সাম্প্রতিক

ওসমান সমাচার পর্ব ২ । আহমদ মিনহাজ

গজগামিনী চাঁদ, ফুট-ফেটিশ পিয়ার ও রাক্ষস সমাচার (১)

এক ভরা পূর্ণিমার রাতে মেয়র সাহেবের বাসভবনে আমরা পৌঁছাই। ফুলের বাগান অতিকায় ভবনটিকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। ভবনের প্রবেশপথ ফুলের কেয়ারি দিয়ে সাজানো। কেয়ারির ফাঁকে বয়স্ক গাছেরা গর্বিত মাথা তুলে মেয়র সাহেবকে পাহারা দিচ্ছে। বিরাট বাগানে লোকজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একে অন্যের সঙ্গে আলাপে মগ্ন। আমাদের হাতে শহরের মানি-গুণী লোকজনের তালিকা। আমরা যোগাযোগ করার আগেই তারা চলে এসেছেন। মেয়র সাহেবকে ঘিরে আড্ডা চলছে। হঠাৎ আমাদের মনে পড়ে আজ ভরা পূর্ণিমা। রাতের আকাশে আলোর ঢল নেমেছে। ভরা পূর্ণিমায় শহরের লোকজন ঘরে থাকতে চায় না। তারা বেরিয়ে পড়ে যেদিকে মন চায়। নদীর ধারে হাওয়া খায়। নৌ-বিহার করে। অনেকে পরিবার নিয়ে শহরতলির দিকে ছুট লাগায়। লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ে। প্রেমিক-প্রেমিকারা শহরের ব্যস্ত সড়ক ধরে হাঁটার সময় খুনসুটিতে লিপ্ত হয়। আর শহরের গণ্যমান্য লোকজন মেয়র সাহেবের বাড়িতে ভিড় করেন। তার বাগানে আড্ডা ও খোশগল্পে মেতে উঠেন। আজ সেটা ঘটেছে।

চান্নিপসর রাতের কারণে শহরের মানি-গুণী লোকজনকে একসাথে পেয়ে আমরা মনে-মনে খুশি হয়ে উঠি। তালিকাটি হাতে নিয়ে আরেকবার চোখ বুলাই। নামের পাশে দাগ কাটি। প্রায় সবাই উপস্থিত। দু’এক জন অবশ্য আসেনি। তারা হয়তো এই মুহূর্তে শহরে নেই। কোনো কাজে হয়তো-বা আটকা পড়েছেন। অসুস্থ থাকা বিচিত্র নয়। হতে পারে কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবেন। তবে যারা এসেছেন তারা কমবেশি পরিচিত ও গণ্যমান্য লোক। মেয়র সাহেবের চারধারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে ও দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাদের হাতে কোমল পানীয়ের গ্লাস। চোখে-মুখে চাঁদরাতে গুলতানি মারার আকস্মিক খুশির ছটা। আমরা বাগানের চারকোণা ধরে টহল দিতে থাকি। একসময় ক্লান্ত হয়ে ফাঁকা চেয়ার খুঁজে বসে পড়ি।

শহরের মানি-গুণী লোকজনের নিকটে বসার শিহরন আমরা রক্তে টের পাচ্ছি। মেয়রের ডান পাশে জজ সাহেব বসে আছেন। বিচারকের আসনে বসে তাকে সওয়াল-জবাব শুনতে দেখেছি। লোকে বলে জজ সাহেবের ঘুমের বাতিক রয়েছে। সওয়াল চলাকালে সুযোগ বুঝে ঘুমিয়ে পড়েন। রায় পাঠ করার সময় মনে হবে মাত্র ঘুম থেকে উঠলেন। জজ সাহেবের পাশে তারকাখচিত ব্রিগেডিয়ার জাদরেল গোঁফে আঙুল বুলাচ্ছেন। তার পাশে ফাদার রোজারিওকে দেখতে পাচ্ছি। ইস্টার সানডের দিনে বাইবেল থেকে যিশুর পুনরায় উত্থানের বিবরণ পাঠ করার সময় তার মুখে অচেনা বিষাদ এসে জমে। এখন সেটা নেই। লঘু কণ্ঠে ব্রিগেডিয়ার সাহেবের সঙ্গে আলাপ করছেন।

আমাদের হাতে মানী-গুণী ব্যক্তিদের তালিকা। সেই তালিকার অনেকেই এখানে উপস্থিত। ফাদারের বাম পাশে জেলা প্রশাসককে দেখা যাচ্ছে। তার পাশে রামকৃষ্ণ মিশনের পুরোহিত পূর্ণেন্দু বাবু ও জামে মসজিদের ইমাম সাহেব জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মৃদু স্বরে কথা কইছেন। উনারা সম্মানী লোক। এছাড়া আরো লোকজন রয়েছেন। চেম্বার সভাপতি এইমাত্র চেয়ার পালটে মেয়র সাহেবের নিকটে বসলেন। তার আঙুলের ফাঁকে সিগারেট টিম টিম করে জ্বলছে। সভাপতি ঘোর সিগারেটখোর। আঙুলের ফাঁকে সিগারেট সারাক্ষণ জ্বলতে থাকে! তাকে দেখে মেয়র সাহেবের বোধহয় ধূমপানের ইচ্ছে জাগে। সভাপতি সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিলেন। মেয়র সাহেব দুই ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট চেপে ধরেছেন। সভাপতি লাইটারে চাপ দিলেন। মেয়র সাহেব খুক-খুক করে কেশে নিজেকে সামলে নিচ্ছেন। তিনি নিয়মিত ধূমপান করেন না। হঠাৎ শখ চাপলে দু’এক টান দেন আর কী! নগরপিতাকে সিগারেটে সুখটান দিতে দেখে অদূরে বসা স্থাপনা-সচিবের ধূপমানের শখ জাগে। তিনিও শখের ধূমপায়ী। সিগারেটের সন্ধানে ইতিউতি চোখ ঘোরান। তার পাশে বসা ঠিকাদার সাহেব স্যারের অভিপ্রায় বুঝতে পেরেছে মনে হলো। বিগলিত হাসি দিয়ে সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিচ্ছে। স্থাপনা সচিবের ঠোঁটে আগুন জ্বলে উঠলো।

স্যালুটের ধাক্কায় রমণী হেসে গড়িয়ে পড়লেও প্রমত্ত পুরুষটিকে দেখে ভয় পায়। বন্য এক রাক্ষস ছাতি ফুলিয়ে নিজের আনুগত্য জাহির করছে, পিয়ারকে এই উপমায় বন্দি করেছে রমণী। সেই রাক্ষুসে বুকে পিষে মরার ভয় তাকে সারাদিন তাড়া করে ফেরে। পিয়ারের আলিঙ্গনে সহজ হতে পারে না। প্রমত্ত রাক্ষসের আলিঙ্গনে পিষ্ট হওয়ার ক্ষণে তার হৃদয়ে প্রবাস জেগে ওঠে। সিভিলিয়ানের অপরিসর বক্ষে মাথা কুটে মরার সুখ খুঁজে মনে-মনে।

আকাশে ফাটিয়ে আজ চাঁদ উঠেছে। মেয়র সাহেবের সিগারেট খাওয়া শেষ। স্থাপনা সচিবের এখনো জ্বলছে। তার হাত ঠিকাদার সাহেবের কাঁধে। দুজনে জমিয়ে গল্প করছেন। খানিক দূরে সার্জন সাহেব বিরস মুখে বসে আছেন। তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। সার্জন সাহেব শহরের ব্যস্ততম মানুষের একজন। সারাদিন ছুরি-কাঁচি নিয়ে থাকেন। ক্লিনিক-চেম্বার ও হাসপাতালে ছুটোছুটি করেন। তার হাতে হেক্সিসলের গন্ধ উথলে উঠছে। বোঝা যায় এখানে আসার আগে কাটাকুটি করে এসেছেন। লোকে বলে ঘুমের মধ্যেও তার হাত চলে। চান্নি রাত তিনি উপভোগ করছেন বলে মনে হলো না। সম্ভবত মেয়র সাহেবের অনুরোধ ঠেলতে না পেরে এখানে এসেছেন।

সার্জন সাহেবের পাশে বই-পাগলা অখিল বাবু কাঁধে ছোট ঝোলা নিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। অখিল বাবু অন্যরকম লোক। বই কেনার মাত্রছাড়া বাতিকের কারণে শহরে সবাই তাকে চেনে। বই কেনার ক্ষেত্রে তার কোনো বাছবিচার নেই। যেটি পান কিনে ফেলেন। ছেলেভুলানো কাহিনী থেকে শুরু করে গুরুগম্ভীর মলাটের বই, — অখিল বাবুর তালিকা থেকে কিছু বাদ পড়ার উপায় নেই। তার কাছে বই একটি খেলনা যাকে ইচ্ছেখুশি বাড়ানো যায়। প্রিয় বস্তুটি কেনার সময় অখিল বাবুকে খুব তৎপর দেখায়। তিনি বইয়ের গন্ধ শুঁকেন। গন্ধ পছন্দ না-হলে সেটি কেনেন না। বইয়ের হরফ ও প্রচ্ছদের প্রতি তার শুচিবায় রয়েছে। মোটা ছাঁচের হরফ কিংবা অযৌক্তিক রঙে ছুপানো প্রচ্ছদ দুই চোখে দেখতে পারেন না। তার সংগৃহীত বইয়েরা মোলায়েম ও আটোসাটো হয়ে থাকে।

অখিল বাবুর বই রাখার ধরনটি ভারি অদ্ভুত! শিশুপাঠ্য হরফ পরিচয়ের পাশে তত্ত্বকথায় ঠাসা জটিল বই, গল্প-উপন্যাসের ফাঁকে ধর্মীয় কিতাব ও আমলনামা, ছেলেভুলানো রূপকথার মাঝখানে মনোবিজ্ঞান ও ইতিহাস জায়গা দখল করে রাখে। তার সংগ্রহ এতো বিশাল যে লোকে মজাক করে বলে,- ‘ওসমান ফুল ভক্ষণ করে আর অখিল বাবু বই গিলে খিদে মেটান!’ বইপ্রেমীদের ঈর্ষাপ্রবণ অংশটি অবশ্য বলে বেড়ায়,- সংগ্রহ অতিকায় হলে কী হবে, এর একটিও তিনি খুলে দেখেননি। তাদের অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়। খবরের কাগজ ও ছেলেভুলানো গল্পকাহিনী ছাড়া তিনি বিশেষ কিছু পড়েন না। জিজ্ঞেস করলে মৃদু হেসে উত্তর করেন,- ‘তোমরা কেউ ওসমানের ফুল চুরির কায়দা লক্ষ করেছো? আমি করেছি। ওসমান আস্ত ফুলের বদলে ফুলের কুঁড়ি চুরি করে। কারণ ফুলের কুঁড়ির মধ্যে আস্ত ফুলটি লুকানো থাকে। ফুল একবার ফোটার পর সেটা আর কুঁড়িতে ফেরত যেতে পারে না। লোকে আস্ত ফুলের সুগন্ধ ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, অথচ ভেবে দেখে না কুঁড়িটা হচ্ছে আসল বনেদ। ওসমানের মতো আমিও কুঁড়ি ভালোবাসি। কুঁড়ির ভিতরে ফুলের সুগন্ধ ও সৌন্দর্য বিকশিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে।’

অখিল বাবুর এমনধারা কথাবার্ত লোকে বুঝে এমন নয়। তবে নির্বিরোধ স্বভাবের লোকটিকে সবাই পছন্দ করে। অখিল বাবুকে দেখে আমাদের ভালো লাগে। বইপাগল লোকটির সঙ্গে আমাদের অনেক দিনের সখ্য। আমরা জায়গা বদল করে তার পাশে গিয়ে বসি। অখিল বাবু মৃদু হেসে ঝোলায় হাত দেন। বেঁটেখাটো রামের বোতল বেরিয়ে আসে সেখান থেকে। অখিল বাবু মদ্যপ প্রকৃতির লোক না। মদ্যপান তার নিয়মিত অভ্যাসের মধ্যে পড়ে না। তবে এমন জ্যোৎস্নধোয়া রাতে এক-আধটু পান করতে ভালোবাসেন। চ্যাপ্টা মদের বোতলটি আলগোছে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমরা হাত বদলা-বদলি করে কয়েক ঢোক পান করি। খুব ঝাঁঝ। মনে হলো গলা দিয়ে গরম হল্কা বইছে। রামের বোতলটা অখিল বাবুকে আমরা ফিরিয়ে দেই। তিনি সেটা ঝোলায় চালান করেন। পাশে বসা সার্জন সাহেব আমাদের এই গোপন অভিযান টের পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে না। চাঁদের আলো টেরচাভাবে তার গালের ডান পাশে পড়েছে। সেখানে একটা কাটা দাগ আছে। দাগটি দেখে আমরা শিউরে উঠি। হিংস্র কোনো জন্তু মুখে আঁচড় দিলে এরকম দাগ হয়। সার্জন সাহেবের পাথুরে মুখে দাগটা কুণ্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। সুযোগ পেলে ফণা তুলে ছোবল মারবে। আমাদের গা শিরশির করে। সার্জন সাহেবের পাশ থেকে আস্তে কেটে পড়ি।

বাগানের ভিতরে ইট-সুড়কির রাস্তা ধরে আমরা দ্রুত-পায়ে হাঁটি। হঠাৎ টের পাই ওসমান আমাদের পিছু নিয়েছে। তার গায়ে সার্জনের পোশাক। হাতে সুঁই-ছুরি-কাঁচি। ডান গালে লম্বা কাটা দাগ। চোখে মানুষ খুনের নেশা। আমরা ত্বরিত জায়গা বদল করি। খণ্ড-খণ্ড জটলায় ঢুকি ও বের হই। ওসমান আমাদের তাড়া করেছে। আমরা ঘোরলাগা আতংকে এক জটলা থেকে আরেক জটলায় পাক খেতে থাকি। আমাদের এভাবে পাক খেতে দেখে পরিচিত অনেকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। দু’এক জন ‘এই এটা কী হচ্ছে’ বলে হেসে ফেলে। তারা হয়তো ভাবছে চন্দ্র কিরণের প্রভাবে আমরা ছেলেমানুষী করছি। পরস্পরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় মেতে উঠেছি। আমাদের সর্পিল ছোটাছুটি দেখে সকলে মজা পায়। অনেকে হাততালি দিয়ে ওঠে। ঘোরগ্রস্ত পায়ে ঘুরতে-ঘুরতে আমরা মেয়র সাহেবের নিকটে চলে আসি। তাকে ঘিরে চলমান জটলার গা ঘেঁষে ছুটতে থাকি। ব্রিগেডিয়ার সাহেবের দরাজ হাসি শুনে আমাদের ঘোর ভাঙে। দম দেয়া পুতলের মতো সকলে দাঁড়িয়ে পড়ি। গায়ের পোশাক ততোক্ষণে ঘামে ভিজে সপসপে হয়ে গেছে।

আকাশে আজ চাঁদের বন্যা বইছে। তার সঙ্গে তাল দিয়ে ব্রিগেডিয়ার পিয়ার মোহাম্মদ গলা ফাটিয়ে হাসছেন। সম্ভবত মেয়র সাহেবের কোনো রসিকতা তার মনে ধরেছে। পিয়ার মোহাম্মদ শহরের পরিচিত মিলিটারি ম্যান। সৈনিক জীবনের পাঠ চুকিয়ে এখন অবসরকে যাপন করছেন। সিভিল পোশাক পরে ঘুরে বেড়ান। সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভুল করেন না। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসাবে মাঝেমধ্যে টেলিভিশনের টক-শো তাকে ডাকে। লোকের সঙ্গে কথা বলার সময় ব্রিগেডিয়ারের জাদরেল গোঁফ তিরতির করে কাঁপে। সিভিল পোশাক ভেদ করে দাপুটে মিলিটারি ম্যান উঁকিঝুকি মারে। শহরে সবাই তাকে চেনে। বয়স প্রচুর হলেও পেটানো শরীর, জাদরেল গোঁফ ও বাজখাই গলার আওয়াজে সেটা বোঝার উপায় নেই। ব্রিগেডিয়ার পিয়ার বউ-ভক্ত মানুষ। সুন্দরী স্ত্রীকে পাখির ছানার মতো আগলে রাখেন। মধ্যবয়সী স্ত্রীটি শহরের ডাকসাইটে সুন্দরীর একজন। শহরবাসীর গুঞ্জন ও কৌতূহলের পাত্রী। অনেকের জন্য না-পাওয়া এক হাহাকার। বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস! দুর্জনরা বলে স্ত্রীর সৌন্দর্য পিয়ারকে মিলিটারি করে রাখে। রাতে ঘুমের মধ্যে স্ত্রীকে পাহারা দেয়।

ব্রিগেডিয়ার পিয়ার মোহাম্মদের রমণী-সঙ্গের ইতিহাস খাপছাড়া ও কৌতুকস্নিগ্ধ। ব্রিগেডিয়ার সাহেবের প্রথম বিবাহ পরিবারের ইচ্ছায় ঘটে। পিয়ার তখন সামরিক জীবনের পয়লা পাঠ চুকিয়ে দ্বিতীয় পাঠে প্রবেশ করেছেন। পদাতিক ডিভিশনে সৈনিকের কঠিন প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। এবার দায়িত্ব বুঝে নেবার পালা। পরিবারের লোকজন ভাবে পিয়ারকে সংসারে ঢোকানোর এটাই মোক্ষম সময়। সুতরাং বিবাহের তোড়জোর শুরু হয়। পিয়ারের ওজর-অজুহাত কাজে আসে না। মুখে তা-না-না করলেও তার মনের ভেতরে বাসনার ঢেউ সমানে বইছিল। একটি কোমল হাতের স্পর্শ পাওয়ার জন্য ভিতরে অস্থির হচ্ছিলেন। তবে তার এই অস্থিরতায় খানিক অসংলগ্নতা ছিল। ব্যারাকে শুয়ে হবু কনের মুখটি কল্পনা করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু মুখের পরিবর্তে নারী দেহের অন্য অঙ্গ তার চোখে ভেসে উঠতো। পিয়ারের মনে হতো চুড়ি পরিহিত কোমল হাত তাকে আবেষ্টন করে আছে। পায়ে নূপুর পরা গোড়ালি ইশারা দিয়ে ডাকছে। মন্ত্রমুগ্ধ সাপের মতো তিনি সেই গোড়ালি-শিঞ্জনের পিছু নিতেন। তার পালিশ-করা বুটে গোড়ালির ছবি ভেসে উঠতো। শয়নে-শয্যায় মুখের বদলে তিনি পদযুগল দেখতেন।

মোদ্দা কথা যুবক পিয়ার মোহাম্মদ তার সামরিক জীবনের শুরু থেকে ফুট-ফেটিশ ছিলেন। সামরিক দায়িত্ব পালনের দিনগুলোয় নিয়ম করে যুদ্ধ ও লড়াইয়ে গেছেন। সম্মুখ ও চোরাগুপ্তা লড়াইয়ে বহুবার জখম হয়েছেন। তবে শত্রু-নিধনের মুহূর্তে প্রতিপক্ষের মুখের দিকে তাকাতেন না। তার মনোযোগ শত্রুর পায়ে নিবদ্ধ থাকতো। পিয়ার বিশ্বাস করেন মুখের দিকে তাকালে চিত্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। লক্ষ-বিচ্যুতি ঘটে। কারো মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে হত্যা করা কঠিন। পায়ের ক্ষেত্রে সমস্যটা নেই। এই অঙ্গের উপর ভর দিয়ে দেহটি দাঁড়িয়ে থাকে। এর সাহায্যে সৈনিকরা শত্রুপক্ষ থেকে আত্মরক্ষা ও আত্মগোপন করে। পায়ের ছাপ এবং আওয়াজ অনুসরণ করে শত্রুকে ঘেরাও করে ফেলে। কিন্তু এতোকিছুর পরেও মুখের মতো বিচিত্র বিভ্রান্তি তৈরির ক্ষমতা পায়ের নেই। পা দিয়ে অনেককিছু করা গেলেও বিভ্রান্ত করার ক্ষমতায় অঙ্গটি সবল নয়। শত্রু তার পায়ের অঙ্গ-ভঙ্গি দিয়ে প্রতিপক্ষকে তাচ্ছিল্য করতে পারে। ভুল জায়গায় এমবুশ করাতে প্ররোচিত করতে পারে। সুযোগ পেলে পায়ের চরকিনাচে ঘুরিয়ে মারতে ও খাদে টেনে নিতে পারে, কিন্তু বেশিক্ষণ বিভ্রান্ত রাখতে পারে না। শত্রুর পা চালানোর মুদ্রা একবার জানা হয়ে গেলে তাকে পরাস্ত করা কঠিন নয়।

পিয়ারের ধারণা সৈনিকের হাত ও পায়ের সক্রিয়তা দিয়ে তার বুদ্ধিমত্তা ও চাতুর্য ধরা যায়। পদাতিক সৈনিকের জন্য পা হলো এমন একটি অস্ত্র যাকে ব্যবহার করে সে শত্রুর বিরুদ্ধে টিকে থাকে। বিজয়ী হয়। নিজের পায়ের পরিচর্যায় তিনি যত্নবান ছিলেন। অন্যদিকে রমণীর পদযুগল তার কাছে সবসময় ভিন্ন অর্থ ও রোমাঞ্চ নিয়ে এসেছে। যুবতী পদযুগলের প্রতি পিয়ারের তীব্র আসক্তি ছিল। রমণী-অঙ্গের মধ্যে পদযুগলের চেয়ে কামঘন কিছুর কথা তিনি ভাবতে পারতেন না। তন্বী কোনো রমণীর অন্য অঙ্গের সৌন্দর্য স্বীকার করলেও পিয়ারের কল্পনায় পদযুগল বারবার হানা দিয়েছে। তার মতে একটি চমৎকার পদযুগল রমণীর সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলে। পায়ের গঠন দেখে মুখের অনেক কিছু ধরে ফেলা যায়। কাজেই পায়ের সমতুল্য কিছু নাই এ জগতে।

ফুট-ফেটিশ বিগ্রেডিয়ার সাহেবের প্রথম পরিণয় ঘটে রমণীয় পদযুগলের সঙ্গে। কনে দেখার সময় কলেজ-পড়ুয়া স্ত্রীর মুখের পরিবর্তে পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কলেজের নিকটবর্তী এক রেস্তোরাঁয় বর-কনের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। সাক্ষাতের পুরোটা সময় পিয়ার মাথা নিচু করে হবু কনের পা এবং গোড়ালির গঠন অনুমানের চেষ্টা করছিলেন। কনেটি সেদিন উঁচু হিলের সঙ্গে ম্যাচ করে শিফন শাড়ি পরেছিল। শাড়ির ফাঁক দিয়ে গোড়ালি বেরিয়ে পড়েছে। পিয়ার সেটা দেখে নিতে বিলম্ব করেননি। ফর্সা গোড়ালির ছোট্ট তিলটি পর্যন্ত তার চোখকে সেদিন ফাঁকি দিতে পারেনি। হবু কনের গোড়ালি দেখে তাকে হ্যাঁ বলার সিদ্ধান্তে নিয়েছিলেন। তার কল্পনা শাড়ি ভেদ করে রমণীর নগ্ন পদযুগলে স্থির হয়। তিনি মোলায়েম পৌরুষে সেই পদযুগল স্পর্শ করেন। হাতের আঙুলে এর দৃঢ়তা ও কমনীয়তা পরখ করেন। হবু কনের পদযুগল তাকে নিশ্চিত করে রমণী কামঘন ও বিশ্বস্ত হবে। তার পকেট থেকে সুদৃশ্য আংটি বেরিয়ে আসে এবং সেটা তিনি কনের আঙুলে পরিয়ে দেন। এই বিবাহে তার কোনো আপত্তি ছিল না।

ফুট-ফেটিশ পিয়ারের স্ত্রীর জন্য সাক্ষাৎটি অবশ্য সুখের ছিল না। বিটকেল লোকটির হাবভাব তার মনে বিরক্তির উদ্রেক করছিল। সারাক্ষণ পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কী খুঁজছে আল্লা জানে। মনে হচ্ছে বিয়ের কনে নয়,- পা দেখতে এসেছে। গলার আওয়াজ সুরেলা নয়। কথা বলার সময় মনে হয় আশপাশে বাজ পড়ছে। ঠোঁটের উপরে গোঁফ জোড়া সুবিধের নয়। হাতের থাবা যেন আফ্রিকার গরিলা। গায়ের রঙ অবশ্য খারাপ না। তবে মুখটা পাথুরে। মিলিটারি হওয়ার কারণে ভাবলেশহীন। মনে হচ্ছে মেজাজি ও মাথামোটা হবে। এমন লোকের সঙ্গে ঘর করতে হবে ভেবে কনের মনে বিরক্তির ঝড় বইছিল।

কনের এই বিরক্তি প্রচলিত প্রথার সঙ্গে খাপ খায় না। মেয়েরা মিলিটারি পাত্র পছন্দ করে না এমন নয়। বরং মিলিটারি পাত্রের প্রস্তাব এলে পারতপক্ষে না করে না। জলপাই লেবাসধারী পুরুষকে নিয়ে রমণী-মনে অপার রোমাঞ্চ ও কৌতূহল বিরাজ করে। একটি মেয়ের কাছে মিলিটারি হয়তো ফ্যান্টাসি। পেটানো শরীর ও এক্রোবেটিক ক্ষিপ্রতার কারণে তাকে বাস্তবের মানুষ ভাবতে কষ্ট হয়। মিলিটারি এক অজানা আগন্তুক। সে আমজনতার অংশ নয়। সাধারণ বা সিভিলিয়ান তাকে নাগাল পায় না। পাঁচ-দশটা সিভিল পুরুষ থেকে সে সম্পূর্ণ আলাদা। বীর ও সাহসী। মৃত্যুর পরোয়া করে না। রমণী-হৃদয়ে মিলিটারি তাই সাহসী ও সুদর্শন এক ফ্যান্টাসি। তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে এবং সময় হলে মাটি ফুঁড়ে আবিভূর্ত হয়। রমণীরা সাহস ও সৌন্দর্যের পূজারী। আর মিলিটারি হচ্ছে এর উৎকৃষ্ট উপমা। পিয়ার মোহাম্মদ একজন মিলিটারি। ফুট-ফেটিশের পাগলামি বাদ দিলে পাত্র হিসাবে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। মনে-মনে বিরক্ত হলেও পিয়ারের হবু স্ত্রী বুঝতে পারছিল এই বিবাহটি ঠেকানো যাবে না।

ব্রিগেডিয়ার সাহেবের প্রথম স্ত্রীর সংকট ছিল অন্যত্র। পিয়ার মোহাম্মদকে সে দেখতে এসেছে পরিবারের চাপে পড়ে। নিতান্ত বাধ্য হয়ে। প্রবাসী এক কাজিনের সঙ্গে তার আশনাই ছিল। সেই ছেলেবেলা থেকে দুজনে খুব ভাব। কিন্তু পারিবারিক বিবাদ তাদের জন্য কাল হয়ে ওঠে। পিয়ারকে বিয়ের চাপ সেখান থেকে তীব্র হয়। পরিবারের চাপে মিলিটারিকে বিয়ে করলেও পিয়ারের গোঁফ ও পদযুগল-মোহ তার স্ত্রী মেনে নিতে পারেনি। বিয়ের পরেও তার মন প্রবাসে বাঁধা ছিল। প্রিয় কাজিনের নাতিদীর্ঘ আয়তন তাকে অহরহ উত্যক্ত করেছে। রমণীর মন পড়ে থাকতো নিতান্ত সাধারণ এক সিভিলিয়ানের জগতে। সিভিলিয়ানটি ভালো গল্প করতে জানে। তার চোখ দুটি ভালোবাসায় কোমল হয়ে থাকে। মুখের ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি আরবদেশের শেখের মতো কাব্যিক। সিভিলিয়ান থাকে প্রবাসে। হাঁটে মাঝারি ছন্দে। কথা বলে মৃদু কণ্ঠে। সেখানে কাব্য ও ভালোবাসার ছটা গোপন থাকে না। পিয়ারের হবু স্ত্রীর ঠোঁট দুটোর মধ্যে সে প্রজাপতির রঙ দেখে। বিকচিত কুচযুগলে দস্যি মেয়ের মাতন টের পায়। কোমরের বাঁকে পাহাড়ি নদীর ডাক শুনে। আর রমণীর নিতম্বদেশকে মেঘ-গম্ভীর নামে ডাকে। তার ইচ্ছা সে পা রাখবে সেই পাহাড়ি নদীতে। টোকা দেবে মেঘ-গম্ভীরে। খুলে দেবে কাঁচুলি। দস্যি মেয়েটি সেদিন বেরিয়ে আসবে আর হুড়মুড় করে ভাসিয়ে নেবে সব। সিভিলিয়ানের বড়ো ইচ্ছে সে ভাসবে পরকীয়ায়। বিরহ আর ভাল্লাগে না!

ব্রিগেডিয়ার সাহেবের স্ত্রী বাঁধা পড়েছিল বাল্যপ্রেমের আবেগে। অবুঝ বয়সে গজিয়ে উঠা দস্যিপ্রেমের স্মৃতিতে। তার মন বাঁধা ছিল প্রবাসী সিভিলিয়ানের বাক্যজালে। সিভিলিয়ানের বিপরীতে পিয়ার মোহাম্মদ পুরোদস্তুর মিলিটারি ম্যান। পালিশ-করা বুটে খটখট আওয়াজ তোলে হাঁটে। কাঁটাচামচ দিয়ে সপাটে নুডলস মুখে তোলে। তার ঊর্দি চকচক করে বন্য গরিলার বিক্রমে। চোখের মধ্যে লেগে থাকে সৈনিকের আত্মবিশ্বাস ও রমণীয় পদযুগল দেখার ঘোর। মাঝেমধ্যে রসিকতার ছলে স্যালুট করে স্ত্রীকে। শক্ত হাঁটু ভাঁজ হয়ে সদম্ভে মাটিতে নেমে আসে। চোখ উপরে তুলে হাত উঠিয়ে আনে কপালে। মনে হয় কোনো রমণী নয়, পিয়ার স্যালুট দিচ্ছে মৃসণ পদযুগলকে। স্যালুটের মধ্যে প্রকাশ পায় রমণীয় কোনো পদযুগলের প্রতি তার বিক্রম ও আনুগত্য। দাপুটে পিয়ার স্ত্রৈণ ছিলেন বটে। স্যালুটের ধাক্কায় রমণী হেসে গড়িয়ে পড়লেও প্রমত্ত পুরুষটিকে দেখে ভয় পায়। বন্য এক রাক্ষস ছাতি ফুলিয়ে নিজের আনুগত্য জাহির করছে,- পিয়ারকে এই উপমায় বন্দি করেছে রমণী। সেই রাক্ষুসে বুকে পিষে মরার ভয় তাকে সারাদিন তাড়া করে ফেরে। পিয়ারের আলিঙ্গনে সহজ হতে পারে না। প্রমত্ত রাক্ষসের আলিঙ্গনে পিষ্ট হওয়ার ক্ষণে তার হৃদয়ে প্রবাস জেগে ওঠে। সিভিলিয়ানের অপরিসর বক্ষে মাথা কুটে মরার সুখ খুঁজে মনে-মনে। স্ত্রৈণ পিয়ার বুঝতে পারেনি মৃসণ পদযুগলের মালকিন তাকে একফোঁটা ভালোবাসে না।

পিয়ারের ভালোবাসায় অবশ্য কখনো ছেদ পড়েনি। স্ত্রীর আদর-যত্নে ত্রুটি ঘটেনি। নিজ হাতে পায়ের নখ কেটে দিতে সৈনিকের দম্ভে বাঁধেনি। পেডিকিওর করে দিতে সংকোচ হয়নি। এমনকি মৈথুনের শিহরিত ক্ষণে স্ত্রীর পদযুগলে আঙুল বুলানোর আবেশ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখতো। পিয়ারের স্ত্রী প্রথমদিকে বিষয়টা উপভোগ করেছে। রানি সিংহাসনে বসে আছে আর রাজা ভৃত্যের মতো তার পদযুগল চুম্বন করছে,- পিয়ারের আবেশের মাঝে এই দাসত্ব তাকে সুখ দিতো। কিন্তু মাত্রছাড়া আবেশের সাথে তাল দিতে না-পেরে স্ত্রী ক্রমে বিরক্ত হয়ে ওঠে। গোঁফো লোকটার কাজ-কারবার তার কাছে মানহানিকর মনে হতো। রমণীর সৌন্দর্যকে সে হাঁটু ও গোড়ালির মধ্যে বন্দি করে ফেলেছে। মাঝেমধ্যে ভাবে,- ‘আচ্ছা এই পাগলের কাছে আমি কি একটা গোড়ালি ছাড়া আর কিচ্ছু নই! পাগলটা কী পায় হাঁটু ও গোড়ালির মতো বিরস দুই অঙ্গে!’

স্ত্রীর এই বিস্ময় ক্রমে ক্ষোভে রূপ নিতে থাকে। রাগের মাথায় পিয়ারের পেটানো বুকের উপর নিজের গোড়ালি তুলে আঘাত করে রমণী। তার নাজুক গোড়ালির আঘাত গিয়ে লাগে পিয়ারের বুকের খাঁচায়। ফল হয় বিপরীত। অবোধ রাক্ষস আবেশে চোখ বুজে ফেলে। সে এখন মহিষাসূর। ত্রিভঙ্গমুরারী দেবী দুর্গার রক্তকমল পদযুগলে ভক্তিভরে সমর্পিত। প্রমত্ত রাক্ষস সমাহিত দেবীচরণে। দেবী জেগে উঠেছেন। জাগ্রত হয়েছে প্রকৃতি। তার বল্লমের ঘায়ে নির্বাপিত হয়েছে দানব মহিষাসূর। দেবীর মুখে শরতের প্রসন্ন আভা। ঠোঁটের রেখায় ‘ওম শান্তি’র দ্যুতি। কাজলটানা চোখে দানবকে বরাভয়। দেবীর পায়ের নিচে মদমত্ত পুরুষ। অহং-স্খলনের সুখে বরাভয় চাইছে। মহিষাসূর নতজানু দেবীর রক্তকমল পদযুগলে। পুরুষ হওয়ার আস্ফালন নিভে গেছে রমণীর রোষ-বহ্নি ও বরাভয়ের মাধুর্যে। পিয়ার এখন মহিষাসূর। রমণীর রক্তকমল গোড়ালির নিচে সুখ-স্খলনের আবেশে বিভোর। রমণী কিন্তু এই আবেশের বাইরে। তার মুখে অশনির আভাস। চোখের কোণায় ক্ষোভের ফুলকি। দেহের তরঙ্গে জনৈক সিভিলিয়ানে তরঙ্গিত হওয়ার দুর্বার পিপাসা।

ফুট-ফেটিশ পিয়ার মোহাম্মদের বাড়াবাড়িতে অতিষ্ঠ স্ত্রী এভাবে বন্ধ্যা ও অনুর্বর হয়ে পড়ে। অবসন্ন ও খিটখিটে হয়ে ওঠে। প্রবাসী কাজিনের জন্য তার মন সারাদিন উচাটন করে। জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়ায়। চড়ুই পাখি ফুড়ুত করে উড়ে বসে তার কাঁধে। দোয়েল পাখি ঘুরঘুর করে পায়ের চারধারে। খাঁচার ময়না উঠে আসে হাতে। বাকপটু পাখি রমণীকে বলে ‘পালা’। গানের পাখি রমণীর পায়ে ঠোকর দিয়ে বলে ‘পালা। ছোট্ট চড়ুই কিচির-মিচির করে কানে,— ‘দেরি করিস নে, এবার পালা।’

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়। রমণী অলস-পায়ে ছাদে ওঠে। দুপুরের গনগনে রোদ তাকে ঝাপটে ধরে। খ্যাপা ষাঁড় ঢুকে পড়ে শরীরের আনাচে-কানাচে। রমণীর ঠোঁটে আগুনের ফুলকি ছুটে। স্তন ফুলে উঠে খ্যাপাটে ষাঁড়ের গর্জনে। নাভিদেশে ধোঁয়ারা কুণ্ডুলি পাকায়। যোনিদেশ দিয়ে লাভাস্রোত নামে। নিতম্বের খাড়াইয়ে লাগে দাবানল। রমণী পুড়তে থাকে সে দাবানলে। দিঘল কেশ বেয়ে শিখারা তার চোখে-মুখে উঠে পড়ে। রমণী একা পুড়তে থাকে ছাদে। সম্মোহিত বোধ করে দাউদাউ রোদের দাপটে। আকাশে চোখ তুলে রোদকে জিজ্ঞাসে,— ‘ঝাঁপ দিই?’ লেলিহান শিখা তার প্রশ্ন শুনে বেগবান হয়। রমণীকে ঘেরাও করে নিয়ে চলে ছাদের কিনারে। রমণীর হাত এখন পাখির ডানা। পায়ের গোড়ালি উঠে গেছে কিনার ছেড়ে। রমণী পুনরায় জিজ্ঞাসে,- ‘ঝাঁপ দিই?’ লেলিহান শিখা বেগবান উত্তর করে,- ‘ঠিক আছে, ঝাঁপ দে!’

ফুট-ফেটিশ পিয়ারকে একা রেখে পাখি পালায়। উধাও হয় নিরুদ্দেশে। পদযুগলের ঘোরে সমাহিত মিলিটারিকে নামিয়ে আনে মাটিতে। লোকে বলে এই ধাক্কা পিয়ারের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বহু দিন পর নিজের হাঁটুর দিকে তাকিয়ে তার বুক হু হু করে ওঠে। পিয়ারের পদযুগল—প্রীতি রমণী ছেড়ে পুনরায় সৈনিকে ধাবিত হয়। শক্ত এক অফিসারে নিজেকে বদলে নেওয়ার শপথ করেন পিয়ার। ছোকরা বয়সী পদাতিকদের কাছে মূর্তিমান আতংক হয়ে উঠেন। সামরিক জীবনের এই পর্বে তার অবদান হলো মাটিতে কান পেতে শত্রুর গতিবিধ ও অবস্থান সনাক্ত করা। কান পাতার কৌশলটি তার হাতে পড়ে তত্ত্বে রূপ লাভ করে। বাস্তবেও এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়। শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে নিজের পাকে কীভাবে ব্যবহার করা লাগে সেটা রপ্ত করা পদাতিক ডিভিশনের ছোকরা অফিসারদের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। পিয়ারের কাছ থেকে তারা শিখে জীবজন্তুর চলাফেরার ধরন। জঙ্গলে ও পাহাড়ে চুপিসারে স্ক্রল করার কৌশল। শত্রু-শিবিরে অতর্কিতে ঢুকে পড়া ও শত্রুকে ঘেরাও করার পদ্ধতি। পায়ের গতির সঙ্গে বন্দুকের সঠিক নিশানার খুটিনাটি তারা শিখে। পায়ের গতি আন্দাজ করে নিশানা ঠিক করার টেকনিকে পিয়ার তাদের দক্ষ করে তোলেন। উপরমহলে পিয়ার মোহাম্মদ নামটি কদর পেতে শুরু করে।

কাজের চাপে রমণীর পদযুগলের প্রতি পিয়ারের আকর্ষণ স্তিমিত হলেও প্রাক্তন স্ত্রীকে ভুলে থাকা সম্ভব হয়নি। স্ত্রীর এই আকস্মিক উড়াল তার মনে ভার হয়ে সারাক্ষণ চেপে থাকে। ব্যবহৃত জুতা, অন্তর্বাস ও অলংকারে অলৌকিক পদযুগলের নড়াচড়া পেয়ে চমকে উঠেন। ঘরের ভিতরে পায়ের আওয়াজ শুনতে পান। কে যেন চুপিসারে সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠছে। তার গোড়ালি তোলার শব্দ শোবার ঘর থেকে স্পষ্ট শোনা যায়। পিয়ার গোড়ালিকে অনুসরণ করে ছাদে উঠেন। রমণীয় পদযুগলের বাহারে ছাদটা ভরে আছে। মন্ত্রমুগ্ধ পিয়ারের চোখের সামনে বাহারি পদযুগলের মিছিল চলছে। ছাদ ভরে উঠেছে সরু ও চ্যাপ্টা জুতোর রকমারি শব্দে। জুতো পায়ে রমণীরা রাজহাঁসের মতো ডানা তুলে হাঁটছে। খিলখিল হেসে একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ছে। কলকল করে আলাপ করছে নিজেদের মধ্যে। পিয়ার সম্বিত হারান।

রমণীরা পিয়ারকে বেড় দিয়ে ঘুরতে শুরু করে। সরু হিলে খটখট শব্দ তুলে তারা ঘুরে। ফ্ল্যামেঙ্কো নর্তকীর মতো ঘুরে। ঘূর্ণিতালে রমণীদের শাড়ির আঁচল খসে পড়ে। বাতাস লেগে খাটো স্কার্ট পতপত করে ফুলে ওঠে। গজেন্দ্রগামিনী রমণীরা তবু পিয়ারের চারপাশে ঘুরে। হাতে হাত রেখে কুচকাওয়াজ করে একরত্তি সেই ছাদে। তাদের পদযুগলে রোদের ছটা। বাঁকানো কোমরদেশ থেকে রোদ পিছলে পড়ছে পায়ের পাতায়। তারা এখন চঞ্চল হরিণী। পায়ের পাতা তুলে চপল ছন্দে হাঁটছে। ছাদ ভরে উঠেছে রমণীয় লাস্যে। রমণীরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ে ছাদের কিনারায়। তাদের পুরুষ্টু উরুদেশে রোদ ঝিকিমিক করে। অধরে মদির লাস্য বহে। পিয়ারকে তারা হাতছানি দিয়ে ডাকে। চোখের তারায় বঙ্কিম কটাক্ষ হানে। কত্থক নতর্কীর মুদ্রায় হাঁটু ভাঁজ করে তাকে ডাকে। রমণীরা তাকে ডাকে ঝাঁপ দিতে। ঝাঁপ দেয়ার আহবানে পিয়ারের ঘোর কেটে যায়। পড়িমড়ি করে ছাদ থেকে নামেন। কানে বালিশ চাপা দিয়ে শুয়ে পড়েন বিছানায়। প্রাক্তন স্ত্রী তাকে সর্বনাশের চূড়ায় ঠেলে দিতে চাইছে বুঝে দিন-রাত নিজেকে কাজে ডুবিয়ে রাখেন। অতঃপর এমন দিন আসে পিয়ার তার ঘরের পেছনে বড়ো গর্ত খনন করেন এবং স্ত্রীর সকল স্মৃতি সমাধিস্থ করেন সেই গর্তে!

পরিবার থেকে বিয়ের চাপ এলেও পিয়ার এবার অনড়। দ্বিতীয়বার বধূবরণে তাকে রাজি করানো যায় না। অস্ত্র ও গোলাবারুদের জগতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখেন। জাদরেল সামরিক বলে সুনাম কুড়ান। বিপত্নীক ও নিঃসন্তান সমর-মানবের জীবনটি হয়তো এভাবে অবসরে পৌঁছে যেতো। এক ঘোর থেকে অন্য ঘোরে ঢোকার পর শত্রুপক্ষের নিখুঁত নিশানায় তার মজবুত পদযুগল পঙ্গু হতে পারতো। বয়সের ভারে শুকিয়ে যেতে পারতো দেহের ভার বহনকারী অঙ্গের প্রতিটি কোষ। অশক্ত পিয়ার হয়তো জীবনে প্রথম নিজের পা দুটিকে ঘৃণা করতেন। একদা যারা মজবুত ও চৌকস ছিল। এখন অধিক নড়তে পারে না। কিন্তু বিধাতার অন্য ইচ্ছা ছিল। এবার সেটাই ঘটে।

সামরিক জীবনের শেষ অধ্যায়টি পিয়ারের জীবনে বসন্ত নিয়ে আসে। শহর দাঙ্গায় কেঁপে ওঠে, আর পিয়ার দেখেন তার ঘরে এক যুবতী কন্যার আগমন ঘটেছে। যুবতীর পরনে লাল বেনারসি। উৎকণ্ঠিত হরিণী অপেক্ষা করছে শোবার ঘরে। যুবতীর মুখটি পানপাতা। অধর পরিপক্ক ডালিমদানা। আঁখি-পল্লবে জিনিয়া ফুটেছে। মেহদিরঙ হাতের আঙুলগুলো বড়ো নাজুক। খানিক চাপ দিলে মট করে ভেঙে যাবে। যুবতীর বক্ষদেশ বর্ষার কদমফুল,— মাত্র ফুটেছে। বহুদিনের পুরোনো অভ্যেস আবার ঘাই মারে পিয়ারের রক্তে। যুবতীর পদযুগলে তার চোখ আটকে যায়। রমণীর গোড়ালি সুডৌল। হাঁটুর ভাঁজ ও সুঠাম উরুদেশে তরুণ-প্রাণের লাবণ্য। ক্ষীণ কটি আলগোছে ধরে আছে যৌবনের ভার। জীবনে এই প্রথম পিয়ার কোনো রমণীকে পরিপূর্ণ দেখলেন। দেহের প্রতি অঙ্গের সংযুক্তিকে দুই চোখ ভরে শোষণ করলেন। তার মনে হলো অনেক পাপ করেছেন জীবনে। এবার সেটা চোকাবেন পরিপূর্ণ রমণী-মৈথুনে!

(ক্রমশ)

আহমদ মিনহাজ

জন্ম স্বাধীনতার বছরে । লেখালেখির শুরু নয়ের দশকে, ছোটকাগজে । একসময় নিয়মিত লিখলেও এখন প্রায় স্বেচ্ছা-নির্বাসিত । যদিও মাঝেমধ্যে উঁকি মারেন ছোটকাগজ ও ব্লগে । এর বাইরে একান্ত পারিবারিক । প্রকাশনায় সক্রিয় না হলেও গান শুনে, সিনেমা দেখে ও বন্ধুসঙ্গে নিজেকে যাপনের পাশাপাশি সক্রিয় আছেন নতুন লেখার খসড়ায় । আহমদ মিনহাজ মূলত প্রবন্ধে স্বচ্ছন্দ হলেও গল্প ও আখ্যানের জগতে ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রায়শ । কয়েকটি গল্প ছোটকাগজে প্রকাশিত হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে । বাকিগুলো প্রকাশের মুখ দেখেনি আর । উল্টোরথের মানুষ তার প্রথম আখ্যান । প্রায় এক দশক আগে এই আখ্যানের চিন্তাবীজ লেখককে তাড়িত করে । অনেকটা ঘোরগ্রস্ততার মধ্যে আখ্যান-টি রচিত হয় এবং প্রকাশিত হয় ছোটকাগজে-ই । সময়ের আবর্তে ধূলিমলিন হয়ে পড়ে ছিল দীর্ঘদিন । যদিও এই আখ্যানের গর্ভে লুকিয়ে থাকা প্রাণবীজ আজো অমলিন,- আখ্যান ও প্রতি-আখ্যানের দ্বৈরথে আজ ও আগামীর পাঠকের জন্য প্রাসঙ্গিক ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি