সাম্প্রতিক

প লা শ দ ত্ত

কবিপ্রিয়অন্ধকার

তারপর থেকে আমি প্রতিরাতে বসি। আর লেখার চেষ্টা করি। কিন্তু কবিতা বিষয়ক কোনো কথাই আমার মনে আসে না। শুধু নিরেট রাতকে মনে হয় কবিতার সঙ্গে অপার সম্পর্কের কোনো প্রাণ। ধরতে পারি না। ধরতে পারি না। ধরতে পারি না। কবিতার সঙ্গে রাত্রির অন্ধকারের সম্পর্কের চেহারাটা কিছুতেই ধরে উঠতে পারি না। শেষকালে অন্ধকারকে নিয়ে এই কথাগুলো কোত্থেকে কীভাবে বের হয়ে আসে। দাঁড়িয়ে যায়। জানি না। আপনার রুচিমাফিক হলো কি না। তবু অন্ধকারের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে আমি এই রাতকথাগুলি ফেলে দিতে পারি না। মনে হয় কবির এই অন্ধকারকে কবিতার এই অন্ধকারকে হয়তো আপনি ভালোবাসতেও পারেন।

নিজেকে উদ্যাপন রাত। নিজেকে উদ্যাপন রাতের অন্ধকার। রাতে আমার অতীতের ইতিহাস মনে পড়ে। রাতে আমাদের অতীতের ইতিহাস মনে পড়ে। নিজেকে শুধরে নেয়ার কোনো সুযোগ সেই স্মরণে নাই। শিলংয়ের মেঘ তখনো আমাদের নিজের নিজের সঙ্গী কি? আমি ৪২৭ নম্বর বিছানায় শুয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে আছি রাতে। অন্ধকারে। শিলংয়ের গাড়ির হেডলাইট এই আলো নেভানো রাতে। ঢাকাশহরে। হুইটম্যান সাহেব, কবি, কবি নিজেকে উদ্যাপন করতেছে। এখন তারা অন্ধকারের আশায় বন্ধ ঘরের ছাদের দিকে তাকায়ে থাকবে। আপনি কি দেখতেছেন?

পাহাড়ের ওপর ঝুলে থাকা আকাশে যতো তারা কবিদের মুখের দিকে। চেয়ে থাকার অভ্যাস রপ্ত করে। ওই আকাশে এই যাত্রায় নিজেদের উদ্যাপন সাঙ্গ হবে। কবি কি তখনো জানে ওইখানে তার আর বেশিদিন থাকা হবে না? জানে সে ওইখানে আজীবন থাকিবে? চার দেয়ালের ওপর ওই তারাবৃন্দ অন্ধকারের সুবাদে—লাইট নেভানো অন্ধকারের সুবাদে—হানা দিয়ে দিয়ে যাবে।

প্রত্যেক রাতে মনে পড়তে পারে ফেলে আসা জীবনের কথা। দিনের বেলা ওইসব জীবনের ফাঁক অলীক বাস্তবতা বুঝে ওঠা যায়। কিন্তু রাতে তা নেশার মতো। বাস্তব বাস্তবতার মতো। অন্ধকার কী করে সময়কে এতোটা কাছে এনে দেয়? সময় কাছে এলেই বা কী রকমে এতোটা সশব্দ হয়ে ওঠে?

২.

অন্ধকারে অনেক কথা মনে পড়ে। অন্ধকারে অনেক কথা মনে হয় সত্য। নিরেট অন্ধকার দ্যাখা কতোটা সৌভাগ্য? নিরেট অন্ধকার দ্যাখার সুযোগ কতো? এখন তোমার অন্ধকার ছাড়া নিজের সময় নেই। সারাটা দিনের শেষে একমাত্র বাতি নিভলেই সূর্য ডুবলেই দ্যাখা হচ্ছে নিজের সঙ্গে। অন্ধকারে ইচ্ছে হয় উঠে বসি। তারপর হই দিনের মতো দ্রুত।

কিন্তু দিন যেভাবে গ্রাস করে রাখে কবিকে অন্ধকারকে কী করে সেই মুক্তি আমাকে দেয়? কবিতা কি তবে অন্ধকার-প্রিয়? জেনে গেছি সমস্ত রাত পৃথিবীর মতো ফলপ্রসূ ছিলো কবিতার জীবনে। জেনে গেছি কাম দুর্দান্ত সুস্বাদ প্রতিবন্ধক ছিলো কবিতার ময়দানে। বয়সী অন্ধকারের ছায়ায় কবি তাই আদ্যন্ত বসে থেকেছে ধ্যানত্রস্ত। ঋষি।

অন্ধকারের প্রতীক্ষায় কবির প্রার্থনা আমরা দেখিনি তেমন দুর্ভাগ্য। আমরা তবে বিষবিস্তারী অন্ধকারকে ছুঁয়ে দেখবো না বন্ধু! আমরা কি রাত জেগে মুখোমুখি কথা বলি প্লাতেরো? আমরা কি মহাশূন্য-আঁধারে স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎমালা!

আরো কোনো কবি অন্ধকারে দেশে ফিরে যাচ্ছে। কার চোখে ধসে পড়তেছে তুষার। কে চোখ বন্ধ করে চেয়ে আছে আকাশের দিক। এইসব কাম দূরে ঠেলে রাখা রাত এইসব সমূহ ক্রমশ দেশে ফেরা নিজস্ব রাতে-পৃথিবীর হিসেবে এইসব অনেকের পাপের দিকে টানছে। কবি কি তবু অন্ধকার?
কবি কি তবু একাএকা?

আমার অন্ধকার এখন দিনের স্বচ্ছ আলো। অন্ধকার এখন স্পষ্ট হাত ধরে ফেলছে আমার যতো চেনা মানুষের। এখন তবে রাত আর দিনে আমাদের তফাৎ নেই কোনো? আরো এক দফা আমরা মিথ্যের দিকে যাবো? জগতে যা কিছু বাস্তবিক ঘটে তাকে বলবো অন্ধকার—কবিতার ঘোড়াশালে। বলবো ওইখানে নিখাদ কল্পনাই আলো। পৃথিবী গোলাকারে ঘোরে বলে মানুষ অন্ধকারকে ভুলে গেছে। ভালোবেসেছে নিঃসংকোচে আলো। শুনেছে অন্ধকারে এই পৃথিবী নাকি আদিম ছিলো। ওইদিকে অন্ধকারেই গোটা পৃথ্বীজুড়ে মানুষ বসে পড়ছে কল্পনায়-কল্পনায়—আরো কিছু অধরা রয়ে গেছে বলে।

কবি তুমি অন্ধকার ভালোবাসো। ওইখানে প্রাণের অজানা উদ্ভাস বলে। শরীরে শরীর মিলে প্রকৃতই প্রাণ। কেবলি প্রাণ। প্রয়াসশূন্য এ অঙ্কুর আনন্দ আনন্দ।

দায়িত্ব পেয়ে আলোক সরকার বৃষ্টির পর রাস্তায়; অলোকরঞ্জন তাকে বন্ধুশ্রদ্ধাবশে ছেড়ে দিলেন তুষারের বনে। এইসব অজানা আপ্লব সূর্যের নাম জানে না। দিনে কি রাতে যখনি এ-খবর মানুষের কাছে যাচ্ছে তখন এসে ভর করতেছে অখ- নীরবতা। তাকে মানুষ জেনেছে রাত্রির নামান্তর। এই জানা নিশ্চিত মানুষের দোষ—সে যদি নীরবতায় আঁধারের সুমহান প্রান্তর দ্যাখে; দেয় কী করে কবি চাপায়ে রাত্রির কিবা অন্ধকারের ঘরে? তবু সব অন্ধকার কি ওইরকম সোনালি ও সফল? আমরা তো জানি পৃথিবীর বাতাস দিনে-রাতে একই ভরপুর অক্সিজেন অক্সিজেন। তাহলে অন্ধকারকে কেনো ভয় পায় পৃথিবীর মানুষ? কেনো অন্ধকারে অস্বস্তি এইসব মানুষের?

এখন অন্ধকার। ঘুমোতে চলে যাচ্ছে কে কে? আমরা তাদের বাঁচানোর শিখরে দাঁড়াবো। দেখবো সে কী কী ভাবে ওই ঘুমের আগে। দেখবো সে কেমন ছটফট আয় ঘুম আয় ঘুম করে অন্ধকারে। কিন্তু আমরা তো সব সাধারণ, কবি কোথায় কবি? তাকে এইসব অন্ধকার উপহার দেয়া যাক। দেয়া যাক নির্ঘুম আরো শতসহস্র রাতগুলি।

এই যেমন এখন শুধু দ্যাখা যাবে কাছের যতো জিনিস। মনের যোগ কাছের কাছের বন্ধুতে। অথচ হৃদয়। আলোকের মতো দ্রুতিমান।

ওরা কবি। অন্ধকার ওদের আপ্রাণ প্রিয়।

লেখাটি প্রকাশিতহয়
হরমা’ প্রথম বর্ষ  সংখ্যা-১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮

Tags: 

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি