সাম্প্রতিক

আপাত অব্যক্তিগত । ইশরাত তানিয়া

চুতমারানির পোলারা চুদতেও পারে না। আক্রোশটা খিস্তিখেউড়ে পরিণত হয়ে ঝনঝন করে ভেঙে  পড়ছিল। ঘটনাটার ফলাফল তখন সবেমাত্র সে টের পায়। তলপেট থেকে যখন টক জলের ঘূর্ণি গা কাঁপিয়ে বাইরে এসে পড়ে। কলতলায় যাবার সু্যোগ দেয় না। দরজার বাইরে বসে সে হাঁপায় আর শরীরের সমস্ত শক্তি একাট্টা করে গালি দেয়।        

ওর ঘুম ভাঙে একটা ঘোলাটে পুকুরের মতো শরীর নিয়ে। চোখ মেলে সে। একটু সময় লাগে বুঝতে সে কোথায়। চোখ বরাবর ফিলামেন্ট কাটা বালব ঝুলছে। লায়লার মনে পড়ে গত রাতেই বালব ফিউজ হয়ে গেছে।

সকালটা নীরব। এ সময়টা শুনশান পড়ে থাকে পাড়া। এক নাম্বার গলিতে বড়জোর দুটো কুকুর ছেঁড়া কাগজের টুকরো নিয়ে দাঁতে কামড়ে টানাটানি করে। ঘিঞ্জি গলি নোংরা কাদায় ঠাসা। প্রায় বছরভর বৃষ্টির পানি গিলে ঘেয়ো থকথকে হয়ে থাকে পুরো গলি। সূর্‍্যের আলো এ গলিতে ঢোকার আগে থমকে যায়। কিন্তু তাপ ঢুকে হিলহিলিয়ে। চুলের গোড়া ভিজিয়ে ঘাম ঝরায় বাসিন্দাদের।   

ইটের ওপর পা ফেলে ফেলে কলতলায় আসে লায়লা। পৌরসভার সাপ্লাইয়ের কল আছে দুটা। তারই একটাতে এসে দাঁত মাজে সে। টুথপেস্টের সাদা ফেনা নিয়ে পানি গড়িয়ে যায় নালার দিকে। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এখনো ল্যাট্রিন আর গোসলের জন্য লাইন শুরু হয়নি।     

সকাল সকাল বেশ হাওয়া ছুটেছে। এতেই কয়েকদিনের গুমোট কেটে গেছে। যদিও সকাল আটটাতেই মাথার ওপর সূর্য গনগনে লাল। বাতাসের হিম ঝাপটে আরাম পায় লায়লার স্যাঁতস্যাঁতে শরীর। আশেপাশে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে হয়তো।
— এত্তো বিয়ানে আইজ ঘুম ভাঙছে?
রোকেয়া বানুর কথা শুনে ডান পাশে ফিরে তাকায় লায়লা। চারপাশ থেকে নিজেকে তুলে নেয়।

—একটু জিরেই আম্মা। ম্যালা বাতাস! কিরাম ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগে!    

রোকেয়া এই গলির একজন ঘরওয়ালি। গতযৌবনা। এখন আর দেহ বিক্রি করতে পারে না। বাবুঘাট পট্টি এলাকার এই গলিতে কয়েকটা একতলা, দোতলা পাকা দালান আছে। পাকা কিন্তু শ্রীহীন, স্যাঁতা পড়া। পলেস্তারা খসে এবড়োথেবড়ো নড়বড়ে হয়ে আছে। রোকেয়ার ঘর অবশ্য টালির ছাউনী দেয়া। ভেতরে হার্ডবোর্ডের সিলিং। সারি সারি ঘরগুলো মুখোমুখি। মাঝখানে সরু প্যাসেজ। রোকেয়ার সাথে থাকে লায়লা, জরী আর তিনজন অল্পবয়সী মেয়ে। একই খুপরি ঘরে কোনো রকমে ঘুমায় পাঁচজন।    

বেশি খদ্দের নিতে হবে। লাল ঠোঁটে রতিলিপ্সায় হৃদয়েশ্বরী সাজে লায়লা। চোখে পুরু কাজলের টান। দেখার মতো ভারি ভাপানো বুক।

রাতভর খাটনীর পর লায়লার শরীর ঘুমায় বেহুঁশ। এতো সকালে এখানে কেউ ঘুম থেকে ওঠেও না। বেলা এগারটা বারোটার আগে অন্তত না। আজ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল লায়লার। হয়েছে কী, রাতে টগর এসেছিল স্বপ্নে। যদিও স্বপ্নের কায়কারবার ওর মধ্যে নেই। তবু কেন যে এক বছরের টগর টলমল হেঁটে এসে ওর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল! চুমোয় চুমোয় মেয়ের ওইটুকু মুখ ভরে দিল লায়লা। এত তীব্র আর স্পষ্ট স্বপ্ন! টগরের মুখে লেগে থাকা দুধ দুধ গন্ধটা পর্যন্ত সে টের পেল।

বাচ্চার বয়স তখন দশদিন। কাঁথার পুঁটলির ভেতর যেন ধবধবে এক স্তুপ টগর ফুটে আছে। স্যালভেশান আর্মি এনজিওর ডাক্তার আপা এসে ওকে দেখল। জিজ্ঞেস করল- তুই কি বড়ি খাবি? হ্যাঁ? বড়ি যদি খাইস বুকের দুধ শুকায় যাবে কিন্তু। চৈতের জমিনের মতোই খাঁ খাঁ হলো বুকের পাথার। জাঁহাবাজ জীন এসে লু হাওয়ার হলকায় চেটেপুটে দুধের শেষ ফোঁটাটুকু শুষে নিল।    

নষ্টের গোড়া ছিল টেন্ডারে কেনা নিম্নমানের কনডম। বিনা পয়সায় পতিতালয়ে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল স্বাস্থ্য সেবা খাতে। ছিঁড়ে, ফেটে বিপদ ঘনালো। লায়লা এসব দাপ্তরিক ব্যাপার বোঝে না। জানে না উৎপাদন-বন্টনের হিসাব নিকাশ। সে গাল পাড়ে খদ্দেরের আনাড়িপনায়। গালিটা অবশ্য যোগ্য পাত্রে পড়ে না। নির্মাতা-বিক্রেতা এমন কি ক্রেতা-বিতরণকারীকেও নয়, ভোক্তাকে গালি দিল লায়লা কিন্তু পেটের সন্তান নষ্ট করলো না। টগরের বাপের চেহারাটা খুব মনে আছে লায়লার। এমন আশ্চর্য ঘটনা তো হরহামেশা ঘটে না। সেই থেকে খদ্দের এলেই মুখটা দেখে নেয়। বোকা হয়ে যাওয়া ওই চেহারাটা পায় না। লোকটারে এই পাড়ায় সে আর দেখলই না।  

জরি এসে দুহাতে ওর কাঁধ ধরে পেছন থেকে। জরিও এই এক নাম্বার গলির বাসিন্দা।

লায়লা একটু সরিয়ে দেয়- সর দেহি। মুক ধোবো।    

ওষুধের গুনে ফুলেফেঁপে ভয়ানক হয়েছে জরির শরীর। চোখের নিচে ক্লান্তির কালি। লায়লার চেয়ে বয়সে বড়ই হবে। এখানে কার বয়স কত কে জানে?

—মাগী আমার সুনার নাকফুল চুরী করসে। ভাতাররে দিয়ে দেসে হারামজাদী। আক্ষেপ করে জরী।  

লায়লার নিজেরও ছিল একজন মজনু। টাকাপয়সা হাতিয়ে বিক্রি করে দিল রোকেয়া বানুর কাছে। এক পুরুষের সাথে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া হলো লায়লাকে। সক্রিয় শিশ্নের আঘাতে হুড়মুড় ভেঙ্গে পড়ল অতীত, অতীতের মাগুরা মহকুমা, মহকুমার সব দিকদিশা। তবু আচমকা লায়লা সেই ভেজা উঠানের সোঁদা গন্ধ পায়। উঠানের ধার ঘেঁষে ছনের ঘর। সেখানে মায়ের কোলে যমজ হয়ে আসে ওরা দুই ভাই বোন। ঘরের সাথে লাগোয়া টগরের ঝোপ আর জোড়া চালতা গাছ। মেঘ রঙে আকাশ ছেয়ে গেলেই দুধ সাদা টগরে সেই ঝোপ ভরে যেত আর চালতার বুকে রস ঘনাতো। সন্ধ্যা নামার আগে চালতা গাছের ওপর দিয়ে উড়ে যেত বলু পীরের ধলপেট বকের ঝাঁক। দল বেঁধে ঠাঁই নিত দত্তবাড়ির বাঁশঝাড়ে।     

আমন উঠে গেলে হারুন আলীর ধানী জমিতে সরিষার ক্ষেত করত আব্বা। ওষুধ দিত পিতলের মেশিনে। জমিতে হলুদের ঢল নামত এই সময়। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা সরিষা গাছে পিছিলে যাওয়া রঙে নয়ন জুড়াতো লায়লা। তিনশ চারশ বছর আগের কালের কথা। হাজরাখানা গ্রামে মামার বাড়িতে দিনমজুর খাটত এক কিশোর। সরিষা মাড়াই করতে গিয়ে সরিষার গাদায় সে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ক্ষেতের মালিক মাঠে গিয়ে দেখে আগুন জ্বলছে। কিশোর অপার্থিব হেসে বলে- ছাই উড়োয়ে দ্যাহেন শইস্যে পুড়েনি। সেই কিশোরই পীর বলু দেওয়ান। সরিষা ক্ষেতে দাঁড়িয়ে বুকে থুথু ছিটাতো লায়লা। এতে ভয় কিছুটা কাটত।

কুলি করে সশব্দে পানি ছুঁড়ে সে। পানির ঝাপটা দেয় চোখে মুখে। বুকের কাছে ম্যাক্সির লেইস সামান্য ভিজে গেছে। আলগা হয়ে থাকা পানির বিন্দুগুলো ঝাড়ে।        

জিজ্ঞেস করে— কিডা চুরি করেছে?   

—জেসমিন শালী।    

লায়লা আর কিছু বলে না। টাকা আর নাকফুলের চিন্তায় উত্তেজিত জরির নাকের পাটা ফুলে ওঠে। সকালবেলাতেই খদ্দেরের আনাগোনা শুরু হয়েছে। লায়লা বা জরি সেদিকে তাকায় না। হয়তো তাকানোর ইচ্ছাই হয় না। 

রোকেয়ার মা-ও ছিল সর্দারনি। টিমটিমে বিজলি বাতির আলোয় রোকেয়া মায়ের গা ঘেঁষে শুনতো গালগল্প। ইডেন মার্কেট পার হয়ে আরও দক্ষিণে পুরনো আমতলা পল্লীতে নাকি জমিদারদের বাইজিখানা ছিল। পানের রসে লাল ভেজা ঠোঁট গোল করে মা বলতো— বাদশা আকবরের সুমায় থেকে এই ব্যাপসা চলতেছে। ইংরেজগের সুমায় এহেনি মাগীদের তিনডে জাগা ছিল। ইতিহাসের সাক্ষী সবুদ এতসব তলিয়ে দেখার মাথা আর মন কোনোটাই নেই রোকেয়ার। ভরদুপুরে কাজ থাকে না এক কালের দাপুটে বেশ্যা রোকেয়ার। ইংলিশ সাবান ফাঁকি দিয়ে বেঁচেবর্তে থাকা উকুনগুলো চুল থেকে টেনে আনে।

দুই হাতের বুড়ো আঙুলের নখে উকুন পিষে মারে টুস করে আর লায়লাকে বলে- সেই সুমায় আট ঘুড়ার ফিটন গাড়িতে চইড়ে কলকাতাততে আসতো জমিদার, ব্যারিস্টার আর ওগের বন্ধুরা। শনিবার আইদবেলা আর রবিবার সারাদিন কাটায়ে ফিরে যাতো।

লায়লার ওই শোনা পর্যন্তই। রোকেয়ার একই গল্প শুনে সে বরাবর তিতিবিরক্ত। সেই জমকালো বাইজিবাড়ির কোনো নাম নিশানা আর অবশিষ্ট নেই। নেই অস্থির অশ্বখুরের শব্দ, সুগন্ধি চুরুট কিংবা জর্দার মৌতাত। সেদিনের এক টুকরো রঙিন কাঁচ লেগে নেই এই পাড়ার কোনো বাড়ির জানলায়। লায়লার ঘরে জানলাই নেই। নড়বড়ে দরজার পাল্লায় অ্যাকশান এইডে’র পোস্টার সাঁটা। এইডসরোধে করণীয় নির্দেশনামা। বিছানা ঝাড়ে লায়লা, ঘর ঝাড়ে। নাইট গার্ড ছেলেটাকে দিয়ে নতুন বালব লাগায়। মুখে স্নো-পাউডার মাখে স্বামীসোহাগিনী পাটরানির মতো। নখের ওপর সস্তা নেলপলিশের প্রলেপ লাগায় বহুক্ষণ ধরে। আজ আর বিরক্ত হয় না লায়লা। আসলে মন নেই রোকেয়ার কথায়।   

 ‘চুত’ শব্দের সাথে অন্যান্য ক্রিয়াপদ যুক্ত করে গালির তুবড়ি ছুটিয়েছিল সে প্রতিবার বমির পর। জরি এসে মায়াভরে মাথা ধুয়ে দিত। হিহি করে হাসত জেসমিন কিংবা রুবি, পপি কিংবা পূর্ণিমা। তা কপালের ফেরে কী না হয়? গরীব হয়, বেশ্যা হয়, টগরও হয়। সবে ছয় হয়েছে টগরের। পাঁচ বছর লায়লা মেয়েকে দেখে না। রোকেয়া খুব খুশি হয়েছিল। মেয়ে হলো এ পাড়ার লক্ষ্মী। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল লায়লা। মেয়েকে পাড়ায় রাখা যাবে না। আমিনুলের কাছে থাকবে টগর। একটু ডাগর হলে যদি সেফহোমে রাখা যায়, লেখাপড়া শিখে মেয়ে হয়তো ভদ্র মানুষের মতোই বড় হবে।  

দরজার ফাঁক দিয়ে লায়লা দেখে কলের পানির তেজী ধারা ছিটকে পড়ছে। কলতলায় গোসল করছে জরি। বুকের ওপর গিঁট দিয়ে বাঁধা পেটিকোট হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। মেরুন রঙের পেটিকোট পানিতে ভিজে কালচে খয়েরি বর্ণ হয়ে যায়। শীতে কাঁপতে কাঁপতে প্লাস্টিকের বালতি থেকে পানি তুলে মাথায় ঢালে জরি। উরুর কাপড় তুলে গা মাজে আর পানিতে গলে ক্ষয়ে যায় ৫৭০ সাবান।          

ভেতরে প্রায় অন্ধকার ঘর, বাইরে ভেজা কলতলা, কলতলার এঁটো বাসন, গুনে গুনে চারটা হুলো আর মেনি, পাড়ায় এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করা মেয়েরা, মোড়ের দুটা মুদি দোকান আর একটা চায়ের টঙ কাঁচা গুয়ের উৎকট গন্ধে অস্থির হয়ে যায়। গুয়ে উপচে পড়ছে ট্যাঙ্কি। একেক সময় দম নেয়া যায় না। এক খিলি পান বাড়িয়ে দেয় রোকেয়া। খসে পড়া আঁচল তোলে চিমসানো বুকের ওপর। ইঁদুরকাটা ব্লাউজের ছিদ্র দিয়ে খয়েরি স্তনবৃন্ত উঁকি দেয় কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর আঁচলে ঢাকা পড়ে। দরজা খোলা রেখেই বের হয়ে যায় সে। থুথু ফেলে আঁচলে নাক চাপা দেয়। জরির নাকফুল চুরির বিচার করা দরকার। জেসমিন ছুঁড়ির কপালে আজ শনি আছে।                  

লায়লা ভেবেছিলো দুপুর নাগাদ ঝুম বৃষ্টি হবে। গাছের পাতা শুধু ঝুরঝুরে হাওয়ার যোগান দিল। মেঘগুলো সরে গেল পূব দিকে। পান চিবানো বন্ধ করে কান খাড়া করে পাখির ডাক শুনলো লায়লা। চারদিক থৈ থৈ শব্দে ডুবে থাকলেও একটা ঘুঘু কিংবা শালিকের ডাক বেখেয়ালেও কান এড়ায় না। এক ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার লায়লা আব্বার সাথে বলু মেলায় গিয়েছিল। চৌগাছার হাজরাখানা গ্রামে। সাথে যমজ ভাই আমিনুল। নারকেল আর নগদ পঞ্চাশ টাকার মানত ছিল মায়ের শ্বাসকষ্ট নিরাময়ের জন্য। ফিবছর সাত দিনের মেলা বসে বলু পীরের রওজা শরীফ ঘিরে। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে সবুজ রঙের ওপর গাঢ় লাল হরফের অক্ষর। পীর বলুহ দেওয়ান (রঃ) রওজা শরীফ। লেখাটার দুপাশে চারটা পাপড়ির দুটা ফুল আঁকা।        

বিকালেই উপচে পড়া ভিড়। কত যে জিনিসপাতি। আমসত্তা আর চাটনীর গন্ধে ভুরভুর করে বাতাস। মাজারের পাশে কপোতাক্ষ বয়ে যায়। তালমিছরির মতো মিঠা পানি বুকে নিয়ে। হজমীওয়ালা ছোট কাঠের বাক্স থেকে এটা সেটা নানান গুঁড়া মিশিয়ে হজমী বানায়। রহস্যময় গলায় বলে- যখন তাঁর দশ বার বচ্ছর, ব্যাদান বিলের মাঠে তিনি গরু চরাতি যান। ভুঁইয়ের মালিক বিনা দোষে গরু ধরতি গেলে তিনি গরুগুলারে বক বানায়ে গাছে বসায়ে রাখেন।   

ছেঁড়া কাগজ থেকে আঙুলে একটু একটু করে হজমী খায় দুই ভাইবোন আর গল্প শোনে। ওদের জিভ কালো হয়ে যায়। ঝিনঝিন করে মুখরোচক হজমীর ঝাঁঝে। সেই থেকে বক দেখলেই লায়লার মনে হয় পীরের বক। ওই বকের ঝাঁক সৌভাগ্যের সমার্থক হয়ে আসে। একদিন হয়তো তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে বাবুঘাট পট্টি থেকে। আলতো করে নামিয়ে দেবে ঘুমন্ত টগরের পাশে। লায়লার উদাস চোখে ভুল করে জল ভাসে। পরক্ষণেই বাতাসের স্পর্শে শুকিয়ে যায়।  

মোলায়েম আঁধারমাখা। হলুদ আর সাদা বাতির উজ্জ্বলতায় সে নরম আলো চোখে সহসা ধরা দেয় না। নটী পাড়ার ঘুম ভাঙে খদ্দের আর দালালের ভিড়ে। রাতের বেলায় আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে দিন। দিনরাত আর ঘুমজাগরণের হিসাব বাবুঘাটের এক নাম্বার গলিতে ওলটপালট হয়ে যায়। সূর্য যখন মুখ লুকিয়েছে শরীরে বিষ ব্যথা টের পায় লায়লা। ব্যথানাশক ট্যাবলেট খেয়ে, নেশা করে কিছু সহ্য করে নেয়। শরীরে শরীর জোড় লাগে।

মায়া মাছ দিয়ে রান্না বাগুনের চচ্চরী থেকে ধোঁয়া ওঠে। রান্নার মাসী এক কালের পতিতা। এই পাড়ার এখন রাঁধুনির কাজ করে। জরির সাথে ভাত খায় লায়লা। পাতে কাঁচা মরিচ ডলে। ডাল ঢালে। ওর জিহ্বা অসাড়। শরীরে তো সুখ বলে কিছু নেই। শুধুই অসুখ। ট্যাবলেট আর সুঁই নিয়ে শরীর ঠিকঠাক রাখা। গণ্ডাকতক ওষুধ গিলে মাথা ঝিমঝিম করে সবসময়। শরীরের নিচে দুই উরুর মাঝখানে ক্ষতের বিষব্যথা। আবার ট্যাবলেট খাওয়া।  তিনবেলা খাবার আর ঘর ভাড়া বাবদ একশ টাকা খরচ হয়ে যায় একদিনেই। নেশাপানি, ট্যাবলেটের খরচা বেড়েছে। অথচ এই মাসে বাজারের অবস্থা ভালো না। চাঁদ রাত থেকে যত পুরুষ আসবে, লায়লা ফিরিয়ে দেবে না কাউকে। শট বা ঘণ্টার হিসাবে দামে পোসালেই হলো। এঁটো থালায় তর্জনী বুলিয়ে সে হিজিবিজি আঁকে। তাকিয়ে দেখে জরি নেই। বাসন ধুয়ে রেখে চলে গেছে।     

জীবনে কত কিছুই তো হতে পারে। একদিন গলির মোড়ে হয়তো টগর দাঁড়িয়ে থাকবে। আমিনুল মামার তর্জনী ধরে। লায়লা হয়তো মেয়েকে চিনতে পারবে কিংবা পারবে না। কিংবা বলু পীর পাঠিয়ে দেবে ধলপেট বকের ঝাঁক। কপোতাক্ষর দিক থেকে আসবে ওরা। প্রসারিত ডানায় আকাশ ঢেকে লায়লাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে। এমনো তো হতে পারে লায়লা টগরের বাপকে দেখতে পাবে খদ্দেরের ভিড়ে। দেখলেও বা কী? টগর লায়লারই মেয়ে অথবা লায়লার মেয়েও না। লায়লার আসলে নেই কিছুই। কবরের একপ্রস্থ মাটির অধিকারও ওর নেই। দিকশূন্য দরিয়ায় ভাসতে ভাসতে জাঁতায় পেষা শরীর একসময় ডুবে যাবে কপোতাক্ষের বুকে।

দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। সন্ধ্যারও একটা সামান্য আলো থাকে। মোলায়েম আঁধারমাখা। হলুদ আর সাদা বাতির উজ্জ্বলতায় সে নরম আলো চোখে সহসা ধরা দেয় না। নটী পাড়ার ঘুম ভাঙে খদ্দের আর দালালের ভিড়ে। রাতের বেলায় আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে দিন। দিনরাত আর ঘুমজাগরণের হিসাব বাবুঘাটের এক নাম্বার গলিতে ওলটপালট হয়ে যায়। সূর্য যখন মুখ লুকিয়েছে শরীরে বিষ ব্যথা টের পায় লায়লা। ব্যথানাশক ট্যাবলেট খেয়ে, নেশা করে কিছু সহ্য করে নেয়। শরীরে শরীর জোড় লাগে। পুরুষ শরীরের কাঁকড়াগুলো ঢেলে দেয় ওর শরীরে। টাকা দিয়ে অতৃপ্তি মিটিয়ে চলে যায়। দিবারাত্রি সেই কাঁকড়ার কুটকুট কামড়ে সারা শরীরে ব্যথা। লায়লা ভাবে আরেকটু পসার যদি বাড়ে। জেদ আর স্নেহ মিশে ফোঁটা ফোঁটা কুয়াশা ঝরে একটা স্বপ্নের তন্ময়তায়… টগর… টগর…     

সেফহোমে রাখতে হলেও টাকা রোজগার বাড়াতে হবে। বেশি খদ্দের নিতে হবে। লাল ঠোঁটে রতিলিপ্সায় হৃদয়েশ্বরী সাজে লায়লা। চোখে পুরু কাজলের টান। দেখার মতো ভারি ভাপানো বুক। দীর্ঘকায়া। হাসলে সাদা দাঁতের সারি। সবাই যেমন চায় আর কী- খোয়াবের পরী। মধ্যরাতে ভিজা-শুকনা মদ-মাদকে আসর জমজমাট। পেছনে খোলা জায়গায় কান ফাটানো শব্দে গানের সাথে নাচে জেসমিন। হিহি করে হাসে। আঁটসাঁট স্কার্ট টপ পরে ইদানীং রেট বাড়িয়েছে। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ফেলে দেয় লায়লা।     

চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে ছোট্ট খুপরীতে। সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে। সে কিছুক্ষণ চোখে দেখতেই পায় না। খদ্দেরের বেশি চাপ নেই। সিরিয়ালে আছে আরো দুজন। এ নিয়ে আজ কাস্টোমারের সংখ্যা চার। ক্লান্তিতে চোখ বুজে যায়। হাত-পা আলগা হয়ে আসে। পৃথিবীর বাইরে এ এক হাহা চর। বেশ্যা পাড়ার নর্দমা পেরিয়ে ধুধু মাঠ দূরত্বে টগর হাসছে…    

একটা ময়লা-ঘেমো শরীর ঝুঁকে আসে। অবসন্ন ব্লাউজ খোলে লায়লা।  

ইশরাত তানিয়া

জন্ম ঢাকায়, ১৯৮০ সালের ৬ নভেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ এবং এমবিএ। পিএইচডি করছেন। মানবিক সম্পর্ক, নৈরাশ্য, স্বপ্ন, প্রকৃতি, প্রেম, অতীন্দ্রিয়তা বিষয়ে তার উপলব্ধি এবং ভাবনাকে কেন্দ্র করে কবিতা এবং অন্যান্য সাহিত্য কর্ম আবর্তিত হচ্ছে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি