সাম্প্রতিক

অবশেষে বন্ডের ঘরে ফেরার গল্প…। মোঃ অনিকউজ্জামান

জেমস বন্ড সিরিজ – Spectre (2015)

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ‘জেমস বন্ড’ সিরিজের ২৫তম ও ‘ড্যানিয়েল ক্রেগ’ সিরিজের ৪র্থ মুভি ‘স্পেক্ট্রা’। মুভিটি নিয়ে নানান জনের ইতঃমধ্যে নানান রকম মতামত তৈরী হয়েছে। তাই, মুভিটি নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। ‘স্পেক্ট্রা’ নিঃসন্দেহে ‘ড্যানিয়েল ক্রেগ’ এর ‘জেমস বন্ড’ সিরিজের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি মুভি যেখানে আগের ৩টি পর্বের সকল অমিমাংসিত রহস্যের সমাধান দেয়া হয়েছে এবং বন্ডকে মুখোমুখি করা হয়েছে সিরিজের সব থেকে ভয়ংকর ভিলেনের সামনে। ‘স্পেক্ট্রা’ কোন একক মুভি নয়। এটি মূলত ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’, ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ ও ‘স্কাইফল’ মুভির ধারাবাহিকতায় সিরিজের উপসংহার। ‘স্পেক্ট্রা’ মুভিটি অনেকটাই ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এর মত এবং তার গল্পও এগিয়েছে ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ স্টাইলে, যেখানে ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এ বন্ড মরিয়া হয়ে ওঠে ‘ভেসপার’ এর মৃত্যুর পিছনে কাদের হাত আছে সেই সংগঠনকে খুঁজে বের করার জন্য তেমনি ‘স্পেক্ট্রা’ তেও বন্ড মরিয়া হয়ে থাকে তার অতীতের এক রহস্য উদ্ধার করে তার জীবনটা ধবংসের পিছনে কার হাত আছে সেই ব্যক্তি ও তার সংগঠনের খোঁজ বের করে তা নির্মুল করে অবশেষে পুর্নাঙ্গ শান্তির ছোঁয়া পাবার জন্য। হয়তো ভাবছেন তাহলে ‘স্পেক্ট্রা’ হবে নিশ্চই ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এর মতই এক মারদাঙ্গা অ্যাকশন মুভি যেখানে থাকবে না কোন গল্প। যদি এমনটা ভেবে থাকেন তবে ভুল ভাবছেন। ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এর বন্ড আর ‘স্পেক্ট্রা’র বন্ডের মধ্যে কোন মিল নেই। ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এ বন্ড ছিল অনেক অপরিপক্ক যার মাথায় ছিল প্রতিশোধের নেশা, সে ছিল এক প্রকার পাগলা কুকুরের মত, মানতে চাইতো না কোন বাধা বিপত্তি ও নিজের খেয়াল খুশি মত ঝোকের মাথায় কাজ করতো সে।। কিন্তু ‘স্কাইফল’ ও ‘এম’ এর মৃত্যু বন্ডকে শিখিয়েছে জীবনবোধ ও বাস্তবতা সম্পর্কে। যার ফলে বন্ড হয়েছে অনেক পরিপক্ক। ‘স্পেক্ট্রা’র বন্ডের মাথায় নেই কোন প্রতিশোধের নেশা, আছে শুধু কিছু প্রশ্ন যার উত্তর সে জীবন দিয়ে হলেও খুঁজে বের করতে চায়, এ পর্বে বন্ড অনেক ঠান্ডা মাথার, অনেক প্রফেশনাল, সে অনেক ভেবে চিনতে ধরে ধরে কাজ করে, ঝোকের মাথায় কোন সিদ্ধান্ত নেয় না, বন্ড এখন বদলে গেছে, যার হাতে মানুষ খুন করার লাইসেন্স আছে সে এখন খুন করতে গেলেও দশবার চিন্তা করে। সব মিলিয়ে ‘স্পেক্ট্রা’তে ধীর স্থির ও শান্ত মস্তিষ্কের যে বন্ডকে দেখানো হয়েছে তা আপনি এর আগের ২৪টি মুভিতে কোথাও খুঁজে পাবেন না। ‘স্পেক্ট্রা’ মুভিটি খুব ধীর গতির ও ঠান্ডা মাথার। এ মুভি দেখতে গেলে আপনাকে মাথায় রাখতে হবে ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’, ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এবং বিশেষ করে ‘স্কাইফল’ এর প্লট, চরিত্র, লোকেশন ও গল্প কারণ মুভিতে বার বার ‘ল্যাশিফ’, ‘ভেসপার লিন্ড’ ‘কোয়ান্টাম’, ‘ডমিনিক গ্রিন’ ও ‘রাউল সিলভা’ এর রেফারেন্স টানা হয়েছে যা ‘ক্রেগ’ সিরিজের ভক্তদের আগের পর্ব গুলোর প্রতি নস্টালজিক করে দেবে।

Bond2‘স্পেক্ট্রা’তে এমন অনেক কিছুই দেখানো হয়েছে যা এর আগে কোন ‘ক্রেগ’ বন্ড মুভিতে দেখানো হয়নি। মুভি শুরু হয়েছে পুর্বের ২১টি বন্ড মুভির মত সেই গোলকের মধ্যে দিয়ে বন্ডের হেঁটে গিয়ে গুলি করার দৃশ্যটি দিয়ে যা পুর্বের ৩টি ক্রেগ মুভিতে ছিল অনুপস্থিত। আমরা জানি ‘জেমস বন্ড’ মুভি মানেই হচ্ছে মুভির শুরুতে একটি মারদাঙ্গা অ্যাকশন সিন। ‘স্পেক্ট্রা’র শুরুতেও একটি চেজ অ্যাকশন সিন দেখানো হয় কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সিনটি ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’, ‘স্কাইফল’ ও বিশেষ করে ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এর তুলনায় ছিল অত্যান্ত নগন্য ও কম সাসপেন্স ও অ্যাকশনে পরিপুর্ণ এবং দৃশ্যটি খুব বেশী দীর্ঘায়িতও ছিল না। তারপর শুরু হয় ‘স্যাম স্মিথ’ এর কন্ঠে গাওয়া ‘রাইটিং অন দ্য ওয়াল’ নামক চমৎকার একটি টাইটেল সং যা ছিল কেমন যেন বিষাদে পরিপুর্ণ এবং টাইটেল সং এর সাথে গ্রাফিক্সের যে চিত্রায়ন গুলো দেখানো হয় তা এ যাবতকালের বন্ড মুভির মধ্যে নিঃসন্দেহে সেরা কাজ এবং সেই ভিডিওটি দেখলে আপনি পুর্বের ৩টি মুভির প্রতি নস্টালজিক হতে বাধ্য হবেন। সব মিলিয়ে ‘রাইটিং অন দ্য ওয়াল’ গানটি পুর্বের পর্বের ‘অ্যাডেল’ এর ‘স্কাইফল’ গানের থেকে কোন অংশে কম আবেদনময়ী ছিল না এবং আমি মনে করি এই গানটিও ‘অস্কার’ পাবার যোগ্য। গোটা মুভিতে এই গানের মিউজিক ও ব্যবহার মুভিতে এক বিষাদময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে যেন খুব বড় এক বিপর্যয় ঘটতে চলেছে বন্ডের জীবনে আর সেটা আপনি টাইটেল ভিডিওটি দেখলেই বুঝতে পারবেন যে বন্ডের জন্য কি ভয়ংকর এক সত্য অপেক্ষা করে আছে।

এবার আসা যাক অভিনয়ের প্রসঙ্গে, ‘ড্যানিয়েল ক্রেগ’কে নিয়ে বলার মত কিছুই নেই। সে এর আগের ৩টি বন্ড মুভিকে ছাড়িয়ে গেছে এবারের পর্বে। ‘স্পেক্ট্রা’তে পুর্বের পর্বের ‘গ্যারেথ ম্যালোরি’ (‘এম’), ‘ইভ মানিপেনি’, ‘বিল ট্যানার’ ও ‘কিউ’ চরিত্র গুলো দেখে খুব ভাল লেগেছে। নতুন ‘এম’ চরিত্রে ‘হ্যারি পর্টার’ সিরিজের ‘লর্ড ভল্ডেমর্ট’ খ্যাত ‘র‍্যালফ ফিয়েন্স’ ছিল এক কথায় যেমন রাশভারি, গম্ভীর তেমনই বেশ এনার্জেটিক যাকে বলে পুরাই একদম বন্ডের মতই পারসোনালিটি। সব মিলিয়ে বলা যায় একজন যোগ্য এজেন্টের যোগ্য বস। গোটা মুভিতে তাকে সব সময় মুখ চোখ বাঁকা করে প্রচন্ড পরিমানে বিরক্ত ও বদ মেজাজে দেখা গেছে তবে পুর্বের পর্বের ‘এম’ এর মত এ পর্বেও ‘ম্যালোরি’ বন্ডকে তার ভুলের জন্য শাসনের পাশাপাশি মুভির শেষে তার কঠিন বিপদে একজন পারফেক্ট বসের মত বন্ডের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এবারের পর্বে ‘মানিপেনি’ ও ‘ট্যানার’ এর করার তেমন কিছুই ছিল না, তারা শুধু ‘ম্যালোরি’ এর পাশে পাশে থেকে তাকে সাপোর্ট দিয়েছে তবে ‘কিউ’ চরিত্রে ‘বেন হুইশো’ কে এ পর্বে বেশ রিস্কি কাজ করতে হয়েছে এবং ‘স্কাইফল’এ ছোট্ট চরিত্রে থাকলেও এ পর্বে তাকে বেশ গুরুত্বপুর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে কারণ গোটা ২৪টি মুভির মধ্যে এই প্রথম ‘কিউ’ কে ফিল্ডে নামানো হয়েছে এবং সেখানে ‘কিউ’ বেশ বুদ্ধিমত্তারও পরিচয় দিয়েছে। ‘কিউ’ এর সাথে বন্ডের গেজেট সংক্রান্ত হিউমার গুলোও বেশ উপভোগ্য ছিল। তবে শুধু ‘কিউ’ একাই নয় এবারের পর্বে প্রথম বারের মত ফিল্ডে নেমেছে স্বয়ং ‘এম’ (‘ম্যালোরি’) এবং তার যে মেজাজ গোটা মুভি জুড়ে ছিল তাতে ‘ম্যালোরি’ যদি বন্ডের জায়গায় থাকতো তবে নির্ঘাত ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস পার্ট টু’ হয়ে যেত। আর হ্যা, পুর্বের মৃত ‘এম’কেউ একটি ছোট্ট কিন্তু অত্যান্ত গুরুত্বপুর্ণ দৃশ্যে দেখা যাবে এ মুভিতে। গোটা মুভি জুড়ে শুধু এই একজনকেই মিস করেছি খুব। এই ‘এম’ ছাড়া ‘জেমস বন্ড’ এর অস্তিত্ব কল্পনা করাও কষ্টকর।

এবারের পর্বে ছিল বরারবরের মতই দুইজন বন্ড গার্ল। একজন শত্রু পক্ষের আর আরেকজন মিত্র পক্ষের। প্রথম বন্ড গার্ল দুনিয়ার সকল যুবকদের রাতের ঘুম হারামকারী ‘মনিকা বেলুচ্চী’ (থুক্কু, তিনি নিজেকে ‘বন্ড গার্ল’ নয় ‘বন্ড ওম্যান’ বলে ঘোষনা দিয়েছেন, কারণ তিনি গোটা সিরিজে অভিনয় করা সব থেকে বেশী বয়স্ক নায়িকা)। ‘মনিকা বেলুচ্চী’কে এ মুভিতে একটু বেশীই বয়স্ক লেগেছে কারণ তার মুখের চামড়ার ভাজ গুলো ছিল প্রকট। তার অল্প পর্দা উপস্থিতি একটু বিষাদময় হলেও তার চরিত্রের ফিনিশিংটা বাকি বন্ড মুভিগুলোর থেকে অনেক ভাল ছিল, সব মিলিয়ে তাকে খুব একটা খারাপ লাগেনি। তবে মুভিতে রূপের আগুন ঝরিয়েছে ফরাসী নায়িকা ‘লি সেডক্স’। এই অভিনেত্রীকে এর আগে দেখা গেছে ‘ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডস’, ‘মিশন ইম্পসিবল-ঘোস্ট প্রোটোকল’ এবং ‘দ্য গ্রান্ড বুডাপেস্ট হোটেল’ এ, তবে যারা যারা তার ‘ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার’ মুভিটি দেখেছেন একমাত্র তাহারাই জানেন তিনি কি জিনিস ! এ মুভিতে তার উপস্থিতি একদম নজরকাড়া ও মনমুগ্ধকর যাকে দেখলে আপনি মুভিতে একটু আগে দেখা ‘মনিকা বেলুচ্চী’কেও ভুলে যাবেন। আমরা জানি যে ‘জেমস বন্ড’ সিরিজে ‘বন্ড গার্ল’দের করার মত তেমন কিছুই থাকে না এবং তাদের ভূমিকাও খুবই নগন্য কিন্তু যদি ‘ক্রেগ’ সিরিজের কথা বলতে হয় তবে ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ এর ‘ইভা গ্রিন’ অভিনীত ‘ভেসপার লিন্ড’ চরিত্রটি যেমন ছিল খুবই গুরুত্বপুর্ণ তেমনি ‘স্পেক্ট্রা’তে ‘লি সেডক্স’ অভিনীত ‘ম্যাডেলিন সোয়ান’ চরিত্রটিও ছিল সমান গুরুত্বপুর্ণ এবং এই দুটি চরিত্রই মুভির শেষে বন্ডের লাইফ চেঞ্জ করে দিয়েছে।

এবারের পর্বের সব থেকে বড় চমক ছিল ৩টি ভিলেন চরিত্রে ৩ জন বাঘা বাঘা অভিনেতা। প্রথমেই ‘মিস্টার হিনক্স’ চরিত্রে ‘ডেভ বাতিস্তা’ ছিল পুরাই ধবংসাত্বক ও দানবীয় এবং এ মুভিতে ‘বাতিস্তা’ কোন ডায়লগই বলেনি, শুধু মাইর চলেছে এবং একে হারাতে বন্ডকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। পরবর্তী ভিলেন ‘ম্যাক্স ডেনবিগ’ ওরফে ‘সি’ চরিত্রে ‘অ্যান্ড্রু স্কট’ যেন ছিল একদম ‘শার্লক’ এর ‘জিম মরিয়ার্টি’’। সেই কথা বলার স্টাইল, সেই চাহনী, সেই ধুর্ত হাসি, সেই এক্সপ্রেশন, সেই ষড়যন্ত্র কি ছিল না এই চরিত্রটিতে। এই হাইলি পাওয়ারফুল ‘সি’ চরিত্রটির উদ্ভব ঘটেছে রাজনৈতিক প্রেশার খাটিয়ে ‘MI6’ এর সব থেকে শক্তিশালী ‘ডাবল ও’ (OO) সেকশনটি চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্য। গোটা মুভিতে মূলত এই ব্যক্তিই ছিল ‘ম্যালোরি’ এর বদ মেজাজের কারণ এবং সে একাই ‘ম্যালোরি’র মাথা খারাপ করে করে রেখেছিল তার রাজনৈতিক প্রেশার ও ষড়যন্ত্র দ্বারা। এবং একে হারাতেও ‘ম্যালোরি’ এবং ‘কিউ’কে যথেষ্ট কাঠ খড় পোঁড়াতে হয়েছে। তবে, তার পর্দায় অল্প উপস্থিতিতেই সে যা করেছে তাকে যদি মুল বন্ড ভিলেন করা হত তবে নিঃসন্দেহে সে সিরিজের সেরা ভিলেন হতে পারতো। আর সব শেষে আসি ‘SPECTRE’ সংগঠণের হেড ‘ফ্রেঞ্জ ওভারহোসার’ ওরফে ‘আর্নেস্ট স্টাভ্রো ব্লোফেল্ড’ চরিত্রে ‘ক্রিস্টোভ ওয়াল্টজ’। এ এমনই এক অভিনেতা যার হাসি দেখলেও শরীরের কলিজা কেঁপে ওঠে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই অভিনেতাকে খুব ভয় পাই, তার ‘ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডস’ মুভিটির পর থেকে। আমি মুভিটি দেখিনি, কিন্তু মুভিটিতে এই অভিনেতার যে পরিমাণ রিভিউ পড়েছি এবং এই নেগেটিভ চরিত্রের জন্য তাকে ‘অস্কার’ পেতে দেখেছি, তখন থেকেই এই অভিনেতার প্রতি আমার একটা ভয় জন্মে গেছে। কখনো যদি সুযোগ হয় আমার এই অভিনেতার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর, তবে সেই সাহসও আমি কখনোই করতে পারবো না। এতটাই ভয় আমার তার প্রতি। যখন থেকে শুনেছি ‘স্পেক্ট্রা’তে ‘ক্রিস্টোভ ওয়াল্টজ’কে নেয়া হয়েছে সিরিজের সব থেকে ভয়ংকর ভিলেনের চরিত্রে তখন থেকেই এই মুভির প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে গেছে এবং কৌতুহল জন্ম নিয়েছে ‘ব্লোফেল্ড’ চরিত্রে তাকে দেখার জন্য। ‘স্পেক্ট্রা’তে সে ছিল সদা হাস্যময়ী কিন্তু তার সেই হাসির পিছনে ছিল এক ভয়ংকর চেহারা। এ মুভিতে দেখানো হয়েছে কিভাবে ‘ফ্রেঞ্জ ওভারহোসার’ ধীরে ধীরে ‘আর্নেস্ট স্টাভ্রো ব্লোফেল্ড’ হয়ে ওঠে, এভাবেই গোটা মুভিতে বন্ডের অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে রহস্যের জট খুলে ‘ব্লোফেল্ড’ এর অরিজিন গল্প দেখানোর মাধ্যমে ‘ব্লোফেল্ড’ ও বন্ডের মধ্যকার সম্পর্ক ও শত্রুতার ব্যাখ্যা দিয়ে অবশেষে অনেক সুন্দর ভাবে ‘আর্নেস্ট স্টাভ্রো ব্লোফেল্ড’কে পর্দায় উপস্থাপন করা হয়েছে যা এর আগের ‘ব্লোফেল্ড’ উপস্থিত বন্ড মুভিগুলোতে দেখানো হয়নি এবং মুভির শেষ দিকে ‘ক্রিস্টোফ ওয়াল্টজ’ যখন ‘ব্লোফেল্ড’ এর আসল চেহারা (যে চেহারার জন্য পুর্বের বন্ড মুভিতে ‘ব্লোফেল্ড’ বিখ্যাত) নিয়ে পর্দায় উপস্থিত হয়, তখন সত্যিই তাকে দেখে আমার ভয়ে কলিজা কেঁপে ওঠে। আচ্ছা, ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ ও ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এর সেই ‘মিস্টার হোয়াইট’ এর কথা মনে আছে ? অনেকে হয়তো ভুলেই গেছেন তার কথা। ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এর বন্ড যেমন তার শত্রু ‘ম্যাথিস’ এর কাছে ফিরে যায় সাহায্যের জন্য, তেমনি ‘স্পেক্ট্রা’তেও বন্ড খুঁজে বের করে ‘কোয়ান্টাম’ সংগঠনের সদস্য সেই ‘মিস্টার হোয়াইট’কে তার কাছ থেকে তথ্য উদ্ধারের জন্য। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে ‘মিস্টার হোয়াইট’ এরও ‘ম্যাথিস’ এর মত একই পরিনতি ঘটে যা আপনার মনে বিষাদের ছায়া এনে দেবে।

12387852_10206364010991আগেই বলেছি ‘স্পেক্ট্রা’ মুভিটিতে বন্ড কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ছুটে বেড়ায়। তাই গোটা মুভিতে তাকে শুধুই ছুটতেই দেখা যায়। একেকটি ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনার যোগসুত্র ঘটিয়ে গোয়েন্দার মত রহস্যের জট খুলতে দেখা যায় তাকে। তাই গোটা ‘স্পেক্ট্রা’ মুভিটি একটি অনুসন্ধান মূলক বা গোয়ান্দা মুভি বললে ভুল হবে না। এবং এ মুভি সিরিজের সব থেকে গুরুত্বপুর্ণ মুভি হবার কারণ, এ মুভির শেষে অবশেষে বন্ড সেই শান্তির খোঁজ পেতে সক্ষম হয় যার পিছনে সে সেই ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ থেকে ছুটে আসছিল এবং ‘ভেসপার’ ও ‘এম’ কে হারিয়ে তার মনে যে যন্ত্রনা ও প্রতিশোধের আগুন ছিল তা অবশেষে নিভে যায়। এ মুভিতে একটি ব্যাপার সকলের নজর কাড়বে যে বন্ডের মনে এখনো সেই ‘ভেসপার’ এর প্রতি এক সুক্ষ ভালবাসার উপস্থিতি রয়েছে এবং বন্ড আজো ‘ভেসপার’কে ভুলতে পারেনি। তবে এ মুভির সব থেকে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হচ্ছে ‘ভেসপার’ এর পর অবশেষে বন্ড তার জীবনে আবার একবার সত্যিকারের ভালবাসা খুঁজে পায় যা মুভির শেষে বন্ডকে তার জীবনের কাংক্ষিত ও সঠিক পথ নির্দেশ দিয়ে তাকে একজন কিলার থেকে মানুষে পরিনত করে এবং সেই ভালবাসাকে আঁকড়ে ধরে বন্ড সব কিছু ভুলে এক নতুন জীবন শুরু করতে চায়। আর এটাই ‘স্পেক্ট্রা’তে বন্ডের সব থেকে বড় পাওয়া যার মাধ্যমে বন্ড তার ভালবাসা ও মানসিক প্রশান্তি নিয়ে অবশেষে ঘরে ফিরে গিয়ে সিরিজের একটি শুভ সমাপ্তী রচনা করে। ‘স্পেক্ট্রা’র এন্ডিং নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ‘স্পেক্ট্রা’ রিলিজ হবার আগে দুই রকম কথা উঠেছিল যে এটা ‘ড্যানিয়েল ক্রেগ’ এর অভিনীত শেষ বন্ড মুভি এবং নতুন বন্ড খোঁজার অভিযান শুরু হয়ে গেছে। আবার এটাও শোনা গিয়েছিল যে ‘ব্লোফেল্ড’কে নিয়ে ‘স্পেক্ট্রা’ এর দুইটি পর্ব বের হবে যার মধ্যে ‘স্পেক্ট্রা’ হচ্ছে প্রথম ও এবং দ্বিতীয় পর্ব পরবর্তীতে আসবে এবং ঐ মুভির মাধ্যমে ‘ক্রেগ’ এর বন্ড জার্নি শেষ হবে। এটাও শোনা গিয়েছিল যে ‘ক্রেগ’ এর হাতে ‘স্পেক্ট্রা’ সহ আরো একটি বন্ড মুভির চুক্তি রয়েছে। যাই হোক, ‘স্পেক্ট্রা’ সিরিজের শেষ মুভি কিনা বা ‘স্পেক্ট্রা পার্ট টু’ আসবে কিনা সেটা সময়ই বলে দিবে তবে ‘স্পেক্ট্রা’র যেভাবে ফিনিশিং টানা হয়েছে তাতে দুটি সম্ভাবনাই কিন্তু থেকে যায়। ‘স্পেক্ট্রা’র ফিনিশিং অনেকটা ‘ফিউরিয়াস সেভেন’ এর মত। মেকাররা ‘স্পেক্ট্রা’তে বন্ডের চরিত্রের একটি সফল সমাপ্তী ঘটিয়েছেন তাই ধরে নেয়া যায় যে এটিই বন্ডের শেষ মুভি আবার তারা একটি সম্ভাবনাও রেখে দিয়েছেন পুনরায় ‘ব্লোফেল্ড’কে ফিরিয়ে আনার তাই ভবিষ্যতে মেকাররা চাইলে ‘ব্লোফেল্ড’ ফিরতেও পারে আর এটা তো জানা কথা যে ‘ব্লোফেল্ড’ ফিরে আসলে বন্ডকেও ফিরতেই হবে। এ সিরিজে তাদের দুজনের সম্পর্ক যে আত্মার সম্পর্ক। একজনকে ছাড়া আরেকজন অসম্পুর্ণ।

‘স্কাইফল’ পরিচালনার পর পরিচালক ‘স্যাম মেন্ডেজ’ পুনরায় এই মুভিতে তার সাধ্য মত চেষ্টা করেছেন তার সেরাটা উপস্থাপন করতে তবে তার পরিচালনা ‘স্কাইফল’কে ডিঙ্গাতে পারেনি। আর তাই এত কিছুর পরেও ‘স্পেক্ট্রা’কে নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। কিছু কিছু দর্শক, সমালোচক ও জরীপের মতে এটি সিরিজের সব থেকে বাজে বন্ড মুভি। আবার এমনও অনেক দর্শক, সমালোচক আছেন যারা ‘স্পেক্ট্রা’কে হাইলি পজিটিভ রিভিউ দিয়েছেন। আসলে ‘স্পেক্ট্রা’র সব থেকে নেগেটিভ সাইড হচ্ছে এ মুভিতে পর্যাপ্ত অ্যাকশনের অভাব (‘জেমস বন্ড’ মুভিতে সবাই যেমন অ্যাকশন দেখে আসছে এবং আশা করে, বিশেষ করে ‘ক্রেগ’ এর বন্ড মুভিতে), গল্পের জটিলতা এবং মুভির দৈর্ঘ্য। এটা সত্যি যে এ মুভিতে আপনি ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’, ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এবং ‘স্কাইফল’ এর সম পর্যায়ের অ্যাকশন পাবেন না। আগেই বলেছি গোটা মুভিটি হচ্ছে অনুসন্ধানমূলক, যেখানে বন্ড শুধু তদন্ত করে গেছে তাই তার হাতে অ্যাকশন করার মত সময় ও পরিস্থিতি ছিল না। শুধু মাত্র শুরুতে একটি অপর্যাপ্ত চেজ সিন, এরপর ‘বাতিস্তা’র সাথে একটি সাসপেন্সহীন কার চেজ, মাঝে নায়িকাকে উদ্ধার করতে একটি বিমানে চড়ে বরফের মধ্যে ‘বাতিস্তা’র গাড়ির সাথে উরাধুরা বিরক্তিকর চেজ, এরপর ট্রেনের মধ্যে নায়ক নায়িকার রোমান্সের মোমেন্টে ‘বাতিস্তা’ সাহেব আবার বাগড়া দিলে তার হাতে বন্ডের চরম ধোলাই এবং সব শেষে ‘ব্লোফেল্ড’ সাহেবের সাথে বন্ডের একটি শ্বাসরুদ্ধকর মাইন্ড গেম। এগুলো অধিকাংশ বন্ড ভক্তদেরই হতাশ করবে, আমাকেও করেছে তবে একটি জিনিস আমাকে পর্দায় আটকে রেখেছে আর তা হল মুভির গল্প এবং মুভির অ্যাকশনের ঘাটতি গল্পই পূরন করে দিয়েছে যা আমি অ্যাকশনের থেকেও বেশী এঞ্জয় করেছি। ‘স্পেক্ট্রা’র গল্প ও অভিনেতাদের পারফরম্যান্সই হল এ মুভির মূল অ্যাকশন যা একজন দর্শককে ১৪৮ মিনিট সিটে বসিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট আর সাথে আছে ‘অস্কার’ নমিনেটেড ‘টমাস নিউম্যান’ এর মনমুগ্ধকর ব্যাক গ্রাউন্ড মিউজিক যা আপনাকে প্রতিটি দৃশ্যে শিহরিত করার সাথে সাথে মন ভরিয়ে দেবে বিষাদে। এ যাবত কালের বন্ড সিরিজের সব থেকে বেস্ট মিউজিক দেয়া হয়েছে ‘স্পেক্ট্রা’তে, চাইলে কেউ এ মুভির সাউন্ডট্রাক নামিয়ে একা একা শান্ত মনে শুনে দেখতে পারেন, তবেই বুঝবেন কি আছে এ মুভির মিউজিকে।

‘স্পেক্ট্রা’র শুরুর চেজ সিন ধারণ করা হয়েছে মেক্সিকোর বিশাল ‘Day of The Dead’ ফেস্টিভলে যা আপনার নজর কাঁড়বে। এবারের পর্বে বরাবরের মতই বন্ড পেয়েছে নতুন ‘অ্যাস্টন মার্টিন DB10’ কার এবং বরাবরের মতই সেই গাড়ির বেশ সফল ভাবেই দফারফা করেছে বন্ড যা দেখে আপনার মুখ থেকে নিজের অজান্তেই একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে। এ মুভিতে অরিজিনালি এমন একটি বিস্ফোরন দৃশ্য দেখানো হয়েছে যা গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে এ যাবত কালের মুভিতে দেখানো সব থেকে বড় সত্যিকারের বিস্ফোরন দৃশ্যের নাম লিখিয়েছে। এ মুভির একটি অ্যাকশন দৃশ্য করতে গিয়ে ‘ড্যানিয়েল ক্রেগ’ তার হাটু মচকে ফেলেন এবং তা জানার পর সাবেক রসিক ‘জেমস বন্ড’ ‘স্যার রজার মুর’ ৬ ফেব্রুয়ারী মন্তব্য করেন “Sorry to hear Daniel Craig has sprained his knee on set of Spectre. Being 007 is not without it’s hazards. I’m available to step in if needed.”। ‘স্পেক্ট্রা’তে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রথম বারের মত ‘ড্যানিয়েল ক্রেগ’ এ মুভির একজন অন্যতম এক্সিকিউটিভ প্রডিউসারের দ্বায়িত্বও পালন করেছেন। ‘স্পেক্ট্রা’র বাজেট ২৪৫ মিলিয়ন যা বন্ড সিরিজের এ যাবত কালের সর্বোচ্চ বিগ বাজেট এবং গোটা বিশ্বের মধ্যে নবম বিগ বাজেট মুভি। রিলিজের পর ‘স্পেক্ট্রা’ যুক্তরাজ্যের বক্স অফিসে ৭ দিনে ৪১ মিলিয়ন আয় করে পুর্বের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়ে এক নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে পাশাপাশি বাহিরের বিশ্বেও এখন পর্যন্ত ‘স্পেক্ট্রা’র রেকর্ড ভাংচুর অব্যাহত রয়েছে। তবে ডমেস্টিক বক্স অফিস (উত্তর আমেরিকা) দৌড়ে এখনো ‘স্পেক্ট্রা’ পিছিয়ে রয়েছে ‘স্কাইফল’ এর কাছে। এখন এ মুভি ‘স্কাইফল’ এর মত ১ বিলিয়নের রেকর্ড মার্ক ছুতে পারবে কিনা সেটা তো সময়ই বলে দিবে। আপাতত, আপনারা যারা যারা এখনো ‘স্পেক্ট্রা’ দেখেননি, তাদের কাছে আমার পরামর্শ খুব বেশী প্রত্যাশা নিয়ে ‘স্পেক্ট্রা’ দেখতে যাবেন না কারণ আগেই বলেছি আমার কাছে এমন অপর্যাপ্ত অ্যাকশনের বন্ড ভাল লাগলেও আপনার কাছে হয়তো ভাল নাও লাগতে পারে এবং অ্যাকশন কম হওয়ায় এ মুভির গল্প আপনাকে বোর করতেই পারে কারণ আপনি যে বন্ডকে দেখতে হলে যাবেন, এ মুভিতে আপনি সেই বন্ডকে পাবেন না, সেই বন্ডের অ্যাকশন পাবেন না। তবে আপনি যদি অ্যাকশন বাদ দিয়ে খুব ভাল টান টান উত্তেজনার একটি গল্প দেখতে চান, যদি বন্ডের মত আপনার মনেও একই প্রশ্ন উকি মারে যা জানার জন্য আপনিও বন্ডের মতই মরিয়া, যদি আপনি ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’, ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এবং ‘স্কাইফল’ এর সাথে এ মুভির গল্পের যোগসুত্র খুঁজে বের করতে পারেন, যদি আপনি বন্ডের মতই ‘ব্লোফেল্ড’ এর অরিজিন এবং ‘অ্যান্ড্রু স্কট’ ও ‘ক্রিস্টোফ ওয়াল্টজ’ এর পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হতে চান এবং সব শেষে যদি আপনি বন্ডের একটি সফল সমাপ্তী দেখতে চান তবে নিঃসন্দেহে ‘স্পেক্ট্রা’ আপনার কাছে গোটা বন্ড সিরিজের মধ্যে সব থেকে শ্রেষ্ঠ বন্ড মুভি… !!!

rs_1024x759-1412Rating: 7.4/10 (41,273 votes)
Director: Sam Mendes
Writer: John Logan (screenplay), Neal Purvis (screenplay), Robert Wade (screenplay), Jez Butterworth (screenplay), John Logan (story), Neal Purvis (story), Robert Wade (story), Ian Fleming (characters)
Stars: Daniel Craig, Christoph Waltz, Léa Seydoux, Ralph Fiennes
Runtime: 148 min
Rated: PG-13
Genre: Action, Adventure, Thriller
Released: 06 Nov 2015
Plot: A cryptic message from Bond’s past sends him on a trail to uncover a sinister organization. While M battles political forces to keep the secret service alive, Bond peels back the layers of deceit to reveal the terrible truth behind SPECTRE.

মোঃ অনিকউজ্জামান

শিক্ষার্থী ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তে আইন নিয়ে পড়ছেন, জন্ম ১৪ মার্চ ১৯৯১ । aneecque@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি