সাম্প্রতিক

হয়তো ভূতের গল্প । তানভির বখতিয়ার

আমার সাথে ভূতের সখ্য বেশ পুরনো। খুব তাকে দেখার ইচ্ছা। কিন্তু ভূত মেমসাহেবকে তো চোখে দেখা হয় না। অবশেষে সে ইচ্ছা পূরণ হয়েছিল একদিন। মেমসাহেব নিজেই এসেছিলেন মোলাকাত করতে। কিছুক্ষণ চোখাচোখি হল। তারপর গায়েব। তারপর দিনের পর দিন নিশি রাতে আমার এবং শুধু আমারই ঘুম ভাংগিয়ে তিনি চলে গেছেন। কোন বার্তা যে বহন করে তিনি আনতেন কে জানে। আজও জানা হয়নি…..

তো এই ভূত মেমসাহেবের গল্প করছিলাম শাহনুর চাচার কাছে। যেদিন প্রথম মেমসাহেবকে দেখেছিলাম সেদিনই। শাহনূর চাচা শুনেই হেসে কুমড়ো গড়াগড়ি। সেদিন রাতে দুজনে এক সাথে শুয়েছি। রাত গভীর হল। মেমসাহেব আসলেন। দুজনেই মেমসাহেবের দিকে তাকিয়ে আছি। এমন রূপবতী মেয়ে এর আগে দুজনে দেখেছি বলে মনে হয় না। রাত তিন টায় না দেখে যদি দুপুর তিন টায় দেখতাম নিশ্চিত প্রেমে পড়ে যেতাম। এখন প্রেম-ট্রেম সব বাদ। উল্টো ফিট হওয়ার উপক্রম। মেমসাহেব যা করার তাই করলেন। দুজনের কাছে আসলেন। কিছুক্ষণ তাকালেন। তারপর আবার গায়েব।

শাহনুর চাচা আমার চেয়ে বছর দুই/একের বড় হবেন হয়তোবা।কিন্তু দুজনেরই শৈশব আমদের নিজেদের হাতেই গড়া। আমাদের নানা কল্পনা।,ভয়,সাধ চারিদকে বুনে যেত লতান্তজাল। বোধের উন্মেষ যখন ঘটল, মা,দাদি, চাচীমা, ফুফুদের নিশ্ছিদ্র ঘেরাটোপ এর ভিতর স্নেহ, প্রশ্রয়, আদিখ্যেতার জারক রসে একটু একটু দুষ্টু হয়ে উঠছি তখন, একটু দামাল। সেই তখন থেকেই শুরু আমাদের নিজেদের মত করে শৈশব রচনা।

তখন আমার বয়স পাচ-ছয় হবে। শাহনুর চাচা বছর দুই এক বেশি হবেন। আমাদের তখন রাজ্য জয় করার নেশা। প্রথমে ঘর দিয়েই আমাদের রাজ্য জয় শুরু। প্রথমেই কোপ পড়ল ঘরের কুনোব্যাঙ গুলোর উপর। প্রতিদিন আমাদের কাজ ছিল মাটির ভিতর গর্ত করে একটা করে ব্যাঙ ধরে এনে কবর দেয়া। পরের দিন ঘুম থেকে উঠেই মাটি খুড়ে দেখতাম ব্যাঙ আছে কি না। এভাবে কিছু দিনের মধ্যে ঘরের সব ব্যাঙ মারা পড়ল। ব্যাঙ এর আকালে এই প্রজেক্ট বন্ধ।

সময়ের প্রয়োজনে দুজনেই চলে আসলাম সিলেট শহরে। সময় তার প্রয়োজনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে আমাকে নিয়ে আসলো ঢাকায়। সিলেট ছাড়লেও ভূত মেমসাহেব ছাড়লেন না আমাকে। নিশি রাতের মেমসাহেব তার হাই হিলের শব্দ তোলে মাঝে মাঝে পরিক্রমা করে যান আমার টেবিলটা। শুধু আমিই টের পাই। শুধুমাত্র আমিই।

কিছুদিন গেল। হঠাৎ আমাদের মাথায় ভূত চাপল পাখি পূষার। যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু হল পাখি খুজা। শেষতক অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দুটো শালিক জোগাড় করা হল। শুরু হল আমাদের পাখি পোষা। পাখির জন্য খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে বন-জংগল, মাঠ-ঘাট সব চষে বেড়াতে লাগলাম। যেখানেই ঘাসফড়িঙ -তেলাপোকা সেখনেই বোতলবন্ধি। শেষতক শালিকের পেটে। একদিন কি মনে করে পাখি দুটো ছেড়ে দিলাম। দেখি এরা আমদের ছেড়ে যায় না।মানে এরা পোষ মেনেছে। নিল আর্মষ্টং চাঁদ থেকে এসে কি অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন, জানি না। কিন্তু আমার জিবনের সবচাইতে আনন্দময় মুহূর্ত ছিল এটা।একসময় শালিক পাখিও হারিয়ে গেল। কুশিয়ারা নামের অলৌকিক নদীর ধারে আমাদের বাড়ি। উঠোন ঘিরে ঘর। পিছনেই পুকুর। পায়ে পায়ে জলাশয়, খোলা বসতিহিন জমি। অবারিত পরিসর।নিত্য আমদের নবিন চোখে ধরা পড়ত আরও কত রূপকথার মত মাত্রা।

সময়ের প্রয়োজনে দুজনেই চলে আসলাম সিলেট শহরে। সময় তার প্রয়োজনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে আমাকে নিয়ে আসলো ঢাকায়। সিলেট ছাড়লেও ভূত মেমসাহেব ছাড়লেন না আমাকে। নিশি রাতের মেমসাহেব তার হাই হিলের শব্দ তোলে মাঝে মাঝে পরিক্রমা করে যান আমার টেবিলটা। শুধু আমিই টের পাই। শুধুমাত্র আমিই।

কেন এ প্রশ্মের জবাব আজো মেমসাহেব নিজের কাছেই গচ্ছিত রেখে গেছেন…

Comments

comments

তানভির বখতিয়ার

ছাত্র, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ভালো লাগে তাই লিখি...

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
FacebookGoogle Plus

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি