সাম্প্রতিক

‘ধুম’ ৩ ও তার ব্যবচ্ছেদ / অনিক-উজ্জামান বাপ্পি

“চেন্নাই এক্সপ্রেস” ও “কৃষ ৩” দেখে যখন মোটামুটি হতাশ, তখন শেষ ভরসা হিসেবে ছিল “ধুম ৩”। অধিকাংশ দর্শক যখন এর ট্রেলার দেখে সমালোচনায় মুখর, আমি তখন আশায় বুক বেধে ছিলাম, যে যেহেতু “আমির খান” আছে, তাই ট্রেলার দেখেই বুঝেছিলাম যে মুভির গল্পে ভাব-গম্ভীর কোন বিষয় আছে। অতঃপর মুভিটা দেখার পর আমি পুরাই হতাশ…

প্রথমে আসি গল্পের বিষয়ে, গল্পটা আমার কাছে খুব একটা খারাপ লাগেনি। তবে গল্পের ভিত্তিটা (আমিরের ব্যাঙ্ক ডাকাতির উদ্দেশ্য/বাবার মৃত্যুর বদলা) বেশ দুর্বল ছিল। মুভির মাঝখানে কখনো কখনো মনে হচ্ছিলো যে আমি মোটেও “ধুম” সিরিজের কোন মুভি দেখছি না। আসলে “ধুম” ও “ধুম ২” এর সাথে কোন ভাবেই গল্প মেলাতে পারছিলাম না। “ধুম” এ “জন” এর উদ্দেশ্য ছিল শুধুই টাকার লোভ, “ধুম ২” তে “ঋত্বিক” এর উদ্দেশ্য ছিল শুধুই শখ সেই সাথে ছিল ভালবাসা যাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল বেশী, আর “ধুম ৩” তে “আমির” এর উদ্দেশ্য শুধুই প্রতিশোধ যদিও মাঝখানে ও শেষে হতচ্ছাড়া প্রেম এসে সব তাল-গোল পাকিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রেমকে সাইডে রেখে ই-মোশন কেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এটা মুভির একটা ভাল দিক। তবে একটা কথা আছে, অনেক সুন্দর জিনিসও অনেক বাজে উপস্থাপনার কারণে খারাপ হয়ে যায়। “ধুম ৩” এর ক্ষেএেও হয়েছে তাই। এ মুভিতে “আমির খান” কে সঠিক ভাবে ব্যবহার করা হয়নি। মুভির এক মাত্র গল্প ছাড়া বাকি সব কিছুতেই ছিল অবহেলার ছাপ।

“ধুম” সিরিজটা সব থেকে বেশী জনপ্রিয় এর গান, মিউজিক এবং অ্যাকশন এর জন্য। কিন্তু সব থেকে দুঃখের বিষয় হল এই তিনটি বিষয়েই অবহেলা করা হয়েছে সব থেকে বেশী। “ধুম মাচালে” গানে সবাই “ক্যাটরিনা”র অর্ধ নগ্ন ড্যান্স দেখেই পাগল হয়ে গেছে, কিন্তু মুভির সব থেকে বহুল প্রতীক্ষিত ওই গান ও তার মিউজিক হয়েছে চরম নিম্ন মানের। প্রথম “ধুম মাচালে” গানের মিউজিক নকল করে এই গানটা বানানো হয়েছে। গান রিলিজের দিন, ওই গান শুনে আমার প্রত্যাশার পারদ ১০০ থেকে নেমে ৫০ এ এসে ঠেকেছিল। এর থেকে “ধুম ট্যাপ” মিউজিক্যাল সংটা অনেক উঁচু মানের হয়েছে। এক মাত্র “কা্মলি” গানটা শ্রুতিমধুর লেগেছে কিন্তু ওই গানে “ক্যাটরিনা”কে ড্যান্সার কম স্ট্রিপার লেগেছে বেশী। আর বাকি সব গুলো গানের মিউজিক ও সুরে “ধুম” ও “ধুম ২” এর তুলনায় একদমই দম ছিল না। তবে একটা ভাল দিক যে এ মুভির “ধুম মাচালে” গানটা বাদ দিলে বাকি গান গুলো “ধুম” ও “ধুম ২” এর তুলনায় অনেক পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর লোকেশন-পূর্ণ ছিল। যদিও “মালাং” গানে ৫ কোটি খরচ করে মেকাররা দর্শকদের কি দেখাইতে চাইছে সেটা আমার মাথায় কাজ করেনি এর থেকে গানের সুরে একটু মনোযোগ দিলে আরো শ্রুতিমধুর কিছু পাওয়া যেত। মুভির ব্যাকগ্রাউড মিউজিকও পুরাই হতাশা জনক। “ধুম” ও “ধুম ২” এর মত কোন নিজস্ব ও মৌলিক ব্যাকগ্রাউড মিউজিক ছিল না এতে। ওই প্রথম পর্বের মিউজিকটাই ঘুরায় ফিরায় ব্যবহার করা হয়েছে। মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে “প্রিতম” এর আগের পর্ব দুটির মত জাদু দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও তার কাজের মাধ্যমে চরম অবহেলা প্রকাশ পেয়ছে।

এবার আসি অ্যাকশনের কথায়… এই একটা ক্ষেএে আমি পুরোপুরি হতাশ। এই মুভির বাজেট নাকি প্রায় ১৫০ কোটির মত যা এ পর্যন্ত হিন্দী মুভির ইতিহাসে সব থেকে ব্যয়বহুল মুভি। কিন্তু এ মুভির অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে সেই বিশাল বাজেটের সদ্য ব্যবহার হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। “অভিষেক” এর স্কুটার নিয়ে অ্যাকশন থিমটা নতুন ও মজাদার ছিল, কিন্তু কি দরকার ছিল সেখানে তামিল বিরক্তিকর স্ট্যান্ট ব্যবহার করার ? এক জায়গায় স্কুটারের চাকা খুলে স্কুটার মাটিতে বসে পড়ার দৃশ্যে পুরাই কার্টুন বানায় ফেলছে, সেখানে গ্রাফিক্স এতই জঘন্য ছিল। ক্লাইম্যাক্স অ্যাকশন গুলো আরো হতাশাজনক ছিল। এমনকি শেষ দৃশ্যে “আমির” এর ব্রিজ থেকে ডিগবাজী দিয়ে লাফ দেবার সিনটা পুরাই হাস্যকর ছিল। এরকম সিরিয়াস একটি দৃশ্যে এত অবহেলা মেনে নেয়া যায় না। আর হুট-হাট করে “আমির” এর বাইক নিয়ে যুক্তিহীন ভাবে আকাশে উড়াল দেয়াটা অতি মাত্রায় বিরক্তিকর ছিল। ক্লাইম্যাক্স সিনে ফেরী থেকে দূরবর্তী ডাঙ্গায় “আমির” এর সুপার বাইক নিয়ে আন-পসিবল জাম্প দেখেতো আমার পুরাই ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে গিয়েছিল, মন চাইছিল ল্যাপটপ নিয়া নিজেই ৬ তলা থাইকা একখান জাম্প মারি। আর “আমির” যে কিভাবে তিন তিন বার ব্যাঙ্ক লুট করলো সেই রহস্যের জট মনে হয় স্বয়ং স্ক্রিপ্ট রাইটারের মাথাতেই খোলে নাই তাই বেচারা দেখাতেও পারে নাই। গোটা মুভিতে শুধু “আমির” এর বাইক ট্রান্সফরমেশন, বিল্ডিং এর দেয়াল থেকে দৌড়ে নিচে নামা, ট্রাকের নিচ দিয়ে বাইক নিয়ে স্লিপ করা, তারের উপর বাইকর স্ট্যান্ট, ব্রিজ থেকে জাম্প করার দৃশ্য ও পানিতে চেজিং সিন ছাড়া মনে রাখার মত আর কোন অ্যাকশন স্ট্যান্ট নাই। যদিও বাইক ট্রান্সফরমেশন সিন গুলোতে পুরোপুরি সাইন্সের থিউরি প্রয়োগ করলে অনেক ঘাপলা বের হবে, তাই ওই দিকে আর না যাই।

dhoom-3-3aএবার আসি অখ্যাত ও বিখ্যাত নায়িকাদের ব্যাপারে… “উদয় চোপড়া”র বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ান নায়িকা “তেব্রেট বেথেল” কে কিছু অল্প দৃশ্যের জন্য নেয়া হয়েছে। ভাল কথা, কিন্তু “আলি”র কল্পনায় একটি দৃশ্যে তাকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিকিনি পরিয়ে মেকাররা যে কি মজা পেলেন ও দর্শকদের যে কি মজা দিতে চাইলেন, সেটা আমার মাথায় কাজ করলো না। আর “ক্যাটরিনা”র কয়েকটা গান, একটা কিসিং সিন আর গুটি কয়েক ডায়লগ দেয়া ছাড়া আর কোন কাজই ছিল না। এর থেকে “তিস মার খান” মুভিতেও তার চরিত্রের ব্যাপ্তি অনেক দীর্ঘ ছিল।

“অভিষেক”কে বেশ ভাল লেগেছে, অন্তত “ধুম ২” থেকে ভাল লেগেছে, তবে এ পর্বে তার মাস্টার মাইন্ড প্ল্যানিং ও থিঙ্কিং খুব মিস করেছি। “উদয় চোপড়া” বরাবরের মতই ছিল। তার অপ্রয়োজনীয় জোক গুলো হাসির থেকে বিরক্তির সৃষ্টি করেছে বেশী। তবে মেকারদের অনেক অনেক ধন্যবাদ যে “ধুম ২” এর মত এ পর্বে “উদয় চোপড়া”র কোন বিরক্তিকর একক গান ছিল না। “জ্যাকি শ্রফ” এর ছোট চরিত্রটি অনেক এনারজেটিক ছিল যা এ মুভির অনেকখানি প্রাণ শক্তি বয়ে এনেছে। শিশু শিল্পী “সিদ্ধার্থ নিগম” অনেক সুন্দর অভিনয় করেছে। তবে গোটা মুভি যে একা টেনে নিয়ে গেছে সে আর কেউ নয় “আমির খান”। তার ২য় চরিত্রটি অনেকটাই “কোয়ি মিল গ্যায়া” এর “ঋত্বিক” ও “মাই নেম ইজ খান” এর “শাহরুখ” কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে “ধুম” সিরিজে এমন দৈত্য চরিত্র খুব অপ্রত্যাশিত ছিল এবং এঞ্জয়ও করেছি খুব। আর ফিশিঙটাও মোটামুটি মন মতই হয়েছে অ্যাকশনগুলো বাদে।

আমার ব্যক্তিগত মতামত অনুযায়ী “ধুম ৩” এর এই অপ্রত্যাশিত ও অকল্পনীয় ত্রুটির জন্য একমাত্র দায়ী এর পরিচালক “বিজয় কৃষ্ণ আর্চারিয়া” যে কিনা কুখ্যাত মুভি “তাসান” এর জন্য বিখ্যাত। শুরুতে যখন থেকে শুনেছিলাম যে এই ব্যাটা “তাসান” মুভির পরিচালক, তখন থেকেই আমার মনে ভয় ছিল যে এ আবার “ধুম ৩” রে “তাসান ২” বানায় না ছাড়ে। আর এখন আমার ভয়টাই সত্যি হল। শুধু মাত্র এর কারণেই মুভির মিউজিক, অ্যাকশন ও যাবতীয় বিষয়ে এত অবহেলা। যদি পরিচালক “সঞ্জয় গাধভী” থাক্তো তাহলে “ধুম” ও “ধুম ২” এর মত “ধুম ৩” ও দর্শকদের মনে স্মরণীয় হয়ে থাক্তো। আফসোস…

এখন আবার শোনা যাচ্ছে যে “ধুম ৪” এ নাকি “শাহরুখ” আসবে। ভাল কথা, এই গুজব “ধুম ২” রিলিজের আগেও ছড়িয়েছিল। তবে সামনের পর্বে “শাহরুখ” আসুক বা যেই আসুক, মিউজিক “প্রিতম” দিক বা যেই দিক, পরিচালনা “সঞ্জয় গাধভী” বা “বিজয় কৃষ্ণ” যেই করুক না কেন “ধুম” প্রথম পর্বের মত স্টাইল, মিউজিক, সং, কমেডি ও অ্যাকশন এ ভরপুর মুভি ২য়টা বানানোর মত সাধ্য বলিউডের আর নেই। অর্থাৎ… “ধুম” এর আর যতই সিকুয়েল আসুক না কেন, বলিউডের সব বাঘা বাঘা হিরো এতে ভিলেনের চরিত্র করুক না কেন, “অভিষেক” ও “উদয়” তাদের জান দিয়ে অভিনয় করুক না কেন, সব নামকরা মিউজিসিয়ান এতে মিউজিক দিক না কেন, হলিউড থেকে স্ট্যান্টম্যান এনে অ্যাকশন করুক না কেন… “ধুম” এর মত মিউজিক আর কখনো কেউ তৈরি করতে পারবে না, “ধুম” এর মত গান আর কখনো কেউ গাইতে পারবে না, “ধুম” এর মত ক্লাসিক অ্যাকশন আর কখনো কেউ দিতে পারবে না, “ধুম” এর “অভিষেক” এর রাফ এন্ড টার্ফ মাস্টার মাইন্ড পুলিশ অফিসার রোল পরবর্তীতে অন্য কোন পর্বে “অভিষেক” হাজার চেষ্টা করলেও পুনরায় ফুটিয়ে তুলতে পারবে না, “ধুম” এ “উদয় চোপড়া”র হাস্য-রসাত্মক কুল রেসার চরিত্র আমাদের যেভাবে নির্মল আনন্দ দিয়েছে “উদয়” হাজার চেষ্টা করলেও পরবর্তী পর্বগুলোতে আমাদের সেভাবে বিনোদিত করতে পারবে না আর যত যেই ভিলেনের চরিত্র করুক না কেন, কেউ “ধুম” এর “জন আব্রাহাম” এর মত স্টাইলিশ, কোল্ড ও ধংসাত্তক চরিত্র করতে পারবে না। “ধুম ২” ও বর্তমান “ধুম ৩” ই হল তার বাস্তব প্রমাণ। Believe it or not…

মোঃ অনিকউজ্জামান

শিক্ষার্থী ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তে আইন নিয়ে পড়ছেন, জন্ম ১৪ মার্চ ১৯৯১ । aneecque@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি