সাম্প্রতিক

এথরিজ নাইট এর কবিতা । বদরুজ্জামান আলমগীর

এথরিজ নাইট : টেরান্স হায়েস—এর মূল্যায়নটুকু নাইট এর কবিতা বিবেচনার কেন্দ্রে রাখা যায়। তিনি বলছেন: নাইট এর কবিতা নাইটের জীবনী, একইসঙ্গে তা অস্থির আমেরিকানীয়তা, কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানীয়তা, আবার তাঁর কবিতায় আছে সত্যিকার ফকনারীয় গূঢ়ৈষা— জীবন ও বাস্তবতার বহুবর্ণিল স্তর ও বিন্যাস। কালো জীবনের লাঞ্ছনা, তাদের জঙ্গম স্বপ্ন ও আশাভঙ্গের গোঙানি। নাইটের কবিতা ন্যায়সঙ্গতভাবেই কিছুটা উচ্চস্বর আর পুরুষকারে উচ্চকিত। তাঁর নির্ভীক চলনটিই একটি মর্যাদাবান স্বতন্ত্র কাব্যভাষা তৈরি করেছে। এথরিজ নাইটের কবিতায় আছে জ্যাজ মিউজিকের অন্তর্লীন তীব্রতা: তিনি লিখেছেন জেলে বসে; ফলে কারাজীবনের কাঠিন্য আর কৃষ্ণাঙ্গ অন্তরাত্মার দহন মিলেমিশে পাঠকের জন্য তৈরি হয়েছে যুগোত্তীর্ণ তৃতীয় নয়ন।

এথরিজ নাইট জন্মেছিলেন ১৯শে এপ্রিল, ১৯৩১— করিন্থ, মিসিসিপি, মৃত্যুবরণ করেন ১০ মার্চ, ১৯৯১— ইন্ডিয়ানাপোলিস, ইন্ডিয়ানায়। মাঝখানে বিয়ে করেছিলেন কবি সোনিয়া সানচেজ-কে; কালো কবিতার স্ফূরণে, আন্দোলনে তাঁদের যূথচারিতা ফলবান হয়েছিল, হয়েছিল দৃষ্টান্তও।

নিজের জন্য একটি কবিতা
অথবা একটি মিসিসিপি কালো ছেলের জন্য মর্সিয়া

মিসিসিপিতে জন্মেছিলাম আমি,
আমি খালি পায়ে কাদা ভেঙে হাঁটতাম।
মিসিসিপির একটি কৃষ্ণাঙ্গ ছেলে
নাঙা পায়ে পাঁক মাড়িয়ে চলতো।
কিন্তু, যখনই আমার বয়স বারো হলো
আরও ভালোর আশায় সেই জায়গা ছেড়ে দিলাম।
আমি তুলা ধোলাইকারী বাবাকে বলে এলাম
বাবা সেদিন লাল পানি গিলতো স্ট্রেইট আপ।
রোববার সকালবেলা যেদিন বাড়ি ছেড়ে এলাম
বাবা গোয়ালঘরের কেওরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আর সে দাঁড়িয়েছিল উঠানে
সূর্যের আলো চিকচিক করছিল তার চোখে
আমি উত্তরদিকে হনহন হাঁটতে শুরু করি
যেমন বেলে হাঁস একরোখে উড়তে থাকে।

আমি ডেট্রয়েট আর শিকাগো ছিলাম
ছিলাম নিউইয়র্ক শহরেও।
আমি ডেট্রয়েট এবং শিকাগো ঘুরেছি
নিউইয়র্ক শহরও চক্কর দিয়েছি।
সব চামের শহর বন্দর রাস্তাঘাট চষে বেরিয়েছি
কিন্তু আমি এখনও যেই কী সেই
কালো ছেলেটি সনাতনী ব্লুজে মজে রই।

আবার ফিরে যাচ্ছি আমার আদি মিসিসিপি
আরো কিছু ভালোর আশায়
ভালো কিছুতে বসতি গড়বো বলে
ফিরে যাচ্ছি, মিসিসিপি ফিরে যাচ্ছি আবার।

মিসিসিপি, আহা মিসিসিপি—
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নাই মানা,
অথবা মিসিসিপির কাদায় ডুবে মরে যাবো
মিসিসিপি আমার।

Etheridge Knight : A poem for myself.

বিষ্যে ঝরোঝর

খোদা, আমারে লিল্লা দিয়া চলে গ্যাচে
জন্মের মত সে আমারে ফেলে দিয়ে যায়
দুনিয়ায় এমন কোন শক্তি নাই
যা দিয়া তারে আমি ফেরত আনতে পারি
একদম দিবালোকের মত পরিস্কার
মৃত্যুর অনড় নগ্ন নৃত্য
তাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গ্যাছে— সে খুইয়েছে মুখের সোনাঝরা হাসি, রাত্রির বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস,
আর কোমলতা।

কলট্রেইনের অসামান্য স্যাক্সোফোনের সুর,
আকাশ থেকে নামা দানাদানা বৃষ্টির
আমি গুষ্টি কিলাই,
এই চমৎকার সাগর, গাছগাছালি, আকাশ,পাখি
কুমির, রঙবেরঙের পশুপাখি দুনিয়ার
এ-মাথা ও-মাথা চক্কর মারে যারা— তাদের জন্য
আমার কিচ্ছু আসে যায় না।

কী বাল ফালাবো আমি মার্কস দিয়া, মাও সেতুঙ,
ফিদেল ক্যাস্ট্রো, নক্রোমার মায়েরে বাপ,
গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের পাছা মারি আমি
বাইবেলের ইউসুফরে ঠাপাই,
মা মেরি তুই আমার চোক্ষের সামনে থাইকা সর
ঈশ্বর যিশুরে আমি পুচিও না
ওইগুলা শুদ্ধা- ফানোঁ, নিক্সন, ম্যালকম আর
হেতেনের চেলাফেলা সব কয়টারে গুয়া মারি।

বিপ্লব, স্বাধীনতা— এইসব বস্তাপঁচা বুলিরে চুদি আমি,
সব রসাতলে যাক

আমি শুধু চাই আমার লীলাবালি ফিরে আসুক
আর আমার প্রাণ গান গেয়ে উঠুক।

Etheridge Knight : Feeling fucked up.

আত্মহত্যার কথা ভাবে এমন কৃষ্ণাঙ্গ কবিদের জন্য

কৃষ্ণাঙ্গ কবিদের বেঁচে থাকা উচিৎ
শ্বেতাঙ্গ পোলাদের মত লোহার সাঁকো থেকে
তাদের লাফিয়ে পড়া বেমানান।
কৃষ্ণাঙ্গ কবিদের জীবন বাজিয়ে দাবড়ানো দরকার
সাদাদের মত তারা রেললাইনে মাথা গলিয়ে দেবে না
কালো কবিরা তল্লাশির বদলে অন্বেষা করবে
সাদা ছেলেরা চোখ সরু করে খুঁজবে শিকারের পাখি
তারা মানসিকভাবে চিপা গলির ভিতর আটকানো,
তন্নতন্ন করে দেখবে গুহার  ভিতর কী মজুত আছে।

কালো কবিরা কালো মানুষের নাড়ির ধন
তারা প্রেমিকদের জন্য বাঁশি বাজায়
তারা দুঃখের ব্যথায় অর্গানে সুর তোলে
যোদ্ধাদের অভিবাদন জানাতে দুন্দুভি বাজায়
কালো কবিদের মরতে দাও যুদ্ধের কাড়ানাকাড়ায়
নির্ভীক অঙ্গীকারের নিচে ধূলার আস্তরণে তাদের সমাধি হোক।

Ethridge Knight : For black poets who think of suicide.

তার পাথরভেদী চোখ

তার চোখ পাথর ভেদী
অন্তর্গত দৃষ্টি আছে তার
কৃষ্ণাঙ্গ বয়েসী গাছপাথর এক
সে বসে আছে কয়েদি আকাশের
গনগনে সূর্যের নিচে
তার পিঠ পশ্চিমের দেয়ালে
দুই ঠোঁটের ফাঁকে পাইপ

বছরের পর বছর
জীবন থেকে হারিয়ে খোয়ায়
সময় যেন ঝরে পড়ে পাকা তাল
কালো পৃথিবীর উপর ফেটে রক্তিম

তার কাল তারই সময়ের অভিজ্ঞান
সেই সময়ের ভিতর দাঁড়িয়ে
তাকে আমি চিনেছি

সে আমাকে নিয়ে গ্যাছে
গভীর জঙলায় ঠিরঠির শীতের কাছে
আমাকে সবক দিয়েছে নারীর
সঙ্গে মিলনের গুহ্য তুকতাক
আমার ভাইয়ের অঙ্গীকারের ওম
তুলতে শিখিয়েছে অরিন্দমের নেশায়
বল্লমের তীক্ষ্ণ তুখোড় ফলায়

যদিও বা আজ ক্ষিপ্র বাঘ ঘরবৈঠা ঘরে
তুমি স্তিমিত নমিত একা
বিড়ালও তোমার চারপাশে পাহাড়া বসায়
বাতাসে হালুম মিঁউ বের করে সাদা দাঁত
পায়ের নিচে বিড়াল থেঁতলে ফেলে সবুজ ঘাস।

আমাদের প্রবীণ কথা নয়
কানে বুঝি শীশা ঢেলে দেয়— হাসে
দুশমন সাফ করার
মন্ত্র তার জানা
অন্তর্ভেদী একজোড়া চোখ
পাথর ফুঁড়ে ওই পারে দ্যাখে

Ethridge Knight : He sees through Stone.

ওইদিন কারারক্ষী আমাকে বলে

ওইদিন কারারক্ষী আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি ধরে নিই তিনি সাতপাঁচ না ভেবেই কথাটি বলেন— আচ্ছা এথরিজ, কালোরা কখনোই সাদাদের মতো পালিয়ে যায় না— কেন বলো তো?

আমি মুখ নিচু করি, মাথা চুলকাই— তেমন কিছু না ভেবেই বলি— দেখেন, আমি ঠিক কইতে পারুম না, তয় মনে কয়— আমাগো পলাইয়া যাওনের জায়গা নাই।

Ethridge Knight : The warden said to me the other day.

Comments

comments

বদরুজ্জামান আলমগীর

নাট্যকার, কবি, অনুবাদক। জন্মেছিলেন ২১শে অক্টোবর ১৯৬৪ সনে ভাটি অঞ্চল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে। পড়াশোনা বাজিতপুরে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০বছর দেশের বাইরে- যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় থাকেন। নাটকের বই ২টো: নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে; আবের পাঙখা লৈয়া। বাঙলাদেশে নাটকের দল- গল্প থিয়েটার- এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, নাট্যপত্রের সম্পাদক। নানা পর্যায়ে আরও সম্পাদনা করেছেন- সমাজ ও রাজনীতি, দ্বিতীয়বার, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ণপথিক, মর্মের বাণী শুনি, অখণ্ডিত। কবিতার বই ২টো: পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর; নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো। প্যানসিলভেনিয়ায় কবিতার প্রতিষ্ঠান- সংবেদের বাগান-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্যারাবল-এর বই ১টি: হৃদপেয়ারার সুবাস। প্রকাশিতব্য- ভাষান্তরিত আন্তর্জাতিক কবিতার বই: ঢেউগুলো জমজ বোন।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি