সাম্প্রতিক

ও জীবন ও মায়া । সেজুল হোসেন

হাসিতে ধরা পড়ে না সুখের আপাদমস্তক

এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো
শব্দহীন হও
শষ্পমূলে ঘিরে রাখো আদরের সম্পূর্ণ মর্মর
লেখো আয়ু লেখো আয়ু
শঙ্খ ঘোষ

যেন আয়ু লিখবো বলেই এই জীবন, এই জীবনকে যাপন। যেন আয়ু লিখবো বলেই বেঁচে আছি। যেন আয়ু লিখবো বলেই এই খরতাপ, রোদ পোহানো মেঘ আর নদীর পাড়ে বসে থাকা চুপচাপ। যেন আয়ু লিখবো বলেই এত শ্বাস, এত প্রশ্বাস আর অদ্ভুত গোঙানির মধ্য দিয়ে অবিরাম স্বপ্নের নির্মাণ, স্বপ্নের ইমারত গড়া।

গানে, কবিতায়, প্রেমে, কামে, হাতে রাখা হাতে, গভীর চুম্বনে আমি তো আয়ুই রচনা করতে চাই। নৈঃশব্দের শব্দ দিয়ে রচনা করতে চাই অলৌকিক কোনো কোলাহল। একান্ত রাজ-উৎসব। শুধু যে কথাগুলো জমে আছে মনে, বাতাসকে সে কথার ভার দিতে চাই না। কান্না এসে যাবে। বাতাসের কান্না এসে যাবে। তাকে কেন কান্না দেবো, সে তো আমারই স্বপ্নের সহোদর।

তারপর শঙ্খ ঘোষকে মেনে শব্দ বাঁধতে গিয়ে, কোনো দূর্বাঘাসে লীন, স্পর্শের নিখিল সমুদ্ভবে আমি লিখতে বসি জন্মে পাওয়া আয়ু। তাকে লিখতে গিয়ে আবার ভাগ্যরেখার নির্দেশে, বাঁশিতে সঞ্চিত সুরগুলো ক্রমাগত ভাঙছি। থামছি না কারও ইশারার কাছে। দিচ্ছি না বাধা নিজেকেও যেতে আবেশী হাওয়ায়, যেখানে কান্নারা হররোজ আসে আর যায় মূর্চ্ছনার নাম করে।

আগুনে তৈরি সেই কান্নার মানে আমি জানি না। সেই না জানার ভাবনাটা অবিকল ধরে ফেলে কাগজে আঁকা যে কি কষ্টের, যারা লেখেন তারা জানেন। আমি যা ভাবি তার এক চতুর্ভাগও ধরতে পারিনি এ অবধি। যেমন চোখের ক্ষমতায় ধরা পড়ে না মেঘের পুরোটা। হাসিতে ধরা পড়ে না সুখের আপাদমস্তক। কান্নায় ধরা পড়ে না বেদনার অবিকল রঙ কিংবা সত্যিকারের অনুভবে ধরা পড়ে না-এই টালমাটাল জীবনকে আমি সত্যিই কতটা ভালোবাসি তার হুবহু হিসেবটাও। শুধু টের পাওয়া, শুধু উপলব্ধি, তাও অপ্রকাশিত। তারাদের জ্বলে ওঠা আর নিভে যাওয়ার সাথে যা গভীরভাবে সম্পর্কিত। যেখানে মরণও একাকী আসে না কোনোদিন।

‘আলোয়-ধোয়া রাত্রি আর রাত্রির তারার পুঞ্জরা পাল্টে দেয় মানুষের সবকিছু। হাতের কাছে যা কিছু আছে সবই যেন অদৃশ্য হয়ে যায় তখন, ব্যাপ্ত এক সরলতায় ভরে যাই আমরা। যেন, আমাদের পরিচিত একটা খোলস থেকে আমরা তখন সরে যাই, এই চির আমি আর ভিন্ন আমির মধ্যে লুপ্ত হয়ে যায় সব ভিন্নতা।’ ফরাসি কবি পল ভালেরির এই কথার মতো রবীন্দ্রনাথের গানে যেন সেইরকম ইঙ্গিত-সামনে দাঁড়ালে বস্তুর সব ভার হালকা হয়ে যায় হঠাৎ, সরে যায় আমাদের সমস্ত মিথ্যে, সরে যায় সাজিয়ে কথা বলার সংসার।’

শঙ্খ ঘোষ-এর বর্ণনা ভঙ্গিতে ভর করে আমার রাবীন্দ্রিক-স্নান, অন্যরকম এক অশেষ/অনন্ত যেন ডুবিয়ে রাখে আদ্যন্ত আমাকেই। রবীন্দ্রনাথ সব কথা বলে দিয়ে যাওয়ার পরেও রেখে গেছেন বলার অধিকার। উসকে দিয়েছেন জীবনে লুকিয়ে থাকা আগুন। সেই আগুনটার একটা রূপ দিতে চাই বলেই নিজের সঙ্গে অবিরাম কথা বলি। ঘুমাতে যেতে যেতে, চুলটা সামান্য ভিজিয়ে, মশারি টাঙাতে টাঙাতে, প্রেমে, কামে, ঝগড়ায় আপসে, সংসারে, কল্পনার স্ত্রী-সঙ্গমে, কাঁচাবাজারে, শ্রমিক-মালিকের নিরস চোখাচোখিতে এত যে আগুনের অনুবাদ। হায়! অনুবাদের সে ভাষা অজানাই থেকে যায়।

ফলে কালো হয়ে আসে ভাবনার আকাশ। ছোট হয়ে আসে চোখের সঙ্গে আকাশের দূরত্ব। সময় পাল্টায়। মেঘ রঙ বদলায়। কালো থেকে ধূসর, তারপর ফের কালো এবং ভীষণ অন্ধকার। ধোয়া তখন অর্থহীন কোনো ধাঁধা। আর আমি নিরর্থক কোনো প্রশ্নবোধক চিহ্ন। লিখতে চাওয়া এক অসহায় চাষি। যে হারিয়েছে তার লাঙলের শাণিত ফলা, ফসলের অধিকার, প্রিয় স্বাদ।

আমার বিশ্বাস লেখকরা সব সময়ই একা, মাঝ সমুদ্রে জাহাজ ডুবির পর নাবিকরা যেমন, সেই রকম। লেখা হলো পৃথিবীর নির্জনতম পেশা। আপনি লিখেছেন সে ব্যাপারে কেউ আপনাকে সাহায্য করতে পারে না- গেব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

কবিতা পড়ার মুগ্ধতায়, মুগ্ধতার ঘোরে আমি চেয়ার থেকে পড়ে যেতে যেতে সেদিন নিজেকে ঝাপটে ধরে ফেলার আগে কাকে ভেবেছিলাম? মগজের ভেতর মাছির মতো ভন ভন করছিল কিছু পিঁপড়া। তারা সারিবদ্ধভাবে নেমে যাচ্ছিল একটি খবরের কাগজে। যেখানে ট্রেনের নিচে জীবন সঁপে দেওয়া স্নাতকোত্তর মাহবুব শাহীনের ছবির কাছে একটি কবিতাকে নুয়ে থাকতে দেখেছি। একটা মৃত্যুকে মাথায় রেখে ঘর বাহির করি। তখন শরীরটারই ভেতরে পরান নামের জিনিসটা নিজের অস্তিত্বকে জানিয়ে পরম ঋত দিয়ে যায়।

ভাবনায় সবই আছে, তবু কী যেন নেই। একটা শূন্যস্থান কিংবা পাহাড়সম একটা গহ্বর বুকে বহন করে খুঁজে ফিরি সেই নিখোঁজ অহঙ্কার। কাউকে দেখাতে পারি না। বোঝাতে পারি না তার আকার কিংবা অঙ্গ-অবয়ব। কত ছবি তুলি, প্রকৃতি, মানুষ, আলো-আঁধার, নানারকম মুখ, হায় বুকের ওই অদ্ভুত শূন্যতার ছবিটা তো ফ্রেমে আসে না! কিন্তু টের পাই সে আছে, বিশাল একটা জায়গা নিয়েই আছে। রাত গভীর হলে আয়নার সামনে দাঁড়াই, আবছা আলোয় দেখি জানালার ওপাশে থরথর করে বেড়ে উঠছে আকাশ (সত্যিই কি বাড়ছে না আমাকেই শুধু ছেড়ে যাচ্ছে?)। উঠছে দালান, ঘর-বাড়ি, সমীকরণে জমছে কত নতুন সংসার। কিন্তু আমি তো বাড়ছি না।

শক্তির কবিতা মনে পড়ে ‘সবার বয়স বাড়ে, আমার বালক বয়স বাড়ে না’। স্মৃতিকে আলোকি উদ্ধার ভেবে আমি নস্টালজিক হই, মাতৃগর্ভ থেকে আবার হাঁটতে শুরু করি। বালক হই। নদীতে যাই। বালকবেলায় পাওয়া সেই নদীতে আমার বয়স হারাই। বুঝতে পারি মাতৃগর্ভে ফিরে যাওয়া সহজ নয়।

আবার বালক বয়সের ক্লান্তি নিয়ে আমি যখন জীবন মুখস্থ করতে বসি তখন বসুন্ধরার আকাশে কোনো চাঁদ থাকে না। স্ক্রল করে আকাশে পাই না আলোর কোনো সংবাদ। তবু হাওয়া দুলে ওঠে। হাওয়া ধাক্কা দেয় বুকের কপাটে। কী আশ্চর্য! হঠাৎ কোথাকার আলো উছলে ওঠে আমার নিগুঢ় অন্ধকারে। আমি কার কাছে যাই, কারে গিয়া জিগাই এই আলোর উৎস কোথায়?

‘আমার নাও যে গাঙে ডোবে না, ও মাঝি খবরদার’

পশ্চিম দুনিয়ায় মানুষগুলোর যাপনের শরণ হু হু করে বাড়ছে আর আমার ভাঙা নাওয়ে একই বেগে বাড়ছে জলের হাহাকার। গলা সাধে না গানের সেই পরম প্রাকৃত সুর। পালিয়ে আসা বহুগামী মেয়েটার মতো এ ঘরে-ও ঘরে উঁকি দেয় শুধু ভাগ্য। আর আমায় বলে অচিন কোনো ভাঙা তাসের ঘরে তুমি ফেলে এসেছো তোমার হ্যান্ড-জিওম্যাট্রি?

কথাটা মনে আসতেই শরীরের সব ক’টি ইন্দ্রিয় দাঁড়িয়ে যায় একযোগে। সব ক’টি ঘুমন্ত কোষ জেগে ওঠে আড়মোড়া ভেঙে আর হঠাৎ বিদ্যুৎ পলকে আমার মনে পড়ে যায়- আমি তো মরে গেছি কয়েক হাজার বছর আগের কোনো ইতিহাসে, অন্য কোনো জীবন-আনন্দে!

তবে একদিন আমি ঠিক ঠিক লিখে দেবো স্মৃতির গাঙচিল, অভিমানী দূরের নদী, নৌকাতে রাত, ডুবে যাওয়া গান, উড়ে যাওয়া ঘুড়ি, বাঁশি আর বুকে ভাঙচুর, এই সব লিখতে লিখতে আমি পেয়ে যাব সেই বাতিঘর। বলে দেবো, ‘দেখো শৈশব, আমি এখনও মাটির ছেলে, সুদিন আনতে গিয়ে কবিতা ভুলিনি।’

তারও আগে জ্বরতপ্ত শরীরে বিছানাটাকে একটা সবুজ ঘাসে মোড়া মাঠ মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল একটা ঘাসপ্রিয় মাঠে আমি এধার-ওধার করছি। আমার ভালো লেগে যাচ্ছিল আর টের পাচ্ছিলাম ফুটবলের মতো বারবার গোলপোস্টের খুব কাছ থেকে বাঁধা পেয়ে পেয়ে, ফিরে ফিরে যেন আসছি। কেন আসছি?
কখনও পেনাল্টি শটেও পারছিলাম না লক্ষ্য ছুঁতে। আর এর সবকিছুই ঘটছিল আবছা স্বপ্নের বিভ্রমে। তারপর খুব যত্নে, হাতের তালুতে দুটি চোখ রেখে দেখি-ভোরের শিশির হয়ে চোখের জলে লেপটে আছে জীবনের সব অনাগত সুখ। আচ্ছা…

সুখের কথা কি শব্দে বলা যায়? কিংবা অসুখের কথা। শুনেছি সব কথা ইতোপূর্বে বলা হয়ে গেছে। নতুন কিছু চাই, নতুন হৃদয়ের কথা।

তাহলে আমরা যা বলছি তা কি অন্য কারও বলে যাওয়া কথা? অন্য কারও হেসে যাওয়া হাসিটা কি নিজের মতো করে হাসছি? আর অন্য কারও দেখে ফেলা স্বপ্নটাও নিজের মতো করে দেখছি অবিরাম? তাই যদি হয় তাহলে যে পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে সবুজ মাঠের শেষ প্রান্তে ছায়াবৃক্ষের দরজাটা পেতে চাই সেই পথটাও কি অন্য কারও পথচিহ্নে তৈরি হয়েছিল? কে জানে এর উত্তর?

ভাবনাটা থিতু হয় কারওয়ান বাজারে, ফুটপাতে, আইল্যান্ডে। সেখানে অযথার্থ গোল বেত ঝুড়িকে বিছানা বানিয়ে, শরীরকে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করে সেই টুকরি বাড়িতে যারা ঘুমায় তাদের ঘুমে কি স্বপ্নরা আসে? এ রকম একটি জিজ্ঞাসা থেকে দেখি আমি তাদের গভীর রাত। দেখি গভীর ঘুমের ঘোরে তাদের শরীর একটু, অল্প একটু সম্প্রসারিত হতে চায়। এ শহরের শত দালানের শত কোটি স্বপ্নের কাছে এ তো এক সিকি তুলো মাত্র চাওয়া। অথচ সেই গোল টুকরির ভেতর থেকে পা দুটি বাইরে বেরোচ্ছেই না কিংবা বেরুলেও কোমরের দিকটা টুকরির তলানিতে লেগে থাকায় পা দুটি টুকরির বাইরে থেকেও ঠিকমতো আরাম নিতে পারছে না। এইরকম অবস্থায় ঘুমন্ত মানুষগুলো মটমট করা শরীর নিয়েও স্বপ্ন দেখছে নিশ্চয়? কি সেই স্বপ্ন জানার বড় ইচ্ছে আমার।

মাঝে মাঝে ওইসব গোল টুকরির তলানিতে লুকিয়ে থাকা কোমরের ব্যথা ভর করে আমার মনে। সঙ্গোপনে। তখন রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে- বৃথা অভিসারে এ যমুনা পাড়ে এসেছি।

তবে তীরহীন এই শব্দ সমুদ্দরে এসে আমার দেখা হয়েছে একটা কারও সাথে। স্মৃতি মেঘে আমি তো তাকেই খুঁজছিলাম। শব্দের সাঁকোতে আমার দেখা হয়েছে তার ভেজা বৈতরণীর সাথে। সে লেখে-হাওয়া আছে তবু নাকি সংযোগে পাওয়া তার ব্যথার বাড়ি। তাই সিঁধ কেটে মৃত্তিকা আনতে চায় সে আলোর নামে। আবার নীরবতায় নাকি তার পালিত চিঠির পালক উড়ে যায়। নিয়ে যায় বাক চিত রোদ্দুর। তারপর সেই মৌনতায় সে অভিমানে দাঁড়ায়। আমি জানতে চাই জেলে নাকি জলের খোঁজ সে চায়!

আমি তার শব্দ থেকে ভাবনার গেরো খুলতে পারি না। তাই বাতাসও ছিদ্র করা হয় না। নিজের অক্ষমতা জেগে ওঠে রাজ্যচ্যুত রাজার মতো আর জীবনটাকে মনে হয় অহেতুক কালাপানির দ্বীপ। যেন আমি ইচ্ছে বনবাসে। তখন শেখ লুৎফরকে মনে পড়ে- আমারে কেডা যে কইছিন এই কালাপানির দ্বীপে আইতাম!

অন্যের শব্দের জট খুলি কী করে? নিজের লেখার শক্তি আর উদ্দীপনাও তো হারাচ্ছি ক্রমাগত। ব্যক্তিগত জীবন বন্ধক রেখে প্রতিষ্ঠানের কাছে তাই আমার আর হয় না লেখা।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভাবি আজকের দিনটাকে লিখবো, ইচ্ছে হয় কিন্তু শক্তি হয় না। সকালে জেগে দেখি জানালার ওপাশে অন্য কোনো বাড়ির ছাদে হালকা বাতাসে স্কুল বালিকার ফ্রক উড়ছে। দেখি, বালিকার মা তার ভেজা শাড়ি রোদে দিয়ে খুব অহঙ্কারী পায়ে ছাদ থেকে নেমে যাচ্ছে। এই সব রোদ, বাতাস, ফ্রক আর ভেজা শাড়ির গল্পও লিখতে ইচ্ছে করে। পারি না।

প্রতি মঙ্গলবার লিফটের গোড়ায় একজনের সঙ্গে দেখা হয়। সে অফিসে যায়, আমি অফিস থেকে ফিরি। সে মনে মনে হাসে, আমিও। তাকে বলতে ইচ্ছে করে ‘আমাদের মঙ্গলবারের সকালগুলোর সঙ্গে লিফটের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে সেটা কি জানেন?’ বলা হয় না। ভাবি, এই না বলাটাই হয়তো একদিন লিখবো।

কিংবা রাতের অন্ধকারে ওই যে মধ্যবয়স্ক লোকটা দাঁড়িয়েছিল একটি নির্জন রেল স্টেশনে। যার বিশ্বাস ছিল ঢাকা থেকে সিলেটমুখী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি নিশ্চয় তার স্টেশনে থামবে। থামেনি। তবে স্টেশনের খুব কাছে এসে ট্রেনটা একটু শ্লথ চলছিল। লোকটা তাড়া খাওয়া মাছির মতো দৌড়াচ্ছে ট্রেনের পাশ দিয়ে, ট্রেনের যেকোনো একটি দরোজা যেকোনো মূল্যে সে ছুঁতে চায়। দৌড়াচ্ছে দৌড়াচ্ছে আর একটা সময় দৌড়াতে দৌড়াতে ঠিকই ধরে ফেলে চলন্ত পিচ্ছিল একটি দরোজা। ট্রেনের নিচে পড়ে যাওয়ার সকল সম্ভাব্যতাকে পাশ কাটিয়ে সে উঠে যায় ট্রেনে আর খুব আনন্দে, দৌড়বিদ কোনো বিজয়ীর মতো হাসতে হাসতে জোরে জোরে শ্বাস নেয়, হাঁপায়, আর হাঁপাতে হাঁপাতে ট্রেনের বগিতে লোহার মেঝেতে পড়ে যায়। আর ওঠেনি। উঠতে পারেনি কোনোদিন। আমি তো সেই পড়ে যাওয়া জীবনের কথাও লিখতে পারতাম!

বান্টি নামের এক সহকর্মী মরে গেল সেদিন। বাড়ির পাশের অভিজাত সেতু থেকে লাফ দিয়ে সে জীবনকে গুডবাই বললো। নিজেকে নিজের ইচ্ছেতে ছুড়ে দিলো মৃত্যু গহ্বরে। খুন করলো নিজের অসমাপ্ত জীবন। কেন? মানুষ কেন নিজেকে খুন করে? মানুষের চূড়ান্ত দুঃখের কী নাম জানি না। যে জীবনের প্রয়োজনে আমাদের এত সুখ, স্বপ্ন, দুঃখবোধ, এত বঞ্চনাবোধ আর এত হাহাকারের আনন্দ সেই জীবনকে বিনাশ করে দেওয়ার মতো বড় অসুখ আছে? এই প্রশ্ন মাথায় নিয়েও হয়তো লিখতে পারতাম অন্তত একটি দুটি শব্দ। আর লিখবো বলে নিজেকে তৈরিও করি। তবু আমার হয়ে ওঠে না।

লিখবো বলে ভুলে থাকি শৈশব, কৈশোর আর প্রথম চুম্বন। প্রথম সবকিছু। লিখবো বলে ভুলে থাকি হাফপ্যান্ট, ধুলো আর তিন চাকা, ছুটির স্কুল, স্কুলের ছুটি। মনে রাখি না বালি রঙ পথ, সবুজের হাওয়া পাতা, প্রিয় দুপুর, নদী তীর, আকাশ ও দিগন্তের এক হয়ে যাওয়া।

তবে একদিন আমি ঠিক ঠিক লিখে দেবো স্মৃতির গাঙচিল, অভিমানী দূরের নদী, নৌকাতে রাত, ডুবে যাওয়া গান, উড়ে যাওয়া ঘুড়ি, বাঁশি আর বুকে ভাঙচুর, এই সব লিখতে লিখতে আমি পেয়ে যাব সেই বাতিঘর। বলে দেবো, ‘দেখো শৈশব, আমি এখনও মাটির ছেলে, সুদিন আনতে গিয়ে কবিতা ভুলিনি।’

ভালো লেখালেখিটা তো শুধু গতরে খাটার কাজ নয়, অনেক পড়াশোনা লাগে, খোলা চোখ-কান লাগে, অভিজ্ঞতা লাগে, জীবনকে নেড়েচেড়ে দেখে বেঁচে থাকা বা না থাকার একটা মানে স্থির করে নিতে হয়, খোলাসা মগজ লাগে একটা তার চেয়ে বেশি, একটা এক্স ফ্যাক্টর লাগে জিনের ভেতরে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকা খুব একটা সৌভাগ্যের জিনিস ..ভূমেন্দ্র গুহ

শব্দে কত কথা ধরে ফেলার কথা ছিল। ওই যে শীতকাল। ভারি কাপড় গায়ে পরে হেঁটে বেড়ানোর ভোরবেলা। শেষ রাতের আভা শরীরে মেখে উঠি উঠি সূর্য। শিশির ভেজা স্ফটিক বৃক্ষরাজি, কিংবা ওই যে বাড়িটা। যেখানে অনেকদিন হলো কোনো অতিথি আসে না। বাড়ির ভেতর একদম কোনার ঘরে নিঃসঙ্গ এক বুড়ো। যেখানে আছেন কেবল সেখানেই আছেন, নড়েন না, চড়েন না। খোঁজ রাখেন না, খোঁজ জানেন না অন্য কোনো ঘরের, কোনো আসবাবের। সেই মানুষহীন, শব্দহীন, অতিথিহীন বাড়ির নিচ তলার নিঃসঙ্গ ড্রয়িংরুমে স্থির সোফার একাকীত্ব, অপেক্ষা আর দরোজার দিকে কান পেতে রাখা কলিংবেলের গভীর আশার গল্প-সবগুলোই তো আমার শব্দ বর্ণে, বাক্যে শিকার করার কথা ছিল একদিন। পারছি না তো! জিনের ভেতরে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকা খুব একটা সৌভাগ্যের জিনিস কি আমার নেই?

Comments

comments

সেজুল হোসেন

সেজুল হোসেন

জন্ম সুনামগঞ্জে ২০০১ থেকে সাহিত্যের ছোট কাগজে লেখা শুরু প্রকাশিত গ্রন্থ : ফুলপাখির জন্মমৃত্যু ২০১০ শুদ্বস্বর স্মৃতিমেঘ স্বপ্নজলরেখা ২০১৩ স্বপ্নসিঁড়ি দখিন দুয়ারের হাওয়া ২০১৪ ভাষাচিত্র কবিতা, জার্নাল ছাড়াও নিয়মিত লিখছেন গান, টিভি নাটক। নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত। স্বপ্নসিঁড়ি অডিও ভিজুয়াল নামের একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী তিনি। ——সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন ২০০৪ সালে। ২০১৪ সালের শেষের দিকে যোগ দেন বেসরকারী টেলিভিশন এটিএন নিউজে লেখাটাকেই নিজের জীবনের একমাত্র গভীর প্রয়োজন মনে করেন। ——'স্মৃতিমেঘ স্বপ্নজলরেখা' প্রকাশ হয়েছিল ২০১৩ তে। ছিল ছোট শহর ছেড়ে বড় শহরে আসার কষ্ট। ’ও জীবন ও মায়া' সেই বইয়েরই ধারাবাহিকতা আছে নগরে থেকেও নাগরিক হতে না পারার যন্ত্রণা। shejulhussen@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি