সাম্প্রতিক

চৌখুপির আনন্দ । পলি শাহীনা

বেশ কিছুদিন আগে অনামিকা একটা বেলি ফুলের গাছ এনে বারান্দার টবে লাগিয়েছে। বিক্রেতা খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিল – কয়েকদিনের মধ্যেই ফুল ফুটবে। বিক্রেতার কথা শুনে অনামিকা তো  মহাখুশি। পরিচর্যার কোন কমতি ছিলো না। কিন্তু ফুল ফোটেনি। অনামিকাও অনেকটা আশা ছেড়ে দিয়েছে। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলার আলো -আধারিতে অনামিকা দেখে, গাঢ় সবুজ পাতার ফাঁক হতে ধবধবে সাদা বেলি ফুল ওকে উঁকি দিয়ে ডাকছে। ফুল ফুটেছে! ফুল ফুটেছে! অনামিকার ভারী আনন্দ হলো! ঘরে সন্ধ্যার আলো না জ্বালিয়ে ও অন্ধকারে চোখ বুঁজে মিশে থাকে ফুলের শরীরে, গাছের সঙ্গে। ও  ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে বেলি ফুলের গন্ধে।

অন্ধকারের শরীরজুড়ে আচমকা অনামিকা একটা ফিসফিস ডাক শুনতে পায়। কে যেন কাঁপা কাঁপা গলায় নাম ধরে ডাকছে। ভালোভাবে কান পাততেই হুড়মুড়িয়ে ধেয়ে আসে ছোটবেলা।

‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’  – আনোয়ার চাচার সুরেলা কন্ঠের গান স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে অনামিকা। ওর প্রিয় ঝোলা ভর্তি বেলি ফুল নিয়ে চাচা ডাকছে। সন্ধ্যায় ফোটা বেলি ফুল পরেরদিন দুপুরে ঝরে যাওয়ার আগেই কাক ডাকা ভোরে চাচা ফুল নিয়ে আসতেন অনামিকার জন্য। উঠোনে দাঁড়িয়ে আদুরে গলায় নাম ধরে ডাকতেন। ঘরে তখনো সবার ঘুম ভাঙে নি। চোখ কচলাতে কচলাতে ঘর ছেড়ে উঠোনে নামতেই চাচার ঝোলা ভর্তি বেলি ফুলের ঘ্রাণে অনামিকার ঘুম উড়ে যেত দূর দিগন্তে।

চাচার হাত থেকে বেলিফুল নিয়ে দু’জনে হেসে হেসে গল্প করতো। চাচা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। বেলি ফুলের গন্ধ ততক্ষণে উঠোন পেরিয়ে পুরো বাড়ী জুড়ে ম ম করছে। চাচার কাঁধের ঝোলায় মা কিছু চাল-ডিম-আলু দিয়ে দেন। কখনো নারিকেল -সুপারিও দেন। মায়ের হাতের কাছে যখন যা থাকতো, তা দিতো। চাচাও যখন যা পেতেন তাতেই খুশি হতেন। চৌদিক আলো করে হাসতেন। চাচার হাসিতে অনামিকার গোটা দিনটি বেলি ফুলের মতো মিষ্টি হয়ে উঠতো। হাসতে হাসতে অনামিকার হাতে রঙিন কাঠির লজেন্স দিয়ে চাচা বিদায় নিতেন। অনামিকা তাঁর চলে যাওয়ার পথের দিকে অপলক চেয়ে থাকতো।

অনামিকা চৌখুপি থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি পেয়ে দুলছে আর বেলি ফুলের সুবাস শুঁকছে। কতদিন বদ্ধ এ চৌখুপিতে নিজেকে ছুঁয়ে দেখবার অবসর মেলে নি অনামিকার। বহুদিন পর নিজেকে ছুঁয়ে দেখার আনন্দ প্লাবনে ও ভাসছে। হিম হিম ঠান্ডায় বেলি ছুঁয়ে থাকে অনামিকাকে, আর অনামিকা ছুঁয়ে থাকে প্রিয়  বেলিকে। কী নিশ্চিন্ত ওরা পরস্পরকে ছুঁয়ে।

আনোয়ার চাচা কোনদিন ‘ভিক্ষা চাই’ বলে কারো উঠোনে চিৎকার করতেন না। মানুষের বাড়ী বাড়ী গিয়ে ফুলের বিনিময়ে যে যা দিতেন তা নিয়ে আনন্দে দিন কাটাতেন।

অন্ধকারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেলি ফুলের ঘ্রাণ তীব্র হয়ে উঠে। মনের আকাশ ভেঙে অনামিকার চৌখুপি জুড়ে নেমে আসে স্মৃতিঝড়। ঝড়ের বেগে ঘোর কেটে ওর কেমন এলোমেলো লাগছে।

অনামিকা গ্রাম ছেড়ে ইট-কাঠের দেয়াল আর দেয়ালের ঠাসাঠাসি ভীড়ের চৌখুপির জীবন বেছে নিলেও গ্রাম ঠিকি রঙ – রুপ- গন্ধে ওকে প্রিয়জনের মতো আগলে রেখেছে। গ্রামের সহজ জীবন, অনিন্দ্য সুন্দর সব অনুভূতি ওকে সুখ দেয় এ চৌখুপিতে। ওর অনুভূতির উঠোনজুড়ে গ্রামের মমতাময় দৃশ্যগুলো ফুল হয়ে ফোটে, সুবাস বিলায়। জীবনের কাটাকুটি খেলায় অনেক বছর আগে গ্রাম ছাড়লেও, ফেলে আসা গ্রাম খানি চায়ে ভেজা বিস্কুটের মতো ওর বুকের গহীনে লেপ্টে আছে। এত এত বছর পরও এ চৌখুপিতে অনামিকার গ্রাম কোজাগরী পূর্ণিমার আলো হয়ে কলকল করছে।

মাথার উপরের ছাদটিকে প্যারাসুটের মতো উড়িয়ে দিয়ে অনামিকার কল্পনাবিলাসী মন ওর গ্রামটিকে পরম আদরে ছুঁয়ে দেয়। গ্রাম ওকে শীতল ছায়া বাড়িয়ে দেয়, কড়ে আঙুল বাড়িয়ে কাছে ডাকে। অনামিকা আর ওর গ্রাম, পরস্পর পরস্পরকে ছুঁয়ে অনন্ত ভালোবাসায় ডুব দেয়।

তপ্ত দুপুর গড়িয়ে নকশাআঁকা নরম বিকেল নামে। বিকেলের ভাঁজে ভাঁজে চালতা ফুলের সুবাস ওকে ব্যাকুল করে তোলে। অনামিকাদের বাড়ীর দক্ষিণ দিকে বাঁশঝাড় পেরিয়ে ঘণ অরণ্য, তার মাঝখানে চালতা গাছ। কিন্তু ওই অরণ্যে যেতে মানা। চালতা গাছে নাকি ভূতপ্রেত থাকে। কে শুনে কার মানা! মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনামিকা ঠিক চলে যায় চালতা ফুলের কাছে। দীর্ঘ সবুজ পাতার আচ্ছাদন সরিয়ে বেলি ফুলের মতো সাদা নরম পাপড়ির চালতা ফুল নিয়েই তবে ও বাড়ী ফিরে।

‘চালতা ফুল কি আর ভিজিবে 

না শিশিরে 
জলে নরম গন্ধের ঢেউয়ে? ‘
                .জীবনানন্দ দাশ  

আহা! সে কোন ছেলেবেলায় ডুবে অনামিকা আজ আনন্দে ভেসে চলছে! 

আষাঢ়ের কালো আকাশের মত চৌখুপির মন কেমন করা বন্দি জীবনের থৈ থৈ অন্ধকার মুছে দেয় হোগলা বন। মাথার উপর পাখীর দল বৃত্তাকারে উড়ছে আপনমনে। পদ্মপাতায় টলমল করছে পানি। কলা গাছের ভেলায় চেপে হোগলা বন, পাগলা হাওয়ায় চুল উড়িয়ে, কচুরিপানা ডিঙিয়ে অনামিকা দূরন্ত উচ্ছ্বাসে এগিয়ে চলছে পদ্মফুলের দিকে। কী আনন্দ! কী আনন্দ! যে আনন্দ সমস্ত বিষন্নতা মুছে চৌদিকে  ছড়িয়ে পড়ছে। অলৌকিক এক ভালোলাগার  শিহরণে অনামিকা থরথর কাঁপছে।
 

চৌখুপির গর্ভে প্রাণ যখন আকুলিবিকুলি করছে,  তখনই সবুজ মাঠ পেরিয়ে বুড়ো বটগাছটি অনামিকার কাছে চলে আসে। গাছটির নাম দিয়েছিল ও ঘুম গাছ। এ গাছের নিচে কাঁধের গামছা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে দেখেছে কত চেনা অচেনা মুখ। একদিন আনোয়ার চাচাকে দূর থেকে ও দেখেছিল অচেনা এক মানুষের সাথে কথা কাটাকাটি করতে। অতঃপর, ঠিক ঘুম গাছটির নিচে এসে দু’জনে হাত ধরে  মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এ গাছটির নিচে বসলে অনামিকারও ঘুমে দু’চোখ জড়িয়ে আসতো। ওর অনেক খেলার সাথী ছিল। ওরা একসঙ্গে মাটি-কাদায় পা ডুবিয়ে খেলতো। খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে সোঁদামাটির গন্ধ শরীরে মেখে ওরা বুড়ো বটগাছটির নিচে ঘুমিয়ে পড়তো। 

কী আশ্চর্য! বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ, বটগাছটির ঝিরঝিরে হাওয়া, এ চৌখুপিতে এসে অনামিকার চোখের পাতায় দোল খাচ্ছে। ও দুলছে, নাচছে আনন্দ উল্লাসে। 

দুধের মতো সাদা আকাশ ভেঙে অন্ধকারের পাহাড় ঠেলে ওর বন্ধুদের মধুর কন্ঠ ভেসে আসছে কানে। জগতের সমস্ত সুন্দর এসে ভীড় করছে যেন এ চৌখুপিতে। ওর বন্ধুরা নাম ধরে ডাকছে আর বলছে, চলো বেরিয়ে পড়ি অজানার পানে। ওরা গলা ছেড়ে গাইছে – জীবনের গান। গানের শরীরজুড়ে কত কত আদর, ভালোবাসা। 

আকাশচুম্বী দালানকোঠার ভীড়ে অনামিকার চৌখুপিটি কানায় কানায় ভরে উঠে সুখ সুখ গন্ধে। বেলিফুলের তীব্র ঘ্রাণ আর ছোটবেলার আস্কারায় ওর হাতদুটো যেন ডানা হয়ে উঠেছে। সুখের বন্যায় ও ডানা মেলে উড়তে থাকে মুক্ত আকাশে। ওর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ছে লাল-সবুজ ঘুড়ি। ও উড়তে উড়তে চলে যায় আনোয়ার চাচা, আম্মা, অরণ্য পেরিয়ে চালতা ফুল, হোগলাবন, পদ্মফুলের কাছে। 

ফুলেল সুভাস, মুগ্ধতা ঘেরা সব দৃশ্য আর খাঁটি মায়ায় জড়ানো মানুষের ছায়ায় ঘেরা ছিল অনামিকার ছোটবেলা। মা – আনোয়ার চাচা আজ মনের দেয়ালে ছবি হয়ে আছে। ব্যস্ততার কাদাজলে নিমজ্জিত অনামিকার বহুদিন মায়াবী ছবিগুলোর সামনে দাঁড়ানো হয় নি। ছবির সামনে দাঁড়াতেই নিজেকে খুঁজে পায়, চোখ ভিজে আসে। মন খারাপের অন্ধকার সরিয়ে অনামিকার মনে হয়, ও যেন রুপোলী মায়ার চাদর জড়িয়ে চাচার গল্প শুনছে। মা ঠিক ওর পাশে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এইতো বেশ সুখ সুখ লাগছে। আনন্দ লাগছে। ছোটবেলায় যেমন করে সুঁই সুতো দিয়ে বেলি ফুলের মালা গাঁথতো তেমন করে ও আজ মা-চাচা- ফুল দিয়ে ভালোবাসার মালা গাঁথছে মনের ক্যানভাসে। কী যে ফূর্তি লাগছে! বাতাসের চেয়েও বেশি বেগে ওর মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে। অনাদি-অনন্ত ভেঙে এবার অনামিকার দু’চোখ ভেঙে ঘুম নামছে। 

কবুতরের বাসার মতো বিষন্নতায় ঘেরা চোখুপির জীবন আনন্দে ভরে উঠেছে। আহা! ভালোবাসা! স্মৃতিঝড়ে বিঃধ্বস্ত  অনামিকা হড়বড় করে চৌখুপির সবকটা জানালা খুলে দেয়। বাতাসের শরীর বেয়ে ঘরের মেঝেতে আনন্দ লুটোপুটি খায়। জানালার চওড়া কার্নিশজুড়ে সাজিয়ে রাখা মানিপ্ল্যান্ট সহ বিভিন্ন ফুলের টবগুলো বাতাসে কাঁপছে। কী অনাবিল সুন্দর! আরাম কেদারায় পা ছড়িয়ে দোল খেতে খেতে অনামিকা ওদের আলতো করে ছুঁয়ে দেয়। 

অনামিকা চৌখুপি থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি পেয়ে দুলছে আর বেলি ফুলের সুবাস শুঁকছে। কতদিন বদ্ধ এ চৌখুপিতে নিজেকে ছুঁয়ে দেখবার অবসর মেলে নি অনামিকার। বহুদিন পর নিজেকে ছুঁয়ে দেখার আনন্দ প্লাবনে ও ভাসছে। হিম হিম ঠান্ডায় বেলি ছুঁয়ে থাকে অনামিকাকে, আর অনামিকা ছুঁয়ে থাকে প্রিয়  বেলিকে। কী নিশ্চিন্ত ওরা পরস্পরকে ছুঁয়ে। 

ঠিক তখনই কোন এক নাম না জানা রাত জাগা পাখী ডেকে উঠে।

Comments

comments

পলি শাহীনা

পলি শাহীনা

লেখকের জন্ম ৪ জুন, নোয়াখালী জেলায়। স্কুলে পড়ার সময় থেকে লেখালিখির সাথে যুক্ত। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশ্যে স্ব রচিত কবিতা পড়েন এবং লেখার শুরুটাও স্কুল কলেজের দেয়াল পত্রিকায় লিখে। আর তার পরের গল্প-ত স্থানীয় ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিকায় পাওয়া যাচ্ছে তাকে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ তিনটি। প্রথম কাব্য গ্রন্থ - গভীর জলের কান্না ( ২০১৬) । দ্বিতীয় স্মৃতিগদ্য - হৃৎকথন ( ২০১৯) । তৃতীয় গল্পগ্রন্থ - ধূসর নির্জনতা ( ২০২১) । বর্তমানে 'সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক'র' সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং নিউইয়র্কে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে সক্রিয়।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি