সাম্প্রতিক

তিন কবি পাঁচ কবিতা । জাকির জাফরান

কবি তিনজন বয়সের ক্রমানুসারে একে একে টেড হিউজ্, টনি হ্যারিসন এবং ক্লডিও কিলান। যদিও অনুবাদ প্রকাশের সজ্জায় সেই বয়ঃক্রম রক্ষিত হয়নি, ইচ্ছেকৃত লঙ্ঘন সেইটা, আশা করা যাচ্ছে এভাবে বয়ঃক্রম বা বর্ণক্রম তথা নামের আদ্যাক্ষরানুসারে অনূদিত কবিতাপাঁচ সজ্জিত না-হওয়ায় ইংরেজ কবিত্রয় বাংলার ন্যায় নাখোশ হবেন না বা সাজসজ্জাগত যৌক্তিকতা/ন্যায্যতা নিয়া প্রশ্ন উঠিয়ে তেড়েফুঁড়ে আসবেন না।

এদের মধ্যে একজন, যিনি সবচেয়ে খ্যাতকীর্ত কবিতারাজ্যিক অধুনা ইতিহাসে, টেড হিউজ্ বাংলাদেশে এবং বিশ্বজোড়া বাংলা পাঠকের কাছে ব্যাপক পরিচিত। অনূদিত হয়েছে এ-ভাষায় টেডের প্রণিধানযোগ্য বলিয়া বিবেচিত কবিতারাজির বড় অংশটা। বাংলাদেশেও এসেছিলেন তিনি, ছিলেন তখন অধিষ্ঠিত গ্রেইট ব্রিটেনের পোয়েট ল্যরিয়েট নামক রাজকবির পদে, এসেছিলেন এ-দেশে লেজেহুমু এরশাদের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় কবিতাফেস্টে যোগ দিতে; সেইসময় এরশাদ বন্দুক তাক করে এবং একদঙ্গল গোলাবারুদ-কামান-বন্দুকধারী সঙ্গে নিয়ে দেশবাসী জিম্মি রেখে একের-পর-এক পল্লিপ্রেমের মুশায়েরা আয়োজন করে চলছিলেন রোজ রোজ এবং জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় পানাহার ও অন্যান্য কবিতামানবিক কায়কারবার করে বেড়াচ্ছিলেন।

অবশ্য কবিতাভাষাভাষী মানুষের কাছে টেড হিউজ্ অত্যন্ত সমাদরণীয় কবি। তিনি জোরজবরদখলকারী কবি নন, অত্যন্ত মৌলিক একটি দিগন্তের নিশানা কবিতায় এনেছেন টেড, স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকতায় প্যারাডাইম পাল্টেছেন ইংরেজি কবিতার। বিচিত্র জন্তুজীবের দেখা পাওয়া যায় তার কবিতার ঘরগেরস্তালি ঘিরে। অ্যানিম্যাল কিংডম, মিথিক্যাল ইল্যুশনের ম্যাজিকে মানবেতিহাসের সঙ্গে কল্পনালগ্নি, কবিতাপাঠকের কাছে টেডের কবিতার অনায়াস সনাক্তিচিহ্ন। উনি সিলভিয়া প্লাথের একমাত্র স্বামী, সিলভিয়া অবশ্য টেডের একমাত্র স্ত্রী নন, ইশারা-ইঙ্গিতে এইভাবেও কবিতাপাঠক বিশেষত বাংলাদেশে টেডকে চেনেন। সিলভিয়ার আত্মহননের পরে, এমনকি টেডের ‘বার্থডে লেটার’ ইত্যাদি লিখে স্বাভাবিক জীবনাবসানের পরে এখনও পর্যন্ত, টেডকে অনেক কবিতানুরাগী সিলভিয়াপ্রয়াণের পেছনে প্রচ্ছন্ন দায়ী করে থাকেন আলাপে-আড্ডায়। সেসব অবশ্য কবিতার বাইরের বিবেচনা, যা-হোক, কালের বিচারে টেড হিউজ্ ও সিলভিয়া প্লাথ উভয়ের কবিতাই নিকষিত হেম বলতে যা বোঝায় তা-ই।

অনূদিত অন্য কবিদ্বয় সেভাবে বাংলায় চেনাজানা নাই। লিটলম্যাগাজিন ইত্যাদিতে সেভাবে অনুবাদিত উপস্থিতি নজরে ঠেকে নাই কিলানের কিংবা টনির কবিতা বাংলায় কিংবা বাংলা মুলুকে। টেডের ন্যায় সেলিব্রেটি এরা না। হ্যারিসনের কবিতাটা আশ্চর্য সরল বিন্যাসে এবং সোজাসাপ্টা বাক্যবাহিত হয়ে এমন একটা জায়গায় উত্তরিত হয়েছে যা শাশ্বত তথা আবহমান বোধের উদ্বোধন ঘটায় পাঠকের ভেতরে। ক্লডিও কিলানের কবিতাত্রয় থেকেও কবির ব্যক্তিগত কবিতাপথ ও প্রতীক-রূপকায়িত রচনশৈলীর পরিচয় কিছুটা পাওয়া যায় নিশ্চয়। টেড, টনি, কিলান সহ দুনিয়ার সকল ভাষার সকল ভূমির ভালো ও প্রণিধানযোগ্য কবি মাত্রেই নিজেদের রাস্তা বানায়ে নেন নিজের শ্রমে এবং কামে। এই কথাগুলো অবশ্য বলা বাহুল্য।

কবিত্রয়ের মধ্যে একজন অ্যামেরিক্যান, দুইজন ব্রিটিশ; মার্কিন কবি ক্লডিও কিলান এখানে উপস্থাপিত ত্রয়ীর মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। বয়সের বিচারে এবং ক্যারিয়ারদৈর্ঘ্যেও ক্লডিওগ্রাফ হ্রস্ব। নর্টন্ অ্যান্থোলোজি ছাড়াও মার্কিন মুলুকের প্রেস্টিজিয়াস্ পত্রপত্রিকায় কিলানের উপস্থিতি নিয়মিত। সর্বশেষ কবিতাবইটি, ‘মিসিং হার’, প্রিন্ট ভার্শনে বেরিয়েছে ২০০৯ সালে। এখন পর্যন্ত ক্লডিও কিলানের পূর্ণাঙ্গ কবিতাগ্রন্থ পাঁচটি। ‘ইন্টেরিম্’ নামে যে-কবিতাকেন্দ্রী কাগজ তিনি দীর্ঘদিন সম্পাদনা করে আসছেন, এখন সেটি ইন্টার্নেটে অ্যাভেইলেবল এবং নিয়মিত। পুরস্কৃত হয়েছেন কবিতার জন্য একাধিকবার, কবিতালিখন ও সৃজনী বিকাশের কর্মশালাচালনার কাজে পেশাগত দক্ষতা তার জীবিকা নির্বাহের সহায়ক উৎস হলেও ক্লডিও কবিতাবিষয়ক সম্পাদনায় ব্যয় করেন অধিকাংশ সময়। কিলানের স্বামী ডোন্যাল্ড রিভেল্ স্বনামে পরিচিত একজন কবি। দুই সন্তান নিয়ে তারা লাস্-ভেগাসেই পাকাপাকি বাস করে আসছেন।

তুলনামূলক বিবেচনায় হ্যারিসনের ক্যারিয়ার অনেক লম্বা। ক্যারিয়ারের কর্মগ্রাফটাও অনেক ভারী। আটাত্তর বছর বয়সে এসে হ্যারিসনের গোটা-পনেরো পূর্ণদৈর্ঘ্য কবিতাবই ছাড়াও রয়েছে একগাদা নানাবিধ পুস্তিকা, চটিবইয়ের ন্যায় প্যাম্ফলেট, নাটকের সম্পাদিত ও মৌলিক বই ইত্যাদি। ফিল্ম এবং টেলিভিশন ছাড়াও টনির রয়েছে থিয়েটার এবং অপেরা মাধ্যমে কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। হ্যারিসন আরেকটা কারণে ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে ব্যাপক পরিচিত, সেটা তার অনুবাদকাজের দক্ষতা ও ব্যাপকতা; মধ্যযুগীয় রহস্যনাট্যগুলোর ব্যাপারে তিনি বিশেষজ্ঞ-গণ্য তথ্যাভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং সেগুলোর বেশ-কতক অনুবাদ করেছেন ও উপযোগী সৃজনে ইংরেজিতে এনেছেন গ্রন্থাকারে। মঞ্চেও অনেক পরিবেশনা তাকে খ্যাতি দিয়েছে। ফিল্মের জন্য লিরিক্স ও স্ক্রিপ্ট লিখেছেন পেশাগত দক্ষতা আর প্যাশন সমেত। বিদ্যায়তনিক পড়াশোনাও করেছেন তিনি ক্ল্যাসিক্স বিষয় নিয়ে। সেই সুবাদে ‘অরেস্টেইয়্যা’, ‘লাইসিস্ট্রাটা’ এবং ফ্রেঞ্চ নাট্যকার মলিয়েরের বেশকিছু নাট্যকাজ অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন। ভূষিত হয়েছেন প্রচুর পুরস্কারে, পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা, কবিতা ছাড়াও অন্যান্য কলামাধ্যমে কাজের স্বীকৃতি হিশেবে। পেয়েছেন য়্যুরোপিয়্যন প্রাইজ্ ফর লিট্রেচার, ২০১০ সালে; পেয়েছেন য়্যুরোপিয়্যন পোয়েট্রি প্রাইজ্ ২০১৪ এবং ডেভিড কোহেন্ প্রাইজ্ ২০১৫। টনি হ্যারিসনের কর্মব্যাপ্ত অধ্যায়ের প্রচুর তথ্য ও টনি বিষয়ক ক্রিটিক রচনাদি, নিজের মৌলিক রচনার পাশাপাশি, ইদানীং উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য অনেক ওয়েবক্ষেত্রে দেখে নেয়া যায়; যেমন যায় টেড হিউজ্ সম্পর্কে বিস্তর জানাশোনার সুযোগ পাওয়া, যায় টেডের এবং সিলভিয়ার রচনারাজ্যে বেড়ানো।

তিন কবি পাঁচ কবিতা । ভাষান্তর ও কবিতথ্যপ্রণেতা : জাকির জাফরান  

Tony Harrison-1টনি হ্যারিসন

টনি হ্যারিসন ১৯৩৭ সালে লীডস্-এ জন্মগ্রহণ করেন। যথার্থই শ্রমজীবী মানুষের কবি তিনি। তার কবিতায় নির্বাক মানুষের মুখেও কথা ফুটে ওঠে। ‘দ্য স্কুল অফ ইলোক্যুয়েন্স’ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

বংশগতি

এ এক রহস্য, কী করে কবি হলে তুমি!
কোথা থেকেই-বা পেলে তোমার এই প্রতিভা?

আমি বলি : আমার দু-জন চাচা ছিল, জো এবং হ্যারি —
এদের একজন ছিল তোতলা, অন্যজন বোবা।

Ted Hughes -1টেড হিউজ্

টেড হিউজ্ ১৯৩০ সালে ইয়র্কশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন। তার কবিতায় প্রতীকি রূপময়তার আশ্চর্য এক জন্তুজগতের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। ‘কাক’ শিরোনামে একটি সিরিজ্ কবিতার জন্য তিনি বিখ্যাত। ‘দ্য হ্যক্ ইন দ্য রেইন’, ‘ল্যুপার্কেল্’ প্রভৃতি তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

ধর্মতত্ত্ব

না, সর্প হাওয়াকে
প্রলুব্ধ করেনি আপেলের প্রতি
এর সবই স্রেফ
সত্যের বিকৃতি।

আদম গিলেছিল আপেল
হাওয়া খেয়েছিল আদমকে
আর হাওয়াকে গ্রাস করেছিল সর্প
এ যেন আন্ত্রিক অন্ধকার।

এ অতিভোজনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে
স্বর্গনিদ্রায় ঢলে পড়ে সর্প —
ঈশ্বরের কলহপ্রিয় কণ্ঠ শুনে
মৃদু হাসে।

Claudia Keelan 1ক্লডিও কিলান

ক্লডিও কিলান এই সময়ের আমেরিকান কবি। জন্ম ১৯৫৯ সালে, ক্যালিফোর্নিয়ায়; এখন থাকেন লাস্-ভেগাসে। ‘Interim’ নামে একটি সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনা করেন। ‘Beatrice Hawley Award’ লাভ করেছেন তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘Utopic’-এর জন্য। [তথ্যসূত্র American Poetry Review, July-August 2001, Vol. 30 / No. 4]

নির্মাতা

চাকায় পাতলা কুয়াশা
চাকার পাখায় সূর্যালোক
দুষ্ট ঘোড়াটিকে পেছনে টেনে ধরে
আমার পাশ থেকে সকল ডানা টেনে নেয়
চাকায় পাতলা কুয়াশা
পাখার ওপর সূর্যালোক
আমার কাছ থেকে টেনে নেয় তোমার সমূহ ডানা
জেনেছ বশ্যতা
পদযুগল টেনে টেনে চলে
সকল ডানা টেনে নেয়
উজ্জ্বল চাকা থেকে
চাকার পাখায় পাখির পালক
পেছনে টেনে ধরে দুষ্ট ঘোড়াটিকে
তার লাগামহীন মত্ততা
চাকায় পাতলা কুয়াশা
পাখায় সূর্যালোক

উপশম

আমরা যারা পশু ছিলাম ভালোবেসেছি সেই আগুন যা পুড়িয়েছিল আমাদের,
আর অভ্যাসবশত ফিরে আসি পোড়ো উপত্যকায়;
এবং সাথে করে নিয়ে আসি আমাদের যে-সকল শিশু
এই ভস্মস্তূপে তাদের জন্যে মাদুর বিছাই
তুমি বাহুতে ধরে আছো শুশ্রূশা
ভালোবাসা, ভালোবাসার শেষ, ভালোবাসা, অবশেষ
তুমি চিরকাল ধরে আছো বাহুমূলে।

ফেব্রুয়ারি

খুব অপ্রতুল ভাষ্য হলো বই
সত্যের খাতিরে
এ-কথা স্বীকার করেন লেখক
আসলেই তাই —
ফলে দাসত্ব।
আনন্দ মানে অবগুণ্ঠন।
পড়ে পড়ে আর লিখে লিখে আমরা মানুষকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাই।
তার পরিসমাপ্তির দিকে।
নির্বি—
       শেষে শব্দের সম্মুখে,
একটি ছায়া প্রলম্বিত হয় আমাদের বাহুতে।

Tags: , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি