন হাজারিকা: গঙ্গার থেকে মিসিসিপি হয়ে ভোলগার রূপ দেখেছি! অস্ট্রিয়া পর্যন্ত যেতে পারি নি— টায়ার্ড হয়ে গেলাম, আর পা চলে না।

মসকরা রাখেন, কাজের কথায় আসেন। কি করেন সেটা বলেন। সেই কখন থেকে দেখছি মাথা গুঁজে পিলারের নিচে বসে আছেন। আমাদের প্রত্যেকটা কথা কান খাড়া করে শুনছিলেন। সত্য করে বলুন…

বললাম তো, পথে পথে চক্কর দেই।

দেখুন একদম গুলতানি মারবেন না— এক্কেবারে পুলিশে হ্যাণ্ডওভার করে দেবো- আপনার জানা থাকা ভালো আমার হাসবেণ্ড রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার।

লে বাব্বা! আর্মি অফিসার!
তাই বুঝি! তা এখন ওই চাঁদুটি কোথায়?
বললাম না রিটায়ার করেছেন!
তা বুঝলাম— কিন্তু এখন কোথায়, অক্কা পেয়েছেন?
শাট আপ— একদম চুপ। সত্যিই পুলিশে দেবো কিন্তু।
লে বাব্বা! হা হা। কুকুরকে ন্যাংটা করার ভয় দেখিয়ে লাভ কী— জানেন তো নগ্নতা-ই কুকুরের পোশাক।
আপনি কিন্তু ভব্যতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।

No no no, not at all mam! শুনুন তাহলে। সেদিন একটু মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিলাম— আজ কিন্তু আলবৎ ঠিক আছি।
সেদিন একটু টেনেছিলাম— বুঝলেন। এখনতো ঢাকা শহরেও রাস্তাঘাটে বাডওয়াইজারের ক্যান পাওয়া যায়। টপাটপ মেরে দিলাম ৫খান— বুঝলেন ৫খান। 

বড্ড ফালতু কথা বলছেন।

একদম না। শুনুন। যেই না নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে— নবাবপুত্রের মত রাস্তা পেরুচ্ছিলাম— নাকি রাস্তাই আমাকে পেরুচ্ছিল ঠিক জানি না, ওই যে ওইখানে মৎস্যভবনের মোড়ে। আর যায় কোথা! একদম আমার উপরে একখান ট্রাক এসে থামে: পুলিশ না র‍্যাব বুঝতে পারি নি। বলে, ওই মাগীর বেটা নাম কী?
কোনরকমে বলি— সাইফুল!
ট্রাকভর্তি রাষ্ট্রযন্ত্র, আঠারো জোড়া আইনের পা আমাকে বলে, হালারপো তোকেই খুঁজছিলাম!

না না তা কেন হবে?

জ্ঞান ফেরার পর দেখি শতশত খালাতো ভাই থালাবাটি বাজিয়ে গান গায়: আমি কাশিমপুর কারাগারে আটক— আমার নাম সাইফুল। হা হা। আরেকটু হলেই তুমি কেঁদে ফেলতে। 

ফালতু কথা রাখুন। আমি কেন কাঁদবো? আর আপনি আমাকে তুমি বলছেন কোন সাহসে?

আপনার একটু কান্নার জন্যই তো এতোকিছু, সবকিছু,  হা খোদা!
কিন্তু আমার মনে হলো উল্টা: কূলে বান্ধা পড়ে গেলে নৌকোজীবনের লাভ কী, নৌকা ভেসে যাবে অজানানায়, গহীন গাঙ্গের নিরুদ্দেশ ঠিকানায়। আমার মনে হলো, এইতো কবি নজরুল হবার এখনই সময়। কবি নজরুল যেমন নার্গিসকে বিয়ে করার রাতেই পালিয়ে যান— আমিও তাই করি। হা হা। হা হা। 

সাত ঘাটের জল খেয়ে এতোদিন পর কী মনে হয়— কোনটা সঠিক : ঘর কৈনু বাহির, না বাহির কৈনু ঘর! এই আলী কদম জংশনে বসেবসেইবা কী ভাবেন— এক বাও মেলে,দুই বাও কী মিলে?

দেখুন, কী মেলে আর কী মেলে না— তা কিন্তু কেউ বলতে পারে না; আপনি চোখ দিয়ে তামাম দুনিয়ার সবকিছু দেখেন, কিন্তু চোখ দিয়ে নিজের চোখ দেখা যায় না— এটাই তাজ্জব, এইতো জগতের লীলা! 

শুনুন, সক্রেটিস আর প্লেটোর সংলাপ শোনার ধৈর্য, সময়, ইচ্ছা কোনটিই আমার নাই।
তাহলে থাক। 
না বলুন।

আজ থেকে ২৫ বছর আগে এই আলী কদম জংশন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলাম। আসলে কী হারিয়ে গিয়েছিলাম না-কী যুক্ত হয়েছিলাম— আমি তো জানি না! 

সোজা উত্তর: সংসারের আহবান শুনে আপনি তার ভার ও সম্মোহন গ্রহণ করতে রাজি হন নি— কাপুরুষ তাই পালিয়ে গিয়েছিলেন। 

সম্মোহন!  হা হা! এতো খুব ছোট বড়শি— এ বড়শিতে রুই মাছ ধরবে না, বড়জোর ধরবে পুঁটি মাছ— শৌলমাছের পোনা।
আপনি আমাদের অসম্মান করে কথা বলছেন।

গোস্তাকি মাফ করবেন সম্মাননীয়া। আমি তা করি নি। যার যা ভালো লাগে সে তা-ই করুক: আগুনের আনন্দ জ্বলায়, দমকল বাহিনীর ভালোলাগা পানি ঢালার মধ্যে; কাঁধ সবথেকে সুন্দর যখন সে ভার বহন করে, ঢালু সর্বোচ্চ  নয়নাভিরাম যখন সে ভার নামিয়ে দেয়।

শোনেন, সারা দুনিয়া ঘুরে চাইলতা পাড়তে পারেন, কিন্তু দিনের শেষে মনে হবে— সব পাখি ঘরে আসে, সব ধুলা গরুর খুরের মধ্যে জড়ো হয়ে বসে! বসে না?

আপনি তো আমার মন আনচান করিয়ে ফেললেন। দেখুন, দুঃখবিহীন আনন্দ বলে কিচ্ছু নাই— দুঃখ নাই কিন্তু আনন্দ আছে— সে সোনার পাথরবাটি। 

আমি এতো মারপ্যাঁচ বুঝি না— আমার কলেজ জীবন— আমি যেতাম লালমাটিয়া মহিলা কলেজে— আমাদের দর্শনের টিচার ছিলেন রঞ্জিতচন্দ্র রাউত— তিনি বলতেন ভারতীয় দর্শনের কেন্দ্রীয় কথা সংসার; এইজন্যই বলে সংসারধর্ম!  তিনি বলতেন বাঙলা এমন এক জায়গা যেখানে তীর্থস্থান ঘরের ভিতর: গয়া, কাশী, মক্কা, জেরুজালেম, লুম্বিনি, ভেটিকান সিটি, ভিটেনবার্গ,বদ্রিনাথ, হাইফা মন্দির, পলিতানা, শ্রিপদ সবই সংসার— আমি এইটুকুই বুঝি।

আমি আপনাকে, আপনাদেরকে গড় হয়ে প্রণাম করি— একহারা সাধনাকে সালাম জানাই। আপনাদের পণ বন্ধনে মুক্তি, আমার রোখ মুক্তির সাথে বন্ধন। আমি পাথেয় করি— জালালুদ্দিন রুমির কথা— তিনি বলেন, তোমার চোখ কোথায় রাখো? উত্তরে বলেন, পথের মধ্যে তোমার চোখ স্থির করো।

আলী কদম জংশনে ফিরে এসেছেন কেন?

আসি নি। আসি নি যে তা বোঝানোর জন্য এসেছি। আমার ভাগ্য ঈশ্বরের ডানার সঙ্গে বাঁধা, পাখির ক্লান্তি নয়— তার উড্ডয়নের নিরুদ্দেশের মধ্যেই আমি থাকি।

দূরগামী গাড়ি হুইসেল দিচ্ছে, আর বসে আছেন কেন, এবার তাহলে আপনার পথে যান। আমিও এসেছি ঘরের বাইরে। আমি ঘরের বাইরে এসেছি বোঝানোর জন্যে যে আমি আসলে বাইরে আসি নি।

যাবো, যাবোই তো, আরেকটু বসে যাই!

আপনি কী জানেন— গাছের গোড়ায় নয়, সবচেয়ে বেশি শিকড় গজায় মানুষের পায়ে!

জানি। তাই আমি পায়ে বিশ্বাস করি না— বিশ্বাস করি পাখায়—

These woods are lovely, dark
and deep. But I have promises
to keep, and miles to go
before I sleep.
miles to go before I sleep.

ফাহিমুল:
ইকরি মিকরি ডুকরি
লাগ ভেলকি লাগ
হাত সাফাই, চোখ
সাফাই— এর নোকরি
যাদু করি, ম্যাজিক দেখাই
ইকরি মিকরি ডুকরি!
শুনলাম— আপনাদের সবকথা মনপ্রাণ ঢেলে দিয়ে শুনলাম।

ম্যাজিক দেখান তো দেখান, কিন্তু এমন কিম্ভুতকিমাকার পোশাক পরেছেন কী কারণে— গলার আওয়াজই বা এতো কর্কশ কেন আপনার— গলা তো নয় যেন রেললাইনের উপর দিয়ে মালগাড়ি যায়— ডিসগাস্টিং!

জি আমি দুঃখিত। আমার সাজপোশাক, পরিধেয় বস্ত্র বমিউদ্রেককারী, বিশেষ করে নারীকূলের সামনে উপস্থাপিত হবার জন্য রীতিমতো কলঙ্কজনক। কিন্তু আমার কোন উপায় নেই।

উপায় না থাকলে ঘরে বসে থাকেন— রাস্তায় বেরুনোর দরকার কী?

রাস্তায় না বেরুলে খাবো কী— নোংরা হলেও গায়ে জামাকাপড়  পিটাতে হয়, কুকুরের মত ন্যাংটা থাকতে তো পারি না।

কুকুর হয়ে জন্মালেই ভালো ছিল।

পারি নি— বিধি বাম। আর্জি করেছিলাম— ভগবানের কাছে, ধোপে টেকে নি। আচ্ছা ভালো কথা— তোমার কথাবার্তা, আচার ব্যবহার এমন অরুচিকর হয়েছে কীভাবে?

লে বাব্বা! আপনি আমাকে তুমি করে বলা শুরু করেছেন!
একটু পরে ফুল বাড়িয়ে দেবেন, তাই তো?

না তার কিছুই হবে না। আপনি বলুন— আপনাকে এতো অস্থির লাগছে কেন?

আপনি দিশা দেখতে জানেন?

আগে জানতাম না, এখন জানি। কাকে খোঁজেন?

যারে খুঁজি তারে এনে দিতে পারবেন যাদুকর?

জরতিক বক্স: খোঁজেন, খোঁজেন— খোঁজা-ই সার কথা!
খোঁজার কোন আদিঅন্ত নাই!

আপনি চুপ করেন। বলুন যাদুকর ভাই, পারবেন, এনে দিতে, পারবেন তারে?

জরতিক বক্স: মানুষ জীবনে জীবন খোঁজে, সে  মৃত্যুর ভিতর দিয়ে আবার জীবনকেই অন্বেষা করে। আমিও যাই, খুঁজে দেখি। ওইযে রঙিন গাড়ির হুইসেল পড়ে! মানুষেরই শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার দয়া— এই দয়াই মৃত্যুকে জীবনের আনপিঠে একটি উপমা বানায়— মৃত্যুকে অভিনন্দনে সমাপ্তির বদলে বানায় বিস্তার। জয় অভিযাত্রা, জয় শ্মশানে শিঙ্গার ধ্বনি।

যাদুকর : যারে খোঁজেন সে আপনার ঘরে বসত করে। সে একটি চারাগাছ— সে কেবল একটু যত্ন চায়— গোড়ায় একটু পানি চায়— একফোঁটা চোখের পানির জল।

সে কেবল হাঁটে, তারা বিরতিহীন দৌড়ায়— দূরত্বহীন সেই পথ! তার পাগুলো দেখো— পায়ের দুইখান গোড়ালি দেখো— ধুলার আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে দুইখানি অসহায় পা! দেখো, চেয়ে দেখো! আমার সকল আর্তি আর অসহায়তা তোমাকেই পরিচর্যা করতে হবে, কেবল তোমারই হাতে আছে ঐশ্বরিক আকনমেন্দির পাতা।

আমি যে মানুষ— ভার, ভার, এ-তো কেবলই ভার। 
কিন্তু আপনি আমাকে তুমি বলছেন কেন?

Sorry, slip of tongue. But please hold your tongue.

কেউ বোঝে না, আমরা কেউ বুঝি না। এই বাঙলায় প্রত্যেকটা মেয়ে যখন বিয়ে করে— সে কেবল বিয়ে করে না— অবধারিতভাবে সে বেহুলা হয়— সংসারের নামে গাঙুড়ের জলে ভেলা ভাসায়। আজ থেকে ২৫বছর আগে যেদিন দু’জন একঘরের ছাউনির নিচে এসেছিলাম সেদিন এই আলী কদম জংশনের এই খাম্বার মধ্যে দাগ কেটে লিখেছিলাম সাইফুল+জাহেদা! কী ছেলেমানুষই না ছিলাম— সাইফুল+ জাহেদা! আজ আবার ঠিকঠিক এসেছি— কিন্তু সে তো সাথে নাই— কোথায় যে আছে তা-ও জানি না।

সবই দাবি, প্রত্যাশা আর নির্ভরতার বোঝাপড়া। দুজনের সমন্বিত জীবন একটি জেগে ওঠা শহরের মত একটি প্রতিজ্ঞার মুখে একা, দুইজন একসাথে নিঃসঙ্গ— তার শক্ত বুনিয়াদ গড়ে তোলে— ইট, কাঠ, বালু, পাথর, টিকে থাকা, অন্যদের টপকে যাওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে আসা— এসব করে করে নিজের দিকে চাইবার সময় কোথায় বলো?

কুমার পোকার ঘর— লেপে পোছে রঙ করে অবশেষে নকশাকাটা লোহার দরজা এঁটে একান্ত ব্যক্তিগত নিজস্ব সেই ঘরের মুখটি বন্ধ করে দিই— ঠিক যেরকম কুমার পোকা নিজের বানানো ঘরে দমবন্ধ কয়েদী!

হা সময়! হা ঈশ্বর!  কিন্তু যে তোমার কাছে আসে, তোমার কাছে সামান্য ধন বাঞ্চা করে— সে কিত্তনখোলার পাড় ভেঙে ধানীসাফা,কানাজাওয়া থেকে আসে, সে মাগরেবের আজানের কোমল রঙিন প্রজাপতি নিয়ে খেলে, দৌলতুন্নাহার খানম হাসি ভাবীর স্নেহের মধু মেখে নগরের দিকে আসে, গুলবানু বেগম— মমিনুদ্দিন আকন; রেজিয়া বেগম হায়দারুদ্দিন আকনের স্রোতচিহ্নে সে-যে দীর্ঘ আলপথ বেয়ে তোমার মাথার সিঁথিতে পথ ভুল করে হাসে।

আমি যে সামান্য মেয়ে— মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, মগবাজারের মোড় থেকে নেমে আসি— আমি মনু ও বদরের রক্তকল্যাণধারায় নত মস্তকে কথা বলি— সালেহা, জেসমিন,গোলাপির মায়ের আঞ্চলে আপনমনে মুখ মুছি; যার কথা বলো যাদুকর— আমি তারে খুঁজি— চোখের জলে চর ধুয়েধুয়ে আসি। যাদুকর, ওগো ম্যাজিকওয়ালা ভাই— আমি তুষখালি, আগুনমুখার রাখালকে কোথা পাই!

এইক্ষণে জাহেদা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে!

তুমি কেঁদে ওঠো, কেঁদে ওঠো সজনে ডাঁটা মেয়ে— নাই, কোথাও আর চর পড়ে নাই। নেমে আসে
বৃষ্টি, বৃষ্টি, বর্ষার অজস্র জলধারা!
জাহেদা! এই যে আমি— তোমার কান্নায় ময়ূর পেখমের সাথে জাগি! আমি তোমার চোখে বলেশ্বরের অন্তর্গত চোখের জল দেখবো বলে যাদুকরের ক্যামোফ্লাজ নিয়ে ছিলাম।

যাদুকর এক হেঁচকায় তার মুখোশ খুলে ফেলে।

তুমি, সাইফুল! তুমি কোত্থেকে আসো!

ছিলাম, এখানেই ছিলাম, কেবল তোমার চোখের জলে শুচি হবার বিদীর্ণ আশায় আশায় ছিলাম। এবার কী ব্যথায়, উল্লাসে ময়ূর নেচে ওঠে!

একা বাঁচিতে না জানি, একলা মরিতে না পারি—
এক লাফে উঠে এসো সখা জীবন ও মরণের কাছাকাছি!
অরণ্য জঙ্গলে অতঃপর একটি ময়ূর বৃষ্টিশিহরিত পাখায় পেখম তোলে!

মার্চ ২২, ২০১৯

ফ্ল্যাপ:
সে কেবল হাঁটে,তারা বিরতিহীন দৌড়ায়— দূরত্বহীন সেই পথ!
তার পাগুলো দেখো— পায়ের দুইখান গোড়ালি দেখো— ধুলার আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে দুইখানি অসহায় পা! দেখো, চেয়ে দেখো! আমার সকল আর্তি আর অসহায়তা তোমাকেই পরিচর্যা করতে হবে, কেবল তোমারই হাতে আছে ঐশ্বরিক আকনমেন্দির পাতা।

প্রথম পরিবেশনা: মার্চ ৩০, ২০১৯
পাঠাভিনয় : ইসরাত জাহান পিকু। অতীশ চক্রবর্তী। বদরুজ্জামান আলমগীর।।

উৎসর্গ : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শাহিদা আফরোজ নীপু— প্রিয় যুগল।

Comments

comments

বদরুজ্জামান আলমগীর

বদরুজ্জামান আলমগীর

নাট্যকার, কবি, অনুবাদক। জন্মেছিলেন ২১শে অক্টোবর ১৯৬৪ সনে ভাটি অঞ্চল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে। পড়াশোনা বাজিতপুরে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০বছর দেশের বাইরে- যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় থাকেন। নাটকের বই ২টো: নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে; আবের পাঙখা লৈয়া। বাঙলাদেশে নাটকের দল- গল্প থিয়েটার- এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, নাট্যপত্রের সম্পাদক। নানা পর্যায়ে আরও সম্পাদনা করেছেন- সমাজ ও রাজনীতি, দ্বিতীয়বার, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ণপথিক, মর্মের বাণী শুনি, অখণ্ডিত। কবিতার বই ২টো: পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর; নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো। প্যানসিলভেনিয়ায় কবিতার প্রতিষ্ঠান- সংবেদের বাগান-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্যারাবল-এর বই ১টি: হৃদপেয়ারার সুবাস। প্রকাশিতব্য- ভাষান্তরিত আন্তর্জাতিক কবিতার বই: ঢেউগুলো জমজ বোন।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি