সাম্প্রতিক

বারুদের মুখোশ । ফজলুল কবিরী

এক আজব ‘ইছম’

মনে মনে সে অন্ধকূপটার কথা ভাবে। একটু পরেই কালো কাপড়টি তাকে অন্ধ করবে। দড়িটার তার দিকেই তাকিয়ে আছে ভেবে খানিকটা চমকে ওঠে। সারা দেশে তাকে নিয়ে হইচই পড়েছে। রাস্তায় রাস্তায় যুবতিরা নেমে উল্লাস প্রকাশ করেছে। তাদের দীর্ঘ চুলগুলো কেটে, তা দিয়ে গালিচা বানিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছে যৌথবাহিনীর তুর্কিদের। শহরের হিংস্র ও বর্বর জঙ্গিটির কী অসহায় সমর্পণ! তাদের এই মুক্তি গোটা শহরবাসীর অর্জন।

হাঁটু বেয়ে উপরে উঠে আসছে বানের জল। তাকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। এই কাদা জলেই তো দাপিয়ে বেড়াত বিলের পর বিল। তারা ছুটত কানি কানি জমি মাড়িয়ে। বর্গা কৃষকের সেয়ানা নজর থেকে যথাসম্ভব লুকিয়ে-চুকিয়ে। মায়ের মৃত্যুর পর বন্ধনহীন শৈশবের এক প্রকার সমাপ্তি ঘটে। তার বয়স তখন আট কি নয় হবে হয়তো। হামাগুড়ি ছেড়ে হাঁটাচলা শেখার পর থেকে মার শাড়ির আঁচলটা তার নির্ভরতার আশ্রয় ছিল। তারপর ধীরে ধীরে বাবার বাম হাতের তর্জনী ধরে পাড়ার মাটির মসজিদে ছুটে যাওয়া শেখে। যতবার সিজদায় যায় মাথাটা একটু উপরে তুলে মুসল্লিদের খত দেওয়া মাথাগুলো দেখার লোভ সে সামলে উঠতে পারত না। সবাই উঠে বসলে তার সেজদায় যাওয়ার সময় হয়। দু’কাঁধের দুই ফেরেস্তাকে সালাম জানানোর জন্য সে কী অস্থিরতা! প্রতিবার সালাম ফিরিয়ে অদ্ভুত সব আবদার নিয়ে দু’হাত মুখের সামনে তুলে ধরত। প্রার্থনার বিষয়বস্তু আলজিভ গলিয়ে সহজে বেরোতে চাইত না। তারপর শৈশবে পিতার তর্জনী ধরে হাঁটার পরিধি বিস্তৃত হয়। ভোরবেলায় জেগে উঠে চোখের পিচুটি মুছে আমপারা-সিপারা নিয়ে মক্তবে ছুটে যাওয়া থেমে গিয়েছিল ততদিনে। কোরান পড়ার প্রথম দিনে মা শিমের বিচি ভেজে খই-মুড়ির সাথে মিশিয়ে বাবার হাত দিয়ে বিলিয়ে দিয়েছিল মক্তবের শিশুদের। তখনো মসজিদের বারান্দাতেই তাদের পড়ানো হতো। সেই যে মক্তবে তার হাতেখড়ি, মায়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে-রহস্যময় আনন্দের পেছনে ছুটে চলা থামেনি। প্রত্যুষে মসজিদের বারান্দা সরব হয়ে উঠত। হুজুরকে খুব ঈর্ষা হত। ঘরে ভাল রান্না হলে কিংবা মুরগি জবাই হলে তার কাজ হত ছুরি আর জ্যান্ত মুরগিটা নিয়ে হুজুরের কাছে ছোটা। রাতের খাবারের দাওয়াতটা বেশ খুশিমনে গ্রহণ করতেন হুজুর। তার উপস্থিতি অনিবার্য ছিল মুরগির মাংসের প্রথম টুকরো কিংবা সদ্য বিয়ানো গাইগরুর দুধের ফাতেহার জন্যে। ধীরে ধীরে ক্রমশ অনুরক্ত হয়ে পড়ে সে-জীবনের প্রতি। তা আরও পোক্ত হয় যখন বাবার হাত ধরে খুব শৈশবে বড়পীর হুজুরের মাজারে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মুগ্ধবিস্ময়ে মাজারের অলিগলিতে দৃষ্টি ফেলে আর রহস্যময় সে-জীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। হযরতের রওজা মোবারকে বাবাকে মাথা নোয়াতে দেখে তার বিস্ময় জাগে। ভক্তদের মুখে শুনত অলৌকিক সব কাহিনি।

সে শোনে চট্টগ্রামের সেই হাজির কথা, যিনি হযরত বড়পীরের কেরামতির গুণে সুদূর মক্কা শরিফ হতে মুহূর্তের বিজলী চমকে অলৌকিক ইস্টিমারে চড়ে চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিল। হাজি তার দু’চোখের উপর ভর করত। সে যেন চোখের সামনে দেখতে পায় বিভ্রান্ত হয়ে হাজি মক্কার পথেঘাটে অসহায়ভাবে ছুটছে। নানাজনের কাছে হাত পেতে ফিরতি পথের পাথেয় জমা করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। তাঁর চোখেমুখে ঠিকরে পড়ে ভয়ানক অপরাধবোধ। নিজের বোকামির কথা ভেবে আফসোস করে। আশু প্রত্যাবর্তনের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে আগপাছ কোনোকিছু না ভেবে ফিরতি জাহাজ ধরার সব পয়সাকড়ি নষ্ট করেছে।

হুজুর আফসোস করে, বৈজ্ঞানিক জোশের নল কোথায় ফিট করা লোকে কি তা জানে? বাবা আদম যে শয়তানি প্ররোচনায় স্বর্গ হইতে খসিয়া শয়তানি স্বভাবের যোগ্য মোকাম এই আলমে নাছুতে আসিয়া পড়িল, কেমনে আসিল কেউ ভাবে? অলি-বুজুর্গের সাথে যোগ না থাকিলে এইসব জানা যাবে?

তখনই হযরত বড়পীর হুজুর হাজির হন। আর হাজি দেখেন আধ্যাত্মিক কেরামতির কী শান! বালক ঘোরের মধ্যে নড়েচড়ে বসত। দূর-প্রবাসে নিজের চোখের সামনে হযরতকে দেখে হাজির মলিন ও পাণ্ডুর মুখ ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাঁর অবাক দৃষ্টি ঘটনার সত্যতা হজম করে। তারপর নিজের দুরবস্থার কথা হুজুরকে জানাতে শুরু করেন। মাঝপথে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে হুজুর হাজির করেন অত্যাশ্চর্য এক মোমবাতি! সে-মোমবাতি অচিন আলোর পরশে জ্বলে ওঠে। কেমন গা-ছমছম-করা এক গায়েবি আওয়াজ বাতাসে জিকির তোলে। কে যেন তাঁকে আদেশ করে সম্মুখে নজর প্রসারিত করতে আর তাকিয়ে দেখতে নূরের আশ্চর্য রোশনাই।

এক আজব ইছম কোত্থেকে ধ্বনিত হয়। বাতাসের ভেতর গা লুকিয়ে সে ইছম হাজিকে চালনা করে এক অত্যুজ্জ্বল আলোকরশ্মির সামনে। আপনাতেই সেই যাদুকরি বচন তাঁর ঠোঁটের ভেতর তুফান তোলে। মন্ত্রমুগ্ধবৎ হাজি মন্ত্রখানা জপে যায়। আর এভাবে জপতে জপতে প্রদীপটির দিকে একাগ্রচিত্তে নজর রেখে কতক্ষণ চালিত হয়েছিল তা স্মরণ করতে পারে না। ক্লান্তিতে নেয়ে উঠে কখন যে দোয়াপাঠ ভুলে ঘুমে দু’চোখ জড়িয়ে এসেছিল হাজি তা বুঝে উঠতে পারে না। খানিকটা ভীত হয়ে সম্মুখে দৃষ্টি প্রসারিত করে। এরপর এক অভাবিত দৃশ্যের অবতারণায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এদিক-ওদিক নজর দিয়ে হাজি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েও বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে না। হাজি সে-স্থানেই নিজেকে আবিষ্কার করে যেখানে দাঁড়িয়ে হজের নিয়তে জাহাজে ওঠার পূর্বে একমাত্র পুত্রের নিকট থেকে বিদায় নিয়েছিল। সদরঘাটের বাতাসে জগৎরহস্যের কূলকিনারা করার ভার তুলে দিয়ে হাজি আপনমনে বিড়বিড় করে ওঠে, এ কী অদ্ভুত কাণ্ড। এ কী কেরামতি!

সে যেন হাজির মুখে ধ্বনিত হওয়া বাক্যটি নিজের কানে শুনতে পায়। তবুও যখন সে মুরিদদের মুখে এসব অদেখা মোজেজার কথা শুনে নিজের বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝামাঝিতে দোলায়মান চেহারাটা আড়াল করতে পারত না, তখন মাজারের কোনো খাদেম আরও বেশি রোশনাই দিয়ে হাজির করে হযরতের কেরামতি।

হুজুর গলায় তেজ নিয়ে বলতে থাকে, বিশ্বঅলি হযরত জিলানি রাহমাতুল্লা আলাইয়ের পর আমাদের হযরত বড়পীরের মতন আর কোনো অলিকুলসম্রাট জগতে আসে নাই! অজ্ঞ মানবজাতির খোদাভীতি নাই বলিয়া অলিকুলের রোশনাইয়ের খোঁজ পায় না।
তার বালকমন তখনো মক্কার মরুপ্রান্তরে অলৌকিক উজ্জ্বল প্রদীপশিখায় পড়ে থাকে। মন্ত্রপাঠরত হাজির ভীত চেহারা কল্পনা করে সে কৌতুকবোধ করে। তারও প্রচণ্ড ইচ্ছে হয় সেই অচিন মন্ত্র বিড়বিড় করে পাঠ করে অলৌকিক মোমবাতির পেছনে ছুটতে। কিন্তু তার সে-ইচ্ছে পূরণের আগেই নতুন মোজেজার ঢালি সাজিয়ে বসত মাজারের কৌতূহলী খাদেম।

হুজুর আফসোস করে, বৈজ্ঞানিক জোশের নল কোথায় ফিট করা লোকে কি তা জানে? বাবা আদম যে শয়তানি প্ররোচনায় স্বর্গ হইতে খসিয়া শয়তানি স্বভাবের যোগ্য মোকাম এই আলমে নাছুতে আসিয়া পড়িল, কেমনে আসিল কেউ ভাবে? অলি-বুজুর্গের সাথে যোগ না থাকিলে এইসব জানা যাবে?

খাদেম আলমে বরজক বা রুহানি জগতে হযরতের কেরামতির কথা বলে আর তার চোখেমুখে ফোটে এক আগাম বিস্ময়ের ঢেউ। হযরতের রুহানি-প্রভাব বাবা আদম আলাইহিসসালাম পর্যন্ত শিকড়িত। খাদেম জনৈক মৌলবি মকবুল হোসেনের কথা বলে। মৌলবি সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর কবরের উপর একটি গর্জন গাছ জন্মায়। গাছটি জন্মেছিল তাঁর রওজা শরিফের একেবারে শিথান বরাবর। একদিন প্রত্যুষে হযরত সেই মৃত মৌলবির রওজা মোবারক দেখতে যান। তাঁর বিশ্বস্ত এক খাদেমকে গাছটি কেটে ফেলার আদেশ দেন। মৌলবি মকবুল হোসেনের পুত্র গাছ কাটার শব্দ শুনতে পেয়ে ছুটে এসে দেখতে পায় বিশালাকার গাছটি পুরো এলাকা কাঁপিয়ে ভূপাতিত হচ্ছে আর হযরত অদূরে দাঁড়িয়ে সে-দৃশ্য দেখছেন। মৌলবির ছেলে খুবই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। রুক্ষ ভাষায় খাদেমকে গালমন্দ করে। অনুমতি না নিয়ে গাছটি কেটে ফেলার জন্য তাকে দোষারোপ করলে খাদেম অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা হযরতকে দেখিয়ে দেয়। মৌলবির পুত্র ততধিক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। জানতে চায় ফকির কেন তার ফকিরি গাছের উপর দিয়ে ফলিয়েছে?

মুখে বিরক্তি জমা করে মাওলানা সাহেব বয়ান করতে থাকে, এই কথা শুনিয়া হযরতের জজবাতি হাল অত্যন্ত গালেব হইয়া ওঠে! তখন তিনি ঘটনার রহস্য না জানাইয়া পারিলেন না, আরে কমবখত! তোর পিতার মাঝ-কপালে একটা ভয়ঙ্কর বিছা ঝুলিয়া আছে দেখিয়া স্থির থাকিতে পারি নাই। তাই গাছটি কাটিতে আমি ছুটিয়া আসিয়াছি। কবরের আজাবের যাতনা বুঝার ক্ষমতা তোর নাই কুলাঙ্গার পুত্র! দূর হ সম্মুখ হইতে!

মৌলবির পুত্র খানিকটা অনুতপ্ত হয়ে ফিরে যায়। সে-রাতে তার শরীরে প্রবল বেগে জ্বর আসে, জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকতে থাকে। তখন সে হুজুরের সাথে দুর্ব্যবহারের কথা সবাইকে বলে। তীব্র যাতনায় সে অস্থির হয়ে ওঠে। এক সময় তার জবান বন্ধ হয়ে যায়! এরপর তার অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়। উপায়ান্তর না দেখে সে-অবস্থায় তাকে হযরতের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। হযরতের নিকট ক্ষমা চেয়ে সকলে রোগীর জন্য হযরতের সহায় প্রার্থনা করলে তিনি উত্তর করেছিলেন, তির যদি কামটা হইতে কোনোরকমে ছুটিয়া যায় তাহাকে আর ধরা যায় না!

বয়ানকারী খাদেম একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বলে, উক্ত ঘটনার কিছুদিন পর মৌলবি সাহেবের পুত্রের মৃত্যু ঘটে।

খাদেমের চোখেমুখে ফুটে ওঠে বিনয় ও ভীতির কুঞ্চন-রেখা।

নিজের অজান্তে তার মধ্যে মুহূর্ত কয়েকের জন্য অপরিচিত খাদেমের গুরুগম্ভীর নীরবতা ভর করে। বিশালাকার এক বিছা তার কপাল বরাবর ঝুলে থাকে। তখন মনে মনে প্রয়াত সেই বুজুর্গের নাম স্মরণ করে। মৃত মৌলবির বোকা পুত্রের উপর তার অকারণে ক্ষোভ জমা হয়।

হযরতের যে আগমন হইবে তার ভবিষ্যদ্বাণী ছয়শো বছরের অধিককাল আগে কেমনে হয় ভাবো দেখি! মানুষের মূর্খতায় হুজুর বিস্মিত না হয়ে পারে না। পিরানে-পীর জিলানি আলাইহিসসালামের খাস শিষ্যের এই এরশাদ মিথ্যে? রাসুলে পাকের বেলায়েতি নাম আহমদ ধারণ করিয়া কে তাঁকে পাঠাইল ভবে? নবীর মতন কোন পুত্রসন্তান রাখি যান নাই কোন উছিলায়?

খাদেমের মধ্যে এক ধরনের নুরানি জোশ জেগে ওঠে। বয়ানের সাথে সাথে তার চারপাশে কখন যে অসংখ্য ভক্ত-মুরিদান জড়ো হয় সে ঠাহর করতে পারে না। খাদেম তার উপস্থিতি খেয়ালই করে না, তবু তার কেবলই মনে হয় খাদেম তাকেই সব কথা বলছে। সে একান্ত বাধ্য শিষ্যের মতো গোগ্রাসে হজম করত নুরানি জোশে ভরতি কন্ঠে হযরতের কেরামতির সাতকাহন।

মানবজাতির কি তার রিপুকে বশ করিবার হেডাম আছে! কাফের, মোশরেক, ফাছেক কি হেলায় হেলায় তৈয়ার হয়? সপ্ত নফছ্-এর প্রভাব ছাড়া কি সপ্তকিছিমের মানুষ তৈয়ার হয়?

হুজুরের কথায় তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।

বয়ান ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। সে ঠিকঠাক ভাবে সবকিছু বুঝে উঠতে পারে না। খাদেম চার স্তরের আধ্যাত্মিক জগতের কথা বলে—আলমে লহুত, আলমে জবরুত, আলমে মালকুত ও আলমে নাছুতের কথা। আলমে নাছুতই হচ্ছে এই নশ্বর পার্থিব জগৎ। মানব চরিত্রেও চার প্রকারের স্বভাব। রহমানি, মালকানি, হায়ওয়ানি, শয়তানি! শয়তানি স্বভাবকেই ইনসানদের জন্য অত্যধিক মুশকিলের বিবেচনা করা হয়। খাদেম শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেওয়া দলের জন্য ঘোষণা করে বিভীষিকাময় আজাব। তখন ফেরেশতা সর্দার আজাজিলের প্রসঙ্গ ওঠে। ফেরেশতা সর্দারের অহংকারকে খাদেম ঘৃণাভরে স্মরণ করায়। অভিশপ্ত শয়তানের সিংহাসনচ্যুতির ঘটনা বয়ান করে। তখন থেকেই আদমজাতির বিরোধীদলের সৃষ্টি। মানবজাতির প্রতি শয়তানের আক্রোশ সৃষ্টি হয়। বাবা আদমকে প্রাপ্য স্বর্গের সিংহাসন থেকে আলমে নাছুতে নামিয়ে আনে।

তারপর খাদেম মানবের জয়ের কথা দীপ্তিময় কণ্ঠে শোনায়। আল্লাপাকের অবারিত করুণা কীভাবে আদমকে পুনরায় সর্বোচ্চ সিংহাসনে আসীন করে তার বিবরণ দেয়। আদম-আলাইহিস-সালামকে দেওয়া আল্লাপাকের প্রতিশ্রুতির কথা সবাইকে জানায়। সুর টেনে মোলায়েম গলায় উচ্চারণ করেন আরবি আয়াত যাতে উল্লেখ থাকে মানবজাতিকে তাঁর নির্দেশিত সুপথে পুনরুদ্ধারের জন্য বাবা আদমের উপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব।

বাবাকে ভিড়ের ফাঁকফোকর গলিয়ে একেবারে সামনের কাতারে চলে যেতে দেখলে পুনরায় তার ঘোর ভাঙত। চোখাচোখি হয়ে গেলে তাকে ইশারায় বাবা পাশে ডেকে নিত। ততদিনে সে পীরের নামধামের অনেক কিছু স¤পর্কে অবগত হয়। কীভাবে বড়মিয়া ফকির মাঘ মাসের হাড় কাঁপানো শীতে বাড়ির পুকুরে কিংবা পশ্চিম পাশের তামার খালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুব দিয়ে থাকতেন বাবা তাকে শোনায়। দিনের পর দিন না খেয়ে, না ঘুমিয়ে পার করে দিতেন। বড়মিয়া ও মুরিদদের মধ্যে জিকির হত। পীরের সান্নিধ্যে মুরিদরা এলেমের ভাণ্ডার পূরণ করত। বাবা তার মুর্শিদের আধ্যাত্মিক সাধনার সকল জ্ঞান দিয়ে নিজের এলেমকে পরিশুদ্ধ করার কাজে গভীরভাবে ডুবেছিলেন।

তারপর থেকে এ-বিশ্বাসের প্রতি তার প্রচণ্ড রকমের মোহ জমা হতে শুরু করে। তার ভেতরের ব্যথিত শিশুটা কেবলই শৈশবের ভেতরে ঘুরপাক খায়। মা সময়ে-অসময়ে তাকে ধরা দেয়। তার অভিমানী প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে দিতে হাঁপিয়ে ওঠে।

মরিচের গুঁড়ার মতন টকটকে লাল রক্ত

প্রথম যেদিন সে পথে নেমেছিল দীর্ঘ আলখাল্লা ও বিশাল মুখোশ মুখে জড়িয়ে, শহরের শিশুদের সে কী উল্লাস! তারা ভাবে এই প্রথম কোনো একজন সত্যিকারের অতিথি এল যে তাদের জন্য নিয়ে এসেছে নির্মল আনন্দের উৎস। তার হাতে ছিল মরিচের গুঁড়ার মতন লাল আটাভর্তি প্যাকেট। সেসব প্যাকেট সংখ্যায় গুনার জন্য শিশুরা কৌতূহলী হয়ে উঠতে বেশি সময় নেয় না। হইচই আর হট্টগোলে তারা খেয়ালই করতে পারত না কোন ফাঁকে আলখাল্লা পরা মুখোশধারী লোকটি আড়াল হয়ে গেছে। একেকজন শিশুর হাতে শোভা পেতে থাকে অসংখ্য প্যাকেট। গুনতে গুনতে তারা হাঁপিয়ে ওঠে। সামান্য লোকটার কাছে এতগুলো প্যাকেট লুকানো ছিল তারা ভাবতেই পারেনি। সেই থেকে শুরু হয় যুবকের বিদ্রোহ ও বিশ্বাসভঙ্গের অধ্যায়। শিশুরা প্যাকেট গোনার কাজে ইস্তফা দিয়ে আতিপাতি করে খুঁজেও তার হদিশ পায় না। তার এই দীর্ঘ আত্মগোপনকালে লাল প্যাকেটগুলো ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি শিশুর হাতে হাতে। সকাল-বিকাল তাদের কেউ কেউ মাঠেঘাটে কিংবা নিদেনপক্ষে শহরের প্রশস্ত পার্কের খোলা জায়গায় এসব গুঁড়া ছিটিয়ে দিয়ে মজা পেতে শুরু করে। তাদের এই খেলায় কৌতূহলী মানুষেরা জড়ো হতে শুরু করলে বিষয়টা আরও উত্তেজক হয়ে ওঠে। শিশুরা তাদের মা-বাবার নিষেধ অমান্য করে এই খেলায় দিনের পুরোটা সময় মেতে থাকে। কেউ কেউ মায়ের কড়া শাসনকে ফাঁকি দিতে না পেরে স্কুল কিংবা ইংরেজি বিদ্যালয়ে ছুটলেও তাদের মন পড়ে থাকে খোলা মাঠে কিংবা পার্কের প্রশস্ত জায়গাগুলোতে। নিজেদেরকে তারা কতই না হতভাগা ভাবে। নিজেদের ইচ্ছেমতন যেখানে খুশি ছুটে পালাবার স্বাদ তাদের ভেতর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তারা নানাবিধ ফন্দি আঁটতে শুরু করে। কোনো কোনো দিন তীব্র উৎকট গন্ধে সবাই নাকে হাত চাপা দিতে শুরু করলে লম্বা বেত নিয়ে ছুটে আসা শিক্ষকেরাও অজান্তে নাকে হাতচাপা দেয়। তখন সবার মিঠে ও চাপা হাসিকে হটিয়ে কাপড় নষ্ট করা কোনো দুষ্ট শিশুই বিষয়ের মধ্যমণি হয়ে ওঠে। এভাবে একের পর এক দুষ্টবুদ্ধি মাথায় নিয়ে তারা যখন স্কুলের পাঠশালাকে গোশালায় পরিণত করে ফেলে তখন ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে শিক্ষকেরা তাদের পরিবারকে বিষয়টা অবহিত করে। কিন্তু তারা দেখতে পায় এসব শিশু অনেকদিন ধরে একই কায়দায় তাদের বাবা-মাকেও ফাঁকি দিয়ে এসেছে। বিষয়ের একটা সুরাহার জন্যে তারা খানিকটা মনোযোগী হয়। শিশুদেরকে কিছুদিন নিজেদের ইচ্ছেমতন চলতে দিলে তারা ভয়ঙ্কর বিষয়টি ঠাওরে উঠতে সক্ষম হয়। লাল মরিচের গুঁড়াভর্তি যেসব প্যাকেট হাতে নিয়ে অধীর মনোযোগ সহকারে তাদের শিশুরা খেলা করতে যায় তা মূলত তাদেরও চেনার বাইরে। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের কোনো সন্দেহ থাকে না যে, শিশুরা এসব গুঁড়া কোনো না কোনো একটা প্রয়োজনে কাজে লাগাতে চাইবে। তারপর শিশুদেরকে তারা মাঠঘাটে কিংবা পার্কের খোলা জায়গায় আগে থেকে খেলতে থাকা শিশুদের সাথে জড়ো হতে দেখে। তাদের যৌথ উল্লাসে মরিচের মতন লাল গুঁড়াগুলো জামা-কাপড়ে লেপ্টে গিয়ে এতটাই ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে থাকে যে, কেউ কেউ জবাই করা মানুষ ভেবে ভুল করে। তবুও ভীতি ও কৌতূহল নিয়ে দূর থেকে শিশুগুলোকে দেখার লোভ তারা ছাড়তে পারে না।

এরপর বিষয়টাকে আর এগোতে দেয়া যায় না ভেবে তাদের পিতামাতা যখন হন্যে হয়ে একটা সমাধান খুঁজতে থাকে, তখন আশার আলোকবর্তিকা হয়ে পুনরায় যুবক নিজেকে হাজির করে। দীর্ঘ আলখাল্লা ও মুখোশে নিজেকে এতটাই আড়াল করে রাখে যে, কেউ তার বয়সের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারে না। কেউ কেউ সন্ত ও সাধু ভেবে তাকে প্রণাম করতে ঝুঁকে পড়ে। কেউ বা মুরিদ হওয়ার বাসনায় পায়ের ধুলো নিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মূলত এসব বিষয় তাকে মোটেও সন্তুষ্ট করতে পারে না। এসবের বিনিময়ে নিজেদের সন্তানদের সে প্রত্যেক বাবা-মার কাছ থেকে গ্রহণ করতে চায়। এমন একটি স্বপ্ন সে লালন করে যা কেবল তাদের অবুঝ শিশুরাই পূরণ করতে পারে। প্রস্তাবটা এতটাই অগ্রহণযোগ্য যে, কোনো বাবা-মা বিষয়টা মেনে নিতে পারে না। মুখোশধারী রহস্যময় যুবককে সম্মান জানাতে দেরি না করলেও বিষয়টি তার চেয়েও জটিল ভেবে তারা সতর্ক হয়ে যায়। একটি আনন্দময় ও উচ্ছল শৈশব শিশুদের দিতে না পারায় তারা ব্যথিত হয়। ঘরবন্দি কিংবা মাঠবন্দি এসব শিশুরা হয়তো হাঁপিয়ে উঠেছিল প্রথাগত অনাচারে। তারা এতটাই অস্থির হয়ে গিয়েছিল যে, মায়া ও বন্ধনের গড়পড়তা জালে নিজেদের বন্দি রাখতে ব্যর্থ হয়। যেসব পাঠশালায় তাদেরকে জ্ঞান অর্জনের জন্যে পাঠানো হয়েছে সেখানে কোনো গলদ আছে কি না পিতামাতা বুঝতে পারে না। কিন্তু একটা বিষয় কোনোভাবেই তাদের মাথায় আসে না। শিশুরা যদিও একই লক্ষ্যে মাঠঘাটবিলে নিজেদের জড়ো করেছে, তারা সবাই একই মত ও পথে মিলিত হল কী করে! শহরের কুলশীল পরিবারের বিদ্যা ও সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা শিশুরাও গোমূর্খ গেঁয়ো শিশুদের মতন সবকিছুতে ফাঁকি দিয়ে লাল মরিচের গুঁড়াভর্তি প্যাকেট নিয়ে উল্লাসে মেতে থাকবে এটা তাদের কাছে রহস্য মনে হয়। তারা স্থির করে মূলত আলখাল্লা পরা মুখোশধারী ব্যতীত এই রহস্যের সমাধান আর কারও কাছে থাকতে পারে না।

কিন্তু যুবকের সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাতে তাদেরকে আরও বেশি হতাশ হতে হয়। যে-শর্ত যুবক পূর্বে তাদের ঘাড়ে চাপাতে চেয়েছিল তা থেকে একবিন্দুও নড়তে রাজি হয় না। এরপর অনেক দেনদরবার করেও বিপথগামী শিশুদের উদ্ধারের কোনো পথ বের করতে না পারলে একসময় তারা ক্ষান্ত হয়। অনেক দিন এভাবে কেটে যায়। নগরের শিশুরা তাদের শৈশবকে স্মৃতি বানিয়ে অনেকটা পথ পাড়ি দিলেও চিন্তা ও কর্মে কোনো পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। নিজেদের ভেতর যে-জগৎ তারা তৈরি করে নেয় তার ভেতর থেকে বের হতে পারে না। তাগুতি আইন ও বিশ্বাস থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। আর এই ফাঁকে নিজেদের যৌবনের জোশ মাথাচাড়া দিলেও আলোকবর্তিকা নিয়ে আসা যুবকের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসে না। যুবকের স্থির ও অবিচল সংকল্পে ভরসা পেয়ে নিজেদের পথকে সঠিক ও যথাযথ ভাবতে কসুর করে না। তারপর একদিন পরিকল্পনা মোতাবেক মধু ও ফুলের বনে ছিটিয়ে দেয় বারুদের গুঁড়া। তাগুতি আইনের বিরুদ্ধে তাদের অবিচল বিশ্বাস আরও পোক্ত হয়। আক্রমণের প্রথম ধাপে শত শত হলুদ প্রজাপতি সঙ্গীতরত অবস্থায় নিমেষে ধুলোয় মিশে যায়। এ-ঘটনায় নগরের উষ্ণ মানুষেরা শোকে ম্যুহমান হয়ে যায়। প্রজাপতিগুলোর সারা শরীরে লেপ্টে থাকে মরিচের গুঁড়ার মতন টকটকে লাল রক্ত। এসব প্রজাপতিই ছিল নগরীর শোভাবর্ধনের সর্বশেষ প্রতীক। এ-ঘটনার পরপর সবাই নগরীর শিশুদের দায়ী করে। শিশুরা সব দায় নিজেদের ঘাড়ে তুলে নেয়। তখন নগরের আমজনতা একযোগে নাটের গুরু আলখাল্লা পরা মুখোশধারী যুবকের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। এই সেই যুবক যে কি না একদিন সন্তানদের কেড়ে নিয়েছিল মায়ের নিরাপদ কোল থেকে; যে কি না নগরীর সবগুলো ব্যস্ত রাস্তায় ছিটিয়ে রেখেছিল মরিচের গুঁড়ার মতন টকটকে লাল বিস্ফোরক। তারপর থেকে আর কোনো প্রজাপতি শহরের পার্কগুলোতে উড়তে দেখা যায়নি। এমনকি আর কোনো যুবতি তাদের শোভাবর্ধনের জন্যে খোঁপায় ফুল গুঁজতে মধু ও ফুলের বনে পা বাড়ায়নি।

যুবকের খোঁজে নগর মেয়রের নির্দেশে ত্রুটিহীন অভিযান চালানো হয়। তখন সবার পুরনো ক্ষত থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করে। যুবতিরা প্রত্যেকে তাদের শাড়ির আঁচলের একটি অংশ কেটে পাঠিয়ে দেয় অভিযানে অংশ নেয়া তুর্কিদের মনোবল বাড়াতে। সন্তানখোয়ানো মায়েরা জায়নামাজ বিছিয়ে বাড়তি নফল নামাজে নিজেদের ব্যস্ত রাখে। আর যেসব নবাগত শিশু খানিকটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তারাও একজোট হয়ে বিপথগামী ভাইদের পরিণতির জন্যে যুবককে দায়ী করে।

এক পূর্ণিমার রাতে তাড়া খেয়ে ভয়ঙ্কর যুবক ঘুমের ঘোরে সদ্যকাটা ফসলের মাঠ দিয়ে ছুটতে গেলে বীর-সেনাদের হাতে ধরা পড়ে। দীর্ঘ আলখাল্লা ও মুখোশ খুললে শৈশবের সে-বালককে কেউ খুঁজে পায় না। চেহারায় ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। মাঠভর্তি অসংখ্য ইঁদুর পলায়নপর লেজটার সাথে সমতা রেখে গর্ত অভিমুখে ছোটাছুটি করে।

এই ফাঁকে যুবকের ধারালো দাঁতগুলো পূর্ণিমার আলোয় খ্যাপা তলোয়ারের মতো চিকচিক করতে থাকে।

ফজলুল কবিরী

জন্মঃ ৯ অক্টোবর ১৯৮১। হালদা নদীর কিনারে। চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার উত্তর মাদার্শা গ্রামে। শিক্ষা- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত এক যুগ ধরে। প্রকাশিত লেখাসমূহ উলুখাগড়া, উত্তরাধীকার, পুষ্পকরথ, সূনৃত, ছান্দস, কথা, চারবাক, সমুজ্জ্বল সুবাতাস, ঘুড়ি ইত্যাদি ছোটকাগজসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থঃ ‘বারুদের মুখোশ’ । প্রকাশকঃ বাঙলায়ন । প্রচ্ছদঃ শিবু কুমার শীল । প্রকাশকালঃ একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১৫

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি