সাম্প্রতিক

একগুচ্ছ চতুর চতুর্দশপদী । কালের লিখন

মানসিক রোগী

প্রতিযোগিতা নেই কোথাও, প্রত্যেকেই স্থিরশান্ত—
দিকভ্রান্ত অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে গেছে দূরে।
যাদের দৃষ্টিবিভ্রম, এখনো ছুটছে তারা অক্লান্ত—
চেনাদৃশ্যই সাদৃশ্য বিলাসে আসছে ফিরে ফিরে।

চিরকালীন সত্য যেমন মত হয় না কোনও,
পথও তেমন বাঁক খুঁজে নেয় নিজের মতন।
আঁককষা বাদ দিয়ে তাকায় যে কিশোরতনু
জানে না সে কোন পাখিটার পাখার ভাঁজে যতন।

শেষ কথা কে বলেছে? আদ্যোপান্ত ক্ষয়ের হিসাব
নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে দূরে, অনড় পাহাড়।
বুকে তার লতাগুল্ম ফুলফল রাঙা গুইসাপ,
মানুষ এখনো খোঁজে, মাটিচাপা মানুষের হাড়।

আর সেই একলা কিশোর, খোঁজে স্বীয় প্রতিযোগী—
কেউ কেউ বলে তাকে, বেপরোয়া মানসিক রোগী।

ঘুম

ধীরে ভাঙে ঘুম, স্থির জেগে আছে অস্থির স্থিরতা,
জানালায় রোদ খেলে, দূরের মৌমাঠে লোকজন।
তখনো কারও ঘুম ভাঙে নাই, আধো নীরবতা
হৃদয়ে ধারণ করে, একজন ভেঙ্গে ফেলে পণ।

তখনো ঘুরছে পৃথ্বী, স্থিতিময় প্রীতি নিয়ে বুকে
কেউ কেউ বসে আছে নিরলস অস্তিত্ব বিলাসে।
সূর্যরথ প্রদক্ষিণ করে স্বীয়পথ, সুখে-শোকে
আলো এসে ধরা দেয় আঁধারের রূপ ভালোবাসে।

এখনো যাদের চোখ পাথরের মতো, অভ্যাসের—
ঘুমে কাটে দিনরাত। তাদের সাদৃশ্য চেনা মন—
পিছনে জমেছে স্মৃতি, সামনেও অবক্ষয় ঢের,
চোখাচোখি প্রেম— করে আসন্ন সন্ধ্যার আয়োজন।

আবারও ঘুমিয়ে যাবো, জেগে থেকো তোমরা সবাই
ঘুমেরও ক্লান্তি আছে, অনন্তের সীমারেখা নাই।

চোখ

চোখ সে তাকিয়ে আছে, ভিতরে কারও মোহছায়া
নাড়াচাড়া করে দিনরাত। পলক প্রণয় খোঁজে—
বিনয়ে তখনো নত হয় দৃষ্টিপাত, নড়ে কায়া,
ঘুরে ছায়া, ধীরে ধীরে মূলাবদ্ধ স্থির চতুর্ভুজে।

পাখির নির্লোভ চোখে, তুমি লোভী হায়েনার দলে,
সুযোগ পেলেই দাঁত বের হয়, রক্ত প্রিয়রঙ—
জিভ খোঁজে নতুনের স্বাদ, পটু তুমি হলাহলে,
শুধু যার চোখ আছে দৃষ্টি নাই, সেই সাজে সঙ।

মনের চোখে তুমি বিলাসী ক্ষণ, চারু ছাপচিত্র—
তোমার মতোন আর দেখেনা কেউ অদেখা রূপ।
স্বচ্ছতায় কৃচ্ছসাধন করে, বহুবর্ণ বৈচিত্র
সাদাকালো হয়ে যায়, রাঙা জমিন তখনো চুপ।

চোখের কি দোষ বলো? দৃশ্যকণা কপি করাই কাজ
মুহূর্ত ক্লিক করে, মহাকালে তাকিয়ে আছে আজ।

পাখি

পাখির ডানায় আছে জমাট শিশির। তবু তার
জলপ্রীতি কম, উড়ে যায় আরও দূরের মেঘে—
শুষ্কতার খোঁজে, বাঁধা পেয়ে ফিরে আসে বারবার—
রাতভর ডানায় দেয় তা, শূন্যতার অনুরাগে

পূর্ণতার খোঁজ নিয়ে, পর সকালেই উড়ে যায়
আরও দুটি পাখি, তখনো কারও চোখ ঠায়াবদ্ধ—
কিছুলোক ভাবছে, পাখির উড়াউড়ি অযথায়—
মিশে থাকে ডানামেলা রোদে। আকাশেই সীমাবদ্ধ।

প্রতিটি পাখিই মানুষের প্রতিবেশী, কাছঘেঁষা—
স্বরলিপি গায় দিনরাত, ঠোঁটে আদুরে উষ্ণতা।
কিছু পাখি নামহীন, কারও নেই-ই ভালো বাসা,
পাখির পালকে লেখা থাকে সময়ের অমরতা।

তুমি যাকে পাখি ভাবো, কোথা সে? উড়ছে অবিরাম—
কবিও পাখির মতো। বর্ণের পালকে লেখা নাম।

পাথর

পাথরের ডাকনাম কে রেখেছে? মনও পাথর—
মনেও জমাট বাঁধে স্মৃতির আঁকর, বোধমাটি
ধীরে ধীরে খাঁটি হয়। কখনো হিসেবী হয় ঘর,
বাইরে থেকেই শক্ত, ভিতরে নরম পরিপাটি।

পাথরে পাথর ঠুকে ঠুকে নির্ধারিত আগুনের
যাত্রাপথ, মানুষের বুকে জ্বলন্ত উষ্ণতা জ্বলে—
পাথরের বুকে কালের কলহ। দাহ্য ফাগুণের
নির্মল পুষ্পঘ্রাণ, এখনো সুবাস দেয় অতলে।

শক্ত কী? শক্তি কী? কী সেই স্থানু দুরন্ত স্থবিরতা?
পাথরের প্রকোষ্ঠে খেলা করে জলের আহবান।
চোখও পাথর হয়, চেয়ে চেয়ে দেখে অমরতা,
পাথরের বুকচিরে বেরোয় স্বচ্ছ ঝর্ণার গান।

যে পাথরে লেখা আছে, সভ্যতার এই অগ্রযাত্রা—
সে পাথরেই লিখে দিবো কাব্যপাথর শূন্যমাত্রা।

জল

অবক্ষয় দূরবর্তী, মাঝখানে ঘুমায় সাগর,
সাগরে ঘুমিয়ে আছে শতনদী, লালিত উচ্ছ্বাস
বুকে ধরে, এখনো উড়ে যাচ্ছে অভ্যাসের প্রহর।
তাই আজও- এখনো জলের নাম আদি সন্ত্রাস।

ক্ষয়ে যায় কালের অধ্যায়, লিখিত নত বিরহ।
পাঠ্য হয় ক্ষুদ্রক্ষুধা, ভূগোলে বাণিজ্য বিচ্ছিন্নতা।
নাবিকের গায়ে শ্যাওলার জলছাপ, মগ্ন স্নেহ—
সব জল মাপবে কোথায় এমন গভীর ফিতা?

নদী শুধুই নদী নয়, আরও গভীরে তার রূপ,
মরে গেলেও রেখা থাকে মামুলী বিশ্বাস, যদিও
অবিশ্বাসী জলে ভাসে জ্বলন্ত জলজ অন্ধকুপ,
জলের ধর্ম- অপরের অনটনে তুমি কাঁদিও।

শুধু যারা এখনো করছে জলের মর্ম তালাশ—
তারাও ভাবেনি, জলভরা দেহে মানুষের বাস।

বৃক্ষ

বৃক্ষমূলে স্থির অনন্ত অক্ষয় নির্ভার দৃঢ়তা-
শেকড়ে এখনো জীবন্ত স্ফুরণ খেলা করে একা।
এখনো পরমপ্রেমে শোভা বাড়ায় সমস্ত পাতা,
থেমেথাকা বৃক্ষের ব্রহ্মতালু সবসময় ফাঁকা।

গতিশীল মানুষের স্থায়ী নিঃশ্বাস বৃক্ষের দান,
অস্থায়ী সামান্য পৃথিবীতে অসামান্য সে প্রভাব।
পাখিদের জাতীয় সঙ্গীত গাছ-গাছালির গান,
বৃক্ষের হয়নি কোনোদিন স্থায়ী বন্ধুর অভাব।

মাটির সন্তান বৃক্ষ। মানুষ পরিশোধিত মূল,
তবু মৌলিক শিরোপা জমায় অকান্ত অনুভব।
মাটিঘেঁষা মানুষের বৃক্ষঘেঁষা মন।  ছোট ভুল
বড় হয় গাছের মতোন, ছায়াময় দুঃখ সব।

বৃক্ষের একটা ডাল ছুঁয়ে দিয়ে বলি— হে প্রকৃতি,
আমি তোমারই একজন, তুমি ছাড়া নাই স্থিতি।

সুর

সুর স্বর মূলত কথার আশ্রয়, শুধু সাধনা
ঘুমিয়ে আছে বিনোদনের বিছানায় অন্ধকারে।
তোমরাই ভালোবাসো বিসমিল্লা খাঁন, প্রণোদনা
দেয় সুপ্রাচীন  হারমনি, সব সুর শূন্যে ঘুরে।

পূর্ণতার গান নিয়ে উড়ে যায় ছেঁড়া মেঘ ঘরে,
বাইরে তখনো আছে বৃষ্টির বন্দনা নিয়ে গান।
ঘরে-বাইরে স্থায়িত্বহীন স্বরালাপ, বিলাসী প্রান্তরে
ভাসে অবিনাশী রাগ, অসুরের যজ্ঞক্রিয়া ধ্যান।

বাতাসের মুহুর্মুহ মূর্ছনায় ভাসে শনশন—
শুনেছ পত্র সঙ্গীত? পাখির অনূদিত অনুপম?
কথার অভাবে কিছু সুর আজও করে অনশন।
নির্দিষ্ট চেতনে জড়ায় মানুষের সত্যায়িত দম।

সব সুর থেমে গেলে, মুছে গেলে সে সমস্ত গান,
অনুভবহীন পৃথিবী ভুলবে— মানুষের দান।

তারা

তারকাদের কখনো আপন মনে হয়নি আর—
মনে হয়েছে তারা আকাশের রাত্রিকালীন সুর,
সুশৃঙ্খল সুবিন্যস্ত সাজিয়ে রাখা সে অলংকার।
দৃশ্যমান দোলাচলে বয়ে গেছে দূর বহুদূর।

যেন প্রেমিকজোনাক আলো জ্বেলে ঘুরছে অযথা,
কিম্বা ভাবনারা ঘুরছে অক্লান্ত অবিরাম ফাঁকা,
রাতের নিজস্ব ঘ্রাণ বলে— অমলিন আকুলতা
সাময়িক, দিনের আলোয় সে লুকিয়ে যায় একা।

তারা গেলে ঘুমিয়ে শুরু হয় অন্ধকারের পাঠ,
চাঁদ যদিও রাতের খণ্ডকালীন অতিথী। তবু
মানুষের ভালোবাসা দিনের সূর্যালোক, চৌকাঠ
পেরিয়ে অন্ধকারের নদীতেই খায় হাবুডুবু।

হে অস্থির তারকা সকল, তোমরা সুক্ষ্ণ অসুখ—
পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মরে যাওয়া চোখ।

ভুলফুল

 যতদূর চোখ যায়, গাঢ় অন্ধকার, তবু তুমি
আলো খোঁজো, আর সূর্যকে বানাও জ্বলন্ত দোসর।
আগুনের সাথে খেলো আজও উষ্ণতার কাঁপাকাপি,
ফাঁপা কথা চাপা পড়ে বিদায়ী মাধুর্যে, একা ঘর।

সেই ঘরে লোক নেই, শোক আছে স্খলিত অধ্যায়
নিয়ে চুপে চুপে। আছে দুরন্ত আকাশ, ছোট ভাব
মুহূর্তের দেয়ালে উদাস ছায়া ফেলে সরে যায়।
স্থায়ী হয় পৃথিবীতে— প্রাত্যহিক স্বভাবী অভাব।

অন্ধকার ঘুম, প্রকাশ্য আলোয় লেখা সনতারিখ,
অপ্রকাশ্যে বেড়ে ওঠে রোদহীন বোধগাছ একা।
মানুষের নামে উড়ে যায় আজও বিবাদী শালিক,
এখনো বিদায়ী আকাশের নাম সীমাহীন খাঁখাঁ…

যদি তুমি একা হও, আর ভালোবাসো শব্দমূল—
জেনো ভাবটুকুই আলো। বাকী সব ব্যাকরণ ফুল।

হাসপাতাল

হাসপাতাল পৃথিবীর সবচেয়ে বিষণ্ণ ঘর,
সার্বক্ষণিক কুক্লান্তি নিয়ে জেগে থাকা লালচোখ।
শেষসীমায় দাঁড়িয়ে আছে, ক্লান্ত কিছু ভয়-ডর।
হাসপাতাল ভীতি তো মানুষের পুরনো অসুখ।

বাবা ছিল, মায়ের সাথেও স্মৃতি আছে যাত্রাকালে,
কত পড়শির শেষ নিঃশ্বাস এই ঘরে সমাপ্ত—
অসংখ্য পীড়াপ্লীহা, জীবনের ডালে ডালে দোলে,
হাসপাতাল না থাকলে এই ক্ষতকাল কে মাপত?

কে শেখাত? জীবনের অন্যনাম সুস্থ থাকা মূলে—
মানুষেরও কখনো কখনো ঘুরে দাঁড়াতে হয়।
ভাবতেই হয়— প্রাপ্তিযোগ এখনো রোগ নির্মূলে।
সুস্থ মানুষের হাসপাতাল প্রিয় জায়গা নয়।

আমি যেতে চাইনা সেই বিষণ্ণ ঘরে, ফলাফলে—
লিখে দাও মৃত আমি, ফিরে যাই প্রকৃতির কোলে।

আগুন

আগামীর সম্ভাবনা কাঠ পোড়া কয়লা স্বরূপ,
মানুষের তবুও দাউদাউ জ্বলতে ভালোলাগে,
পুড়ে পুড়ে ঘুরে যায় ধোঁয়া, চক্রাকার নভরূপ—
বুকের গভীরে জ্বলে বেদনার গান, অস্তরাগে।

যাকে তুমি অগ্নি ভাবো, কোথায় সে ছিলো এতদিন?
আগুনের প্রতীক্ষায় ছিলো সভ্যতার গতজন্ম,
বিবর্তিত মানুষ এখনো কিন্তু চির বেদুইন—
তবুও যাত্রাপথে আগুনের গীত গায় প্রজন্ম।

ধীরে ধীরে বেলা বাড়ে, চৌকাঠে ঘুমন্ত কোলাহল,
বৃক্ষের মাথায় কুয়াশা বৈঠকে যাবতীয় পাখি।
সমস্ত রক্তজ মাংস আজও সিদ্ধ হবার আদ্যফল—
আগুন পোড়াবে, যতই তোমার বন্ধ রাখো আঁখি।

ইতিহাস চর্চা কাম্য নয়, কাব্য করে ধীরে বলি—
আগুন আমার মায়ের বুকে ওমের পদাবলী।

 

Comments

comments

কালের লিখন

কালের লিখন

কবি, গীতিকার, পুঁথিকার, শিশু সাহিত্যিক, গল্পকার, গবেষক, সম্পাদক, সংকলক, শিল্প-সাহিত্য সমালোচক, আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, লোকসাহিত্য ও লালন গবেষক। বহুমাত্রিক লেখক কালের লিখনের প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য গ্রন্থ সংখ্যা ৫০ এর অধিক।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি