সাম্প্রতিক

ছায়ার শেষের ছায়া ও ছায়াবিকৃতি । লায়লা ফারজানা

চন্দ্রগ্রহণ

আজ পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। পিঙ্গল হেমন্ত।
সময় সকাল ১১টা ৩৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে
উপচ্ছায়ায় চাঁদের প্রবেশ।
গ্রহণের শুরু।

টলতে টলতে এসে দাঁড়ালাম
কেন ডাকলে তুমি আমায়?
মরণনেশানো আহ্বানে
কফিনের ডালা খুলে শুয়ে পড়লাম
নির্ভরতায় তোমার বুকে—

ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় চাঁদ।
প্রতিটি আবর্তন সর্বনাশের আরো কাছাকাছি নিয়ে যায় তাকে।
নিজের অরবিটে পাক খায় —নিশ্চিত মৃত্যূকে উপেক্ষা করে।
খানিক পরেই চির অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে সে।
আকস্মিক, অবশ্যম্ভাবী,
মৃত্যুর মতো নিশ্চিত যে সত্য
কী গভীর ঘুম—
একটি লাশকে জড়িয়ে একটি কফিন,
একটি কফিনে একটি লাশ!
শব্দহীন নিনাদ, সময়বিহীন মুহূর্তে
টাইমল্যাপ্সে আটকে পড়া এক জমাট স্থিরচিত্র।

তবুও ‘নেকড়ে চাঁদ’-এর আলোকবন্যায় ভেসে যায় পার্থিবেরা!
চন্দ্রগ্রস্ত নেকড়েরা ডেরা থেকে বেরিয়ে বিলাপে মত্ত।
বিচ্ছুরিত মহাচান্দ্র আভা নিভে যাওয়ার ঠিক আগে!
ক্ষরণে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত চাঁদ।
ব্লাডমুন।

নিঃসঙ্গ পাইনের মতো হাত বাড়াই—
সবুজ থেকে নীল, নীল থেকে লাল।

আঙুলের নখে চোখ তুলে নিয়েছ তুমি
তবুও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি।
ভালোবাসা শরীরে নয়,
শরীর ভালোবাসা হয়ে গেছে।

রক্তনালীর ক্ষরণে
চাইনিজ ড্রাগনেরা খুবলে খেয়েছে চাঁদ,
ঘন্টাধ্বনিকে বিদ্রুপ করে হাস্যরত
তিনটি তিনপায়া ব্যাঙ।
মায়া-ইনকার চিতাগুলি সব শানিয়ে নিয়েছে দাঁত।
সূর্যের জমিতে চাঁদকে রোপণ করেছে মিশরীয়রা।

মেসোপটেমিয়ান
সাতটি অসুর আক্রান্ত করেছে আমাকে।
নকল রাজার বর্ম বিকল।
গঙ্গাস্নানে তবু খুঁজেছি নির্ভানা।
কফিনের ঘরে শীতল করেছি দেহ।

চাঁদ সব জানে। সেই সব মুহূর্ত,
যখন সূর্যের আলো পৌঁছয় না তার কাছে।
আগ্রাসী পৃথিবীর ওপেক ত্বক শুষে নেয় সব আলো।
এই সেই মুহূর্ত, যখন এক সরলরেখায় তিনটি বিন্দু।
ইথার নোডের একদম কাছাকাছি সে।
চাঁদের ওপর পৃথিবীর কালো ছায়া।

তুমিও তো জানতে তোমার কথার টুঁটি চেপে
মুখ বন্ধ করে দেয়া হাতের কথা!
আর আমি বৃত্তাকার ঘুমন্ত কালো টিপ তোমার অস্তিত্বে।

দ্যুতিময় অগ্নিবলয়ের জঠরে,
ভ্রুণের মতো পরম ভরসায়, তোমার কফিনে
আমি আজন্ম লাশ—
এক মৃত্যু থেকে আমৃত্যু!

আর কোন মুখে ফিরে যাবো কক্ষপথে!
কত গ্রহণের জন্য কত পূর্ণিমা!
একই তো জোছনা আর এই ক্ষয়,
কেবলই ক্ষয়ে যাওয়া আর পুনঃসংস্কার!

ইক্লিপ্সের আলোকিত অন্ধকারে
একটি কফিন, কফিনের বুকে ঘুমন্ত একটি লাশ,
মাঝখানে এক জীবন্ত মরণ।

আরেক হেমন্ত
প্রচ্ছায়া থেকে চাঁদের নির্গমন ২টা ৫০ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে।
৫ ঘণ্টা সাড়ে ১১ মিনিট স্থায়ী এ গ্রহণটির সর্বোচ্চ মাত্রা ১.১৬৮৩।
গতি ১০৯.২০২০।

প্রেমবৃত্ত-২
আবারও:
ছায়ার শেষের ছায়া

আবারও

শুয়ে পড়লাম পাশ ফিরে।
ওপাশে তাকাবো না।
ওপাশে যা আছে থাক।

এপাশে একটা শহর,
কালো রাস্তা,
রাস্তার শেষে কালো নদী,
কালো নদীর উপরে কালো আকাশ
কালো আকাশে সাদা চাঁদ।
সাদা চাঁদের ঠিক নিচে তার ছায়া।

ছায়ার নিচে, আরো গভীরে
আরও অতলে আমি।
নীল অক্টোপাস
ছায়ার শেষের ছায়া—

ছায়ার শেষের ছায়া

নীল অক্টোপাস আমি।
আরও অতলে, আরো গভীরে,
ছায়ার নিচে
তার ছায়া।

সাদা চাঁদের ঠিক নিচে
সাদা চাঁদ।
কালো আকাশে কালো আকাশ।
কালো নদীর উপরে কালো নদী,
রাস্তার শেষে রাস্তা।
কালো একটা শহর—

এপাশে ওপাশে যা আছে— থাক ওপাশে।
তাকাবো না।
পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম
আবারও।

ছায়াবিকৃতি

সুপ্রাচীন এক দ্বীপ,
নাকি সুদূরের কোনো গ্রহ?
ধোঁয়া ওঠা-ছাই—এর মতো
কিছু সাদা-কালো মানুষের
নির্জন খোলা বাহু—
মৃত উত্তাপ ছড়িয়ে ধূসর!

জীবনোত্তর যাপনের মাঝে
একাকী হাঁটছি যেন ইডিপাস
এক ভূ-পৃষ্ঠ বিচ্ছিন্ন
হারানো বাগানে।
ভাসমান পথে ক্ষত
স্ফীতপদের ভার।

চারদিকে থৈ থৈ
রুপালি ঘাসের ঢেউ
বাতাসে তীব্র বিবমিষা
শুষ্ক ঘাসের সমুদ্রে জাগে
হাঙরের ঘোলা চোখ,
ছায়াবিকৃতি সৈকতে
নোনা স্বপ্নের ফেনা তোলে।

 

লায়লা ফারজানা

কবি লায়লা ফারজানা পেশায় স্থপতি। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক। পরবর্তীতে আরবান ডিজাইন ও স্থাপত্যবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্ক এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টো থেকে । তিনি নিউ ইয়র্ক সিটি স্কুল কনস্ট্রাকশন অথোরিটিতে স্থপতি হিসাবে কাজ করছেন । এর বাইরেও লায়লা ফারজানা একজন নাট্যশিল্পী এবং শিল্প ও সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখায় রয়েছে তার সাবলীল যাতায়াত। নিউইয়র্ক-এর ডিস্টুডিওডি আর্কিটেক্টস এবংইঞ্জিনিয়ার্স (দ্য স্টুডিও অফ ডিজাইন) তার নিজ্স্ব প্রতিষ্ঠান, যেখানে তিনি ‘সাসটেইনেবল-আর্কিটেকচার’ এর চর্চা করেন।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
FacebookGoogle Plus

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি