সাম্প্রতিক

অবিনাশী কাল । রুমা মোদক

প্রাক কথাঃ

হায় এক নিদারুণ সময় । স্বজনের মৃত্যু যখন মিলিয়ে যায় সংখ্যার  হিসাবে …

আমি তোমার কিংবা তুমি আমার সংগ্রামে -সংকটে, আনন্দ- বিষাদের  সুতোয় বোণা নকশি কাঁথা।

আজ পৃথিবী জুড়ে নেমে এসেছে অসহ্য দহন, ফুরিয়েছে  এই প্রার্থিত জীবনের দিন । দিন আবৃত করা প্রেম, যাপন মুখর করা সুর আর অশ্রুর কোলাহল ফেলে, শূন্য থেকে আকার পাওয়া মানুষ আমরা মিলিয়ে যাচ্ছি আবার অনন্ত শূন্যে। 

জীবন এক শৌখিন  বাগানের বাহারি ফুল, বিচিত্র রং, পরাগায়নে অন্তর্গত জিন রেখে যাওয়ার তুমুল আকাঙ্ক্ষা এ জীবন, গোপন চুম্বন, কবরে দেয়া শেষ মুঠোর মাটি।

জীবন বর্নাঢ্য রূপকথা এক।প্রাথমিক ও আদিমতম সঙ্গী নিঃসংগতাই কেবল সত্য এখানে।   

পৃথিবীর কাছে রেখে যাওয়া কেবল সেই উপলব্ধির অধিকার, শোন হে মানুষ, নশ্বর এই পৃথিবীর বুকে অতর্কিত পাওয়া জীবন, হারিয়ে যেতে পারে যে কোন অসচেতন মূহুর্তে, যেমন হারিয়ে যায় উৎসবের ফানুস দূর মেঘেদের ছোঁয়ার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষায়। জীবন তো আসলে টুকরো  টুকরো ধ্বংসেরই  আয়োজন। মানুষের আজীবন লড়াই তবু ধ্বংসের বিপরীতে।        

### 

পিতা এবং পুত্রের কথোপকথনঃ—

—ক্রিং…..ক্রিং……..ক্রিং………

—হ্যা বাবা বলো।

—কেমন আছিস বাবু।

—ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?

—শরীরটা ভালো নেই বাবু। সুগার বেড়ে গেছে। প্রেসারটাও ফ্লেক্সিবল। এই বেড়ে যাচ্ছে এই কমে যাচ্ছে।

—ঠিকমতো  ওষুধ খাচ্ছো না?

—তাতো খাচ্ছি। বয়স হয়েছে। এখন যাবার সময়। ওষুধও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঠিকঠাক কাজ করতে চায় না।

—আচ্ছা আমি কিছু টাকা পাঠিয়ে দেবো।

-আমি টাকার জন্য ফোন করিনি বাবু। তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। তোর মাকে স্বপ্ন দেখছি ঘনঘন৷ হয়তো ডাক পাঠাচ্ছে। শেষবারের মতো তোকে দেখতে ইচ্ছে করছে বাবু। আসবি দেশে? 

—দেশে আসা মুখের কথা?  ছুটি ছাটা, অনীকের স্কুল, কতো কিছু ম্যানেজ করার ব্যাপার। বললেই দেশে আসা যায়? 

—আমার যে তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। বাবু….

—বাবা এখন রাখো। রাত কয়টা বাজে জানো? ঘুমাবো। সকালে কাজে যেতে হবে।

—বাবু বাবু…

##

পিতার কথাঃ—

ভেবেছিলাম এই অক্সিজেন না পাবার তীব্র দমবন্ধতাতেই বুঝি ফুরিয়ে যাবো। শরীরের সব শক্তি আর সাহস জীবনে যোগ করে আমি চিৎকার করতে চাই, ডাক্তার… ডাক্তার……। বেঁচে থাকার সব আকুতি দু’হাতে সঞ্চয় করে ডাকি নার্স…নার্স….. আমার একটু অক্সিজেন দরকার। অক্সিজেন।  আমি শ্বাস নিতে পারছি না….. । কিন্তু কেউ নেই, কোথাও কেউ নেই….আমার প্রচণ্ড বেঁচে থাকার ইচ্ছেরা গলা আকড়ে পরে থাকে, বের হয় না, হতে পারেনা। কিছু অর্থহীন গোঁ গোঁ এই নিঃসঙ্গ নির্দয় আই সি ইউর শীতল বাতাসে শুষে নেয়। লিখে দেয় নির্দয় কালের খাতায়।  হায় জীবন, মানুষের জীবন। এক সময় এসেছে মানুষের  জীবনে,    এমন পশু-পাখি, কীটের মতো মৃত্যু কাম্য কি হয় কারো, স্বজনের আহাজারি হীন শোকহীন…..

—নিনিয়া, নিনিয়া এলি?  এলি মা?  ডাক্তার তোকে আসতে দিলো?  তোর আসতে ভয় করলো না আমার কাছে?

— বাবা, বাবা আমি কি করে আমার বাবাকে ছাড়া থাকবো বাবা?  বাবাকে ভয় পায় কোন মেয়ে?  ডাক্তারের কি সাধ্য বাবা আমাকে আমার বাবার কাছে আসতে বাঁধা দেয়!  আমি কোন বাঁধা মানিনি বাবা। আমি তোমার কাছে থাকবো। তুমি একটুও ভয় পেয়োনা। আমি আছি।       

নিনিয়াকে দেখে কিছু অক্সিজেন কি জমা হয় আমার নিজস্ব বাতাসে, নিঃশ্বাসের জন্য?   কোন হাই ফ্লো মেশিন ছাড়া? ভেন্টিলেশন ছাড়া।  কমে আসে কিছুটা রুদ্ধ দমের কষ্ট।হঠাৎ কেউ যেনো সরিয়ে নেয় ঘাতক আঙুল টিপে ধরা শ্বাসনালী থেকে।

মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসায় অক্সিজেন থাকে। মনুষ্য জন্ম প্রাপ্তির সার্থকতা। যাপনের অক্সিজেন। মৃত্যু যখন অমোঘ, ফুসফুস যখন হেরে যেতে থাকে তখন শেষ শ্বাসটা ভালোবাসার অক্সিজেন নিয়ে পাড়ি দেয় অচেনা অনন্ত জগতের দিকে। শেষ নিঃশ্বাসে একটু ভালোবাসার  অক্সিজেন খুঁজে নিতে নিতে  আমি জানি, জানতে থাকি এই আপনজনের আকুল উৎকণ্ঠায়ই এক জীবনের সুখ থাকে।  অন্তিম যাওয়ার মূহুর্তে স্বজনের অশ্রুভেজা চোখ, আকুল জীবন ছেড়ে যাবার সময় স্বজনের আহাজারি ,  এইতো জীবন, ভালোবাস  জীবন। মাঝখানে যে কয়েকটি দিন, সেতো কেবলই আয়োজন, টিকে থাকার আয়োজন। বিদায়….। বিদায় জীবন……।

কন্যার কথাঃ—

পৃথিবীতে  মহামারি এসেছে। বিজ্ঞানের এত উন্নতি, প্রযুক্তির এতো অগ্রগতি, সভ্যতার  উদ্ভাবনী ক্ষমতা  থাকা সত্ত্বেও এ পর্যন্ত আমরা একমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বের করতে পেরেছি শুধুই নিজ নিজ গৃহে অন্তরীণ থাকা, যা হিংস্র প্রাণীদের থেকে নিজেকে বাঁচাতে গুহায় লুকিয়ে থাকার কৌশলের মতো। কতো তুচ্ছ তোমার সব বড়াই মানুষ।

বাবা বাবা। চলে গেলে বাবা। শেষ পর্যন্ত অতিমারী আমাকেই নিঃস্ব করলো বাবা। আমার পৃথিবীটাকেই নিঃসঙ্গ করে দিলো! আমার জন্যই  রাখলো পিতার স্নেহহীন, মমতাহীন পৃথিবী, অতিমারী ক্লান্ত দিন।

বাবা, বাবা তাবৎ বিশ্ব ব্যস্ত যখন এইসব ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিকাশ নিয়ে…. ভ্যাক্সিন নিয়ে…এই ব্যর্থতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার  নাকি ট্রাম্প প্রশাসনের। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কেনো কেরালা মডেল হতে পারলেন না, ভ্যাক্সিন পেটেন্ট নিয়ে কতো টাকার বাণিজ্য হবে পৃথিবীব্যাপী, চীন কেনো লুকিয়ে গেলো সত্য হিসাব, ধেয়ে আসছে কি সেকেন্ড ওয়েভ…. কতো লক্ষ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হলো লকডাউনে, কর্মহীন হলো কতো মানুষ! এতো এতো এতো  হিসাবের মাঝে কে মনে রাখবে আমার মতো এক নগন্য নারীর পৃথিবী শূন্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা। এযে নগন্য হিসাবের একটি সংখ্যা। একটি মৃত্যু। মহাকাল কী লিখবে আমাকে পিতৃহীন নিঃস্ব করে দিয়েছে একটি অতিমারী।  আমার তো একটাই জীবন বাবা।

###

পিতা এবং পুত্রের কথোপকথনঃ—

মহামারির সবচেয়ে আতঙ্কময় অভিঘাতটি  হচ্ছে যে সেটা আমাদেরকে আমাদের নিজ নিজ শেষ পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়।মনে করিয়ে দেয় পূর্বপ্রস্তুতি, চিকিৎসা, কম বয়স ও প্রাচুর্য্য থাকা সত্ত্বেও  কেউ জানেনা, কেউ জানে না কে কখন এই মহামারির লক্ষ্য হবে। এখানে তুমি, আমি, আমরা সবাই এক অনশ্চিত দিন যাপন করছি শুধু। সব সুস্থতা নিয়ে যাপন করছি অসুস্থ দিন।                                 

—বাবু, বাবু এলি শেষ পর্যন্ত!

—বাবা!  আমি আসতে চাইনি। আসতে বাধ্য হয়েছি বাবা। আমার ছেলে অনীক। পিতৃহীন হয়ে গেলো বাবা। নিদারুণ এক বাঁচার লড়াইয়ে পতিত হলো ওর মা। ভীষণ জীবনযুদ্ধে তাদের ফেলে দিয়ে এলাম বাবা।   

—আমার তো আসার সময় হয়েছিলো। শুধু তোকে আমার সন্তানকে দেখতে চেয়েছিলাম শেষবারের মতো, কিন্তু এভাবে নয় যদিও। তোরতো আসার সময় হয়নি বাবু। তোর সামনে তো ছিলো একটা পুরো জীবন। উন্নত দেশের সর্বোচ্চ সুবিধায় ছিলো তোর জীবন। তোকে কেনো আসতে হলো এসময়ে?     

—কে জানতো বাবা এই অতিমারী এভাবে অতর্কিত আমাদের হ্যাঁচকা টানে বসিয়ে দেবে এক সারিতে।তোমাকে আমাকে দুজনকে এক সংখ্যার সারিতে। এক লক্ষ এক, এক লক্ষ দুই। বাবা আমরা কেউ জানতাম না আমরা পিতা পুত্র এভাবে সংখ্যা হয়ে যাবো পাশাপাশি। আমাকে ক্ষমা করো বাবা।

—এখন আর ক্ষমা টমা শব্দগুলোর কোন মূল্য নেই। জানলে কি হতো, জানিনা বলে কি হলো, এদিন ফুরাবে কবে?  নাকি আদৌ ফুরাবে না!  ফুরালে কি আগের মতো উদযাপন ময় দিন ফিরে আসবে আবার মানব জীবনে? মানুষ কী বদলে যাবে, দাঁড়াবে নিজের দহনের মুখোমুখি! ভুলে যাবে উদ্ধত অহংকার?  

—প্রবল পরাক্রম মানুষ কি ভাববে কতো তুচ্ছ সে এক অদৃশ্য জীবাণুর কাছে!  সে কী নত হবে মায়াময় প্রকৃতির কাছে? নাকি আবার ফিরে যাবে অস্ত্র আর হিংসার পুরানো পৃথিবীতে?                            

—আমার কিন্তু কিছু বলার কথা নয়। আর গায়ে পড়ে বলতে যাওয়ার সেই পুরানো রীতি, বড়ো ক্লিশে আর একঘেয়ে। আমি মৃত। আমি বলছি। বহু বহু কাল ধরে মানুষ শিল্পে সাহিত্যে এই রীতি ব্যবহার করে আসছে । কৌশল৷ যে কৌশলে এখন চমকও নেই। কিন্তু বর্তমানে এই কৌশলের আশ্রয় নেয়া ছাড়া উপায়ও নেই। আমাকেই বলতে হবে। নইলে সত্য আর অর্ধসত্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকবে এই নিদারুণ কালের ইতিহাস। আমাকে ইতিহাসের চলমান অংশ হয়ে বলে যেতে হবে বর্তমান  ভবিষ্যতের কাছে। 

—ভবিষ্যৎ,

—হ্যা ভবিষ্যৎ।ভবিষ্যতের মানুষ  কী জানবে না এই কালের কথা? করোনাকাল নাম ছিলো যার।

—হ্যা জানবে,জানবে এক ক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে অসহায় হয়ে গিয়েছিল পুরো সভ্য মানুষ জাতি।

—না আমরা অসহায় হয়ে যাইনি৷ আমরা লড়াই করেছি। দেশে দেশে গবেষণাগারগুলোতে অসংখ্য গবেষক দিনরাত চেষ্টা করে গেছে ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের জন্য। ওষুধ কিংবা ভেন্টিলেশনে মানুষ বাঁচানোর জন্য৷

কিন্তু মানুষকে বাঁচাতে পারিনি আমরা। যারা উন্নতদেশের বড়াই করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইটালি, ফ্রান্স দেশগুলোতে স্তুপীকৃত হচ্ছে মৃতদেহ। মানুষের মৃতদেহের ভার নিতে পারছে না আমাদের সভ্যতা।

—ডাক্তার,নার্সরা জীবনপণ লড়াই করেছে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে।  

—ডাক্তারদের আমরা অপশন দিয়েছি, কাকে বাঁচাতে চাও বলো, তরুনকে নাকি বৃদ্ধকে। দীর্ঘকাল আমাদের ছায়া দেয়া, আশ্রয় দেয়া, শিক্ষা দেয়া প্রৌঢ় প্রজন্মকে আমরা বলি দিয়েছি অতিমারীর কাছে। সুস্থ মাথায় মানুষ খুন করছি আমরা প্রতিদিন।   

—উপায় ছিলোনা। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছিলো, মারা যাচ্ছিলো। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ছিলো না। মানুষকেই তো বাঁচিয়েছিলো মানুষ।   শুধু ঠিক করে নিয়েছিলো কাকে বাঁচাতে হবে।

—উফ! কী অমানবিক!  কার অধিকার ছিলো না বাঁচার?     এই অপশন খোঁজার রাষ্ট্রীয় নীতিতে, রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতার কাছে হার মেনে একের পর এক ডাক্তার আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলো।

—সত্যের পিঠে অন্য সত্য থাকে। মিথ্যার পিঠে অন্য মিথ্যা। আমাদের সব বলে যেতে হবে। সব। যতোটুকু জানি আমরা।

###  

পিতার কথাঃ—

আমার প্রথম যেদিন জ্বর এলো। কিচ্ছু নেই। না সর্দি না কাশি। এপ্রিলের মাঝামাঝি বৃষ্টি হয়েছিলো বেশ। ভিজে ফিরছিলাম ওষুধের দোকান  থেকে। ভাবলাম জ্বর। ফ্লু৷ নাপা। একটা হিস্টাসিন। পরদিন দিব্যি সুস্থ। তার পরদিনও।

দুদিন পর আবার জ্বর গলাব্যথা। বাসায় বসে  তোমার ডাক্তার কাকাকে ফোন  করলাম। জ্বর বাড়ছে। সাথে কাশি হালকা শ্বাসকষ্ট। তোমার  ডাক্তার কাকা টেস্ট করার পরামর্শ দিলেন। আর সাথে আদা লেবু লবংগ, ভিটামিন সি, ডি, অনেক ফলমূল, ব্যালেন্স ডায়েট। প্যারাসিটামল। হিস্টাসিন,্এরিথ্রোমাইসিন।   লিলি সব আতঙক তুচ্ছ করে কিনে নিয়ে এলো।

আমি নিজেকে আলাদা করে নিলাম ওদের থেকে। আলাদা ঘর। আলাদা বাসন -কোসন, আমি চেয়েছি ওরা নিরাপদ থাকুক। প্রচণ্ড কষ্ট নিয়ে নিজেই নিজের কাজ করেছি।  প্রশাসন থেকে  আমাকে ওরা বারবার  তাড়া দিচ্ছিলো টেস্ট করতে।

ডাক্তারের পরামর্শ অগ্রাহ্য করা গেলেও ওদের অগ্রাহ্য করা গেলো না। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে রইলাম লাইনে। পিসিয়ার ল্যাব। পিজি হাসপাতাল। দীর্ঘ অপেক্ষার লাইনে চৈত্রের গরমে টের পাচ্ছিলাম, আমার জ্বর বাড়ছে, বাড়ছে শ্বাসকষ্ট। সন্ধ্যা নাগাদ সিরিয়াল পেয়ে স্যাম্পল দিয়ে বাসায় হাঁটতে হাঁটতে পৌছুলাম।  সবাইকে নিরাপদ রেখে ঢুকে গেলাম নিজের ঘরে । সেদিনই তীব্র হলো জ্বর। এ কেমন জ্বর, পাশে প্রিয়জন নেই। তোমার মাকে জানানো হলোনা। চিন্তায় পড়ে যাবে৷ নিজেকেও বিপদে ঠেলে দেবে।   

পরদিন সাত  সকালে দরজায় দাঁড়ালো এম্বুলেন্স। এতোদিন যে লড়াই টা করছিলাম একা একা।  এবার সবাই জানলো। জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলো আশেপাশের ফ্ল্যাটের  সবাই।  যেনো আমি অন্য গ্রহ থেকে  ভুল করে চলে আসা কোন প্রাণী। সবার ক্রুদ্ধ অসহনীয় দৃষ্টি৷ অসুস্থতার দুর্বিষহতা   অতিক্রম করে আমাকে গ্রাস করছিলো অপরাধবোধ। পুলিশ যখন বোর্ড ঝুলিয়ে দিচ্ছিলো গেইটে, লকডাউন । এমবুলেন্সে উঠতে উঠতে আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো আমি কি সবাইকে ঠেলে দিলাম কোন অনিশ্চিত আগামীতে! মৃত্যুর মতো অন্তিম  শূন্যতার আগামীতে!              

এম্বুলেন্সে বসে আমার শুরু হলো অপেক্ষা। সারাদিন খাবার নেই, পানি নেই, লিলি নেই, নিনিয়া নেই। মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর এই বেঁচে থাকার একাকীত্ব! মৃত্যুর অপেক্ষায় জীবনের  নিঃসঙ্গতা।  

তারপর হাসপাতালে  আশেপাশে আরো কয়েকটা বিছানা। কারো অক্সিজেন আছে। হাই ফ্লো।  কারো নেই। উঠানামা করছে বুক। নিষ্প্রাণ দেহও পাশাপাশি কয়েকটা। কবরের মতো নিস্তব্ধতা আর ওষুধের মৃত্যুগন্ধ!  কী দুঃসহ! উফ কী দুঃসহ!! আমি শ্বাস নিতে পারছি না। চিৎকার করে ডাকছি, ডাক্তার ডাক্তার….নার্স নার্স…..

পিতা এবং পুত্রের কথোপকথনঃ—

—কেউ আসেনি। কেউ না। আমাকে দোষ দেবে না বাবা।  লকডাউন শুরু হয়ে গেলো।  আমি কি করে আসতাম। তাছাড়া আমার কাছেই বা কে আসতে পেরেছিলো ?  ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাবার পর কেউ আসেনি । কেউ আসতে পারেনি। এমন কি আমার মৃতদেহটাও কেউ দেখতে পায়নি আমার স্ত্রী, সন্তান।   আমাকে দোষ দেয়ার আগে আমার অবস্থাটাও ভাবো বাবা। আমার শেষ যাত্রার কথা।  

—তুমিতো চিকিৎসা পেয়েছিলে। অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন। কিন্তু আমি এসবের কিচ্ছু পাইনি।

—তা পেয়েছিলাম। চেষ্টার ত্রুটি ছিলো না ডাক্তার নার্সদের। কিন্তু এ কেমন মৃত্যু!  নিঃসঙ্গ প্রাণীর মতো। মানুষের মৃত্যুর উৎসব হয়। শোক হয়।  আহাজারি হয় ! স্বজন পরিবেষ্টিত কতো আয়োজন মানুষের মৃত্যুর । একা নিশব্দে নীরবে মারা যায় পশু পাখি। মানুষ নয়।  আবছা দেখছিলাম বাবা,  ডাক্তার নার্সরা ভেন্টিলেশন খুলে নেয়ার আগে আমার অনীককে বলছিলো, সে বাই টু পাপা….বাই…. অনীক অনীক মাই সান….আমি চোখ খুলে শেষবারের মতো দেখতে পারছিলাম না আমার সন্তানের চেহারাটা। বাবা। আমার সন্তান। মরচুয়ারি, ফিউনারেল কবর সব একা বাবা সব একা……। ওরা কেউ আসতে পারেনি। আচ্ছা বাবা একী প্রকৃতির প্রতিশোধ। তোমাকে অবহেলার?

—জানিনা, জানিনা। বড়ো রহস্যময় এ প্রকৃতি।  কিন্তু আমি একা ছিলাম না বাবু। ডাক্তার আসেনি, নার্স আসেনি। ছুটে এসেছিলো  নিনিয়া। সংক্রমণের ছোঁয়া ভয় না পেয়ে জড়িয়ে ধরেছিলো আমাকে। আই সি ইউর ভেতরে সব নিয়ম ভেঙে।

—আমরা তো শুনেছি দেশে মৃতদেহ পড়েছিলো রাস্তায়। কেউ এগিয়ে আসে নি। বৃদ্ধ মা কে আক্রান্ত শোনে জঙ্গলে ফেলে রেখে গেছে সন্তান । সিঁড়িতে পড়েছিলো মৃতদেহ। কেউ এগিয়ে আসেনি সৎকারে। মসজিদ থেকে দেয়নি খাটিয়া। পিটিয়ে পাড়া থেকে বের করে দিয়েছে আক্রান্তকে।

—হ্যা বাবু, নিউজ তো তাই হয় সেগুলোই, যেগুলো অস্বাভাবিক। স্বাভাবিক তো এই যে লক্ষ সন্তান আগলে ছিলো তাদের বৃদ্ধ পিতা মাতাকে। যেমন আমাকে আগলে ছিলো নিনিয়া। শেষ মূহুর্তে আগলে ছিলো।  ডাক্তারের সব নিষেধ অগ্রাহ্য করে ছুটে এসেছিলো।  আমি শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছি আমার সন্তানের  কোলে।

—সন্তান ?

—হ্যা সন্তান।  তোমার মায়ের মৃত্যুর পর এই মেয়ে নিয়ে লিলিকে বিয়ে করেছিলাম  বলে তুমি রাগ করে চলে গিয়েছিলে তোমার  নানাবাড়িতে। কতোদিন তোমাকে দেখতে গেছি, তুমি ইচ্ছে হলে সামনে এসেছো, ইচ্ছে না হলে আসোনি। আমি তোমার খরচ দেয়ার পিতা ছিলাম শুধু। বুভুক্ষুর মতো  কতোদিন দাঁড়িয়ে থেকেছি তোমার স্কুলের সামনে। তুমি দেখেও উপেক্ষা করে চলে গেছো। আর নিনিয়া। জৈবিক পিতা ছিলাম না তার। প্রতিটি দিন পিতার সম্ভ্রম দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছে আমাকে। প্রিয় খাবার, প্রিয় পোশাক, ডাক্তার, ওষুধ, পথ্য, সন্তানের মতো সঙ্গ কি দেয়নি সে আমাকে!  নিজের মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে আমার শেষ নিঃশ্বাস তোলে নিয়েছে নিজের কোলে।   

—বাবু, আমি চাইনি বাৎসল্যহীন দিনে এভাবে তোমার মুখোমুখি হই আমি। পিতৃহীন হোক তোমার সন্তান। কিন্তু ঐ যে তুমি বললে প্রকৃতি, হয়তো, হয়তো…..  

—হয়তো একদিন মানুষ অতিক্রম করবে এই মৃত্যুভয়, জয় করবে আতঙককাল। নতুন পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে মানুষ নতুন কিছু মূল্যবোধ জানুক তবে বাবা। মানুষ জানুক শুধু মানুষের তরেই মানুষ। শুধু মানুষের জন্য মানুষের সম্পর্কের নানা নাম। ঔরসে ধরা কিংবা গর্ভে ধরাই শেষ কথা নয়। শেষ কথা নয় রক্তের অন্তর্গত কোন বন্ধন। যে বন্ধন সৃষ্টির অন্য প্রাণীকূল অগ্রাহ্য করে বোধবুদ্ধি হীনতায়, সেই বন্ধন মানুষ তৈরি করে নতুনতর সত্যে। মানবিক সত্য। মানুষ জানে মানুষের জন্য            অন্তর্গত সত্য কেবল মানবিক বোধ। যে বোধে নিনিয়া তোমার সন্তান হতে পারে। আমি পারি না। নতুন পৃথিবীতে আমিও তোমার সন্তান হবো বাবা। ঔরসের দায় স্বীকার করে কিংবা অস্বীকার করে আমিই তোমার সন্তান হবো। ছুটে আসবো বাৎসল্যের ডাকে।    

একসাথে গাইবো মানবতার সুর। যৌথসুর,  সমস্বরে।   

সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে….।

Comments

comments

রুমা মোদক

জন্ম: হবিগঞ্জ। জেলা শহর থেকে প্রকাশিত সংকলনগুলোতে লেখালেখির মাধ্যমেই হাতেখড়ি। শুরুটা আরো অনেকের মতোই কবিতা দিয়ে। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বিশঙ্ক অভিলাষ’। এরপর ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন মঞ্চনাটকে। রচনা করেন কমলাবতীর পালা, বিভাজন, জ্যোতি সংহিতা ইত্যাদি মঞ্চসফল নাটক। অভিনয়ও করেন। মঞ্চে নাটক রচনার পাশাপাশি নিরব অন্তঃসলিলা স্রোতের মতো বহমান থেকেছে গল্প লেখার ধারাটি। জীবন ও জগতকে দেখা ও দেখানোর বহুস্তরা এবং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার উৎসারণ ঘটেছে ২০১৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন ‘ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি’তে। ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’ প্রন্থভুক্ত গল্পগুলোতে সে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠেছে আরও নির্মোহ, একবগগা, খরখরে কিন্তু অতলস্পর্শী ও মমতাস্নিগ্ধ। গল্প লেখার স্বীকৃতিস্বরূপ ইতোমধ্যে পেয়েছেন বৈশাখী টেলিভিশনের পক্ষ থেকে সেরা গল্পকারের পুরস্কার, ফেয়ার এন্ড লাভলী সেরা ভালোবাসার গল্প পুরস্কার। ২০১৪ সাথে মঞ্চনাটকে অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘তনুশ্রী পদক’। বর্তমানে সক্রিয় রয়েছেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পত্র-পত্রিকা, লিটলম্যাগ এবং বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রকাশিত অন্তর্জাল সাহিত্য পোর্টালে লেখালেখিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম. এ সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় জড়িত রয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে স্বামী অনিরুদ্ধ কুমার ধর ও যমজ সন্তান অদ্বিতীয়া অভীন্সা পদ্য ও অদ্বৈত অভিপ্রায় কাব্যকে নিয়ে হবিগঞ্জে বসবাস করছেন।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি