সাম্প্রতিক

কে ‘বাউল’ আর কে ‘বাউল’ নয়! । সুস্মিতা চক্রবর্তী

‘বাউল’ শব্দটির ঢিলেঢালা অর্থও আছে, যে অর্থে আমরা চট করে কাউকে বাউল/বাউলা মানুষ হিসেবে শনাক্ত করতে পারি। বিষয়ীভাবনার বাইরে যিনি একটু পাগলাটে বা ক্ষেপাটে বা উদাসীন সেরকম কাউকে আমরা সাধারণত ‘বাউল’ বলে ফেলি যারা ভাবের ঘোরে নিশিদিন মত্ত হয়ে থাকেন। এখানে ‘বাউল’ একটা দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র। কিন্তু যারা গুরু পরম্পরাক্রমে বাউল-ধর্ম-সাধনার সাথে যুক্ত তাদের কাছে ‘বাউল’ শব্দটির তাৎপর্য এর চাইতে বেশি কিছু। শব্দটি নিয়ে গবেষকদের নানা মত থাকলেও সাধারণভাবে বাউল শব্দের এই অর্থের সাথে প্রায় সকলেই একমত হবেন: ‘বা’ মানে বাতাস আর ‘উল’ মানে অনুসন্ধানকারী। আর বাউল-ফকিরিসাধনার সাথে যুক্ত সকলেই মানবেন যে, অন্য অনেক কিছুর পাশাপাশি সাধকেরা বাতাসেরই অনুসন্ধান করেন প্রধানত যেটাকে দেহসাধনার অন্যতম অঙ্গ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। বাউল-ফকিরেরা বলেন: ‘দমের সাধনা’ বা ‘দমের কাজ’। আমাদের শিক্ষিত পরিমণ্ডলে এটি সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলতে হয় যে, যোগব্যায়ামসাধনার কথা যার পরিধি গোটা পৃথিবীতেই কম-বেশি নানাভাবে বিস্তৃত। দেহসাধনা করতে গেলে এই শ্বাস-প্রশ্বাস-এর নিয়ন্ত্রণের সাধনাই সর্বাগ্রে আত্মস্থ করতে হয়। বঙ্গীয় এই যোগসাধনার ধারা আমাদের লোকায়ত সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যেটা বিশেষভাবে পারদর্শী গুরুরাই কেবলমাত্র এর পদ্ধতিগত দিকটি হাতেকলমে তার শিষ্য-সাধককে শিখিয়ে দেন। বাউল-ফকিরি-সুফিধারা-তন্ত্র-সহজিয়াবৈষ্ণবসহ প্রায় সকল বঙ্গীয় লোকধর্ম আর সম্প্রদায়ের মধ্যেই এই দেহসাধনার ব্যাপার রয়েছে। তবে, স্ব স্ব গোষ্ঠীর দীর্ঘ চর্চায় প্রত্যেকেরই সুনির্দিষ্ট রীতি-পদ্ধতি গড়ে উঠেছে যেটা আবার পরস্পর থেকে ভিন্ন।

অঞ্চল ভেদে সংস্কৃতি ভিন্ন হয়; আচার-চিহ্ন-নামকরণও ভিন্ন হয়। লালনের ঘরানার সাধক-ফকিরেরা এমনকি গায়েনরা যে সকল আচারের মধ্য দিয়ে তাদের স্ব স্ব সম্প্রদায়গত ধর্ম-সংস্কৃতি পালন করেন, অন্য অনেক অঞ্চলেই সেটা ভিন্ন। নামকরণও আলাদা। ঘরও (তাঁদের কথায়) আলাদা। দেহসাধনার রীতি-পদ্ধতির ভিন্নতা ছাড়া আবার সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যের আলোকে দুই বঙ্গের এই ধরনের সকল লোকধর্মীয়-সম্প্রদায়ের মধ্যেই একটা বড় ঐক্য পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। যেমন: মানবিকতাবোধ, গুরুবাদিতা, প্রতিবাদী চেতনা, ভাবালুতা, আত্মঅনুসন্ধানকারী, প্রেমধর্মীতা, উদাসীনতা, ত্যাগধর্মীতা, মানুষভজা ইত্যাদি প্রভৃতি। প্রচলিত সমাজ-ধর্মের বাহ্যিক আচরনের বিপরীতে, এঁরা নিজেকে অনুসন্ধান করেন ‘পরমের’ মধ্য দিয়ে, ‘মনের মানুষের’ মধ্য দিয়ে, ‘অচিন মানুষে’র সন্ধানের মধ্য দিয়ে, কখনো ‘যুগলভজা প্রেমসাধনা’র মধ্য দিয়ে, কখনো ‘উল্টার সাধনার’ মধ্য দিয়ে। তাঁরা বিদ্যমান ভোগবাসনার সমাজকাঠামোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অন্যরকম জীবন-যাপনে নিজেকে যুক্ত রাখেন। প্রচলিত জগত-সংসারকে সর্বপ্রকারে বর্জন করেন বলেই তারা হন ‘জ্যান্তে-মরা’।

শহুরে লোকশিল্পী ফরিদা পারভীনের বাউল বিষয়ক কুলীন দৃষ্টিভঙ্গিই লোকশিল্পী আর বাউল গানের রচয়িতা শাহ আব্দুল করিম সম্পর্কে এ হেন উন্নাসিক মন্তব্য করতে সাহস দেয়! অথচ, খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, শাহ আব্দুল করিমের গান সিলেট আর বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের জনমনে দীর্ঘ সময় ধরে ‘বাউলা গান’ বা ‘বাউল গান’ নামেই প্রচলিত আর প্রতিষ্ঠিত। আঞ্চলিক সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে তো আর ঐ সব অঞ্চলের ‘বাউল গান’ বা ‘বাউলা গান’কে অস্বীকার করা যায় না!

বাউল শব্দটির নানা অর্থ থাকলেও সাধারণভাবে আত্মঅনুসন্ধানকারী, স্ব-ভাবের জগতে মত্ত, উদাসীন, পাগল, ক্ষেপাটে, বিদ্যমান সমাজ-সংসারের বিষয়ীভাবনার বিপরীতে মানবিকতাবোধসম্পন্ন যে-কোন মানুষকেই ‘বাউল’ নামে ডাকা হয়ে থাকে। ফলে, এই নামে শুধুমাত্র লালনের ঘরারনার মানুষই নন, অন্য অনেক ঘরানার মানুষই হয়ে থাকেন ‘বাউল’। এরা সংসারের বাইরেও থাকতে পারেন, আবার সংসারে আবদ্ধ থেকেও অন্য রকমের জীবনচর্যায় থাকতে পারেন। এই সব দিক থেকে, গুণী লোকশিল্পী শাহ্ আব্দুল করিমকেও নির্দ্বিধায় ‘বাউল’ বিশেষণে অভিষিক্ত করা যায়। আর অঞ্চলগত ভিন্নতার কারণে কুষ্টিয়া অঞ্চলে যে গানগুলোকে ‘বাউল গান’ বা ‘ভাব গান’ নামে ডাকা হয়ে থাকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ-সিলেট-সুনামগঞ্জে আঞ্চলিক খানিক ভিন্নতাসহ সেগুলোই ‘বাউলা গান’ বা ‘বাউল গান’ নামে জনমনে প্রতিষ্ঠিত। ফলে, সিলেট-সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ এই সমস্ত অঞ্চলে শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো ‘বাউল গান’ হিসেবেই দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠিত আর গৃহীত। অঞ্চলবিশেষে ‘বাউল’ গানের কথা-সুরেও ভিন্নতা থাকে। তবে, সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যও পরিলক্ষিত হয়ে থকে। ফলে, সম্প্রতি শাহ আব্দুল করিমকে নিয়ে শহুরে লোকশিল্পী ফরিদা পারভীনের উক্তিটি সর্বোপরি গ্রহণ করা যায় না! বাউলসম্রাট বলার চলটা এখানকার মানুষের অভ্যাসগত বৈশিষ্ট্যের দিক। সে ভিন্ন কথা। এমনকি বাউল আর সম্রাটের ধারণাও যে ভিন্ন সেটাও খাঁটি সত্য কথা। কিন্তু তাই বলে শাহ আব্দুল করিম বাউলশিল্পী নন, সেটা কোনোভাবেই সত্য নয়। একটা বিশাল অঞ্চলের গণমানুষ তাঁকে আর তাঁর গানকে ‘বাউল’ আর ‘বাউল গানের’ সাথে অতিমাত্রায় সংশ্লিষ্ট বলেই মনে করেন। আর এর পেছনে ঐ সমস্ত অঞ্চলের বাউল-ঘরানার বৈশিষ্ট্যের সবিশেষ যুক্ততা রয়েছে বলেই এগুলো ‘বাউল গান’ নামে দীর্ঘ দিন ধরে জনমনে প্রতিষ্ঠিত। ফলে, ঐ অঞ্চলের বাউল আর বাউল গানের স্বকীয় ধারাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এখন কুষ্টিয়ার কোন বাউল-ফকির যদি সিলেট-ময়মনসিংহের ‘বাউলা গান’কে এর আঞ্চলিক পার্থক্য বিবেচনা না করে স্রেফ এগুলোকে ‘বাউল গানের’ স্বীকৃতি দিতেই অস্বীকার করেন তবে সেটা তাঁর আঞ্চলিক মনোভঙ্গীর সীমাবদ্ধতা বা তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা/সীমাবদ্ধতা হিসেবে গৃহীত হতে পারে। কিন্তু তাই বলে অন্য অঞ্চলের লোকসমাজে প্রতিষ্ঠিত বিশেষ এই ফর্মটির নাম বদলানোর বা একে অস্বীকারের কোন সুযোগই নাই। কিংবা এই অস্বীকৃতির পেছনে শক্তিশালী কোন যুক্তিও নাই। সুতরাং, লোকশিল্পী শাহ আব্দুল করিমকে অসংখ্য বাউলগানের রচয়িতা বলতে বা তাঁকে সাধারণভাবে ‘বাউল’ নামে অভিহিত করতে এই দেশের কারোরই কোন দ্বিধা থাকার কারণ থাকতে পারে না!

সমাজ-ইতিহাস থেকে রাজা-বাদশাহ্-সম্রাটদের শাসন বিদায় নিয়েছে ঠিকই। কিন্তু আমাদের চিন্তনে আর চর্চায় এখনও এই শব্দগুলোর প্রতি মোহ বিন্দুমাত্র দূর হয় নাই! তা না হলে বিদ্যমান আধিপত্যশীল সমাজ-ধর্ম-সংস্কৃতির একেবারে বিপরীত স্রোতে অবস্থানরত একজন বাউল-ফকিরকে কোনোভাবেই ‘বাউলসম্রাট’ হিসেবে অভিহিত করা যায় না। বাউল আর সম্রাট দুই প্রান্তের জিনিস। কিন্তু মধ্যবিত্ত-মন কোন কিছুকে বিশেষ অভিধায় ভূষিত করতে না পারলে প্রাণে আরাম পান না! সেই অভ্যাসের দীর্ঘ সংস্কৃতি বাঙালি মধ্যবিত্তরা এখনও দম্ভভরে ঘোষণা করেন; সুযোগ পেলেই নিয়ত পরিচর্চাও করেন! যেমন কিনা মধ্যবিত্ত-মুখ বড় করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগে কবিগুরু (আর কি প্রচলিত আছে এ মুহূর্তে সব মনে পড়ছে না!) অভিধা না জুড়ে উনার প্রসঙ্গে আলাপই তুলতে পারেন না! জনপ্রিয় লোক-গায়ক শাহ আব্দুল করিমের বেলাতেও অনেক দিন ধরেই মধ্যবিত্ত-বাঙালিরা কর্পোরেট-মিডিয়ার নানা পরিসরে উনার নামের আগে ‘বাউলসম্রাট’ বলে বলে প্রতিনিয়তই মুখে প্রায় ফেনা তুলে ফেলেছিল! কর্পোরেট-মিডিয়া সংস্কৃতির অজ্ঞতাজনিত ব্যবসায়িক বাড়াবাড়ির কারণে আমাদের লোকসংস্কৃতিও আজ অন্য অনেক কিছুর মতই স্রেফ পণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে, লোকসংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় নিয়েই এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য হাজির করতে ব্যর্থ হয়! আর ভদ্দরলোকদের যেহেতু এ সমস্ত বিষয়াদি নিয়ে কোনরূপ মাথাব্যথা নাই ফলে, কর্পোরেট-মিডিয়া অনেক সময় লোকসংস্কৃতি বিষয়ে অতি মাত্রায় লাগামছাড়া আচরন করে থাকে। সে ক্ষেত্রে, লোকসংস্কৃতির মত জনজাতির গুরুত্বপূর্ণ আর স্পর্শকাতর বিষয়ে নানা ধরনের তথ্যবিভ্রান্তির অবকাশ তৈরী হয়।এ ক্ষেত্রে, সঠিক গবেষণা আর তার আলোকে কোন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক দিক নিয়ে সঠিক তথ্য সম্বলিত অনুষ্ঠান প্রচার-পরিবেশন করা বাঞ্ছনীয়।

সবশেষে, এ কথাটি না বললেই নয় যে, শহুরে লোকশিল্পী ফরিদা পারভীনের বাউল বিষয়ক কুলীন দৃষ্টিভঙ্গিই লোকশিল্পী আর বাউল গানের রচয়িতা শাহ আব্দুল করিম সম্পর্কে এ হেন উন্নাসিক মন্তব্য করতে সাহস দেয়! অথচ, খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, শাহ আব্দুল করিমের গান সিলেট আর বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের জনমনে দীর্ঘ সময় ধরে ‘বাউলা গান’ বা ‘বাউল গান’ নামেই প্রচলিত আর প্রতিষ্ঠিত। আঞ্চলিক সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে তো আর ঐ সব অঞ্চলের ‘বাউল গান’ বা ‘বাউলা গান’কে অস্বীকার করা যায় না! তাই না?

* স্বীকার্য যে, একই প্রসঙ্গের তিন-চারটা আলাদা স্ট্যাটাস-লেখাকে একত্র করে এটি বানানো হয়েছে; তারপর প্রাসঙ্গিক একটা শিরোনাম জুড়ে দিয়ে এটিকে একই সুতায় গাঁথার চেষ্টা করা হয়েছে। বাউল বিষয়ক সাম্প্রতিক বিতর্ককে সাধারণভাবে বোঝার জন্য এই ধরনের কাজ প্রথমবারের মত করলাম!

Comments

comments

সুস্মিতা চক্রবর্তী

কবি, শিক্ষক ও গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি