সাম্প্রতিক

সাইন অব্ রেইন । আহমদ মিনহাজ

ডিয়ার রিডারস, আমি হচ্ছি গে লিসা তাবাসসুম। ইচ্ছে করলে তোমরা আমায় ‘লিসা’ বলে ডাকতে পারো। ইন ফ্যাক্ট ঘরে আমায় এই নাম ধরে ডাকে সবাই। আমার চার বছরের বড়ো ইফতিখারকে যেমন পুরো নাম ধরে কেউ ডাকে না, —আমরা সবাই ‘ইফি’ বলে ডাকি তাকে। ইফি হচ্ছে গে আমার বিগ ব্রাদার, যদিও আমি সেটা মানি না। বিকজ, বয়সে বড়ো হলেও তাকে একদম বাচ্চা দেখায়। আমার এই ভাইটি কানে কম শোনে এবং কোনো কথা ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে পারে না। থার্টি ফার্স্ট ডিসেম্বরে আঠাশ ক্রস করবে সে, বাট্, এখনো তাকে বাচ্চাদের মতো লাগে। হুঅ্যান হি ওয়াজ নিয়ার এইটিন্থ, একটা শকিং ঘটনায় সে প্রায় ডিফ হয়ে পড়ে এবং তার কথারা আস্তে-আস্তে জড়িয়ে যেতে আরম্ভ করে। আমার গ্রান্ড-মা, মানে নানু এখনো বিশ্বাস করে, শকিং ইভেন্ট দেখা না-দিলে ইফি খুব বড়ো একটা কিছু করে সবাইকে মাত করে দিতো। নানু যেটা বিশ্বাস করে সেটা মনপ্রাণ দিয়ে করে। বহু ব্যাপারে তার সঙ্গে আমার বনে না। তবে ইফি সম্পর্কে নানুর ওপিনিয়নের সাথে আমি একমত। একটা কিছু হবার এ্যাবিলিটি যে ওর ছিল তা মনে করলে এখন খারাপ লাগে।

ইফি ও আমার মাঝে বয়সের ডিফারেন্স কম হওয়ায় তার ছেলেবেলার অনেক ঘটনা আমি পরিষ্কার মেমোরাইজ করতে পারি। আঠারোয় পা দেবার আগে অব্দি ভীষণ শার্প এন্ড ইন্টেলিজেন্ট একটা বাচ্চা ছিল সে। মেমোরি এতো ভালো ছিল তার, কোনো কিছু একবার শুনে বা পড়ে অবিকল রিপিট করে দিতে পারতো। স্কুলে এক্সামে তার সাথে কেউ পেরে উঠতো না। মিনহুআইল, আরো অনেক গুণ ছিল ইফি’র। ফর এগজাম্পল, সে খুব ভালো গিটার বাজাতো, ক্রিকেট বলে দারুণ সুইং করাতে পারতো এবং দশ বছর বয়সে ড্রইং ও পেন্টিংয়ে তার হাত এমন পেকে উঠতে আরম্ভ করেছিল, —লোকেরা সেটা দেখে অবাক হয়ে যেতো।

9ছবি আঁকা কিম্বা কাগজ-পেন্সিল নিয়ে ড্রইংয়ের হ্যাবিট আজো ছাড়তে পারেনি ইফি। এখনো তার হাতে পেন্সিল বা ব্রাশ ধরিয়ে দিলে নানারকম লাইন এন্ড ফিগারে কাগজ ভরিয়ে তুলবে সে; বাট্, সেগুলো ছেলেবেলায় আঁকা ছবির মতো হয় না; —ফিগারগুলোকে  ট্র্যাকলেস ও এলোপাতাড়ি বলে মনে হয়। ডক্টর আঙ্কেলের মতে এর পেছনে শকিং ইভেন্ট-ই দায়ী, যেটা ইফির ব্রেন-সেলগুলোকে আস্তে-আস্তে ড্যামেজ করে দিচ্ছে। মনের যে-জায়গাটা ওর জখম হয়েছে সেটা রিমুভ না হলে ইফি আর কখনো স্বাভাবিক মানুষের মতো কথা বলতে কিংবা ছবি আঁকতে নাকি পারবে না! ডক্টর আঙ্কেলের সাথে আমি অবশ্য পুরোপুরি একমত নই। এটা ঠিক যে ইফির ড্রইং বা স্কেচে ছেলেবেলার সেই ভয়ংকর ডিসিপ্লিনটা নেই, কিন্তু এগুলোকে এক কথায় রাবিশ বলায় আমার আপত্তি আছে। ট্র্যাকলেস এইসব ফিগারের মাঝে ইফি যেন কিছু এক্সপ্লেন করতে চায় বলে মনে হয় আমার। ছোটবেলা থেকে ওকে জানি আমি, তাই ওর মনের মতি-গতি বুঝতে আমার কষ্ট হয় না। আমাদের ভাই-বোনের মাঝে এমন বহু ব্যাপার আছে যা আমি কারো সঙ্গে শেয়ার করি না এবং জানি না অ্যাট ফিউচার কোনোদিন করবো কিনা। তবে লিখতে যখন বসেছি, ডিয়ার রিডারস, আমি ট্রুলি সবকিছু বলবার চেষ্টা করবো এন্ড আই হোপ দ্যাট তোমরা আমায় বুঝবে।

ইফির ছবি আঁকার কথা লিখতে গিয়ে ছোট মামার কথা খুব মনে পড়ছে আমার। ছোট মামা, এক-কথায় এক আজব লোক ছিল সে। অ্যাডাল্ট হয়েও বাচ্চাদের মতো স্ট্যাম্প জমানো পছন্দ করতো। নানা শেইপের পাথর ও অর্কিডের খোঁজে সারা দেশ চষে বেড়াতো আর নানুর একাউন্ট খালি করে দামি সব পেইন্টিংয়ের বই ও ক্যাটালগের পেছনে টাকা উড়াতো। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে লাইনে আনা যাচ্ছে না দেখে মামারা ওর বিয়ে দেবার ডিসিশান নিয়েছিল। ছোট মামার বয়স তখন নিয়ার থার্টি। তা সবাই তার বিয়ে দেবার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে বুঝে একদিন হুট করে ‘মা আমি আসছি’ বলে সেই যে বেরিয়ে গিয়েছিল, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।

যে-ঘরটায় ছোট মামা থাকতো সেটাকে মিউজিয়ামের মতো করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এখন। নানুবাড়িতে গেলে সে-ঘরে আমি একবার যাবোই যাবো। ছোট মামাকে একটা ড্রিমার বলে মনে হয় আমার। আই গেজ্, ছোট মামা বাচ্চা ছিল এবং আজীবন বাচ্চা থাকতে চেয়েছিল। যখন দেখলো সেটা আর সম্ভব না, মানে আমার মামারা তাকে আর বাচ্চা থাকতে দিতে রাজি না, নিজের ফ্রি ইউলকে বাঁচাবার জন্যে ঘর থেকে এক্সিট করেছিল সে। নানু আজো বিশ্বাস করে ছোট মামা একদিন ফিরে আসবে। বাট্, আমার কেন জানি মনে হয় সে আর কোনোদিন ফিরবে না। তার মতো বাচ্চারা ঘরে ফেরার জন্য এক্সিট করে না। বিকজ, ঘর হলো গে এমন একটা জায়গা যেখানে কিছু লোকের মাঝে তুমি স্টে করো, তাদের সাথে খাও ও ঘুমাও; —ছোট মামার মতো লোক যখন ঘর থেকে এক্সিট করে তখন সে অনেক লোকের মাঝে গিয়ে পড়ে, অনেকের সাথে থাকা ও ঘুমানোর মাঝে ঘরের ফিলিংস তার চলে যায়। এ হলো গে কার্নিভালের মতো একটা ব্যাপার, যেখানে তুমি খালি ঘুরছো…ঘুরছো…আর ঘুরছোই! যে-লোক একবার কার্নিভালের মধ্যে গিয়ে পড়েছে সে তার ফ্রি উইল নিয়ে হোল লাইফ খালি ঘুরতেই থাকবে। ছোট মামা যেমন ঘুরছে। আই ডোন্ট বিলিভ দ্যাট হি ওয়াজ ডেড। বরং এটা ভাবতে আমার ভালো লাগে যে ছোট মামা এখনো বেঁচে আছে এবং বাচ্চাদের মতো সারা দুনিয়া ঘুর ঘুর করে বেড়াচ্ছে।

মাঝেমধ্যে তার মতো ঘুরতে খুব ইচ্ছে করে আমার। একটা কথা তোমাদের বলি কানে-কানে, ঘরে থাকতে একদম ভালো লাগে না আমার। যদিও চাচা এবং মামারা ঘরকে খুব প্রিফার করে, কিন্তু আই ডোন্ট লাইক টু স্টে হোম ফর মাই হোল লাইফ। সারা জীবন ঘরে বসে বুড়ো হবার চাইতে আই লাইক টু ট্রাভেল লাইক অ্যা জিপসি। তবে জিপসিদের মতো পায়ে হেঁটে ঘোরা একদম পছন্দ না আমার। ওল্ড ডেইজের ট্রাভেলাররা পা’য় হেঁটে দুনিয়া ঘুরতো শুনেছি, আমি সে-দায়িত্বটা হ্যামারকে দিতে চাই। ভারি আজব এক ভেহিকল এটি। এমন কোনো রোড নাই হ্যামার সেখানে চলবে না! সেদিন টিভিতে হ্যামারের নতুন মডেল দেখে ওটা চালাবার জন্য হাত আমার নিশপিশ করছিল। হ্যামার কেনার মতো টাকা আমার নেই। ভাবছি বড়ো মামাকে ধরবো। তার পলিশড্ গালে বাচ্চা মেয়ের মতো কিস করে একটা হ্যামার চাইবো। আমি জানি, আবদার শুনে বড়ো মামা কি বলবে আমায়। আই অ্যাম শিওর, মুচকি হেসে আমার পিঠ চাপড়ে দেবে সে, ‘সরি‌্য বেব, আই অ্যাম নট অ্যা রিচ গাই। হ্যামার কেনার মতো মানিড ম্যান নই আমি। আর হলেও এই লাক্সারির  কোনো মানে হয় না। তুমি বরং তোমার চাচাদের গিয়ে ধরো। আমার মনে হয় তুমি চাইলে তারা তা কিনে দেবে। আফটার অল, তোমার পেটারন্যাল আঙ্কেলদের তুলনায় আমরা হচ্ছি গে এতিম। এই ক’বছরে ওনারা এতো টাকা কামিয়েছে!,—সে-তুলনায় আমি কিছুই না।’—বড়ো মামা ভালো করেই জানে চাচাদের কাছে কখনো কিছু চাইনি আমি; চাইতে ভালো লাগে না; ওনারা যা দেয় সেটা নিজ থেকে দেয় এবং সেখানে হ্যামারের মতন লাক্সারিয়াস ঘটনার পসিবিলিটি একদম জিরো। সো, এ-জীবনে ওটায় চড়ে দুনিয়া চক্কর দেয়া আমার হবে না!

সে যাকগে, লেটস কাম টু দ্যা পয়েন্ট, আমি যেন কোথায় ছিলাম? ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, ইফির ছবি আঁকা নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। ইফির মগজে ছবি আঁকার ইচ্ছা মোস্ট প্রভ্যাবলি ছোট মামার কারণে ঘটেছিল। নানুর কাছে শুনেছি, ছেলেবেলায় আমরা যখন নানুবাড়ি বেড়াতে যেতাম, ইফি নাকি চান্স পেলেই ছোট মামার ঘরে ঘুরঘুর করতো এবং তাকে ড্রইং শেখাবার জন্য মামাকে অস্থির করে তুলতো। ক্যান ইউ ইমাজিন, ওই বাচ্চা বয়সে তার ড্রইংয়ে যে অ্যাডাল্ট স্ট্রেন্থ গ্রো করেছিল, অ্যাট নাউ, মানে এখন সে-কথা ভাবলে আমার মাথা ঝিমঝিম করে। টেন টু এইটিন্থ, অর্থাৎ ডিফ হওয়ার আগে অব্দি ইফি’র করা ছবি, স্কেচ ও ড্রইংয়ের একটা কালেকশান আমি যত্নে করে প্রিজার্ভ করেছি। ডক্টর আঙ্কেল ছাড়া এগুলোর খবর বিশেষ কেউ রাখে বলে মনে হয় না। আমার বেড-সাইড ড্রয়ার ও আলমিরায় ইফির ছবি ও স্কেচবুক লুকিয়ে রেখেছি আমি। মাঝে-মাঝে বের করে ছবিগুলো দেখি আর আমার পাশে কিম্বা ব্যালকনিতে ড্যাবড্যাব চোখ-করে বসে থাকা এখনকার ইফিকে দেখে ভাবি, —বাচ্চা ছেলেটি এতো পাকামো আর্ন করেছিল কীভাবে!

দশ থেকে আঠারো অব্দি ইফির আঁকা স্কেচ বা ওয়েল পেন্টিং দেখে এগুলোকে একটা বাচ্চা ছেলের আঁকা ছবি বলে কেউ মানতে চাইবে না। বাচ্চাদের ছবিতে যে-ভিউটা ধরা পড়ে, এই যেমন ধরো সবকিছু খুব ব্রাইট আর কালারফুল হয় সেখানে, ফিগারগুলো খসখসে ও ফ্র্যাগমেন্টেড হতে চায়, এবং রঙের বন্যায় ভীষণ নাইভ ও ইনোসেন্ট ফিলিং জাগায় মনে, —ইফির আঁকা ছবিতে  এর সাইন কেউ পাবে না।

ওর আঁকা ছবিগুলো অ্যাবসার্ড ও মর্বিড ঘটনায় সারাখন বোঝাই হয়ে থাকে।  ইফি যদি গাছ আঁকে তো দেখা যাবে সে-গাছের কোনো পাতা নেই, ওটাকে দেখে গাছের চেয়ে কঙ্কালের অনুভূতি বেশি হবে তোমার। ওর কিছু ওয়েল পেন্টিং আমি প্রিজার্ভ করতে পেরেছি, যার একটাও ঠিক বাচ্চাদের স্বভাবকে এক্সপোজ করে না। মানে আমি বলতে চাইছি ওর অনেক ছবির শেইপ বাচ্চাদের কথা মনে পড়িয়ে দিলেও কন্টেট বা মিনিংয়ের দিক থেকে সেগুলো ঠিক চাইল্ডিশ নয়। ফিগারগুলো কোঁচকানো, ফোলা-ফাঁপা, স্ট্রেইট হতে গিয়ে বারবার দুমড়ে গেছে,-আর এটাই আমায় অবাক করে। ওর আঁকা একটা ওয়েল পেন্টিং সেদিন দেখছিলাম। সম্ভবত হুঅ্যান হি ওয়াজ থারটিন ওর মে বি ফোরটিন, কনভেন্টে পড়ছে তখন,-পেন্টিংটা সেই সময়ে করেছিল। আমাদের গ্রে-হাউন্ডকে এঁকেছিল সে। কুকুরটাকে অতিকায় মাদী সিংহের মতো করে পেন্টই করেছিল ইফি। ছবিতে গ্রে-হাউন্ডের চোখ ধক ধক করে জ্বলছে আর দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে এমন একটা ভাব করছে যেন সবকিছুর ওপর বিরক্ত হয়ে আছে সে। ছবির ওই কুকুরের দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না, ভয়ে গা ছম ছম করে ওঠে।

যদ্দূর মনে করতে পারছি গ্রে-হাউন্ডের সঙ্গে ইফির রিলেশান মোটের ওপর খারাপ ছিল না। আমাদের কম্পাউডের যে-অংশটিকে গার্ডেনের মতো করে বানানো হয়েছিল সেখানে বহুবার ইফির সঙ্গে হাউন্ডকে খেলায় মেতে উঠতে দেখেছি আমি। সে ইফির সঙ্গে তাল দিয়ে দৌড়াতো, ওর হাতে ঝুলানো মাংসের টুকরো ছিনিয়ে নেবার জন্য ডলফিনের মতো ডিগবাজি দিয়ে ঘেউ ঘেউ করে উঠতো। অচেনা কোনো লোকের জন্যে হাউন্ডকে ফেস করা ছিল ভারি বিপদজনক ব্যাপার। ঘরে অচেনা লোক দেখলে ওটা এমনভাবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াতো, —আশু বিপদের সম্ভাবনায় সেই লোক ভয়ে কেঁপে উঠতো। এরকম সিচ্যুয়েশনে ইফি’র আচরণ ছিল দেখার মতো। হাউন্ডের গলায় লাগানো চেন টেনে ধরে ওটাকে ধমক লাগাতো সে, ‘কিপ কোয়াইট মাই পুডল। হোয়্যাই ইউ আর বি এ্যাংরি নাউ! স্ট্রেঞ্জারস আর অলসো বি দ্যা মেম্বার অব্ আওয়ার ইউনিভার্স। সো কিপ ডাউন য়্যুর টেইল এন্ড ওয়েলকাম দ্যা স্ট্রেঞ্জারস।’-বাচ্চা ছেলেটি বড়োদের মতো মুখ করে কুকুরটাকে সামলাচ্ছে দেখে অবাক হওয়ার-ই কথা। তবে ইফি’র দিক থেকে এটাই ছিল স্বাভাবিক। কোনো স্ট্রেঞ্জারসকে ইউনিভার্সের মেম্বার বলে ভাবার মাঝে ওর ফিলসফিক্যাল পয়েন্ট কী ছিল জানি না, তবে গ্রে-হাউন্ডকে ‘পুডল’-এর মতো আদুরে নাম ধরে কেন ডাকতো সে, তা এতদিন পরেও আমি বুঝতে পারি না।

কুকুরকুলের মাঝে রাজসিক হিংস্রতার জন্য গ্রে-হাউন্ড তার নিয়ারেস্ট নেইবার জার্মান শেফার্ডের মতোই ফেমাস। সে-তুলনায় পুডল জাতের কুকুর হলো গে অতিরিক্ত আদুরে, চান্স পেলেই তোমার কোলে মুখ গুঁজে আদর কাড়তে চাইবে সে। গ্রে-হাউন্ডের আদর কাড়ার কায়দা কিন্তু একদম অন্যরকম। তার হাবভাব দেখে মনে হবে সে একটা লর্ড এবং তুমি তাকে কেয়ার করতে বাধ্য। ইন ফ্যাক্ট আমাদের গ্রে-হাউন্ড মাঝেমধ্যে এমন ভাব নিয়ে ঘেউ করে উঠতো, মনে হতো আমরা ওর সাবর্ডিনেট এবং তার সেবা করার জন্য আল্লা আমাদের পাঠিয়েছে। এরকম একটা কুকুরকে ইফি রীতিমতো নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরাচ্ছে দেখে সবাই কমবেশি আশ্চর্য হতো। আমার নিজের দিক থেকে যদি দেখি,—গ্রে-হাউন্ডটাকে দু’চোখে দেখতে পারতাম না আমি। বিকজ, আমার অতি আদরের অ্যালসেশিয়ানকে খুব জ্বালাতন করতো সে। ওকে দেখলে এমনভাবে ঘেউ করে উঠতো, বেচারা বাচ্চা কুকুরটা ভয়ে কুঁই কুঁই করে আমার কোলে গিয়ে লুকাতো। হাউন্ডের উপস্থিতি মনে যে ফিয়ার তৈরি করে তাকে সহ্য করার মতো হার্ট সকলের থাকে না। অথচ ইফি ওটাকে অবলীলায় ‘পুডল’ নামে ডাকতো, পাতলা স্টিক দিয়ে খোঁচাতো কিংবা সারা ঘর দৌড় করিয়ে বেড়াতো! সোজা কথায় হাউন্ডটা, লাইক অ্যা ওবিডিয়েন্ট সাবর্ডিনেট, —ইফির হুকুম পালন করে যেতো। অথচ ওটাকে আঁকতে গিয়ে কী গা ছমে ছমে করেই-না এঁকেছিল সে!

ইফির পেইন্টিংয়ের যতো ফিগার তার সবগুলো নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা ও হিংস্রতা চালিয়েছে সে। ছেলেবেলায় আমার শখ করে পোষা অ্যালসেশিয়ানকে এঁকেছিল একবার। ওটা দেখে ভ্যা করে কেঁদে দিয়েছিলাম আমি। আমার মনে হয়েছিল খুব সুন্দর একটা ছবি হবে সেটা। কিন্তু কমপ্লিট হওয়ার পর দেখা গেলো অ্যালসেশিয়ানের মাথা আঁকেনি সে। মাথাবিহীন কুকুরটা ইয়টে লাগানো পালের মতো ছোট্ট শরীর ফুলিয়ে কাউকে যেন তাড়া করছে। ছবিটা এমনভাবে আঁকা, দেখে মনে হবে বদরাগী কোনো ষাঁড় ক্যানভাস ছিঁড়েফুঁড়ে তোমায় ঢুঁস দেবার জন্য বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ছবিটা দেখে এতো কান্না পেয়েছিল আমার, রাগের মাথায় ইফির হাত থেকে ওটা কেড়ে নিয়ে আমাদের ছোট্ট সুইমিং পুলে ফেলে দিয়েছিলাম। এখন মনে হয় না ফেললেই ভালো করতাম। বাট্, ছবির মিনিং বুঝবার মতো বয়স তখনো হয়নি আমার। মাথাবিহীন অ্যালসেশিয়ানের তেড়ে আসবার ভঙ্গিতে ফাইটিংয়ের যে স্পিরিট ইফি এনেছিল সেটা ভাবলে এখন খুব কষ্ট হয়। বিকজ, আজকের ইফিকে ওই মাথাবিহীন অ্যালসেশিয়ানের মতো লাগে আমার। দিনে দিনে ওর কথা আরো বেশি করে জড়িয়ে যাচ্ছে, হেয়ারিং মেশিন ব্যবহার করা সত্ত্বেও অনেক শব্দ ওর কানে ঢুকে বলে বিশ্বাস হয় না। মাঝেমধ্যে এমন ড্যাবড্যাবে চোখ করে চেয়ে থাকে, ভীষণ কান্না পায় আমার। ইচ্ছে করে বলি, ‘কামঅন ইফি, তোমার আঁকা সেই এ্যালসেশিয়ানের মতো ছুট লাগাও তো দেখি।’ —বলতে পারি না দেখে আরো বেশি কান্না পায়।

আমার এই ভাইটির কারণে ঘরে আটকা পড়ে গেছি আমি, হয়ে উঠেছি অ্যাবসার্ড। লাস্ট ফাইভ ইয়ারস বলতে গেলে ওর সাথে স্টে করছি আমি। গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করলেও ইফির এই অবস্থায় ফারদার স্টাডি আর সম্ভব নয়। আগে কতো ফ্রেন্ডস ছিল আমার! লাস্ট টেন ইয়ারসে দু’একজন ছাড়া সবাইকে হারাতে হয়েছে। ঘরের লোকদের মতো ফ্রেন্ডসরাও মনে করে ইফির প্রতি অতিরিক্ত কেয়ারিং হতে গিয়ে নিজেকে আমি ধ্বংস করে দিচ্ছি এবং এটা বাড়াবাড়ি। মে বি দে আর ট্রু, বাট্ আমার পক্ষে ইফিকে ছেড়ে থাকা টোটালি ইমপসিবল। এই ঘরে আমার নিজের বলে কিছু যদি থেকে থাকে সে হচ্ছে গে এই ভাইটি যার চোখ দিয়ে একদিন সবকিছু দেখতে শিখেছিলাম আমি। তোমাদের কাছে লুকোবো না, গ্রাজুয়েশনের সময় অনেকে প্রোপোজ করেছে আমায়। একজনের সঙ্গে ফিজিক্যাল কন্ট্যাক্ট পর্যন্ত হয়েছিল। কিন্তু শেষমেষ এটাই ফিল করেছি আমি, —অল অব্ দ্যা বয়েজ আর দ্যা সেইম সোলস অব্ মাই ফিট! তারা সবাই এতো কমন আর ডিজগাস্টিং, —আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।

তার আরলি ম্যাচুরিটি দিয়ে যে-লাইফের ছবি ইফি আমার চোখে ঢুকিয়ে দিয়েছে সেই চোখের পক্ষে বেডে যেতে পাগল কিম্বা নিজের ম্যানলিনেসকে এক্সপোজ করতে মরিয়া কোনো ছেলেকে মেনে নেয়া পসিবল না। আমি পারিনি। ইফির মতো সেন্সুয়াল ছেলের প্যাসিভ হয়ে পড়া এমন পাগল করে দিয়েছিল আমায়, তোমরা বুঝবে কিনা জানি না, —এই জীবনে আর কিছু একসেপ্ট করতে পারবো না আমি। আমাদের ভাই-বোনের সেন্সুয়াল রেসপন্সের জায়গায় থার্ড পারসনকে টেনে এনে লাইফকে জটিল করতে রাজি না আমি। ইফির চোখ দুটো যে অবোধ বিস্ময় নিয়ে দুনিয়াকে দেখে এখন, সেদিকে তাকালে ঘরের বাইরে যাবার আগ্রহ তাই আমার উবে যায়। লাস্ট থ্রি ইয়ারস ধরে আমি ঘরে না-থাকলে ইফি অস্থির হয়ে পড়ে; ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ কিম্বা ডিনার কোনোটাই হয়ে ওঠে না ওর। ইভেন টয়লেট কিংবা শাওয়ারের সেন্স সে হারিয়ে ফেলছে। মানুষের এই প্রয়োজনগুলো তাকে এখন মনে করিয়ে দিতে হয়। ইফি আমাকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করে ফেলেছে। সারাদিন ঘরে বসে তাই গান শুনি, টিভি দেখি, বই পড়বার চেষ্টা করি আর ওর পেইন্টিংস ও ড্রইংগুলো দেখে ভাবি, —কবে সেইদিন আসবে যেদিন ইফি আবার বড়োদের মতো করে আমায় ধামকি দেবে : ‘ওঃ লিসা! ডোন্ট ডিস্টার্ব মি। দেখছো না কাজ করছি। যাও, তোমার ফ্রেন্ডসদের সাথে খেলা করো গে।’

শক থেরাপিতে কোনো কাজ হয় কিনা জানি না। এ্যাট লিস্ট ডক্টর আঙ্কেল ফেলিওর হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে। বাট্ আই হোপ, ইফি একদিন ঠিক জেগে উঠবে। ওর আঁকা ছবিগুলো নিয়ে ইদানিং খুব ভাবি আমি। ছবিগুলোকে ওর চোখের সামনে এনে রাখি। নিজের হাতে আঁকা ছবিগুলো ও আর চিনতে পারে বলে বিলিভ হয় না। তবে  সেগুলোয় এমনভাবে হাত বুলায়, —মনে হবে মা তার বাচ্চাকে আদর দিচ্ছে। তখন খুব কোয়াইট লাগে তাকে। চোখ দুটো কিছু একটা বলতে চাওয়ার আকুতিতে জ্বল জ্বল করে। আমার খুব আশা হয়, মনে-মনে ভাবি, ‘ডেইজ উইল কাম, ইফি নিশ্চয় ছবিগুলোকে তার নিজের বলে চিনতে পারবে।’ —অবশ্য চেনার পর ওর রিঅ্যাকশান কী হবে, সেটা, বিলিভ মি,—আই ডোন্ট গেজ। আগেই বলেছি তোমাদের, তার আঁকা ছবিগুলো আরামদায়ক নয়। অ্যাংগার, স্যাটায়ার, আয়রনি আর স্যাডনেস এতো ওপেন সেখানে,—বেশিক্ষণ তাকানো যায় না।

ইফির ড্রইং বা ওয়েল পেইন্টিং অ্যাংজাইটিকে বাড়িয়ে তোলে, অস্বস্তির সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিতে হয়। তার ওয়েল পেইন্টিংয়ে রঙের ব্যবহার স্মুদ নয়। হার্ড ও আনস্মুদ রঙের কারণে মেন্টাল পিস বা হ্যাপিনেসের পরিবর্তে ভেতরটা কেমন খালি হয়ে পড়ে, নাথিংনেসের ফিয়ার মনকে অবশ করে দেয়। ইভেন ওর ল্যান্ডস্কেপগুলা ভীষণ রুক্ষ আর ধূসর! গাছপালা, ঘরবাড়ি, বৃষ্টি কিম্বা রোদ সবকিছু এমনভাবে এঁকেছে সে, —ফিয়ার অব্ নাথিংনেস বড়ো হয়ে ওঠে সেখানে। ডক্টর আঙ্কেলের মতে ইফির অকালপক্ক ছবিগুলো নেগেটিভ সিজোফ্রেনিয়ার সিমটমকে এক্সপোজ করেছে। বাচ্চা বয়সেই নিজেকে ওয়ার্ল্ড থেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছে ছেলেটা। কনভেন্টে পড়ার সময় আঁকা ল্যান্ডস্ক্যাপগুলা মন-খারাপ-করা ঘটনায় এতো মনোটনাস, গ্রে ও ব্রাউন কালারের প্রাধান্য এমন যে ন্যাচারের মাঝে গ্রিনিশ কোনো কিছুর অস্তিত্বে বিলিভ করবার ইচ্ছেটা মরে যায়!

এখন  আমি  বুঝি নিজেকে নিয়ে টায়ার্ড হয়ে পড়েছিল ইফি।  মেন্টালি ভীষণ  ডিস্টার্বড ফিল করছিল সে, যেখান থেকে লাইফকে প্রাইসলেস বলে থিংক ও ইমাজিন করার পাগলামোয় পেয়ে বসেছিল তাকে। আমার এই ধারণা ডক্টর আঙ্কেলকে শেয়ার করেছিলাম একদিন। তার চশমা নাকের ওপরে ঠেলে দিয়ে মৃদু হেসে আঙ্কেল বলেছিল, ‘মে বি ইউ আর রাইট লিসা। তোমার ধারণা হয়তো ঠিক। দেখো লিসা, মানুষের জীবনে লেট ম্যাচুরিটি ডেঞ্জারাস হতে পারে, আবার আর্লি ম্যাচুরিটির কারণে নিজেকে ডেস্ট্রয় করে দিতে পারে সে। বিকজ, এর একটিও ঠিক ন্যাচারাল না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে গিয়ে তুমি আর পাঁচজন থেকে ডিফরেন্ট হয়ে যাচ্ছো। যে-বয়সে যেটা আসার কথা,—তোমার বেলায় তার অপজিট হচ্ছে। মানুষকে যদি ন্যাচারাল এলিমেন্ট বলে ভাবো তাহলে তোমার ঐ-ন্যাচার এখানে অ্যাবনর্মাল আচরণ করছে। ইফি’র আর্লি ম্যাচুরিটি তাই অ্যাবনর্মাল। এই বয়সে এতোটা অ্যাডাল্টসি নর্মাল ঘটনা নয়। আর্লি কিম্বা লেট ম্যাচুরিটি ব্রেন-সেলগুলোয় যে জগাখিচুড়ি পাকায় তার থেকে নিজেকে বের করে আনা খুব কঠিন। ফর এ্যাগজাম্পল, লেট ম্যাচুরিটির কথা-ই ধরো। ম্যাচুরিটি দেরিতে আসার ফলে লং ডেইজ তোমায় প্যাসিভ থাকতে হতে পারে। তোমার মগজের কোষগুলো জাগতে চাইছে না, লং ডিসটেন্স ক্রস করে একদিন যদি সেটা জাগে তখন ওলোট-পালোট ঘটে যায়,—একে সামাল দিয়ে সবার কাছে নিজেকে একসেপটেবল্ করা ভেরি হার্ড জব। এতদিন প্যাসিভ ছিলে তুমি, বাট্ নাউ, অ্যাক্টিভ হওয়ার ধাক্কায় ধ্বংস হয়ে যেতে পারো! আর্লি ম্যাচুরিটি তো আরো ভয়ংকর! এর ধাক্কা সইবার ক্ষমতা সব লোকের থাকে না। যে-জায়গা থেকে তোমায় কম্যুনিকেট করবো আমি, তোমার ম্যাচুরিটিকে প্রতিভা বলে মানতে বাধ্য হবো, —সেই জায়গাটা অনেকে ধরে রাখতে পারে না বলে অকালে ঝরে যায়। দ্যান উই সে, —প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটলো। আমার ধারণা কি জানো লিসা, —আর্লি ম্যাচুরিটির মাঝে পজিটিভের চেয়ে নেগেটিভ সিজোফ্রেনিয়ার সিমটম বেশি ধরা পড়ে।’

হিউম্যান মাইন্ডের জটিল গতি-প্রকৃতি এক্সপ্লেইন করতে গিয়ে ডক্টর আঙ্কেলের চোখ দুটো লাইট হাউসের মতো জ্বলছিল। তাকে খুব একসাইটেড লাগছে তখন। কফির কাপ থেকে ঠোঁট তুলে আরো এক্সপ্লেইন করেছিল সে, ‘বুঝলে লিসা, যে-লোক পজিটিভ সিজোফ্রেনিয়ায় ভোগে সেই লোক ইল্যুশন ও ইমোশনের মাঝখানে পড়ে দিবাস্বপ্ন দ্যাখে। সেল্ফ একজিসটেন্স, আই মিন নিজের বিয়িং বা অস্তিত্ব নিয়ে সারাক্ষণ হেজিটেট করে সে। হিউম্যান এক্সিসটেন্স বা মানব-অস্তিত্বকে রিডিকুলাস লাগে তার। অনেকে মন দিয়ে গডকে ভাবতে শুরু করে। সবকিছুর আলটিমেট গোল হিসাবে গডের ইমাজিন করতে গিয়ে আরো বেশি জটিলতায় জড়িয়ে ফ্যালে নিজেকে, বেশি করে কনফিউসড হয়। পজিটিভ সিজোফ্রেনিককে বিভ্রান্ত স্বাপ্নিক বা কনফিউসড ড্রিমার নামে ডাকতে পারো তুমি। ডাউট থেকে মুক্তি পাবার জন্য লজিক এন্ড ডিবেটে নিজেকে ক্লান্ত করার চেয়ে বিলিভারদের মতো ভক্তি ও বিশ্বাসের স্রোতে ভেসে যেতে চায় সে। তার থিংকিং ও ইমাজিনেশন খালি শ্যাডো দ্যাখে। প্রকৃতি, আই মিন ন্যাচারের মাঝে একের-পর-এক পাওয়ারফুল শ্যাডো দেখতে পায় সে। অনেকে গডের শ্যাডো দ্যাখে, এ্যাঞ্জেল-প্রফেট বা স্যাটানকে ভিশন করে। ট্রাজেডি কি জানো লিসা, এইসব শ্যাডো আদিম মানুষের মতো স্ট্রেঞ্জ-বিলিভার করে না তাকে, সরল ভয় ও বিশ্বাস বুকে করে কাউকে ভক্তি জানাতে পারে না সে, —বিকজ, সে এখন আর কেইভে নেই; সিভিলাইজেশনের শ্যাডোও তার মাঝ দিয়ে ঢুকে গেছে!’

তার কথার জাদু দিয়ে ডক্টর আঙ্কেল অ্যাডিক্ট করে ফেলছিল আমায়। আমার দেখা ডক্টরদের মাঝে আঙ্কেল একদম আলাদা মানুষ। অন্য ডক্টরদের মতো কেবল রোগী দেখে বেড়ায় না সে। পেশেন্টের মনের গভীরে ডুব দেবার কিউরিসিটি থেকে অনেক কিছু নিয়ে ভাবে। তার ভাবনাগুলো এমনভাবে এক্সপোজ করে সে, —তুমি হিপনোটাইজড হয়ে যাবে! আঙ্কেলের ওল্ড ফেইসের দিকে তাকিয়ে হিপনোটাইজড হয়ে গিয়েছিলাম আমি। চোখের চশমাটা হাতে নিয়ে কথা বলছিল সে, ‘বুঝলে লিসা, সিভিলাইজেশনকে তুমি ন্যাচারের সাথে মানুষের ফার্স্ট স্যাপারেশন বলে ভাবতে পারো। সাপোজ, ট্রু বিলিভারদের মতো গডকে যদি ন্যাচারের মেইন কজ-এন্ড-ইফেক্ট বলে মেনে নাও, তাহলে অ্যাডাম ও ইভের ফল ফ্রম দ্যা হেভেনের ঘটনা মিনিংফুল হয়ে ওঠে। তুমি তখন মানতে বাধ্য থাকো যে অ্যাডাম ও ইভের বোকামির কারণে মানুষ ন্যাচার থেকে আলগা হয়ে গিয়েছে। ন্যাচারের কেমিস্ট্রি তার দেহ-মনে আছে বটে, কিন্তু অনুভবের জগতে ন্যাচার এখন মানুষের স্ট্রং অপজিশন। এই অপজিশনকে শুধু সরল-সুন্দর ঘটনা বলে ভক্তি ও বিশ্বাসের দিন আর নেই। ন্যাচারে অ্যাংগার আছে, মানুষকে ধ্বংস করে দেবার প্রচ- ক্ষমতা রয়েছে, —এই বিশ্বাস সেখানে শক্তভাবে জায়গা করে নিয়েছে। সো, ন্যাচার একটা ভীতিকর ইভেন্ট-ও বটে! সামান্য ভূমিকম্প বা উল্কাপাতে তুমি ধ্বংস হয়ে যেতে পারো! বিলিভারদের কাছে অ্যাডাম ও ইভের ফার্স্ট সিন হচ্ছে গে এরকম এক ফিলিংস। সোজা কথায় অ্যাংগার অব্ ন্যাচার। রাগ করে তোমায় সে তার শরীর থেকে বের করে দিয়েছে। এতদিন যে-বিধানকে ওবে করে ন্যাচার বিরাজ করছিল, তুমি তাকে ইগনোর করেছো; নিজের পা’য় কুড়াল মারার কাজটা করেছো তুমি! ঐ-গাছের কাছে যেতে তোমায় মানা করেছিলো সে, কিন্তু কিউরিসিটি চাপা দিয়ে রাখতে না-পেরে একদিন সেখানে চলে গেছো তুমি, গাছ থেকে ফল পেড়ে খেয়ে ফেলেছো। কাজেই কজ-এন্ড-ইফেক্ট কিম্বা লজ-অব্-ন্যাচারের ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে গেছে।

এই ডিজ-অর্ডার, বুঝলে লিসা, —এটাকে খুব ভাইটাল মনে করি আমি। অ্যাজ অ্যা ক্রিয়েটর হিসাবে গড তার খুশিমতো সবকিছু বানিয়েছে। বানাতে গিয়ে বিউটির পাশাপাশি আগলিকে জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছে সে। বিউটি বা আগলি তো আর আকাশ থেকে পড়েনি? ধরে নিতে পারো এগুলোর প্রেজেন্স গডের নিজের ভেতরেই ছিল। ডিউরিং ক্রিয়েশন, বিউটির সাথে আগলিকে উগড়ে দিয়েছিল সে। গডের ভেতরের আগলিটা স্যাটান হয়ে বেরিয়ে এসে এ্যাডাম ও ইভকে নিষিদ্ধ গাছের নিচে টেনে নিয়েছিল। এখান থেকে গডকে ডাবল হেডেড বিয়িং বলে ভাবতে পারো তুমি। তার দুটো মাথা। সৃষ্টির সময় একটি দিয়ে বিউটিকে প্রকাশ করেছে সে, অন্যটি আগলি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। ফ্রম নাউ, তুমি কোশ্চেন করতে পারো গড সবকিছু সৃষ্টি করেছিল কেন? কী এমন প্রয়োজন হয়েছিল তার, যে তাকে ক্রিয়েটর বলে নাম কিনতে হলো? এ্যাডাম ও ইভের মতো দুটো আহাম্মক সৃষ্টি করতে হলো? তোমার প্রশ্নের জবাবে আমি বলবো তার নিজের ভেতরে সুন্দরের যে-প্রবাহ বইছিল সেটাকে ফিজিক্যাল দেখবার বাসনা থেকে সৃষ্টির কাজে মন দিয়েছিল সে। লোনলি বিয়িং হিসাবে নিজের ভেতরে নিজেকে ফিল করার খেলা বিরক্ত করে মারছিল তাকে। আর ভালো লাগছিল না তার। সুতরাং নিজের ভেতর থেকে নানারকম জিনিসপত্র টেনে বার করতে আরম্ভ করলো সে। অ্যাডাম ও ইভ নামের দুটো মানব-মূর্তিকে বানিয়ে বাইরে ছেড়ে দিলো।

বেচারা গড তখন এটা ভাবতে পারেনি যে আগলির প্রতীক স্যাটান নিজেকে হাইড করে ঘুরছে, ভেতরের শয়তানী লুকিয়ে এ্যাঞ্জেলের ভেক ধরে গডের গুনগান গাইছে। অ্যাডাম ও ইভকে অস্বীকার করে সে যখন তার বত্রিশ দাঁত বের করে ফেললো গডের তখন হুঁশ হলো। গড দেখলো সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে, —শয়তান তার লেজ বের করে ফেলেছে; এ্যাঞ্জেলের মতো পবিত্র ব্যাপার ফুঁড়ে তার অশুভ মুখ সে ঠিক বের করে দিয়েছে। এখন এটাকে আটকাতে না-পারলে অ্যাডাম ও ইভকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে। বিউটিকে শেষ করে দেবে সে! ফর দ্যাট রিজন, গডের ভেতরে সুন্দরের প্রেজেন্স নষ্ট করে আগলি তার রাজত্ব কায়েম করে বসবে। দ্যাট মিন, গড নিজে একটা শয়তানে পরিণত হয়ে যাবে! ল-এন্ড-অর্ডার ছাড়া বিউটিকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না বুঝে গড তাই আইন জারি করে দিলো। আমি বলবো এ-কাজ করে নিজের বিপদ আরো বাড়ালো সে।’

ডক্টর আঙ্কেলের কথাগুলো অদ্ভুত লাগছিল আমার। অ্যাডাম ও ইভের ফার্স্ট সিনের ঘটনাকে কেউ এভাবে এ্যাক্সপ্লেইন করতে পারে তা আমি জীবনেও কল্পনা করিনি। তবে অদ্ভুত হলেও কথাগুলো এতো লজিক্যাল, —বেচারা গডের অসহায় অবস্থা পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আমি। আমার ও ইফির দিকে তাকিয়ে আঙ্কেলের মুখ তখন হাসিতে ভরে উঠেছে, ‘বুঝলে লিসা, গডের কথা ভাবলে খুব দুঃখ হয়। আহা বেচারা! আমার মনে হয় কি জানো, গড সিজোফ্রেনিক ছিল অথবা সব জন্ম দেবার কালে সিজোফ্রেনিয়া তাকে অ্যাটাক করে বসেছিল। সে চাইলে বিউটি, এন্ড ওনলি বিউটি দিয়ে সৃষ্টির কাজ সারতে পারতো, ন্যাচারকে নানা বিউটিফুল এ্যালিমেন্ট দিয়ে ভরিয়ে তুলতে পারতো, অথচ দ্যাখো স্যাটানকে এড়াতে পারলো না সে! কী করে পারবে? বিউটি যদি গডের অংশ হয় তবে স্যাটানকেও তার অস্তিত্বের অংশ বলে মানতে হবে তোমায়। আর একে যদি আলাদা বিয়িং ভাবো, তাহলে গডের একত্ব বা ওয়াননেস কিন্তু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে এক দেবতা ছেড়ে বহু দেবতার অস্তিত্বে বিলিভ করতে হবে তোমায়। হিউম্যান সিভিলাইজেশনে এরকম একটা ফেজ গেছে, এক দেবতার বদলে বহু দেবতায় ভক্তি ও বিশ্বাস করেছে মানুষ, —এক ঈশ্বরের পরিবর্তে অনেক ঈশ্বর ছিল তার। সেইসব ঈশ্বরের মধ্যে কেউ শান্তি ও সুন্দরের সিম্বল হিসাবে ভক্তি পেয়েছে, কেউ আবার ধ্বংস ও প্রলয়ের সিম্বল রূপে মানুষের ভয় কুড়িয়েছে। দুটোকে জোড়া দিয়ে নিরাকার বা শেইপলেস গডের যে-ধারণা মডার্ন সিভিলাইজেশনে চলে এখন সেটাকে টিকিয়ে রাখতে গেলে বিউটি ও আগলি থেকে গডকে আলাদা করে দেখতে হবে তোমায়। কিন্তু সারা জীবন অসংখ্য শেইপের মাঝখানে চলাফেরা করে শেইপলেস গডকে ফিল করা মানুষের পক্ষে সত্যিই কঠিন। ইফ ইউ আর অ্যা গুড অভজারবার তাহলে বুঝতে পারবে নিরাকার ঈশ্বরকে কোনো-না-কোনো শেইপের মাধ্যমে আমরা বুঝে নিই। মুখে বলি বটে কজ-এন্ড-ইফেক্টের ক্রিয়েটর হওয়ার কারণে শেইপ সৃষ্টি করার পরেও গড নিজে শেইপলেস, সো শেইপের দায়-দায়িত্ব বহনে বাধ্য নয় সে, বাট্ সেটা খুব স্ট্রং লজিক বলে মনে হয় কি? আমার তা মনে হয় না। কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি সুন্দর-অসুন্দরের প্রেজেন্স, তোমার ওই বিফোর দ্যা ক্রিয়েশন, মানে সৃষ্টির অনেক আগে থেকে গডের মাঝে ছিল। অ্যাডাম ও ইভের ঘটনার ভেতর দিয়ে সেটা যখন ফেটে গেলো তখন থেকে সিভিলাইজেশন তৈরির রাস্তা মানুষ পেয়ে গেলো। যে-কারণে আমি মনে করি, —সিভিলাইজেশন হলো গে মানুষের ফার্স্ট ফিলিংস অব্ ফ্রিডম অ্যাগেইনস্ট দ্যা রোলিং অব্ গড ওর ক্রিয়েটেড ন্যাচার।

বুঝলে লিসা, আদি পাপের পর মানুষ রিয়েলাইজ করেছে ন্যাচারকে দেখে কেবল মুগ্ধ হলে চলবে না, ভয় করলে চলবে না, ভক্তি ভরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কোনো কাজ হবে না, —এটাকে ফাইন্ড করা দরকার, এর ওপর নিজের শাসন কায়েম করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ হিসাবে নিজের আইডেন্টিটি বিল্ড করা যায়। মে বি আই অ্যাম রং লিসা, কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়, —মানুষের এই অ্যাক্টিভিটি গডকে প্যাসিভ করে দিয়েছে। এ্যাডাম, ইভ ও স্যাটান মিলে যে-ড্রামাটা জমে উঠেছিল সেদিন, স্যাটান সেখানে গড বেচারাকে ধরে এমন মার লাগিয়েছে, —মারের চোটে কোমর সোজা করে উঠতেই পারছে না বেচারা। বিষয়টাকে এভাবে ইমাজিন করো, গডের ভেতর থেকে ডার্টি একটা হ্যান্ড উঠে এসে তার মুখে ঠাস করে চড় লাগিয়ে দিয়েছিল। থাপ্পড় খেয়ে গডের মাথা সেই যে বন করে ঘুরে উঠলো,-এখন অব্দি তা আর কাটিয়ে উঠতে পারছে না সে। নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে-আসা অশুভ শক্তির এই জোর অনুভব করে গড একেবারে বিকল হয়ে গিয়েছে। ইফির মতো ড্যাবড্যাব চোখে মানুষের কাজ-কারবার দেখে যাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই তার!

হিস্ট্রি নিয়ে আমি এখানে টানাটানি করছি না লিসা। হ্রিস্ট্রি বা সায়েন্স হাতে নিলে তোমার ঐ ইভ ও এ্যাডামের ঘটনা কতোটা টিকবে সে-তর্কে আমি যাবো না। কিন্তু থিওলোজি, মানে ধর্মগুলো যা বলে আর-কী, তাদের বক্তব্য মেনে নিয়ে এ্যাডাম ও ইভের আদি পাপকে যদি ট্রু-ইভেন্ট ধরো তাহলে তুমি মানতে বাধ্য, —লজ-অব্-ন্যাচার বা কজ-এন্ড-ইফেক্ট এখন আগলির দখলে। আগলির এই রাজত্বে গড ব্যাপারটা ব্রিটিশ মনার্কির মতো হেরিটেজ হয়ে যাচ্ছে। হেরিটেজকে লালন-পালনে অনেক ফায়দা লিসা। কোনোকিছু যখন হেরিটেজ হয় তখন তার এ্যান্টিক ভ্যালু বেড়ে যায়। তোমাদের মতো রিচ এন্ড এ্যারিস্টোক্রেট ফ্যামিলিরা নিজের বংশ নিয়ে যেমন প্রাউড ফিল করে, তোমার চাচাদের মতো নিজের এ্যান্টিকনেসকে শো করে স্যাটিসফাই হতে চায়, —ধরে নাও গডের বেলায় এখন তাই ঘটছে। স্যাটান তোমার ঐ-গডকে এ্যান্টিক-পিসের মতো নিলাম করছে। গডের দরদাম কী হবে, কে তাকে কিনবে বা বেচবে, কেমন করে ঘরে সাজিয়ে রাখবে, দুই হাত জড়ো করে মোনাজাত করবে নাকি মাটিতে শুয়ে সেজদা দেবে তার সব সে ডিফাইন করে দিচ্ছে। এই জায়গা থেকে গডকে যখন ভিশন করি তখন খুব মজা লাগে আমার। থিংক লিসা, সাত আসমানের ওপারে বসে গডের বিউটিফুল অংশ মাথা উঁচু করে তোমার-আমার মাঝে উঁকি দিতে চাইছে, আর সেটা টের পেয়ে তার আগলি অংশটি ‘এই…খবর্দার, মাথা তুলবি না একদম।’ বলে বিউটিফুলের মাথাটাকে বারবার মাটিতে নাবিয়ে দিচ্ছে! দুই শক্তির টাগ-অব্-ওয়ারে বেচারা গডের অবস্থাটা একবার ভাবো! সিভিলাইজেশনকে ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বললে আসলে কম বলা হয়…!’

ডক্টর আঙ্কেল তখন হো হো করে হাসছে। তার সাথে গলা মিলিয়ে আমিও হেসে উঠি। আসলেই, গডকে এভাবে ভাবলে দুঃখ লাগে, হাসিও পায়। আমি হাসছি দেখে আঙ্কেল আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠেছিল, ‘অনেকদিন পর তোমায় প্রাণখুলে হাসতে দেখছি লিসা। ইফি তোমার বয়সকে এখনো কেড়ে নিতে পারেনি। এটা ভালো লক্ষণ। মানুষের জন্য হাসতে পারাটা খুব জরুরি লিসা। ইফি’র মতো একটি ভারি বোঝা তুমি বইছো। অথচ কী-এমন বয়স তোমার হয়েছে যে তুমি প্রাণখুলে হাসবে না? আমার ওয়াইফের মতো মুখ মলিন করে রাখবে? লাস্ট টেন ইয়ারস ধরে ওকে প্রাণখুলে হাসতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।’

ওয়াইফের প্রসঙ্গ ঊঠতেই ডক্টর আঙ্কেলের কোয়াইট ফেইস একদম নিভে গিয়েছিল। তার ওয়াইফকে আমি দেখেছি। ভেরি বিউটিফুল ওম্যান। এই বয়সেও এতো সুন্দর তিনি, —দেখলে মন ভরে ওঠে। তিনি যখন হাসেন, তার গালে চমৎকার টোল পড়ে আর সেটা এতো চমৎকার যে ইচ্ছে হয় কেবল তাকিয়ে থাকি। এই বিউটিফুল ওম্যানের একটা খুঁত আছে, আর সেটা হলো তার বাম পা’টা একটু খাটো। হাঁটতে গেলে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। দশ বছর আগের এক রোড এ্যাক্সিডেন্টে ওনার বাম পা মারাত্মক জখম হয়। ঐ-এ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে এরকম ধারণা তাকে পেয়ে বসে যে নিশ্চয় তিনি এমন কোনো পাপ করেছেন যার কারণে গড তাকে খোঁড়া করে দিলেন। এরপর থেকে এতো মনমরা হয়ে থাকেন তিনি, দেখে মনে হবে তার চেয়ে দুঃখী মানুষ জগতে দুটি নেই! ডক্টর আঙ্কেল বা ছেলে-মেয়েরা অনেক চেষ্টা করে আন্টিকে কিওর করতে পারেনি। যার হাসি একটা এ্যাসেট ছিল, সে যখন হাসতে পারে না তখন এর চেয়ে স্যাড ইভেন্ট আর কী হতে পারে! আমার হাসি তার ওয়াইফকে মনে করিয়ে দিয়েছে বুঝে আঙ্কেলের জন্য কষ্ট লাগে আমার। আহা বেচারা!

ডক্টর আঙ্কেল নিজেকে সামলে নিয়েছিল। তার গলার আওয়াজ ভারি ও গম্ভীর হয়ে ওঠে আবার, ‘বুঝলে লিসা, গডের বেহাল অবস্থার কথা ভেবে যতো-ই হাসি আমরা, ইট’স অ্যা ট্রাজিডি ফর ম্যানকাইন্ড দ্যাট উই লস্ট দ্য গড ইন আওয়ার সোল, আমাদের জীবনে গডের ট্রু-ফিলিংস দিন-দিন কমে যাচ্ছে। এখন যে-গডকে মানুষ বিলিভ করে, পুজো বা ভক্তি দেয়, বোমা ফাটায়, অন্যের কল্লা কাটে, —সেই গড আসলে স্যাটানের হাতে বানানো ফিউরিয়াস ডল ছাড়া কিছু না। ডলটাকে ভীষণ বদরাগী ও হিংসুক করে মার্কেটে ছেড়ে দিয়েছে সে। এই, জাস্ট লাইক অ্যা সেলেবল আইটেমটিকে গড ভেবে যারা বাজার থেকে কিনছে তারা কী করে বুঝবে অরিজিনাল গডের ফিলিংস আসলে কী! তাদের পক্ষে ইমাজিন করা শক্ত, অরিজিনাল গড আসলে কতো লোনলি; বিউটি ও আগলির চক্করে পড়ে হাহাকার করছে বেচারা! ও ইয়েস, হাহাকারের কথায় এক গ্রেট বেঙ্গলি পোয়েটের কবিতার দুটো লাইন মনে পড়ে গেলো। তুমি জানো বোধহয় লিটারেচার পড়ার অভ্যাস আমার অনেক দিনের। এক কালে তো খুব পড়তাম। ডাক্তারির চোটে এখন আর সেভাবে সময় পাই না। তবে লিটারেচারের লোকজনকে বেশ পছন্দ করি আমি। পাওয়ারফুল রাইটারের অনেকে ভেরি ইন্টারেস্টিং সাইক্রিয়াটিক কেইস হয়। ফ্রম মাই ভিউ আমি তো মনে করি কেবল ডাক্তারি বই পড়ে কাজ হবে না, পাগলের ডাক্তার হতে গেলে অন্য জিনিস ঘাটাঘাটির অভ্যাস ডাক্তারিতে খুব ভালো কাজ দেয়। সো-কল্ড কিছু মেডিসিন আর মেডিকেল সায়ান্স হাতে করে মানুষের মনের অলি-গলি ট্রাভেল করা যায় না লিসা। অথচ এই সিম্পল বিষয়টি আমার অনেক কলিগ বুঝে বলে মনে হয় না। ফর দ্যাট রিজন, তাদের প্রসেস অব্ ট্রিটমেন্টকে এতো ম্যাকানাইজড লাগে আমার, আই ট্রুলি কনফেস লিসা,—আমার মনে হয় অন্যকে ট্রিটমেন্ট করার আগে এই লোকগুলোর মন-মগজের ট্রিটমেন্ট করা দরকার। ফ্রয়েড, য়্যুং, এরিক ফ্রম, —ওয়ার্ল্ড ফেমাস সাইক্রিয়াটিস্টরা লিটারেচার গিলে খেয়েছে এবং সাকসেসফুলি ইউজ করে গেছে। সে যাক গে, আমি যে-পোয়েটের কবিতার লাইন তোমায় শুনাবো তার নাম ছিল বিষ্ণু দে, টেগোরের বেশ পরের কবি। টেগোরকে চেনো নিশ্চয়?…’

ডক্টর আঙ্কেলের মুখে টেগোরের নাম শুনে আমি ছোট্ট করে মাথা নাড়ি। একটা ঘটনা মনে পড়ে যায়। আমাদের ঘরের লাইব্রেরিতে টেগোরের শেষ বয়সে আঁকা পেইন্টিংসের একটা ক্যাটালগ ছিল। আমি ও ইফি তখন বেশ ছোট। স্কুল ছুটির এক দুপুরে দু’জনে মিলে লাইব্রেরিতে গিয়ে ঢুকেছিলাম। লাইব্রেরিতে সারি-করে-রাখা বই এলোমেলো করে দিয়ে মজা পাচ্ছিলাম দু’জনে। আমাদের উৎপাতে বইগুলো ঝুপ-ঝুপ করে মাটিতে পড়ছিল আর দু’জনে মিলে সেগুলো উল্টোপাল্টা জায়গায় ঢুকিয়ে দিচ্ছিলাম। হিস্ট্রির বই চলে যাচ্ছিলো সায়ান্সের বই রাখার সেল্ফে, সায়ান্স গিয়ে ঢুকছিল লিটারেচারে। এই হুটোপুটির মধ্যে ব্রাউন কালারের চ্যাপ্টা মতন একটা বই টুপ করে ফ্লোরে পড়তেই ইফি কিউরিয়াস হয়ে বইটি হাতে তুলে নিয়েছিল। বইয়ের কাভার পেজে দাড়িওয়ালা এক লোকের ছবি ছিল; তার ঠিক নিচে একটা শ্যাডি ক্যাপশন, —পেইন্টিংস অব্ টেগোর বা এরকম কিছু। আমার এখনো মনে আছে টেগোরের দাড়ি ইফিকে খুব হন্ট করেছিল। দু’জনে মিলে বইয়ের পাতা উল্টেছিলাম আমরা। পেজের-পর-পেজ ডার্ক, শ্যাডি, ফ্র্যাগমেন্টেড সব ফিগার আর খসখসে ডার্কি ব্যাকগ্রাউ- দেখে হেসে কুটিপুটি হয়ে ইফির গায়ে ঠেলা মেরেছিলাম আমি, ‘লুক ইফি লোকটা কীসব এঁকেছে! এরচেয়ে আমি অনেক ভালো আঁকতে পারি।’

চলবে…

আহমদ মিনহাজ

জন্ম স্বাধীনতার বছরে । লেখালেখির শুরু নয়ের দশকে, ছোটকাগজে । একসময় নিয়মিত লিখলেও এখন প্রায় স্বেচ্ছা-নির্বাসিত । যদিও মাঝেমধ্যে উঁকি মারেন ছোটকাগজ ও ব্লগে । এর বাইরে একান্ত পারিবারিক । প্রকাশনায় সক্রিয় না হলেও গান শুনে, সিনেমা দেখে ও বন্ধুসঙ্গে নিজেকে যাপনের পাশাপাশি সক্রিয় আছেন নতুন লেখার খসড়ায় । আহমদ মিনহাজ মূলত প্রবন্ধে স্বচ্ছন্দ হলেও গল্প ও আখ্যানের জগতে ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রায়শ । কয়েকটি গল্প ছোটকাগজে প্রকাশিত হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে । বাকিগুলো প্রকাশের মুখ দেখেনি আর । উল্টোরথের মানুষ তার প্রথম আখ্যান । প্রায় এক দশক আগে এই আখ্যানের চিন্তাবীজ লেখককে তাড়িত করে । অনেকটা ঘোরগ্রস্ততার মধ্যে আখ্যান-টি রচিত হয় এবং প্রকাশিত হয় ছোটকাগজে-ই । সময়ের আবর্তে ধূলিমলিন হয়ে পড়ে ছিল দীর্ঘদিন । যদিও এই আখ্যানের গর্ভে লুকিয়ে থাকা প্রাণবীজ আজো অমলিন,- আখ্যান ও প্রতি-আখ্যানের দ্বৈরথে আজ ও আগামীর পাঠকের জন্য প্রাসঙ্গিক ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি